সেক্যুলারিজমের সংকট ও আলী রীয়াজের পর্যালোচনা

(এই লেখাটি মূলত অধ্যাপক আলী রীয়াজ রচিত “সেক্যুলারিজমের রূপ ও রূপান্তর” প্রবন্ধের ওপর ভিত্তি করে লিখিত একটি পর্যালোচনা। মূল প্রবন্ধটি ‘প্রতিচিন্তা’ পত্রিকায় গত ০৬ মার্চ ২০১৮ তারিখে প্রকাশিত/আপডেট হয়।)
ভূমিকা
কয়েক দশক ধরে বিশ্বজুড়ে সমাজবিজ্ঞানী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং নীতিনির্ধারকদের আলোচনার অন্যতম প্রধান ও বিতর্কিত বিষয় হয়ে উঠেছে সেক্যুলারিজম। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ, মতাদর্শ ও রাজনৈতিক অবস্থান থেকে এই প্রপঞ্চটি নিয়ে নিরন্তর তর্কবিতর্ক চলছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানা পরিবর্তনশীল ঘটনাপ্রবাহ এই আলোচনায় প্রতিনিয়ত নতুন নতুন মাত্রা ও বৈচিত্র্য যোগ করছে। আমাদের প্রাত্যহিক রাজনীতি থেকে শুরু করে বিদ্যায়তনিক পরিসরে সেক্যুলারিজম নিয়ে যেমন অতিসরলীকৃত ব্যাখ্যা রয়েছে, তেমনি এর তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণও বিদ্যমান।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ তাঁর “সেক্যুলারিজমের রূপ ও রূপান্তর” প্রবন্ধে এই বহুল আলোচিত বিষয়টির একটি নিবিড় পাঠ হাজির করেছেন। তাঁর আলোচনার মূল ভিত্তি হলো এই স্বীকৃতি যে, সেক্যুলারিজম কোনো বৈচিত্র্যহীন, একক বা সর্বজনীন বিষয় নয়। মতাদর্শ এবং রাষ্ট্রপরিচালনার নীতি হিসেবে এর অসংখ্য ধরন রয়েছে এবং এটি চূড়ান্তভাবে একটি বিতর্কিত ও বিতর্কযোগ্য বিষয়। এই প্রবন্ধে তিনি সেক্যুলারিজম ধারণাটির বিভিন্নমুখী দৃষ্টিভঙ্গির একটি সমালোচনামূলক আলোচনা উপস্থাপন করেছেন। একই সাথে তিনি সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে এই ধারণাটির ঐতিহাসিক রূপান্তর, রাষ্ট্রপরিচালনার নীতি হিসেবে এর বিভিন্ন কাঠামোগত মডেল এবং বিশেষ করে অ-পশ্চিমা সমাজগুলোতে রাষ্ট্র ও সেক্যুলারিজমের মধ্যকার জটিল ও সংঘাতময় সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন।
আলী রীয়াজ তাঁর আলোচনার শুরুতেই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, বিশ্বজুড়ে ধারণা, বিশ্ববীক্ষা এবং রাষ্ট্রপরিচালনার ধরন হিসেবে সেক্যুলারিজম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেও এর আলোচনা সমস্যাসংকুল। আক্ষরিক এবং রূপক—উভয় অর্থেই এর অত্যুৎসাহী প্রবক্তা এবং কঠোর বিরোধীরা সব সময়ই এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক বা রাজনৈতিক লড়াইয়ে লিপ্ত আছেন। এই লড়াই কেবল তাত্ত্বিক নয়, বরং সেক্যুলারিজমের মান-নির্ণায়ক (নরমেটিভ) দিক এবং প্রায়োগিক (ইম্পিরিকাল) দিক নিয়ে গভীরভাবে বিস্তৃত। বৈশ্বিক রাজনীতির দৃশ্যপটের রূপান্তর, বিভিন্ন রাষ্ট্রে দৈনন্দিন রাজনীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন, রাজনীতি এবং জনপরিসরে ধর্মের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ইত্যাদি বিষয় সেক্যুলারিজম বিষয়ক বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে। একই সাথে সমাজবিজ্ঞানে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির উন্মেষ প্রথাগত পাণ্ডিত্যকে চ্যালেঞ্জ করছে। বাংলাদেশের মতো দেশে সেক্যুলারিজম সংবিধানে এবং রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনায় বহুল চর্চিত হলেও, ধারণা হিসেবে এটিকে তীক্ষ্ণভাবে খতিয়ে দেখার বৌদ্ধিক ধারাটি খুব একটা শক্তিশালী নয়।
