সিলেট গণভোট দিবস - সিলেট পাকিস্তানকে বেছে নেওয়ার বিস্মৃত ইতিহাস

সিলেটের মানুষ পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দিয়েছিল, এই তথ্য নতুন নয়। নতুন প্রশ্ন হলো, কেন দিয়েছিল? প্রায় আট দশক ধরে এই প্রশ্নের সবচেয়ে সহজ উত্তরটিই সবচেয়ে বেশি প্রচারিত হয়েছে, ধর্ম। কিন্তু সমসাময়িক স্মৃতিকথা, ইতিহাসচর্চা এবং গণভোটের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারীদের অভিজ্ঞতা বলছে, গল্পটি ছিল অনেক বেশি জটিল।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো, আমরা প্রায়ই অতীতকে তার নিজস্ব সময়ের ভেতর থেকে না পড়ে বর্তমানের রাজনৈতিক বাস্তবতা দিয়ে বিচার করি। ১৯৪৭ সালের সিলেট গণভোটও সেই ভাগ্য এড়াতে পারেনি।
আজ যখন সিলেটের পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির কথা ওঠে, আলোচনাটি প্রায়ই একটি বাক্যে এসে থেমে যায়, ‘সিলেট ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাই পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দিয়েছিল।’ কথাটি একেবারে ভুল নয়; কিন্তু অসম্পূর্ণ। কারণ ইতিহাসে কোনো জনগোষ্ঠী কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে রাষ্ট্র বদলে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নেয় না। এমন সিদ্ধান্তের পেছনে থাকে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক, ক্ষমতার বণ্টন, নিরাপত্তাবোধ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের আশা কিংবা আশঙ্কা।
সিলেট গণভোটও এর ব্যতিক্রম ছিল না।
আজকের এই আলাপের উদ্দেশ্য পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া নয়; বরং একটি সহজ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা। কেন সিলেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান মনে করেছিলেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ আসামের চেয়ে পাকিস্তানের সাথেই বেশি নিরাপদ?
এই প্রশ্নের উত্তর সবচেয়ে ভালো পাওয়া যায় তাঁদের কাছেই, যাঁরা সেই সময়ের ঘটনাগুলোর ভেতর দিয়ে হেঁটেছেন।
ফরিদপুর থেকে মুসলিম লীগ ন্যাশনাল গার্ডের সদস্য হিসেবে গণভোটের প্রচারণায় অংশ নিতে সিলেটে এসেছিলেন আবদুল গফুর। বহু বছর পর তাঁর স্মৃতিকথা ‘আমার কালের কথা’ লিখতে গিয়ে তিনি প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা স্মরণ করেন। সিলেটে পৌঁছে তিনি যে দৃশ্য দেখেছিলেন, তা ছিল তাঁর কাছে অভাবনীয়।
সিলেটে গিয়ে দেখলাম, হৈহৈ কাণ্ড, রৈরৈ ব্যাপার। গণভোট উপলক্ষে সমগ্র সিলেটে মুসলমানদের মধ্যে যেন এক বিরাট সাড়া পড়ে গেছে। সিলেটের মুসলমানরা যেন মুক্তির আশায় একপায়ে খাড়া হয়ে আছে। গণভোটের মাধ্যমে তারা জুলুম-নির্যাতনের হাত থেকে মুক্তির জন্য প্রহর গুনছে।
আবদুল গফুর · আমার কালের কথা
এই কয়েকটি লাইন পুরো গণভোটের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
খেয়াল করলে দেখা যাবে, আবদুল গফুর ‘পাকিস্তানের জন্য উচ্ছ্বাস’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেননি। তিনি লিখেছেন ‘মুক্তির আশায়’ অপেক্ষা করার কথা। তাঁর কাছে পাকিস্তান কেবল একটি নতুন রাষ্ট্র নয়, বরং একটি বিদ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা; এই অঞ্চলের মানুষের মুক্তির এক নতুন দুয়ার।
এখন প্রশ্ন আসে, কিসের মুক্তি?
