সিভিল ডিজঅবিডিয়েন্স: রাষ্ট্রযন্ত্র, নাগরিক বিবেক এবং রাজনৈতিক প্রতিরোধ

ভূমিকা
আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল ভিত্তি গড়ে উঠেছে আইনি বৈধতা এবং সার্বভৌম ক্ষমতার সমীকরণের ওপর। ম্যাক্স ওয়েবারের সংজ্ঞা অনুযায়ী, রাষ্ট্র হলো এমন এক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান যা একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মধ্যে বৈধ সহিংসতার চূড়ান্ত একচেটিয়া অধিকার দাবি করে [১]। এই সহিংসতার প্রাতিষ্ঠানিক রূপই হলো ‘আইন’।
লিগ্যাল পজিটিভিজমের দাবি হলো, রাষ্ট্র কর্তৃক প্রণীত এবং বলবৎযোগ্য নিয়মই হলো চূড়ান্ত আইন, এবং নাগরিকের প্রধানতম কর্তব্য হলো তার প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্য প্রদর্শন করা।
কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাস এবং রাজনৈতিক দর্শনের বিশ্লেষণে আমরা দেখি, বৈধতা এবং ন্যায়বিচার সবসময় একবিন্দুতে মিলিত হয় না। রাষ্ট্র যখন তার আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করে সমাজকাঠামোতে কাঠামোগত অবিচার, বৈষম্য কিংবা মানুষের মৌলিক অধিকার হরণের প্রক্রিয়াকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়, তখন নাগরিক বিবেকের সাথে রাষ্ট্রযন্ত্রের এক অনিবার্য সংঘাত তৈরি হয়। এই সংঘাতেরই অন্যতম প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক ও বাস্তব প্রকাশ হলো নাগরিক অবাধ্যতা।
আইন অমান্য কোনো আকস্মিক আইনভঙ্গ বা সাধারণ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নয়। এটি মূলত একটি সুনির্দিষ্ট জ্ঞানতাত্ত্বিক ও নৈতিক অবস্থান থেকে উদ্ভূত রাজনৈতিক প্রতিরোধ। সাধারণ অপরাধী আইন ভঙ্গ করে নিজস্ব সংকীর্ণ স্বার্থে এবং সে তার কাজটিকে গোপন রাখতে চায়।
পক্ষান্তরে, আইন অমান্যকারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী জনসমক্ষে, সচেতনভাবে এবং একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা নৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে আইন অমান্য করে। এই প্রক্রিয়াটি ইতিবাচক আইনের শুষ্ক ধারার বিপরীতে প্রাকৃতিক আইন বা শাশ্বত ন্যায়বিচারের ধারণাকে শ্রেষ্ঠতর বলে ঘোষণা করে।
যখন একটি রাষ্ট্রে আইনি বৈধতা তার নৈতিক ভিত্তি হারিয়ে ফেলে, তখন সেই আইনের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করার অর্থ দাঁড়ায় অন্যায়ের সহযোগী হওয়া। ফলে, আইন অমান্য কেবল একটি রাজনৈতিক অধিকারই নয়, বরং তা নাগরিকের এক প্রকার নৈতিক দায়বদ্ধতা হিসেবে আবির্ভূত হয়। এটি এমন এক প্রতিবাদের ভাষা যা সমাজকাঠামো ও রাষ্ট্রের মধ্যকার ক্ষমতার ভারসাম্যকে পুনর্নির্ধারণ করতে চায় এবং ইতিবাচক আইনের সীমানা পেরিয়ে ন্যায়বিচারের এক বৃহত্তর দিগন্ত উন্মোচন করে।
১. আইন অমান্য
আইন অমান্যের আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের সূচনা ঘটে উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে হেনরি ডেভিড থরোর চিন্তার মধ্য দিয়ে। ১৮৪৯ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘রেজিস্ট্যান্স টু সিভিল গভর্মেন্ট’ (যা পরবর্তীতে ‘সিভিল ডিসঅবিডিয়েন্স’ নামে পুনর্মুদ্রিত হয়)-এ থরো রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে ব্যক্তির বিবেকের স্বায়ত্তশাসনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন [২]।
তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট: রাষ্ট্র যখন দাসপ্রথার মতো চরম অমানবিক প্রতিষ্ঠানকে আইনি সুরক্ষা দেয় কিংবা মেক্সিকোর বিরুদ্ধে অন্যায় সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ পরিচালনা করে, তখন নাগরিকের কর্তব্য হলো সেই রাষ্ট্রের সাথে সব ধরনের সহযোগিতা ছিন্ন করা।
থরোর তাত্ত্বিক কাঠামোতে রাষ্ট্রকে দেখা হয়েছে একটি জড় যন্ত্র হিসেবে, আর নাগরিকের বিবেক হলো সেই যন্ত্রের চাকার গতি রোধ করার প্রধান ঘর্ষণ। তিনি কর দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে সরাসরি কারাবরণ করেন এবং এর মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে, একটি অন্যায্য রাষ্ট্রে বিবেকের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখার একমাত্র স্থান হলো কারাগার। থরোর এই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী নৈতিক অবস্থান পরবর্তীকালে সমষ্টিগত রাজনৈতিক আন্দোলনের রূপান্তরের ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
বিংশ শতাব্দীতে এসে আইন অমান্যের এই ধারণাকে একটি সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ও উদারনৈতিক রাজনৈতিক দর্শনের কাঠামোতে বিন্যস্ত করেন জন রলস। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আ থিওরি অব জাস্টিস (১৯৭১)-এ রলস আইন অমান্যের একটি অত্যন্ত কঠোর এবং পরিশীলিত সংজ্ঞা প্রদান করেছেন [৩]। রলসের মতে, আইন অমান্য হলো একটি প্রকাশ্য, অহিংস এবং বিবেকবোধ তাড়িত আইনভঙ্গ, যা সাধারণত কোনো সরকার বা আইনসভার নীতি ও আইনের পরিবর্তন ঘটানোর লক্ষ্যে রাজনৈতিকভাবে পরিচালিত হয়।
