রিবা, ইনসাফ ও রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার || বাংলাদেশের ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটের একটি ফিকহি-নীতিগত মূল্যায়ন

নির্বাহী সারসংক্ষেপ
রাষ্ট্রীয় বাজেট মূলত একটি রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের দলিল। যে খাতে সরকার সবচেয়ে বেশি অর্থ বরাদ্দ দেয়, সেই খাতটিই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মনোযোগ পায়। এই সাধারণ সমীকরণের ওপর ভিত্তি করেই বক্ষ্যমাণ বাজেট বিশ্লেষণটি শুরু হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে সরকারের মূল আয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি জিডিপির প্রায় ৩.৬ শতাংশ হলেও মোট বাজেটের প্রায় ২৫ শতাংশের কাছাকাছি।
শরিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করলে বিদ্যমান বাজেট কাঠামোতে কয়েকটি মৌলিক সংকট ফুটে ওঠে। সবচেয়ে বড় সংকট হলো, বাজেটের মূল কাঠামোতেই রিবা বা সুদ ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে। মোট ব্যয়ের ১৩.৬ শতাংশ চলে যায় সুদ পরিশোধে। অন্যদিকে বাজেট ঘাটতির ৮৬ থেকে ৯০ শতাংশই পূরণ করা হয় সুদভিত্তিক ঋণের মাধ্যমে। ফলে রাষ্ট্র ঋণ ও সুদের এক দুষ্টচক্রে আটকে যাচ্ছে।
রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রেও ইনসাফের স্পষ্ট অভাব পরিলক্ষিত হয়। মোট আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে কর খাত থেকে। এর একটি বড় অংশই হলো পরোক্ষ কর, যা সমাজের নিম্নবিত্ত ও সাধারণ মানুষের ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করে। এর পাশাপাশি দুর্নীতি ও অর্থপাচারের কারণে রাষ্ট্রীয় সম্পদের যে ব্যাপক ক্ষরণ ঘটছে, তার পরিমাণ অনেক ক্ষেত্রেই মোট বাজেট ঘাটতিকেও ছাড়িয়ে যায়।
এই সংকটগুলো উত্তরণের লক্ষ্যে প্রবন্ধে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রিবামুক্ত অর্থায়নে উত্তরণ ও মাকাসিদে শরিয়ার আলোকে বরাদ্দের পুনর্বিন্যাস। একইসাথে বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় ফিকহুল মুআমালাতে পারদর্শী ফকিহদের অন্তর্ভুক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
১. প্রেক্ষাপট ও আলোচনার প্রাসঙ্গিকতা
দীনি শিক্ষার পরিসরে রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থা নিয়ে আলোচনাকে অনেকেই বাহুল্য মনে করতে পারেন। কিন্তু এই ধারণাটি সঠিক নয়। ফিকহ বা ‘তাফাক্কুহ ফিদ-দীন’ অধ্যয়নের সাথে সতর্ক করার সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে। ফিকহ চর্চার মূল উদ্দেশ্যই হলো মানুষকে সতর্ক করা। তাই যে বিষয়টি সমগ্র জাতির হালাল ও হারামের সাথে সরাসরি যুক্ত, ফিকহি দৃষ্টিকোণ থেকে তার বিশ্লেষণ করা অপরিহার্য।
১.১ বাজেটের মৌলিক ধারণা
ব্যক্তিপর্যায়ে আমাদের প্রত্যেকেরই একটি নিজস্ব বাজেট থাকে। একজন মাদরাসার শিক্ষার্থীর পকেটে পরিবার বা অন্য কোনো উৎস থেকে অর্থ আসে। এর বিপরীতে তার মাদরাসার বেতন, খাবার বা মোবাইল বিলের মতো খরচ থাকে। আয় ও ব্যয়ের এই প্রাক্কলন বা হিসাবটিই হলো বাজেট। এটি কখনোই চূড়ান্ত কোনো অঙ্ক নয়। প্রত্যাশিত পাঁচ হাজার টাকার আয় মাস শেষে চার হাজার টাকা হতে পারে। আবার তিন হাজার টাকার হিসাব করা ব্যয় বেড়ে চার হাজার টাকা হয়ে যেতে পারে। বাজেট মূলত একটি আর্থিক পরিকল্পনা।
