সুদের অর্থনৈতিক কুফল ও মুক্তির ব্লুপ্রিন্ট

অর্থনৈতিক লেনদেনের ইতিহাসে সুদ একটি প্রাচীন ও বিতর্কিত ধারণা। আধুনিক পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় সুদকে চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, এর নৈতিক ও অর্থনৈতিক কুফল নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে আলোচনা ও সমালোচনা চলে আসছে। বিশেষত ইসলামে সুদকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ (হারাম) করা হয়েছে এবং সুদভিত্তিক লেনদেনের মারাত্মক পরিণতির বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। সুদের চর্চা মানবসভ্যতার ইতিহাসের মতোই প্রাচীন একটি বিষয়। এর বিবর্তনের সাথে জড়িয়ে আছে বিভিন্ন ধর্মীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট। এই প্রবন্ধে সুদের অর্থনৈতিক কুফলগুলো বিশ্লেষণ এবং একটি সুদবিহীন অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উপায় নিয়ে আলোচনা করা হবে, পাশাপাশি এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও তুলে ধরা হবে।
সুদের সংজ্ঞা ও ইতিহাস
সাধারণ অর্থে, ঋণ হিসেবে প্রদত্ত মূলধনের উপর পূর্বনির্ধারিত হারে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করাকে সুদ বলে। অর্থাৎ, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অর্থ ব্যবহারের বিনিময়ে ঋণের মূল আসলের উপর যে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করতে হয়, সেটিই সুদ। ইসলামি পরিভাষায় একে ‘রিবা’ বলা হয়, যার আক্ষরিক অর্থ বৃদ্ধি বা অতিরিক্ত। ইসলামে যেকোনো ধরনের সুদই নিষিদ্ধ, তা কম হোক বা বেশি।[1]
সুদের ধারণা বা চর্চা নতুন কিছু নয়। এর শেকড় পাওয়া যায় প্রাচীন মেসোপটেমিয়া সভ্যতায়। সেখানে খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দেও শস্য বা রৌপ্য ঋণের উপর সুদ আদায়ের প্রমাণ মেলে।[2] প্রাচীন গ্রীস ও রোমেও সুদের প্রচলন ছিল, যদিও দার্শনিক এরিস্টটল মনে করতেন টাকা নিজেকে নিজে বৃদ্ধি করতে পারে না, তাই টাকার উপর সুদ নেওয়া প্রকৃতিবিরুদ্ধ।[3] ইয়াহুদি, খ্রিস্টান ধর্মের প্রাথমিক পর্যায়ে সুদকে বিভিন্ন মাত্রায় নিরুৎসাহিত বা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।[4]
মধ্যযুগীয় ইউরোপে খ্রিস্টান চার্চ নিজেদের মধ্যে সুদ গ্রহণকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছিল।[5] এই ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞার কারণে এবং অনেক ক্ষেত্রে ইয়াহুদিদের ভূমি মালিকানা ও অন্যান্য পেশা থেকে বঞ্চিত করার ফলে, কিছু ইয়াহুদি সম্প্রদায় টাকা ধার দেওয়ার পেশায় নিয়োজিত হয়। তাদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাতে ইয়াহুদিদের নিজেদের মধ্যে সুদ গ্রহণ নিষিদ্ধ হলেও, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের থেকে সুদ গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা ছিল না (যদিও এ নিয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে)। এই ঐতিহাসিক, সামাজিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপটের কারণে মধ্যযুগে ইউরোপের কিছু অংশে অর্থলগ্নীকারী হিসেবে ইয়াহুদিদের দেখা যায়।[6] এই ঐতিহাসিক সংশ্লিষ্টতা থেকেই “সুদখোর ইয়াহুদি” ধারণাটি উদ্ভূত হয়েছে। যদিও অর্থলগ্নীর ব্যবসা ইতিহাসে বিভিন্ন সম্প্রদায় ও গোষ্ঠী বিভিন্ন সময়ে করেছে এবং আজ মুসলিমদের ভেতরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয় মধ্যযুগে, বিশেষ করে ইতালির ভেনিস, ফ্লোরেন্স ও জেনোয়ার মতো বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোতে। ব্যবসায়ীরা অর্থ জমা রাখা, স্থানান্তর এবং বিনিময়ের জন্য বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করতেন। ‘ব্যাংক’ শব্দটি ইতালীয় ‘ব্যাংকো’ (Banco) থেকে এসেছে, যার অর্থ বেঞ্চ বা টেবিল, যেখানে বসে সেসময়ের অর্থ লেনদেনকারীরা কাজ করত।