নতুন ডিপ্লোমা প্রোগ্রাম ২০২৬ শুরু হয়েছে! ক্রিটিক্যাল সোশ্যাল থট অ্যান্ড ইসলামিক ট্র্যাডিশন ডিপ্লোমা সম্পর্কে জানুন → নতুন ডিপ্লোমা প্রোগ্রাম ২০২৬ — ডিপ্লোমা সম্পর্কে জানুন →

ইসলামি ঐতিহ্যমডার্নিটিরাজনৈতিক দর্শনসমসাময়িক বিশ্লেষণ

নেশন-স্টেট, নৈতিকতা ও কাঠামোগত সংকট

Share
Share

নেশন-স্টেট, নৈতিকতা ও কাঠামোগত সংকট

দৃশ্য এক:

একজন মাদ্রাসা-শিক্ষক যৌন কেলেঙ্কারির অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবরটি দ্রুত ভাইরাল হয়ে গেল। ফটোকার্ড ছড়াতে শুরু করল, সেই সঙ্গে আসতে থাকল গৎবাঁধা মন্তব্য। একই সঙ্গে চলতে থাকল মিডিয়া ট্রায়াল ও তীব্র বিদ্বেষ ছড়ানোর মহড়া।

দৃশ্য দুই:

একজন সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষ, যিনি সীমিত বেতনে মাস টানতে হিমশিম খান, তিনি বাজারে গেছেন। গত মাসের চেয়ে তাকে তিন টাকা বেশি দামে ডিম কিনতে হয়েছে। সবজির দামও আকাশছোঁয়া। দু-আড়াইশো টাকার নিচে কোনো মাছ নেই, ব্রয়লার মুরগির দামও কমছে না। ফেরার সময় রিকশাওয়ালাও বিশ টাকার ভাড়া চল্লিশ টাকা দাবি করে বসেছেন। এমন দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ সেই মধ্যবিত্তের মনে রিকশাচালককে গালি দেওয়া বা তার গায়ে হাত তোলার মতো তীব্র আক্রোশ তৈরি হওয়া খুব অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়।

দৃশ্য তিন:

সেই একই মধ্যবিত্ত মানুষটির অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সরকারি প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ করছেন। হাসপাতালে ডাক্তার নিয়মিত আসছেন না, ওষুধে ভেজাল, ব্যাংকের ঋণ নিয়ে তা আর ফেরত দেওয়া হচ্ছে না। ট্রাফিক পুলিশ রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করছেন। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নারী শিক্ষার্থীকে কুপ্রস্তাব দিয়েছেন ও শ্লীলতাহানি করেছেন, হোয়াটসঅ্যাপে যৌন উত্তেজক বার্তা পাঠাচ্ছেন; অফিসে নারী কর্মী তার পুরুষ বস বা সহকর্মীর হাতে যৌন হেনস্তার শিকার হচ্ছেন; এমনকি গৃহকর্মীকে ধর্ষণ করে মেরে ফেলার মতো ঘটনাও ঘটছে।

এখানে তিনটি ভিন্ন গোষ্ঠী এবং তিন ধরনের অভিযোগ উঠে এসেছে। প্রশ্ন হলো, এই সমস্যাগুলো কি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন? এর দায়ভার কার—নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির নাকি কোনো নির্দিষ্ট বর্গের?

সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে এর উত্তর হতে পারে, দায়টি একান্তই ব্যক্তির। কিন্তু মৌলিকভাবে সমস্যাটি কেবল নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়; বরং সমস্যাটি সেই বৃহত্তর কাঠামোর, যার ভেতরে এই তিন শ্রেণির মানুষকেই প্রতিদিন জীবনযাপন করতে হচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে বিচ্ছিন্ন মনে হলেও এই সমস্যাগুলো মূলত একই রোগের তিনটি ভিন্ন উপসর্গ মাত্র।

ধর্মীয় কোনো ব্যক্তির (যেমন: হুজুর বা মাদরাসা-শিক্ষক) নৈতিক স্খলনের খবর প্রকাশ পেলে সেক্যুলার মহলের প্রতিক্রিয়ায় একটি সুনির্দিষ্ট ধরন লক্ষ্য করা যায়। তারা ঘটনাটিকে খুব দ্রুত একজন ব্যক্তির অপরাধ বা ব্যক্তিগত পাপের প্রশ্ন থেকে সরিয়ে পরিচয়বাদী বা বর্গীয়ভাবে উপস্থাপন করেন। এর মাধ্যমে তারা সেক্যুলারিজমের অন্যতম মূলনীতি—’ধর্ম একান্তই ব্যক্তিগত চর্চার বিষয়’—থেকেও সরে আসেন।