রলসের তাত্ত্বিক কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এখানে আইন অমান্যকারী কিন্তু আইনের শাসনের প্রতি তার সামগ্রিক আনুগত্য বা বিশ্বস্ততা ত্যাগ করে না। বরং সে যে শাস্তি বা আইনি পরিণতি বরণ করে নেয়, তার মাধ্যমেই সে প্রমাণ করে যে সে রাষ্ট্রের সংবিধান বা আইনি কাঠামোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তবে সে কেবল একটি সুনির্দিষ্ট চরম অন্যায্য আইনের প্রতিবাদ করছে। রলসের এই মডেলটি মূলত একটি ‘প্রায়-ন্যায়সঙ্গত’ গণতান্ত্রিক সমাজের প্রেক্ষাপটে তৈরি, যেখানে আইন অমান্য কাজ করে সংবিধানের একটি সুরক্ষাকবচ হিসেবে।
রলসের এই উদারনৈতিক কাঠামোর সমান্তরালে জুর্গেন হাবেরমাস তাঁর ডিলিবারেটিভ ডেমোক্রেসি তাত্ত্বিক আলোকেও আইন অমান্যকে বিশ্লেষণ করেছেন [৪]। হাবেরমাসের মতে, আইন অমান্য হলো একটি সাংবিধানিক রাষ্ট্রের বৈধতার অতন্দ্র প্রহরী। একটি গণতান্ত্রিক সমাজ যখন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কিংবা শক্তিশালী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাবে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর শুনতে ব্যর্থ হয়, তখন আইন অমান্যের মাধ্যমে নাগরিকেরা জনপরিসরে নতুন করে যুক্তির আলো তৈরি করে। হাবেরমাস মনে করতেন, রাষ্ট্র আইন অমান্যকারীদের সাথে কেমন আচরণ করছে, তা দিয়েই বোঝা যায় সেই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কতটা পরিপক্ক। একটি আত্মবিশ্বাসী সাংবিধানিক গণতন্ত্র আইন অমান্যকে তার রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয় উপাদান হিসেবেই গণ্য করে। কারণ এটি জনমত গঠন ও রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণের মধ্যকার দূরত্বকে কমিয়ে আনতে সাহায্য করে।
তবে আধুনিক উত্তর-ঔপনিবেশিক এবং চরমপন্থী রাজনৈতিক তাত্ত্বিকেরা রলস ও হাবেরমাসের এই উদারনৈতিক ও নিয়মাবদ্ধ মডেলের তীব্র সমালোচনা করেছেন। রবিন সেলিকাটেস বা ক্লারিসা ডেলমাসের মতো সমকালীন চিন্তাবিদেরা দেখিয়েছেন যে, রলসের দেওয়া শর্তগুলো বাস্তব জগতের প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোকে অবদমিত করার একটি হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে [৫]। রলস যে ‘অহিংসা’, ‘প্রকাশ্য ঘোষণা’ এবং ‘শাস্তি মাথা পেতে নেওয়ার’ শর্ত দিয়েছেন, তা অনেক সময় শোষিত ও প্রান্তিক গোষ্ঠীর লড়াইকে দুর্বল করে দেয়।
চ্যান্টাল মুফের পলিটিক্যাল রিয়ালিজম তত্ত্বের আলোকে বিচার করলে দেখা যায়, সমাজ সহজাতভাবেই বহুত্ববাদী এবং দ্বান্দ্বিক [৬]। সেখানে ক্ষমতা এবং আধিপত্যের যে বিন্যাস থাকে, তাকে কেবল শান্তিপূর্ণ সংলাপের মাধ্যমে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। ফলে, আইন অমান্যের জ্ঞানতাত্ত্বিক সীমানাকে আরও বিস্তৃত করে সেখানে কাঠামোগত ভাঙচুর, বয়কট এবং অবাধ্যতার অন্যান্য উগ্র বা আপসহীন রূপকেও অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীতা আজ রাষ্ট্রচিন্তায় জোরালো হয়ে উঠেছে।
২. ভদ্রতার রাজনীতি
আইন অমান্যের ধারণার সাথে ভদ্রতা ও নাগরিক শিষ্টাচারের (সিভিলিটি) বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু এই শব্দটির রাজনৈতিক ব্যবহার মোটেও নিরপেক্ষ নয়। সমকালীন সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তায় এটি একটি অত্যন্ত রাজনৈতিকভাবে চার্জযুক্ত শব্দ।
শাসকগোষ্ঠী প্রায়শই এই নাগরিক শিষ্টাচারের দোহাই দিয়ে যেকোনো মৌলিক ও চরমপন্থি প্রতিবাদকে ‘অসভ্য’ বা ‘উচ্ছৃঙ্খল’ বলে দাগিয়ে দিতে চায়। ফলে আইন অমান্যের তাত্ত্বিক বিনির্মাণে আমাদের দেখতে হবে যে, অহিংসা, প্রকাশ্যতা এবং আইনি আনুগত্যের যে প্রচলিত ধারণা রয়েছে, তা আসলে ক্ষমতার বিন্যাসের সাথে কীভাবে সম্পর্কিত।
প্রথমেই আসে অহিংসার প্রশ্নটি। রলসের উদারনৈতিক মডেলে অহিংসাকে আইন অমান্যের একটি অলঙ্ঘনীয় শর্ত হিসেবে ধরা হয়েছে। যুক্তি দেওয়া হয় যে, সহিংসতা মানুষের যোগাযোগের পথ বন্ধ করে দেয় এবং প্রতিবাদের নৈতিক আবেদনকে ম্লান করে। কিন্তু বাস্তব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে সহিংসতা ও অহিংসার মধ্যকার সীমারেখাটি অত্যন্ত অস্পষ্ট।
উদাহরণস্বরূপ, যখন প্রটেস্ট্যান্টরা বা ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনের কর্মীরা কোনো বর্ণবাদী স্মারক বা ঐতিহাসিক শোষকের মূর্তি ভেঙে ফেলে, কিংবা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের প্রতীক হিসেবে কোনো পুলিশি যানবাহন পুড়িয়ে দেয়, তখন কি তাকে ব্যক্তি-হিংসা বা সাধারণ সহিংসতার সাথে তুলনা করা যায়?