আর্থিক পরিকল্পনার এই চমৎকার নজির কুরআনেও বিদ্যমান। ইউসুফ আলাইহিস সালাম যখন মিসরের রাজার কাছে দেশের অর্থভান্ডারের দায়িত্ব চাইলেন, তখন তিনি মূলত একটি সুস্পষ্ট বাজেট পরিকল্পনারই প্রস্তাব করছিলেন। তাঁর পরিকল্পনাটি ছিল সাত বছরের প্রাচুর্যের সময় অপচয় রোধ করে ফসল সঞ্চয় করা, যেন পরবর্তী দুর্ভিক্ষের বছরগুলোতে তা যথাযথভাবে কাজে লাগানো যায়।
১.২ রাষ্ট্রীয় বাজেটের স্বাতন্ত্র্য
ব্যক্তিগত বাজেট অনেক ক্ষেত্রেই কেবল কিছু সংখ্যার হিসাব। কিন্তু রাষ্ট্রীয় বাজেট হলো একটি দেশের অগ্রাধিকারের দলিল। একজন মানুষ যদি তার হাজার টাকা আয়ের অর্ধেকই নির্দিষ্ট একটি খাতে ব্যয় করেন, তবে তার অগ্রাধিকারের জায়গাটি সহজেই বোঝা যায়। রাষ্ট্রের হিসাবটিও ঠিক এমনই।
এর সাথে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই চলে আসে। এই বিশাল অর্থ কোথা থেকে এল? কিয়ামতের দিন সম্পদ নিয়ে যে দুটি মৌলিক প্রশ্ন করা হবে, তার প্রথমটি হলো সম্পদ কোথা থেকে উপার্জিত হয়েছে এবং দ্বিতীয়টি হলো তা কোথায় ব্যয় করা হয়েছে। আখিরাতের জবাবদিহির এই নীতিটিই মূলত ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে বাজেট বিশ্লেষণের সঠিক পথরেখা তৈরি করে।
২. বর্তমান বাজেটের কাঠামোগত চিত্র
২.১ সামগ্রিক আকার
রাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থনৈতিক শক্তি মাপার জন্য আমরা সাধারণত জিডিপি (গ্রস ডমেস্টিক প্রোডাক্ট) বা মোট দেশজ উৎপাদনের ওপর নির্ভর করি। কিন্তু এই বিশাল অঙ্কটি কখনোই একটি দেশের প্রকৃত অবস্থার পুরোপুরি প্রতিফলন ঘটাতে পারে না। দশ লাখ কোটি টাকার জাতীয় ব্যয়ের ভেতরেও এমন অসংখ্য মানুষ চাপা পড়ে থাকে, যাদের হয়তো রাত কাটে ফুটপাতের চরম অনাহারে। জিডিপির মতো সামষ্টিক সূচকগুলো সমাজের তলানিতে থাকা এই মানুষগুলোর বঞ্চনার কোনো হিসাব রাখে না।
২.২ ব্যয়ের বণ্টন
খাতভিত্তিক বরাদ্দের হিসাব টানলে দেখা যায়, সবচেয়ে বড় অংশটি যাচ্ছে জনপ্রশাসনে। এই খাতের জন্যই বরাদ্দ রাখা হয়েছে মোট বাজেটের ৪৩.১ শতাংশ। এর ঠিক পরেই রয়েছে শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতের অবস্থান।
অন্যদিকে বাজেটের ১৩.৬ শতাংশ অর্থই চলে যাচ্ছে কেবল পুরোনো ঋণের সুদ মেটাতে। টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ প্রায় এক লাখ কোটি। সরকার মূলত বড় বড় সড়ক কিংবা সেতু নির্মাণের মতো উন্নয়নকাজের জন্যই আগে এই বিশাল অঙ্কের ঋণ করেছিল।
২.৩ আয়ের উৎস
সরকারের মোট রাজস্বের সিংহভাগই জোগাড় করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। এর পরিমাণ প্রায় ৮৬ থেকে ৮৭ শতাংশ। বাকি আয়টুকু আসে নন-এনবিআর এবং কর-বহির্ভূত নানা খাত থেকে।
হিসাব করলে দেখা যায়, রাষ্ট্রের মোট আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশই আসে করের মাধ্যমে। আর এর সবচেয়ে বড় অংশটি হলো পরোক্ষ কর। শুধু ভ্যাট থেকেই সরকার আদায় করে ৩২ শতাংশ অর্থ।
এই পরোক্ষ করের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এটি ধনী ও গরিবের মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না। একজন রিকশাচালক যখন তাঁর মুঠোফোনে কথা বলার জন্য টাকা রিচার্জ করেন, তাঁকে যে হারে ভ্যাট দিতে হয়, সমাজের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিটির ক্ষেত্রেও ভ্যাটের হার ঠিক একই। সম্পদের বৈষম্য বিবেচনা না করে সবার ওপর সমান হারে কর চাপিয়ে দেওয়ার এই ব্যবস্থাটি ইনসাফের ধারণার সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক।
