দর্শনের পদ্ধতিগত বর্ণবাদ

আধুনিক কালের প্রথিতযশা কয়েকজন দার্শনিকের বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টি এখন সবারই বেশ জানা। জন লক, ডেভিড হিউম, ইমানুয়েল কান্ট কিংবা জি ডব্লিউ এফ হেগেলের মতো বহু চিন্তাবিদই মনে করতেন যে, দুনিয়ার কৃষ্ণবর্ণ ও আদিবাসী মানুষেরা অনগ্রসর ও অসভ্য; আর ইউরোপীয় আলোকায়নের ছোঁয়াতেই কেবল তাদের সুধরে নেওয়া সম্ভব।
বর্তমানের কোনো চিন্তাশীল দার্শনিকই অবশ্য এমন চরম বর্ণবাদকে আর সমর্থন করেন না। তবে সংগত কারণেই এই লেখকদের মূল তত্ত্বগুলো এখনো চিন্তাজগতে গভীর মনোযোগের সাথে পঠিত হয়। তাঁদের দার্শনিক অন্তর্দৃষ্টিগুলোকে অক্ষুণ্ণ রাখার স্বার্থে গবেষকদের মাঝে এখন ব্যক্তির নিজস্ব বর্ণবাদী অবস্থান আর তাঁর প্রণীত সামগ্রিক দর্শনকাঠামোকে আলাদা করে দেখার একটি প্রবণতা লক্ষ করা যায়। আফ্রিকানদের নিয়ে হেগেলের বর্ণবাদী মন্তব্যগুলো নিশ্চিতভাবেই ভুল ও অগ্রাহ্য, কিন্তু তা দিয়ে তাঁর ‘স্পেকুলেটিভ মেটাফিজিক্স’-এর বিচার করা চলে না।
সাধারণত যুক্তিটা এমনই দেওয়া হয়। কিন্তু গত কয়েক দশকে বর্ণবাদ নিয়ে আমাদের বোঝাপড়া যদি কিছুটা হলেও স্পষ্ট হয়ে থাকে, তবে একটা বিষয় মানতেই হবে—ব্যক্তির বিচ্ছিন্ন কিছু বর্ণবাদী মন্তব্যের ওপর অতিরিক্ত নজর দিলে, পুরো ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে বর্ণবাদ কীভাবে টিকে থাকে তা ঢাকা পড়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইন হয়তো এখন আর অশ্বেতাঙ্গ মানুষকে সরাসরি অধিকারবঞ্চিত করে না, কিন্তু পাইকারি হারে জেলে পুরে রাখার ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সেখানে পদ্ধতিগত নিপীড়ন ঠিকই জারি রাখা হয়েছে।
দর্শনের জগতেও কি ঠিক এমন কিছু ঘটার আশঙ্কা নেই? দার্শনিকদের ব্যক্তিগত বর্ণবাদের কড়া সমালোচনা করতে গিয়ে আমরা কি অজান্তেই তাঁদের চিন্তার ভেতরের ‘কাঠামোগত বর্ণবাদ’কে অক্ষত রেখে দিচ্ছি?
আধুনিক চিন্তার ইতিহাসে সবচেয়ে সুসংবদ্ধ দর্শনকাঠামোর রূপকার হেগেলের দৃষ্টান্তটিই এ ক্ষেত্রে একটু বিশদভাবে তলিয়ে দেখা যাক। হেগেল যে সরাসরি বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন, তা স্পষ্ট। উদাহরণ হিসেবে, তাঁর মতে আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গরা ছিল ‘সরলতার ঘোরে মগ্ন এক শিশুর জাতি’ (race of children that remain immersed in a state of naiveté)। আদিবাসীদের নিয়ে তিনি লিখেছিলেন যে, তারা মূলত ‘বর্বরতা ও পরাধীনতার’ মাঝে জীবনযাপন করে। এমনকি তাঁর ‘দ্য ফিলোসফি অব রাইট’ (১৮২১) গ্রন্থে তিনি যুক্তি দেখান, এই অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে ইউরোপীয় আলোকায়নের প্রগতিতে শামিল করতে তাদের ওপর ঔপনিবেশিক শাসন কায়েম করার পেছনে এক ধরনের অধিকার তাদের আছে।
তবে হেগেলের এই বর্ণবাদী মন্তব্যগুলো তাঁর মূল দর্শনকাঠামোয় কোনো ছাপ ফেলেছে কি না, তা প্রথম দেখায় স্পষ্ট মনে নাও হতে পারে। অধিবিদ্যা, নন্দনতত্ত্ব, ইতিহাস, রাজনীতি, এমনকি উদ্ভিদবিজ্ঞান বা চৌম্বকত্বের মতো বিষয়ে তাঁর বিশাল সব লেখায় তিনি দেখাতে চেয়েছেন কীভাবে ডায়ালেকটিক ট্রান্সফর্মেশন কাজ করে।
হেগেলের ডায়ালেকটিক্স বা দ্বান্দ্বিক তত্ত্ব বেশ জটিল বলেই পরিচিত। তবে সহজ কথায় একে এভাবে বোঝানো যায় যে, এখানে মূলত পরস্পরবিরোধী দুটি ধারণাকে মুখোমুখি দাঁড়ানো হয়। একসময় তাদের ভেতরের নিজস্ব বিরোধগুলো কেটে যায়। আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় আগের চেয়ে আরও বড় ও সত্য একটি নতুন ধারণা।
এর একটি বড় উদাহরণ হলো ‘প্রভু-দাস দ্বন্দ্ব’, যা হেগেল মানুষের মাঝে সমতার সম্পর্ক তৈরির পথ হিসেবে দেখিয়েছেন। এখানে তিনি দেখান, প্রভু ও দাসের এই বিপরীত অবস্থান এমন এক দমবন্ধ ও অস্থির পরিস্থিতি তৈরি করে যা একসময় ভাঙতে বাধ্য; আর এটি শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহের পথ ধরে একটি সমতাভিত্তিক ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যায়।