আলী রীয়াজ এই শূন্যস্থান পূরণের লক্ষ্যেই তাঁর প্রবন্ধটি সাজিয়েছেন। তিনি সেক্যুলারিজমকে একটি সর্বজনীন মতবাদ হিসেবে দেখার যে নিরঙ্কুশ ধারা রয়েছে, তার সমালোচনা করেছেন। আবার উল্টোদিকে প্রেক্ষাপট ও নির্দিষ্ট দেশ-কালকে মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে মূল ধারণাকে অবজ্ঞা করার প্রবণতা থেকেও নিজেকে সযত্নে দূরে রেখেছেন। তাঁর মতে, আমাদের প্রত্যেককে এই মানসিক প্রস্তুতি রাখতে হবে যে, ধর্ম ও রাজনীতির প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক যেমন বিভিন্ন রকমের হতে পারে, তেমনি সেক্যুলারিজম শব্দটির অর্থ কী হবে সে বিষয়েও নতুন করে বোঝাপড়া হতে পারে। এর জন্য দার্শনিক ইয়ুর্গেন হাবারমাসের ভাষায় আমাদের ‘সংকীর্ণ সেক্যুলারপন্থী সচেতনতা’ পরিহার করতে হবে।
সেক্যুলারিজম ও সেক্যুলারকরণ
সেক্যুলারিজম বিষয়ে আলোচনার সবচেয়ে প্রাথমিক সংকটটি এর সংজ্ঞার সাথে জড়িত। সেক্যুলারিজম বিষয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ধারণা হলো, এটি রাষ্ট্র ও ধর্মের মধ্যকার সম্পর্ক নির্ধারণের একটি মতাদর্শগত কাঠামো প্রদান করে। এই মতাদর্শিক কাঠামোর মূল কথা হলো, সেক্যুলার যুক্তির কারণে রাজনৈতিক জীবন থেকে ধর্মকে বাদ দেওয়া উচিত এবং ধর্মীয় যুক্তির ভিত্তিতে রাষ্ট্রের সক্রিয় হওয়া উচিত নয়।
অর্থাৎ, এটি এমন এক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা দাবি করে যা ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যে সুনির্দিষ্ট দেওয়াল তুলে দেবে।
সেক্যুলারিজমের একটি অন্যতম পুরোনো ও ধ্রুপদী সংজ্ঞা পাওয়া যায় জর্জ জ্যাকব হোলিওক থেকে, যাঁকে এই শব্দটির জনক হিসেবে বর্ণনা করা হয়। ১৮৫১ সালে হোলিওক সেক্যুলারিজমকে বস্তুবাদী উপায়ে মানবকল্যাণ বাড়ানো এবং উপযোগবাদী ধারায় মানবকল্যাণকে পরিমাপ করার জ্ঞান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন। তাঁর মতে, এটি আস্তিকতা, নাস্তিকতা বা খ্রিষ্টধর্মের বাইরে প্রাকৃতিক নৈতিকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত।
কিন্তু আলী রীয়াজ চার্লস টেইলরকে উদ্ধৃত করে দেখান, এত বছর পরও সেক্যুলারিজম দ্বারা আসলে কী বোঝায়, তা সম্পূর্ণভাবে স্পষ্ট নয়।
এর একটি বড় কারণ হলো, সেক্যুলারিজমকে দর্শন, সমাজতত্ত্ব এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান—এই তিনটি ভিন্ন ভিন্ন জ্ঞানের ধারায় পঠনপাঠন করা হয়। দার্শনিকভাবে এটিকে অতীন্দ্রিয়বাদ বাতিল করে অভিজ্ঞতাবাদের গ্রহণ হিসেবে দেখা হয়। সমাজতাত্ত্বিকভাবে এটি সামাজিক প্রতিষ্ঠানে ধর্মের প্রভাব হ্রাস নির্দেশ করে। আর রাজনৈতিকভাবে এটি ব্যক্তিগত ও জনপরিসরের পৃথক্করণকে নির্দেশ করে। এই তিনটি ব্যাখ্যা মিলে সেক্যুলারিজম একটি রাজনৈতিক মতবাদে পরিণত হয়েছে।