অবশ্য ধর্মীয় নেতাদের নৈতিক স্খলনের ঘটনায় কেবল সেক্যুলাররাই প্রতিক্রিয়া দেখান, বিষয়টি এমন নয়। ধর্মপ্রাণ মুসলিম কিংবা ধর্মের সাথে শিথিল সম্পর্কযুক্ত সাধারণ মানুষও এসব ক্ষেত্রে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তবে মূল তফাতটি হলো—সেক্যুলারদের প্রতিক্রিয়া সাধারণত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, অন্যদিকে সাধারণ মুসলিমদের প্রতিক্রিয়া জন্ম নেয় গভীর হতাশা থেকে। তাদের যুক্তিটি সাধারণত এমন হয়: যারা সমাজকে নৈতিকতার পথ দেখাবেন, তারাই যদি অনৈতিকতায় জড়িয়ে পড়েন, তবে তাদের নৈতিক কর্তৃত্বের ভিত্তি কোথায় থাকে?

নৃবিজ্ঞানী তালাল আসাদ দেখিয়েছেন, সেক্যুলারিজম কেবল রাষ্ট্র ও ধর্মকে আলাদা রাখার একটি নিরপেক্ষ নীতি নয়; এটি একই সঙ্গে একটি সক্রিয় ক্ষমতা-কাঠামো, যা ধর্মীয় কর্তৃত্বকে জনপরিসর থেকে সরিয়ে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ করতে চায়। এই প্রক্রিয়ার একটি কার্যকর উপায় হলো জনসম্মুখে ধর্মীয় কর্তৃত্বের নৈতিক বৈধতাকে দুর্বল করে দেওয়া। একজন ধর্মীয় নেতা কোনো কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়লে জনপরিসরে সেটি প্রায়ই এমনভাবে আলোচিত হয়, যেন ঘটনাটি কেবল ওই ব্যক্তির নয়, পুরো ধর্মীয় বর্গের প্রতিনিধিত্ব করে। এর ফলে তাদের শরয়ি এজেন্সি ও নৈতিক কর্তৃত্বও প্রশ্নের মুখে পড়ে।

কিন্তু এই ফ্রেমিং একটি মৌলিক সমস্যাকে আড়াল করে ফেলে। একই ধরনের নৈতিক স্খলন বাংলাদেশের প্রায় সব পেশা ও সামাজিক স্তরেই বিদ্যমান। স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকের হাতে শিক্ষার্থীর হয়রানির ঘটনা ঘটে, চিকিৎসক রোগীকে অপ্রয়োজনীয় টেস্ট দিয়ে কমিশন বাণিজ্যে জড়ান, আইনজীবী মক্কেলের অর্থ আত্মসাৎ করেন কিংবা অর্থের বিনিময়ে হয়রানিমূলক মামলা পরিচালনা করেন এবং রাজনীতিবিদরা ভোট কেনেন।

নৈতিক ব্যর্থতার হিসাব করলে কোনো গোষ্ঠীরই রেকর্ড খুব একটা সন্তোষজনক নয়। পার্থক্যটা ঘটনার সংখ্যায় নয়, বরং দৃশ্যমানতায়। ধর্মীয় নেতাদের ক্ষেত্রে একটি ‘প্রতীকী বিপর্যয়’ জড়িয়ে থাকে বলে সেই ঘটনাগুলো অতি দ্রুত আলোচনায় আসে; অথচ অন্যান্য ক্ষেত্রের একই ধরনের ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম মনোযোগ পায়।

এদিকে, ধর্মীয় ও মাদরাসাকেন্দ্রিক সমাজও এই সংকটের ব্যাখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তিকর অবস্থায় থাকে। কেন এমন ঘটনা ঘটছে এবং কীভাবে এগুলোর পুনরাবৃত্তি রোধ করা যায় এই প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক উত্তর তাদের কাছেও স্পষ্ট নয়। ফলে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া সাধারণত ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে থাকে: আরও বেশি তরবিয়ত এবং আরও কঠোর শৃঙ্খলা। কিন্তু সমস্যার কাঠামোগত দিকটি কখনোই আলোচনায় আসে না। ফলে সমাধানের চেষ্টাও বারবার ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