এই উদাহরণ দেখে যে কেউ স্বাভাবিকভাবেই ভাববেন যে, হেগেলের দর্শনকাঠামো অন্তত বর্ণবাদী হতে পারে না। খ্যাতনামা সমাজ-তাত্ত্বিক সুসান বাক-মরস তো আরও এক ধাপ এগিয়ে দাবি করেছেন, হেগেল আসলে এই প্রভু-দাস দ্বন্দ্বের রূপকে হাইতির দাস বিপ্লবের ইতিহাসকেই তাঁর দর্শনে তুলে ধরেছিলেন। অর্থাৎ, ব্যক্তিগত চিন্তায় বর্ণবাদ থাকলেও, দর্শনের সত্য উন্মোচনের তাগিদেই হেগেল শেষ পর্যন্ত বিপ্লবী সংগ্রামের মাধ্যমে এক সর্বজনীন ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। যদি তা-ই হয়, তবে তাঁর দর্শন তাঁর নিজের বর্ণবাদেরই বিপরীত। ঠিক এই অমিলের কারণেই বিশ্লেষকেরা হেগেলের প্রকাশ্য বর্ণবাদ এবং তাঁর মূল দর্শনের তাৎপর্যকে আলাদা করে দেখার পক্ষে যুক্তি দেন।
কিন্তু আমরা যদি হেগেলের এই দ্বান্দ্বিক ধারণার গোড়ার দিকে একটু গভীরভাবে তাকাই, তবে এই পার্থক্যের দেয়াল ভেঙে পড়ে। সেখানে দেখা যাবে, ঔপনিবেশিক বর্ণবাদ সরাসরি তাঁর এই দ্বান্দ্বিক চিন্তার মূল ভিত্তি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিল। আজকের দুনিয়ায় কাঠামোগত বর্ণবাদকে যেমন শুধু একজন ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট কিছু বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে বোঝা যায় না, দর্শনের ভেতরের কাঠামোগত বর্ণবাদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি এক। এর জন্য আমাদের ধারণাগুলোর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট জানতে হবে; বুঝতে হবে কীভাবে বর্ণবাদ এগুলোর জন্মকে প্রভাবিত করেছিল এবং কীভাবে তা আজও আমাদের অজান্তেই আমাদের চিন্তার ধরনকে নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে।
তবে ডায়ালেকটিক্স বা দ্বান্দ্বিকতার পুরো ইতিহাসই যে বর্ণবাদী চিন্তায় ডুবে আছে, এমনটি বলা ভুল হবে। উদাহরণস্বরূপ, সক্রেটিসের দ্বান্দ্বিক তত্ত্বের কথা বলা যায়। এই তত্ত্বে মূলত কোনো ধারণার অভ্যন্তরীণ নিজস্ব বিরোধ ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সংলাপের মাধ্যমে এই বিষয়গুলোকে ফুটিয়ে তোলা হয়।
এছাড়া ‘বৌদ্ধ দ্বান্দ্বিকতা’ নামেও একটি ধারণা রয়েছে। এটি মূলত বৌদ্ধ দার্শনিক নাগার্জুনের (আনুমানিক ১৫০-২৫০ খ্রিস্টাব্দ) কাজের তিব্বতি ব্যাখ্যার সাথে জড়িত। এই তত্ত্বে প্রচলিত বাস্তব সত্তাগুলোর চূড়ান্ত শূন্যতা বা সারবত্তাহীনতাকে দেখানো হয়।
হেগেলের দ্বান্দ্বিক চিন্তার শিকড়ও আসলে অনেক গভীরে। তিনি প্লেটো ও নব্য-প্লেটোবাদ পড়েছিলেন, সম্ভবত ভারতীয় দর্শনও তাঁর জানা ছিল। পাশাপাশি তিনি চুম্বকবিজ্ঞানের বিপরীত দুই মেরুর ধারণা নিয়েও পড়াশোনা করেন। এই বিপরীত মেরুগুলো যেভাবে প্রাকৃতিক বিশ্বে একটি শৃঙ্খলা বজায় রাখে, তা তাঁর চিন্তায় প্রভাব ফেলেছিল। প্রকৃতপক্ষে, হেগেলের মতে এই দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া সবখানেই সক্রিয়। বর্তমানের কারাব্যবস্থার সবকিছুকে যেমন কেবল বর্ণবাদ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না, হেগেলের দর্শনের পরিধিও ঠিক তেমনই শুধু বর্ণবাদে সীমাবদ্ধ নয়। তবে এটিও সমান সত্য যে, বর্ণবাদের প্রসঙ্গ ছাড়া আজকের কারাব্যবস্থা কিংবা হেগেলের দর্শন কাঠামো কোনোটিই পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়।
হেগেলের ঠিক আগের দুজন চিন্তাবিদও এই দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন। তাঁরা হলেন ঝাঁ-ঝাক রুসো এবং ফ্রিডরিশ শিলার। তাঁদের দিকে তাকালে বোঝা যায়, এই পদ্ধতিটি প্লেটো বা চুম্বকবিজ্ঞানের মতোই ঔপনিবেশিক ইতিহাসের দ্বারাও গভীরভাবে প্রভাবিত ছিল।
