কবি ইকবালের চিন্তায় লেনিন: বিপ্লব ও মানবমুক্তির দুই দিগন্ত

ভূমিকা
কবিতার ভাষা কেমন, কবিতার পরিসীমা কতদূর অথবা কবিতার রং কী— এ নিয়ে ধ্রুপদী থেকে সমকালীন সাহিত্যের পাতায় পাতায় লেখালেখি কম হয়নি। আপাতত এ আলোচনা একপাশে থাক। এবার একটু দৃষ্টিপাত করা যাক কবিতার সার্বজনীনতা নিয়ে, যা অ্যারিস্টটলের বয়ানে এখনো আমাদের মাঝে প্রাসঙ্গিক হয়ে আছে। তাঁর ভাষায়, “কবিতা দর্শন ও ইতিহাসের চেয়েও বেশি গভীর, যা চিরন্তন সত্যের দিকে ধাবিত করে”।[1]
এই সত্য একজন কবির কাছে চির আরাধ্য। কবি তাঁর শব্দের বুনন আর উপমার জলছাপে তুলে ধরেন চিন্তা ও ভাবের প্রগাঢ়তা। ধর্ম, ভাষা, স্থান, কাল, মতাদর্শ— এ সকল ইটের গাঁথুনি ছাপিয়ে নানা বর্ণের কবিরা তাঁদের চিন্তাগুলোকে এক মোহনায় জড়ো করেন। আর গড়ে ওঠে এক মহাসত্যের মিনার। এই যেন এক পরম সৌন্দর্য!
কবি আল্লামা ইকবাল প্রাচ্যের এক দূরদর্শী চিন্তাবিদ। রাজনীতি, সাহিত্য, দর্শন ও আধ্যাত্মিকতার এক অপার মিশেলে তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের অনন্য কিংবদন্তি। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের জ্ঞান-দর্শনের সমন্বয়ে নিজেকে একজন আধুনিক মননশীল ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন; পশ্চিমের একাডেমিয়াতেও সফলভাবে বিচরণ করেছেন। আধুনিক সময়ের অন্যতম দার্শনিক ফ্রেডরিখ নিটশে থেকে শুরু করে প্রখ্যাত কবি ম্যাথু আর্নল্ডের চিন্তা দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত আল্লামা ইকবাল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের চিন্তার সেতুবন্ধন করেছেন।
এই গুরুত্বপূর্ণ সময়কালে রুশ বিপ্লবের মহানায়ক ভ্লাদিমির লেনিন সমকালীন সকল চিন্তাবিদের চিন্তাজগতে স্থান করে নিয়েছিলেন। নিকোলাস জারের সামন্তবাদকে হটিয়ে কৃষক-মজুরদের এই বিপ্লবের গল্প তখন সকলের মুখে মুখে।[2]
লেনিন কবি আল্লামা ইকবালের চিন্তা ও কলমে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন অত্যন্ত নাটকীয় ও বিস্ময়করভাবে। ইকবাল তাঁর কাব্য ও দর্শন চিন্তার বলয়ের বাইরে গিয়েও সার্বজনীনভাবে বিশ্বমানবতার কথা তাঁর বিশ্বাসের সুরে বুলন্দ রেখেছেন। কবি তাঁর দরাজ গলায় এই সুরের অনুরণন করেছেন দ্বিধাহীনভাবে:
মুসলিম হ্যায় হাম ওয়াতান হ্যায়, সারা জাহান হামারা (আরব আমার, ভারত আমার, চীনও আমার নয়গো পর,
বিশ্বজোড়া মুসলিম আমি, সারাটি জাহানে বেঁধেছি ঘর) —— (তারানায়ে মিল্লি / আল্লামা ইকবাল)
কবি ইকবালের মননে যেমন আত্মদর্শন (খুদী), মুসলিম তাহযিব-তামাদ্দুন ও হারানো ঐতিহ্যের হাহাকার ছিলো, তেমনি সমানভাবে ভৌগোলিক সীমানা ছাপিয়ে তিনি মজলুমের সারথি হয়ে থেকেছেন অবিরামভাবে।[3][4]
রুশ বিপ্লব ও মজলুমের সারথী কবি
মানব ইতিহাসের শুরু থেকে অদ্যাবধি সমাজ ও সভ্যতার নানা রকম বাঁক বদলে জালেম-মজলুমের ধারণা নানারকমের দৃশ্যপটে এসে হাজির হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯১৭ সালে সংগঠিত, রুশ বিপ্লব ইতিহাসের এক যুগান্তকারী ঘটনায় আবির্ভূত হয়েছে। বলশেভিক নেতা লেনিনের নেতৃত্বে পুঁজিপতির শোষণের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণির এই আপোষহীন সংগ্রাম সমগ্র বিশ্বকে জাগিয়ে দিয়েছিলো।[5]