একই ধরনের সমস্যা দেখা যায় শ্রেণিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণি নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে কোটি কোটি টাকা সরিয়ে নিচ্ছে—এটি যেমন সত্য, তেমনি সুযোগ পেলে রিকশাচালকও বিশ টাকার ভাড়া ষাট টাকা দাবি করতে পিছপা হন না—সেটিও সমভাবে সত্য। রিকশাচালকের প্রভাবের ক্ষেত্র ছোট, তাই তার অপরাধের মাত্রাও আপাতত ছোট। তবে সুযোগ ও ক্ষেত্র বড় হলে তার দুর্নীতির মাত্রাও হয়তো আরও বড় হতো। অর্থাৎ, শোষণ উভয় দিক থেকেই হচ্ছে। উভয় পক্ষই একে অপরের দিকে আঙুল তুলছে এবং দোষারোপ করছে। কিন্তু এর পেছনের কাঠামোগত বাস্তবতাটি প্রায়শই বিশ্লেষণের বাইরে থেকে যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে ই. পি. থম্পসনের ‘মোরাল ইকোনমি’ ধারণাটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। থম্পসন দেখিয়েছেন, অষ্টাদশ শতকের ইংল্যান্ডে মানুষ শুধু ক্ষুধার তাড়নায় বিদ্রোহ করত না; তাদের প্রতিক্রিয়ার পেছনে কাজ করত ন্যায়বিচার সম্পর্কে একটি সামাজিক ধারণা, যাকে তিনি ‘মোরাল ইকোনমি’ বলেছেন। মানুষ তখনই ক্ষুব্ধ হতো, যখন তারা মনে করত সেই ‘মোরাল ইকোনমি’ লঙ্ঘিত হয়েছে।

অন্যদিকে, জোহান গালতুং-এর কাঠামোগত সহিংসতার ধারণা বিষয়টিকে অধিকতর স্পষ্ট করে। কোনো সামাজিক কাঠামো যদি মানুষকে টিকে থাকার জন্য অন্যায়ের দিকে ঠেলে দেয়, তবে সেই অন্যায়ের দায় কেবল নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর বর্তায় না; বরং কাঠামোর ওপরও সমভাবে বর্তায়।

রিকশাওয়ালা বাড়তি ভাড়া নিতে চায়, কারণ তার বিদ্যুৎ খরচ বেড়েছে, বাড়িভাড়া বেড়েছে, সন্তানের পড়াশোনার ব্যয় বেড়েছে। তারও বেশি আয় করতে ইচ্ছা করে, সে-ও আরেকটু ভালো থাকতে চায়, আরেকটু ভালো খেতে চায়, পয়সাওয়ালা হওয়ার বাসনা তারও আছে। কিন্তু সে এমন একটি অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে বাস করছে, যা কখনোই তার পক্ষে কাজ করে না। সেই বাস্তবতা সে নিজেও তৈরি করেনি। অথচ সেই বাস্তবতার ভেতরে টিকে থাকার চেষ্টা করতে গিয়ে সে এমন কিছু করছে, যা অন্যের কাছে অন্যায় বলে মনে হয়। তখন একটা ক্লাস-টেনশন তৈরি হয়।

এই যে পারস্পরিক আঙ্গুল তোলা-এটা ঠিক আছে। কিন্তু, আঙুলটা আসলে ভুল দিকে যাচ্ছে। প্রশ্নটা কেবল কে কাকে ঠকাল, কে কাকে বঞ্চিত করল—এখানে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্ন হলো, এমন একটি কাঠামো কীভাবে তৈরি হলো, যেখানে মানুষকে বাঁচার জন্য বারবার এমন আচরণের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

কাঠামোগত সমস্যা বিশ্লেষণের অর্থ ব্যক্তিগত দায় অস্বীকার করা নয়, কিংবা কোনো ব্যক্তি বা বর্গকে দায়মুক্তি দেয়াও নয়।

কিন্তু ব্যক্তিগত দায় স্বীকার করলেই আর সমস্যা তো শেষ হয়ে যায় না। আরও কিছু প্রশ্ন থেকে যায়।

এই ধরনের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বারবার কেন ঘটছে? কোন পরিবেশে এগুলো জন্ম নিচ্ছে? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এগুলো প্রতিরোধ করার কার্যকর উপায় কী?

এই প্রশ্নগুলো কিন্তু খুব কমই আসে। আমাদের আলোচনা ‘এই মানুষটা খারাপ’/’এই গোষ্ঠীটাই এমন’-এ সীমাবদ্ধ থাকে। ব্যক্তির নৈতিক ব্যর্থতাকে যে বৃহত্তর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা তৈরি করছে, সেটি আলোচনার বাইরে থেকে যায়।