তবে কোনো রাজনৈতিক মতবাদই ক্ষমতার সম্পর্ক থেকে মুক্ত নয়। সেক্যুলারিজমের জ্ঞানভাষ্যও বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক ক্ষমতার অসম আদান-প্রদানের মাধ্যমেই তার বর্তমান রূপ পেয়েছে। তুরস্কের সাংবিধানিক আদালতের একটি রায়ের কথা উল্লেখ করে তিনি দেখান, সেখানে সেক্যুলারিজম বলতে কেবল রাষ্ট্র নয়, বরং ধর্ম থেকে সামাজিক জীবন, শিক্ষা, পরিবার, আচরণ ও পোশাকের ধরন পৃথক করাকে বোঝানো হয়েছে। নৃবিজ্ঞানী সাবা মাহমুদও একারণেই বলেছেন যে সেক্যুলার উদারতাবাদ কেবল রাষ্ট্রের মতবাদ নয়, এর বৃহৎ তাৎপর্য বিবেচনা করলে এটি একটি জীবনাচরণ।
এই সংজ্ঞাগত আলোচনার পরই আলী রীয়াজ সেক্যুলারিজম এবং সেক্যুলারকরণের মধ্যকার অত্যন্ত জরুরি তাত্ত্বিক পার্থক্যটি রেখাঙ্কিত করেন।
সেক্যুলারিজম হলো রাষ্ট্র ও ধর্মের পৃথক্করণের একটি নীতি বা মতবাদ। অন্যদিকে সেক্যুলারকরণ হলো একটি চলমান সামাজিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে সমাজে ও ব্যক্তিজীবনে ধর্মের প্রভাব ক্রমাগত হ্রাস পায়।
সমাজবিজ্ঞানী পিটার বার্গারের মতে এটি সামাজিক ও ব্যক্তিগত চেতনাবোধে ধর্মের ভূমিকার সংকোচন ঘটায়। ঊনবিংশ শতাব্দীর সমাজবিজ্ঞানী যেমন অগাস্ট কোঁত, কার্ল মার্ক্স, এমিল ডুর্খেইম বা ম্যাক্স ওয়েবার সকলেই বিশ্বাস করতেন যে, আধুনিকায়নের সাথে সাথে জনপরিসর থেকে ধর্ম ধীরে ধীরে বিদায় নেবে।
হোসে ক্যাসানোভার মতে সেক্যুলারকরণ তিনটি প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে: ধর্মীয় বিশ্বাসের হ্রাস, ধর্মের ব্যক্তিগতকরণ এবং সেক্যুলার পরিসরসমূহের পৃথক্করণ। প্রথমদিকে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে উপস্থিতি হ্রাস পাওয়ায় এই তত্ত্ব প্রবল জনপ্রিয়তা পায়। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয়-রাজনৈতিক শক্তির পুনরুত্থান এই তত্ত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। পিটার বার্গারের মতো সমাজবিজ্ঞানীরা পরবর্তীতে স্বীকার করতে বাধ্য হন যে, আমরা সম্পূর্ণ সেক্যুলার বিশ্বে বাস করছি না এবং সেক্যুলারকরণের দাবিগুলো অনেকাংশেই অতি মূল্যায়িত ছিল।
আধুনিকীকরণ তত্ত্বের প্রভাবেই সেক্যুলারকরণকে একটি সর্বজনীন ধারণায় পরিণত করা হয়েছিল। ধরে নেওয়া হয়েছিল যে, পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর অনুসরণে উন্নয়নশীল সমাজগুলো প্রগতির পথে হাঁটলে সেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটবে এবং সনাতন মূল্যবোধ বা ধর্মের প্রভাব হ্রাস পাবে। কিন্তু ইউরোপের ইতিহাসে সেক্যুলারিজম রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে উদ্ভূত হয়েছিল দীর্ঘ ধর্মযুদ্ধের পর, যখন সমাজ ধীরে ধীরে ধর্মের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ মেনে নিয়েছিল। পশ্চিমা বিশ্বে সেক্যুলারিজমের ভিত্তি গঠিত হওয়ার পরই তাকে রাষ্ট্রের নীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। কিন্তু অ-পশ্চিমা সমাজগুলোতে এই প্রক্রিয়াটি ঘটেছে সম্পূর্ণ উল্টোভাবে। সেখানে আধুনিকতা বা সেক্যুলারিজম অভ্যন্তরীণভাবে বিকশিত হয়নি, বরং ঔপনিবেশিক শক্তির মাধ্যমে বা দেশীয় এলিটের মাধ্যমে বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
টি এন মদন যথার্থই বলেছেন যে, অ-পশ্চিমা সমাজগুলোর হাজার বছরের ধর্মীয় ঐতিহ্যকে আমলে না নিয়েই সেখানে সেক্যুলারিজম স্থানান্তর করা হয়েছিল। ফলে সমাজ সেক্যুলার হওয়ার অনেক আগেই রাজনৈতিক মতবাদ হিসেবে সেক্যুলারিজম রাষ্ট্রের নীতিতে পরিণত হয়।
সেক্যুলারিজমের ঐতিহাসিক রূপান্তর ও জ্ঞানতাত্ত্বিক সংকট
আলী রীয়াজ তাঁর প্রবন্ধে সেক্যুলারিজমকে একটি অপরিবর্তনশীল ধারণা হিসেবে মেনে নিতে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন। তিনি এর ঐতিহাসিক বিবর্তনের তিনটি সুনির্দিষ্ট রূপান্তরের কথা বিশদভাবে আলোচনা করেছেন। ব্যুৎপত্তিগতভাবে সেক্যুলারিজম শব্দটি এসেছে ল্যাটিন ‘সেক্যুলাম’ থেকে, যা রোমানদের কাছে ছিল সময় পরিমাপের একক বা একটি প্রজন্মের সমমান। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে এর প্রথম অর্থগত রূপান্তর ঘটে, যখন খ্রিষ্টধর্মের যাজকদের কাজের দুটি ধারা তৈরি হয়। যারা ইহজাগতিক বিষয় থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেন, তারা হন ধর্মীয় যাজক, আর যারা পার্থিব (সেক্যুলাম) বিষয়ে যুক্ত থাকেন, তারা হন সেক্যুলার যাজক। এই বিভেদটি সেন্ট অগাস্টিনের ‘দেবতার শহর’ এবং ‘মানুষের শহর’ বিভাজনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
ষোড়শ শতাব্দীতে এর দ্বিতীয় রূপান্তর ঘটে। ইউরোপে ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যে দীর্ঘ ‘ত্রিশ বছরের যুদ্ধ’ শেষে ১৬৪৮ সালের পিস অব ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তির মাধ্যমে সেক্যুলারিজম একটি ভিন্ন মাত্রা পায়। গির্জার সম্পত্তি পার্থিব মালিকানায় হস্তান্তর হওয়াকে সেক্যুলারকৃত বলা হতে থাকে। এই চুক্তি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক থেকে ধর্মকে দূরে রাখলেও রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের বৈধতাকে অস্বীকার করেনি। ঊনবিংশ শতাব্দীতে এর তৃতীয় রূপান্তর ঘটে, যখন হোলিওক এর প্রচলন করেন রাজনৈতিক মতবাদ হিসেবে।
কিন্তু বর্তমানে সেক্যুলারিজম একটি চতুর্থ রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে এর মূল দার্শনিক ভিত্তিকেই প্রবলভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। পার্থ চট্টোপাধ্যায়, আশীষ নন্দী, তালাল আসাদ, টি এন মদন, চার্লস টেইলর প্রমুখ তাত্ত্বিকরা সেক্যুলারিজমের প্রচলিত ধারণার তীব্র সমালোচনা করেছেন। আশীষ নন্দী দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন যে, সেক্যুলারিজম রাষ্ট্রীয় কাজের ভিত্তি হিসেবে অচল এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হিসেবে ব্যর্থ। এই সমালোচকদের একটি বড় ঐকমত্য হলো, সেক্যুলারিজমের মূল ভিত্তি যে ‘বিশুদ্ধ যুক্তি’ (র্যাশনালিটি), তার অসারতা প্রমাণ করা।