পৃথিবীবাসীর কাছে এক মহাআশ্চর্য এই সংবাদ। যেখানে কৃষক, দিনমজুর তাদের কাস্তে কোদাল, হাতুড়ি নিয়ে ইতিহাসের মহানায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। মানবতার কবি আল্লামা ইকবালকেও এই ঘটনা কম আন্দোলিত করেনি। যে শ্রমিক খোদার বন্ধু, যে শ্রমিকের গায়ের ঘাম খোদার কাছে তার মজুরির চেয়ে মহান— সেই শ্রমিকের এই জয়যাত্রাকে কবি হৃদয় দিয়ে আলিঙ্গন করেছেন। মজলুমের এই দূর্গম যাত্রার নেতৃত্ব দানকারী মহান নেতাকে কবি কুর্নিশ করতে একটুও কুণ্ঠাবোধ করেন নি।
খোদার দরবারে লেনিন: পুঁজিবাদের সমালোচনা
আল্লামা ইকবাল এক অনন্য উচ্চতার দৃশ্যপটে লেনিনকে নিয়ে গিয়েছেন। স্রষ্টার প্রতি কবির অবিচল বিশ্বাস আর লেনিনের প্রতি মুগ্ধতা— আধ্যাত্মিক ও বাস্তবিক সেতুবন্ধনের এক নবদিগন্তে পা ফেলেছে। আল্লামা ইকবাল লেনিনকে খোদার দরবারে দাঁড় করিয়ে তাঁরই জবানিতে বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদী জুলুমের এক মর্মান্তিক চিত্র তুলে ধরেছেন। লেনিনকে নিয়ে ইকবালের কালজয়ী কবিতা ‘লেনিন খুদা কি হুজুর মেঁ’ (খোদার দরবারে লেনিন)-এ বিশ্বনিপীড়িত শোষণের চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে তিনি হৃদয়ের অবস্থা বর্ণনা করেন এভাবে:[6]
কাঁটে কি তারহা দিল মেঁ খাটাকতি রাহি ইয়ে বাত (খোদা, তোমার আকাশের নীচে আমার দুঃখের বাস,
বিঁধেছে আমায় কাঁটার মতো, হৃদয়ে হয়েছে চাষ) —— (লেনিন খুদা কি হুজুর মেঁ / আল্লামা ইকবাল)
লেলিল তার বেদনাবিধুর কন্ঠে খোদার সামনে বাদী হয়েছেন। ইনসানিয়াতবিহীন পশ্চিমা পুঁজিবাদের চিত্র তুলে ধরেছেন এভাবে:
হাক ইয়ে হ্যায় কি বে-চাশমা-এ-হাইওয়ান হ্যায় ইয়ে জুলমাত,
রানা-এ-তামির মেঁ, রওনক মেঁ, সাফা মেঁ,
গিরজোঁ সে কাহিঁ বারহকে হ্যায় ব্যাংকোঁ কি ইমারাত,
জাহের মেঁ তিজারাত হ্যায়, হাকিকাত মেঁ জুয়া হ্যায়,
সুদ এক কা লাখো কে লিয়ে মার্গে মুফাজাআত,
ইয়ে ইলম, ইয়ে হিকমাত, ইয়ে তাদাব্বুর, ইয়ে হুকুমাত,
পিতে হ্যায় লাহু, দেতে হ্যায় তালিম-এ-মুসাওয়াত (পশ্চিমের এই জ্ঞানের আলো হাঁকিয়াছে দিকবিদিক,
মধ্যখানে তার লুটাইয়াছে জীবন আলোর রূপ ঝিলিক।
শুভ্র সফেদ অট্টালিকার ব্যাংক ইমারত আর টাওয়ার,
ছাপিয়া গিয়াছে গির্জা ছাড়ি, ধর্মতে নেই কিছু চাওয়ার।
জুয়ার আসর ব্যবসার ছলে, সুদে মৃত্যু বহুপ্রাণ,
জ্ঞানপাপীদের হিকমা ইলম, কানুন, কায়দা, কালিম,
রক্ত চুষে শূন্য করে, ফাঁপা বুলি সমতার তালিম) —— (লেনিন খুদা কি হুজুর মেঁ / আল্লামা ইকবাল)
মূলত, অধুনা পশ্চিমা বিশ্ব তার মানবিকতার ছদ্মবেশে পুঁজিবাদের মূল রোপণ করেছে। জ্ঞান, শিল্পকলা ও স্থাপত্যশিল্পের আলোকায়নের উল্টোপিঠে আছে শিল্পবিপ্লবের নামে মানুষকে ‘রোবট’ বানানোর এক অমানবিক প্রচেষ্টা। রূহ-বর্জিত বস্তুবাদের চাকচিক্যময় গোলকধাঁধার আড়ালে প্রকৃত মানবতাকে কেমন করে অবদমিত করা হয়েছে, লেনিনের বয়ানে তা সুস্পষ্ট। যে রূহ সভ্যতার ভিত্তি হয়, তার ফলস্বরূপ মানবতা রসদ জোগায় প্রতিনিয়ত, যা ধর্ম, বর্ণ, গোত্রপ্রথাকে ছাপিয়ে যায়। হৃদয়হীন সমাজব্যবস্থার কথা বলতে গিয়ে বাদী লেনিনের অনুযোগ:[7]