এই প্রশ্নের উত্তরও তাঁর স্মৃতিকথাতেই ছড়িয়ে আছে। আবদুল গফুর শুধু নিজের অনুভূতির কথা লেখেননি। তিনি সেই সময়কার জনমত, মিছিল এবং প্রচারণার ভাষাও সংরক্ষণ করেছেন। তিনি লিখেছেন, সিলেটের মুসলমানদের মুখে তখন এমন সব স্লোগান শোনা যেত:
জনস্লোগান · ১৯৪৭
“আসামে আর থাকব না, গুলি খেয়ে মরব না।”
“আসাম সরকার জুলুম করে, নামাজের উপর গুলি করো।”
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলা জরুরি। এগুলো আবদুল গফুরের নিজস্ব মন্তব্য নয়; বরং তিনি সেই সময়কার জনসমাজে প্রচলিত রাজনৈতিক স্লোগানগুলো লিপিবদ্ধ করেছেন। ইতিহাসবিদদের কাছে এ ধরনের স্লোগান কোনো ঘটনার চূড়ান্ত প্রমাণ না হলেও একটি জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রকে কীভাবে উপলব্ধি করছিল, তা বোঝার জন্য এগুলো অত্যন্ত মূল্যবান দলিল।
আবদুল গফুর একা নন।
একই ধরনের রাজনৈতিক পরিবেশের কথা লিখেছেন আবুল মাল আবদুল মুহিতও। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী হিসেবে পরিচিত হলেও, ১৯৪৭ সালে তিনি ছিলেন গণভোটের একজন তরুণ কর্মী। তাঁর স্মৃতিকথা ‘স্মৃতির মণিকোঠায়’ পড়লে বোঝা যায়, গণভোটের আগে মুসলিম লীগের সামনে পরিস্থিতি মোটেই সহজ ছিল না। বিজয়ের গল্প দিয়ে তিনি স্মৃতিচারণ শুরু করেননি; বরং লিখেছেন:
মুসলিম লীগের তখন বেশ বিপদ। আসামে লাইন প্রথার বিরুদ্ধে মার্চ মাসে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয় এবং সরকার তার মোকাবিলায় ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করে। সভাপতি মওলানা ভাসানী ও সম্পাদক মাহমুদ আলি কারাবন্দি। আরও অনেক নেতা, ছাত্র এবং কর্মী জেলে। সিলেটের পরিবেশও উত্তপ্ত…
আবুল মাল আবদুল মুহিত
মুহিতের এই স্মৃতিচারণ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি গণভোটকে কোনো রোমান্টিক বিজয়ের ইতিহাস হিসেবে লেখেননি। তিনি এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার কথা বলেছেন, যেখানে মুসলিম লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব কারাগারে, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এবং গণভোটের আগে পুরো আসাম রাজনৈতিক উত্তেজনায় উত্তপ্ত।
আবদুল গফুরের স্মৃতিতে আমরা মানুষের অনুভূতির প্রকাশ দেখি, আর আবুল মাল আবদুল মুহিতের স্মৃতিতে দেখি সেই অনুভূতির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। এই দুটি স্মৃতিকথা পাশাপাশি রাখলে একটি প্রশ্ন আর এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
কেন সিলেটের বিপুলসংখ্যক মানুষ বিদ্যমান ব্যবস্থাকে ‘জুলুম’ হিসেবে দেখতে শুরু করেছিলেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ১৯৪৭ সালের জুলাই থেকে আরও কয়েক বছর পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। পর্যালোচনা করতে হবে আসামের লাইন প্রথা, কংগ্রেসের রাজনীতি, সিলেটকে ঘিরে গড়ে ওঠা ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং সেই ইতিহাস, যা শেষ পর্যন্ত একটি গণভোটকে অনিবার্য করে তুলেছিল।
আসামের বিরুদ্ধে রায় ও পাকিস্তানের পক্ষে ধারাবাহিকতা
সিলেট গণভোটকে শুধু পাকিস্তানের পক্ষে দেওয়া একটি রায় হিসেবে মূল্যায়ন করলে ইতিহাসের আংশিক পাঠই সম্পন্ন হয়। কারণ ১৯৪৭ সালের জুলাইয়ে ব্যালট বাক্সে যে সিদ্ধান্ত উঠে এসেছিল, তার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল আরও বহু বছর আগে। সিলেটের মানুষের বড় একটি অংশ পাকিস্তানকে বেছে নেওয়ার পূর্বে মূলত বিদ্যমান আসাম প্রাদেশিক ব্যবস্থাকেই প্রত্যাখ্যান করেছিল।