রুসোর চিন্তাভাবনা হেগেলকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। হেগেলের মতোই রুসোও ঔপনিবেশিক নৃবিজ্ঞানী এবং ধর্মপ্রচারকদের লেখা বিবরণগুলো গভীর আগ্রহ নিয়ে পড়তেন। তবে হেগেলের সাথে তাঁর ভাবনার একটা পার্থক্য ছিল। রুসো মনে করতেন তিনি এমন এক জনগোষ্ঠীর কথা পড়ছেন যারা এক শান্ত ও মনোরম জীবনযাপন করে। ১৭৫৫ সালে প্রকাশিত একটি গ্রন্থে রুসো অ্যান্টিলিসের মতো অঞ্চলের ধর্মপ্রচারকদের বিবরণ ব্যবহার করেন। এর মাধ্যমে তিনি দেখান কীভাবে আমেরিকার আদিবাসীরা এক নিখুঁত সমতা ও শান্তিতে বসবাস করত। ইউরোপীয়রা যখন সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন এবং কৃত্রিম হয়ে উঠছিল, রুসোর চোখে আমেরিকার সেই সহজ-সরল সমতাই ছিল মানুষের স্বাভাবিক জীবনধারা।
তবে রুসো এমনটা চাননি যে ইউরোপীয়রা আবার সেই আদিম জীবনে ফিরে যাক। আবার ইউরোপের সাথে যোগাযোগ তৈরি হওয়ার পর আমেরিকার আদিবাসীরাও যে চিরকাল সেই আদিম অবস্থায় থাকবে, তাও তিনি বিশ্বাস করতেন না। রুসোর মতে, তাঁর ভাষায় ‘ক্যারিব’ বা আদিবাসীদের আরও বেশি যুক্তিবাদী হওয়া দরকার ছিল। অন্যদিকে, ইউরোপীয়দের প্রয়োজন ছিল আদিবাসীদের মতো সহজ-সরল ও প্রাকৃতিক হওয়া।
(বলে রাখা ভালো, ‘ক্যারিব’ শব্দটি ঔপনিবেশিক আমলের নৃবিজ্ঞান থেকে এসেছে। এটি অ্যান্টিলিসের বিভিন্ন গোষ্ঠীকে একসাথে বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। তাই এর বদলে অন্য কোনো সঠিক শব্দ ব্যবহার করা কঠিন। অবশ্য এই জনগোষ্ঠীর অনেকেই নিজেদের ‘কালিনাগো’ বলে পরিচয় দিত।)
ক্যারিব ও ইউরোপীয়দের এই পরস্পরবিরোধী দুটি উপাদানকে মেলানো দরকার ছিল। উপাদান দুটি হলো—সহজাত প্রবৃত্তি এবং যুক্তি। এই দুটির মিলনে তৈরি হতো জীবনের এক নতুন ধারা। একে বলা যায় ‘সহজাত যুক্তিবোধ’। এটি দুই পক্ষের সমস্যাগুলো দূর করে সম্পূর্ণ নতুন এক তৃতীয় জীবন ব্যবস্থার জন্ম দিত। রুসো একে বলতেন ‘শহরে বসবাসের উপযোগী এক বনমানুষ’ (savage made to inhabit cities) তৈরি করা।
বিষয়টি চেনা চেনা লাগছে কি? আপাতদৃষ্টিতে বিপরীত দুটি বিষয় মিলে সম্পূর্ণ নতুন কিছু তৈরি করছে। আনুষ্ঠানিক নাম পাওয়ার আগেই এটি আসলে ছিল ডায়ালেকটিক্স বা দ্বান্দ্বিক তত্ত্বের প্রয়োগ।
এই প্রকাশ্য বর্ণবাদী যুক্তিটি কীভাবে পরে দ্বান্দ্বিক তত্ত্বের মূল কাঠামোয় জায়গা করে নিয়েছিল, তা রুসোর একটি বিখ্যাত গল্প থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়। গল্পটি তিনি তাঁর ‘ডিসকোর্স’ গ্রন্থে লিখেছেন। সেখানে এক আদিবাসীর কথা বলা হয়েছে। সে সকালে এক ফরাসি উপনিবেশবাদীর কাছে নিজের ঝুলন্ত বিছানা (হ্যামক) বিক্রি করে দেয়। কিন্তু রাত হতেই সেটি আবার ফেরত চায়।
রুসো লিখেছেন:
তার [ক্যারিব আদিবাসীর] মনে কোনো উদ্বেগ নেই। সে কেবল তার বর্তমান অবস্থা নিয়েই মগ্ন থাকে। ভবিষ্যৎ যত কাছেই হোক না কেন, তা নিয়ে তার কোনো ভাবনাই নেই। তার পরিকল্পনাগুলোও খুব সীমিত। সে বড়জোর সন্ধ্যা পর্যন্ত পরিকল্পনা করে। ক্যারিবদের দূরদর্শিতার দৌড় ঠিক এইটুকুই। সকালে সে তার তুলোর বিছানা বিক্রি করে দেয়। আর রাতে সেটি যে আবার লাগবে—এই সাধারণ বিষয়টি বুঝতে না পেরে, সন্ধ্যায় সে কেঁদে কেঁদে সেটি ফেরত কিনতে আসে।
এই গল্পটি ১৬৬৭ সালের একটি বিবরণ থেকে নেওয়া। ধর্মপ্রচারক জঁ-ব্যাপটিস্ট দু তের্ত্রে অ্যান্টিলিসের মানুষের ওপর এই বিবরণ লিখেছিলেন। তিনি থাকতেন বর্তমানের গুয়াদেলুপ অঞ্চলে। মজার বিষয় হলো, দু তের্ত্রের মূল গল্পে একটি বিশেষ প্রেক্ষাপট ছিল। রুসো তাঁর লেখায় সেটি পুরোপুরি বাদ দিয়েছেন। দু তের্ত্রের মতে, আদিবাসীরা যে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে পারত না বিষয়টি আসলে তা না। আসল কারণটি ছিল অনেক বেশি যৌক্তিক। লেনদেন বা কেনাবেচা নিয়ে ফরাসিদের সাথে আদিবাসীদের ধারণার অমিল ছিল।
ফরাসিদের কাছে কোনো বেচাকেনা ছিল চূড়ান্ত বা স্থায়ী। কিন্তু আদিবাসীদের কাছে তা ছিল সাময়িক। দু তের্ত্রে লিখেছেন,
ক্যারিবরা আশা করত, ফরাসিরাও তাদের নিজেদের ভেতরের সম্পর্কের মতো আচরণ করবে। অর্থাৎ, ফরাসিদের কাছে যা-ই চাওয়া হবে, তারা যেন তা মন খুলে দিয়ে দেয়।
