মুসলিম মননের উপনিবেশমুক্তি: একটি দার্শনিক সমালোচনা

সারসংক্ষেপ
বর্তমান ইসলামি বিশ্বের যাবতীয় সংকট মূলত ‘জ্ঞানতাত্ত্বিক উপনিবেশবাদ’-কে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে। সুতরাং, মুসলিম মনস্তত্ত্বকে উপনিবেশমুক্ত করতে হলে আমাদের অবশ্যই পশ্চিমা জ্ঞানকাঠামোকে বিনির্মাণ করতে হবে। আর এর অর্থ হলো, রেনেসাঁ বা নবজাগরণের পর থেকে প্রগতি ও আধুনিকতার মতো ধারণার মাধ্যমে যে ইউরোপ-কেন্দ্রিক জ্ঞানব্যবস্থা ধীরে ধীরে আধিপত্য বিস্তার করেছে, তার থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করা।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, পশ্চিমা চিন্তাধারার সাথে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সংলাপ বা আদান-প্রদান পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হবে। বরং এর প্রকৃত তাৎপর্য হলো, আমাদের নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যকে পুনরুদ্ধার ও পুনরুজ্জীবিত করা এবং সেই ঐতিহ্য থেকে উৎসারিত বিভিন্ন পরিভাষা ও ধারণার আলোকে চিন্তা করতে সক্ষম হওয়া। কিন্তু উত্তর-ঔপনিবেশিক পরিস্থিতির বাস্তবতায় এটি এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। কারণ, এই বাস্তবতায় আমাদের নিজেদের ঐতিহ্যের সাথে বুদ্ধিবৃত্তিক ও ভাষাগত যে সংযোগ ছিল, তা ব্যাপকভাবে ছিন্ন হয়ে গেছে।
এর চেয়েও বড় বিষয় হলো, অনেক মুসলিম বুদ্ধিজীবীই সরলভাবে বিশ্বাস করেন যে, সমসাময়িক সংকটগুলো মোকাবিলায় ইসলামি ঐতিহ্যের তেমন কোনো প্রাসঙ্গিকতা নেই। অথচ, মুসলিমরা যতক্ষণ পর্যন্ত নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের ভিত্তিমূলে নিজেদের আত্ম-পরিচয়কে প্রোথিত করতে না পারছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা জ্ঞানতাত্ত্বিক উপনিবেশবাদের এই জালে বন্দিই থেকে যাবে। একজন মুসলিম হিসেবে হয়তো তারা বেশ স্বাচ্ছন্দ্যের সাথেই নিজেদের প্রাত্যহিক ইবাদত বা প্রার্থনা পালন করতে পারবেন, কিন্তু তাদের মনোজগৎ আচ্ছন্ন হয়ে থাকবে ধ্বংসাত্মক ও ইউরোপ-কেন্দ্রিক সব ধারণায়। ফলস্বরূপ, নিজেদের এই খণ্ডিত আত্ম-পরিচয় থেকে তারা কখনোই পুরোপুরি বের হয়ে আসতে পারবেন না।
১ | প্রথম পর্ব
আপনি রিয়াদ বা লাহোর অথবা অন্য কোথাও ঐতিহ্যবাহী কোনো বাড়িতে বাস করছেন। হঠাৎ আপনাকে জোর করে শ্রীহীন কোনো বহুতল অ্যাপার্টমেন্টে নিয়ে যাওয়া হলো। এসব আধুনিক ভবনে হয়তো সুইমিংপুল, ফিটনেস সেন্টার এবং ব্যক্তিগত উন্মুক্ত জায়গার মতো সুযোগ-সুবিধা থাকতে পারে। কিন্তু কাঁচঘেরা এসব আধুনিক কাঠামোতে সেই ঐতিহ্যবাহী জানালাগুলো থাকে না। ফলে মানুষ আলো, উত্তাপ ও শব্দের প্রাকৃতিক জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তা ছাড়া, চারপাশ আবদ্ধ থাকায় এসব ভবন ঠান্ডা বা গরম রাখতে প্রচুর বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি তীব্র আলো ও তাপমাত্রাজনিত অস্বস্তি তো রয়েছেই। মানুষ হয়তো তাদের পুরনো বাড়ির সুন্দর নিদর্শনগুলো—যেমন জানালার শার্শি, তেলের প্রদীপ বা গাছের টব—এখনো সযত্নে রেখে দিয়েছে। কিন্তু নতুন এই পরিবেশে এসে এগুলোর ভাষা ও অন্তর্নিহিত তাৎপর্য তারা আর বুঝতে পারে না। এককথায়, নতুন এই পরিবেশ মানুষের জীবন, কর্ম ও চিন্তার ছন্দকে আমূল বদলে দেয়। মুসলিম মনস্তত্ত্বের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটাই ঘটেছে; এর পুরো স্থাপত্যটাই যেন মৌলিকভাবে বদলে গেছে। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, খণ্ডিত আত্ম-পরিচয় নিয়ে বেড়ে ওঠা বর্তমান প্রজন্ম তাদের ঐতিহাসিক পরিচয় অন্বেষণ করতে এবং বর্তমান আত্ম-পরিচয় বিনির্মাণে এই জ্ঞানের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে প্রায়শই কোনো আগ্রহ দেখায় না।
অর্থাৎ, নতুন কোনো ভিত্তি স্থাপন করতে হলে বিদ্যমান কাঠামোটিকে আগে ভেঙে ফেলতে হবে—আর এই কাঠামোটিকেই আমি বলছি ‘জ্ঞানতাত্ত্বিক উপনিবেশবাদ’ (Epistemic colonialism)। এটি ঠিক রাজনৈতিক উপনিবেশবাদের মতো নয়; বরং ঔপনিবেশিক শাসনের আনুষ্ঠানিক অবসানের পরও শিক্ষা ও সংস্কৃতির মতো ক্ষেত্রগুলোতে ঔপনিবেশিক কাঠামো ও চিন্তাপদ্ধতির টিকে থাকাকেই এটি নির্দেশ করে।
জ্ঞানতাত্ত্বিক উপনিবেশবাদ বলতে আমি ঠিক কী বোঝাতে চাইছি, তা স্পষ্ট করতে একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। আমাদের উত্তর-ঔপনিবেশিক যুগের ‘শিক্ষা’র বিষয়টিই বিবেচনা করা যাক। বিশ্বব্যাপী অধিকাংশ আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থাই পশ্চিমা পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে, এমনকি শিক্ষার মাধ্যম যখন ইংরেজি ছাড়া অন্য কোনো ভাষাও হয়। এই প্রেক্ষাপটে, পশ্চিমা সভ্যতাকেই বারবার একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে দেখা হয়; যার ফলে অন্যান্য সভ্যতাকে ব্যর্থ মনে হয় এবং ধরে নেওয়া হয় যে, সফল হতে হলে তাদেরও পশ্চিমা কাঠামো গ্রহণ করা প্রয়োজন। একইভাবে, পশ্চিমা প্রাতিষ্ঠানিক, বৈজ্ঞানিক এবং শিক্ষাগত কাঠামোকে অবলীলায় ‘একাডেমি’, ‘বিজ্ঞান’ এবং ‘শিক্ষা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। অন্যদিকে, বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যগুলোকে প্রায়শই ‘ধর্মীয় প্রশিক্ষণ’ বা ‘অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা’র গণ্ডিতে নামিয়ে আনা হয়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আধুনিক শিক্ষা বা আধুনিক বিজ্ঞান সাধারণত জ্ঞান ও নৈতিকতার মধ্যকার সম্পর্কের প্রতি কোনো ভ্রূক্ষেপই করে না; অথচ জ্ঞানের অপরিমেয় ক্ষমতাকে—যেমন ধরুন, একটি পরমাণুর ভেতরের শক্তিগুলো কীভাবে কাজ করে তা জানার ক্ষমতাকে—কোনোভাবেই উপেক্ষা করার উপায় নেই।
এসব কথার সারমর্ম হলো, আধুনিক (পশ্চিমা) শিক্ষা তার নিজস্ব সুনির্দিষ্ট মতাদর্শ এবং স্থানিক ইতিহাস দ্বারা পরিচালিত হলেও, এটিকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও সর্বজনীন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়; যেন শিক্ষা বা বিজ্ঞান নিয়ে ভাবার জন্য এটি ছাড়া আর কোনো বিকল্প কাঠামোর অস্তিত্বই থাকতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ, ইসলামি ঐতিহ্যে শিক্ষার একটি নৈতিক ও মূল্যবোধগত মাত্রা রয়েছে, যা আত্ম-উৎকর্ষ ও মানবকল্যাণের ধারণার সাথে গভীরভাবে যুক্ত। অথচ এই বিষয়গুলো আজ ক্রমেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে; কারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন নৈতিক গঠনের (অর্থাৎ, নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ গড়ার) পরিবর্তে কেবল দক্ষতা ও উৎকর্ষ অর্জনের পেছনে ছুটতেই বেশি আগ্রহী।
ওপরের উদাহরণটি থেকে অন্তত এটুকু স্পষ্ট হয় যে, জ্ঞানতাত্ত্বিক উপনিবেশবাদ আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে কীভাবে প্রভাবিত করে। এটি বিশ্বকে তার প্রকৃত রূপে দেখার পথে এক বিশাল বাধা। রাজনৈতিক উপনিবেশবাদ মানুষকে তার রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। অন্যদিকে, জ্ঞানতাত্ত্বিক উপনিবেশবাদ বিভিন্ন জ্ঞানকাঠামোর সাহায্যে মানুষের মনকেই পরাধীন ও পঙ্গু করে দেয়।
জ্ঞানতাত্ত্বিক উপনিবেশবাদের এই ধারণাটি ইউরোপকেন্দ্রিকতার (Eurocentrism) সাথে গভীরভাবে যুক্ত। আমরা যদি এই আধিপত্যবাদী চিন্তাধারাকে সঠিকভাবে চিহ্নিত ও বিশ্লেষণ করতে না পারি, তবে মুসলিম মনস্তত্ত্বকে উপনিবেশমুক্ত করার আলাপ একেবারেই অবান্তর।
আমাদের সাম্প্রতিক ইতিহাসে ইউরোপকেন্দ্রিকতা ঠিক কতটা গভীরভাবে গেঁথে আছে? বিষয়টি বুঝতে আমি ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ও রাজনীতিক টি. বি. মেকলের একটি বিখ্যাত উদ্ধৃতি স্মরণ করতে চাই। ভারতীয় উপমহাদেশে ইংরেজি শিক্ষা প্রসারের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন:
‘আমি এমন একজনকেও পাইনি যিনি এই কথা অস্বীকার করবেন—ইউরোপের একটি ভালো গ্রন্থাগারের একটিমাত্র তাকের বই ভারত ও আরবের সমগ্র সাহিত্যের সমতুল্য। পশ্চিমা সাহিত্যের এই অন্তর্নিহিত শ্রেষ্ঠত্ব প্রাচ্যদেশীয় শিক্ষা পরিকল্পনার সমর্থক কমিটির সদস্যরাও পুরোপুরি স্বীকার করে নিয়েছেন… আমাদের এখন এমন একটি শ্রেণি তৈরির জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে, যারা আমাদের এবং আমাদের শাসিত কোটি কোটি মানুষের মাঝে দোভাষীর কাজ করবে। এই শ্রেণিটি রক্তে ও বর্ণে ভারতীয় হলেও রুচি, মতাদর্শ, নৈতিকতা ও বুদ্ধিবৃত্তিতে হবে পুরোপুরি ইংরেজ।’
সংস্কৃত, ফার্সি ও আরবি ভাষায় রচিত সমগ্র ভারতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য নিয়ে মেকলে এভাবেই তাঁর চূড়ান্ত রায় দিয়েছিলেন। মেকলে ও তাঁর মিত্রদের কাছে হিন্দু-মুসলিমদের সাহিত্য এবং ঐতিহ্যগুলো ছিল সম্পূর্ণ মূল্যহীন। এগুলোকে তাঁরা সেকেলে কুসংস্কার বলে মনে করতেন, যা উপমহাদেশে আধুনিকতার আগমনকে বাধাগ্রস্ত করছিল।
কেউ যেন আবার না ভাবেন যে, এটি নাম না-জানা কোনো ঔপনিবেশিক প্রশাসকের বক্তব্য; যার কথার আজ আর কোনো প্রাসঙ্গিকতা নেই। বরং মনে রাখা দরকার, মেকলে এবং তাঁর সহকর্মীরা ফার্সির বদলে ইংরেজি চালু করে ভারতের শিক্ষাব্যবস্থাকে আমূল বদলে দিতে ঠিকই সফল হয়েছিলেন।
এবার চলুন, সুপরিচিত ইংরেজ সাংস্কৃতিক সমালোচক রজার স্ক্রুটনের একটি দাবি বিশ্লেষণ করে দেখা যাক:
পশ্চিমা সভ্যতার শেকড় নিহিত রয়েছে ইসরায়েলের ধর্ম, গ্রিসের সংস্কৃতি এবং রোমের আইনের মাঝে। যিশুর মৃত্যুর পর গত দুই হাজার বছরে এই সবকিছুর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সভ্যতাটি নানাভাবে বিকশিত হয়েছে, আবার ক্ষয়প্রাপ্তও হয়েছে। নতুন ভূখণ্ডে বিস্তার লাভ করা হোক কিংবা নিজেদের গুটিয়ে নিয়ে শহরমুখী হওয়াই হোক—পশ্চিমা সভ্যতা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান, আইন ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছে। বিজ্ঞান ও শিল্পকলাতেও তারা এনেছে নিত্যনতুন চর্চা। পরীক্ষা-নিরীক্ষার এই ঐতিহ্যই সময়ের পরিক্রমায় জন্ম দিয়েছে এনলাইটেনমেন্ট বা জ্ঞানদীপ্তি এবং গণতন্ত্রের। এটি এমন এক সমাজব্যবস্থা তৈরি করেছে, যেখানে রাষ্ট্র মানুষের স্বাধীন মতপ্রকাশ ও ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়।’ (Reilly, 2010, ‘Foreward’)।
স্ক্রুটন প্রশ্ন তুলেছেন, ‘ইসলামি বিশ্বে কেন এমন কিছু ঘটল না?’ সপ্তম শতাব্দীতে যে সভ্যতা প্রচণ্ড প্রাণশক্তি নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিল, তা আজ কেন বিভিন্ন স্থানে এতটা নীরব, সহিংস এবং ক্ষুব্ধ? উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে প্রভাব বিস্তার করে যারা একদিন নগর, বিশ্ববিদ্যালয়, গ্রন্থাগার এবং এক সমৃদ্ধ রাজকীয় সংস্কৃতির গোড়াপত্তন করেছিল, তাদের আজ এই দশা কেন?—স্ক্রুটন এসব ভেবে আশ্চর্য হন।
তিনি আরও জানতে চান, কেন আজকের ইসলাম তার কট্টর সমর্থকদের সহিংসতাকে কেবল সহ্যই করছে না; বরং মনে হয় যেন সেগুলোকে অনুমোদন ও প্রচারও করছে।
স্ক্রুটন আরও একটি প্রশ্ন তোলেন। ইউরোপে পাড়ি জমানো যেসব মুসলিম সংখ্যালঘু ধর্মনিরপেক্ষ আইনি ব্যবস্থার সুবিধা ভোগ করতে চায়, তারা কেন আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ধরনের আইনের পক্ষে ওকালতি করে? অথচ সেই আইনের রূপরেখা কী হবে বা এর ব্যাখ্যা দেওয়ার অধিকার কার রয়েছে—সে বিষয়ে তাদের নিজেদের মধ্যেই কোনো ঐকমত্য নেই (Scruton, ‘Foreword,’ in Reilly, 2010)।
স্ক্রুটন এরপর এর একটি উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি অনেকটা কল্পনাবিলাসী হয়েই অনুমান করেন যে, একাদশ শতাব্দীতে ইসলামি সভ্যতা এক গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটের মধ্য দিয়ে গিয়েছিল। তখন এটি দর্শনের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অন্ধ অনুশাসনে বা বিশ্বাসের আশ্রয় নেয় এবং সেখান থেকে এটি আর কখনোই প্রকৃত অর্থে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি (Scruton, ‘Foreword,’ in Reilly, 2010)।
স্ক্রুটন অবশ্য ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের কোনো বিশেষজ্ঞ নন। তবে, ধর্মতাত্ত্বিক আল-গাজালির দর্শন ও যুক্তির ওপর সেই বিখ্যাত আক্রমণের পর ইসলামি সভ্যতা যে এক দীর্ঘ স্থবিরতার যুগে নিপতিত হয়েছিল—এমন দাবি করার ক্ষেত্রে স্ক্রুটন একা নন।