জন মরেল বা জেনিফার ওয়েলচম্যানের মতো চিন্তাবিদেরা বলেন যে, সম্পত্তির ক্ষতিসাধন আর মানুষের ওপর শারীরিক আঘাত করা এক জিনিস নয় [৭]। শোষণের প্রতীকী কাঠামোর ওপর আঘাত করা অনেক সময় প্রতিবাদের ভাষাকে আরও বেশি স্পষ্ট এবং কার্যকর করে। তদুপরি, অনশন বা আত্মাহুতির মতো আত্ম-উৎসর্গমূলক সহিংসতা অনেক সময় শোষকের ভেতরের সুপ্ত হিংস্রতা ও অমানবিকতাকে সমাজের সামনে সম্পূর্ণ উন্মোচিত করে দেয়।
একইভাবে ‘প্রকাশ্যতা’র শর্তটিকেও সমকালীন ডিজিটাল যুগে নতুন করে মূল্যায়ন করা দরকার। সনাতন তাত্ত্বিকেরা বলতেন, আইন অমান্যকারীকে অবশ্যই নিজের পরিচয় প্রকাশ করে, প্রশাসনকে আগে থেকে জানিয়ে আন্দোলনে নামতে হবে।
কিন্তু বর্তমানের নজরদারি রাষ্ট্র এবং কর্পোরেট আধিপত্যের যুগে অগ্রিম নোটিশ দিয়ে আন্দোলন করতে গেলে রাষ্ট্রযন্ত্র শুরুতেই তা পণ্ড করে দেয়। এডওয়ার্ড স্নোডেনের মতো তথ্যফাঁসকারী যখন রাষ্ট্রের গোপন ও বেআইনি নজরদারির তথ্য ফাঁস করেন, তখন তাকে অত্যন্ত গোপনে কাজটি করতে হয়। কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর তিনি এর নৈতিক দায় স্বীকার করেন। একে কি আমরা আইন অমান্য বলব না?
একইভাবে অ্যানোনিমাস বা ডিজিটাল অ্যাক্টিভিস্টরা যখন ডিলিয়াড ডিনায়াল অব সার্ভিস (DDoS) আক্রমণের মাধ্যমে কোনো অন্যায্য কর্পোরেট বা রাষ্ট্রীয় ওয়েবসাইটের কার্যক্রম স্তব্ধ করে দেয়, তখন তাকে ‘ভার্চুয়াল সিট-ইন’ বা ডিজিটাল আইন অমান্য হিসেবেই গণ্য করতে হবে। এখানে পরিচয় গোপন রাখাটাই প্রতিবাদের টিকে থাকার প্রধান শর্ত।
সবচেয়ে বড় বিতর্কটি রয়েছে ‘আইনি আনুগত্য’ বা শাস্তি মেনে নেওয়ার মানসিকতা নিয়ে। রলসের অনুসারীরা মনে করেন, শাস্তি মেনে নেওয়ার মাধ্যমে নাগরিক আইনের শাসনের প্রতি তার সম্মান বজায় রাখে। কিন্তু কিম্বার্লি ব্রাউনলি বা ডেভিড লেফকোভিচের মতো সমকালীন চিন্তাবিদেরা প্রশ্ন তুলেছেন, যে আইনটি নিজেই চরম অন্যায্য এবং যে বিচারব্যবস্থা শোষকের স্বার্থ রক্ষা করে, তার দেওয়া শাস্তি মেনে নেওয়ার মধ্যে কী ধরনের নৈতিক গৌরব থাকতে পারে? [৮] জেনোসাইড বা বর্ণবাদের মতো অপরাধের আইনি পরিণতি মাথা পেতে নেওয়া অনেক সময় সেই অন্যায় ব্যবস্থার আইনি বৈধতাকেই পরোক্ষভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার শামিল। ফলে, আদালতে দাঁড়িয়ে ‘দোষী’ স্বীকার না করে, বরং ‘নট গিল্টি’ বা নির্দোষ দাবি করে রাষ্ট্রের আইনি সংজ্ঞাকেই চ্যালেঞ্জ করাটাই প্রকৃত রাজনৈতিক প্রতিরোধ। আইন অমান্যের মূল লক্ষ্য আইনের প্রতি বিশ্বস্ততা দেখানো নয়, বরং আইনি কাঠামোর ভেতরে লুকিয়ে থাকা অবিচারকে সমূলে উৎপাটন করা।
৩. ঐতিহাসিক বিকাশ ও রূপান্তর
আইন অমান্যের তত্ত্ব কেবল পশ্চিমা লাইব্রেরির চত্বরে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং এর প্রকৃত রূপান্তর ও বিকাশ ঘটেছে ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক বিশ্বের রাজপথে। এই রূপান্তরের সবচেয়ে বড় পুরোধা ছিলেন মহাত্মা গান্ধী। গান্ধী থরোর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী ধারণাকে দক্ষিণ আফ্রিকা এবং পরবর্তীতে ভারতের মাটিতে একটি সমষ্টিগত, শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রযুক্তিতে রূপান্তর করেন, যার নাম তিনি দিয়েছিলেন ‘সত্যাগ্রহ’।
করুণা মান্তেনার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গান্ধীর সত্যাগ্রহ কেবল একটি নৈতিক আদর্শ ছিল না [৯]। এটি ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে একটি অত্যন্ত হিসাব-নিকাশ করা কৌশলগত প্রতিরোধ। গান্ধী বুঝতে পেরেছিলেন যে, একটি আধুনিক সশস্ত্র ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সহিংস যুদ্ধে জয়ী হওয়া অসম্ভব এবং তা সমাজের ভেতরেও এক স্থায়ী হিংস্রতার জন্ম দেয়।