যে চিকিৎসক সরকারি হাসপাতালে নিয়মিত উপস্থিত হন না এবং প্রাইভেট চেম্বারে রোগী দেখাকে অগ্রাধিকার দেন, তার পেছনেও কাজ করছে একটি ত্রুটিপূর্ণ বেতন ও প্রণোদনা-কাঠামো, যা তাকে ক্রমাগত অতিরিক্ত ব্যক্তিগত আয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একইভাবে, যে পুলিশ সদস্য ঘুষ বা চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়েন, তার পেছনেও এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি বিদ্যমান, যেখানে ঊর্ধ্বতন মহলে নিয়মিত অর্থের ভাগ পৌঁছে দেওয়ার একটি অলিখিত চাপ কাজ করে। আবার, যে মাদরাসা-শিক্ষক যৌন নিপীড়নের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়েন, তার ক্ষেত্রেও প্রায়ই দেখা যায়, তিনি এমন একটি বিচ্ছিন্ন ও জবাবদিহিতাহীন পরিবেশে অবস্থান করছেন, যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহার করা তুলনামূলকভাবে সহজ এবং ধরা পড়ার ঝুঁকি অত্যন্ত কম।

অর্থাৎ, এখানে ব্যক্তির নিজস্ব দায়ভার নিশ্চিতভাবেই রয়েছে, কিন্তু সেই নৈতিক স্খলন শূন্য থেকে তৈরি হয় না। এটি এমন একটি পরিবেশে বিকশিত হয়, যা তাকে সুযোগ দেয়, কখনো প্ররোচিত করে এবং কখনো বা শাস্তির ভয় কমিয়ে দেয়। মূলত একটি নির্দিষ্ট কাঠামোগত ব্যবস্থাই সেই পরিবেশ তৈরি করে দেয়।

তাহলে এই সংকটের সমাধান কী?

সংক্ষেপে বলতে গেলে, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার কাছে এর কোনো কার্যকর সমাধান নেই। ব্যক্তিকে নৈতিকভাবে গড়ে তোলার কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা রাষ্ট্রের কাছে নেই। মূলত ব্যক্তিকে নৈতিকভাবে সঠিক রাস্তায় পরিচালিত করা রাষ্ট্রের প্রধান উদ্দেশ্যও নয়; রাষ্ট্রের প্রধান উদ্বেগ হলো নাগরিকের ওপর আইন প্রয়োগ করা। রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে একজন মানুষ আইন ভঙ্গ করেছে কি না, সেটাই তার কাছে মুখ্য বিবেচ্য বিষয়।

কিন্তু আইন মান্য করা আর নৈতিক হওয়া সম্পূর্ণ এক জিনিস নয়। আইনকে ফাঁকি দিয়ে, আইনের চোখ এড়িয়ে কিংবা ধরা না পড়ে অনেক ধরনের অন্যায় কাজ করাই সম্ভব। ফলশ্রুতিতে ধীরে ধীরে এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, যেখানে মানুষের কাছে কাজটির নৈতিক বৈধতার চেয়ে ‘ধরা পড়ার আশঙ্কা’ বড় হয়ে দাঁড়ায়।

ইসলামে এই ধরনের সমস্যা মোকাবিলার জন্য অত্যন্ত কার্যকর একটি ধারণা রয়েছে, যাকে ‘তাকওয়া’ বলা হয়। সেক্যুলার পরিভাষায় একে ‘technologies of the self’ হিসেবে আখ্যায়িত করা যেতে পারে।

‘Technologies of the self’ মূলত ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর একটি ধারণা। এই ধারণা দিয়ে তিনি এমন কিছু চর্চাকে বোঝাতে চেয়েছেন, যার মাধ্যমে মানুষ সচেতনভাবে নিজের ওপর কাজ করে, নিজেকে গঠন করে এবং একটি নির্দিষ্ট নৈতিক বা অস্তিত্বগত লক্ষ্যের দিকে নিজেকে পরিচালিত করে।

নৃবিজ্ঞানী সাবা মাহমুদ তাঁর Politics of Piety গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, ‘তাকওয়া’-কেও এই অর্থে একটি ‘টেকনোলজি’ হিসেবে বোঝা সম্ভব। নামাজ, রোজা, জিকির বা সৎসঙ্গ (সোহবত)—এগুলো কেবল আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়; এগুলো এমন কিছু নিয়মিত অনুশীলন, যা মানুষের ভেতরে ধীরে ধীরে একটি সুদৃঢ় নৈতিক স্বভাব গড়ে তোলে। বারবার চর্চার মাধ্যমে এগুলো মানুষের মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণ, আত্মসচেতনতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক ধরনের শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করে।

পবিত্র কুরআনেও এই ধারণার সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। রোজার বিধান প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো’ (সুরা আল-বাকারা, ২:১৮৩)। আবার নামাজ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে’ (সুরা আল-আনকাবুত, ২৯:৪৫)। এই আয়াতগুলোতে ইবাদতকে শুধু একটি ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবেই নয়, বরং নৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবেও উপস্থাপন করা হয়েছে।