২.৪ ঘাটতির অর্থায়ন
অভ্যন্তরীণ ঘাটতি মেটাতে সরকার মূলত দুটি জায়গা থেকে ঋণ নেয়। প্রথমত, দেশীয় ব্যাংকগুলোর কাছে ট্রেজারি বিল ও বন্ড বিক্রি করে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হয়। এর পাশাপাশি রয়েছে সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করা সঞ্চয়পত্র। এই সঞ্চয়পত্রের বিপরীতে সরকার নির্দিষ্ট হারে যে বাড়তি অর্থ দেয়, তাকে অনেক সময় ‘মুনাফা’ বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বাস্তবে এটি আক্ষরিক অর্থেই সুদ।
অন্যদিকে বিদেশি ঋণের বেলায় সরকার বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফ-এর মতো বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর দিকে হাত বাড়ায়। এর বাইরে জাপানসহ আরও কিছু দেশের কাছ থেকেও ঋণ আসে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বিদেশ থেকে আসা এই বিশাল অঙ্কের ঋণের প্রায় পুরোটাই সুদভিত্তিক।
ঋণের বাইরেও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন তহবিল থেকে খুব সামান্য একটি অংশ অনুদান হিসেবে পাওয়া যায়। কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নিঃস্বার্থ সাহায্য বলে আসলে কিছু নেই। ব্যক্তিগত পর্যায়ে হয়তো কেউ কেউ কোনো ফায়দা ছাড়া কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই দান করেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যেকোনো আর্থিক সহায়তার সাথেই অদৃশ্য সুতা বাঁধা থাকে। দাতারা তাদের অর্থের বিনিময়ে এমন সব নীতি চাপিয়ে দেয়, যা অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের সমাজকাঠামো ও ইসলামি মূল্যবোধের মূলে আঘাত করে। উদাহরণস্বরূপ, সাম্প্রতিক সময়ে এলজিবিটি-এর মতো যেসব পশ্চিমা ধারণা আমাদের সমাজে সুকৌশলে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে, তার সবচেয়ে বড় প্রবেশদ্বার হলো এই বিদেশি ঋণ ও অনুদানের শর্তগুলো।
৩. শরিয়াভিত্তিক মূল্যায়ন
৩.১ বায়তুল মালের কাঠামো
ঐতিহাসিকভাবে একটি ইসলামি রাষ্ট্রের আয়ের মূল উৎসগুলো ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। এর মধ্যে ছিল জাকাত, উশর, খারাজ, জিজিয়া এবং গনিমতের খুমুস। এর মধ্যে জাকাত ও উশরের অর্থ কোথায় ব্যয় হবে, তা শরিয়া কর্তৃক নির্ধারিত। তবে রাষ্ট্র চাইলে বায়তুল মালের প্রয়োজনে নির্দিষ্ট কর বা ‘নাওয়াইব’ আরোপ করতে পারত। এমনকি জরুরি প্রয়োজনে ঋণ নেওয়ারও সুযোগ ছিল।
৩.২ রিবার দুষ্টচক্র ও শরিয়ার সীমারেখা
বিদ্যমান বাজেটের দিকে তাকালে শরিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে বড় যে সংকটটি চোখে পড়ে, তা হলো রিবা বা সুদ।