গান্ধীর লবণ সত্যাগ্রহের কথা ধরা যাক। ১৯৩০ সালের দাণ্ডি অভিযান ছিল ব্রিটিশদের তৈরি করা লবণ আইনের বিরুদ্ধে এক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আঘাত।
লবণের মতো একটি অপরিহার্য প্রাকৃতিক উপাদানের ওপর ব্রিটিশদের একচেটিয়া কর আদায়ের আইনকে ভেঙে গান্ধী প্রমাণ করেছিলেন যে, আইন অমান্যের মাধ্যমে কীভাবে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে রাজনৈতিক সংগ্রামের সাথে যুক্ত করা যায়। সমুদ্রের তীরে গিয়ে নিজ হাতে এক চিমটি লবণ তুলে নিয়ে তিনি কোটি কোটি মানুষের অবচেতন মন থেকে ব্রিটিশ আইনের কাল্পনিক ভয় দূর করে দিয়েছিলেন। ব্রিটিশ পুলিশ যখন অহিংস সত্যাগ্রহীদের ওপর নির্মমভাবে লাঠিচার্জ করছিল, আর সত্যাগ্রহীরা কোনো পাল্টা আঘাত না করে সেই নির্যাতন সহ্য করছিলেন, তখন আন্তর্জাতিক মিডিয়ার সামনে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের তথাকথিত ‘সভ্যতার মুখোশ’ সম্পূর্ণ খসে পড়েছিল। এটিই ছিল গান্ধীর নৈতিক শক্তির কৌশলগত বিজয়।
অনুরূপভাবে, আমেরিকার মাটিতে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র এবং সিভিল রাইটস মুভমেন্ট বা নাগরিক অধিকার আন্দোলন আইন অমান্যের এই দর্শনকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। বর্তমানের উদারনৈতিক সমাজ প্রায়শই মার্টিন লুথার কিং-এর আন্দোলনকে একটি অত্যন্ত রোমান্টিক এবং শান্তিপূর্ণ হিসেবে উপস্থাপন করে, যা আসলে ইতিহাসের একটি স্যানিটাইজড সংস্করণ। আ
লেকজান্ডার লিভিংস্টন বা এরিন পিনেডার মতো ইতিহাসবিদেরা দেখিয়েছেন যে, কিং-এর আন্দোলন মোটেও নিষ্ক্রিয় বা বোঝাপড়ার আন্দোলন ছিল না [১০]। ১৯৫৫ সালে মন্টগোমারি বাসের সিট ছেড়ে দিতে অস্বীকৃতি জানানো রোজা পার্কসের সেই ঐতিহাসিক ‘না’ ছিল রাষ্ট্র ও সমাজের বর্ণবাদী কাঠামোর বিরুদ্ধে এক চরম অবাধ্যতা।
মার্টিন লুথার কিং তাঁর বিখ্যাত ‘লেটার ফ্রম বার্মিংহাম জেল’-এ পরিষ্কার লিখেছিলেন যে, সরাসরি অহিংস আন্দোলনের মূল লক্ষ্য হলো সমাজে এমন এক সংকটপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করা, যা রাষ্ট্রকে আলোচনা করতে বাধ্য করে [১১]।
তিনি সমাজের কৃত্রিম শান্তির চেয়ে ন্যায়বিচারকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছিলেন। কৃষ্ণাঙ্গদের এই আন্দোলন আমেরিকার অর্থনীতি এবং সমাজব্যবস্থাকে কার্যত অচল করে দিয়েছিল। এটি ছিল অহিংসার এক অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও বাস্তবসম্মত রূপ, যা শোষক শ্রেণীকে তাদের আইনি ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধা ত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল।
উত্তর-ঔপনিবেশিক বাংলাদেশের ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই যে, এই ভূখণ্ডের জন্মই হয়েছে এক সুদীর্ঘ আইন অমান্য ও প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যখন ঢাকাজুড়ে ১৪৪ ধারা জারি করে সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করেছিল, তখন সেই আইনটি ছিল বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় ও ভাষার অধিকারকে স্তব্ধ করার এক চক্রান্ত। ২১শে ফেব্রুয়ারির সকালে ছাত্র ও জনতা যখন সেই ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত নেন, তখন কাগজের আইনের চোখে তারা সবাই ছিলেন আইনভঙ্গকারী ও অপরাধী। রাষ্ট্র তাদের ওপর গুলি চালিয়েছিল, রক্ত ঝরিয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসের আদালতের বিচারে সেই আইন অমান্য ছিল পরম ন্যায়সঙ্গত এবং অনিবার্য।
আমাদের একেবারে সাম্প্রতিক ইতিহাসের দিকে তাকান। ২৪-এর জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার মহাকাব্যিক গণঅভ্যুত্থান। রাষ্ট্র যখন তার নিজের নাগরিকদের, বিশেষ করে অধিকারকামী তরুণ শিক্ষার্থীদের বুকে সরাসরি গুলি চালানোর জন্য সান্ধ্যকালীন আইন জারি করল, তখন সেই আইনের নৈতিক বৈধতা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়?