তবে এ ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতার প্রশ্ন থেকে যায়। এই নৈতিক টুলগুলোর যথাযথ কার্যকারিতার জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ অপরিহার্য। অর্থাৎ, এগুলো শূন্যে কাজ করতে পারে না। একজন ব্যক্তি যদি এমন একটি সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে বসবাস করেন, যেখানে তার নৈতিক অনুশীলনকে সমর্থন করার মতো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা সামাজিক ভিত্তি নেই, তবে কেবল একক প্রচেষ্টার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে সেই নৈতিক অবস্থান ধরে রাখা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

অর্থাৎ, ‘তাকওয়া’ মূলত ব্যক্তিগত বিষয় হলেও, এর কার্যকারিতা পুরোপুরি ব্যক্তিগত নয়। এর জন্য এমন একটি সামাজিক পরিবেশেরও প্রয়োজন রয়েছে, যেখানে নৈতিক জীবনযাপন কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়, বরং সেটিই স্বাভাবিক ও টেকসই ব্যবস্থা হিসেবে পরিগণিত হবে।

সমস্যা হলো, আধুনিক নেশন-স্টেট এই তাকওয়ার টুলকে ধারণ করতে পারে না।

অধ্যাপক ওয়ায়েল হাল্লাক তাঁর The Impossible State গ্রন্থে এই সংকটের একটি মৌলিক উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন। তাঁর যুক্তি হলো, আধুনিক রাষ্ট্র এবং ইসলামি শাসন-কাঠামো কেবল দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থাই নয়; ভিত্তিগতভাবেই এরা একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে একটিকে আরেকটির ভেতরে পুরোপুরি ধারণ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

আধুনিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো মানব-সার্বভৌমত্ব। সংসদ আইন প্রণয়ন করে, আদালত সেই আইন কার্যকর করে এবং নাগরিক তা মেনে চলে। এই কাঠামোয় আইনের চূড়ান্ত উৎস হলো মানুষ। কিন্তু ইসলামে আইনের চূড়ান্ত উৎস মানুষের ইচ্ছা নয়, বরং তা হলো আল্লাহর ওহি; আর ‘শরিয়া’ সেই ওহির ভিত্তিতে গঠিত একটি নৈতিক-আইনি কাঠামো। হাল্লাকের মতে, এই দুই ধরনের সার্বভৌমত্ব শেষ পর্যন্ত একই ব্যবস্থার ভেতরে সমানভাবে অবস্থান করতে পারে না। একটিকে পুরোপুরি গ্রহণ করলে স্বাভাবিকভাবেই অন্যটির পরিসর সংকুচিত হয়ে আসে।

তবে হাল্লাকের এই আলোচনা শুধু আইনের উৎসের প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি আরও দেখান যে, আধুনিক রাষ্ট্র নিজেও নাগরিকদের গড়ে তোলার জন্য এক ধরনের ‘technology of the self’ ব্যবহার করে। তবে তার লক্ষ্য তাকওয়া বা নৈতিক আত্মশুদ্ধি নয়। স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, গণমাধ্যম, বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে বাজারব্যবস্থা—এসব প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে এমন এক ধরনের নাগরিক তৈরি করতে কাজ করে, যাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো উৎপাদনশীলতা, ভোগক্ষমতা এবং প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা।

এর ফলে সমাজজুড়ে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী নৈতিক প্রকল্প পাশাপাশি কাজ করতে থাকে। একদিকে তাকওয়াকেন্দ্রিক চর্চা মানুষকে আত্মসংযম, জবাবদিহিতা এবং আল্লাহভীতির দিকে নিয়ে যেতে চায়; অন্যদিকে আধুনিক রাষ্ট্র ও বাজারকেন্দ্রিক কাঠামো তাকে ক্রমাগত ভোগ, বৈষয়িক সাফল্য, প্রতিযোগিতা এবং ব্যক্তিগত অর্জনের দিকে ধাবিত করে। এই দুই প্রবণতা সব ক্ষেত্রে সরাসরি পরস্পরবিরোধী না হলেও, তাদের মৌলিক অভিমুখ কোনোভাবেই এক নয়।

