৫৪ দেশে জরিপঃ ধর্মীয় বিশ্বাসের বৈশ্বিক চিত্র

আমি যখন গ্র্যাজুয়েট স্কুলে পড়ি, আমাদের প্রোগ্রামে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে দুটি মেজর ও একটি মাইনর বিষয় নিতে হতো। আমি জানতাম আমার একটা মেজর হবে মার্কিন রাজনীতি। এটা বেছে নেওয়া আমার জন্য খুব সহজ সিদ্ধান্ত ছিল। আমাকে এ-ও জানানো হয়েছিল যে, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের চেয়ে জনপ্রশাসনে শিক্ষকতার চাকরি পাওয়া তুলনামূলক সহজ; কারণ চাকরির সুযোগ ছিল তুলনামূলক বেশি, অথচ এ বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গ্র্যাজুয়েটের সংখ্যা ছিল কম। তাই দ্বিতীয় মেজর হিসেবে আমি ওটাই বেছে নিই।
আজও আমি বুঝি না, ঠিক কী ভেবে তৃতীয় বিষয় হিসেবে তুলনামূলক রাজনীতি নিয়েছিলাম। কারণ তখন পর্যন্ত নিজের দেশের বাইরে আমি শুধু কানাডাতেই গিয়েছিলাম। তবে যতদূর মনে পড়ে, তুলনামূলক রাজনীতির ওপর আমি প্রায় নয় ক্রেডিট আওয়ারের কোর্স করেছিলাম।
সবচেয়ে স্মরণীয় কোর্সটি পড়িয়েছিলেন প্রখর মেধাবী অধ্যাপক ফ্রেড সল্ট। কোর্সের নাম ছিল, ‘কম্পারেটিভ পলিটিক্যাল বিহেভিয়ার’। বিভিন্ন সমাজ কীভাবে তাদের নিজ নিজ দেশের সরকারের সাথে যুক্ত হয়, মূলত সেটাই ছিল এ ক্লাসের বিষয়। কিছুদিন আগে ড্রপবক্স ঘাঁটতে গিয়ে আমি কোর্সটির সিলেবাসও খুঁজে পাই।
সোভিয়েত ইউনিয়নের নির্বাচন নিয়ে পড়ার সময় জেনেছিলাম সেখানে প্রচুর ব্যালট ইচ্ছাকৃতভাবে নষ্ট করা হতো। কারণ, প্রত্যেক নাগরিকের জন্য ভোট দেওয়া বাধ্যতামূলক থাকলেও, ব্যালট পেপারে বিকল্প হিসেবে কেবল একজনেরই নাম থাকত। ওটাই ছিল তাদের প্রতিবাদের ভাষা।
ফাইনাল প্রজেক্টের ব্যাপারে আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, ধর্ম নিয়ে আমি একটি উপাত্তভিত্তিক পেপার লিখব। এর জন্য ‘World Values Survey’ ব্যবহার করা ছাড়া আমার আর কোনো উপায় ছিল না। তবে এই প্রজেক্টের একটা ব্যাপার আমার স্পষ্ট মনে আছে। পুরো ডেটা ফাইলটা লোড করতে গেলেই আমার ছোট্ট ডেল ল্যাপটপটি বারবার ক্র্যাশ করত। কাজটা সামলানোর মতো পর্যাপ্ত র্যাম তাতে ছিল না। তাই বাধ্য হয়ে আমি ড. সল্টকে অনুরোধ করি, বিশ্লেষণের জন্য তিনি যেন নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের ডেটা আলাদা করে আমাকে পাঠান।
এখন অবশ্য আমার আর সেই সমস্যা নেই। আমি পুরো ফাইলটাই লোড করতে পারি। জরিপটির সবচেয়ে সাম্প্রতিক সংস্করণ হলো ‘ওয়েভ ৭’, যার তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল ২০১৭ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে। এতে মোট ৬৪টি দেশের তথ্য আছে। তবে কিছু দেশে ধর্ম সংক্রান্ত প্রশ্নের কোনো উত্তর না থাকায়, শেষ পর্যন্ত দেশের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ৫৪-তে। অবশ্য এ সংখ্যাটাও নেহাত কম নয়।
ওয়ার্ল্ড ভ্যালুজ সার্ভের (WVS) ডেটা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ধর্ম সম্পর্কে বেশ কিছু অপ্রত্যাশিত চিত্র সামনে এসেছে; চলুন সেদিকে নজর দেওয়া যাক।

ডব্লিউভিএস-এর খুব সাধারণ একটা প্রশ্ন ছিল: আপনি কি সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করেন?