সরকার ঠিক কী ধরনের ফাঁদে আটকে আছে, তার একটি সহজ হিসাব দেওয়া যাক। বাজেটের ১৩.৬ শতাংশ অর্থ চলে যাচ্ছে পুরোনো সুদের ঘানি টানতে। অন্যদিকে ঘাটতি মেটানোর জন্য যে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়া হচ্ছে, তার প্রায় পুরোটাই সুদভিত্তিক। আগামী বছর এই নতুন ঋণের সুদ মেটানোর জন্য সরকারকে আবারও ঋণ করতে হবে। এটি আক্ষরিক অর্থেই এক অন্তহীন দুষ্টচক্র। সুদের এই চক্রে একবার জড়ালে বের হওয়ার কোনো সহজ পথ থাকে না। কুরআনে সুদের কারবারিদের জন্য যে ভয়াবহ ধ্বংসের সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে, তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা মূলত এটাই। কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘকাল এই আত্মঘাতী চক্রের ভেতর টিকে থাকতে পারে না।
৩.৩ মাকাসিদে শরিয়া এবং আমাদের অগ্রাধিকার
রাষ্ট্র কোন খাতে কত টাকা বরাদ্দ দেবে, তার জন্য শরিয়ার একটি সুস্পষ্ট মানদণ্ড রয়েছে। আধুনিক পরিভাষায় একে বলা হয় ‘মাকাসিদে শরিয়া’। যদিও পূর্ববর্তী আলিমরা ভিন্ন ভিন্ন পরিভাষায় এই ধারণার ওপর প্রচুর কাজ করে গেছেন।
ফকিহগণ মানুষের মৌলিক অধিকারকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করেছেন। এগুলো হলো দীন, জীবন, বিবেক, বংশ এবং সম্পদের সুরক্ষা। শরিয়ার মূল অভীষ্টই হলো এই পাঁচটি বিষয়কে যেকোনো মূল্যে হিফাজত করা। এর সাথে মানুষের চাহিদার তিনটি স্তর যুক্ত হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘জরুরিয়াত’ অর্থাৎ অপরিহার্য প্রয়োজন, যেমন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। এরপর আসে ‘হাজিয়াত’ বা জীবনকে সহজ করার উপকরণ, যার আওতায় পড়ে অবকাঠামো বা রাস্তাঘাট। আর সবশেষে থাকে ‘তাহসিনিয়াত’ বা সৌন্দর্যবর্ধক খাত।
আমরা যদি কেবল এই মানদণ্ডটি সামনে রেখে বাজেট সাজাতাম, তবে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের পুরো চিত্রটিই বদলে যেত। তখন বিশাল বিশাল ফ্লাইওভারের চেয়ে মানুষের চিকিৎসায় স্বাস্থ্য খাত অনেক বেশি অগ্রাধিকার পেত। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন জাকাতের যে বিস্তৃত বিধান দিয়েছেন, তার মূল উদ্দেশ্যই হলো সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অথচ বর্তমান বাজেটে দারিদ্র্য বিমোচন ও খাদ্যনিরাপত্তার মতো এত বিশাল ও স্পর্শকাতর একটি খাতে যে সামান্য অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়, তা কোনোভাবেই ইনসাফ বা ন্যায়বিচারের ধারণার সাথে মেলে না।
৩.৪ আমানতের ঘাটতি
একটি শ্বেতপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে প্রায় এক লাখ কোটি টাকারও বেশি অর্থ বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হয়েছে। এবারের বাজেটে আমাদের মোট ঘাটতির পরিমাণ ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ কেবল অর্থপাচারের এই চোরাই পথটি বন্ধ করা গেলে রাষ্ট্রকে এত বিপুল পরিমাণ ঘাটতির বোঝা বইতে হতো না।
এর পাশাপাশি রয়েছে ব্যাংক খাতের সীমাহীন লুটপাট। গত কয়েক বছরে এই খাত থেকে গায়েব হয়ে গেছে প্রায় পৌনে সাত লাখ কোটি টাকা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান কতটা শোচনীয়, তা মাত্র ২৪ স্কোরের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়। গত কয়েক বছর ধরে আমরা এই তলানিতেই আটকে আছি। পরিস্থিতির বিন্দুমাত্র উন্নতি হয়নি।
রাষ্ট্রের এই অবস্থাকে একটি ক্রমাগত রক্তক্ষরণের সাথে তুলনা করা যায়। অর্থনীতিতে এমন একটি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, যেখানে নিচ দিয়ে রাষ্ট্রের সম্পদ অনবরত বেরিয়ে যাচ্ছে আর ওপর দিয়ে তার ক্ষতিপূরণ আদায়ের চেষ্টা চলছে। এই প্রাতিষ্ঠানিক ছিদ্রগুলো বন্ধ না করে কেবল নতুন নতুন কর চাপিয়ে সাধারণ মানুষকে নিংড়ে নেওয়ার কোনো অর্থ হয় না।