আগস্টের শুরুতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বানে যে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তা ছিল আধুনিক কালের আইন অমান্যের এক অভূতপূর্ব লোকাল সংস্করণ। কর বা গ্যাস/পানির বিল দেওয়া বন্ধ করা, প্রবাসীদের ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানো স্থগিত করা, সরকারি অফিস-আদালত বয়কট করা এবং সবচেয়ে বড় কথা—রাষ্ট্রযন্ত্রের জারি করা কারফিউ ও ‘শুট অ্যাট সাইট’ (দেখামাত্র গুলি) নির্দেশকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে হাসিমুখে লাখো জনতার রাজপথে নেমে আসা এগুলো সবই ছিল একটি প্রতিষ্ঠিত স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকাঠামোর সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান।
ইতিহাসের কাঠগড়ায় বুক পেতে দেওয়া এই কারফিউ ভঙ্গকারীরা কি অপরাধী ছিলেন? না।
তারা প্রমাণ করেছেন যে, রাষ্ট্রের আইন যখন খুনির হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন সেই আইন অমান্য করাই হলো নাগরিকের সর্বোচ্চ নৈতিক দায়িত্ব। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে যখন স্বৈরাচার ও ফ্যাসিজম চেপে বসে, তখন আইন অমান্য আর কেবল কোনো একটি নির্দিষ্ট বৈষম্য দূর করা বা আংশিক সংস্কারের হাতিয়ার থাকে না। তা হয়ে ওঠে একটি পচে যাওয়া সিস্টেমকে সমূলে উৎপাটন করে নতুন এক ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ পুনর্গঠনের প্রধান নিয়ামক।
৪. আইন অমান্যের ন্যায্যতা ও শর্তাবলী
আইন অমান্যের ন্যায্যতা প্রতিপাদনের ক্ষেত্রে জন রলস যে তিনটি প্রধান শর্তের কথা বলেছিলেন—দীর্ঘস্থায়ী অবিচার, শেষ অবলম্বন এবং সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর সমন্বয়—তা সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোতে গভীর সমালোচনার দাবি রাখে।
রলসের প্রথম শর্ত ছিল, আইন অমান্য কেবল তখনই করা যাবে যখন সমাজের মৌলিক স্বাধীনতাগুলো দীর্ঘ সময় ধরে লঙ্ঘিত হবে। তিনি অর্থনৈতিক বৈষম্য বা সামাজিক নীতিনির্ধারণের বিষয়গুলোকে এর বাইরে রেখেছিলেন।
কিন্তু পুঁজিবাদের এই আধুনিক যুগে অর্থনৈতিক অবিচার এবং রাষ্ট্রীয় আইন একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। কর্পোরেট স্বার্থে যখন কোনো রাষ্ট্র ভূমি অধিগ্রহণ আইন তৈরি করে গরিব কৃষকদের জমি কেড়ে নেয়, কিংবা পরিবেশ ধ্বংসকারী কোনো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অনুমোদন দেয়, তখন সেখানে মৌলিক স্বাধীনতা আর অর্থনৈতিক শোষণের মধ্যে কোনো তফাত থাকে না। ফলে রলসের এই সংকীর্ণ বিভাজন বাস্তব জগতের অবিচারকে আড়াল করার একটি বুদ্ধিবৃত্তিক চেষ্টা মাত্র।
রলসের দ্বিতীয় শর্ত—আইন অমান্য হতে হবে ‘শেষ অবলম্বন’—তাও চরমভাবে ত্রুটিপূর্ণ। এই শর্তের অন্তর্নিহিত অর্থ হলো, নাগরিককে প্রথমে বছরের পর বছর ধরে ভোট, পিটিশন, আইনি মামলা এবং মানববন্ধনের মতো নিষ্ক্রিয় প্রাতিষ্ঠানিক পথে ঘুরতে হবে। কিন্তু শোষিত ও প্রান্তিক মানুষের কি এই দীর্ঘ আইনি লড়াই চালানোর মতো সময় বা সংস্থান থাকে? একটি স্বৈরাচারী বা ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে যেখানে আদালতের স্বাধীনতা বলতে কিছু থাকে না, সেখানে আইনি পথ ব্যবহার করা মানে প্রকারন্তরে সেই অন্যায্য ব্যবস্থার আয়ু বাড়িয়ে দেওয়া।
ফলে, অবিচার যখন চরম রূপ নেয়, তখন আইন অমান্য প্রথম পদক্ষেপও হতে পারে, শেষ অবলম্বন নয়। ক্ষমতার এই অসম বিন্যাসে প্রাতিষ্ঠানিক পথগুলো নিজেই শোষণের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।
তৃতীয়ত, রলসের সংখ্যালঘু সমন্বয়ের শর্তটি আন্দোলনের বাস্তব গতিপ্রকৃতিকে উপেক্ষা করে। একটি স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে যখন মানুষ রাস্তায় নেমে আসে, তখন বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে নিখুঁত সমন্বয় সাধন করার মতো রাজনৈতিক বিলাসিতার সুযোগ থাকে না। জলবায়ু পরিবর্তন বা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের বিরুদ্ধে আজকের দিনে সারা পৃথিবীতে যে ফ্রাইডেস ফর ফিউচার বা এক্সটিংশন রেবেলিওনের মতো আন্দোলনগুলো হচ্ছে, তা কোনো কেন্দ্রীয় ছকে বাঁধা নয়। তরুণেরা যখন স্কুল বর্জন করে বা রাস্তা আটকে বসে থাকে, তখন তারা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদনের তোয়াক্কা করে না। কারণ তারা জানে যে, তথাকথিত নিয়ম ও শৃঙ্খলার মধ্যে থেকে আজ পর্যন্ত কোনো বড় কাঠামোগত পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়নি।
