রাষ্ট্র যখন উপাস্য: জাতিরাষ্ট্রের মেটাফিজিক্যাল দাবি || শায়খ মুসা আল হাফিজের সাক্ষাৎকার

সম্পাদকীয় নোট: আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের মেটাফিজিক্যাল দাবি ও এর সীমাবদ্ধতা নিয়ে দৈনিক কালবেলাকে দেয়া শায়খ মুসা আল হাফিজের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক অংশগুলো নিয়ে এই সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা ও কিউরেটেড নিবন্ধটি তৈরি করা হয়েছে।
আধুনিক রাষ্ট্রকে স্রেফ একটি প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে দেখার সুযোগ কম। এটি আসলে নির্দিষ্ট একটি সভ্যতাগত দর্শনের রাজনৈতিক রূপ, যা মানুষের ওপর এমন এক নিরঙ্কুশ অধিকার দাবি করে বসে। যে অধিকার এককালে কেবল ঈশ্বরের জন্যই নির্দিষ্ট ছিল। দৈনিক কালবেলাকে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে শায়খ মুসা আল হাফিজের আলোচনাটি মূলত এই প্রশ্নটিকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে। জাতিরাষ্ট্রের (ন্যাশন স্টেট) মৌলিক বুনিয়াদ এবং নিজেকে চূড়ান্ত ও সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর যে রাষ্ট্রীয় প্রবণতা, তাঁর আপত্তিটি ঠিক সেই জায়গায়।
১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফালিয়া চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপের ত্রিশ বছরের ধর্মযুদ্ধের অবসান ঘটে। তবে এই চুক্তির সুদূরপ্রসারী প্রভাব ছিল ভিন্ন জায়গায়। এর মাধ্যমে এমন এক নতুন রাজনৈতিক সত্তার বিকাশ ঘটে, যা আর ঐশী বিধানের অধীন রইল না। মধ্যযুগীয় ইউরোপের ক্ষমতার চিরাচরিত বিভাজন—যেখানে রাজা, পোপ ও সামন্তপ্রভুদের মাঝে কর্তৃত্ব ভাগাভাগি হতো এবং কোনো একক সার্বভৌম শক্তি ছিল না—তা পুরোপুরি বদলে যায়। রাষ্ট্রকে তখন থেকে একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ভেতর সর্বোচ্চ স্বাধীন ও সিদ্ধান্তগ্রহণকারী শক্তি হিসেবে গণ্য করা শুরু হয়, যা আধুনিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি।
এই রূপান্তরের পেছনে কাজ করেছে তিনজন প্রধান চিন্তাবিদের দার্শনিক বয়ান। টমাস হবস তাঁর ‘লেভায়াথান’ গ্রন্থে মানুষের আদিম বা প্রাকৃতিক অবস্থাকে চরম অরাজক হিসেবে দেখিয়েছেন, যেখানে মানুষ ছিল মানুষেরই প্রতিপক্ষ। তাঁর মতে, এই বিশৃঙ্খলা এড়াতে মানুষ নিজেদের স্বাধীনতার একাংশ এক শক্তিশালী শাসন কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেয়; ফলে হবসের রাষ্ট্র হয়ে ওঠে মূলত নিরাপত্তাকেন্দ্রিক, যার কাজ শান্তি বজায় রাখা।
অন্যদিকে, জন লক তাঁর ‘টু ট্রিটিসেস অব গভর্নমেন্ট’ বইয়ে রাষ্ট্রকে দেখিয়েছেন নাগরিক অধিকারের পাহারাদার হিসেবে। মানুষের জন্মগত জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্র ব্যর্থ হলে জনগণের প্রতিরোধের অধিকারও তিনি স্বীকার করেছেন। আর জ্যাঁ জাক রুশো তাঁর ‘দ্য সোশ্যাল কন্ট্র্যাক্ট’-এ নিয়ে আসেন ‘সাধারণ ইচ্ছা’ বা জেনারেল উইলের ধারণা, যেখানে সার্বভৌমত্ব কোনো শাসকের ব্যক্তিগত বিষয় নয়, বরং তা জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছার অধীন। ভিন্ন ভিন্ন পথ নিলেও এই তত্ত্বগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রকে এক ধরনের মানবিক সামাজিক চুক্তির চূড়ান্ত রূপ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে ‘জাতি’ বা ন্যাশনের স্বতন্ত্র ধারণা। বেনেডিক্ট আন্ডারসনের ‘ইম্যাজিনড কমিউনিটিজ’ তত্ত্ব অনুযায়ী, জাতি মূলত একটি ‘কল্পিত সম্প্রদায়’। এখানে নাগরিকেরা পরস্পরকে সরাসরি না চিনলেও ভাষা, শিক্ষাব্যবস্থা, ছাপা প্রযুক্তির বিকাশ ও অভিন্ন ইতিহাসের বয়ানের ওপর ভর করে নিজেদের একটি বৃহৎ ঐক্যের অংশ মনে করে। আর্নেস্ট গেলনার অবশ্য বিষয়টিকে দেখেছেন অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের জায়গা থেকে। তাঁর মতে, আধুনিক শিল্পায়নের প্রয়োজনে যখন একটি অভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির দরকার পড়ল, তখনই জাতির ধারণা তৈরি হলো এবং রাষ্ট্র তাকে একটি রাজনৈতিক কাঠামো দিল।