এই বিবরণ অনুযায়ী, ফরাসিদেরই বরং বোকা মনে হয়। কারণ দিনের বেলা ঘুমানোর হ্যামক অদলবদল করার কোনো মানে হয় না। তাছাড়া, আদিবাসীদের এলাকায় গিয়ে তাদের এই উদারতার মূল্যায়ন না করাটা ফরাসিদের এক ধরনের অভদ্রতাও ছিল।
রুসোর লেখায় এই পুরো প্রেক্ষাপটটি উধাও হয়ে গেছে। লেনদেন ও উপহার দেওয়ার চমৎকার এক সামাজিক রীতি ছিল এই আদিবাসীদের। অথচ রুসোর লেখায় তারা হয়ে গেল এক-মাত্রিক চরিত্র, যাদের যেন সময়ের কোনো জ্ঞানই নেই। তবে দ্বান্দ্বিকতার ইতিহাসের জন্য আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। তা হলো—এই বর্ণবাদী ভুলের ওপর দাঁড়িয়ে রুসো দর্শনের জগতে কোন তত্ত্বটি তৈরি করেছিলেন।
রুসো তাঁর নিজের কল্পিত এই মানুষদের যেমন হিংসে করতেন, তেমনি তাদের সমালোচনাও করতেন। তিনি মনে করতেন, মানুষের বেশিরভাগ কষ্টের মূল কারণ হলো ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করা। তিনি লিখেছিলেন:
দূরদর্শিতা! এই দূরদর্শিতাই আমাদের অনবরত বর্তমান থেকে দূরে নিয়ে যায়। এমন এক জায়গায় দাঁড় করায় যেখানে আমরা হয়তো কখনোই পৌঁছাতে পারব না… হে মানুষ, তোমার অস্তিত্বকে নিজের ভেতরেই গুটিয়ে রাখো। তাহলে তুমি আর কষ্ট পাবে না।
তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন ক্যারিবদের কোনো দূরদর্শিতা নেই। আর সেই কারণেই তিনি তাদের সুখী এবং ‘উদ্বেগহীন’ মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
কিন্তু রুসো এটাও জানতেন যে, ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা না করলে কোনো পরিকল্পনা বা অগ্রগতি সম্ভব নয়। ১৭৬২ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘অন দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ গ্রন্থে তিনি বলেন, সামাজিক জীবনের জন্য আমাদের ‘সহজাত প্রবৃত্তির বদলে ন্যায়বিচারকে’ বেছে নিতে হবে।
আমাদের এমন একটা পথ খুঁজে বের করতে হবে যাতে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবা যায়। কারণ এই ভাবনাই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে। আবার একই সাথে বর্তমানের আনন্দ ও প্রশান্তিও যেন হারিয়ে না যায়।
অর্থাৎ, আমাদের সহজাত প্রবৃত্তি এবং যুক্তিবোধের মতো দুটি বিপরীত ধারণাকে মেলাতে হবে। এর ফলে জীবনের এমন এক নতুন ধারা তৈরি হবে যেখানে আমরা ভবিষ্যতের কথা ভুলে যাব না, আবার বর্তমান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজের সুখও নষ্ট করব না। অর্থাৎ, ফরাসি আর ক্যারিবদের সংস্কৃতির মাঝে এক ধরনের দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার প্রয়োজন ছিল।
আর এই পুরো চিন্তাভাবনা বা দ্বান্দ্বিক তত্ত্বের ভিত্তিটি দাঁড়িয়ে আছে রুসোর একটি বর্ণবাদী ধারণার ওপর। ধারণাটি ছিল—অ্যান্টিলিসের মানুষ এতটাই বোকা যে তারা সকালে বুঝতে পারে না যে রাতে ঘুমানোর জন্য তাদের একটি ঝুলন্ত বিছানা লাগবে।
কোনো সন্দিহান পাঠক হয়তো বলতে পারেন, এটি কেবল রুসোর নিজস্ব সমস্যা। এর সাথে মূল দ্বান্দ্বিক তত্ত্বের কোনো সম্পর্ক নেই। হেগেলের বর্ণবাদী লেখার সাথেও এর কোনো মিল নেই।
কিন্তু রুসোর পর জার্মান চিন্তাধারায় এই দ্বান্দ্বিক তত্ত্বের ইতিহাস যেভাবে এগিয়েছে, তা লক্ষ্য করলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। রূপটি যতই তাত্ত্বিক বা জটিল হোক না কেন, এই ঔপনিবেশিক বর্ণবাদ ঠিকই এর সাথে মিশে ছিল। হেগেলের আগে দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করা প্রধান চিন্তাবিদদের একজন ছিলেন কবি ও দার্শনিক ফ্রিডরিশ শিলার। ১৭৯৫ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘লেটারস অন দ্য এসথেটিক এডুকেশন অব ম্যান’ গ্রন্থে শিলার স্পষ্টভাবেই রুসোর সেই কাজটি হাতে নেন। এই বইটি হেগেলের দ্বান্দ্বিক দর্শনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এখানে শিলার বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে সহজাত প্রবৃত্তি ও যুক্তিবোধকে মেলানোর চেষ্টা করেন।