টি. জে. ডি বোয়ার, ইবরাহিম মদকুর এবং মন্টগোমারি ওয়াটের মতো পশ্চিমা ও মুসলিম ইতিহাসবিদদের এক সুদীর্ঘ তালিকা রয়েছে, যারা এই তত্ত্বটিকে সমর্থন করেছেন যে, ইউরোপের ‘অন্ধকার যুগে’ ইসলামি বিশ্বই গ্রিক দার্শনিক ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ ও ব্যাখ্যা করেছিল এবং পরবর্তীতে দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীতে তা ল্যাটিন পশ্চিমা বিশ্বে হস্তান্তর করেছিল।
তবে ঠিক এখানেই প্রচলিত আখ্যানটি মুসলিম সভ্যতার অবদানকে আর গুরুত্ব দেয় না; এর পরবর্তী ইসলামি জ্ঞানচর্চার ধারাটি গবেষকদের কাছে প্রায় উপেক্ষিতই থেকে যায়। গবেষকদের মতে, এর পেছনে প্রধান কারণ ছিল রক্ষণশীল ধর্মতাত্ত্বিকদের বিরোধিতা। তাঁদের দাবি অনুযায়ী, দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যেই মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের অবলুপ্তি ঘটেছিল। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, ল্যাটিন পশ্চিমা বিশ্ব ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে গ্রিক দার্শনিক ঐতিহ্যকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পেরেছিল। তাঁদের মতে, মুসলিম বিশ্ব যেহেতু ইতোমধ্যেই সেই ঐতিহ্যকে প্রত্যাখ্যান করে বুদ্ধিবৃত্তিক স্থবিরতায় নিমজ্জিত হয়েছিল, তাই পশ্চিমা বিশ্বই সেটিকে রক্ষা করার সুযোগ পায়। এই পরিস্থিতির পরিণতিতে ইসলামি বিশ্বে ‘বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মহত্যা’ ঘটেছে; যা তাদের ‘বিকৃত ধর্মতত্ত্বের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক অকার্যকর সংস্কৃতি’ এবং বহু মুসলিমের ‘নৈতিক অবিকশিত দশা’র দিকে ঠেলে দিয়েছে (এ বিষয়ে পরে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে) [see Reilly, 2010, Ch. 9]।
ওপরের কথাগুলোর প্রতি কেউ যদি নিবিড়ভাবে মনোযোগ দেন, তবে এর মধ্যে লুকিয়ে থাকা আধিপত্যবাদী (triumphalist) ও উদ্দেশ্যবাদী (teleological) সুরটি ধরতে খুব একটা সময় লাগবে না। উদাহরণস্বরূপ, স্ক্রুটন দম্ভভরে বলেন: ‘আর পরীক্ষা-নিরীক্ষার এই ঐতিহ্যই সময়ের পরিক্রমায় জন্ম দিয়েছে এনলাইটেনমেন্ট বা জ্ঞানদীপ্তি, গণতন্ত্র এবং এমন এক ধরনের সমাজব্যবস্থার, যেখানে রাষ্ট্র মানুষের স্বাধীন মতপ্রকাশ ও ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করে’ (Scruton, ‘Foreword,’ in Reilly, 2010)।
আমি আগেই ‘আধুনিক শিক্ষা’র উদাহরণ দিয়ে যেদিকে ইঙ্গিত করেছিলাম, তা থেকে একটি প্রশ্ন জাগে—কীভাবে একজন মানুষ তার বর্তমান ঐতিহাসিক অবস্থান এড়িয়ে যেতে পারে? কারণ এই অবস্থানটি জ্ঞানদীপ্তি ও ইউরোপকেন্দ্রিকতার (Eurocentrism) মতাদর্শ দ্বারা এমনভাবে রূপায়িত, যা অতীত সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়াকে পুরোপুরি বিকৃত করে দেয় বলে মনে হয়।
ওলুদামিনি ওগুননাইকে-র মতে, পশ্চিমা সভ্যতা সম্পর্কে এই দৃষ্টিভঙ্গি যে তাদের সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্পের সমান্তরালেই গড়ে উঠেছিল, তা মোটেও কাকতালীয় নয়। এই প্রকল্পের অধীনে হাজার হাজার তরুণকে সদ্য প্রতিষ্ঠিত পশ্চিমা বিশ্বের ‘সভ্য করার মিশন’-এ বিশ্বাস করতে শেখানো হয়েছিল। বিশ্বের অপেক্ষাকৃত ‘অন্ধকারে থাকা’ মানুষগুলোকে বর্বরতা ও অজ্ঞতা থেকে মুক্ত করে পশ্চিমা সভ্যতার সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার এক কৃত্রিম কর্তব্যবোধ তাদের মনে গেঁথে দেওয়া হয়েছিল। এক্ষেত্রে সেই মানুষগুলোর নিজস্ব আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের কোনো তোয়াক্কাই করা হয়নি; বরং এই লক্ষ্য অর্জনে সবচেয়ে জোরজবরদস্তিমূলক ও অমানবিক পদ্ধতিগুলোকেও বৈধতা দেওয়া হয়েছিল। এই নিষ্ঠুর সাম্রাজ্যবাদ মূলত আধুনিক পশ্চিমা উদারতাবাদেরই উল্টোপিঠ: তাদের যুক্তিটা হলো, ‘যদি তুমি এবং তোমার সমাজ আমাদের মতো করে যৌক্তিক, উদার ও স্বাধীন না হও, তবে তুমি পশ্চাৎপদ। আর তাই তোমাকে ‘উন্নত’ করার জন্য এবং আমাদের উদারবাদী আদলে তোমাকে নতুন করে গড়ে তোলার জন্য, আমরা অনুদার পন্থায় তোমার স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেব’ (Ogunnaike, 2018)।
‘পশ্চিম’ (the West) শব্দটি যে কয়েক শতাব্দী আগের একটি সাম্প্রতিক উদ্ভাবন মাত্র, তা দেখানোর পর কসমোপলিটান চিন্তাবিদ কোয়ামে অ্যান্থনি আপিয়া যুক্তি দেন যে, পশ্চিমা সভ্যতা বলতে আসলে কিছু নেই। আপিয়ার মতে, ‘পশ্চিমা সংস্কৃতি’ পরিভাষাটি প্রচুর বিভ্রান্তি তৈরি করে, কারণ এটি একটি বিতর্কিত ধারণা। স্নায়ুযুদ্ধের সময়, ‘পশ্চিম’ বলতে লৌহযবনিকার একপাশকে বোঝানো হতো, যার বিপরীত ও শত্রু পক্ষ ছিল ‘পূর্ব’। এই প্রক্রিয়ায় বিশ্বের বিশাল একটি অংশকে একেবারেই উপেক্ষা করা হয়েছিল। আরও সাম্প্রতিককালে, ‘পশ্চিম’ বলতে মূলত উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলকে বোঝায়: অর্থাৎ ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকায় তাদের সাবেক উপনিবেশগুলো। এক্ষেত্রে এর বিপরীত দিকটি হলো আফ্রিকা, এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার অপশ্চিমা বিশ্ব—যাকে এখন ‘গ্লোবাল সাউথ’ বলা হয়। যদিও লাতিন আমেরিকার অনেকেই নিজেদের পশ্চিমা ঐতিহ্যের দাবিদার বলে মনে করেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি সমগ্র বিশ্বকে স্বীকার করে ঠিকই, কিন্তু বৈচিত্র্যময় সমাজগুলোকে মাত্রাতিরিক্ত সরলীকরণ করে ফেলে। একইসাথে, এটি অত্যন্ত বেছে বেছে অস্ট্রেলিয়ান, নিউজিল্যান্ডার এবং শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকানদের এর অন্তর্ভুক্ত করে। এর ফলে ‘পশ্চিমা’ শব্দটি আদতে শ্বেতাঙ্গদেরই একটি শ্রুতিমধুর প্রতিশব্দ হয়ে দাঁড়ায় (Appiah, 2016)।
যাই হোক, স্ক্রুটনের মতো প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ জোনাথন ইজরায়েলও একটি দাবি তুলেছেন। তিনি তথাকথিত ‘র্যাডিক্যাল এনলাইটেনমেন্ট’ বা চরমপন্থী জ্ঞানদীপ্তির শ্রেষ্ঠত্বের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন (তার মতে এটি হলো স্পিনোজা বা দিদেরোর দর্শন, যা লক বা নিউটনের মতো মধ্যপন্থী ছিল না)। তার এনলাইটেনমেন্ট কনটেস্টেড বইয়ে তিনি বেশ জোর গলাতেই বলেছেন:
‘যারা বিশ্বাস করেন যে সমাজ কেবল ‘যুক্তি’ দিয়েই সবচেয়ে ভালোভাবে চালানো সম্ভব, তাদের কাছে এই চরমপন্থী এনলাইটেনমেন্টের ধারণাটিই সেরা। এর ওপর ভিত্তি করে ব্যক্তি স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও সাম্যের যে আধুনিক সমাজ গড়ে উঠেছে, তা নৈতিক ও রাজনৈতিক—সব দিক থেকেই শ্রেষ্ঠ। শুধু অতীত নয়, আজও এর চেয়ে ভালো কোনো বিকল্প নেই। এই শ্রেষ্ঠত্ব কেবল পশ্চিমা বিশ্বের জন্যই নয়, বরং প্রাচ্য বা ঐতিহ্যবাহী যেকোনো সমাজের চেয়েও এটি অনেক উন্নত। এককথায়, যুক্তির বিচারে এর সামাজিক মূল্যবোধগুলো এতটাই নিখুঁত যে, এর কোনো বিকল্প হতেই পারে না।’ (Israel, 2006, p. 869)
অন্য জায়গায় ইজরায়েল এই ‘র্যাডিক্যাল এনলাইটেনমেন্ট’-কে এমন একটি প্যাকেজ হিসেবে দেখিয়েছেন, যার মূল কথা হলো দুটি:
এক. সত্য বিচারের একমাত্র মাপকাঠি হবে দার্শনিক বা গাণিতিক যুক্তি;
এবং দুই. অতিপ্রাকৃত শক্তি, জাদু, ঈশ্বর বা আত্মার মতো যাবতীয় অদৃশ্য ধারণাকে পুরোপুরি বাতিল করতে হবে।
এটি সত্যিই এক বিস্ময়কর দাবি। বিশেষ করে আধুনিকতার চরম ব্যর্থতাগুলোর দিকে তাকালে এই দাবি আরও অবাস্তব মনে হয়। এই আধুনিকতার হাত ধরেই তো এসেছে দাসপ্রথা, আফ্রিকা ও ভারতে ঔপনিবেশিক গণহত্যা, গত দুই শতকের বিশ্বযুদ্ধ, বর্ণবাদ, মৌলবাদ এবং আজকের পরিবেশ বিপর্যয় (Hallaq, 2018; Zwicky, 2023)।
তা সত্ত্বেও ইজরায়েলের মতো পণ্ডিতরা অবলীলায় এমন একটি মাপকাঠি দাঁড় করান, যেখানে এনলাইটেনমেন্টের যুক্তি ও ইতিহাসকেই তারা গোটা বিশ্বের জন্য ‘সর্বজনীন’ বলে চালিয়ে দেন। আর তারা চান, বাকি সব সংস্কৃতির বিচার এই পশ্চিমা মাপকাঠিতেই হোক।
আঠারো শতকের এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলনটি শুরু হয়েছিল মূলত মধ্যযুগের খ্রিষ্টীয় অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক বিদ্রোহ হিসেবে। ওগুননাইকে এবং অন্যান্য গবেষকরা দেখিয়েছেন, কীভাবে রেনেসাঁ ও এনলাইটেনমেন্টের যুগে পশ্চিমা বিশ্বে ধর্মের পতন ঘটেছিল এবং জ্ঞানচর্চা থেকে ধর্মকে আলাদা করা হয়েছিল। এর ফলে মহাবিশ্বকে দেখার যে ঐতিহ্যবাহী দৃষ্টিভঙ্গি (যাকে দর্শনের ভাষায় ‘চেইন অফ বিয়িং’ বা সৃষ্টির স্তরবিন্যাস বলা হতো), তা পুরোপুরি পালটে যায় (Ogunnaike, 2016, p. 802)।
যখন ঐশ্বরিক সত্তা, ফিরিশতা বা অদৃশ্য জগতের ধারণাগুলো হারিয়ে গেল, তখন পশ্চিমা মানুষ নিজেকে সৃষ্টির এই স্তরবিন্যাসের একেবারে চূড়ায় বসিয়ে দিল। ঈশ্বর বা স্বর্গ হয়তো তখনো মানুষের কল্পনায় টিকে ছিল, কিন্তু দার্শনিক ও বিজ্ঞানীদের চোখে এই দৃশ্যমান মহাবিশ্বের সর্বেসর্বা হয়ে দাঁড়াল পশ্চিমা মানুষ।
ওগুননাইকে বলেন, মধ্যযুগে মানুষের মূল্য বিচার করা হতো ঈশ্বরের সাথে তার আধ্যাত্মিক সম্পর্কের ভিত্তিতে। কিন্তু এনলাইটেনমেন্টের পর সেই চিত্র বদলে গেল। তখন মানুষের বিচারের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়াল—সে কতটা যৌক্তিক এবং কতটা ‘আলোকিত ইউরোপীয়’ মানুষের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারল (Ogunnaike, 2017, p. 189)।
উনিশ শতকে এসে দার্শনিক হেগেল এনলাইটেনমেন্টের এই আদর্শকেই যেন পূর্ণতা দিলেন। তিনি ঘোষণা করলেন, পশ্চিম ইউরোপ হলো এমন এক ভূখণ্ড, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট বা ‘বিশেষ’ ধারণা ‘সর্বজনীন’ রূপ লাভ করে। এনলাইটেনমেন্টের এই নির্দিষ্ট যুক্তিবাদকেই তিনি ‘সর্বজনীন যুক্তি’ হিসেবে দাঁড় করান এবং একেই মানবতার আসল পরিচয় বলে দাবি করেন। এর ফলে এনলাইটেনমেন্টের চিন্তাবিদরা সারা বিশ্বের হয়ে কথা বলার এক অদ্ভুত কর্তৃত্ব পেয়ে যান। হেগেলের ভাষায়:
আফ্রিকায় মানুষ তার সাধারণ শারীরিক অস্তিত্বের বাইরে আর এগোতে পারেনি। তারা মনে করে এর চেয়ে বেশি কোনো বিকাশ সম্ভব নয়। তাদের গায়ে প্রচুর জোর, ফলে তারা হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে পারে। তাদের মেজাজও বেশ সরল, তবে এই সরলতার পেছনে চরম নিষ্ঠুরতাও লুকিয়ে থাকে। অন্যদিকে এশিয়া হলো বিভাজন ও বিস্তৃতির জায়গা। এখানে একদিকে রয়েছে কঠোর নৈতিক জীবন, আবার অন্যদিকে রয়েছে সীমাহীন অহংকার, অসীম আকাঙ্ক্ষা আর লাগামহীন স্বাধীনতা। আর ইউরোপ হলো আধ্যাত্মিক ঐক্যের ভূমি। ইউরোপ জানে কীভাবে এই লাগামহীন স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করে একটি সুশৃঙ্খল ও সর্বজনীন রূপ দিতে হয়। এখানেই মানুষের আত্মা তার প্রকৃত ঠিকানা খুঁজে পায়। (Hegel, 1980, pp. 172–173)।
ওগুননাইকের মতে, এই ধারণাগুলো ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদকে বৈধতা দিয়েছে। আজও এগুলো উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড, মার্কসবাদী অভ্যুত্থান এবং শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী মতাদর্শকে প্রভাবিত করে চলেছে। হেগেল সৃষ্টির স্তরবিন্যাস (Chain of Being) ধারণার একটি পরিমার্জিত এবং সময়-নির্ভর রূপ দাঁড় করিয়েছিলেন। সেখানে আধুনিক মানুষকে রাখা হয়েছে একেবারে চূড়ায়। অন্যদিকে মানবতার অন্যান্য অংশকে এই শৃঙ্খলের অনেক নিচে স্থান দেওয়া হয়েছে। এদেরকে প্রায়ই অতীতের গণ্ডিতে আটকে রাখা হয় অথবা ইতিহাসের আওতার পুরোপুরি বাইরে বলে ধরে নেওয়া হয়। হেগেল মূলত বোঝাতে চেয়েছেন, এনলাইটেনমেন্ট বা জ্ঞানদীপ্তির অভাবে অ-ইউরোপীয়রা আসলে উপমানব (subhuman)। আর তিনি এর সাথে যে বর্ণবাদী সারসত্তাবাদ (racial essentialism) যুক্ত করেছেন, তা থেকে ইঙ্গিত মেলে যে তাদের এই অবস্থার হয়তো কখনোই কোনো উন্নতি সম্ভব নয় (Ogunnaike, 2016, p. 802)।