এই বাস্তবতায় মাদরাসাকে একটি দ্বীপের সঙ্গে তুলনা করা যায়। একজন ছাত্র মাদরাসায় ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করে, তাকওয়া ও নৈতিকতার পাঠ শেখে; কিন্তু একই সঙ্গে সে ইন্টারনেট ব্যবহার করে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অংশ নেয়, বাজারে যায়, রাষ্ট্রের আইন-কানুনের ভেতরে জীবনযাপন করে এবং বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে প্রতিনিয়ত তার মিথস্ক্রিয়া ঘটে। অর্থাৎ তার ওপর একই সময়ে দুটি ভিন্ন ধরনের সামাজিক ও নৈতিক শক্তি কাজ করছে।

দীর্ঘমেয়াদে কোন শক্তি বেশি প্রভাব ফেলবে, সেটি কেবল তত্বীয় প্রশ্ন নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিরও প্রশ্ন। মাদরাসা একজন মানুষের জীবনের একটি অংশকে প্রভাবিত করতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র, বাজার, শিক্ষা, গণমাধ্যম ও প্রযুক্তি তার জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রকে ঘিরে রাখে। ফলে যে কাঠামোর পেছনে বৃহত্তর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি রয়েছে, তার প্রভাবও সাধারণত বেশি গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী হয়।

তবে এই সমস্যাকে কেবল হুজুর বা মাদরাসা-সমাজের সংকট হিসেবে দেখলে ভুল হবে।

রিকশাচালক, ডাক্তার, পুলিশ, ব্যবসায়ী, মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নবিত্ত—সবাই একই বৃহত্তর কাঠামোর ভেতরে বসবাস করছে। সবাই একই ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক শক্তির প্রভাবের মধ্যে রয়েছে। তাই নৈতিক স্খলনের প্রশ্নটিও কোনো একক গোষ্ঠীর সমস্যা নয়; এটি এমন একটি পরিবেশের সমস্যা, যা ভিন্ন ভিন্ন মানুষকে ভিন্ন ভিন্নভাবে প্রভাবিত করছে।

এই কারণেই প্রাক-আধুনিক ইসলামি কাঠামোর আলোচনা কেবল একটি রাজনৈতিক আদর্শের আলোচনা নয়; এর একটি ব্যবহারিক দিকও আছে। কারণ সেই কাঠামোর ভেতরে এমন কিছু সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছিল, যেগুলো মানুষের নৈতিক জীবনকে শুধু ব্যক্তিগত উপদেশের মাধ্যমে নয়, বরং বাস্তব সামাজিক ব্যবস্থার মাধ্যমেও সহায়তা করত।

আজ যদি কোনো ব্যবসায়ী ওজনে কম দেন, তেলে ভেজাল মেশান বা অস্বাভাবিক মুনাফা করেন, তাহলে (অন্তত তাত্ত্বিকভাবে) ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ করা যায়। কিন্তু অভিযোগের পরিণতি কী হবে, সেই বিষয়ে মানুষের আস্থা সব সময় সমান নয়। প্রাক-আধুনিক ইসলামি নগরজীবনে এই ধরনের বিষয়ে কাজ করত হিসবা। এটি ছিল এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা, যার দায়িত্ব ছিল বাজারে ন্যায্য লেনদেন নিশ্চিত করা। মুহতাসিবরা বাজার তদারক করতেন, ওজন মাপ যাচাই করতেন, ভেজাল, মজুতদারি কিংবা অতিরিক্ত মুনাফার মতো বিষয় পর্যবেক্ষণ করতেন। অর্থাৎ বাজারের নৈতিক জবাবদিহিতার জন্য একটি কাঠামোগত ব্যবস্থা সেখানে বিদ্যমান ছিল।

একইভাবে, আজ একজন রিকশাচালক বা নিম্নআয়ের মানুষ বাড়তি ভাড়া নিতে প্রলুব্ধ হতে পারেন কারণ তার জীবনে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা খুবই সীমিত। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা সবকিছুর চাপ তার ওপর, কিন্তু সঙ্কটকালীন সময়ে নির্ভর করার মতো কোনো শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো তার জন্য একদমই নেই। প্রাক-আধুনিক ইসলামি সমাজে এই জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত ওয়াকফ। ধর্মীয় বন্দোবস্তের মাধ্যমে গড়ে ওঠা এই সামাজিক সম্পদ থেকে শিক্ষা, চিকিৎসা, আবাসনসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক সেবা পরিচালিত হতো। ফলে সংকটের মুহূর্তে মানুষের সামনে বেঁচে থাকার জন্য অন্যকে ঠকানোই একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়াত না। ওয়াকফ সেই সামাজিক ভরসার একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ছিল।