[7] রেনেসাঁ যুগে মেদিচি পরিবারের মতো প্রভাবশালী পরিবারগুলো ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।[8] পরবর্তীতে, বিনিময় বিল (Bill of Exchange), জমা রশিদ এবং আংশিক রিজার্ভ ব্যাংকিং (Fractional Reserve Banking) ধারণার বিকাশ ঘটে।[9] ১৬০৯ সালে ব্যাংক অব আমস্টারডাম এবং ১৬৯৪ সালে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আধুনিক কেন্দ্রীয় ও বাণিজ্যিক ব্যাংকিংয়ের ভিত্তি স্থাপিত হয়।[10] সময়ের সাথে সাথে, শিল্প বিপ্লব ও পুঁজিবাদের বিকাশের ফলে ঋণের চাহিদা বাড়তে থাকে এবং সুদভিত্তিক লেনদেন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। ব্যাংকগুলো আমানত গ্রহণ ও ঋণ প্রদানের মাধ্যমে অর্থনীতিতে অর্থের যোগান নিয়ন্ত্রণ করে এবং সুদই তাদের মুনাফা অর্জন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে।[11]
সুদের অর্থনৈতিক কুফল
সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থা কেবল কিছু অর্থনৈতিক সমস্যাই তৈরি করে না, বরং এটি একটি পদ্ধতিগত শোষণযন্ত্র। সুদকে আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিক মনে হলেও এর গভীরে রয়েছে মারাত্মক কুফল ও এক ধরনের প্রবঞ্চনা। এর প্রধান কুফলগুলো নিম্নরূপ:
১. বৈষম্যের বিষবৃক্ষ: সুদ হলো সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টির প্রধান হাতিয়ার। এটি এমন এক ব্যবস্থা যেখানে পুঁজির মালিক কোনো প্রকার ঝুঁকি বা শ্রম ছাড়াই, নিছক টাকা ধার দিয়েই ক্রমাগত আয় করতে থাকে। এর মাধ্যমে টাকাপয়সা চুম্বকের মতো ধনীদের হাতে জমা হতে থাকে। অন্যদিকে, ঋণগ্রহীতাকে তার শ্রম, ঘাম ও মেধা দিয়ে অর্জিত মুনাফার একটি বড় অংশ সুদ হিসেবে তুলে দিতে হয়। এখানেই আসল ধোঁকা: যদি ব্যবসায় লাভ হয়, তবে সুদদাতার লাভ তো হচ্ছেই। কিন্তু লোকসান হলে তার সম্পূর্ণ দায়ভার ঋণগ্রহীতার, তবুও তাকে সুদসহ আসল পরিশোধ করতেই হবে! এই অন্যায্য শর্ত গরিবকে আরও নিঃস্ব করে আর ধনীর সম্পদ আরও বৃদ্ধি করে। এতে সম্পদের সুষম বণ্টন অসম্ভব করে হয়ে যায় এবং সমাজে হিংসা ও অস্থিরতা বাড়ে।[12]
২. টাকার মূল্যহ্রাস: ব্যাংক যখন সুদে ঋণ দেয়, তখন তারা শূন্য থেকে নতুন অর্থ (Credit) তৈরি করে। এই সৃষ্ট টাকার ওপর আবার সুদ যুক্ত হয়। ফলে বাজারে পণ্যের উৎপাদন না বাড়লেও অর্থের পরিমাণ বেড়ে যায়, যার ফলে প্রতিটি টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। এভাবে নীরবে টাকা ও শ্রম চুরি করছে একটি গোষ্ঠী। আপনার জমানো টাকার মান সুদব্যবস্থার কারণে ক্রমাগত কমে যাচ্ছে। একে এক ধরনের অদৃশ্য কর বললেও ভুল হবে না। সুদের হার বাড়লে উৎপাদন খরচ বাড়ে, ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়, যার চূড়ান্ত শিকার হয় সাধারণ ভোক্তা।[13]
৩. উৎপাদন কমে যাওয়া: সুদের মাধ্যমে পুঁজির মালিক একটি নিশ্চিত ও ঝুঁকিহীন আয়ের প্রলোভন দেখতে পায়। এই প্রলোভনই এক মস্ত বড় ধোঁকা: কেন একজন পুঁজির মালিক নতুন ব্যবসায় বিনিয়োগ করে উৎপাদনের ঝুঁকি নেবে, যদি সে কোনো ঝুঁকি ছাড়াই শুধু টাকা ধার দিয়ে নিশ্চিত আয় করতে পারে? এর ফলে, যে পুঁজি নতুন কারখানা, গবেষণা বা উদ্ভাবনে বিনিয়োগ হয়ে দেশের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারত, তা অনুৎপাদনশীল খাতে অলস বসে থাকে বা ঝুঁকিমুক্ত সুদি আয়ের পেছনে ছোটে। এর ফলে দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে গলা টিপে হত্যা করা হয়।[14]