দীপেশ চক্রবর্তীর Provincializing Europe বইটিতে একটি বিশেষ কাল্পনিক ধারণাকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ধারণাটি হলো, অ-পশ্চিমা সমাজগুলোতে আধুনিকতার জন্মস্থান হিসেবে ইউরোপকেই ধরে নেওয়া হয়। গত দুই শতাব্দী ধরে ইউরোপীয় দার্শনিক ও চিন্তাবিদরা এমন সব তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছেন যেগুলো সর্বজনীনতার দাবি করে। অথচ এগুলো অ-পশ্চিমা বিশ্বে বসবাসকারী বিশ্বের বিশাল জনগোষ্ঠীকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে যায়। পরিহাসের বিষয় হলো, অ-পশ্চিমা অঞ্চলের গবেষকরা প্রায়ই নিজেদের সংস্কৃতি অধ্যয়নের জন্য এই তথাকথিত ‘সর্বজনীন’ তত্ত্বগুলো গ্রহণ করেন। কিন্তু এই তত্ত্বগুলোর যে নিজস্ব একটি সুনির্দিষ্ট বা ‘বিশেষ’ ঐতিহাসিক অবস্থান রয়েছে, সেটি তারা স্বীকার করতে ব্যর্থ হন।
অর্থাৎ আমরা হয়তো মুখে ইউরোপকেন্দ্রিকতাকে প্রত্যাখ্যান করতে চাই। কিন্তু একইসাথে আবার এর বিশ্লেষণাত্মক আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোগুলোকেই আপন করে নিই।
চক্রবর্তী যুক্তি দেন যে, ইউরোপকে ‘প্রাদেশিকীকরণ’ বা একপেশে প্রমাণের অর্থ হলো এই তথাকথিত সর্বজনীন তত্ত্বগুলোকে সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করা। এগুলো আসলে এমন কিছু নির্দিষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের গভীরে প্রোথিত, যাদের প্রকৃত সর্বজনীন বৈধতার অভাব রয়েছে (Chakrabarty, 2008, pp. 26–27)।
তা সত্ত্বেও সমসাময়িক গবেষণায় ইউরোপীয় চিন্তাবিদদের আধিপত্য আজও বজায় রয়েছে। জ্ঞান উৎপাদনের ক্ষেত্রে ইউরোপ নিজেই যেন একটি অলিখিত মানদণ্ড বা রেফারেন্স পয়েন্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে। অ-পশ্চিমা অঞ্চলের ইতিহাসবিদরা প্রায়শই ইউরোপীয় ইতিহাসের সাথে যুক্ত হতে বাধ্য বোধ করেন। অথচ ইউরোপীয় গবেষকরা যখন ইউরোপ নিয়ে গবেষণা করেন, তখন তারা এই সৌজন্যের প্রতিদান দেওয়ার কোনো প্রয়োজনই বোধ করেন না।
হেগেলের সময় থেকে চলে আসা এই ইউরোপকেন্দ্রিক চিন্তাধারার চরম সীমাবদ্ধতাগুলো আমাদের পরবর্তী আলোচনায় আরও স্পষ্ট হবে। তবে এই প্রসঙ্গে হার্ভার্ডের ইতিহাসবিদ খালেদ আল-রওয়ায়হেব-এর কথা সংক্ষেপে উল্লেখ করা যাক।
সতেরো শতকের উসমানীয় বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাস নিয়ে লেখা তাঁর সাম্প্রতিক বইটিতে তিনি এনলাইটেনমেন্ট মডেলগুলোর ভেতরে লুকিয়ে থাকা একটি উদ্দেশ্যবাদী অনুমানের (teleological assumption) যৌক্তিকতা নিয়ে ঠিকই প্রশ্ন তুলেছেন। এই অনুমান অনুযায়ী ধরে নেওয়া হয়, মানবজাতির বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক বিকাশ কেবল একটি নির্দিষ্ট দিকেই অগ্রসর হতে পারে। আর সেই দিকটি হলো সেটাই, যা বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের পর থেকে ইউরোপের নির্দিষ্ট কিছু অংশ গ্রহণ করেছিল। সুতরাং কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ যদি ইউরোপীয় মডেলের সাথে না মেলে, তবে তাকে চূড়ান্তভাবে পশ্চাৎপদতা ও ধর্মীয় উন্মাদনার তকমা দিয়ে বাতিল করে দেওয়া হয় (El-Rouayheb, 2015, p. 357)। তাই এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, স্ক্রুটনের মতোই ইজরায়েলও তার বইয়ে ইসলাম সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে সেই পুরোনো ‘পতন তত্ত্ব’ (decline thesis)-এরই পুনরাবৃত্তি করেছেন।
২ | দ্বিতীয় পর্ব
ইসলামি এবং ভারতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের শিক্ষার্থীদের কাছে এনলাইটেনমেন্টের এই ভ্রান্তি স্পষ্ট হওয়ার কথা। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, আমাদের অধিকাংশ বুদ্ধিজীবীই বিজ্ঞান, সাহিত্য ও দর্শনে আমাদের নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। এর সম্ভাব্য কারণ হলো, সংস্কৃত, ফার্সি বা আরবি ভাষা সম্পর্কে বিন্দুমাত্র জ্ঞান না থাকা মেকলের মতো কোনো এক ঔপনিবেশিক শাসক আমাদের ওপর একটি ধারণা চাপিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ইউরোপের একটি ভালো গ্রন্থাগারের একটিমাত্র তাকের বই ভারত ও আরবের সমগ্র দেশীয় সাহিত্যের সমতুল্য।
বিজ্ঞান ও মানববিদ্যার বিভিন্ন শাখায় আমাদের বুদ্ধিজীবীদের ইউরোপীয় তত্ত্বগুলোকে অন্ধভাবে মেনে নেওয়ার বিষয়টি আর আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না। ‘আধুনিকতা’, ‘প্রগতি’, ‘উন্নয়ন’ এবং ‘বৈজ্ঞানিক অভিজ্ঞতাবাদ’ (scientific empiricism)-এর মতো বিতর্কিত মতবাদগুলো আজ আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তার প্রধান উপাদানে পরিণত হয়েছে। এগুলোর বিষয়ে কোনো সমালোচনামূলক প্রশ্নই তোলা হয় না। বস্তুত আমরা ইউরোপীয় চিন্তাপদ্ধতিতে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যে, মানববিদ্যায় আমাদের ‘সাহিত্যতত্ত্ব ও সমালোচনা’ও পশ্চিমা সমালোচকদের কাজ থেকে ধার করা। এক্ষেত্রে আমরা ফুকো, দেরিদা বা বাখতিনের মতো চিন্তাবিদদের ওপর নির্ভর করি। ভারত ও ইসলামি বিশ্ব উভয় জায়গাতেই সাহিত্যের এত সমৃদ্ধ একটি ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও আমরা এটি করছি। শেলডন পোলক যেমনটা উল্লেখ করেছেন:
এমনটা নয় যে, প্রাক-আধুনিক ভারতে সংস্কৃতি ও ক্ষমতার সমীকরণকে গভীরভাবে বোঝার মতো কোনো উপাদান আমাদের কাছে নেই। এখানে প্রাক-আধুনিক বলতে ১৫০০ থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত সময়কালকে বোঝানো হচ্ছে। এরপরই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি উপমহাদেশে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করে এবং জ্ঞানের জগতের নিয়মকানুন বদলে দেয়। কল্পনা এবং এর লিখিত প্রকাশের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়া এক সমৃদ্ধ সাহিত্যিক নিদর্শনের অধিকারী। কেবল পাঠ্য বা টেক্সটের সংখ্যার বিচারে এবং শত শত বছর ধরে টিকে থাকা নিরবচ্ছিন্ন বহুভাষিক সাক্ষরতার দিক থেকে এটি সমগ্র গ্রিক, ল্যাটিন এবং মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় সংস্কৃতির সম্মিলিত রূপের চেয়েও অনেক বেশি নিবিড়। (Pollock, 2011, p. 4)
এখানে দীপেশ চক্রবর্তীর একটি পর্যবেক্ষণের কথাও স্মরণ করা যেতে পারে। আধুনিক ভারতে সামাজিক চর্চাগুলো অধ্যয়ন করতে গিয়ে তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন, বর্তমানে এমন ভারতীয় সমাজবিজ্ঞানী বা দার্শনিকের সংখ্যা নেই বললেই চলে, যারা অতীতের চিন্তাবিদদের সাথে গুরুত্ব সহকারে তর্কে লিপ্ত হতে সক্ষম। যেমন ত্রয়োদশ শতাব্দীর ন্যায়শাস্ত্রের চিন্তাবিদ গঙ্গেসা, পঞ্চম-ষষ্ঠ শতাব্দীর ব্যাকরণবিদ ও ভাষাদর্শনিক ভর্তৃহরি অথবা দশম ও একাদশ শতাব্দীর শৈব দার্শনিক অভিনবগুপ্তের কথা বলা যায়।
চক্রবর্তী বলেন, ‘এটি দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, দক্ষিণ এশিয়ায় ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসনের একটি বড় ফলাফল হলো আমাদের এই বিচ্ছিন্নতা। সংস্কৃত, ফার্সি বা আরবি ভাষায় একসময় যে নিরবচ্ছিন্ন ও জীবন্ত বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যগুলো ছিল, তা এ অঞ্চলের অধিকাংশ বা হয়তো সব আধুনিক সমাজবিজ্ঞানীর কাছেই আজ কেবল ঐতিহাসিক গবেষণার বিষয়মাত্র। তারা এই ঐতিহ্যগুলোকে রীতিমতো মৃত বলে এবং নেহায়েত অতীত ইতিহাস হিসেবেই বিবেচনা করেন’ (Chakrabarty, 2008, pp. 5–6)।
অন্য কথায়, আমাদের সমাজবিজ্ঞানীরা যখন কোনো আলোচনার জন্য আদর্শ কাউকে খোঁজেন, তখন তারা এই প্রাচীন চিন্তাবিদদের বদলে হেগেল, মার্ক্স কিংবা ওয়েবারের দিকেই তাকিয়ে থাকেন।৬
গবেষকরা যেমনটি উল্লেখ করেছেন, উপনিবেশায়ন মূলত সেই মানুষগুলোকে নিজেদের ইতিহাসে প্রবেশাধিকার থেকে বঞ্চিত করে, যারা জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে উপনিবেশিত (epistemically colonized)। ঔপনিবেশিক চিন্তাধারা ও ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে এটি বাস্তবতা ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে স্থানীয় ভাষার সক্ষমতাকে সীমিত করে ফেলে। ঔপনিবেশিক প্রকল্পটি এই দাবি প্রতিষ্ঠা করে যে, উপনিবেশিতদের ভাষার কোনো প্রযুক্তিগত বা বৈজ্ঞানিক গাম্ভীর্য নেই। এর ফলস্বরূপ, জ্ঞানতাত্ত্বিক উপনিবেশবাদ আমাদের নথিপত্র বা আর্কাইভ মুছে ফেলে। এটি ইতিহাসকে একটি শূন্য খাতায় পরিণত করে এবং আত্মপরিচয় ও প্রতীকগুলোকে অস্পষ্ট করে দেয়। ইউরোপীয় উপনিবেশবাদীরা উপনিবেশিত মানুষের ওপর যে ছাঁচ চাপিয়ে দিয়েছিল, তার বাইরে গিয়ে নিজস্ব পরিভাষায় নিজেদের ঐতিহ্যকে তুলে ধরার সক্ষমতাকে এটি পুরোপুরি দুর্বল করে দেয় (Asif, 2020, p. 4)।
আমি চক্রবর্তীর মতো এতটা নৈরাশ্যবাদী নই। তবে আমাদের স্বীকার করতে হবে যে, জ্ঞানতাত্ত্বিক উপনিবেশবাদ আমাদের সমাজে গভীরভাবে গেঁথে আছে। এই বাস্তবতায় মুসলিম মনস্তত্ত্বকে উপনিবেশমুক্ত করার ডাক এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি।৭
‘উপনিবেশমুক্তকরণ’ (decolonization) শব্দটি ‘ঔপনিবেশিকতামুক্ত’ (decoloniality) পরিভাষার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। এর শেকড় খুঁজে পাওয়া যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের বেশ কয়েকজন চিন্তাবিদের লেখায়। এদের মধ্যে রয়েছেন ফ্রান্টজ ফ্যানন, এইমে সেজায়ার, অ্যানিবাল কিজানো, ওয়াল্টার মিগনোলো, সিলভিয়া উইন্টার এবং সাবেলো এনডলোভু-গাতশেনি।৮
মিগনোলো এবং ক্যাথরিন ওয়ালশ এই বিষয়টি চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন (Mignolo and Walsh, 2018, pp. 105–110)। তাদের মতে, ঔপনিবেশিকতামুক্ত চিন্তার মূল লক্ষ্য হলো পশ্চিমা জ্ঞানকাঠামো থেকে আমাদের বিচ্ছিন্ন করা। ইউরোপীয় রেনেসাঁ থেকে শুরু করে এনলাইটেনমেন্টের মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্বে এই জ্ঞানকাঠামো সুসংহত হয়েছিল। এর অর্থ হলো একটি সন্দেহজনক বিশ্বাস থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নেওয়া। বিশ্বাসটি হলো, কোনো একটি নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিই নাকি সর্বজনীন যৌক্তিকতার প্রতিনিধিত্ব করে। সেই জাতিগোষ্ঠীটি পশ্চিম ইউরোপ হলেও এই বিশ্বাস মেনে নেওয়া যায় না। কারণ ওগুননাইকে এবং চক্রবর্তীসহ অনেকেই যুক্তি দিয়েছেন যে, এই অবস্থানটি মূলত একটি প্রাদেশিক বা আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সর্বজনীনতা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।
এছাড়া ঔপনিবেশিকতামুক্ত চিন্তার অন্যতম লক্ষ্য হলো ‘জ্ঞানতাত্ত্বিক স্বাধীনতা’ অর্জন করা। এনডলোভু-গাতশেনির মতে, জ্ঞানতাত্ত্বিক স্বাধীনতা হলো মূলত চিন্তা করা, তত্ত্ব নির্মাণ করা এবং বিশ্বকে ব্যাখ্যা করার অধিকার। এর মধ্যে দেশীয় পদ্ধতির বিকাশ ঘটানোও অন্তর্ভুক্ত। পাশাপাশি ইউরোপকেন্দ্রিকতার প্রভাবমুক্ত হয়ে নিজস্ব ঐতিহাসিক অবস্থানের জায়গা থেকে লেখালেখি করাও এর অংশ (Ndlovu-Gatscheni, 2018, p. 3)।
সুতরাং, উপনিবেশমুক্তকরণের মূল কথা হলো ‘উপনিবেশিত মন’কে ইউরোপকেন্দ্রিক জ্ঞানতাত্ত্বিক শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করা।
এক অর্থে এই ঔপনিবেশিকতামুক্ত চিন্তার সূচনা হয়েছিল অনেক আগেই। উদাহরণস্বরূপ, আমরা উপমহাদেশের মুহাম্মদ ইকবালের কথা ভাবতে পারি। তিনি পশ্চিমা জ্ঞানতত্ত্বের সমালোচনা করেছিলেন এবং ইসলামকে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু আমার মতে, ইকবাল এক্ষেত্রে অনেক বেশি ছাড় দিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, ইসলামের শিক্ষাগুলোকে ‘আধুনিক জ্ঞানের আলোকে’ বুঝতে এবং ব্যাখ্যা করতে হবে (see Faruque, 2021b)।
সংক্ষেপে তিনি আমাদের বলেন, আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রগতির কারণে আধুনিক মানবতা এক ধরনের সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। এই অগ্রগতি ধর্মের প্রচলিত বোঝাপড়া এবং ব্যাখ্যাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। অতীত থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়ার মাঝে এই সংকটের কোনো সমাধান নেই। বরং আধুনিক মুসলিমদের অবশ্যই আধুনিক বিজ্ঞানের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। তাদেরকে ইসলামি ঐতিহ্যকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান না করে একে নতুনভাবে ভাবার চেষ্টা করতে হবে।