এহসাস-এ-মুরাওয়াত কো কুচাল দেতে হ্যায় আলাত (মুর্দা দিলের মেশিন চলে, হুকুম চালায় নির্বিচার,
মানব দরদ নাইকো যাহার,
অনুভূতি শূন্য করে, ইঞ্জিন ভাঙে নির্বিকার) —— (লেনিন খুদা কি হুজুর মেঁ / আল্লামা ইকবাল)
ফরমানে খোদা: আসমানী ইনকিলাবের আহ্বান
লেনিনের এই বর্ণনার পরবর্তী দৃশ্যপট পুরোপুরিভাবে পাল্টে যায়। এ যেন খোদা প্রদত্ত এক পশ্চিমা ঝঞ্ঝার হুঙ্কার। যে হুঙ্কার কাঁপিয়ে দিয়েছে দ্বান্দ্বিক বৈষম্যের সমাজব্যবস্থার অস্থির চিত্র। খোদা নিজেই যেন পুঁজিবাদী জালিমের বিরুদ্ধে অগ্নিকণ্ঠ; তিনি নিজেই পাঠ করছেন আগামী বিপ্লবের মেনিফেস্টো। ফেরেশতারাও যেন প্রস্তুতি নিচ্ছে কৃষক-মজুরের বেশে পৃথিবীতে আগমনের জন্যে। লক্ষ্য একটাই, কৃষক-মজুরের সাথে কাঁধে কাঁধ মেলাবে ইনসাফ ও ইনকিলাবের লড়াইয়ে।[8]
সত্যের প্রকৃত দর্শন হলো— সে সবসময় নিপীড়িতের পাশে থাকে। আর খোদা তো খোদ সেই পরম সত্যেরই আধার। পুঁজিবাদী জুলুমের বিষবাষ্পে এ দুনিয়া যখন অন্ধকারাচ্ছন্ন, সেখানে মজলুমের পক্ষাবলম্বন করা, তাঁর সপক্ষে কথা বলা, তাঁর হাতকে শক্তিশালী করা খোদ পয়গম্বরের কাজের অনুরূপ। ফেরেশতাদেরকে মজলুমের কাতারে শামিল হওয়ার মধ্য দিয়ে খোদা যেন প্রতিটি বিবেকবান মানুষকে সাম্য ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার হুকুম করছেন। এ এক নয়া জিন্দেগির নয়া বন্দোবস্ত।
‘ফরমানে খোদা’ কবিতার অংশটি ‘লেলিন খোদা কি হুজুর মে’ কবিতার শেষ অংশ, যেখানে কবি ইকবালের বয়ানে আসমানী ইনকিলাবের আহ্বান দেখানো হয়েছে। খোদা নিজেই বিপ্লবের মন্ত্র পাঠ করছেন। পৃথিবীবাসীর হুশ ফিরাচ্ছেন এভাবে:[9]
কাখ-এ-উমারা কে দর-ও-দিওয়ার হিলা দো (আমার শোষিত দিনমজুর বান্দাদের জাগিয়ে তুলো,
বৈষম্যে ভরা শাসকের ঘরের ইটের দেয়াল খুলো) —— (ফরমানে খোদা / আল্লামা ইকবাল)
খোদায়ি স্লোগানে সাম্য ও ইনসাফের সমাজকে তুলে ধরতে আগ্রহী ফেরেশতাদের আহ্বান করা হয়। এ যেন জুলুমের শোষণ ভাঙতে আসমান ও জমিনের পার্থক্য ক্রমশই দূরীভূত হয়ে গেছে। খোদার জমিনে ইনসাফের বাইরে থাকার সুযোগ নেই। এ সমতার ডাকে পুঞ্জীভূত সম্পদের যথাযথ হিস্যা বুঝে না পেলে ফসলের ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই বাকি থাকবে না। কবির ভাষায়:
উস খেত কে হার খোশা-এ-গান্দুম কো জালা দো (কৃষক যেথা পায় ন্যায্য হিস্যা, সেথার তরে নাও,
সমতাবিহীন শস্যদানায় আগুন লাগিয়ে দাও) —— (ফরমানে খোদা / আল্লামা ইকবাল)
এমন বিপ্লবাত্মক আহ্বানের মধ্য দিয়ে খোদা যেনো তার আরশেও শান্তি পাচ্ছেন না। নেমে আসতে চান সেই মজলুমের মিছিলে। যে মাটিতে মজলুম দিনমজুরের রক্ত ও চোখের জল ঝড়ে পড়ে, সেই মাটিতে বাস করে প্রশান্ত হতে চান। কবির ভাষায়:
মেরে লিয়ে মিট্টি কা হারাম অওর বানা দো (তখতে বসেও নাখোশ আমি, খাস মহলে নেই আরাম,
মজলুমের পাশে মাটির ঘরে, বানাও আমার ঘর হারাম) —— (ফরমানে খোদা / আল্লামা ইকবাল)
ইকবাল কি কমিউনিজমের সমর্থক ছিলেন?