৪. ঋণের চোরাবালি ও শোষণের নিগড়: সুদভিত্তিক ঋণ একটি চোরাবালির মতো। একবার এতে পা দিলে, চক্রবৃদ্ধি সুদের প্রক্রিয়া ঋণগ্রহীতাকে অতল গহ্বরে টেনে নামায়। অনেক সময় দেখা যায়, মূল ঋণের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি সুদ পরিশোধ করার পরও ঋণ থেকে মুক্তি মেলে না। ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পর্যন্ত এই ঋণের জালে আটকা পড়ে। বিশেষ করে, উন্নয়নশীল দেশগুলো বৈদেশিক ঋণের সুদের নাগপাশে এমনভাবে আবদ্ধ হয় যে তাদের সার্বভৌমত্ব পর্যন্ত হুমকির মুখে পড়ে।[15] ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতারা উচ্চ সুদের চাপে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়। এটি সাহায্যের নামে শোষণ ছাড়া আর কিছুই নয়। এই ‘সাহায্য’ এক নির্মম পরিহাস।[16]
৫. অর্থনৈতিক অস্থিরতার চক্র: সুদভিত্তিক ব্যবস্থা অর্থনীতিতে কৃত্রিম উন্নতি (Boom) এবং ভয়াবহ মন্দার (Bust) চক্র তৈরি করে। সুদের হার কমিয়ে বাজারে ঋণের প্রবাহ বাড়ানো হয়, যা শেয়ারবাজার বা আবাসন খাতে কৃত্রিম বুদ্বুদ (bubble) তৈরি করে। মনে হয় অর্থনীতি খুব ভালো চলছে। কিন্তু এই ভালো থাকাটাও একটা বিভ্রম: কারণ এই সমৃদ্ধি বাস্তব উৎপাদনের উপর ভিত্তি করে নয়, বরং ঋণের উপর নির্ভরশীল। যখন সুদের হার বাড়ে বা ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতা দেখা দেয়, তখন এই বুদ্বুদ ফেটে যায় এবং ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট নেমে আসে। ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দা সুদভিত্তিক অর্থনীতির ভয়াবহ পরিণতির একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।[17]
৬. বেকারত্ব: যখন পুঁজি উৎপাদনশীল খাতের বদলে সুদভিত্তিক (Speculation) বা অনুৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত হয় (যেমনটি ৩ নং পয়েন্টে বলা হয়েছে), তখন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হয়। কলকারখানা গড়ে ওঠে না, ব্যবসার প্রসার ঘটে না। ফলে শিক্ষিত ও অশিক্ষিত বেকারত্বের হার বাড়ে। অর্থনীতিতে হয়তো জিডিপি’র কিছু বৃদ্ধি দেখা যায়, কিন্তু সাধারণ মানুষ তার সুফল পায় না, কর্ম পায় না।[18]
৭. নৈতিকতার অবসান: সুদভিত্তিক ব্যবস্থা মানুষের ভেতর থেকে সহানুভূতি, সহযোগিতা ও সহমর্মিতার মতো গুণগুলো নষ্ট করে দেয়। সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থায় শেখানো হয়, কীভাবে অন্যের প্রয়োজন বা বিপদকে ব্যবহার করে মুনাফা অর্জন করা যায়। শ্রম ও উৎপাদনের মাধ্যমে আয় করার চেয়ে বসে বসে অন্যের অসহায়ত্ব থেকে আয় করার মানসিকতা তৈরি হয়। এই ব্যবস্থা মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক ও চরম স্বার্থপর করে তোলে। এতে একটি সুস্থ সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে ধ্বংস হয়ে যায়। পারস্পরিক বিশ্বাস ও সহযোগিতার বদলে সন্দেহ ও শোষণের সম্পর্ক তৈরি হয়।[19]
সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থা থেকে মুক্তির ব্লুপ্রিন্ট
সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থা এমন এক কাঠামো তৈরি করে যার ফলে বৈষম্য বাড়ে, শোষণকে উস্কে দেওয়া হয় এবং অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল হয়ে যায়। এটি সমাজের স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। এর বিপরীতে, ইসলাম একটি সুদবিহীন অর্থনীতির ধারণা দিয়েছে। যে অর্থনীতি ন্যায়পরায়ণতা, অংশীদারিত্ব, সামাজিক কল্যাণ এবং বিনিয়োগে ঝুঁকির বাস্তবসম্মত শেয়ারের উপর প্রতিষ্ঠিত এক মানবিক ব্যবস্থা। কিন্তু এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো রাতারাতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া, যার জন্য প্রয়োজন গবেষণা, ধাপে ধাপে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, উপযুক্ত আইনগত ভিত্তি, শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, ব্যাপক জনসচেতনতা এবং একটি সুস্পষ্ট, সময়াবদ্ধ রূপরেখা বা ব্লুপ্রিন্ট।