ওপরের গ্রাফে যেমনটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, এই ডেটাসেটে এমন অনেক দেশ আছে যেখানে প্রায় সবাই সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করে। এমন প্রায় এক ডজন দেশ ছিল, যেখানে অন্তত ৯৯ শতাংশ মানুষ সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী। পাশাপাশি এমন ৩১টি দেশ ছিল, যেখানে এই হার অন্তত ৯০ শতাংশ। তালিকার একেবারে ওপরের দিকে থাকা এই দেশগুলো মূলত কয়েকটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের যেমন, সাব-সাহারান আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা।
তাহলে সবচেয়ে কম ‘বিশ্বাসী’ দেশগুলোর কী অবস্থা? গ্রাফের একেবারে নিচের দিকে দুটি দেশ আলাদাভাবে চোখে পড়ে। চেকিয়ার মাত্র ২৬ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন যে তাঁরা সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করেন। আর চীনে এই হার আরও কম—নগণ্য। মাত্র ১৭ শতাংশ। তালিকার নিচের দিকে মূলত ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার অঞ্চলগুলোর আধিক্য দেখা যায়। এসব অঞ্চলের ম্যাকাও, দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং এবং জাপানের মতো দেশ বা ভূখণ্ডগুলোতে সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসের হার বেশ কম।
জরিপটিতে বিশ্বাসের বিষয়ে আরও একগুচ্ছ প্রশ্ন ছিল, যেগুলো মূলত জান্নাত-জাহান্নামের অস্তিত্ব নিয়ে। এই অংশটা ঘাঁটতে আমার সবসময়ই বেশ ভালো লাগে। প্রশ্নগুলো আলাদাভাবে করা হয়েছিল। ফলে আমরা সহজেই বের করতে পারি—কারা দুটোর অস্তিত্বেই বিশ্বাস করেন, কারা কোনোটিতেই করেন না, আর কারাই বা শুধু যেকোনো একটিতে বিশ্বাস করেন। যে ৫৩টি দেশের মানুষ দুটো প্রশ্নেরই উত্তর দিয়েছেন, তাঁদের তথ্য নিয়ে আমি কিছু হিটম্যাপ তৈরি করেছি।

বিশ্বাসের গ্রাফের একেবারে ওপরের দিকে থাকা অনেক দেশের প্রায় সবাই জান্নাত ও জাহান্নাম—দুটোতেই বিশ্বাস করেন। মিশরে এই হার ১০০ শতাংশ, বাংলাদেশে ৯৯ এবং তিউনিসিয়ায় ৯৮ শতাংশ। তবে সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস আর পরকালে বিশ্বাসের তুলনামূলক হিসাবে বেশ কিছু ব্যতিক্রম চোখে পড়ে।
এর মধ্যে একটা হলো বলিভিয়া। দেশটির ৯৮ শতাংশ মানুষ সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করলেও জান্নাম-জাহান্নাম দুটোতেই বিশ্বাস করেন মাত্র ৬০ শতাংশ। নিকারাগুয়ার ৯২ শতাংশ মানুষ সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী, কিন্তু ৬৪ শতাংশ মানুষ জান্নাম-জাহান্নাম—কোনোটিই মানেন না। আমার বিশ্বাস, আপনারা ঘাঁটলে এমন আরও অনেক মজার উদাহরণ পাবেন; পেলে মন্তব্যের ঘরে জানাতে পারেন।
স্বাভাবিকভাবেই এই গ্রাফে সবচেয়ে নিচে আছে চীন—সেখানকার মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ জান্নাম-জাহান্নাম দুটোতেই বিশ্বাস করেন। চেকিয়ার ক্ষেত্রে এই হার ১১ শতাংশ। অন্যদিকে, জার্মানির ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করলেও, জান্নাম-জাহান্নাম দুটোতেই বিশ্বাস করেন মাত্র ১৫ শতাংশ—যা চেকিয়ার চেয়ে সামান্যই বেশি।