আমার একটি সাম্প্রতিক প্রবন্ধে আমি দেখিয়েছি যে, বাস্তবে এই পুনর্গঠন বা নতুন ব্যাখ্যা কেমন হওয়া উচিত তার অসংখ্য উদাহরণ ইকবাল দিয়েছেন। ইকবালের কাছে ‘আধুনিক জ্ঞানের আলোকে ইসলামকে ব্যাখ্যা করার’ অর্থ হলো: বার্গসনের দর্শনের আলোকে কবি-দার্শনিক বেদিলকে পাঠ করা; হেগেলের চিন্তাধারার নিরিখে সুফি দার্শনিক আবদুল করিম আল-জিলিকে বিশ্লেষণ করা; আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বের আলোকে আত্মপরিচয় ও চেতনার মতো ধারণাগুলোকে ব্যবচ্ছেদ করা; এবং নিৎশের দর্শনের সাথে সুফিবাদের ‘ইনসানে কামেল’ বা নিখুঁত মানুষের ধারণার সংযোগ ঘটানো। (Faruque, 2021b)।
এসব কারণে আমার কাছে ইকবালের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত সমস্যাযুক্ত মনে হয়। কারণ এটি মূলত আমাদের সমগ্র ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যকে পশ্চিমা আধুনিকতার ‘লিটমাস টেস্টে’ ফেলতে বলে। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরোক্ষভাবে দাবি করে যে, ঐতিহ্যবাহী ইসলামি এবং ভারতীয়-ইসলামি জ্ঞানকাঠামোর চেয়ে আধুনিক পশ্চিমা জ্ঞানকাঠামো কোনো না কোনোভাবে শ্রেষ্ঠ। আর এর মানে হলো, আগে উল্লেখিত মেকলের সেই ঔপনিবেশিক এবং ইউরোপকেন্দ্রিক আখ্যানেই ফিরে যাওয়া।
মুসলিম মনস্তত্ত্বকে কীভাবে ফলপ্রসূভাবে উপনিবেশমুক্ত করা যায়, তা নিয়ে আলোচনার আগে একটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার। সমসাময়িক ঔপনিবেশিকতামুক্ত তাত্ত্বিকদের অবস্থান থেকে আমার নিজের অবস্থান ঠিক কোথায় আলাদা, তা সংক্ষেপে তুলে ধরা প্রয়োজন।
আমি ঔপনিবেশিকতামুক্ত চিন্তাবিদদের সাথে একমত যে, ইউরোপকেন্দ্রিক জ্ঞানকাঠামোর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। তবে এর মানে এই নয় যে, পশ্চিমা সবকিছুকেই আমাদের ঢালাওভাবে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, আমরা গ্রিক দর্শনের অবদানের কথা বলতে পারি। আমার দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রিক ঐতিহ্য হলো বৃহত্তর ইসলামি ঐতিহ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। বস্তুত গ্রিক জগতও যে মুসলিমদের অধিকারভুক্ত, তেমনটা ভাবার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কারণ মুসলিমরা এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে গ্রিক চিন্তাধারা নিয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করেছেন।
তাছাড়া কখনো কখনো ঔপনিবেশিকতামুক্ত চিন্তাবিদরা পশ্চিমা ঔপনিবেশিক ইতিহাসের পাঠকে মাত্রাতিরিক্ত সরলীকরণ করে ফেলেন। ইউরোপীয়রা আমেরিকায় যে সমস্ত ধ্বংসলীলা চালিয়েছিল, তার সবকিছুর জন্য তারা খ্রিষ্টান ধর্মতত্ত্বকে দায়ী করার প্রবণতা দেখান (see e.g., Mignolo & Walsh, 2018)। এটা সত্যি যে খ্রিষ্টধর্মের নামে তখন অসংখ্য হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল, বিশেষ করে আমেরিকায়। কিন্তু এই একই ধর্মে লাস কাসাসের মতো মানবাধিকার রক্ষাকারীদেরও উদ্ভব হয়েছিল (see Clayton, 2010)।
এছাড়া ঔপনিবেশিকতামুক্ত তাত্ত্বিকরা যখন ‘মানুষ’ বা ‘প্রকৃতি’র মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষাগুলোর উৎস খুঁজতে যান, তখন তারা আলোচনাটিকে বড্ড একপেশে করে ফেলেন। তারা পশ্চিমা ঐতিহ্যকে মানব ইতিহাসের এক চূড়ান্ত অস্বাভাবিকতা বা বিচ্যুতি হিসেবে তুলে ধরেন। আমার কাছে এই দৃষ্টিভঙ্গিটিও সমস্যাযুক্ত মনে হয়।
তাছাড়া ডিকলোনিয়াল থিওরির প্রবক্তারা নিজেদের সমালোচনা করার ক্ষেত্রে প্রায়শই ইউরো-আমেরিকান তত্ত্ব ও চিন্তাপদ্ধতির ওপর নির্ভর করেন। এমনকি অ-পশ্চিমা ঐতিহ্যগুলোকে ব্যাখ্যা বা অনুবাদ করতে গিয়েও তারা সেই একই পশ্চিমা তত্ত্বের পরিভাষা ব্যবহার করেন।
কিছু গবেষক এই পদ্ধতির সমালোচনা করেছেন। তারা যুক্তি দেখিয়েছেন যে, অ-পশ্চিমা ঐতিহ্যগুলোকে তাদের নিজস্ব পরিভাষায় অধ্যয়ন করা উচিত। এটি পশ্চিমা গবেষকদেরও বাইবেল এবং গ্রিকদের মতো প্রাক-আধুনিক ইতিহাসকে নতুন করে আবিষ্কার ও মূল্যায়ন করতে সাহায্য করবে। এগুলোকে তারা নিজেদের ঐতিহ্য বলেই মনে করে। আধুনিকতার ঔপনিবেশিক প্রকল্পের কারণে এই ঐতিহ্যগুলো মারাত্মকভাবে বিকৃত হয়েছে। সুতরাং উপনিবেশবাদ কেবল উপনিবেশিতদের অতীত ও পরিচয়কেই বিকৃত করে না। এটি উপনিবেশবাদীদের নিজেদের চেতনা এবং ইতিহাসকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
অতএব উপনিবেশমুক্তকরণ কেবল উপনিবেশিতদের জন্যই প্রয়োজনীয় কোনো প্রকল্প নয়। বরং এটি উপনিবেশবাদীদের জন্যও আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ তাদেরকে বিশ্বাস করানো হয়েছে যে তারা এমন এক বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য ও ‘সভ্যতা’র অংশীদার, যার কোনো টেকসই বিকল্প বা সমকক্ষ পৃথিবীতে নেই (for more information, see Dagli, 2024; Lumbard, 2022; Ogunnaike, 2022)।
৩ | তৃতীয় পর্ব
যাই হোক, এই বিষয়ে আমার চিন্তাধারাও ইউরোপকেন্দ্রিকতার সমালোচনার সাথে অনেকটা মিলে যায়। তবে আমি সামনে এগিয়ে যাওয়ার উপায় হিসেবে ‘বহুত্ববাদ’-এর একটি মডেল প্রস্তাব করছি। এর অর্থ এই নয় যে, আমরা পশ্চিমা সব কিছু থেকে পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে নেব। আমার প্রস্তাবিত বহুত্ববাদের মূল কথাটি হলো:
‘সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক বহুত্ববাদ হলো এই স্বীকৃতি যে, দর্শন, বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর বিশ্বের প্রধান সভ্যতাগুলো বিভিন্নভাবে দিয়েছে। তাই সত্য, জ্ঞান ও অস্তিত্বের প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার জন্য একাধিক বৈধ জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামো বা পদ্ধতি রয়েছে।’ (Faruque, 2021a, p. 10)
এখন এই কাঠামোটি তখনই অর্থবহ হবে, যদি আমরা ইউরোপকেন্দ্রিকতার বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে পারি। আমাদের এনলাইটেনমেন্ট বা জ্ঞানদীপ্তি এবং আধুনিকতার আধিপত্যবাদী চিন্তাধারা থেকে নিজেদের সরিয়ে নিতে হবে। এই আধুনিকতা আবার তথাকথিত কিছু ‘সর্বজনীন’ ধারণাকে আঁকড়ে ধরে আছে, যেমন—প্রগতি, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, সমতা, অভিজ্ঞতাবাদ, যন্ত্রবাদী যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানবাদ, উন্নয়ন এবং মানবাধিকার ইত্যাদি। অন্য কথায়, আমরা আধুনিকতার সেই বিশ্ববীক্ষাকে (Weltanschauung) সহজভাবে মেনে নিতে পারি না, যা এনলাইটেনমেন্ট, আধুনিক বিজ্ঞানের যন্ত্রবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এবং রেনেসাঁর সময়কার মানুষের শ্রেষ্ঠত্ববাদী ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
এখানে ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ নেই। আধুনিকতা বা তথাকথিত এনলাইটেনমেন্টের সমালোচনা করার অর্থ এই নয় যে, আমাদের আবার ঘোড়া বা গাড়ির যুগে ফিরে যেতে হবে কিংবা প্রযুক্তি ও আধুনিক জীবনের অন্যান্য সুবিধাগুলো বর্জন করতে হবে। আমাদের বরং ইউরোপকে এবং তাদের আধুনিক ধারণাকে ‘প্রাদেশিকীকরণ’ করতে হবে। তারা যে ধারণাগুলোকে সর্বজনীন ও শাশ্বত বলে চালিয়ে দিচ্ছে, সেগুলোর উৎপত্তি কিন্তু অত্যন্ত নির্দিষ্ট কিছু বুদ্ধিবৃত্তিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে (Chakrabarty, 2008)।
স্থান স্বল্পতার কারণে আধুনিকতার বিবর্তনের সব দিক বিস্তারিত আলোচনা করা সম্ভব নয়। তবে আধুনিকতার শিকড়ে না গিয়ে মুসলিম মনস্তত্ত্বকে উপনিবেশমুক্ত করার কথা ভাবাই যায় না। সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক—সব ক্ষেত্রেই আমাদের চিন্তাভাবনা আজ আধুনিকতার উপস্থিতিতে প্রভাবিত। আমরা যদি আমাদের বর্তমান ও অতীতকে পশ্চিমা জ্ঞানকাঠামোর সর্বব্যাপী প্রভাব থেকে ‘মুক্ত’ (delinking) করতে এবং আধুনিকতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে চাই, তবে কানাডীয় দার্শনিক চার্লস টেইলরের A Secular Age বইয়ের সেই বিখ্যাত প্রশ্নটি আমাদের করতেই হবে:
১৫০০ সালের দিকে পশ্চিমা সমাজে ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস না করা প্রায় অসম্ভব ছিল। অথচ ২০০০ সালে এসে আমাদের অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, ঈশ্বরে অবিশ্বাস করা কেবল সহজই নয়, বরং অনিবার্য। এমনটা কেন হলো? (Taylor, 2007, p. 25)
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের মধ্যযুগের শেষের দিকের চিন্তাধারা এবং ‘সার্বজনীনতা’র প্রকৃতি নিয়ে বাস্তববাদী ও নামসর্বস্ববাদীদের মধ্যকার বিতর্ক থেকে শুরু করতে হবে। এরপর রেনেসাঁ যুগে যে চিন্তার প্রসার ঘটেছিল, তা বিশ্লেষণ করতে হবে। বিশেষ করে রেনেসাঁর সময়কার মানুষের শ্রেষ্ঠত্ববাদী ধারণা, পেত্রার্কের মাধ্যমে ‘ব্যক্তি’ বা ‘ইনডিভিজুয়াল’ ধারণার জন্ম এবং প্রকৃতির ওপর ক্ষমতা ও আধিপত্য বিস্তারের মন্ত্রের ওপর আমাদের নজর দিতে হবে। এই তালিকাটি বিশাল। তবে প্রটেস্ট্যান্ট সংস্কার, কোপারনিকান বিপ্লব, গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের যুদ্ধ এবং বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের মতো ঘটনাগুলোর প্রেক্ষাপট বুঝতে হবে, যা মূলত ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্টের পথ প্রশস্ত করেছিল। এই বিষয়গুলো ভালোভাবে বুঝতে হলে ম্যাকিয়াভেলি, মন্তেইন, গ্যালিলিও, হবস, দেকার্তে, বয়েল, লাইবনিজ, লক, নিউটন, হিউম, রুশো, কান্ট, হেগেল, মার্ক্স, নিৎশে এবং আরও অনেকের গুরুত্বপূর্ণ লেখাগুলো সম্পর্কে ধারণা রাখা জরুরি।
আধুনিকতার সমালোচনা বহু জায়গা থেকেই হয়েছে। তাই সব বিস্তারিত বিবরণে না গিয়ে আমরা কেবল এটুকু মনে রাখতে পারি যে, হেগেলের সেই মিথটি এখন আর কোনো সিরিয়াস চিন্তাবিদ বিশ্বাস করেন না। সেই রূপকথা অনুযায়ী, আধুনিক যুগ হলো একদল অসাধারণ বিজ্ঞানী, লেখক ও দার্শনিকদের সৃষ্টি, যারা তাদের সময়ের ধর্মীয় কুসংস্কার ধ্বংস করে যুক্তি, প্রগতি ও স্বাধীনতার ওপর ভিত্তি করে এক নতুন পৃথিবী গড়ে তুলেছিলেন। আগেই বলেছি, উপনিবেশবাদ, দাসপ্রথা, বর্ণবাদ, যুদ্ধ, গণহত্যা এবং আজকের জলবায়ু সংকটের সাম্প্রতিক স্মৃতিই প্রমাণ করে যে, আধুনিকতা ততটা মহান কিছু নয়। অবশ্য এখনো কেউ কেউ, যেমন জার্মান দার্শনিক ইয়ুর্গেন হ্যাবারমাস, একে একটি ‘অসমাপ্ত প্রকল্প’ হিসেবেই দেখেন (Habermas, 1990)।
আধুনিকতা কীভাবে শুরু হলো আর কেনই বা এতে নানা সমস্যা তৈরি হলো, তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত।
অনেকে মনে করেন, আধুনিকতা আসলে খ্রিষ্টধর্মের এক নতুন বা ধর্মনিরপেক্ষ রূপ মাত্র। যেমন—আমরা যে সবসময় ‘উন্নতি’ বা ‘প্রগতি’র কথা বলি, এটি আসলে খ্রিষ্টধর্মের সেই পুরনো ধারণারই আধুনিক সংস্করণ। ধর্মতত্ত্বে যেমন বিশ্বাস করা হতো যে, অশুভ সব শক্তি একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে এবং পৃথিবীতে এক সোনালী দিন আসবে—আমাদের আধুনিক ‘প্রগতি’র ধারণাও ঠিক একই স্বপ্ন দেখায়। শুধু ধর্মের বদলে এখন এর নাম হয়ে গেছে আধুনিক উন্নয়ন।
আবার কেউ একে দেখেন নিৎশের দৃষ্টিভঙ্গিতে, যেখানে মানুষ নিজেকেই বড় করে দেখানোর চেষ্টা করে। উপনিবেশবাদবিরোধী ঐতিহ্যের কেউ কেউ আধুনিকতার উত্থানকে ট্রান্স-আটলান্টিক দাস ব্যবসা, প্রকৃতির ওপর আধিপত্য এবং ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের সাথে যুক্ত করেন। আবার অনেকে মনে করেন, আধুনিকতার মূল সংকটগুলো সেই ভয়াবহ ধর্মীয় সংগ্রামের মধ্যেই নিহিত, যা মধ্যযুগীয় পৃথিবীর সমাপ্তি ঘটিয়েছিল এবং গত কয়েক শতাব্দীতে ইউরোপকে রূপান্তর করেছিল।
এই প্রবন্ধে আমাদের ‘প্রগতি’ বা ‘উন্নয়ন’-এর ধারণাটি নিয়ে একটু অন্যভাবে ভাবতে হবে। আধুনিক মানুষ নিজেকে যেভাবে চেনে, তার জন্য এই প্রগতি অপরিহার্য। আর আধুনিক সংস্কৃতির মূল মেরুদণ্ড হলো বিজ্ঞান। প্রগতির ধারণাটি আজ আমাদের জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই ছেয়ে আছে। আমরা দেশগুলোকে ‘উন্নত’ বা ‘উন্নয়নশীল’ বলে ভাগ করি। আমাদের অর্থনীতি প্রবৃদ্ধি ও প্রসারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এমনকি সরকারি নীতি বা বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের সার্থকতাও মাপা হয় তার বাস্তব সাফল্য দিয়ে।