বাজেটে এত বিশাল ঘাটতি থাকার মূল কারণ কেবল ব্যয়ের আধিক্য নয়, বরং উন্নয়ন প্রকল্প ঘিরে গড়ে ওঠা দুর্নীতির সিন্ডিকেট। দুই টাকার একটি সাধারণ কাজ দশ টাকায় করতে গিয়ে রাষ্ট্রের বাকি আট টাকা গুটিকয়েক প্রভাবশালীর পকেটে চলে যাচ্ছে। সামষ্টিক অর্থনীতির দোহাই দিয়ে ‘আরও আয় করতে হবে’ বলে জনগণের পকেট কাটার এই নীতি কোনোভাবেই টেকসই হতে পারে না।
এই লাগামহীন দুর্নীতি শরিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে অগ্রহণযোগ্য তো বটেই, এটি মানুষের সাধারণ নৈতিক বোধের কাছেও চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। রাতারাতি হয়তো দুর্নীতির সূচকে জাদুকরী কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। কিন্তু ধারাবাহিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার মাধ্যমে ধাপে ধাপে অবস্থার উন্নতি করা মোটেও অসম্ভব কোনো কাজ ছিল না। রাষ্ট্রের সম্পদ কীভাবে এবং কাদের হাত ধরে লুণ্ঠিত হচ্ছে, তা নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সবারই জানা।
৩.৫ করব্যবস্থা ও ইনসাফের প্রশ্ন
আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্রের আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস হলো কর। সাধারণ আয়কর ব্যবস্থায় একটি নির্দিষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করা থাকে। যার আয় এই সীমার নিচে, তাকে কর দিতে হয় না। কেবল এই সীমার ওপরের আয়ের জন্যই করের বিধান রাখা হয়।
ইসলামের ইতিহাসেও রাষ্ট্রের একান্ত প্রয়োজনে কর বা অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহের নজির রয়েছে। তবে সেই করের ভার সর্বদা সমাজের প্রকৃত বিত্তবানদের ওপরই ন্যস্ত করা হতো। অথচ আমাদের বর্তমান করকাঠামোর বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে ধনীদের চেয়ে সমাজের প্রান্তিক ও সাধারণ মানুষের ওপরই জবরদস্তিমূলক অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করা হচ্ছে। ভ্যাট এবং নানা ধরনের পরোক্ষ করের যাঁতাকলে মূলত নিম্নবিত্তরাই পিষ্ট হচ্ছেন।
রাষ্ট্রীয় এই নীতির ভেতরেই সামাজিক অবিচারের সবচেয়ে বড় রূপটি লুকায়িত। রাষ্ট্র একদিকে পরোক্ষ করের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের পকেট থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বের করে নিচ্ছে। অন্যদিকে সামাজিক নিরাপত্তার নামে সামান্য কিছু ভাতা ফিরিয়ে দিয়ে এমন এক বয়ান তৈরি করছে, যেন সাধারণ মানুষের প্রতি চরম বদান্যতা দেখানো হচ্ছে।
এই কাঠামোগত বঞ্চনা কখনোই প্রকৃত অর্থে সাধারণ মানুষের উপকারে আসে না। এটি মূলত সমাজের সম্পদকে গুটিকয়েক প্রভাবশালীর হাতে পুঞ্জীভূত করার একটি মোক্ষম হাতিয়ার। বিত্তবানদের হাতে সম্পদের এই একচেটিয়া কেন্দ্রীকরণ সাধারণ ন্যায়বিচারের পরিপন্থি তো বটেই, এটি কুরআনের সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক নির্দেশনারও সরাসরি লঙ্ঘন।
৪. নীতিগত সুপারিশ
সুপারিশ ১: রিবা থেকে পরিকল্পিত উত্তরণ
রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে রাতারাতি সুদের মূলোৎপাটন করা সম্ভব নয়। কারণ, সরকার ইতিমধ্যেই দেশি ও বিদেশি ঋণের বিশাল বোঝায় আটকে আছে। তবে এই দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট পথনকশা থাকা জরুরি:
- আগামী বাজেটগুলোতে অন্তত নতুন করে সুদভিত্তিক ঋণ নেওয়া বন্ধ করতে হবে। রাষ্ট্রের আয় যতটুকু, ব্যয়কে ঠিক ততটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার নীতি গ্রহণ করা অপরিহার্য।
- যেসব ঋণের বিপরীতে রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট সম্পদ বা অ্যাসেট রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে ঋণদাতাদের সাথে নতুন করে চুক্তির শর্ত নিয়ে দরকষাকষি করা যেতে পারে।
- অর্থ মন্ত্রণালয়কে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাগুলোর সাথে আলোচনার সময় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ইসলামি অর্থায়নের দাবি তুলতে হবে। রাষ্ট্রকে পরিষ্কার করতে হবে যে, উন্নয়নকাজের জন্য অর্থের প্রয়োজন থাকলেও তা অবশ্যই শরিয়াহসম্মত ও হালাল উপায়ে আসতে হবে।
এই পদক্ষেপগুলোর মাধ্যমে হয়তো রাতারাতি সব বাজেট ঘাটতি মুছে যাবে না, তবে এর মধ্য দিয়ে সুদের ধ্বংসাত্মক চক্র থেকে বের হওয়ার একটি বাস্তবসম্মত সূচনা অন্তত করা যাবে।
সুপারিশ ২: মাকাসিদে শরিয়ার আলোকে বরাদ্দের অগ্রাধিকার নির্ধারণ
রাষ্ট্রীয় সম্পদের বণ্টনকাঠামোটি মাকাসিদে শরিয়ার আলোকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। অপরিহার্য প্রয়োজন, জীবনকে সহজ করার উপকরণ এবং সৌন্দর্যবর্ধক খাত; মূলত এই তিন স্তরের মানদণ্ডে প্রতিটি বরাদ্দকে নতুন করে মূল্যায়ন করতে হবে।
বর্তমানে স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল খাতগুলোতে যে সামান্য পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা একেবারেই অপ্রতুল। এই খাতগুলোতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াতে হবে। একইসাথে ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় আমাদের প্রতিরক্ষা বাজেটের দিকেও মনোযোগ দেওয়া জরুরি। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের সামরিক সক্ষমতায় যে ঘাটতি রয়েছে, তা পূরণে কৌশলগত বরাদ্দ বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি।
সুপারিশ ৩: দুর্নীতি ও অর্থপাচার প্রতিরোধ
দেশ থেকে পাচার হয়ে যাওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ যদি ঠেকানো যায়, তবে বাজেটের এই বিশাল ঘাটতির একটা বড় অংশ এমনিতেই পূরণ হয়ে যায়। দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান রাতারাতি হয়তো প্রথম সারিতে নেওয়া সম্ভব নয়। তবে কঠোর জবাবদিহির মাধ্যমে এই অবস্থান ধাপে ধাপে উন্নত করা মোটেও অবাস্তব কোনো কল্পনা নয়। দুর্নীতির এই কাঠামোগত ছিদ্রগুলো বন্ধ না করে সাধারণ মানুষের ওপর নতুন করে রাজস্বের বোঝা চাপানোর কোনো অর্থনৈতিক বা নৈতিক যৌক্তিকতা থাকতে পারে না।
সুপারিশ ৪: জাকাত, ওয়াকফ ও ইসলামি অর্থায়নের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ
শরিয়াতে জাকাত, ওয়াকফ এবং বিভিন্ন ইসলামি অর্থায়ন পদ্ধতি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। এগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা করা গেলে:
- সুদভিত্তিক বাজেটের প্রভাব হ্রাস পাবে
- সরকারের জন্য নতুন আয়ের পথ উন্মুক্ত হবে
- সামাজিক নিরাপত্তা (৬.৭%), কৃষি (৫%), স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের একটি অংশ জাকাত ও ওয়াকফের মাধ্যমেই পূরণ করা সম্ভব হবে
অর্থনীতিবিদদের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক নিরাপত্তার বরাদ্দ যদি ইনসাফপূর্ণভাবে বণ্টন করা যায় এবং দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা হয়, তবে বাজেটের ঘাটতি অবিশ্বাস্যভাবে কমে আসে। তখন প্রতিবছর নতুন করে সুদভিত্তিক ঋণ নেওয়ার বা পুরোনো ঋণের বিশাল সুদ টানার আর কোনো প্রয়োজনই পড়বে না।
সুপারিশ ৫: বাজেট প্রণয়নে ফকিহদের অন্তর্ভুক্তি
জাতীয় বাজেট প্রণয়নের মতো স্পর্শকাতর প্রক্রিয়ায় ‘ফিকহুল মুআমালাত’ বিষয়ে পারদর্শী আলিম ও ফকিহদের সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এটি নিছক কোনো আনুষ্ঠানিকতা বা লোকদেখানো বিষয় নয়। রাষ্ট্রীয় আয় ও ব্যয়ের প্রতিটি খাত হালাল নাকি হারাম, তা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে নিরূপণ করার জন্য এই বিশেষায়িত জ্ঞানের কোনো বিকল্প নেই।
৫. উপসংহার
শরিয়ার মানদণ্ডে বর্তমান বাজেট কাঠামোকে পর্যালোচনা করলে এর একটি আমূল সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা বোঝা যায়।
শুরুতেই আসে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অগ্রাধিকারের প্রশ্ন। অনুৎপাদনশীল বা কম গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে বছরের পর বছর ধরে যে বিপুল অর্থ ঢালা হচ্ছে, তা কমিয়ে জনস্বাস্থ্য এবং জাতীয় প্রতিরক্ষার মতো স্পর্শকাতর জায়গাগুলোতে কৌশলগত বিনিয়োগ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
এর পরই আসে সুদের প্রসঙ্গ। আমাদের বর্তমান অর্থনীতির ধমনিতে সুদ এমনভাবে মিশে গেছে যে, আয় ও ব্যয়ের উভয় দিক থেকেই রাষ্ট্র এক ভয়াবহ ফাঁদে আটকে আছে। এ বছর বাজেটের ১৩ শতাংশ যাচ্ছে সুদের পেছনে। আগামী বছর এই অঙ্কটি স্বাভাবিকভাবেই আরও স্ফীত হবে। সুদের এই চক্র ছিন্ন করতে না পারলে জাতীয় অর্থনীতিতে প্রকৃত কোনো কল্যাণ বা বরকত আশা করা অমূলক।
করকাঠামোর অবিচার দূর করাও ঠিক সমানভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান ব্যবস্থায় দরিদ্র মানুষের পকেট কেটে সেই অর্থ ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে মূলত ধনীদের সুবিধার্থেই ব্যবহার করা হচ্ছে। মাঝখান থেকে সামাজিক নিরাপত্তার নামে গরিবকে অতি সামান্য কিছু অর্থ ফিরিয়ে দিয়ে একধরনের প্রতারণামূলক বয়ান তৈরি করা হয়েছে।
অর্থনীতির এই গভীর কাঠামোগত সংকটগুলো থেকে উত্তরণের মূল উপায় হলো বাজেট বিশ্লেষণ ও নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় ফিকহ বিশেষজ্ঞদের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। জাতীয় বাজেটের মতো সংবেদনশীল জায়গায় কেবল অর্থনীতির গাণিতিক হিসাব কষলেই চলে না, সেখানে হালাল-হারামের সূক্ষ্ম বিচারবোধ যুক্ত হওয়াও সমান জরুরি। কেবল এভাবেই একটি ইনসাফভিত্তিক ও সত্যিকারের কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের এবং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের সঠিক পথটি অনুধাবন করার তাওফিক দান করুন।







Comments