আইন অমান্যের প্রকৃত নির্যাস নিহিত রয়েছে তার সিস্টেমবিরোধী চরিত্রের মধ্যে। এটি সমাজের কৃত্রিম ঐকমত্যকে চ্যালেঞ্জ করে। আলেকজান্ডার ল্যাভিনের মতে, আইন অমান্য সমাজকে অবচেতন স্তরের মগজধোলাই থেকে মুক্ত করে এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক ধাক্কা দেয়। এটি সাধারণ মানুষকে ভাবাতে বাধ্য করে যে, আমরা যে সমাজব্যবস্থাকে ‘স্বাভাবিক’ এবং ‘আইনসঙ্গত’ বলে ধরে নিয়েছি, তার ভেতরে কতটা সহিংসতা ও শোষণ লুকিয়ে আছে। তাই আইন অমান্যের ন্যায্যতা কোনো আইনি বইয়ের ধারা দিয়ে পরিমাপ করা যাবে না; এর ন্যায্যতা নির্ধারিত হবে মানুষের মুক্তি ও সামাজিক সমতার বৃহত্তর আকাঙ্ক্ষার মধ্য দিয়ে।
৫. ডিজিটাল ও সমকালীন নাগরিক প্রতিরোধ
একবিংশ শতাব্দীতে প্রযুক্তির অভূতপূর্ব বিকাশ পাবলিক স্ফিয়ারের চরিত্রকে আমূল বদলে দিয়েছে। হাবেরমাস যে কফি হাউজ বা সংবাদপত্রের জনপরিসরের কথা বলেছিলেন, তা আজ স্থানান্তরিত হয়েছে সাইবার স্পেস বা ডিজিটাল দুনিয়ায়।
এই পরিবর্তনের ফলে আইন অমান্যের কৌশল এবং দর্শনেও এসেছে এক বিশাল রূপান্তর। সমকালীন রাষ্ট্রচিন্তায় এই নতুন ধারাকে ‘ডিজিটাল ডিসঅবিডিয়েন্স’ বা সাইবার প্রতিরোধ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। আধুনিক রাষ্ট্র আজ কেবল লাঠি বা বন্দুক দিয়ে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং সে ব্যবহার করছে সিসিটিভি, অ্যালগরিদম, ফেসিয়াল রিকগনিশন এবং ইন্টারনেটের ওপর কঠোর নজরদারি। এই নজরদারি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে প্রতিরোধকেও ডিজিটাল রূপ ধারণ করতে হয়েছে।
ডিজিটাল আইন অমান্যের একটি বড় প্রকাশ হলো হ্যাকটিভিজম। সাধারণ হ্যাকাররা সাইবার অপরাধ করে ব্যক্তিগত লাভ বা অর্থ চুরির জন্য, কিন্তু হ্যাকটিভিস্টরা তা করে একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা সামাজিক আদর্শের ভিত্তিতে। যেমন, উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ যখন ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের মার্কিন সামরিক বাহিনীর গোপন নথি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছিলেন, তখন তিনি প্রচলিত আন্তর্জাতিক ও রাষ্ট্রীয় আইন ভঙ্গ করেছিলেন। কিন্তু নৈতিকতার বিচারে তাঁর এই কাজ ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের মিথ্যাচার ও যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে এক চরম বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ।
উইকিলিকস এবং স্নোডেনের এই কাজগুলো প্রমাণ করে, আধুনিক যুগে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করাটাই হলো সবচেয়ে বড় আইন অমান্য। একইভাবে অ্যারন সোয়ার্টজের ওপেন অ্যাক্সেস আন্দোলনের কথা বলা যায়। সোয়ার্টজ এমআইটির নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার বৈজ্ঞানিক ও একাডেমিক গবেষণাপত্র সাধারণ মানুষের জন্য বিনামূল্যে ডাউনলোড করার ব্যবস্থা করেছিলেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন যে জ্ঞান কারো ব্যক্তিগত বা কর্পোরেট সম্পত্তি হতে পারে না। রাষ্ট্র তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিয়েছিল, যা তাকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু সোয়ার্টজের এই কাজ বিশ্বজুড়ে মুক্ত জ্ঞান ও ডিজিটাল সাম্যের এক নতুন চেতনা তৈরি করেছে।
ডিজিটাল প্রতিরোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সমকালীন সামাজিক আন্দোলনের মাঠ পর্যায়ের কৌশল। আধুনিক আন্দোলনগুলো আজ আর কোনো নির্দিষ্ট দলের ব্যানারে হয় না, এগুলো হয় ফেসবুক, টুইটার বা এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপের (যেমন সিগন্যাল বা টেলিগ্রাম) মাধ্যমে সমন্বিত বিকেন্দ্রীকৃত আন্দোলন। হংকংয়ের ছাতা আন্দোলন কিংবা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ঘটে যাওয়া স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনগুলো একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে। সেখানে আন্দোলনকারীদের কোনো একক নেতা ছিল না। তারা ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্যে মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিত, পুলিশের অবস্থান ট্র্যাক করত এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে নিজেদের প্রতিবাদের ভাষা বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিত।