এই যাত্রার প্রথম এবং সবচেয়ে জরুরি ধাপ হলো ভিত্তি স্থাপন করা। এর জন্য প্রথমেই সুদকে পরিষ্কারভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে – কোন কোন লেনদেন সুদের আওতায় পড়বে, তা নির্দিষ্ট করে একটি পূর্ণাঙ্গ আইন তৈরি করা জরুরি। সুদবিহীন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য হয় নতুন আইন লাগবে, নয়তো বিদ্যমান আইনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে একটি স্বাধীন ও কার্যকর শরিয়া বোর্ড গঠন করতে হবে, যা সুদবিহীন আর্থিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করবে। পাশাপাশি, মুদারাবা (মূলধন ও শ্রমের অংশীদারিত্ব), মুশারাকা (যৌথ অংশীদারিত্ব), ইজারা (ভাড়া), সালাম (অগ্রিম ক্রয়) এর মতো চুক্তিগুলোর আইনগত বৈধতা ও প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এই পর্যায়ে কয়েকটি পাইলট প্রকল্প হাতে নিয়ে সুদবিহীন মডেলগুলোর কার্যকারিতা বাস্তবে পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে।
প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা তৈরির অংশ হিসেবে, কয়েকটি নতুন সুদবিহীন আর্থিক প্রতিষ্ঠান চালু করার পাশাপাশি প্রচলিত ব্যাংকগুলোকেও ‘ইসলামি উইন্ডো’ খোলার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে, যাতে তারা অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে। এই ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ। তাই বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে শরিয়া-ভিত্তিক অর্থনীতি ও ব্যাংকিং বিষয়ে বিশেষায়িত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা অপরিহার্য।
জনসচেতনতা বৃদ্ধি এই রূপান্তরের একটি মূল ভিত্তি। গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে সুদের ক্ষতিকর প্রভাব এবং সুদবিহীন ব্যবস্থার সুফল সম্পর্কে মানুষকে সহজভাবে জানাতে হবে। একইসাথে, জাকাত ও ওয়াকফ ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। এর মাধ্যমে দরিদ্র ও অভাবী মানুষদের সুদবিহীন ঋণ (করজে হাসানা) প্রদান করে মহাজনি সুদের চক্র থেকে বেরিয়ে আসার বিকল্প পথ তৈরি করতে হবে।
দ্বিতীয় ধাপে আসবে ধীরে ধীরে মূল পরিবর্তনের পালা। প্রথম ধাপের পাইলট প্রকল্পগুলোর সাফল্য মূল্যায়ন করে সেগুলোর পরিধি বাড়াতে হবে। সরকার যদি তার অভ্যন্তরীণ ঋণের চাহিদা মেটাতে পুরোপুরি সুকুক (ইসলামি বন্ড) ব্যবহার শুরু করে, তবে তা হবে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। একইভাবে কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং আবাসন খাতে প্রচলিত সুদভিত্তিক ঋণের বদলে মুশারাকা, ইজারা বা অন্যান্য শরিয়াসম্মত অর্থায়ন পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও সুদের হারকে মুদ্রানীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করে লাভ-লোকসান ভাগাভাগির অনুপাত বা সম্পদ-ভিত্তিক লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের মতো বিকল্প পদ্ধতি প্রয়োগ শুরু করতে পারে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও পদক্ষেপ নিতে হবে। বিদেশের সাথে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মুরাবাহা (লাভে বিক্রি), ওয়াকালা (প্রতিনিধিত্ব) ইত্যাদি সুদবিহীন পদ্ধতি ব্যবহারের উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যান্য দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে সুদবিহীন আর্থিক সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করাও জরুরি। এই পুরো পর্যায়ে নিয়মিত গবেষণা চালিয়ে যেতে হবে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে মানানসই নতুন আর্থিক পণ্য ও সেবা উদ্ভাবন করে সুদবিহীন ব্যবস্থাকে আরও সমৃদ্ধ ও কার্যকর করতে হবে।