রুসোর মতোই শিলার বিশ্বাস করতেন যে, ‘প্রাকৃতিক মানুষের’ প্রবৃত্তি-চালিত জীবন এবং ইউরোপীয়দের যুক্তি-চালিত জীবনের মধ্যে একটি বড় দূরত্ব তৈরি হয়েছে। রুসোর মতো তিনিও প্রবৃত্তির ভেতরের ভালো দিক এবং যুক্তির ভেতরের ভালো দিক—এই দুটিকে একসাথে মেলাতে চেয়েছিলেন। এটি করার উপায় হিসেবে তিনি লিখেছিলেন:
“মানুষের শারীরিক চরিত্র থেকে তার খামখেয়ালিপনাকে এবং তার নৈতিক চরিত্র থেকে তার স্বাধীনতাকে আলাদা করতে হবে। প্রথমটিকে নিয়মের অধীনে আনতে হবে এবং দ্বিতীয়টিকে ইন্দ্রিয়জাত অনুভূতির ওপর নির্ভরশীল করতে হবে… [এবং এই দুটির মিলনে] এক তৃতীয় চরিত্রের জন্ম দিতে হবে…”
শিলারের ভাষা রুসোর চেয়ে বেশি তাত্ত্বিক হলেও, তাঁর বর্ণবাদী ধারণাটি কিন্তু একই ছিল। তাঁর মতে, কিছু মানুষ কেবল প্রবৃত্তির ঘোরে মগ্ন (আইনহীন ‘বর্বর’), আবার কিছু মানুষ যুক্তির মাঝে হারিয়ে গেছে (আবেগহীন ইউরোপীয়)। আর লক্ষ্য হলো, দুই পক্ষের খারাপ দিকগুলো বাদ দিয়ে ভালো অংশগুলোকে একসাথে মেলানো।
বর্জন এবং সংরক্ষণের এই যুগলবন্দিকে বোঝাতে শিলার একটি জার্মান শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। তা হলো, ‘আউফহেবুং’ (Aufhebung)। ইংরেজিতে একে বলা হয় ‘সাবলেশন’ (sublation)। শব্দটির চমৎকার একটি অর্থ আছে—একই সাথে কোনো কিছুকে ‘বাতিল করা’ আবার ‘টিকিয়ে রাখা’। হেগেল এই শব্দটির প্রতি ভীষণ মুগ্ধ ছিলেন।
হেগেলের লেখায় অবশ্য সাবলেশনের সংজ্ঞাগুলো বেশ জটিল ও তাত্ত্বিক। (যেমন—অস্তিত্ব এবং অনস্তিত্বের সাবলেশন নিয়ে তিনি লিখেছেন: “অস্তিত্ব আর শূন্যতা যতক্ষণ আলাদা থাকে, ততক্ষণই তাদের নিজস্ব পরিচয় থাকে। কিন্তু তারা যখন এক হয়ে যায়, তখন নিজেদের এই পুরোনো রূপ হারিয়ে তারা সম্পূর্ণ নতুন কিছুতে বদলে যায়। “)
তবে এই কঠিন তত্ত্বের ঔপনিবেশিক ইতিহাসটি পরিষ্কার বোঝা যায়। এই সাবলেশন বা আউফহেবুং-এর কাজটিই আসলে রুসো ক্যারিব আদিবাসীদের ক্ষেত্রে করতে চেয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন আদিবাসীদের দূরদর্শিতার অভাবকে ‘বাতিল’ করতে, কিন্তু বর্তমানকে উপভোগ করার ক্ষমতাকে ‘টিকিয়ে রাখতে’। এর মাধ্যমে তাদের আরও সুশৃঙ্খল কিন্তু সুখী এক জীবন দেওয়া সম্ভব হতো।
ইউরোপীয়দের জন্যও তিনি একই জিনিস চেয়েছিলেন। তাদের অতিরিক্ত দূরদর্শিতাকে বাতিল করা, ন্যায়ের চেতনাকে টিকিয়ে রাখা এবং তাদের আরও সুখী জীবনে উন্নীত করা। এই প্রক্রিয়ার শেষ পরিণতি ছিল দুই সংস্কৃতির ভালো উপাদানের মিলন, যাকে শিলার বলেছিলেন সেই ‘তৃতীয় চরিত্র’—অর্থাৎ ‘শহরে বসবাসের উপযোগী এক বনমানুষ’।
নিজের দ্বান্দ্বিক সাবলেশন তত্ত্বটি তৈরির সময় হেগেলের মাথায় হয়তো প্লেটো কিংবা চুম্বকবিজ্ঞানের প্রভাব ছিল। কিন্তু মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাঁর এই দ্বান্দ্বিক দর্শন যে তাঁর পূর্বসূরিদের থেকে পাওয়া বর্ণবাদী চিন্তার সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তিনি এই বর্ণবাদকে রূপ দিয়েছিলেন এক তাত্ত্বিক ও পদ্ধতিগত কাঠামোয়।
বিষয়টি বুঝতে হেগেলের বিখ্যাত ‘প্রভু-দাস দ্বন্দ্ব’ তত্ত্বের দিকে তাকানো যাক। এই তত্ত্বের একটি সংস্করণে তিনি মানুষের ‘আত্মসচেতনতা’ বা সেলফ-কনশাসনেসের জন্ম নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি পুরো গল্পটি সাজিয়েছেন মানুষের আদিম বা ‘প্রাকৃতিক অবস্থা’র পটভূমিতে। রুসোর মতে, ক্যারিব আদিবাসীরা ঠিক এই অবস্থাতেই আটকে ছিল।
হেগেল বুঝতে চেয়েছিলেন কীভাবে আদিম মানুষ স্রেফ জৈবিক চাহিদা ও বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে এক সর্বজনীন অবস্থায় পৌঁছায়। রুসোর সেই ক্যারিবদের মতো অবস্থা থেকে মানুষ কীভাবে রুসো, শিলার বা হেগেলের মতো দার্শনিক হয়ে উঠল? বর্তমানের গণ্ডি পেরিয়ে তারা কীভাবে চিরন্তন ও সর্বজনীন সত্য নিয়ে কথা বলার যোগ্যতা অর্জন করল?
