সমসাময়িক বিশ্লেষণ

হামাস কি ইজরাইলের সৃষ্টি?

Share
Share

হামাস কি ইজরাইলের সৃষ্টি?

ফিলিস্তিনি ইসলামপন্থী সংগঠন হামাস একইসাথে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং একটি রাজনৈতিক আন্দোলন। ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে ফিলিস্তিনিদের বড় একটি অংশ তাদের সমর্থন করে।

ফিলিস্তিনি সমাজে হামাসের শেকড় অনেক গভীরে। তা সত্ত্বেও দলটির জন্ম নিয়ে একটি ভুল ধারণা সবখানে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বে এই কথাটি বেশ জোর দিয়ে প্রচার করা হয়। এমনকি ফিলিস্তিনি মুক্তি সংগ্রামের অনেক সমর্থকও এটি বিশ্বাস করেন।

সেই প্রচলিত ধারণাটি হলো, ইয়াসির আরাফাতের ধর্মনিরপেক্ষ সংগঠন পিএলও-র প্রভাব কমাতে ইসরায়েল নিজেই হামাসকে মদত দিয়েছিল। কেউ কেউ এমনকি মনে করেন, ইসরায়েলই হামাসকে সৃষ্টি করেছে।

আসলে এই ধারণাটি একটি গুজব মাত্র। ফিলিস্তিনিদের ভেতরকার হামাস-বিরোধী পক্ষ এবং ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা—উভয় পক্ষই এই বিভ্রান্তিকর তত্ত্বটি ছড়িয়েছে।

হামাস-বিরোধী সেই দলের অন্যতম ব্যক্তি হলেন মোহাম্মদ দাহলান। পরিহাসের বিষয় হলো, এই ব্যক্তিই পরে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র ঘনিষ্ঠ সহযোগী হয়েছিলেন। ২০০৬ সালে সাধারণ মানুষের ভোটে হামাস সরকার ক্ষমতায় আসে। সেই নির্বাচিত সরকারকে হঠাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মদতে একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থান চালানো হয়। দাহলান সেখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

এই প্রচারণার মূল দাবিগুলো এখন আর ধোপে টেকে না। এমনকি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরোধীরা বর্তমানে এটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করলেও এর কোনো ভিত্তি নেই।

হামাস বিষয়ক প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞ ও ঐতিহাসিক খালেদ হ্রুব ‘দ্য ইলেকট্রনিক ইন্তিফাদা’র কাছে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, কেন এই ধারণাটি একেবারেই অমূলক।

দীর্ঘ এবং বহুমাত্রিক ইতিহাস

ইসরায়েল প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে হামাসকে সৃষ্টি বা সমর্থন করেছে—এই বয়ানটির ইতিহাস বেশ দীর্ঘ এবং বহুমাত্রিক।

ইংরেজি সংবাদমাধ্যমে এই বয়ানটি শুরুর দিকে প্রভাব বিস্তার করে ১৯৮১ সালের মার্চ মাসে। তখন ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এ ডেভিড কে শিপলার একটি প্রতিবেদন লিখেছিলেন।

শিপলার সেখানে গাজার তৎকালীন ইসরায়েলি সামরিক গভর্নর ইতজাক সেজেভের একটি উদ্ধৃতি তুলে ধরেন। সেজেভ বলেছিলেন, “ইসরায়েল সরকার আমাকে একটি বাজেট দিয়েছিল এবং সামরিক প্রশাসন সেই অর্থ মসজিদগুলোতে দেয়।” শিপলার সরাসরি সেজেভের নাম উল্লেখ না করেই আরও যোগ করেন যে, এই অর্থ মসজিদ-মাদরাসার পেছনে ব্যয় করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল এমন এক শক্তি গড়ে তোলা যা পিএলও-পন্থী বামপন্থীদের মোকাবিলা করতে পারে।

১৯৮৬ সালে শিপলারের পুলিৎজার পুরস্কারজয়ী বই ‘Arab and Jew’-এর পরবর্তী এক সংস্করণে তিনি সেজেভের মন্তব্যগুলোকে আরও গুছিয়ে উপস্থাপন করেন। শিপলার সেখানে উল্লেখ করেন যে, সেজেভ তাকে জানিয়েছিলেন ইসরায়েল পিএলও এবং কমিউনিস্টদের পাল্টাপাল্টি শক্তি হিসেবে ‘ইসলামিক মুভমেন্ট’কে অর্থায়ন করেছিল। শিপলার বন্ধনীতে এটিও মন্তব্য করেন যে, এই অর্থায়নই ‘হামাসের বীজ বপনে’ সহায়তা করেছিল।