জান্নাম-জাহান্নামের যেকোনো একটিতে বিশ্বাস করেন, এমন মানুষের সংখ্যা সাধারণত খুব একটা দেখা যায় না। তবে কিছু দেশে এই হার বেশ নজরকাড়া। যেমন, ফিলিপাইনের ৩০ শতাংশ উত্তরদাতা গ্রাফের ওপরের বাঁ দিকের ঘরে আছেন, আর কলম্বিয়ার অনুপাতও একদম তাই। ২৫ শতাংশ নিয়ে এর ঠিক পেছনেই আছে পুয়ের্তো রিকো।
উত্তরদাতাদের কাছে সৃষ্টিকর্তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা জানতে জরিপে একটি প্রশ্ন ছিল, যেখানে ১ থেকে ১০ পর্যন্ত স্কেলে তাদের উত্তর দিতে বলা হয়েছিল। এই প্রশ্নটার ডেটা নিয়ে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে আমি রীতিমতো হতাশ হয়ে পড়ি। কারণ, বিপুলসংখ্যক দেশের প্রায় বেশিরভাগ মানুষই ১০-এর মধ্যে ১০ বেছে নিয়েছিলেন। আমার আগ্রহ ছিল মূলত সেই দেশগুলোকে ঘিরে, যেখানকার বড় একটা অংশ একেবারে ১ অথবা ১০ বেছে নিয়েছেন। অন্যভাবে বললে, নিচের দেশগুলোতে ধর্মীয় মেরুকরণ সবচেয়ে প্রবল।

এই গ্রাফে সবচেয়ে বড় অনুপাতটি কোন দেশের? চীন। সেখানে যে একজন উত্তরদাতা ‘সৃষ্টিকর্তার গুরুত্ব’ ১০-এর মধ্যে ১০ দিয়েছেন, তাঁর বিপরীতে ১৫ জন দিয়েছেন ১। চেকিয়াতে এই অনুপাত মোটামুটি ৫ : ১। অর্থাৎ, সেখানে প্রতি একজন প্রবল ধার্মিক মানুষের বিপরীতে পাঁচজন ধর্মহীন মানুষ রয়েছেন। তবে অন্যান্য অনেক বড় দেশে এই ব্যবধান বেশ পরিমিত; যেমন জাপান ও যুক্তরাজ্যে এটি ৩ : ১।
আবার এমন কিছু জায়গাও আছে যেখানে চিত্রটা একেবারেই উল্টো, আর এর প্রায় সবগুলোই গ্রাফের ওপরের দিকে। যেমন, ব্রাজিলে যে একজন উত্তরদাতা নিজেকে ১ দিয়েছেন, তাঁর বিপরীতে ৩৪ জন ‘সৃষ্টিকর্তার গুরুত্ব’ প্রশ্নে ১০-এ ১০ বেছে নিয়েছেন। এই অনুপাত আর্মেনিয়াতে ৩৩ : ১ এবং গুয়াতেমালা ও পুয়ের্তো রিকো—উভয় জায়গাতেই ৩১ : ১।
সহজ কথায়, একজন কট্টর ধর্মহীন মানুষের নিজের দেশেই সংখ্যালঘু হয়ে পড়ার আশঙ্কা একজন প্রবল ধার্মিক মানুষের চেয়ে অনেক বেশি। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি প্রান্তের জন্যই কথাটা সত্যি। এমনকি জার্মানির মতো একটি মূলত ধর্মনিরপেক্ষ দেশেও ১৬ শতাংশ মানুষ নিজেকে ১০-এ ১০ দিয়েছেন, আর ২৬ শতাংশ দিয়েছেন ১। ফলে, ওই ধরনের জায়গাতেও নিজের মতো একই ধর্মীয় চিন্তার মানুষ খুঁজে পাওয়া খুব একটা কঠিন নয়।

বিশ্বাসের হিসাব-নিকাশ আপাতত থাক। ডব্লিউভিএস-এর আরেকটি বিবৃতি আমার বেশ কৌতূহল জাগিয়েছে: ‘একমাত্র গ্রহণযোগ্য ধর্ম হলো আমার ধর্ম।’ বিবৃতিটি আমার খুব ভালো লাগার কারণ হলো, এখানে একজন ব্যক্তিকে তার ধর্মের সত্যতা নিয়ে একদম আপসহীন ও একচেটিয়া একটি দাবি ছুঁড়ে দিতে বলা হয়েছে।