প্রগতির এই ধারণাটি এসেছে খ্রিষ্টীয় মিলেনারিয়ানিজম (এক ধরনের ধর্মীয় আশাবাদ) এবং ক্যালভিনিজমের কিছু ধারা থেকে। তারা পৃথিবীর রূপ বদলে ফেলার জন্য মানুষের শক্তিকে কাজে লাগানোর ওপর জোর দিয়েছিল (Nisbet, 1994)।
জন বুনিয়ানের ১৬৭৮ সালের খ্রিষ্টীয় রূপক ‘দ্য পিলগ্রিম’স প্রগ্রেস’-এর মধ্যেও আধ্যাত্মিক অর্থে এই প্রগতির ধারণার দেখা পাওয়া যায়। অষ্টাদশ শতাব্দীতে জ্ঞানদীপ্তির সময়কার লেখকরা প্রগতির অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীর বিজ্ঞানের অর্জন থেকে। বিশেষ করে কোপারনিকাস ও নিউটনের যুগ তাদের চিন্তায় বড় প্রভাব ফেলেছিল। নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র মানুষের মনে এক দারুণ আশাবাদের জন্ম দিয়েছিল; মানুষ তখন ভাবতে শুরু করেছিল যে পৃথিবীটা তাদের হাতের মুঠোয়, তারা একে বুঝতে ও নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম।
তুর্গো ও কন্ডরসেট-এর মতো ফরাসি বুদ্ধিজীবীরা বিজ্ঞানের নতুন আবিষ্কারগুলোকে প্রগতির ধারণার সাথে যুক্ত করেছিলেন। কন্ডরসেট তাঁর ‘স্কেচ ফর এ হিস্টোরিক্যাল পিকচার অফ দ্য প্রগ্রেস অফ দ্য হিউম্যান মাইন্ড’ গ্রন্থে বিজ্ঞানের নতুন আবিষ্কারগুলো কীভাবে আগের জ্ঞানকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, তার অনেক উদাহরণ দিয়েছেন (Condorcet, 1955)।
সাধারণভাবে প্রগতির প্রচারকরা দাবি করেন যে, ইউরোপীয় বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও প্রতিষ্ঠানই পৃথিবীর সেরা। তাঁরা মনে করেন, বাকি বিশ্বকে সভ্য হতে হলে ইউরোপীয় মানদণ্ডই মেনে নিতে হবে। হিউম ও কান্টের মতো চিন্তাবিদরা আবার এর সাথে ইউরোপীয় জাতির জৈবিক শ্রেষ্ঠত্বের তত্ত্বও যোগ করেছিলেন (Kant, 2012)। অগাস্ত কোঁত আবার ইতিহাসকে তিনটি ধাপে ভাগ করে ‘বৈজ্ঞানিক প্রগতি’র এক সহজ-সরল ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন (Comte, 2009)।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওয়ায়েল হাল্লাক সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আধুনিকায়নের তত্ত্ব প্রায় প্রতিটি একাডেমিক ক্ষেত্রেই দাপট চালিয়ে যাচ্ছে। সব আধুনিকায়ন প্রকল্পের মূলে রয়েছে হাল্লাকের ভাষায় এক ‘প্রগতির ধর্মতত্ত্ব’ (theology of progress)। এই ধর্মতত্ত্ব দাঁড়িয়ে আছে সরলরৈখিক ও উদ্দেশ্যবাদী সময়ের ধারণার ওপর; যেখানে মনে করা হয় প্রগতি অনিবার্য। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, ইতিহাসের প্রাথমিক ধাপগুলো ছিল কেবল পরবর্তী পর্যায়ের প্রস্তুতির জন্য। সবকিছুর চূড়ান্ত পরিণতি হলো পশ্চিমা আধুনিকতা। এই ধারণার ভেতরে সুকৌশলে লুকিয়ে আছে এই বার্তা যে, আধুনিক ইউরোপের আগের কোনো সংস্কৃতি বা সভ্যতারই কোনো গ্রহণযোগ্যতা বা বুদ্ধিবৃত্তিক মান নেই। তাঁরা মনে করেন, পুরনো সভ্যতাগুলোর সমস্ত অর্জনই যেন পশ্চিমা আধুনিকতার দিকে যাওয়ার একটি মাধ্যম ছিল (Hallaq, 2019)। অর্থাৎ পশ্চিমা আধুনিকতাকেই সারাবিশ্বে ঔপনিবেশিকতা ও জোরজবরদস্তির মাধ্যমে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
প্রগতির এই ভয়াবহ দিকটি নিয়ে আমি পরে আরও কথা বলব। আপাতত আধুনিকতার মূল অধিবিদ্যার দিকে নজর দেওয়া যাক। আধুনিক বিজ্ঞানের যান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই এই ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
আজ বিজ্ঞানের জনপ্রিয়তা ও প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। এমনকি আমাদের নৈতিক লক্ষ্যগুলোও এখন বৈজ্ঞানিক ফলাফলের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়।
‘আত্মপরিচয়’ (selfhood)-এর কথাই ধরা যাক। এনলাইটেনমেন্টের পর থেকে মানুষের পরিচয়কে আধুনিক বিজ্ঞানের মাপকাঠিতে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে; যেন বিজ্ঞানই আমাদের মূল সত্তাকে সংজ্ঞায়িত করতে পারে। ডারউইন-পরবর্তী জীববিজ্ঞানের উন্নতির ফলে আমরা এখন মানুষের স্বভাবকে কোষের নিউক্লিয়াসের ভেতর খুঁজে পেতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। যেমন, আইকিউ এখন আর কেবল কোনো দক্ষতার পরিমাপক নয়, বরং এটি ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ মূল্য বা যোগ্যতার সূচক হিসেবে দেখা হয় (Comfort, 2019)। কিন্তু দাসপ্রথা, উপনিবেশবাদ ও পরিবেশগত সংকটের আজকের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে এটা বলা কঠিন যে, কেবল পশ্চিমা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিই মানুষের আত্মপরিচয় খোঁজার নির্ভরযোগ্য ভিত্তি।
এনলাইটেনমেন্টের সময়কার আত্মপরিচয় বা পরিচয় নিয়ে অনেক ধারণাই গড়ে উঠেছিল উত্তর গোলার্ধের ধনী দেশগুলোর বিত্তবান শিক্ষিত পুরুষদের দ্বারা। এই ধারণাগুলো কেবল বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার নয়, বরং বিজ্ঞান জগতের নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে ছিল, তাদের মূল্যবোধকেও তুলে ধরেছে। তারা মূলত বস্তুবাদ, রিডাকশনিজম এবং প্রকৃতির ওপর আধিপত্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষাকেই গুরুত্ব দিয়েছে (Comfort, 2019)। তাই এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, পরিচয়কে কেবল বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় সংজ্ঞায়িত করলে মানুষের শ্রম, সামাজিক ভূমিকা কিংবা তার নৈতিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের মতো বিষয়গুলো কীভাবে আড়ালে পড়ে যায়।
আধুনিক বিজ্ঞানের প্রভাবে ইউরোপকেন্দ্রিকতা যেন পূর্ণতা পেল। আধুনিক বিজ্ঞানের ইতিহাস বেশ জটিল। আজ বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা প্রায়ই ভুলে যান যে ‘সায়েন্স’ বা বিজ্ঞান শব্দটি বেশ নতুন। ১৮৩৪ সালে উইলিয়াম হুয়েল প্রথম ‘সায়েন্টিস্ট’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। নিউটনের সময়ে একে বলা হতো ‘ন্যাচারাল ফিলোসফি’, আর অ্যারিস্টটলের সময়ে একে বলা হতো ‘এপিস্টিমে’ (epistēmē)। আধুনিক বিজ্ঞান একটি নির্দিষ্ট বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যেমন—বস্তুবাদ বা প্রকৃতিবাদ। অন্যান্য সংস্কৃতিরও নিজস্ব বিজ্ঞান ছিল এবং আছে। পশ্চিমা বিজ্ঞান কেবল একটি পদ্ধতি, যার নিজস্ব কিছু পূর্বশর্ত বা অনুমান রয়েছে। বিজ্ঞান কখনোই শূন্য থেকে আসে না, বরং তা বিভিন্ন জ্ঞানতাত্ত্বিক ও অস্তিত্ববাদী ধারণার রঙে রঙিন।
গ্যালিলিও, দেকার্ত ও লকের চিন্তাধারা অনুসরণের ফলে বিজ্ঞানে এমন কিছু অনুমান ঢুকে পড়ল যা বেশ সমস্যাজনক। যেমন, তারা বস্তুর প্রাথমিক ও গৌণ গুণের মধ্যে পার্থক্য টানলেন এবং মন ও জড়ের মধ্যে দেকার্তীয় বিভাজন তৈরি করলেন। সপ্তদশ শতাব্দীর বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের পর বিশ্বকে একটি সুনির্ধারিত ঘড়ি বা মেশিনের মতো দেখার প্রবণতা শুরু হলো। সময়ের সাথে সাথে এই বৈজ্ঞানিক বিশ্ববীক্ষা কার্যকরণ, উদ্দেশ্যবাদ এবং অতিপ্রাকৃতের অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে শুরু করল। এর চরম রূপ হলো ‘বিজ্ঞানবাদ’ (scientism), যেখানে দাবি করা হয় যে কেবল বিজ্ঞানই সবকিছুর উত্তর দিতে পারে। এই বৈজ্ঞানিক চিন্তার মূলে রয়েছে জগতকে ‘বিষয়’ (object) ও ‘ব্যক্তি’ (subject) হিসেবে আলাদা করে দেখা। এই বিভাজনটি মানুষের চেতনার এক গভীর স্তরকে—যাকে ‘নন-রিফ্লেক্টিভ কনশাসনেস’ বলা হয়—তাকেও আড়াল করে ফেলে। হুসার্ল ও হাইডেগারের মতো দার্শনিকরা আধুনিক বিজ্ঞানের এই মৌলিক সীমাবদ্ধতাগুলো আমাদের সামনে তুলে ধরেছিলেন।
হাইডেগার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় আগে বলেছিলেন, ‘বিজ্ঞান চিন্তা করে না’ (science does not think)।
তিনি দাবি করেছিলেন, আধুনিক মানুষ চিন্তা করা থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। মানুষ হয়তো একে সরাসরি অস্বীকার করবে। তারা বলবে, বর্তমানে যে পরিমাণ বৈজ্ঞানিক গবেষণা হচ্ছে, তা ইতিহাসের অন্য কোথাও দেখা যায়নি। কিন্তু হাইডেগার আগে থেকেই এমন যুক্তির আশঙ্কা করেছিলেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, প্রকৃত চিন্তার জায়গাটি দখল করে নিয়েছে ‘গবেষণা’। তিনি বৈজ্ঞানিক চিন্তাকে অভিহিত করেন ‘ক্যালকুলেটিভ থিংকিং’ বা হিসাববাদী চিন্তাধারা হিসেবে। এর বৈশিষ্ট্য হলো, আমরা যখন কোনো কিছু পরিকল্পনা বা গবেষণা করি, তখন তা সবসময় নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সাধনের জন্য করি। অর্থাৎ, আমরা কেবল ফলাফল খুঁজি। হাইডেগারের কাছে এই হিসাববাদী চিন্তাধারা কম্পিউটার ছাড়াই চলে, কারণ এর মূল নির্যাসই হলো গণনা করা।
২০২৩ সালে এসে হাইডেগারের কথাগুলোই সত্য বলে মনে হয়। নামকরা এক বিশ্লেষক দার্শনিকের সাম্প্রতিক বই The Border Between Seeing and Thinking-এর কথাই ধরা যাক। পাঠক বইটি পড়ে হতাশই হবেন, কারণ এতে প্রকৃত ‘চিন্তা’ নিয়ে কোনো আলোচনা নেই।
নেড ব্লক শুরুতেই বলেছেন, তিনি দার্শনিক তর্ক-বিতর্ক এড়িয়ে চলবেন। তার কাছে দার্শনিক চিন্তার কোনো বৈজ্ঞানিক বা অভিজ্ঞতামূলক ভিত্তি নেই। তিনি কগনিটিভ সায়েন্স, সাইকোলজি ও নিউরোসায়েন্স থেকে প্রচুর তথ্য নিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন যে, দেখা বা উপলব্ধির সাথে চিন্তার পার্থক্য কোথায়। তিনি ‘কগনিশন’ বা সংজ্ঞান এবং ‘থিংকিং’ বা চিন্তাকে একই মনে করার ভুল করেছেন। তার বইতে চিন্তা কীভাবে গঠিত হয়, তা নিয়ে খুব সামান্যই আলোচনা রয়েছে। তিনি উপলব্ধিকে চূড়ান্ত বিচারক হিসেবে মানেন। তার মতে, উপলব্ধি হলো অ-ধারণাগত ও রূপকধর্মী, আর কগনিশন হলো ধারণাগত ও যুক্তিনির্ভর।
কিন্তু পুরো বিশ্লেষণে এক ধরনের পরিহাস রয়ে গেছে। চিন্তা মানেই হলো ধারণা ও সর্বজনীনতার সাথে যুক্ত থাকা। অথচ ব্লক অভিজ্ঞতামূলক গবেষণা দিয়ে এই বিষয়টি ঠিক করতে চেয়েছেন, যা স্বভাবতই নির্দিষ্ট ও আংশিক।
যাই হোক, দর্শনের মতো একটি গভীর বিষয়েও ‘চিন্তা’ থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট। এটি আসলে একটি বড় সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত, যা সপ্তদশ শতাব্দী থেকে বিজ্ঞানের ক্রমাগত দাপটের সাথে যুক্ত। বিজ্ঞানের অনেক গুণ থাকলেও, এটি অধিবিদ্যা বা মেটাফিজিক্সের জন্য কোনো জায়গা রাখে না। অথচ, বিজ্ঞান নিজেও অজান্তে একটি অধিবিদ্যার ওপর ভিত্তি করে চলে। সেটি হলো প্রকৃতিবাদ (সবকিছুই ভৌত জগতের নিয়ম দ্বারা চালিত) বা বস্তুবাদ (পদার্থই বাস্তবতার একমাত্র ভিত্তি)। বাস ভ্যান ফ্রাসেন এ বিষয়ে যথার্থই বলেছেন:
আমি বস্তুবাদের একটি ব্যাখ্যা দিচ্ছি: এটি কোনো সাধারণ তত্ত্ব নয়, এটি বরং একটি মানসিক ভঙ্গি বা দৃষ্টিভঙ্গি। এই দৃষ্টিভঙ্গির মূল হলো—বস্তুগত জগত সম্পর্কে কোনো মতামত দেওয়ার সময় বর্তমান বিজ্ঞানের ওপর প্রবলভাবে নির্ভর করা। একইসাথে, বিজ্ঞান কোনো না কোনো সময় সবকিছুর ব্যাখ্যা দিয়ে দেবে—এমন একটি অটল বিশ্বাসও এই দৃষ্টিভঙ্গির অংশ। (van Fraasen, 2008, p. 59)।
বর্তমানে বিশ্লেষণাত্মক দার্শনিকদের কল্যাণে দর্শন অনেকটা বিজ্ঞানের দাসে পরিণত হয়েছে। নেড ব্লকের সাম্প্রতিক বইটির উদাহরণ আমরা আগেই দেখেছি। এখনকার দর্শনে কেবল বিজ্ঞানীরাই সিদ্ধান্ত নেন বাস্তবে কোন জিনিসটি সত্য। আর দার্শনিকদের কাজ হলো বিজ্ঞান যেটুকু সুযোগ দেয়, তার ভেতরে থেকে প্রশ্ন করা বা যৌক্তিকভাবে চিন্তা করা। স্টিফেন হকিং তো বলেই দিয়েছেন, ‘দর্শন এখন মৃত। বিজ্ঞানের আধুনিক অগ্রগতির সাথে দর্শন আর তাল মেলাতে পারেনি। জ্ঞান অন্বেষণের পথে বিজ্ঞানীরাই এখন মশাল বহনকারী’ (Hawking & Mlodinow, 2010, p. 5)।
কিন্তু বিজ্ঞানীরা বা পদার্থবিজ্ঞানীরা যে চূড়ান্ত সত্যের প্রশ্নে একমত, তা কিন্তু নয়। এ বিষয়ে তিন পদার্থবিজ্ঞানীর একটি বিখ্যাত গবেষণাপত্র ‘On Math, Matter, and Mind’ বেশ আলোচিত। সেখানে তারা দেখিয়েছেন যে, গাণিতিক বা পরীক্ষামূলক পদ্ধতিতে একমত হলেও, প্রাপ্ত ফলাফলকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে তা নিয়ে তাদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ আছে। তারা বিজ্ঞানীদের তিনটি দলে ভাগ করেছেন:
ক) মৌলিকবাদী (Fundamentalist)
খ) ধর্মনিরপেক্ষ (Secular)
গ) রহস্যবাদী (Mystic)