এই ইতিহাসের শুরু আরও পেছনে।
১৮৭৪ সালে ব্রিটিশ সরকার প্রশাসনিক সুবিধার যুক্তিতে সিলেটকে বাংলা প্রেসিডেন্সি থেকে বিচ্ছিন্ন করে আসামের সাথে যুক্ত করে। এটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে নেওয়া হলেও এর রাজনৈতিক অভিঘাত ছিল সুদূরপ্রসারী। ভাষা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের দিক থেকে সিলেট বাংলার সাথে যুক্ত থাকলেও প্রশাসনিকভাবে তাকে এমন একটি প্রদেশের অধীনে রাখা হয়, যেখানে সময়ের সাথে সাথে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে নতুন দ্বন্দ্ব তৈরি হতে থাকে।
বিশ শতকের ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে সেই দ্বন্দ্ব আরও তীব্র আকার ধারণ করে। বিশেষ করে ভূমি, জনসংখ্যা ও প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে মুসলমানদের সাথে কংগ্রেস নিয়ন্ত্রিত আসাম সরকারের সম্পর্ক ক্রমেই উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। বহুল আলোচিত ‘লাইন সিস্টেম’ বা লাইন প্রথা সেই উত্তেজনার অন্যতম প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। সরকার এটিকে ভূমি ও বসতি ব্যবস্থাপনার নীতি হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও মুসলিম লীগের কাছে এটি ছিল মুসলমান কৃষকদের বিস্তার রোধ ও রাজনৈতিক প্রভাব সীমিত করার একটি হাতিয়ার। এ প্রসঙ্গে লাইন প্রথাটি আগে বুঝে নেওয়া প্রয়োজন।
লাইন সিস্টেম: সিলেট গণভোটের অন্যতম প্রেক্ষাপট
সিলেট গণভোটকে বুঝতে হলে লাইন প্রথা সম্পর্কে জানা জরুরি। কারণ ১৯৪৭ সালের গণভোটের আগে আসামের মুসলিম রাজনীতিতে এটি ছিল সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি।
বিশ শতকের প্রথমার্ধে পূর্ববঙ্গের বহু মুসলমান কৃষক জীবিকা ও চাষযোগ্য জমির সন্ধানে আসামে বসতি স্থাপন করেন। এতে কৃষি উৎপাদন বাড়লেও আসামের রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিজাতদের একটি অংশের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, এই অভিবাসনের ফলে ভূমির মালিকানা, জনসংখ্যার ভারসাম্য ও নির্বাচনী রাজনীতিতে মুসলমানদের প্রভাব বৃদ্ধি পাবে।
এই প্রেক্ষাপটে আসাম সরকার লাইন প্রথা নামে একটি ভূমি ও বসতি নিয়ন্ত্রণ নীতি চালু করে। সরকার এটিকে প্রশাসনিক ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও মুসলিম লীগ এবং পূর্ববঙ্গের মুসলমান কৃষকদের বড় একটি অংশের কাছে এটি ছিল বৈষম্যমূলক। তাঁদের অভিযোগ ছিল, এই নীতির মাধ্যমে মুসলমান কৃষকদের নতুন এলাকায় বসতি স্থাপন, জমি চাষ ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুযোগ সীমিত করা হচ্ছে। সময়ের সাথে এই অসন্তোষ আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
১৯৪৬ সালে লাইন প্রথার বিরুদ্ধে মুসলিম লীগের নেতৃত্বে আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলন দমন করতে সরকার ধরপাকড় চালায় এবং বহু নেতা-কর্মী কারাবন্দি হন। আবুল মাল আবদুল মুহিত তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, গণভোটের ঠিক আগে ‘আসামে লাইন প্রথার বিরুদ্ধে মার্চ মাসে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়’ এবং সেই আন্দোলন দমনে ব্যাপক গ্রেপ্তার অভিযান চালানো হয়।
অর্থাৎ, সিলেট গণভোট কোনো রাজনৈতিক শূন্যতার মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়নি। তার আগে কয়েক বছর ধরে জমে ওঠা ভূমি, প্রতিনিধিত্ব ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে সৃষ্ট সংঘাতই গণভোটের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল।