আলোকায়নের যুগে ঐতিহ্য ও ধর্মের বিপরীতে যুক্তির ওপর অতিমাত্রায় ভরসা করা হয়েছিল। কিন্তু ক্রেইগ ক্যালহিউনের মতো তাত্ত্বিকরা মনে করেন যে, ধর্মের বিপরীতে যুক্তির সপক্ষে বলতে গিয়ে সেক্যুলারপন্থীরা কার্যত যুক্তির একটি মৌলবাদী ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন। ফিলিপ গরস্কি তো আরও একধাপ এগিয়ে বলেছেন যে, ধর্মবাদীরা নয়, বরং সেক্যুলারপন্থীরাই আলোকায়নের যুক্তির আলোকচ্ছটায় অন্ধ ছিল। বিদ্যমান সেক্যুলারিজমের এই ধারণাগত অপর্যাপ্ততার সমালোচনা করেই হোজে ক্যাসানোভা ‘জনধর্মসমূহ’, আলফ্রেড স্টেপান ‘দ্বৈত সহিষ্ণুতা’ এবং রাজীব ভার্গভা ‘নীতিনির্ভর দূরত্ব’-এর মতো নতুন বিকল্প ধারণার প্রস্তাব করেছেন। অর্থাৎ, সেক্যুলারিজম কোনোভাবেই স্থির নেই, এটি ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং এর পুনর্মূল্যায়ন অত্যন্ত জরুরি।
রাষ্ট্রপরিচালনার নীতি হিসেবে সেক্যুলারিজমের বিচিত্র মডেল
প্রবন্ধের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো রাষ্ট্রপরিচালনার নীতি হিসেবে সেক্যুলারিজমের প্রায়োগিক মডেলগুলোর আলোচনা। মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাথে সম্পর্কিত হওয়ায় এই দিকটি সর্বাধিক প্রভাবশালী। সেক্যুলার রাষ্ট্র বলতে মূলত ধর্ম এবং রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের পৃথক্করণের নীতিকে বোঝায়। এটি বিভিন্ন কারণে হতে পারে—নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে, চিন্তার স্বাধীনতা সুরক্ষায় অথবা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে। সাধারণত দুটি নীতি এখানে কাজ করে: পৃথক্করণের নীতি এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের নীতি। ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে আধুনিক বিশ্বে সেক্যুলার রাষ্ট্রের প্রধানত চারটি মডেলের উদ্ভব ঘটেছে, যা প্রমাণ করে যে সেক্যুলার রাষ্ট্রের কোনো একক বৈশ্বিক রূপ নেই।
প্রথমটি হলো ফরাসি মডেল বা ‘লেইসিটে’। এই মডেলের মূল ভিত্তি হলো রাষ্ট্র নাগরিকদের ধর্ম থেকে সুরক্ষা দেবে এবং এর পাশাপাশি ধর্মীয় বিষয়গুলোকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে। এটি জনপরিসর থেকে ধর্মকে সম্পূর্ণরূপে নির্বাসিত করে। অলিভিয়ার রয়ের মতে, এটি পশ্চিমা সেক্যুলারিজমের একটি আতিশয্যিক ও মতাদর্শগত ধরন, যা সমাজ নিজেকে রাজনৈতিকভাবে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করে তার পথ ঠিক করে। দ্বিতীয়টি হলো আমেরিকান মডেল। মার্কিন সংবিধানে ‘পৃথক্করণের প্রাচীর’ ধারণার মাধ্যমে রাষ্ট্র ও চার্চকে একে অপরের থেকে সুরক্ষা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এখানে জনপরিসরে ধর্মকে