মৌলিকবাদীরা (যেমন ম্যাক্স টেগমার্ক) মনে করেন পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম দিয়েই বাস্তবতার সবকিছু ব্যাখ্যা করা সম্ভব। তাদের মতে, বস্তুবাদ যদি সত্য হয়, তবে এই ভৌত জগত আসলে গণিত ছাড়া কিছুই নয়। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা এর সাথে একমত নন। তারা বলেন, বিজ্ঞান কেবল একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে কাজ করে। তাই বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব থেকে সরাসরি কোনো দার্শনিক কাঠামো দাঁড় করানোটা অনেকটা ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়ার মতো। রহস্যবাদীরা আবার বস্তুবাদের একটি বড় ভুল ধরিয়ে দেন। তারা মনে করেন, পদার্থবিজ্ঞান অভিজ্ঞতার ‘চেতনা’র দিকটি পুরোপুরি এড়িয়ে গেছে। যদিও তারা বিশ্বাস করেন, বিজ্ঞানের কাঠামো বদলালেও তা চূড়ান্ত সত্যের দিকেই এগোচ্ছে।
বিজ্ঞান নিয়ে এই মাতামাতির মাঝেও পদার্থবিজ্ঞানী আরউইন শ্রোডিঙ্গার বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা নিয়ে চমৎকার একটি কথা বলেছেন:
আমি মনে করি, যখন আমি বিজ্ঞান দিয়ে বাস্তব জগতকে ব্যাখ্যা করতে যাই, তখন আমি নিজের মনকেই বাদ দিয়ে ফেলি। আমি নিজেও জানি না যে আমি এমনটা করছি। অথচ আমি অবাক হই যে, বিজ্ঞানের চোখে দেখা এই জগতটা কত অসম্পূর্ণ। বিজ্ঞান আমাদের অনেক তথ্য দেয়, আমাদের অভিজ্ঞতাগুলোকে সুশৃঙ্খল করে। কিন্তু আমাদের হৃদয়ের কাছের বিষয়গুলো—যেমন রঙ, আনন্দ, বেদনা বা পবিত্রতা—এসব নিয়ে বিজ্ঞান পুরোপুরি নীরব। এই বিষয়গুলো নিয়ে বিজ্ঞান যা বলে, তা অনেক সময় এতটাই হাস্যকর যে সেগুলো গুরুত্ব দিয়ে নেওয়া কঠিন। সংক্ষেপে বলতে গেলে, বিজ্ঞান যে জগত তৈরি করে, আমরা তার অংশ নই। আমরা কেবল দর্শক। আমরা যে এই জগতের অংশ মনে করি, তার কারণ হলো আমাদের শরীর এই জগতেরই অংশ। (Schrödinger, 2014, p. 95)।
শ্রোডিঙ্গার বিজ্ঞানশিক্ষিত মানুষের দার্শনিক চিন্তার অভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন:
কেবল বিজ্ঞান পড়লেই যে মানুষের মনে শান্তি আসে, তা নয়। বিজ্ঞান পুরোনো ধর্মীয় বিশ্বাসগুলোকে ধ্বংস করতে পারলেও তার জায়গায় নতুন কোনো অর্থপূর্ণ দর্শনের জন্ম দিতে পারে না। এর ফলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যেখানে বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত দক্ষ ও বুদ্ধিমান হয়েও দর্শনের দিক থেকে অনেকটা শিশুদের মতো অপরিণত থেকে যান।’ (Schrödinger, 2014, p. 12)।
আধুনিক বিজ্ঞানের ‘সাফল্য’ নিয়ে অনেকেরই অনেক কথা থাকে, তাই এই বিষয়টি আরেকটু তলিয়ে দেখা প্রয়োজন। অনেক পর্যবেক্ষকের চোখে আধুনিক বিজ্ঞান দারুণ এবং সর্বব্যাপী। জুম বা স্কাইপের মাধ্যমে হাজার মাইল দূরের মানুষের সাথে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ, জটিল হার্ট সার্জারি কিংবা চ্যাটজিপিটির মতো এআই (AI) ব্যবহার করে মানুষের বুদ্ধিকে প্রায় অনুকরণ করতে পারা—এসবই তাদের সাফল্যের প্রমাণ।
তবে বিজ্ঞানের এই জয়গান গাওয়া দৃষ্টিভঙ্গিটি এখন সেকেলে হয়ে গেছে। প্রথমত, এটি ‘বিজ্ঞান’ এবং ‘বিজ্ঞানের প্রযুক্তিগত সাফল্য’—এই দুটিকে গুলিয়ে ফেলে। দ্বিতীয়ত, জলবায়ু বিপর্যয় বা পারমাণবিক অস্ত্রের মতো প্রযুক্তির ভয়াবহ ধ্বংসাত্মক দিকগুলোকে এরা পুরোপুরি এড়িয়ে যায়। বাস্তব হলো, বর্তমানে অনেক চিন্তাশীল মানুষই ‘বৈজ্ঞানিক সর্বগ্রাসিতা’ (scientific totalitarianism) নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন এবং দিন দিন তাদের অসন্তুষ্টি বাড়ছে (McGilchrist, 2021; Merchant, 2020; Nasr, 2008; Smith, 2012, 2020; Zwicky, 2023)।
৪ | চতুর্থ পর্ব
বিজ্ঞানের বর্তমান ধারা নিয়ে এমন আরও অনেক কথা বলা যায়। তবে ওপরের আলোচনা আধুনিক বিজ্ঞানের তথাকথিত শ্রেষ্ঠত্বের দাবি ভাঙার জন্য যথেষ্ট। তবে বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞানের বিশ্ববীক্ষা—এই দুটির মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি। আধুনিক বিজ্ঞান বস্তুবাদের ওপর ভিত্তি করে চলে, যা বিজ্ঞানের মূল কাজের বাইরের বিষয়। আমার এই আলোচনার উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিমা বিজ্ঞানের জ্ঞানতাত্ত্বিক আধিপত্য তুলে ধরা, বিজ্ঞানকে প্রত্যাখ্যান করা নয়। ইসলামি ঐতিহ্যে বিজ্ঞানের চর্চা অন্য কিছু দার্শনিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। সাইয়িদ হুসাইন নসর যেমনটি ব্যাখ্যা করেছেন, ইসলামি বিজ্ঞান প্রাকৃতিক জগত ও এর বাইরের সবকিছুর মধ্যে ঐক্য ও স্তরবিন্যাস মেনে চলে (চিত্র ১)। ইসলামি বিজ্ঞান ‘তাওহিদ’ বা একত্ববাদের দর্শনের ওপর ভিত্তি করে গড়া। এই দর্শনের আলোকেই গ্রিক বা ভারতীয় সভ্যতার মতো ভিন্ন ভিন্ন ধারার জ্ঞান এখানে একীভূত হয়েছিল (নসর, ১৯৬৮, ১৯৭৬)। সত্যের সন্ধানেই ছিল এই বিজ্ঞানের মূল প্রেরণা, যেমনটা আল-কিন্দি বলেছেন:
সত্যের কদর করতে বা তা অর্জন করতে আমাদের লজ্জা পাওয়া উচিত নয়, তা যেখান থেকেই আসুক না কেন। এমনকি তা যদি আমাদের থেকে ভিন্ন জাতি বা দূরের কোনো দেশ থেকে আসে তবুও। সত্যের সন্ধানী ব্যক্তির কাছে সত্যের চেয়ে বড় কিছু নেই। সত্যকে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই, যিনি সত্য কথা বলেন বা পৌঁছে দেন তাকেও তুচ্ছ করার উপায় নেই। (আল-কিন্দি, ১৯৭৪, পৃ. ৫৮)।
আল-কিন্দি যে উদার মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, মেকলের মতো ইউরোপকেন্দ্রিক চিন্তাবিদদের মানসিকতার সাথে তার আকাশ-পাতাল তফাৎ। তারা নিজেদের সংস্কৃতির বাইরের কোনো কিছুতে বিজ্ঞানের ছিটেফোঁটাও দেখতে পান না। তাই এটা আশ্চর্যজনক নয় যে, ইসলামি দার্শনিক ও বিজ্ঞানীরা প্রাচীন যুগের সব ধরনের বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক জ্ঞানকে সাদরে গ্রহণ করেছিলেন। এটি গ্রেকো-রোমান সংস্কৃতি এবং ল্যাটিন খ্রিস্টান বিশ্বের মধ্যে এক প্রয়োজনীয় সেতুবন্ধন তৈরি করেছিল। মধ্যযুগে খ্রিস্টানরা যে মুসলিম বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিকে কতটা গুরুত্ব দিত, নবম শতাব্দীর আলভারাস অফ করডোবার উদ্ধৃতিতে তার প্রমাণ পাওয়া যায়:
খ্রিস্টানরা আরবদের কবিতা ও উপন্যাস পড়তে ভালোবাসে। তারা আরব ধর্মতত্ত্ববিদ ও দার্শনিকদের বই পড়ে। তবে খণ্ডন করার জন্য নয়, বরং শুদ্ধ ও চমৎকার আরবি ভাষা শিখতে। এখন এমন কোনো সাধারণ মানুষ কি আছে যে পবিত্র ধর্মগ্রন্থের ল্যাটিন ব্যাখ্যা পড়বে, কিংবা গসপেল বা নবিদের জীবনী নিয়ে পড়াশোনা করবে? হায়! সব মেধাবী তরুণ খ্রিস্টানরা উৎসাহের সাথে আরবি বই পড়ছে। তারা বিপুল অর্থ খরচ করে বিশাল লাইব্রেরি গড়ে তুলছে। তারা নিজেদের খ্রিস্টান সাহিত্যকে অবহেলার চোখে দেখে। তারা নিজেদের ভাষাই ভুলে গেছে। ল্যাটিন ভাষায় বন্ধুর কাছে চিঠি লিখতে পারে এমন মানুষ হাতেগোনা। অথচ হাজার হাজার মানুষ আছে যারা চমৎকার আরবিতে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে, এমনকি আরবদের চেয়েও ভালো কবিতা লিখতে পারে।’ (Indiculus Luminosus, PL. CXXI, 555; cited in Menocal, 2002, p. 66)।
স্ক্রুটনের মতো পশ্চিমা চিন্তাবিদরা এই সত্য স্বীকার করলেও তারা অবাক হন এই ভেবে যে, একাদশ শতাব্দীতে আল-গাজালির কথিত আক্রমণের পর ইসলাম কেন বিজ্ঞানের গতি ধরে রাখতে পারল না (আমি ‘কথিত’ বলছি, কারণ আল-গাজালি বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে ছিলেন না) [আল-গাজালি, ২০০০]।
অথচ এই ধারণাটি একেবারেই ভুল। দুর্ভাগ্যজনক যে, অনেক মুসলিম বুদ্ধিজীবীও এই ভুল ইতিহাসের ফাঁদে পা দিয়েছেন। এখনো অনেক মুসলিম বুদ্ধিজীবীকে বলতে শোনা যায় যে, মধ্যযুগে ইসলামি স্বর্ণযুগ ছিল। কিন্তু আমরা যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নিই যে দ্বাদশ শতাব্দীর পর ইসলামি চিন্তার ধারা ম্লান হয়ে গিয়েছিল, তবুও আধুনিক মুসলিমদের কাছে সেই স্বর্ণযুগের তেমন কোনো গুরুত্ব নেই। কারণ তারা এর বর্তমান তাৎপর্য বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থায় রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মতো বিষয়ে প্লেটো বা অ্যারিস্টটলকে এখনো পড়ানো হয়। কিন্তু মুসলিমদের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনায় এমনটা দেখা যায় না। সত্যি বলতে, রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়ার সময় আমাদের পুরো পাঠ্যক্রমজুড়ে প্লেটো, অ্যারিস্টটল, অকুয়িনাস, ম্যাকিয়াভেলি, হবস, লক, কান্ট, হেগেল, মার্ক্স বা অ্যাগাম্বেন—সবই পশ্চিমা চিন্তাবিদ। সেখানে ইসলামি রাজনৈতিক চিন্তার কোনো স্থান নেই। অন্যান্য বিষয়ের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
অনেক মুসলিম এখনো বিশ্বাস করেন যে দ্বাদশ বা ত্রয়োদশ শতাব্দীতেই ইসলামি সভ্যতার স্বর্ণযুগের অবসান হয়েছিল। তাদের মতে, এরপর থেকে আধুনিক সময় পর্যন্ত বুদ্ধিবৃত্তিক স্থবিরতার এক ‘অন্ধকার যুগ’ চলেছিল, যেখানে কেবল আগের কাজগুলোর নকল ও সংকলন হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিষয়ে চর্চার ভিন্নতা থাকলেও, ইসলামি বিশ্বে ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঊনবিংশ বা বিংশ শতাব্দী পর্যন্তও যৌক্তিক ও সৃজনশীল জ্ঞানচর্চা বেশ প্রাণবন্ত ছিল। এটি যদিও ভিন্ন আলোচনার বিষয়, তবুও আমি পাঠকদের জর্জে সালিবা, ডেভিড কিং, জামিল রাজেপ, উইলিয়াম চিটিক, আহমদ দাল্লাল, রবার্ট মরিসন, এমিলি স্যাভেজ-স্মিথ, নাহিয়ান ফ্যান্সি, সাইয়িদ হুসাইন নসর, হেনরি করবিন, মোহাম্মদ রুস্তম, খালিদ আল-রওয়ায়হেব, আসাদ আহমেদ, রবার্ট উইস্নোভস্কিসহ অনেকের কাজের দিকে ইঙ্গিত করতে পারি। তারা প্রচুর তথ্য-প্রমাণ দিয়ে এই দাবিটিকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
ইসলামি সভ্যতার অবক্ষয়ের এই আখ্যান মেনে নেওয়ার সমস্যাগুলো এখন স্পষ্ট। স্ক্রুটন বা ইজরায়েলের মতো যারা মনে করেন যে গাণিতিক-ঐতিহাসিক যুক্তিই বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রগতির একমাত্র মাপকাঠি, তাদের এই তত্ত্বও সমস্যাজনক। এই আখ্যান ইসলামে ‘ধর্ম ও যুক্তি’র মধ্যকার জটিল সম্পর্ককে খুব সহজ কিছু দাবির মধ্যে আটকে ফেলে। যেমন—ধর্মতত্ত্ব ও দার্শনিক যুক্তির মধ্যে নাকি চিরস্থায়ী লড়াই ছিল, অথবা দার্শনিকরা ধর্মীয় পণ্ডিতদের ভয়ে তাদের প্রকৃত বিশ্বাস লুকিয়ে রাখতেন।
এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, অবক্ষয়ের এই আখ্যানটি অত্যন্ত সরলীকৃত। এই দৃষ্টিভঙ্গির মূল যুক্তি হলো, আজকের মুসলিম বিশ্বের চরমপন্থা বা উগ্রবাদের নেপথ্যে রয়েছে অতীত ধর্মতত্ত্ববিদদের ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা থেকে যুক্তিকে সরিয়ে দেওয়ার প্রবণতা। তাদের দাবি, এর ফলে অন্ধবিশ্বাস ও অসহিষ্ণুতার বিস্তার ঘটে। অনেক সমালোচকই এ ধরনের ব্যাখ্যা নির্মাণ করেন, যা কার্যত মুসলিমদের ওপর পশ্চিমা ধাঁচের সংস্কার চাপিয়ে দেওয়ার পথ প্রশস্ত করে। বস্তুত, একে সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের একটি রূপ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। রিচার্ড রোর্টি বা স্ক্রুটনের মতো পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীরা তাই ইসলামি সমাজের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের সমাধান হিসেবে এক ধরনের ‘এনলাইটেনমেন্ট’ বা জ্ঞানদীপ্তির আহ্বান জানান। তবে ইতিহাসের এমন সরল পাঠ বর্তমান সংকটকে আরও জটিল করে তোলে; এ ধরনের কাল্পনিক ব্যাখ্যা আমাদের মনোযোগকে প্রকৃত কারণ থেকে সরিয়ে দেয়। ইউরোপকেন্দ্রিক ইতিহাসের ভিত্তিতে নির্মিত এক বিকৃত চিত্র উপস্থাপন করে।
যাই হোক, আগের পৃষ্ঠাগুলোতে যে আলোচনা হয়েছে, তা যদি কিছুটা গুরুত্ব বহন করে, তবে আমাদের বুঝতে হবে যে মুসলিম মনস্তত্ত্বকে উপনিবেশমুক্ত করা সম্ভব নয়, যদি না আমরা সর্বব্যাপী পশ্চিমা জ্ঞানকাঠামোর গ্রাস থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারি। এই জ্ঞানকাঠামোই আমাদের ইতিহাস, সাহিত্য, বিজ্ঞান ও দর্শন থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। আমাদের বিশেষভাবে সতর্ক হতে হবে ইউরোপকেন্দ্রিক আধুনিকতা এবং তার প্রগতি ও বস্তুবাদী বিজ্ঞানের ধারণা নিয়ে।