আল্লামা ইকবাল তাঁর সমগ্র জীবনব্যাপী ইমানি রওশনে আত্মদর্শনের বিকাশের কথা বলেছেন। সেই বিকাশমান আলোর বিচ্ছুরণ স্থান, কাল, জাতি ও সম্প্রদায়কে ছাপিয়ে গেছে। একজন কবির কোনো নির্দিষ্ট দেশ নেই, ভাষা নেই; সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে বিচরণশীল কবি মানবতার পক্ষে, মজলুমের পক্ষে যেখানেই সত্যকে খুঁজে পান, তা মর্মে ধারণ করেন।
ভ্লাদিমির লেনিন ও রুশ বিপ্লব বিংশ শতাব্দীর উজ্জ্বল আকাশে দুটি ধ্রুবতারা যারা ইতিহাসে অম্লান হয়ে থাকবে। দর্শনগতভাবে রুশ বিপ্লবের নেতা লেনিন বস্তুতান্ত্রিক চেতনায় বিশ্বাসী হলেও কবি ইকবাল সেই আলোচনায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং আল্লামা ইকবাল তাঁর দর্শনের আলোকে ইনসাফ ও সাম্যের শাশ্বত ঐশী ধারণাকে লেনিনের বিপ্লবী স্পৃহায় যুক্ত করেছেন। বিশ্বাসের দিক দিয়ে দুজন দুই বলয়ের হওয়া সত্ত্বেও, উম্মাহর মানবতার প্রশ্নে আসমানি ধারণাকে আল্লামা ইকবাল সর্বব্যাপী করেছেন। তিনি সমগ্র মানবতার আত্মাকে খোদায়ি দর্শনে অনুভব করেছেন।
ইসলামী দর্শনে পুঁজিবাদের ধারণা ও কমিউনিজম ধারণার চিন্তাগত মৌলিক ও স্বতন্ত্র পার্থক্য আছে। ইসলাম ধর্ম একজন মুমিনকে সম্পদ অর্জনে নিষেধ করেনি; বরং তা বৈধতার প্রশ্ন, যাকাত, মানুষের হক— এ সকল মানদণ্ড যথাযথভাবে পালনের নিশ্চয়তা চায়, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো সমাজে ইনসাফ, আদল ও কল্যাণমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। এই তাত্ত্বিক ধারণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সকল মানবিক সংগ্রামে ইসলামী দর্শনের পূর্ণ সমর্থন ও যথাযথ প্রচেষ্টার বিধান কার্যকর। হাদিসের ভাষায়, প্রতিটি শ্রমিক খোদা তা’লার পরম বন্ধু এবং তাঁর ন্যায্য অধিকারের জন্য সংগ্রাম মানেই ইনসাফ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। এটাই যুগ যুগ ধরে প্রেরিত নবী-রাসূলদের মিশনের অন্যতম একটি প্রধান অনুষঙ্গ।
তবে আল্লামা ইকবালের এই সাম্যবাদী সমর্থনকে কেবল একটি আবেগিক বা ভাসা ভাসা মুগ্ধতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ইকবাল যেমন লেনিনের পুঁজিবাদ-বিরোধিতাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন, ঠিক তেমনি মার্কসবাদের নাস্তিক্যবাদী ও রূহ-বর্জিত বস্তুতান্ত্রিক দর্শনের বিরুদ্ধে তাঁর কলমকে তীব্রভাবে শাণিত করেছেন। ইকবালের কাছে কমিউনিজম হলো এমন এক সমাজব্যবস্থা, যা দেখতে সুঠাম দেহের অধিকারী হলেও তার ভেতরে কোনো ‘রূহ’ বা ঐশী প্রাণ নেই। মানুষের আত্মিক মুক্তির কোনো বন্দোবস্ত এই বস্তুতান্ত্রিক দর্শনে অনুপস্থিত।