নিয়ন্ত্রণ করার বদলে উভয়ের স্বাধীন অস্তিত্বের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তৃতীয়টি হলো ব্রিটিশ মডেল। এখানে একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য লক্ষণীয়; ব্রিটিশ সমাজ ব্যাপকভাবে সেক্যুলার হলেও রাষ্ট্র কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে ধর্মের সাথে যুক্ত। ব্রিটিশ রাজা বা রানি চার্চ অব ইংল্যান্ডের প্রধান এবং সরকারের উচ্চকক্ষে বিশপরা বসেন। চতুর্থটি হলো ভারতীয় মডেল, যার মূল কথা হলো ‘সর্বধর্মসম্ভাবা’ বা সব ধর্মই সমান। রাষ্ট্র সব ধর্মের প্রতি সমমর্যাদা প্রদর্শন করবে। তবে অচিন ভানায়েকের মতে, এই নীতির ফলে ধরে নেওয়া হয়েছে যে ভারতীয় সমাজ বাস্তবে সেক্যুলার, যা সব সময় সত্য নয়।
এই মডেলগুলো নিছক কোনো বিমূর্ত আদর্শের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নয়। এগুলো নির্দিষ্ট সমাজের নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার ফসল। ফ্রান্সের কঠোর সেক্যুলার রাষ্ট্র ব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছিল ফরাসি বিপ্লবের পর যাজকতন্ত্রের ক্ষমতা এবং ডানপন্থী ক্যাথলিকদের বৈরিতার বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক সংগ্রাম হিসেবে। সুতরাং, অন্য কোনো সমাজের ঐতিহাসিক বাস্তবতা ফরাসি বা মার্কিন সমাজের মতো না হলে সেখানে এই মডেলগুলোর সফল প্রয়োগ কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
অ-পশ্চিমা সমাজে সেক্যুলার রাষ্ট্র
আলী রীয়াজের প্রবন্ধের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ সমাজতাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদটি দেখা যায় অ-পশ্চিমা সমাজগুলোতে সেক্যুলার রাষ্ট্রগুলোর কার্যক্রম মূল্যায়নের ক্ষেত্রে। তিনি এই প্রশ্নটি খুব জোরেশোরে তুলেছেন যে, কেন এই রাষ্ট্রগুলোতে সেক্যুলার রাষ্ট্রকাঠামো প্রায়শই ব্যর্থ হয়েছে এবং কেন সেখানে ধর্মীয়-রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটেছে? সেক্যুলারিজমের বিরোধীরা মনে করেন, রাষ্ট্রগুলোর মতাদর্শিক অবস্থানই এই ব্যর্থতার কারণ। এই বিষয়টি বুঝতে হলে অ-পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর উদ্ভব ও বিকাশকে বুঝতে হবে।
প্রথমত, অ-পশ্চিমা সমাজে রাষ্ট্রগুলো অভ্যন্তরীণ বিবর্তনের মাধ্যমে গড়ে ওঠেনি। এগুলো ঔপনিবেশিক শাসনের লিগ্যাসি বা ইউরোপীয় মডেলের সচেতন অনুকরণ। স্বাধীনতাসংগ্রামের নেতারা ঔপনিবেশিক আমলের সীমানা, প্রশাসন ও আইন কাঠামো প্রায় অপরিবর্তিত অবস্থাতেই গ্রহণ করেছিলেন। এই উত্তরাধিকারের সাথেই তারা সেক্যুলারিজম নামক মতাদর্শটিও পেয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত, এই উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলোর বৈধতা কোনো দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল না। তাদের বৈধতার ভিত্তি ছিল জনগণকে দেওয়া উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি। ফলে