আদিম বনে যখন দুজন মানুষের হঠাৎ মুখোমুখি দেখা হয়, তখন তাদের অবচেতন জীবনের ঘোর কাটে। অন্য একজন মানুষকে দেখার সাথে সাথেই আমার মনে এই আশঙ্কা তৈরি হয় যে, সে হয়তো আমাকে স্রেফ একটা ‘বস্তু’ হিসেবে দেখবে। নিজের ভেতরের ‘মানুষ’ বা কর্তাসত্তাকে টিকিয়ে রাখতে এবং বস্তুতে পরিণত হওয়া এড়াতে, আমি উল্টো তাকেই বস্তু বানিয়ে ফেলার চেষ্টা করি।
এখান থেকেই জন্ম নেয় প্রভু ও দাসের সম্পর্ক। এই লড়াইয়ে যে জেতে, সে হয় প্রথম প্রভু। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে অন্যকে বস্তু বানিয়ে ফেলার কারণে বিজয়ী ব্যক্তিটি নিজের কর্তাসত্তার আসল রূপটিই হারিয়ে ফেলে। কারণ, অন্য একজন মানুষের কাছ থেকে সমমর্যাদার স্বীকৃতি পাওয়ার সুযোগ তার আর থাকে না।
তাই সত্যিকারের আত্মসচেতনতা তখনই সম্ভব, যখন এই দাসত্ব ঘুচে যায় এবং দুজন সমান মর্যাদার মানুষ একে অপরকে স্বীকৃতি দেয়। এই প্রক্রিয়ায় দুই পক্ষের নেতিবাচক দিকগুলো বাতিল হয়ে যায়, কর্তাসত্তার মূল চেতনাটি টিকে থাকে এবং দুজনেই সমান মর্যাদার এক নতুন আত্মসচেতনতায় উন্নীত হয়।
আসল সমস্যাটি অন্য জায়গায়। হেগেল বিশ্বাস করতেন, কৃষ্ণাঙ্গ ও আদিবাসীদের ভেতরের দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়াটি ঘুমন্ত। তারা স্রেফ প্রকৃতির মাঝেই আটকে আছে। নিজের চেষ্টায় মুক্ত বা আত্মসচেতন হওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
ঠিক এই কারণেই তিনি উপনিবেশ শাসনকে সমর্থন করতেন। একে তিনি বলতেন ‘বীরের অধিকার’ (right of heroes)। তাঁর মতে, ইউরোপীয় শাসনের হাত ধরেই কেবল অন্য জাতিগুলো প্রগতির পথে হাঁটবে। তারা শামিল হবে মানুষের স্বাধীনতার যাত্রায়।
তাই সুসান বাক-মরসের ধারণার সাথে এখানে দ্বিমত করা চলে। হেগেলের কাছে হাইতির বিপ্লব কোনো স্বাধীন সংগ্রাম ছিল না। এটি ছিল মূলত ইউরোপীয় আদর্শেরই এক ধরনের জয়।
আফ্রিকার মানুষদের নিয়ে হেগেল লিখেছিলেন:
হাইতিতে কৃষ্ণাঙ্গরা খ্রিস্টীয় নীতিতে একটি রাষ্ট্র গঠন করেছে। কিন্তু সংস্কৃতির প্রতি তাদের কোনো আগ্রহ নেই। তাদের মূল ভূখণ্ড আফ্রিকায় চরম স্বৈরাচার চলে। তাদের ভেতরের চেতনা একেবারেই ঘুমন্ত। তারা নিজের মধ্যেই ডুবে আছে। সেখানে কোনো অগ্রগতির লক্ষণ নেই।
ঔপনিবেশিক বর্ণবাদ এবং দ্বান্দ্বিক তত্ত্বের কাঠামো একে অপরের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। হেগেলের ‘আত্মসচেতনতা’, ‘প্রগতি’ বা ‘স্বাধীনতা’র মতো তাত্ত্বিক ধারণাগুলোও এর বাইরে নয়।
এই দর্শনের চূড়ান্ত ফলাফল হয়তো ভালো হতে পারে। কিন্তু হেগেলের এই ব্যবস্থার শুরুটাই হয়েছিল রুসোর বর্ণবাদী ধারণা থেকে। রুসো দাবি করেছিলেন, ইউরোপীয়রা আসার আগে আদিবাসীরা স্রেফ আদিম অবস্থায় আটকে ছিল। তাদের কোনো নিজস্ব চিন্তা করার ক্ষমতা ছিল না।
হেগেলের পরের লেখাগুলোতে এই দ্বান্দ্বিক চিন্তা আরও তাত্ত্বিক রূপ নেয়। সেখানে আদিম বা সভ্য মানুষের কথা সরাসরি থাকে না। তার বদলে ‘অস্তিত্ব’ বা ‘অনস্তিত্বের’ মতো কঠিন বিষয় চলে আসে। দর্শনের ভেতরের এই বর্ণবাদকে বুঝতে হলে আমাদের একটি কাজ করতে হবে। প্রকাশ্য বর্ণবাদ কীভাবে কাঠামোগত বর্ণবাদে রূপ নিল, তা দেখতে হবে।
হেগেলের সমর্থকেরা যাই বলুন না কেন, আসল সমস্যাটি এই তাত্ত্বিক রূপের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। এটি একটি সর্বজনীন রূপ নেওয়ার কারণে এর বর্ণবাদী গোড়াটি ঢাকা পড়ে গেছে। এই ইতিহাস না জেনে দ্বান্দ্বিক তত্ত্ব ব্যবহার করা বিপজ্জনক। এতে আমাদের অজান্তেই বর্ণবাদী ধারণা আমাদের চিন্তা, বিশ্বাস ও কাজের মধ্যে ঢুকে যেতে পারে। তাহলে সর্বজনীন সমতার এই দ্বান্দ্বিক সত্যে পৌঁছানোর কি কোনো বর্ণবাদ-বিরোধী পথ আছে?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের একটি ঘটনা দেখা যাক। মার্তিনিকের বিখ্যাত দার্শনিক, কবি ও রাজনীতিবিদ এমে সেজেয়ার হেগেলের প্রধান বই ‘দ্য ফেনোমেনোলজি অব স্পিরিট’ পড়তে বসেন। বইটি পড়া শেষ করে তিনি বেশ উৎসাহিত হন। তিনি তাঁর বন্ধু লিওপোল্ড সেঙ্গরকে এটি দেখান। সেঙ্গর ছিলেন সেনেগালের একজন দার্শনিক, কবি ও দীর্ঘকালীন নেতা।
সেজেয়ার তাঁকে বললেন, ‘শোনো হেগেল কী বলেছেন, লিওপোল্ড: সর্বজনীন অবস্থায় পৌঁছাতে হলে, আগে আগে নিজের নিজস্ব রূপ বা পরিচয় জানতে হবে।!’