যখন রাষ্ট্র ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়, তখন তারা মেশ-নেটওয়ার্কিং বা অফলাইন ব্লুটুথ অ্যাপের সাহায্যে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখে। এটিও এক ধরনের প্রযুক্তিগত আইন অমান্য। রাষ্ট্র যখন প্রযুক্তিকে দমনের হাতিয়ার বানায়, নাগরিক তখন সেই প্রযুক্তিকেই প্রতিরোধের বর্মে রূপান্তর করে। এই ডিজিটাল প্রতিরোধ প্রমাণ করে যে, দেয়াল যতই উঁচু হোক না কেন, মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের জন্য নতুন কোনো না কোনো পথ ঠিকই খুঁজে নেয়।
৬. রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া, দণ্ডনীতি এবং সাংবিধানিক সংকটের প্রশ্ন
আইন অমান্যের মুখে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিক্রিয়া এবং তার দণ্ডনীতি বিশ্লেষণ করলে আমরা আধুনিক আইন দর্শনের এক সংকট দেখতে পাই।
যখন কোনো নাগরিক বা গোষ্ঠী সচেতনভাবে আইন ভঙ্গ করে, তখন বিচারব্যবস্থা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এক ধরনের প্যারাডক্সের মুখোমুখি হয়। অপরাধ তত্ত্বের দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, শাস্তির মূল লক্ষ্য হলো সমাজে অপরাধ প্রতিরোধ করা এবং অন্যদের সতর্ক করা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, রাষ্ট্র মনে করে যে আইন অমান্যকারীদের যদি শাস্তি না দেওয়া হয়, তবে তা সাধারণ মানুষের মধ্যে আইন ভাঙার প্রবণতা বাড়িয়ে দেবে এবং সমাজের স্থিতিশীলতা নষ্ট করবে।
কেন্ট গ্রিনাওয়াল্টের মতে, আইনের অভিন্ন প্রয়োগ না হলে বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়। তাই, কেউ ভালো উদ্দেশ্যে আইন ভাঙলেও তাকে সাধারণ অপরাধীর মতোই শাস্তি দেওয়া উচিত [১২]।
কিন্তু এর বিপরীতে রোনাল্ড ডরকিনের যে অধিকার-ভিত্তিক আইনি দর্শন, তা রাষ্ট্রের এই শাস্তিমূলক মনোভাবকে কঠোরভাবে খণ্ডন করে [১৩]।
ডরকিনের যুক্তি হলো, একটি প্রকৃত সাংবিধানিক গণতন্ত্রে নাগরিকের ‘বিবেকের অধিকার’ এবং বাকস্বাধীনতা অত্যন্ত মৌলিক বিষয়। যখন কোনো নাগরিক আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করে যে কোনো একটি নির্দিষ্ট আইন সংবিধানের মূল স্পিরিট বা ন্যায়ের পরিপন্থী, তখন সেই আইন ভঙ্গ করা তাঁর একটি সাংবিধানিক অধিকারের মধ্যেই পড়ে।
ডরকিন মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন যে, বিচারকেরা নিজেরাও অনেক সময় পুরোনো কোনো আইনকে অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেন।
তাহলে একজন সাধারণ নাগরিক যদি আন্দোলনের মাধ্যমে কোনো একটি আইনের অসাংবিধানিক ও অন্যায্য চরিত্রকে আদালতের সামনে তুলে ধরতে চান, তবে তাকে কেন অপরাধী বলা হবে? রাষ্ট্রের একটি বিশেষ দায়িত্ব হলো এই ধরনের প্রতিবাদকারীদের সুরক্ষা দেওয়া এবং তাদের প্রতি নমনীয় হওয়া। সরকারি প্রসিকিউটরদের উচিত তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর ধারায় মামলা না করা এবং বিচারকদের উচিত তাদের শাস্তি মওকুফ বা নামমাত্র প্রতীকী দণ্ড দেওয়া।
জোসেফ রাজ অবশ্য ডরকিনের এই ধারণার কিছুটা সমালোচনা করেছেন তাঁর শাসনব্যবস্থা-ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে [১৪]। রাজের মতে, একটি সম্পূর্ণ অনুদার বা স্বৈরাচারী রাষ্ট্রে নাগরিকের আইন অমান্য করার এবং রাষ্ট্রকে অচল করে দেওয়ার পূর্ণ নৈতিক অধিকার রয়েছে, কারণ সেখানে তাদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের কোনো পথ থাকে না।
কিন্তু একটি উদারনৈতিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে, যেখানে নাগরিকের ভোট দেওয়ার, কথা বলার এবং আইনি প্রতিবাদের অধিকার সুরক্ষিত থাকে, সেখানে আইন অমান্যের অধিকার খাটো হয়ে আসে। কারণ সেখানে আইনি পথেই পরিবর্তন আনা সম্ভব।
তবে রাজের এই তত্ত্বের বড় দুর্বলতা হলো, তিনি বাস্তব জগতের তথাকথিত উদার রাষ্ট্রগুলোর ভেতরের লুকানো স্বৈরাচারী চরিত্রকে ধরতে পারেননি। বাস্তবে কোনো রাষ্ট্রই পুরোপুরি উদার বা অনুদার হয় না; সবাই একটি স্পেকট্রাম বা সীমানার মধ্যে অবস্থান করে। আমেরিকার মতো তথাকথিত সভ্য দেশেও আমরা দেখি কীভাবে কৃষ্ণাঙ্গ বা আদিবাসীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে পুলিশ মিলিটারি গিয়ার এবং টিয়ার গ্যাস দিয়ে নিষ্ঠুরভাবে দমন করে। ব্রিটেনের মতো রাষ্ট্রেও পরিবেশবাদী আন্দোলন এক্সটিংশন রেবেলিওনের রাস্তা অবরোধের কর্মসূচিকে দমন করার জন্য নতুন নতুন কঠোর আইন পাস করা হয়। ফলে, তথাকথিত উদার রাষ্ট্রগুলোও অনেক সময় চরম অনুদার আচরণ করে, যা নাগরিকের আইন অমান্যের যৌক্তিকতাকে পুনর্প্রতিষ্ঠিত করে।