এরপর থেকে এই ‘কাউন্টারওয়েট’ বা ‘পাল্টাপাল্টি শক্তি’র তত্ত্বটি শিপলারের বদলে সরাসরি সেজেভের বক্তব্য হিসেবে প্রচার হতে থাকে। সামরিক গভর্নর হিসেবে সেজেভের পদের কারণে এই বয়ানটি মানুষের কাছে বেশ বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। ‘দ্য ইন্টারসেপ্ট’ এবং বিশ্লেষক অ্যালন বেন-মেয়ারসহ অনেক প্রকাশনা ও ভাষ্যকার এই একই ভুল তথ্য প্রচার করেছেন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমে এই ধারণাটি জনপ্রিয় করার পেছনে আরেকটি পুরনো নিবন্ধের ভূমিকা রয়েছে। ১৯৯২ সালে ‘লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস’-এ ইয়োসি মেলম্যান একটি নিবন্ধ লেখেন। মেলম্যান দীর্ঘকাল ধরে নেতানিয়াহুর কট্টর বিরোধী হিসেবে পরিচিত। সেই নিবন্ধের শিরোনাম ছিল— “How Israel Helped to Spawn Hamas.”

২০০৯ সালে ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এ অ্যান্ড্রু হিগিন্সের একটি নিবন্ধ এই ধারণাকে আরও উসকে দেয়। নিবন্ধটির শিরোনাম ছিল— “কীভাবে ইসরায়েল হামাস সৃষ্টিতে সাহায্য করেছিল।”

সেই লেখায় আভনার কোহেনের একটি মন্তব্য উদ্ধৃত করা হয়। হামাসের উত্থানের সময় কোহেন গাজায় ইসরায়েলি ‘ধর্মবিষয়ক’ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। তিনি মন্তব্য করেন, “চরম পরিতাপের বিষয় হলো, হামাস ইসরায়েলেরই সৃষ্টি।” 

কোহেনের বক্তব্যের রেশ ধরে হিগিন্স উল্লেখ করেন, ধর্মনিরপেক্ষ পিএলও-র পাল্টাপাল্টি শক্তি হিসেবে গাজার ‘ইসলামিক মুভমেন্ট’কে ইসরায়েল বছরের পর বছর সহ্য করেছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে উৎসাহও দিয়েছে।

তবে প্রকৃত ইতিহাস আরও অনেক বেশি জটিল। বাস্তব তথ্যপ্রমাণ কোনোভাবেই ‘ইসরায়েল হামাস সৃষ্টি করেছে’—এই মিথ বা গুজবকে সমর্থন করে না। বর্তমান নিবন্ধে তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হবে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের অতর্কিত হামলা বা ‘অপারেশন আল-আকসা ফ্লাড’-এর পর এই গুজবটি আবার নতুন করে আলোচনায় আসে।

মূলধারার প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমগুলোও একই সুর মেলায়। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে মার্ক মাজত্তি এবং রনেন বার্গম্যান ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এ একটি বহুল পঠিত নিবন্ধ লেখেন। যার শিরোনাম ছিল— “Buying Quiet’: Inside the Israeli Plan That Propped Up Hamas।” প্রায় একই সময়ে সিএনএন-ও একটি সংশ্লিষ্ট খবর প্রচার করে। সেখানে বলা হয়, হামাস শাসিত গাজায় কাতারের পাঠানো অর্থের প্রবাহে কেবল নেতানিয়াহুর অনুমতিই ছিল না, বরং তিনি এর পক্ষে সোচ্চারও ছিলেন। সিএনএন-এর মতে, হামাসের প্রতি ‘অতিরিক্ত নরম’ হওয়ার কারণে নেতানিয়াহু তার জোটসঙ্গীদের কাছেও সমালোচিত হন।

এমনকি জায়নবাদী সংবাদমাধ্যমগুলোও এই বয়ানকে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। তাদের দাবি, নেতানিয়াহু হামাসের ব্যাপারে অনেক বেশি শিথিল ছিলেন। ‘দ্য টাইমস অফ ইসরায়েল’-এর রাজনৈতিক সংবাদদাতা তাল স্নাইডার ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর এক উপসম্পাদকীয়তে দাবি করেন, ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের নীতিই হামাসকে শক্তিশালী করেছে। আর এভাবেই আগের সেই হামলার পথ প্রশস্ত হয়েছে।

২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাবেক পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক প্রধান জোসেপ বোরেল মন্তব্য করেন: “হ্যাঁ, ফাতাহ-র নেতৃত্বাধীন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে দুর্বল করার প্রচেষ্টায় ইসরায়েল সরকার হামাসকে অর্থায়ন করেছিল।”