যখনই তারা এই প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে, তখনই তাদের বৈধতার সংকট তৈরি হয়েছে। তৃতীয়ত, এই সমাজগুলোতে রাষ্ট্র পরিণত হয়েছে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী বা হেজিমনি বিস্তারের প্রধান প্রতিষ্ঠানে। শাসকশ্রেণি রাষ্ট্রকে ব্যবহার করে তাদের নিজেদের পছন্দমতো মতাদর্শ চাপিয়ে দেয়। সেক্যুলার জাতীয়তাবাদ তখন শাসকশ্রেণির লুণ্ঠনপরায়ণ ও হস্তক্ষেপবাদী চরিত্রের বৈধতা দানকারী হাতিয়ারে পরিণত হয়। এ অবস্থায় সেক্যুলারিজম কেবল রাষ্ট্রের নীতি থাকে না, এটি রাষ্ট্রের একটি আগ্রাসী প্রকল্প হয়ে দাঁড়ায়।
মার্ক য়ুর্গেনস্মায়ার এবং উইলিয়াম মাইলসের গবেষণার সূত্র ধরে রীয়াজ দেখান যে, পৃথিবীর অনেক দেশে সেক্যুলার রাষ্ট্রসমূহ তাদের নাগরিকদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং সামাজিক ন্যায়বিচার দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। শাসক এলিট শ্রেণির এই সাধারণ কল্যাণ প্রদানে অক্ষমতা তাদের কর্তৃত্ববাদী করে তোলে। কর্তৃত্ববাদ টিকে থাকার জন্য সমাজকে দমন করে এবং সেক্যুলার সিভিল সোসাইটিকে অত্যন্ত দুর্বল বা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। রাজনীতি চর্চার সব পথ যখন রুদ্ধ হয়ে যায়, তখন জনপরিসর হিসেবে এককভাবে টিকে থাকে কেবল মসজিদ, মন্দির বা গির্জার মতো ধর্মীয় কেন্দ্রগুলো। অসম অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নগরায়ণ এবং সেক্যুলার রাজনৈতিক দলগুলোর সীমাহীন সুবিধাবাদী রাজনীতির ফলেই বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় শক্তিগুলোর উত্থান ঘটেছে। উত্তর আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার আলজেরিয়া, মিসর, পাকিস্তান থেকে শুরু করে খোদ ভারতের ইতিহাস এর বড় প্রমাণ। ভারতে আশির দশকে যখন ইন্দিরা গান্ধীর সরকার কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে এবং সাংগঠনিকভাবে কংগ্রেস একটি দুর্বল ও মতাদর্শহীন দলে পরিণত হয়, ঠিক সেই শূন্যস্থানের সুযোগেই সেখানে ধর্মীয়-রাজনৈতিক শক্তিগুলো মূলধারায় চলে আসে। রাষ্ট্রের আধুনিকায়নের দাবি এবং জনসমাজের ধীরগতির পরিবর্তনের মধ্যে যে বিশাল অসমতা রয়েছে, অ-পশ্চিমা দেশে সেক্যুলার রাষ্ট্রের পতন বা সংকটের মূলে সেটিই সবচেয়ে বড় কারণ। রাষ্ট্র জোর করে ধর্মকে সরিয়ে দিলেও সমাজ থেকে তা সম্পূর্ণ মুছে যায় না, বরং সুপ্ত অবস্থায় থেকে সুযোগ পেলেই প্রবল শক্তিতে ফিরে আসে।
বিকল্প সেক্যুলারিজমের সন্ধান এবং গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদ
প্রবন্ধের শেষাংশে আলী রীয়াজ তাঁর দীর্ঘ আলোচনার সারসংক্ষেপ না টেনে সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কয়েকটি নীতিগত ও তাত্ত্বিক প্রস্তাবনা পেশ করেছেন। তাঁর এই প্রস্তাবনাগুলো সমকালীন রাজনৈতিক চিন্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, তিনি মনে করেন যে, ‘রক্ষণশীল ধর্ম’ বনাম ‘প্রগতিশীল সেক্যুলারিজম’—এই ধরনের অতিসরলীকৃত ও দ্বিধাবিভাজিত চিন্তার অবসান হওয়া অত্যন্ত জরুরি। সেক্যুলারিজমকে আর চোখ বন্ধ করে আধুনিকতা, মুক্তি বা যুক্তির সমার্থক হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। কারণ, আধুনিকতা বা মুক্তির পথ কেবল প্রথাগত সেক্যুলারিজমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দ্বিতীয়ত, তিনি খুব স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেছেন যে, আদর্শ হিসেবে সেক্যুলারিজমের কোনো সর্বজনীন বা বৈশ্বিক ধারণা নেই। এর রূপ ও প্রয়োগের বৈচিত্র্য এতটাই বেশি যে, আমাদের উচিত ‘সেক্যুলারিজম’ না বলে বহুবচনে ‘সেক্যুলারিজমগুলো’ শব্দটির ব্যবহার শুরু করা।
তৃতীয়ত, দক্ষিণ এশিয়া ও বিশেষত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেক্যুলারিজমের অন্ধ অনুকরণ যে বিপজ্জনক, তা তিনি টি এন মদনের বক্তব্য দিয়ে প্রমাণ করেছেন। পশ্চিমা সমাজ থেকে আমদানিকৃত এই ধারণা এই অঞ্চলের বহুধর্মমতের সমাজের জন্য পুরোপুরি উপযুক্ত নয়। এটিকে বাতিল না করে বরং এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া উচিত, যা এই অঞ্চলের ধর্মবিশ্বাসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যুক্তিবাদ বা র্যাশনালিটি এককভাবে এই দেশগুলোর চালিকাশক্তি হতে পারে না। চতুর্থত, এই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা কোনোভাবেই ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। চার্লস টেইলরের মতে, সমাজে বিরাজমান বৈচিত্র্যের প্রতি রাষ্ট্রের একটি সঠিক এবং গণতান্ত্রিক প্রতিক্রিয়াই হলো প্রকৃত সেক্যুলারিজম। তাই একটি অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারিত হওয়া উচিত, যেখানে সব ধর্মের ও মতের মানুষের সমান অধিকার ও সহনশীলতা নিশ্চিত করা হবে।
সর্বশেষে, আলী রীয়াজ তাঁর তাত্ত্বিক অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার করে জানিয়েছেন যে, তিনি সেক্যুলারিজমের কোনো বিকল্প খুঁজছেন না। বরং তিনি পূর্বনির্ধারিত সমাধান পরিহার করে সমাজ বাস্তবতার আলোকে ‘বিকল্প সেক্যুলারিজম’-এর কাঠামোগত বিন্যাসের কথা বলছেন। ভিনসেন্ট পিকোরা, আশীষ নন্দী বা তালাল আসাদের মতো চিন্তাবিদদের মতামতের বৈচিত্র্য এটাই প্রমাণ করে যে, সেক্যুলারিজমকে আর কোনোভাবেই ইতিহাসবর্জিত, নিরপেক্ষ, রাজনীতিবর্জিত বা বিশুদ্ধ যুক্তির আলোয় দেখার অবকাশ নেই। এটি চূড়ান্তভাবেই ক্ষমতার সম্পর্ক, সমাজ বাস্তবতা ও ইতিহাসের একটি পরিবর্তনশীল আখ্যান। অধ্যাপক রীয়াজের এই প্রবন্ধটি কেবল সেক্যুলারিজমের ধারণাগত অস্পষ্টতাকে দূর করেনি, বরং বাংলাদেশের মতো সমাজগুলোতে ধর্ম ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের একটি বহুমাত্রিক ও গণতান্ত্রিক রূপরেখা প্রণয়নের জন্য এক অত্যন্ত জরুরি বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে।
পর্যালোচনাঃ
শাহেদ হাসান
রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, দ্য মুসলিম মাইন্ডস







Comments