গ্রাফটা দেখলেই বুঝবেন, এমন অনেক দেশ আছে যেখানে বহুত্ববাদের চর্চা খুব একটা জোরালো নয়। বাংলাদেশ, মিয়ানমার, জর্ডান এবং পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ (৯০ শতাংশেরও বেশি) উত্তরদাতা এই কথায় একমত হয়েছেন যে, একমাত্র গ্রহণযোগ্য ধর্ম তাঁদেরটিই। প্রসঙ্গত বলে রাখি, গ্রাফের ওপরের দিকে থাকা এই দেশগুলো যে ধর্মীয়ভাবে সবচেয়ে বেশি সমজাতীয়, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আপনার চারপাশে যখন একটি নির্দিষ্ট ধর্মেরই নিরঙ্কুশ আধিপত্য থাকে, তখন সেই ধর্মটিকেই একমাত্র গ্রহণযোগ্য বলে দাবি করাটা বেশ সহজ।
তাহলে গ্রাফের নিচের দিকের দেশগুলোর কী অবস্থা? বলা চলে, এর প্রায় সবই প্রথম বিশ্বের দেশ। নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, জার্মানি এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোর অবস্থান গ্রাফের এই অংশে। এসব দেশে ধর্মীয় বহুত্ববাদ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে। নিজের ধর্মই একমাত্র গ্রহণযোগ্য—এমন দাবি করা মানুষ সেখানে রীতিমতো বিরল; সাধারণত মোট জনসংখ্যার মাত্র ১০ শতাংশ এমনটা মনে করেন।
তবে আমি সবচেয়ে অবাক হয়েছি ওই দেশগুলো দেখে, যেখানে উত্তরদাতাদের মতামত প্রায় সমান দুই ভাগে বিভক্ত। বিচিত্র মিশ্রণ দেখা গেছে সেখানে, যেমন: নিকারাগুয়া, লেবানন, ইথিওপিয়া, কাজাখস্তান, স্লোভাকিয়া ইত্যাদি। খণ্ডিত মতামতের এই দেশগুলো যে পৃথিবীর কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে অবস্থিত, এমন কোনো ঢালাও মন্তব্য করার সুযোগ এখানে একেবারেই নেই।
কিন্তু এ থেকে আমার মাথায় একটা চিন্তা এল—ঠিক কোন বিষয়গুলো মানুষকে এমনভাবে অন্য ধর্মকে বাতিল করে শুধু নিজের ধর্মকে আঁকড়ে ধরতে প্ররোচিত করে? এটা বোঝার জন্য আমি দুটো সহজ হিসাব কষলাম। প্রথমটি হলো, একটু আগে বলা ‘সৃষ্টিকর্তার গুরুত্ব’ প্রশ্নে প্রতিটি দেশের গড় স্কোর। আর দ্বিতীয়টি হলো, প্রতিটি দেশের ঠিক কত শতাংশ মানুষ নিজের ধর্মকেই একমাত্র গ্রহণযোগ্য বলে মেনে নিয়েছেন। আমি দেখতে চাইছিলাম, যেসব দেশে ধার্মিকতার মাত্রা বেশি, অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে এমন একপেশে বা বর্জনশীল হওয়ার প্রবণতাও বেশি কি না।

পরিসংখ্যান বলছে, জাতীয় পর্যায়ের ধার্মিকতা এবং অন্য ধর্মকে বাতিল করার এই প্রবণতার মধ্যে বেশ জোরালো একটি ধনাত্মক সম্পর্ক দেখা যায় (r = ০.৬৯)। এর মানে হলো, যেসব দেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কেন্দ্রে সৃষ্টিকর্তা বড় জায়গা জুড়ে আছেন, সেসব দেশে নিজেদের ধর্মকেই একমাত্র গ্রহণযোগ্য বলে মনে করা মানুষের সংখ্যাও বেশি। তবে এখানকার R2 (আর-স্কয়ারড) মান মাত্র ০.৪৮; অর্থাৎ, ‘সৃষ্টিকর্তার গুরুত্ব’ নামক এই চলকটি ডেটার মোট পার্থক্যের মাত্র অর্ধেকটা ব্যাখ্যা করতে পারে।