মজার ব্যাপার হলো, অনেক সমসাময়িক পশ্চিমা চিন্তাবিদও প্রগতির ধারণার অন্ধকার দিকটি দেখতে পেয়েছেন। ওয়াল্টার বেঞ্জামিন প্রগতিকে ‘বিপর্যয়’ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, প্রগতির এই আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিই অতীতকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। নতুনের পেছনে ছুটতে ছুটতে এটি যা আর নতুন নয়, তাকে হেয় প্রতিপন্ন করে। তার লেখা Das Passagen-Werk বইয়ে বেঞ্জামিন যুক্তি দিয়েছেন যে, প্রগতির ওপর বিশ্বাসটাও যেন অনেকটা পৌরাণিক চিন্তার মতোই (Benjamin, 2002, p. 19)।
এছাড়া প্রগতির পরিমাণগত ধারণাটি দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নের ধারণার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতার কথা বিবেচনায় নিয়ে যে উন্নয়ন দরকার, তার সাথে এই প্রগতি খাপ খায় না। ওয়ায়েল হাল্লাক তার সাম্প্রতিক বই Restating Orientalism-এ এনলাইটেনমেন্ট-পরবর্তী পশ্চিমা জ্ঞানব্যবস্থাকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করার ডাক দিয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, পশ্চিমা জ্ঞানকাঠামো তার মূল্যবোধহীন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক যুক্তির মাধ্যমে জগতকে ধ্বংসের কিনারে নিয়ে এসেছে। একদিকে এটি যেমন লুণ্ঠনকারী পুঁজিবাদ ও গণহত্যাভিত্তিক উপনিবেশবাদ তৈরি করেছে, অন্যদিকে তেমনি ডেকে এনেছে জলবায়ু বিপর্যয় (Hallaq, 2018)।
পশ্চিমা জ্ঞানকাঠামোর এই সমালোচনা সত্ত্বেও কেউ হয়তো বলবেন, আধুনিক রাষ্ট্র, আমলাতন্ত্র বা পুঁজিবাদী উদ্যোগের কথা ইউরোপীয় ইতিহাসের ধারণা ছাড়া ভাবা কঠিন। নাগরিকত্ব, রাষ্ট্র, সুশীল সমাজ, গণপরিসর, মানবাধিকার, আইনের চোখে সমানাধিকার, ব্যক্তিমানুষ, সরকারি ও বেসরকারি খাতের পার্থক্য, গণতন্ত্র বা সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো ধারণাগুলো ইউরোপীয় ইতিহাসের ছাপ বহন করে (Chakrabarty, 2008)।
এই যুক্তিতে হয়তো কিছুটা সত্যতা আছে। তবে বর্তমানে পশ্চিমা দেশগুলোতে বর্ণবাদী সহিংসতা, ইসলামভীতি এবং সংখ্যালঘুদের প্রতি দুর্ব্যবহার যেভাবে বাড়ছে, তাতে এটা স্পষ্ট যে পশ্চিমা উদারনৈতিক আধুনিকতা মোটেই আদর্শ কিছু নয়। এটি যে আমাদের জন্য সেরা বিকল্প, তা ভাবার কোনো কারণ নেই (Massad, 2016; Uddin, 2019)। তবে আমি আগেই বলেছি, আমার উপনিবেশমুক্তকরণ প্রক্রিয়া একটি সুস্থ বহুত্ববাদের কথা বলে। এটি পশ্চিমা চিন্তার ইতিবাচক উপাদানগুলোকে (ইউরোপকেন্দ্রিকতাকে নয়!) নিজস্ব বিশ্ববীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রাখে। কিন্তু যেটা সবচেয়ে দুঃখজনক, তা হলো অন্ধভাবে পশ্চিমাদের অনুসরণ করার প্রবণতা।
অনেকে মনে করেন যে, রাজনৈতিক আধুনিকতার যেসব ধারণা আমরা আজ দেখি, তার সমতুল্য—কিংবা তার চেয়ে উন্নত—কোনো ব্যবস্থা অ-ইউরোপীয় ঐতিহ্যগুলোতে নেই। এটি একটি ভুল ধারণা। উদাহরণ হিসেবে মুঘল আমলের ‘সুলহ-ই-কুল’ বা ‘সবার সাথে শান্তি’র কথা বলা যায়। সেই সময়ের বিশ্ব প্রেক্ষাপটে মুঘল রাষ্ট্রব্যবস্থা ছিল সম্ভবত সবচেয়ে সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। সম্রাট আকবর এই দর্শনের মাধ্যমেই শিষ্টাচার, যুক্তিবোধ ও মানুষের মধ্যে মেলবন্ধনের এক অনন্য আদর্শ প্রচার করতে চেয়েছিলেন। শুধু মুঘল আমল নয়, ভারতীয় উপমহাদেশের হিন্দু ও বৌদ্ধ ঐতিহ্যের গভীরে তাকালেও আমরা বহুত্ববাদ, সহনশীলতা ও ন্যায়বিচারের অগণিত নজির খুঁজে পাব। ভারত যে চিরকালই একটি বহুত্ববাদী সমাজ হিসেবে গড়ে উঠেছিল, তার প্রমাণ ইতিহাসের নানা পাতায় ছড়িয়ে আছে। ত্রয়োদশ শতাব্দীর বিখ্যাত কবি ও সংগীতজ্ঞ আমির খসরুর লেখায় আমরা সেই সম্প্রীতির এক চমৎকার চিত্র পাই:
‘খোরাসানি, গ্রিক বা আরব, যে-ই আসুক না কেন,
সে কোনো সমস্যাই বোধ করবে না।
এখানকার মানুষ তাকে আপনজনের মতোই ভালোবাসবে,
তার মনে প্রশান্তি এনে দেবে।
যদি তারা তাকে নিয়ে ঠাট্টাও করে,
তাও করবে মুচকি হাসিতে।’
মানান আসিফের সাম্প্রতিক গবেষণা The Loss of Hindustan বইটিতে তিনি দেখিয়েছেন যে, আগে ভারত বা ‘হিন্দুস্তান’ ছিল সব ধর্মের মানুষের ঠিকানা। কিন্তু ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গি হিন্দুস্তানকে কেবল ‘হিন্দু’ ভারত হিসেবে বদলে ফেলেছে। আসিফ সপ্তদশ শতাব্দীর ডেকান ইতিহাসবিদ ফিরিশতার ধারণাটি বিশ্লেষণ করেছেন। তার বিশাল কর্ম তারিখ-ই-ফিরিশতা ছিল পরবর্তী শতাব্দীর ভলতেয়ার, কান্ট, হেগেলদের মতো ইউরোপীয় দার্শনিকদের অন্যতম উৎস। কিন্তু ঔপনিবেশিক ইতিহাসবিদরা হিন্দুস্তানের ধারণাকে সরিয়ে সেখানে ‘ইন্ডিয়া’ বসিয়ে দিয়েছেন। এখন আমরা এমন এক সংজ্ঞায় অভ্যস্ত হয়ে গেছি যেখানে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ তৈরি হলেও ‘ইন্ডিয়া’ মানেই হাজার বছরের পুরনো এক দেশ। ফলে ‘প্রাচীন বাংলাদেশ’ বা ‘প্রাচীন পাকিস্তান’ শব্দগুলো শুনতে বেমানান লাগে, কিন্তু ‘প্রাচীন ভারত’ বললে কেউ প্রশ্ন তোলে না।
ফিরিশতার ইতিহাসই প্রথম, যেখানে হিন্দুস্তানকে একটি জায়গা এবং বহু ধর্ম ও রাজনীতির মিলনস্থল হিসেবে দেখা হয়েছে। তিনি তার ইতিহাসে নুহ বা আদমের আমল থেকে ইন্দ্র পর্যন্ত সব কিছুকে মেলাতে চেয়েছেন।
মহাভারত অনুযায়ী পৃথিবীর চারটি বিশাল যুগ রয়েছে। ফিরিশতা এর সাথে ইসলামি সময়ের মিল ঘটিয়েছেন এভাবে: এক ব্যক্তি হজরত আলি রা.-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আদমের ত্রিশ হাজার বছর আগে কে ছিল?’ আলি রা. উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আদম’। ব্যক্তিটি বারবার প্রশ্ন করলেও উত্তর একই ছিল। ফিরিশতা এই আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যাটি ব্যবহার করেছেন এটা বোঝাতে যে, পৃথিবীর শুরুর সময়টা মানুষের জ্ঞানের অতীত। আদমের আমলই সবসময় প্রথম। এজন্যই তিনি মনে করতেন মুসলিমদের কাছে হিন্দুস্তানিদের কথাগুলো গুরুত্বহীন নয়। তিনি আদম ও নূহকে দাপর যুগের সাথে মিলিয়ে দুই ভিন্ন সময়ের মধ্যে সমন্বয় করেছেন। এটা ছিল ইসলামি পরিচয়কে ভারতীয় প্রেক্ষাপটে মিশিয়ে ফেলার এক চমৎকার প্রচেষ্টা।
আকবরের উজির আবুল ফজলের লেখা মহাভারতের (রজমনামা) ভূমিকাতেও এই বহুত্ববাদী মানসিকতা পাওয়া যায়। আবুল ফজল লিখেছেন, আকবর চেয়েছিলেন যেন মুহাম্মদের অনুসারী মুসলিম, ইহুদি ও হিন্দুরা একে অপরের ধর্মগ্রন্থগুলোর বিশুদ্ধ অনুবাদ সহজ বাংলায় পড়তে পারে। তার মতে, মহাভারত হলো জ্ঞানী ঋষিদের কাজ। যারা অন্য ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ ছড়ায়, আবুল ফজল তাদের সাবধান করে দিয়েছেন। তিনি অনুবাদগুলো করার মূল উদ্দেশ্যই ছিল যেন মানুষ সত্যের খোঁজ পায় এবং ধর্মীয় বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকে। ভারতে সাম্প্রতিক ধর্মীয় সংঘাতের সময়ে এই উদাহরণগুলো কতটা প্রাসঙ্গিক, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
ইসলামি সাংস্কৃতিক ইতিহাস থেকে এমন আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া সম্ভব যেখানে মানবাধিকার, বহুত্ববাদ, সামাজিক ন্যায়বিচার বা সার্বভৌমত্বের শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া যায়। আমরা যদি ইসলামি ইতিহাসের গভীরে যাই, তবে শিল্প, স্থাপত্য, সাহিত্য, রাজনীতি ও দর্শন থেকে প্রচুর প্রেরণা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। ইসলাম তো ইবনু সিনা, আল-গাজালি, রাজি, ইবনু আরাবি, রুমি, ইবনু খালদুন বা শাহ ওয়ালিউল্লাহর মতো কত রত্নই না উপহার দিয়েছে।
ইউরোপকেন্দ্রিকতা এবং এনলাইটেনমেন্টের গণ্ডি পেরিয়ে আমরা যখন নিজেদের ঐতিহ্যের দিকে তাকাই, তখন ইসলামি উত্তরাধিকার উদ্ধার ও পুনরুজ্জীবিত করা আমাদের জন্য খুব জরুরি হয়ে পড়ে। তবে এই পথে একটি বড় বাধা হলো ভাষার দেয়াল। বর্তমানের অধিকাংশ মুসলিম বুদ্ধিজীবী আরবি, ফার্সি কিংবা উসমানীয় তুর্কি ভাষায় তেমন দক্ষ নন। এর পাশাপাশি তাদের মধ্যে এক ধরনের নেতিবাচক মানসিকতা কাজ করে। তারা মনে করেন, আমাদের নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য আধুনিক যুগের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে অক্ষম। আবদুল্লাহ লারুই, হাসান হানাফি, ওরহান পামুক কিংবা পারভেজ হুদভয়ের মতো অনেক চিন্তাবিদের লেখায় এমন মনোভাব ফুটে ওঠে।
আজ ইংরেজি ও অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষায় প্রচুর বই ও নিবন্ধ পাওয়া যায়। আমাদের পূর্বসূরিদের চিন্তার ধরণ ও পদ্ধতি বোঝার জন্য এগুলোই যথেষ্ট। এখন প্রয়োজন উপনিবেশমুক্ত হওয়ার দৃঢ় ইচ্ছা এবং একটি বড় মাপের অনুবাদ আন্দোলন। ইসলামি ভাষায় সংরক্ষিত কোটি কোটি পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই। বর্তমানের মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা এই পাণ্ডুলিপিগুলোর মূল্য সম্পর্কে খুব একটা সচেতন নন।
আমাদের বর্তমান পরিস্থিতির সাথে রেনেসাঁ যুগের মানবতাবাদীদের তুলনা করা যেতে পারে। তারা যেমন গ্রিক ও ল্যাটিন ধ্রুপদী ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করতে চেয়েছিলেন, আমাদের পরিস্থিতিও অনেকটা সেরকম। যদিও আমাদের তাদের মানবতাবাদী অধিবিদ্যায় বিশ্বাস করার প্রয়োজন নেই, তবুও পরিস্থিতিগত মিলটা আমরা স্বীকার করতে পারি। ভালো খবর হলো, ‘লাইব্রেরি অফ অ্যারাবিক লিটারেচার’-এর মতো কিছু অনুবাদ প্রকল্প শুরু হয়েছে। এগুলোতে আরবি সাহিত্যের কবিতা, ধর্ম, বিজ্ঞান, দর্শন ও ইতিহাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ বইগুলোর ইংরেজি অনুবাদ পাওয়া যাচ্ছে। তবে অন্যান্য ইসলামি ভাষার ক্ষেত্রেও এমন আরও প্রকল্প হাতে নেওয়া দরকার।
এছাড়া ইসলামি বিশ্বে উচ্চতর গবেষণার জন্য আরও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেন মুসলিম পণ্ডিতরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়াতে পারেন। আমাদের উচিত ইসলামি বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘পশ্চিম’ নিয়ে পড়াশোনার জন্য আলাদা বিভাগ খোলা। ইসলামি সভ্যতার দৃষ্টিকোণ থেকে পশ্চিমা বিজ্ঞান ও ইতিহাসের চর্চা সেখানে হওয়া প্রয়োজন। এসব উদ্যোগের সফলতার বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে, যা নিয়ে এই নিবন্ধে বিস্তারিত বলা সম্ভব নয়। তবে মুসলিম চিন্তাবিদদের অবশ্যই হীনম্মন্যতা ঝেড়ে ফেলতে হবে। যেকোনো বুদ্ধিবৃত্তিক সমস্যা সমাধানের জন্য বারবার পশ্চিমের দিকে তাকিয়ে থাকা বন্ধ করতে হবে।
নিবন্ধের শুরুতে আমি যে রূপকের কথা বলেছিলাম, সেখানে ফিরে আসা যাক। মুসলিম মনস্তত্ত্বকে উপনিবেশমুক্ত করতে হলে পশ্চিমা জ্ঞানকাঠামোকে ভেঙে ফেলতে হবে। রেনেসাঁ থেকে শুরু করে আধুনিকতা ও প্রগতির ধারণার মাধ্যমে যে ইউরোপকেন্দ্রিক জ্ঞানব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, তা থেকে নিজেদের আলাদা করতে হবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে পশ্চিমা চিন্তার সাথে আমাদের সব সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। বরং এর অর্থ হলো নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যকে খুঁজে বের করা ও তাকে পুনরুজ্জীবিত করা, যাতে আমরা সেই ঐতিহ্যের আলোকে চিন্তা করতে পারি।
বর্তমান উত্তর-ঔপনিবেশিক পরিস্থিতিতে ঐতিহ্যের সাথে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও ভাষাগত সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে, যা একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। অনেক মুসলিম বুদ্ধিজীবী মনে করেন, আমি যে ইসলামি ঐতিহ্যের কথা বলছি, বর্তমানের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তার কোনো প্রাসঙ্গিকতা নেই। কিন্তু নিজের পরিচয়কে যদি আপনি আপনার নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তুলতে না পারেন, তবে আপনি উপনিবেশবাদের জাঁতাকলেই পিষ্ট হবেন। আপনি মুসলিম হিসেবে হয়তো নিয়মিত নামাজ পড়বেন, কিন্তু আপনার মনের জগৎটি ইউরোপকেন্দ্রিক ধ্বংসাত্মক ধারণায় আচ্ছন্ন থাকবে। এর ফলে আপনার খণ্ডিত আত্মপরিচয় কখনোই ঘুচবে না। এসব কারণে উপনিবেশমুক্তকরণের এই লড়াই কেবল ঘরে বসে তাত্ত্বিক চিন্তা করার বিষয় নয়। এটি কেবল তাত্ত্বিক কোনো বিষয় নয়; বরং এক আত্মিক সাধনা, যা আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তির দিশা দেবে।
তথ্যসূত্র