আবুল মাল আবদুল মুহিতের স্মৃতিকথায় সেই উত্তেজনার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি গণভোটের আগের পরিস্থিতি স্মরণ করতে গিয়ে লিখেছেন:
‘মুসলিম লীগের তখন বেশ বিপদ। আসামে লাইন প্রথার বিরুদ্ধে মার্চ মাসে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয় এবং সরকার তার মোকাবিলায় ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করে। সভাপতি মওলানা ভাসানী ও সম্পাদক মাহমুদ আলি কারাবন্দি। আরও অনেক নেতা, ছাত্র এবং কর্মী জেলে… সিলেটের পরিবেশও উত্তপ্ত।’
এই উদ্ধৃতির গুরুত্ব শুধু এই কারণে নয় যে এটি রাজনৈতিক দমন-পীড়নের কথা বলছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মুহিত গণভোটকে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছেন না। তাঁর কাছে গণভোট ছিল কয়েক মাস ধরে জমে ওঠা একটি রাজনৈতিক সংকটের পরিণতি।
একই সময়ে আবদুল গফুরের স্মৃতিতেও একই অনুভূতির প্রতিফলন পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন, সিলেটের মানুষ ‘মুক্তির আশায় একপায়ে খাড়া হয়ে আছে’। তাঁর সংরক্ষিত স্লোগানগুলোও সেই সময়ের জনমনের ভাষা তুলে ধরে, যেমন: ‘আসামে আর থাকব না’, ‘আসাম সরকার জুলুম করে’। এই ভাষা হয়তো রাজনৈতিকভাবে অতিরঞ্জিত ছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও এটি একটি বাস্তবতা তুলে ধরে। সিলেটের বহু মুসলমান বিদ্যমান প্রশাসনিক কাঠামোকে নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য অনুকূল মনে করছিলেন না।
তবে এখানেই ইতিহাসকে সরলীকরণ করলে ভুল হবে।
সিলেটকে আসামের সাথে রাখার পক্ষে অবস্থান নেওয়া সবাই মুসলমানদের বিরোধী ছিলেন কিংবা পাকিস্তানের বিরোধিতা মানেই মুসলমানদের বিরোধিতা, এমনটাও সত্য নয়। বরং মূল প্রশ্নটি ছিল ক্ষমতা, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের বিন্যাস নিয়ে।
গবেষক আশফাক হোসেন (Ashfaque Hossain) দেখিয়েছেন, সিলেট প্রশ্নে রাজনৈতিক অবস্থানগুলো সময়ের সাথে বদলেছে। তিনি একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেন। তাঁর ভাষায়, যে হিন্দু অভিজাত শ্রেণি একসময় বাংলার সাথে সিলেটের পুনঃসংযুক্তির পক্ষে ছিল, ১৯৪৭ সালে তারাই আসামের সাথে থাকার পক্ষে অবস্থান নেয়। একই সময়ে কংগ্রেস এবং কমিউনিস্ট পার্টি সিলেটকে আসামের ভেতরে রাখার জন্য যৌথ প্রচারণাও পরিচালনা করে।
এই তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি প্রমাণ করে যে সিলেট প্রশ্নে রাজনৈতিক অবস্থান কেবল আদর্শ দিয়ে নির্ধারিত হয়নি; বরং ক্ষমতার সমীকরণও এতে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
আসামের জন্য সিলেট কেবল একটি জেলা ছিল না। এটি ছিল রাজস্বের গুরুত্বপূর্ণ উৎস, চা-শিল্পের প্রবেশদ্বার এবং শিক্ষিত জনবলের একটি কেন্দ্র। সিলেটকে হারানো মানে শুধু ভূখণ্ড হারানো নয়, বরং অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক শক্তিরও পুনর্বিন্যাস। ফলে কংগ্রেসের সিলেটকে ধরে রাখার আগ্রহকে শুধু জাতীয়তাবাদের আলোকে মূল্যায়ন করলে পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না।
অন্যদিকে মুসলিম লীগের প্রচারণাও শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল না। তাঁদের প্রধান রাজনৈতিক যুক্তি ছিল, সিলেটের ভাষা বাংলা, জনসংখ্যার অধিকাংশ মুসলমান এবং অর্থনৈতিক যোগাযোগ পূর্ব বাংলার সাথে। অথচ প্রশাসনিকভাবে তারা এমন একটি ব্যবস্থার অধীনে রয়েছে, যেখানে নিজেদের ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব থেকে তারা বঞ্চিত বলে মনে করছে।