এই সাংবিধানিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য ডেভিড লেফকোভিচ প্রস্তাব দিয়েছেন যে, রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অধিকারের মধ্যেই আইন অমান্যের অধিকার নিহিত [১৫]। একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ভোটের মাধ্যমে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার অর্থ এই নয় যে সেই সিদ্ধান্তটি সবসময় নিখুঁত বা ন্যায়সঙ্গত। সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন অনেক সময় সংখ্যালঘুর ওপর অত্যাচারের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। তাই ভোটের পরও সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অহিংসভাবে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অধিকার নাগরিকের থাকা উচিত।
এর জন্য প্রয়োজনে দেশের দণ্ডবিধিতে পরিবর্তন এনে ‘ডেমান্ডস অব কনভিকশন’ অর্থাৎ বিবেকের তাড়নায় কৃত কাজের জন্য বিশেষ আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ রাখা উচিত। আদালতকে কেবল এটি দেখলে চলবে না যে আইনটি ভাঙা হয়েছে কিনা; আদালতকে দেখতে হবে কোন নৈতিক উদ্দেশ্যে আইনটি ভাঙা হয়েছে। একটি রাষ্ট্র যখন তার আইনি কাঠামোর ভেতরে এই ধরনের নীতিগত ভিন্নমতের জায়গা দিতে পারে, কেবল তখনই সেই রাষ্ট্র একটি প্রকৃত ন্যায়ভিত্তিক সমাজ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
উপসংহার
আইন তো মানুষের জন্যই তৈরি। কিন্তু কখনো কখনো সেই আইনই যখন মানুষের গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়ায়, তখন কী করার থাকে?
রাষ্ট্র বা সরকার যে নিয়মকানুনগুলো বানায়, তা তো চূড়ান্ত নয়। রক্তমাংসের মানুষই সেগুলো লেখে। কখনো হয়তো নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে, কখনো আবার তখনকার পরিস্থিতির চাপে। আইনের আসল কাজ তো মানুষকে শান্তিতে রাখা, তার অধিকার বুঝিয়ে দেওয়া। কিন্তু সেই আইনই যখন উল্টো মানুষের ওপর ছড়ি ঘোরাতে শুরু করে, তখন বুঝতে হয় কোথাও গণ্ডগোল হয়েছে।
ঠিক এমন সময়েই কিছু মানুষ রুখে দাঁড়ায়। তারা বুক চিতিয়ে বলে, ‘এই অন্যায় আমরা মানি না!’ এই যে না মানার সাহস, এটাই তো আইন অমান্য। সিভিল ডিজঅবিডিয়েন্স। অবশ্য সব প্রতিবাদই যে সঠিক হয়, তা নয়। কেউ কেউ নিজের স্বার্থেও জল ঘোলা করে। কিন্তু যুগে যুগে যারা সত্যিকারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, তারা নিজেদের আরাম-আয়েশের কথা ভাবেনি। তারা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, অন্ধের মতো সব মেনে নেওয়ার নামই নাগরিকত্ব নয়। মার্টিন লুথার কিং-ও ঠিক এ কথাই বলেছিলেন—যে আইন অন্যায়, তাকে চোখ বুজে মেনে নেওয়ার চেয়ে অবাধ্য হওয়াই শ্রেয়।
এখন কথা হলো, সরকার এই প্রতিবাদীদের সাথে কী আচরণ করবে? সে কি কেবল পুলিশ আর লাঠি দিয়ে তাদের মুখ বন্ধ করে দেবে? যদি তাই হয়, তবে মানুষ রাগে-ক্ষোভে একদিন ঠিকই ফেটে পড়বে। আর সরকার যদি অহংকার সরিয়ে নিজেদের ভুলটা শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করে, তবে সমাজটা সবার জন্যই একটু বেশি বাসযোগ্য হবে।
আজকের এই ইন্টারনেটের যুগে ব্যাপারটা আরও জটিল হয়ে গেছে। এখন পদে পদে আমাদের ওপর নজরদারি। কে কী লিখছে, কে কী ভাবছে সব সরকারের নখদর্পণে। এখনকার দিনে প্রতিবাদ মানে শুধু রাস্তায় নেমে স্লোগান দেওয়ায় সীমাবদ্ধ নেই। এই অদৃশ্য শেকলগুলো ভেঙে নিজের স্বাধীন চিন্তার অধিকারটুকু বাঁচিয়ে রাখাও এক বড় লড়াই।
রাষ্ট্রীয় বৈধতা এবং নৈতিক ন্যায়বিচারের মধ্যে ব্যবধান একটি চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতা। যখন রাষ্ট্রের আইন মৌলিক অধিকারকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করে, তখন একজন নাগরিক প্রচলিত আইনি কাঠামোর প্রতি নিরঙ্কুশ আনুগত্য প্রকাশ করবেন নাকি বিবেকের তাড়নায় প্রতিবাদ করবেন সেই সিদ্ধান্তটি মূলত রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত। এর কোনো সরল বা একমাত্রিক উত্তর নেই। বরং, রাষ্ট্র ও নাগরিকের এই ক্রমাগত বোঝাপড়া এবং সংঘাতের মধ্য দিয়েই আইনি ব্যবস্থা এবং সামাজিক কাঠামোগুলো সময়ের সাথে বিবর্তিত হয়েছে।





Comments