হেগেলের এই জটিল দর্শনের মধ্যে সেজেয়ার এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পান। এটি তাঁদের ‘নেগ্রিচ্যুড’ (Négritude) আন্দোলনের সাথে মিলে যাচ্ছিল। ১৯৩০-এর দশকে প্যারিসে সেঙ্গর ও সেজেয়ার এই আন্দোলন শুরু করেছিলেন। এটি ছিল কৃষ্ণাঙ্গদের চিন্তা ও শিল্পের এক লড়াই। হেগেলের দর্শনও ঠিক একই কথা বলছিল। কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে নিজেদের পরিচয়কে মেনে নেওয়া কোনো সংকীর্ণ বিষয় নয়। বরং এটি ছিল মানবজাতির সর্বজনীন অগ্রগতিরই একটি অংশ।
ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী চিন্তাবিদদের মধ্যে কেবল সেজেয়ার আর সেঙ্গরই হেগেলের কাজের গুরুত্ব বোঝেননি। ফ্রান্তজ ফানোঁ, সি এল আর জেমস এবং অমিলকার কাবরালের মতো বিপ্লবী নেতারাও হেগেলের দর্শনে অর্থ খুঁজে পেয়েছিলেন। তাঁদের কাছে এই দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এর মাধ্যমে ‘সর্বজনীন’ এবং ‘নির্দিষ্ট’—এই দুটি বিপরীত বিষয় এক নতুন মিলনে পৌঁছাতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই দ্বান্দ্বিক তত্ত্ব ব্যবহার করতে গিয়ে তাঁরা কি অজান্তেই হেগেলের বর্ণবাদকে নিজেদের চিন্তায় জায়গা দিয়ে ফেলেছিলেন?
আমি মনে করি, তাঁরা সেটি করেননি। এই চিন্তাবিদেরা রুসোর সময় থেকে চলে আসা দ্বান্দ্বিক তত্ত্বের বর্ণবাদী ইতিহাস নিয়ে হয়তো সরাসরি কথা বলেননি। তবে তাঁরা হেগেলের চিন্তার আসল সমস্যাটি ঠিকই ধরেছিলেন। তাঁরা হেগেলের ভেতরের বর্ণবাদী যুক্তিটির কড়া সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু একই সাথে দ্বান্দ্বিক চিন্তার আসল মূল্যটিকে ধরে রেখেছিলেন।
হেগেলের বর্ণবাদের মোকাবিলা করার এটি একটি চমৎকার দ্বান্দ্বিক উপায়। তাঁরা দ্বান্দ্বিক তত্ত্বের ভেতরের বর্ণবাদী বিরোধটিকে বাতিল করতে চেয়েছিলেন। এর মাধ্যমে তাঁরা এমন এক নতুন চিন্তার জন্ম দিতে চেয়েছিলেন যা ইতিহাসকে সামনে এগিয়ে নেবে।
হেগেলের বিশ্বাস সঠিক ছিল না। আফ্রিকা বা ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের মানুষেরা ইতিহাসে আটকে ছিলেন এটা বললে ভুল হবে। বরং হেগেল নিজেই তাঁর বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ইতিহাসে আটকে ছিলেন। ইতিহাসকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার অর্থ হলো বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে কাজ করা। এটি হলো দ্বান্দ্বিক তত্ত্বের নিজেরই এক ধরনের রূপান্তর বা ‘সাবলেশন’। এর মাধ্যমে হেগেলের সঠিক অনুধাবনগুলোকে টিকিয়ে রাখা, বর্ণবাদকে বাতিল করা এবং নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
সেঙ্গর, সেজেয়ার এবং ফানোঁ এই দ্বান্দ্বিক পরিবর্তনটি এনেছিলেন। এর জন্য তাঁরা রুসোর বর্ণবাদী নৃবিজ্ঞানকে প্রত্যাখ্যান করেন। মিশনারি দু তের্ত্রে যে বিষয়টি জানতেন, তা এই বড় বড় দার্শনিকেরা জানতেন না। আমেরিকার ও আফ্রিকার মানুষের নিজস্ব জটিল জীবনধারা ও লজিক ছিল। এই চিন্তাবিদেরা সেই বিষয়টি আবার ফিরিয়ে আনেন।
তাই সেজেয়ার ইউরোপের সমালোচনা করে বলেছিলেন:
ইউরোপের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযোগটি খুবই ন্যায্য। ইউরোপ এমন কিছু সভ্যতার গতি থামিয়ে দিয়েছিল, যারা তখনো পুরোপুরি বিকশিত হয়নি। ইউরোপ তাদের ভেতরের লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনা ও সমৃদ্ধিকে প্রকাশ করতে দেয়নি।
আর সেঙ্গর বলেন:
আমি বিশ্বাস করি—’নেগ্রিচ্যুড একটি দ্বান্দ্বিক বিষয়’। আমি মনে করি না এটি অন্য কোনো মূল্যবোধের কাছে হেরে যাবে। বরং এটি মানবসভ্যতায় কিছু গুরত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
ফানোঁ লিখেছেন:
“যে তত্ত্ব আমার স্বাধীনতার ওপর বাইরে থেকে কোনো শর্ত চাপিয়ে দেয়, তা আমাকে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। আমার কৃষ্ণাঙ্গ চেতনা কোনো শূন্যতা বা অভাব নয়। এর একটি নিজস্ব ও স্পষ্ট অস্তিত্ব আছে। এটি নিজের ভেতরেই সম্পূর্ণ। আসলে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের কোনো নির্দিষ্ট ছক বা একক পরিচয় নেই। এখানে একেকজন মানুষের বৈশিষ্ট্য ও বৈচিত্র্য একেক রকম।”