গ্রাফের ট্রেন্ডলাইনের নিচে ধারাবাহিকভাবে অবস্থান করা দেশগুলোর বেশিরভাগই লাতিন আমেরিকার। উদাহরণ হিসেবে ব্রাজিলের কথা ধরা যাক। সেখানে সৃষ্টিকর্তার গুরুত্বের গড় স্কোর ১০-এর মধ্যে ৯-এরও বেশি। অথচ একই সঙ্গে মাত্র ১৫ শতাংশ ব্রাজিলীয় মনে করেন যে তাঁদের ধর্মই একমাত্র সত্য বা গ্রহণযোগ্য ধর্ম। অর্থাৎ, সমাজটি গভীরভাবে ধর্মানুরাগী হলেও অন্যান্য ধর্মের প্রতি তাদের সহনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। একই প্রবণতা দেখা যায় পেরু, কলম্বিয়া ও গুয়াতেমালাতেও। দেশগুলো একদিকে অত্যন্ত ধার্মিক, অন্যদিকে ধর্মীয় বহুত্ববাদ গ্রহণের ক্ষেত্রেও তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত।
অন্যদিকে, কিছু দেশে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যায়। সেখানে সামগ্রিক ধার্মিকতার মাত্রা তুলনামূলক কম হলেও নিজ ধর্মকে একমাত্র সঠিক বলে মনে করার প্রবণতা বেশি। উদাহরণস্বরূপ, থাইল্যান্ডে সৃষ্টিকর্তার গুরুত্বের গড় স্কোর ১০-এর মধ্যে প্রায় ৫, কিন্তু দেশটির প্রায় অর্ধেক মানুষ নিজেদের ধর্ম ছাড়া অন্য কোনো ধর্মকে গ্রহণযোগ্য মনে করেন না। ভিয়েতনামও প্রায় একই অবস্থানে রয়েছে। তিউনিসিয়া ও তুরস্কের তথ্যও বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। দেশ দুটি যথেষ্ট ধার্মিক হলেও ধার্মিকতার সূচকে শীর্ষে নেই; তবে নিজ ধর্মের একচ্ছত্র সত্যতার প্রশ্নে সেখানকার মানুষের অবস্থান তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি কঠোর।
আজকের আলোচনা শেষ করার আগে আরেকটি স্ক্যাটারপ্লটের কথা বলা যেতে পারে, যা বহুল আলোচিত ‘সেক্যুলারাইজেশন হাইপোথিসিস’ বা ধর্মনিরপেক্ষকরণ তত্ত্বের একটি সাধারণ প্রতিফলন তুলে ধরে। বিশেষত বিশ্বের বহু অঞ্চলে এই ধারণাটি জনপ্রিয় যে, কোনো দেশ যত বেশি শিক্ষিত ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হবে, ততই ধর্মীয় বিশ্বাস ও চর্চা থেকে দূরে সরে যাবে। এই সম্পর্ক যাচাই করার জন্য ধর্মীয় বিশ্বাস, সম্পৃক্ততা ও আচার-আচরণসংক্রান্ত একাধিক সূচকের ভিত্তিতে আমি ধার্মিকতার একটি সমন্বিত সূচক তৈরি করেছি এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নির্দেশক হিসেবে ব্যবহার করেছি মাথাপিছু জিডিপি।

ডেটা থেকে দেখা যায়, সাধারণভাবে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশগুলোই বেশি ধার্মিক, আর অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশগুলো আমার তৈরি ধার্মিকতার সূচকে তুলনামূলকভাবে নিচের দিকে অবস্থান করছে। দুই চলকের মধ্যে সহসম্পর্কের মান (r) –০.৭০, যা একটি শক্তিশালী ঋণাত্মক সম্পর্ক নির্দেশ করে, যদিও এটি পুরোপুরি নির্ধারক নয়। একইভাবে, R²-এর মান প্রায় ০.৫০, অর্থাৎ পর্যবেক্ষিত বৈচিত্র্যের প্রায় অর্ধেকই কেবল মাথাপিছু জিডিপি দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