এই বিবর্তনে ধর্মের সামাজিক অবস্থানও বদলে যায়। মধ্যযুগে যেখানে চার্চ ও ধর্ম ছিল রাজনৈতিক পরিচয়ের মূল ভিত্তি, আধুনিক রাষ্ট্রে তাকে ব্যক্তিগত পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়। এটি ধর্মনিরপেক্ষতা বা সেকুলারিজম নামে পরিচিত। ফলে নাগরিকত্বের ভিত্তি ধর্মীয় পরিচয়ের বদলে আইনি ও রাজনৈতিক সম্পর্কে রূপ নেয়। সব মিলিয়ে, একটি আধুনিক জাতিরাষ্ট্র বা ন্যাশন স্টেট মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে: নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, সার্বভৌম ক্ষমতা এবং এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বা সাংস্কৃতিক জাতিগত ঐক্য।
রাষ্ট্র যখন ‘পার্থিব উপাস্য’ হয়ে ওঠে
শায়খ মুসা আল হাফিজ পশ্চিমা রাষ্ট্রচিন্তার এই তাত্ত্বিক ভিত্তিগুলোকে ঢালাওভাবে অস্বীকার করেন না; বরং তিনি এগুলোর ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতা ও সংকীর্ণতাকে সামনে নিয়ে আসেন। মূলত, ইউরোপের চার্চ ও রাজতন্ত্রের মধ্যকার দীর্ঘদিনের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং একটি সুনির্দিষ্ট সভ্যতাগত সংকটের গর্ভেই এই কাঠামোর জন্ম। পরবর্তীতে এনলাইটেনমেন্ট রাষ্ট্রকে যেকোনো মেটাফিজিক্যাল কর্তৃত্ব থেকে মুক্ত করে স্রেফ মানবিক যুক্তির ওপর দাঁড় করায়। ফরাসি বিপ্লব এসে রাষ্ট্র ও জাতিকে রূপ দেয় এক পরম রাজনৈতিক সত্তায় (স্যাক্রেড পলিটিক্যাল সাবজেক্ট) যা যেকোনো উচ্চতর নৈতিক বা ধর্মীয় সত্যের বিকল্প হিসেবে হাজির হয়। এর সাথে যুক্ত হওয়া শিল্পায়ন ও আধুনিক প্রশাসনিক প্রযুক্তি রাষ্ট্রকে দেয় অভাবনীয় ক্ষমতা। স্থায়ী আমলাতন্ত্র, পেশাদার সেনাবাহিনী এবং নাগরিকদের পুঙ্খানুপুঙ্খ গণনা ও নজরদারির সক্ষমতা অর্জন করে রাষ্ট্র আর মানুষের সেবকে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং নিজেই নিজেকে চূড়ান্ত রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
রাষ্ট্রের আইন যদি নিজেকে সর্বশেষ সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে, তাহলে তা মানুষের ওপর একটি পার্থিব অ্যাবসুলোউট তৈরি করে। অথচ ইসলামি দৃষ্টিতে ক্ষমতা আমানত, উপাস্য নয়; শাসন ন্যায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যম, নিজেই চূড়ান্ত উদ্দেশ্য নয়।
ঠিক এই বিন্দুতেই ভৌগোলিক সীমানার ধারণা ছাপিয়ে যাওয়া ইসলামের ‘উম্মাহ’ তত্ত্বের সাথে আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের সংঘাতটি রূপ নেয় এক মৌলিক দ্বন্দ্বে। জাতিরাষ্ট্রের দাবি হলো, নাগরিকের সর্বোচ্চ ও চূড়ান্ত পরিচয় নির্ধারিত হবে তার ভৌগোলিক সীমান্ত দিয়ে। অন্যদিকে ইসলামের অবস্থান আকিদা বা বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে। এই দুটি পরম দাবি কখনো একসাথে মেলানো সম্ভব নয়। এই ঐতিহাসিক টানাপোড়েনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সমকালীন কিছু ইসলামি চিন্তাবিদ ইসলামি রাজনৈতিক দর্শনেও সার্বভৌমত্বের একটি সমান্তরাল রূপ দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন। তবে ইউরোপীয় বাস্তবতার সাথে তাল মেলাতে গিয়ে পুরো বিষয়টি জটিলতা কমানোর বদলে আরও বাড়িয়েছে।