রুসো এবং হেগেল ধরে নিয়েছিলেন যে কৃষ্ণবর্ণ ও আদিবাসীদের নিজস্ব কোনো দ্বান্দ্বিক চিন্তার ক্ষমতা নেই। কিন্তু সেঙ্গর, সেজেয়ার এবং ফানোঁ উল্টো কথা বলেন। তাঁদের মতে, সব জাতির ভেতরের জটিলতাকে আগে বুঝতে হবে। তবেই দ্বান্দ্বিক তত্ত্ব সঠিকভাবে শুরু হতে পারে।
এটি করা গেলে আমরা ঔপনিবেশিক ভেদাভেদের চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারব। তখন সংস্কৃতির মাঝে গড়ে উঠবে লেনদেনের এক চমৎকার সম্পর্ক। সেজেয়ার ও সেঙ্গর একে বলতেন সংস্কৃতির লেনদেন।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ফরাসিরা তাদের বাণিজ্যিক নিয়ম অ্যান্টিলিসের ওপর জোর করে চাপিয়ে দিয়েছিল। তা না করে দুই পক্ষই একে অপরের থেকে শিখতে পারত। তখন দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়াটি কেবল ইউরোপ থেকে বাইরে আসত না। বরং মানুষের জীবন সাজানোর আরও অনেক নতুন ও সমৃদ্ধ পথ তৈরি হতো। এই ব্যবস্থার ভেতর দাসত্ব, বর্ণবাদ বা ঘৃণার কোনো জায়গা থাকে না। অথচ স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার দ্বান্দ্বিক প্রগতিটি ঠিকই টিকে থাকে।
দ্বান্দ্বিক চিন্তা নিজে থেকে বর্ণবাদী নয়। তাই একে পুরোপুরি বাদ দেওয়ারও প্রয়োজন নেই। তবে আধুনিক দ্বান্দ্বিক চিন্তার গোড়া যে রুসো বা হেগেলের বর্ণবাদে লুকিয়ে ছিল, তা দার্শনিকদের স্বীকার করতে হবে। এই প্রকাশ্য বর্ণবাদই পরে তাদের তাত্ত্বিক ধারণার ভেতরে লুকিয়ে গেছে। আজ যখন আমরা দ্বান্দ্বিক চিন্তা ব্যবহার করি, তখন একটি ঝুঁকি থাকে। আমরা যদি এর ইতিহাস স্বীকার না করি, তবে অজান্তেই সেই বর্ণবাদ আমাদের চিন্তায় চলে আসতে পারে। এমনকি বর্ণবাদ-বিরোধী লড়াইয়ের ক্ষেত্রেও এটি ঘটতে পারে।
বিষয়টি পরিষ্কার করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘নিউ ডিল’-এর উদাহরণ দেওয়া যাক। ইতিহাসবিদ ইরা কাটজনেলসন দেখিয়েছেন, নিউ ডিল অর্থনৈতিকভাবে বেশ সফল ছিল। কিন্তু কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানরা এর সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। আদিবাসী বা জাপানি বংশোদ্ভূত আমেরিকানদের ক্ষেত্রেও এর রেকর্ড খুব খারাপ ছিল। ফলে এই কল্যাণমুখী ব্যবস্থা সাধারণ অর্থনৈতিক বৈষম্য কমালেও বর্ণবাদী বৈষম্য বাড়িয়ে দিয়েছিল।
এখন এই সমস্যা সমাধানের উপায় কী? উপায় হলো বর্ণবাদী অন্যায় দূর করতে হবে পুরো অর্থনৈতিক প্রগতিকে বাদ না দিয়ে। একইভাবে, দ্বান্দ্বিক তত্ত্বের ক্ষেত্রেও আমাদের এর বর্ণবাদী অন্যায় দূর করতে হবে। তত্ত্বটিকে একটি নিরাপদ ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হবে। একে পুরোপুরি ছু^ড়ে ফেলার কোনো দরকার নেই।
আমরা যদি সত্যি দর্শনে বর্ণবাদ দূর করতে চাই, তবে কিছু কাজ করতে হবে। চিন্তাবিদেরা ব্যক্তিগতভাবে যে বর্ণবাদ দেখিয়েছেন, তা নিয়ে আলোচনা করতে হবে। দর্শনের সিলেবাস এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে বৈচিত্র্য আনতে হবে। তবে একই সাথে ধারণার ভেতরে লুকিয়ে থাকা সূক্ষ্ম বর্ণবাদের দিকেও তাকাতে হবে।
কেবল দ্বান্দ্বিক তত্ত্বই নয়, আরও অনেক ধারণা সে যুগের বর্ণবাদ দিয়ে প্রভাবিত হয়েছিল। যেমন—ব্যক্তির স্বায়ত্তশাসন, নন্দনতত্ত্ব বা স্বাধীনতার ধারণা। ইউরোপীয় জীবন যে তথাকথিত ‘বর্ডার’ বা ‘বর্বরদের’ চেয়ে আলাদা, তা দেখাতে গিয়েই এই তত্ত্বগুলো তৈরি হয়েছিল।
এর মানে এই নয় যে এই ধারণাগুলো বাদ দিতে হবে। আমাদের শুধু এদের পেছনের বর্ণবাদী ইতিহাসটি বুঝতে হবে। তারপর এদের সমতার ভিত্তিতে নতুন করে সাজাতে হবে। এতে আমরা পশ্চিমা জ্ঞান ঐতিহ্যকে হারিয়ে ফেলব না। বরং এর মাধ্যমে দার্শনিক চিন্তার আরও উন্নতি হবে। বর্তমানের ক্ষতি কাটিয়ে ভবিষ্যতের মেরামতের পথে হাঁটতে দর্শন আমাদের বড় হাতিয়ার হতে পারে। তবে তার আগে দর্শনের ভেতরের কাঠামোগত বর্ণবাদকে আমাদের মেনে নিতেই হবে।
এভরাম অ্যালপার্টের কর্মজীবন কাটছে হামবুর্গের ‘দ্য নিউ ইনস্টিটিউট’-এ রিসার্চ ফেলো হিসেবে। ২০২১ সালে প্রকাশিত A Partial Enlightenment: What Modern Literature and Buddhism Can Teach Us About Living Well Without Perfection এবং ২০২২ সালের The Good-Enough Life গ্রন্থ দুটি তাঁরই লেখা।
সম্পাদনা: নাইজেল ওয়ারবার্টন
তরজমাঃ
শাহেদ হাসান, রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট অ্যাট দ্য মুসলিম মাইন্ডস







Comments