হাল্লাকের বিশ্লেষণে এই বিষয়টিও বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। তার মতে, প্রাক-আধুনিক ইসলামি সমাজে রাষ্ট্র সামাজিক জীবনের একমাত্র কেন্দ্র ছিল না। বরং শরিয়াভিত্তিক বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সম্প্রদায় এবং উলামার নেটওয়ার্ক সমাজের নৈতিক ও সামাজিক জীবনের কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করত। ফলে একজন মানুষের নৈতিক জীবন কেবল ব্যক্তিগত ইচ্ছাশক্তির ওপর নির্ভর করত না; সেটি এমন একটি সামাজিক পরিবেশের ভেতরে গড়ে উঠত, যেখানে তাকওয়ামুখী জীবনযাপন তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক এবং টেকসই ছিল।

ধর্মীয় ও সেক্যুলার দ্বন্দ্ব কিংবা আন্তঃশ্রেণি ও সমশ্রেণির মধ্যকার সংঘাত—উভয় ক্ষেত্রেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ব্যক্তি থেকে সরে গিয়ে নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা বর্গের ওপর গিয়ে পড়ে। কিন্তু মূল সমস্যাটি এমন একটি কাঠামোর, যা বারবার নৈতিক স্খলনের জন্ম দিচ্ছে, অথচ তা প্রতিরোধ করার জন্য কার্যকর কোনো নৈতিক উপকরণ সরবরাহ করতে পারছে না।

তাহলে এর সমাধান কোথায়?

এর সমাধান হলো প্রাক-আধুনিক ইসলামি রাজনৈতিক কাঠামোর পুনরুদ্ধার; অর্থাৎ ‘শরিয়া’-এর বাস্তবায়ন। শরিয়া যদি কেবল ব্যক্তিগত আমল বা ধর্মাচরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মূল ভিত্তি না হয়, তবে ‘তাকওয়া’র মতো নৈতিক উপকরণও তার পূর্ণ কার্যকারিতা অর্জন করতে পারে না। কারণ তাকওয়া কেবল ব্যক্তিগত সদিচ্ছার নাম নয়। এটি এমন একটি নৈতিক চর্চা, যার বিকাশ ও স্থায়িত্বের জন্য একটি সহায়ক সামাজিক পরিবেশ অপরিহার্য। একজন ব্যক্তি হয়তো একাই চেষ্টা করতে পারেন, কিন্তু তার চারপাশের পরিবেশ যদি প্রতিনিয়ত তাকে বিপরীত দিকে টানতে থাকে, তবে সেই প্রচেষ্টা খুব বেশি কার্যকর হয় না। আর সাময়িকভাবে কাজ করলেও সময়ের সাথে সাথে তা দুর্বল হতে বাধ্য।

তবে এর পাশাপাশি এই বিষয়টিও মনে রাখা প্রয়োজন যে, প্রাক-আধুনিক ইসলামি কাঠামো পুনরুদ্ধারের ধারণাকে যদি কেবল রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবে দেখা হয়, তবে সেটি শেষ পর্যন্ত একই আধুনিক রাষ্ট্র-কাঠামোরই পুনরাবৃত্তি হয়ে দাঁড়াবে, যার সমালোচনা আমরা এই আলোচনায় করেছি। শুধুমাত্র ভাষা ও প্রতীকের পরিবর্তন ঘটালেই কোনো মৌলিক পার্থক্য তৈরি হয় না। ক্ষমতা অর্জনই যদি প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, তবে কাঠামোর নাম বদলালেও এর ভেতরের সবকিছু অপরিবর্তিতই থেকে যায়।

এ কারণে বিষয়টিকে একটি দীর্ঘমেয়াদি সভ্যতাগত প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করতে হবে; যার মূলকথা হলো আধ্যাত্মিকতা ও নৈতিকতার ওপর ভিত্তি করে একটি রাজনৈতিক পুনর্জাগরণ। এই মুহূর্তে অন্তত তিনটি কাজ সমান্তরালভাবে এগিয়ে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি বলে মনে হয়:

প্রথমত, প্রয়োজন একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্গঠন। আধুনিক জ্ঞান-কাঠামোর ভেতরে যে সেক্যুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ নৈতিক অনুমানগুলো প্রায় অদৃশ্যভাবে কাজ করছে, সেগুলোকে আগে শনাক্ত করা দরকার। একই সঙ্গে ইসলামি জ্ঞান-ঐতিহ্যকে কেবল অতীতের ধর্মীয় স্মৃতি হিসেবে না দেখে, বরং বিশ্বকে বোঝা, ব্যাখ্যা করা এবং মূল্যায়ন করার একটি পূর্ণাঙ্গ বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, তাকওয়া অর্জনকারী চর্চাগুলোকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সাধনা হিসেবে রেখে দিলে এর প্রভাব সীমিত হয়ে পড়ে। তাই সৎসঙ্গ (সোহবত), আত্মশুদ্ধিমূলক বা তরবিয়তকেন্দ্রিক পরিবেশ, স্থানীয় সম্প্রদায়ভিত্তিক চর্চা এবং পারস্পরিক নৈতিক সহায়তার ক্ষেত্রগুলোকে সামাজিকভাবে আরও শক্তিশালী করতে হবে। কারণ একজন ব্যক্তি একা হয়তো স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটতে পারেন, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে সেই লড়াই চালিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব।