এই কারণেই সিলেট গণভোটকে শুধু ভারত বনাম পাকিস্তানের লড়াই বলা যথেষ্ট নয়। এটি ছিল মূলত দুটি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সংঘর্ষ। একদিকে ছিল এমন একটি প্রাদেশিক কাঠামো, যা বিদ্যমান অবস্থাকে ধরে রাখতে চাইছিল; অন্যদিকে ছিল এমন একটি আন্দোলন, যা দাবি করছিল সিলেটের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার একান্তই সিলেটের মানুষের।
এই রাজনৈতিক সংঘাত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর লড়াইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তা ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে গ্রামীণ জনসভা এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও ছড়িয়ে পড়েছিল। আর সেখান থেকেই জন্ম নিয়েছিল এমন এক গণ-আন্দোলন, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ জুলাইয়ের সিলেট গণভোট।
মসজিদের মিম্বার থেকে ব্যালট বাক্স, তারপর ইতিহাসের বিস্মৃতি
১৯৪৭ সালের সিলেট গণভোটকে শুধু মুসলিম লীগের রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখলে সবচেয়ে বড় ভুলটি করা হবে। কারণ এটি ছিল না কেবল দুই দলের নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এটি ছিল এমন একটি গণআন্দোলন, যেখানে প্রায় পুরো সমাজ কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে পড়েছিল।
সবচেয়ে বড় লড়াইটা হয়েছিল জনমত নিয়ে।
একদিকে ছিল কংগ্রেস। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। গবেষক Ashfaque Hossain দেখিয়েছেন, কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টি যৌথভাবে সিলেটকে আসামের সঙ্গে রাখার জন্য প্রচারণা চালিয়েছিল। শুধু তাই নয়, সিলেটকে আসামের ভেতরে রাখার জন্য একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক প্রচেষ্টাও গড়ে উঠেছিল।
আজকের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় অবস্থানও ছিল সিলেটের পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা করা।
তবে ইতিহাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশটি পরে আসে।
বাংলাদেশের অন্যতম কমিউনিস্ট নেতা মোহাম্মদ তোয়াহা বহু বছর পরে নিজের স্মৃতিকথায় ফিরে তাকিয়ে স্বীকার করেন, তিনি কেন্দ্রীয় পার্টি লাইনের সঙ্গে একমত ছিলেন না। তাঁর ভাষায়, সিলেটের পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা “বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না।” আরও স্পষ্ট করে তিনি লিখেছেন,
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সার্কুলার মারফত পার্টি কর্মীদের উপর নির্দেশ আসল — গণভোটে সিলেটের পাকিস্তানে যোগদানের বিরোধিতা করতে হবে। যুক্তি দেখানো হলো ভারত ‘অসাম্প্রদায়িক’ এবং ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’। সুতরাং সিলেট পাকিস্তানে যোগ না দিয়ে ভারতে যোগদান করলে সিলেটের জনগণ মুসলিম ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত আবহাওয়ার বাইরে থাকবে।
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি তখনো পাকিস্তান-হিন্দুস্থানের ভিত্তিতে বিভক্ত হয়নি। কাজেই এখানকার কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীগণ পার্টির নির্দেশ মানতে বাধ্য। সুতরাং পার্টি-কর্মীগণ ‘সিলেটের গণভোটে’ ঐ জেলার পাকিস্তান অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা করার কাজে কোমর বেঁধে মাঠে নেমে গেল। এর সামাজিক প্রতিক্রিয়া যা হওয়ার তাই হলো।