- Al-Ghazālī, A. H. (2000). The incoherence of the philosophers. M. E. Marmura (ed. and trans.). Brigham Young University Press.
- Al-Kindī. (1974). Al-Kindī’s Metaphysics: A Translation of Ya’qūb ibn Iṣḥāq al-Kindī’s Treatise “On First Philosophy”. Translated by A. L. Ivry. SUNY Press.
- Appiah, K. A. (2016). There is no such thing as Western civilisation. The Guardian, November 9. https://www.theguardian.com/world/2016/nov/09/western-civilisation-appiah-reith-lecture
- Asif, M. A. (2020). The loss of Hindustan: The invention of India. Harvard University Press.
- Bakar, O. (1998). Classification of knowledge in Islam: A study in Islamic philosophies of science. Islamic Texts Society.
- Benjamin, W. (2002). The arcades project. Translated by H. Eiland and K. McLaughlin. Harvard University Press.
- Block, N. (2023). The border between seeing and thinking. Oxford University Press.
- Blumenberg, H. (1985). The legitimacy of the modern age. Translated by R. Wallace. The MIT Press.
- Césaire, A. (2000). Discourse on colonialism. Translated by Joan Pinkham. NYU Press.
- Chakrabarty, D. (2008). Provincializing Europe: Postcolonial thought and historical difference. Princeton University Press.
- Clayton, L. (2010). Bartolomé de las casas and the conquest of the Americas. Wiley-Blackwell.
- Comfort, N. (2019). How science has shifted our sense of identity. Nature, 574(7777), 167–170.
- Comte, A. (2009). The positive philosophy of Auguste Comte (Vol. 2). Translated by Harriet Martineau. Cambridge University Press.
- Condorcet, J. N. C. (1955). Sketch for a historical picture of the progress of the human mind. Translated by June Barraclough. Weidenfeld and Nicolson.
- Connell, R. (2007). Southern theory: The global dynamics of knowledge in social science. Allen & Unwin.
- Dagli, C. (2024). Metaphysical institutions: Islam and the modern project. SUNY Press.
- Daston, L., & Galison, P. (2007). Objectivity. Zone Books.
- Descartes, R. (1985). The philosophical writings of Descartes (Vol. 3). Translated by John Cottingham et al. Cambridge University Press.
- El-Rouayheb, K. (2015). Islamic intellectual history in the seventeenth century: Scholarly currents in the Ottoman Empire and the Maghreb. Cambridge University Press.
- Fanon, F. (1994). A dying colonialism. Grove Press.
- Fanon, F. (2021). The wretched of the earth. Grove Press.
- Faruque, M. U. (2021a). Sculpting the self: Islam, selfhood, and human flourishing. University of Michigan Press.
- Faruque, M. U. (2021b). The crisis of modern subjectivity: Rethinking Muhammad Iqbal and the Islamic tradition. Journal of Islamic and Muslim Studies, 6(2), 43–81.
- Feyerabend, P. (1975). Against method: Outline of an anarchist theory of knowledge. Verso.
- Fleck, L. (1979). Genesis and development of a scientific fact. University of Chicago Press.
- Galileo, G. (2008). The Essential Galileo. Edited and translated by Maurice A. Finocchiaro. Hackett.
- Ganeri, J. (2012). The self: Naturalism, consciousness, and the first-person stance. Oxford University Press.
- Ganeri, J. (2017). Attention, not self. Oxford University Press.
- Giddens, A. (1990). The consequences of modernity. Stanford University Press.
- Gillespie, M. A. (2008). The theological origins of modernity. University of Chicago Press.
- Grosfoguel, R. (2002). Colonial difference, geopolitics of knowledge, and global coloniality in the modern/colonial capitalist world-system. Review, 25, 203–224.
- Habermas, J. (1981). Modernity versus postmodernity. New German Critique, 22, 3–14.
- Habermas, J. (1990). The philosophical discourse of modernity. Translated by F. Lawrence. The MIT Press.
- Hallaq, W. (2018). Restating orientalism: A critique of modern knowledge. Columbia University Press.
- Hallaq, W. (2019). Interview on Restating Orientalism, conducted by Fatima Taskomur. https://www.fletcherforum.org/home/2019/2/12/an-interview-with-professor-wael-hallaq
- Hawking, S., & Mlodinow, L. (2010). The grand design. Random House.
- Hegel. (1980). Lectures on the philosophy of world history. Translated by H.B. Nisbet. Cambridge University Press.
- Heidegger, M. (1966). Discourse on thinking. Translated by J.M. Anderson and E.H. Freund. Harper and Row.
- Heidegger, M. (1968). What is called thinking? Translated by J. Glenn Gray. Harper and Row.
- Heidegger, M. (1977). Basic writings. Harper and Row.
- Husserl, E. (1970). The crisis of European sciences and transcendental phenomenology: An introduction to phenomenological philosophy. Translated by D. Carr. Northwestern University Press.
- Hut, P., Alford, M., & Tegmark, M. (2006). On math, matter and mind. Foundations of Physics, 36, 765–794.
- Israel, J. (2006). Enlightenment contested: Philosophy, modernity, and the emancipation of man 1670–1752. Oxford University Press.
- Jameson, F. (2002). A singular modernity: Essay on the ontology of the present. Verso.
- Kant, I. (2012). Physical geography. In E. Watkins (Ed.), Kant: Natural science. Cambridge University Press.
- Kinra, R. (2020). Revisiting the history and historiography of Mughal pluralism. ReOrient, 5(2), 137–182.
- Kuhn, T. (1996). The structure of scientific revolutions. University of Chicago Press.
- Latour, B. (1993). We have never been modern. Harvard University Press.
- Library of Arabic Literature. (n.d.). Retrieved from https://nyupress.org/library-of-arabic-literature/
- Locke, J. (1997). An essay concerning human understanding. Edited by R. Woolhouse. Penguin.
- Losensky, P., & Sharma, S. (2012). In the bazaar of love: The selected poetry of Amir Khusrau. Penguin Books.
- Lumbard, J. (2022). Decolonizing Quranic studies. Religion, 13, 176. https://doi.org/10.3390/rel13020176
- Macaulay, T. B. (1835). Macaulay’s minute on Indian education. http://oldsite.english.ucsb.edu/faculty/rraley/research/english/macaulay.html
- Massad, J. (2016). Islam in liberalism. University of Chicago Press.
- McDowell, J. (1994). Mind and world. Harvard University Press.
- McGilchrist, I. (2021). The matter with things: Our brains, our delusions, and the unmaking of the world (Vol. 2). Perspectiva.
- Menocal, M. R. (2002). The ornament of the world: How Muslims, Jews and Christians created a culture of tolerance in medieval Spain. Back Bay Books.
- Merchant, C. (2020). The death of nature: Women, ecology, and the scientific revolution. HarperOne.
- Mignolo, W., & Walsh, C. (2018). On decoloniality: Concepts, analytics, praxis. Duke University Press.
- Nasr, S. H. (1968). Science and civilization in Islam. Harvard University Press.
- Nasr, S. H. (1976). Islamic science: An illustrated study. The World of Islam Festival Trust.
- Nasr, S. H. (1989). Knowledge and the sacred. State University of New York Press.
- Nasr, S. H. (2008). Islam, science, Muslims, and technology. With Muzaffer Iqbal. Institute for Humanities and Cultural Studies.
- Nasr, S. H. (2010). Islam in the modern world: Challenged by the west, threatened by fundamentalism, keeping faith with tradition. HarperOne.
- Ndlovu-Gatscheni, S. (2018). Epistemic freedom in Africa: Deprovincialization and decolonisation. Routledge.
- Nisbet, R. (1994). History of the idea of progress. Routledge.
- Ogunnaike, O. (2016). From heathen to subhuman: A genealogy of the influence of the decline of religion on the rise of modern racism. Open Theology, 2(1), 785–803.
- Ogunnaike, O. (2017). African philosophy reconsidered: Religion, race, and rationality. Journal of Africana Religions, 5(2), 181–216.
- Ogunnaike, O. (2018). Of cannons and canons: The promise and perils of post-colonial education. Renovatio, 2(2), 25–39.
- Ogunnaike, O. (2022). Oludamini Ogunnaike “From Theory to Theoria and back again and beyond: Decolonizing the study of Africana religions”. Journal of Africana Religions, 102, 174–211.
- Pollock, S. (Ed.). (2011). Forms of knowledge in early modern Asia: Explorations in the intellectual history of India and Tibet, 1500–1800. Duke University Press.
- Quijano, A. (2007). Coloniality and modernity/rationality. Cultural Studies, 21(2–3), 168–178.
- Quijano, A., & Ennis, M. (2000). Coloniality of power, eurocentrism, and Latin America. Nepantla: Views from South, 1(3), 533–580.
- Reilly, R. (2010). The closing of the Muslim mind: How intellectual suicide created the modern Islamist crisis. ISI Books.
- Ross, S. (1962). Scientist: The story of a word. Annals of Science, 18(2), 65–85.
- Schrödinger, E. (2014). Nature and the Greeks and science and humanism. Cambridge University Press.
- Shapin, S. (1996). The scientific revolution. University of Chicago Press.
- Shapin, S., & Schaffer, S. (1985). Leviathan and the air-pump: Hobbes, Boyle and the scientific life. University of Princeton Press.
- Smith, W. (2012). Science & Myth: With a response to Stephen Hawking’s the grand design. Angelico Press.
- Smith, W. (2020). The vertical ascent: From particles to the tripartite cosmos and beyond. Philos-Sophia Initiative Foundation.
- Sousa Santos, B. (2018). The end of the cognitive empire: The coming of age of epistemologies of the south. Duke University Press.
- Táíwò, O. (2022). Elite capture: How the powerful took over identity politics (and everything else). Pluto Press.
- Taylor, C. (2007). A secular age. Harvard University Press.
- Uddin, A. (2019). When Islam is not a religion: Inside America’s fight for religious freedom. Pegasus Books.
- van Fraasen, B. C. (2008). The empirical stance. Yale University Press.
- Weber, M. (1946). Science as a vocation. In H. H. Gerth & C. Wright Mills (Eds.), From Max Weber: Essays in sociology. Oxford University Press.
- Weber, M. (1992). The Protestant ethic and the spirit of capitalism. Translated by T. Parsons. Routledge.
- Wittgenstein, L. (1953). Philosophical investigations. Macmillan.
- Wynter, S. (2003). Unsettling the coloniality of being/power/truth/freedom. The New Centennial Review, 3, 257–337.
- Zwicky, J. (2023). Once upon a time in the west: Essays on the politics of thought and imagination. McGill-Queen’s University Press.







Comments