পরবর্তীকালে প্রখ্যাত আরব স্কলার ড. মুস্তফা সিবায়ী এবং ইরানি চিন্তাবিদ ড. আলি শরিয়তির দার্শনিক বয়ানেও ইকবালের এই চিন্তার চমৎকার প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়। তাঁদের চিন্তার আলোকে বলা যায়, কমিউনিজম বস্তুত ‘আত্মা ছাড়া শরীর’। শরিয়তি যেমনটা মনে করতেন— পুঁজিবাদ মানুষকে বানিয়েছে স্রেফ অর্থনৈতিক উৎপাদনের যন্ত্র, আর কমিউনিজম মানুষকে পরিণত করেছে রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি প্রাণহীন বস্তুতে। উভয়ের মাঝেই মানুষের ‘খুদী’ বা রূহানিয়াত চরম অবমূল্যায়নের শিকার হয়েছে। ইকবালের চোখে লেনিনের এই ঐতিহাসিক বিপ্লব তাই এক অসম্পূর্ণ সত্য। এটি পশ্চিমা পুঁজিবাদের মন্দির থেকে শোষণের মিথ্যা খোদাদের তো ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে, কিন্তু সেই শূন্যস্থানে তাওহীদ বা একত্ববাদের সত্য খোদাকে স্থাপন করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
একটি প্রশ্ন আসতে পারে এমন যে, আল্লামা ইকবাল কি কমিউনিস্ট ব্যবস্থাকে সমর্থন করতেন? মোটা দাগে বলতে গেলে, না। কবির দর্শনে ‘রূহ বা খুদী’ মেটাফিজিক্সের একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ। তিনি আত্মদর্শনের বিকাশ লাভের পথে স্রষ্টার তাওহীদি চেতনার প্রতিফলনের চিন্তায় বিশ্বাসী ছিলেন। এই বলয়ের ভেতর মানবতার কল্যাণ, মজলুমের দর্শন, জিহাদ, উম্মাহর ধারণাসমূহ সহজাতভাবে উপস্থিত হয়েছে।[10]
অপরপক্ষে, কবির চিন্তায় লালিত এই দলিত মজুরের কষ্ট ও লাঞ্ছনা মনস্তাত্ত্বিকভাবে সময়ের সাথে উপস্থিত ছিলো। ভারতীয় উপমহাদেশ সুদীর্ঘ দু’শত বছরের অধিক সময় পুঁজিবাদী ঔপনিবেশিক শোষণের দুঃখময় অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে হেঁটে এসেছে, যার প্রতিটি কষ্টের অনুভূতি কবিকে স্পর্শ করেছে। ফলে সুদূর সোভিয়েত ইউনিয়নের মেহনতি মানুষের হৃদয়ের আকুলতা কবি ইকবাল তীব্রভাবে অনুভব করেছেন।[11]
কবি, অর্থাৎ অনুভূতির মানুষ
আরবিতে কবিকে বলা হয় ‘শায়ের’। যা মূলত ‘শুয়ুর’ শব্দ থেকে এসেছে, যার আরেক নাম হলো অনুভূতি। সুতরাং, একজন কবি হলেন সেই ব্যক্তি যিনি মানুষের হৃদয়ের বিচ্ছিন্ন অনুভূতিগুলো বুঝতে পারেন, তা নিজের হৃদয়ে টেনে আনতে পারেন এবং নিখুঁত শব্দের বুননে পাঠকের হৃদয়ে সঞ্চারিত করতে পারেন। কবিদের এই কাজটিই করতে হয়। যিনি যত ভালোভাবে হৃদয়ের অনুভূতি শব্দের বুননে তুলে ধরতে পারেন, তিনি ততো মহান ও প্রিয় কবি হন। কবি আল্লামা ইকবালের এই দৃশ্যপট আমাদেরকে মজলুমের হৃদয়ের কাছে নিয়ে যায়। নীরবে, একাকীত্বে তার দুঃখের সারথি হয়ে আমরাও কখন যেন অজান্তেই ডুকরে কেঁদে উঠি।





Comments