তবে ব্যতিক্রমগুলো সবসময়ই বিশেষভাবে চোখে পড়ে, আর এই বিশ্লেষণে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম হলো চীন। ধার্মিকতার সূচকে দেশটি প্রায় সর্বনিম্ন অবস্থানে থাকলেও মাথাপিছু জিডিপির বিচারে এটি শক্ত অবস্থানে রয়েছে। পরিসংখ্যানগত মডেলটি যদি নিখুঁতভাবে প্রযোজ্য হতো, তাহলে চীনের বর্তমান ধার্মিকতার স্কোর অনুযায়ী দেশটির মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ৪ লাখ মার্কিন ডলার হওয়ার কথা—যা এই ডেটাসেটে অন্তর্ভুক্ত অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় অন্তত চার গুণ বেশি। এ অস্বাভাবিক বিচ্যুতির প্রধান কারণ অর্থনৈতিক নয়; বরং রাজনৈতিক। কমিউনিস্ট পার্টির দীর্ঘদিনের রাষ্ট্র-সমর্থিত নাস্তিকতাবাদ এবং ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ মানুষের প্রকাশ্য ধর্মীয় পরিচয় ও চর্চাকে এমনভাবে সীমিত করেছে, যা কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়ন দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
তাহলে ট্রেন্ডলাইনের ওপরে থাকা ব্যতিক্রমী দেশগুলোর অবস্থা কী? এখানে সবচেয়ে বড় চমকগুলোর একটি হলো পুয়ের্তো রিকো। দেশটির মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ৪০ হাজার ডলার, তবু ধার্মিকতার সূচক ০.৮৩। এর পেছনে ঐতিহ্যগতভাবে শক্তিশালী ক্যাথলিক চার্চের প্রভাবের পাশাপাশি পেন্টেকোস্টাল আন্দোলনের বিস্তারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে থাকতে পারে। একইভাবে কয়েকটি ইস্টার্ন অর্থোডক্স-প্রধান দেশও তাদের অর্থনৈতিক অবস্থানের তুলনায় প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ধার্মিক। সাইপ্রাস, গ্রিস ও রোমানিয়া তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
তাহলে এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কোথায়? মজার বিষয় হলো, তারাও একটি ব্যতিক্রম। দেশটির ধার্মিকতার সূচক ০.৬২ এবং মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ৭০ হাজার ডলার। ট্রেন্ডলাইনের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হলে হয় যুক্তরাষ্ট্রের মাথাপিছু জিডিপি কমে প্রায় ২৮ হাজার ডলারে নেমে আসতে হতো, নয়তো তাদের ধার্মিকতার সূচক কমে প্রায় ০.৪৭-এ পৌঁছাতে হতো।
ধর্ম নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে একটি বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তা হলো, বাস্তবে কোনো দুটি দেশ একেবারে এক রকম নয়। এমনকি পাশাপাশি অবস্থিত দুটি দেশ কিংবা একই দেশের দুটি অঞ্চলও ধর্মীয় আচরণ, বিশ্বাস ও সংস্কৃতির দিক থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন হতে পারে।
এই উপলব্ধি আমাকে আরও বিনয়ী করেছে। আমার মনে হয়, একটি দেশের ধর্মীয় বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা করতেই হয়তো পুরো কর্মজীবন কেটে যাবে, তারপরও তার সবটুকু উপলব্ধি করা সম্ভব হবে না। সেখানে পৃথিবীর আরও দুই শতাধিক দেশের ধর্মীয় বৈশিষ্ট্য সমানভাবে বোঝার কথা ভাবা প্রায় অসম্ভব।
কিন্তু সেটি আমাকে নিরুৎসাহিত করে না। বরং এই জটিলতা ও বৈচিত্র্যই আমাকে বারবার ধর্ম বিষয়ে ফিরে আসতে উদ্বুদ্ধ করে।







Comments