তৃতীয়ত, প্রাক-আধুনিক ইসলামি রাজনৈতিক কাঠামোকে পুনরায় আমাদের চিন্তার পরিসরে ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। এর অর্থ তাৎক্ষণিক কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন নয়; বরং মুসলিমদের মধ্যে এই বোধ তৈরি করা যে, আধুনিক ‘নেশন-স্টেট’ মানব ইতিহাসের চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয় কোনো গন্তব্য নয়। এর বাইরেও বিকল্প রাজনৈতিক প্রকল্প সম্ভব—এই বিশ্বাসের পুনর্গঠন শুরু হতে পারে চিন্তা, গবেষণা, লেখালেখি এবং শক্তিশালী সমাজ (কমিউনিটি) গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে। এটি কয়েক বছরের কাজ নয়; বরং এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দেওয়ার মতো একটি বৃহত্তর বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক প্রচেষ্টা।

প্রাক-আধুনিক ইসলামি রাজনৈতিক কাঠামো ও তার নৈতিক মূল্যবোধকে আমাদের সমাজ ও চিন্তায় ফিরিয়ে আনতে যত দেরি হবে, সমাজের এই কাঠামোগত অবক্ষয় ও সামগ্রিক সমস্যা তত বেশি বাড়তেই থাকবে।

তথ্যসূত্র

প্রাথমিক সূত্র

  • আল-কুরআন। সূরা আল-বাকারা (২:১৮৩) এবং সূরা আল-আনকাবুত (২৯:৪৫)।

বই ও প্রবন্ধ

  • Asad, T. (2003). Formations of the Secular: Christianity, Islam, Modernity. Stanford University Press.
  • Foucault, M. (1988). Technologies of the Self: A Seminar with Michel Foucault. University of Massachusetts Press.
  • Galtung, J. (1969). Violence, Peace, and Peace Research. Journal of Peace Research, 6(3), 167-191.
  • Hallaq, W. B. (2012). The Impossible State: Islam, Politics, and Modernity’s Moral Predicament. Columbia University Press.
  • Mahmood, S. (2005). Politics of Piety: The Islamic Revival and the Feminist Subject. Princeton University Press.
  • Thompson, E. P. (1971). The Moral Economy of the English Crowd in the Eighteenth Century. Past & Present, 50(1), 76-136.

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles
সমসাময়িক বিশ্লেষণ

ইতিহাসের নতুন বিন্যাস: ব্রাহ্মণ বনাম নমশূদ্র মনস্তত্ত্ব এবং জুলাইয়ের রূপান্তর

সমসাময়িক বিশ্লেষণ•June 20, 2026সমসাময়িক বিশ্লেষণইতিহাসের নতুন বিন্যাস: ব্রাহ্মণ বনাম নমশূদ্র মনস্তত্ত্ব এবং...

ভূরাজনীতিসমসাময়িক বিশ্লেষণ

কাঁটাতারের ওপারে ছুঁড়ে ফেলা মানুষ: পুশ-ইন সংকটের ভেতর-বাহির

ভূরাজনীতি•June 19, 2026ভূরাজনীতিসমসাময়িক বিশ্লেষণকাঁটাতারের ওপারে ছুঁড়ে ফেলা মানুষ: পুশ-ইন সংকটের ভেতর-বাহিররাকিবুল হাসান•43...

রাজনৈতিক দর্শনসমসাময়িক বিশ্লেষণ

গোমাতা: বিশ্বাস ও রাজনীতির জটিল সমীকরণ

রাজনৈতিক দর্শন•June 17, 2026রাজনৈতিক দর্শনসমসাময়িক বিশ্লেষণগোমাতা: বিশ্বাস ও রাজনীতির জটিল সমীকরণমোহাম্মদ মোশাররফ...

ভূরাজনীতিসমসাময়িক বিশ্লেষণ

তুরষ্কের প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ ও ভূরাজনীতি

ভূরাজনীতি•June 15, 2026ভূরাজনীতিসমসাময়িক বিশ্লেষণতুরষ্কের প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ ও ভূরাজনীতিদ্য মুসলিম মাইন্ডস এডিটরিয়াল•59...