সবশেষে, তৃতীয় ধাপে দেশের পুরো আর্থিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে সুদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করা হবে। এই পর্যায়ে আইনগতভাবে সব ধরনের সুদ নিষিদ্ধ ঘোষিত হবে এবং এর চর্চা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হবে। ব্যাংক ব্যবস্থা, জাতীয় বাজেট প্রণয়ন, মুদ্রানীতি নির্ধারণ থেকে শুরু করে সকল উন্নয়ন পরিকল্পনা—সবকিছুই পরিচালিত হবে সুদবিহীন অর্থনীতির মূলনীতির উপর ভিত্তি করে। জাকাত, উশর (ফসলের জাকাত), ওয়াকফ ইত্যাদি ইসলামি অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোকে জাতীয় অর্থনীতির মূলধারায় সম্পৃক্ত করে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য একটি শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে হবে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করা, যাতে সুদবিহীন ব্যবস্থার নামে কোনো নতুন শোষণ বা অনিয়মের সুযোগ তৈরি না হয়। কেবল রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণই যথেষ্ট নয়, সামাজিক ও ব্যক্তিগত পর্যায়েও নৈতিকতার চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। এই সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই বাংলাদেশ একদিন বিশ্বের বুকে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও কার্যকর সুদবিহীন অর্থনীতির রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারবে ইনশাআল্লাহ।
তথ্যসূত্র
[1] Siddiqi, M. N. (2004). Riba, bank interest and the rationale of its prohibition. Islamic Research and Training Institute.
[2] Homer, S., & Sylla, R. E. (2005). A history of interest rates (4th ed.). Wiley Finance.
[3] Aristotle. (1984). The Politics (C. Lord, Trans.). University of Chicago Press.
[4] Noonan, J. T., Jr. (1957). The scholastic analysis of usury. Harvard University Press.
[5] Le Goff, J. (1988). Your money or your life: Economy and religion in the Middle Ages. Zone Books.
[6] Chazan, R. (2006). The Jews of Medieval Western Christendom: 1000-1500. Cambridge University Press.
[7] Kindleberger, C. P. (1993). A financial history of Western Europe. Oxford University Press.
[8] De Roover, R. (1966). The rise and decline of the Medici Bank: 1397-1494. W. W. Norton & Company.
[9] Usher, A. P. (1943). The early history of deposit banking in Mediterranean Europe. Harvard University Press.
[10] Quinn, S., & Roberds, W. (2005). The big problem of large bills: The Bank of Amsterdam and the origins of central banking. Federal Reserve Bank of Atlanta Working Paper, 2005-16.
[11] Cameron, R., & Neal, L. (2016). A concise economic history of the world: From Paleolithic times to the present (5th ed.). Oxford University Press.
[12] Chapra, M. U. (2000). Why has Islam prohibited interest? Rationale behind the prohibition of Riba. Review of Islamic Economics, 9, 5-20.
[13] Huber, J., & Robertson, J. (2000). Creating new money: A monetary reform for the information age. New Economics Foundation.
[14] Chapra, M. U. (1992). Islam and the economic challenge. The Islamic Foundation & The International Institute of Islamic Thought. (Chapter on Resource Allocation).
[15] Toussaint, É. (2019). The Debt System: A History of Sovereign Debts and their Repudiation. Haymarket Books.
[16] Rahman, A. (1999). Micro-credit initiatives for equitable and sustainable development: Who pays? World Development, 27(1), 67-82.
[17] Minsky, H. P. (1986). Stabilizing an unstable economy. Yale University Press.
[18] Chapra, M. U. (1992). Islam and the economic challenge. The Islamic Foundation & The International Institute of Islamic Thought.
[19] Naqvi, S. N. H. (1994). Islam, economics, and society. Kegan Paul International.







Comments