ইউরোপীয় রাষ্ট্রচিন্তা একদিকে বাঁক নিয়েছে বলে সেই অনুযায়ী ইসলামকে বিপরীত দিক থেকে ঢেলে সাজানোর আইডিয়াটা বিপজ্জনক। সেখানে ইজতিহাদের আবশ্যিকতা তৈরি হয়। ইজতিহাদের সমস্ত শর্ত রক্ষা করে তা কেবল করতে পারেন মুজতাহিদগণ। কিন্তু ব্যাপারটা সেভাবে হয়নি।
জাতীয়তাবাদের এই রাজনৈতিক আবেগ যখন চূড়ান্ত রূপ নেয়, তখন সুকৌশলে মানুষকে শেখানো হয় রাষ্ট্রের স্বার্থেই জীবন দেওয়া শ্রেয়, সীমান্তই সর্বোচ্চ পবিত্র স্থান এবং জাতীয় স্বার্থই নৈতিকতার একমাত্র শেষ মানদণ্ড।
ভৌগোলিক সীমান্তের ওপারে থাকা মানুষের রক্ত কি তবে কম মূল্যবান? এই ভাবনার বাস্তব ও ভয়াবহ পরিণতি দেখা গেছে গত শতকের প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে, যেখানে রাষ্ট্র ও তথাকথিত ‘জাতীয় গৌরবের’ নামে কোটি কোটি মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া হয়েছে। বস্তুত, উপনিবেশবাদ, ফ্যাসিবাদ কিংবা জাতিগত নিধনের মতো আধুনিক নিষ্ঠুরতাগুলো শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের এই প্রশ্নহীন সার্বভৌমত্বের দাবির আড়ালেই নিজেদের তাত্ত্বিক বৈধতা খুঁজে পেয়েছে।
নজরদারি রাষ্ট্রের ভয়াবহতা
আধুনিক রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থা এখন আর শুধু প্রচলিত আইনের সীমানায় আটকে নেই। রাষ্ট্র এখন নাগরিকদের সংখ্যা গণে, বায়োমেট্রিক তথ্য জমা করে; মানুষকে রূপান্তর করে নির্দিষ্ট ফাইল, ট্যাক্স নম্বর, সামরিক রসদ কিংবা ডেমোগ্রাফিক ইউনিটে। মানুষ তখন রক্ত-মাংসের অস্তিত্ব হারিয়ে স্রেফ ডাটায় পরিণত হয়। এক সুক্ষ্ম শৃঙ্খলা ও নজরদারির ভেতর দিয়ে রাষ্ট্র মানুষের শরীর, আচরণ, এমনকি চিন্তার পরিমণ্ডলকেও নিজের ছকে বেঁধে ফেলে। যখন রাষ্ট্র নিজেকে এমন এক অলঙ্ঘনীয় ও পবিত্র সত্তা হিসেবে হাজির করে, তখন এই বিশাল জনসমষ্টিকে অনায়াসে যুদ্ধের ময়দানে ঠেলে দেওয়া সম্ভব হয়। কারণ রাষ্ট্রের এই পরম ইচ্ছাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কোনো উচ্চতর নৈতিক আদালতকে আধুনিক ব্যবস্থা আর স্বীকৃতি দেয় না।
অ্যাবসুলোউট সভরেন্টি মানুষের ঊর্ধ্বে রাষ্ট্রকে বসিয়ে দেয়। তখন রাষ্ট্র আর মানুষের সেবক থাকে না; বরং মানুষই রাষ্ট্রের উপাদানে পরিণত হয়। মানুষের মর্যাদা, বিবেক, নৈতিকতা কোনো রাজনৈতিক যন্ত্রের অধীন হতে পারে না। রাষ্ট্র প্রয়োজনীয়, কিন্তু সর্বোচ্চ নয়।
এই পর্যালোচনার অর্থ এই নয় যে শায়খ মুসা আল হাফিজ কোনো রাষ্ট্রবিরোধী অরাজকতাবাদী। তিনি রাষ্ট্রের প্রাত্যহিক প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করছেন না, বরং প্রশ্ন তুলছেন রাষ্ট্রের আধিভৌতিক বা মেটাফিজিক্যাল দাবিগুলো নিয়ে। রাষ্ট্র আদতে মানবিক প্রয়োজনের তাগিদে গড়ে ওঠা একটি ঐতিহাসিক নির্মাণ মাত্র, কোনো চূড়ান্ত বা পরম সত্য নয়। সমাজ সচল রাখতে আইন দরকার, তবে সেই আইন কখনো শাশ্বত ন্যায়ের বিকল্প হতে পারে না। সীমান্ত বাস্তব হতে পারে, কিন্তু মানবতা তার চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত। একই সাথে বোঝা যায়, আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের এই বহুমাত্রিক সংকটটি কেন আজও মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে এত গভীর এক টানাপোড়েন তৈরি করে রেখেছে।
রেফারেন্সঃ
রায়হান, আ. ত. (2026, May 18). ‘ধর্মকে ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে.’ কালবেলা. https://www.kalbela.com/opinion/interview/292330






Comments