পার্টির বিরোধিতা সত্ত্বেও মুসলিম লীগের জয় হলো। কমিউনিস্ট পার্টি জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল।
মোহাম্মদ তোয়াহা · স্মৃতিচারণ
এই আত্মসমালোচনার গুরুত্ব এখানেই যে, এটি মুসলিম লীগের কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়। এটি একজন কমিউনিস্ট নেতার নিজের মূল্যায়ন। তাঁর উপলব্ধি ছিল, সিলেটের বাস্তব জনমতকে তাঁদের দল সঠিকভাবে বুঝতে পারেনি।
শুধু রাজনৈতিক দল নয়, ধর্মীয় নেতৃত্বও বিভক্ত ছিল।
হুসাইন আহমদ মাদানী এবং উলামায়ে হিন্দ অবিভক্ত ভারতের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছিলেন। অন্যদিকে শর্ষিনার পীরের প্রতিনিধি দল, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এবং স্থানীয় বহু আলেম পাকিস্তানের পক্ষে গ্রাম থেকে গ্রামে প্রচারণা চালান। ফলে মসজিদের মিম্বার শুধু ধর্মীয় উপদেশের স্থান ছিল না; সেটি হয়ে উঠেছিল রাষ্ট্র, জাতীয়তা এবং মুসলমানদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্কের মঞ্চ।
ছাত্রসমাজও এই আন্দোলনের প্রাণ হয়ে ওঠে। অবিভক্ত বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তরুণ কর্মীরা সিলেটে আসেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন তরুণ শেখ মুজিবুর রহমান, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, শাহ আজিজুর রহমানসহ আরও অনেকে। তখন তাঁরা কেউ ইতিহাসের বড় চরিত্র নন। তাঁরা ছিলেন গণভোটের কর্মী।
আবদুল গফুর লিখেছেন, তাঁদের দায়িত্ব ছিল শুধু প্রচারণা চালানো নয়, মুসলিম লীগ কর্মী ও সমর্থকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও। কোথাও হামলার খবর এলেই তাঁরা ছুটে যেতেন। অন্যদিকে আবুল মাল আবদুল মুহিত স্মরণ করেছেন সেইসব নারীদের, যাঁদের নাম ইতিহাসে প্রায় নেই, অথচ যাঁরা গণভোটের সাংগঠনিক কাজে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছিলেন। বাইরে থেকে আসা কর্মীদের থাকা, খাওয়া, যোগাযোগ, প্রচারণা, সবকিছুর পেছনে তাঁদের নিরলস পরিশ্রম ছিল।
অবশেষে আসে ৬ ও ৭ জুলাই।
কিন্তু ইতিহাসের ট্র্যাজেডি এখানেই শেষ হয়নি। র্যাডক্লিফ সীমান্ত কমিশন করিমগঞ্জ মহকুমার বড় অংশ ভারতকে দিয়ে দেয়। অর্থাৎ জনগণ একটি রায় দিয়েছিল, কিন্তু সেই রায়ের ভৌগোলিক বাস্তবায়ন সম্পূর্ণ হয়নি। কয়েকটি এলাকায় পাকিস্তানের পতাকা উঠেছিল, কয়েক দিনের মধ্যেই তা নামিয়ে ভারতের পতাকা তোলা হয়। এক রাতের মধ্যে বদলে যায় মানুষের নাগরিকত্ব, মানচিত্র আর ভবিষ্যৎ।
এই কারণেই সিলেট গণভোট শুধু বিজয়ের ইতিহাস নয়; এটি অসম্পূর্ণ বিজয়ের ইতিহাসও।
আজ প্রায় আট দশক পরে ফিরে তাকালে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আর পাকিস্তান বা ভারত নয়। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো — আমরা কি ১৯৪৭ সালের মানুষকে তাঁদের নিজের সময়ের ভেতর থেকে বোঝার চেষ্টা করছি, নাকি ২০২৬ সালের রাজনীতি দিয়ে তাঁদের বিচার করছি?
সিলেটের মানুষ যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তার সঙ্গে একমত হওয়া বা না হওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। কিন্তু কেন তাঁরা সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সেই প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
কারণ ইতিহাসকে ভুলে যাওয়া সহজ। কিন্তু ইতিহাসকে সরল করে ফেলা আরও বিপজ্জনক। সিলেট গণভোট দিবস আমাদের সেই সতর্কবার্তাই মনে করিয়ে দেয়।







Comments