বোরেল কেবল গাজায় কাতারের অর্থ পাঠানোর অনুমতি দেওয়ার কথাই বলেননি, বরং তিনি ইঙ্গিত করেছেন যে এর মধ্য দিয়ে ইসরায়েল নিজেই আসলে হামাসকে অর্থায়ন করেছে।

ইতিহাসের এই ভুল ব্যাখ্যা ভিত্তিহীন এবং বিভ্রান্তিকর।

রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে মিথের জন্ম

‘ইসরায়েল হামাস তৈরি করেছে’—এই মিথ বা গুজবের শুরুর দিকের ইঙ্গিতগুলো পাওয়া যায় ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা এবং সামরিক বাহিনীর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের কাছ থেকে। এর মধ্যে সেজেভের সেই মন্তব্যগুলো অন্যতম, যেখানে তিনি গাজায় প্রাথমিক দিকে মসজিদ নির্মাণ পর্যায়ে ইসরায়েল সরকারের অর্থ বরাদ্দের কথা বলেছিলেন।

ইতিহাসবিদ খালেদ হ্রুব তার ‘Hamas: Political Thought and Practice’ বইতে উল্লেখ করেছেন যে, ফিলিস্তিনি ইসলামপন্থীদের উত্থান নিয়ে ইসরায়েলিদের মূল্যায়ন ও ব্যাখ্যাগুলো ছিল নানামুখী এবং কখনো কখনো পরস্পরবিরোধী। কেউ কেউ ইসলামপন্থীদের এই উত্থানকে ইসরায়েলের একটি ‘পরিকল্পনা’ হিসেবে দেখেছিলেন। আবার কেউ কেউ মনে করতেন, ইসরায়েলি নীতি কেবল এই বিষয়টিকে উপেক্ষা করেছে। অন্যদিকে অনেকের মতে, ইসরায়েলের অবস্থান ছিল এই আন্দোলনের প্রতি চরম বৈরী এবং তারা একে দমন করতেই চেয়েছিল।

তবে এই মিথটি ফিলিস্তিনি রাজনীতিতে হামাসের প্রতিদ্বন্দ্বীদের মাধ্যমেই শক্ত ভিত্তি পায়। এদের মধ্যে প্রধান ছিলেন পিএলও (PLO) প্রধান ইয়াসির আরাফাত। হামাসের সাথে তাঁর এই বিরোধের শিকড় অনেক গভীরে। ১৯৫০-এর দশকে ফাতাহর প্রতিষ্ঠাতারা মূলত মুসলিম ব্রাদারহুড থেকেই বেরিয়ে এসে নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ দল গড়েছিলেন।

হ্রুবের মতে, পিএলও-র তথ্য বিভাগ সচেতনভাবেই ইসরায়েলি ব্যাখ্যাগুলো গ্রহণ করে এবং সেগুলো প্রচার শুরু করে। তারা এই ধারণাটিই প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল যে, পিএলও-কে দুর্বল করার জন্য হামাস নিছক ইসরায়েলেরই একটি সৃষ্টি।

১৯৯০-এর দশকের শুরুতে এই দ্বন্দ্ব চূড়ান্ত রূপ নেয়। বিশেষ করে ১৯৯১ সালের মাদ্রিদ সম্মেলনের আগে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়—যা ছিল পরবর্তী ‘অসলো চুক্তি’র প্রাথমিক ধাপ।

পিএলও তখন হামাসকে তাদের ‘প্যালেস্টাইন ন্যাশনাল কাউন্সিল’ পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। কিন্তু হামাস এই প্রস্তাবে দ্বিধাগ্রস্ত থাকায় পিএলও-র মুখপত্র ‘ফিলিস্তিন আল-সাওরা’ তাদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রোপাগান্ডা শুরু করে। হ্রুবের বর্ণনা অনুযায়ী, পিএলও তখন হামাসকে “জাতীয় ঐক্যের পথ ত্যাগ করার” দায়ে অভিযুক্ত করে।

পিএলও-র পক্ষ থেকে তখন বারবার এই ধারণাটিই প্রচার করা হচ্ছিল যে, হামাস আসলে ইসরায়েলি উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য তৈরি হয়েছে, অথবা পিএলও-কে দুর্বল করতে ইসরায়েলের মৌন সম্মতিতেই এর জন্ম।

মাদ্রিদ সম্মেলন চলাকালে হামাস একটি ইশতেহার প্রকাশ করে পিএলও-র গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তাদের দাবি ছিল, পিএলও দখলদার শক্তির কাছে নতিস্বীকার করেছে।

পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয় যখন ইসলামপন্থী, জাতীয়তাবাদী এবং বামপন্থী সংগঠনগুলো মিলে ‘শান্তি প্রক্রিয়ার’ বিরোধিতায় একটি যুক্তফ্রন্ট গঠন করে। ১৯৯১ সালের মাদ্রিদ সম্মেলন চলাকালীন এই জোটের ডাকা সাধারণ ধর্মঘট অভাবনীয় সাফল্য পায়, যা পিএলও নেতৃত্বকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয়।

একই সময়ে হামাসসহ ১১টি সংগঠনের নেতারা তেহরানে এক সম্মেলনে মিলিত হন। ১৯৯২ সালে হামাস ইরানে তাদের দপ্তর খুললে পিএলও নেতারা প্রোপাগান্ডা শুরু করেন যে, হামাস আসলে “বিদেশি শক্তির অনুগত”।

আরাফাত দাবি করেন, হামাস ইরান থেকে বছরে ৩ কোটি ডলার সহায়তা পাচ্ছে। হামাস এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা বলে উড়িয়ে দেয়। কিন্তু দ্রুতই পশ্চিমা ও আরব সংবাদমাধ্যমগুলোতে আরাফাতের এই দাবিগুলো প্রচার হতে থাকে।

আরাফাতের মূল উদ্দেশ্য ছিল হামাসকে কলঙ্কিত করা। কারণ হামাস ইসরায়েলের সাথে আপস এবং ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের ফেরার অধিকার ত্যাগের ঘোর বিরোধী ছিল। আরাফাত ভয় পাচ্ছিলেন, বামপন্থী ও জাতীয়তাবাদীদের সাথে নিয়ে গড়ে ওঠা এই জোট হয়তো হামাসের নেতৃত্বে পিএলও-র বিকল্প হয়ে দাঁড়াবে।

পরবর্তী কয়েক বছরে আরাফাত ও ফাতাহ নেতারা হামাসকে পিএলও-তে ভেড়ানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু পিএলও-র আমূল সংস্কারের দাবিতে হামাস অনড় থাকায় সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এরপরই আরাফাত দলটিকে বিতর্কিত করার মিশনে নামেন।

২০০১ সালে ইতালীয় পত্রিকা ‘এল-এসপ্রেসো’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরাফাত দাবি করেন, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী অ্যারিয়েল শ্যারন আসলে ইসলামপন্থীদেরই সুবিধা করে দিচ্ছেন। আরাফাতের যুক্তি ছিল, হামাসের হামলাগুলো শ্যারনকে ‘আত্মরক্ষা’র অজুহাত দেওয়ার সুযোগ করে দেয়।

মজার ব্যাপার হলো, সেই একই নিবন্ধে লেখক উল্লেখ করেন যে, আরাফাত যখন দেশের বাইরে যেতেন, মোসাদ নিজেই তাঁর নিরাপত্তার তদারকি করত। এর মানে দাঁড়ায়, কট্টর গোষ্ঠীগুলোর চেয়ে ইসরায়েল আসলে আরাফাতকেই ক্ষমতায় দেখতে বেশি আগ্রহী ছিল। এটি হামাসকে সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে আরাফাতের দাবির ঠিক উল্টো চিত্র।

পরের সংখ্যায় আরাফাতের আরেকটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়। সেখানে তিনি আরও সরাসরি অভিযোগ করেন:

হামাস তৈরি হয়েছে ইসরায়েলের সমর্থনে। পিএলও-র বিরোধিতা করাই ছিল এর লক্ষ্য। তারা ইসরায়েল থেকে অর্থ ও প্রশিক্ষণ পেয়েছে। আমাদের একটা টমেটো কারখানা তৈরির অনুমতি না দিলেও, তাদের সব ধরণের লাইসেন্স দেওয়া হতো। রবিন নিজেই একে বড় ভুল হিসেবে স্বীকার করেছেন।

আরাফাতের এই ‘প্রশিক্ষণ’ পাওয়ার দাবিটি ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। হয়তো তাঁর মাথায় ১৯৮৯ সালে ‘দ্য জেরুজালেম পোস্ট’-এ প্রকাশিত একটি অখ্যাত তথ্যের প্রভাব ছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, ইসরায়েলি সামরিক সরকার পিএলও-কে দুর্বল করতে ব্রাদারহুডের কিছু কর্মীকে অস্ত্র দিয়েছিল। তবে হামাসের প্রকৃত ইতিহাসের সাথে আরাফাতের এই গুরুতর অভিযোগের কোনো মিল পাওয়া যায় না।

১৯৭৩ সালে শিক্ষক ও প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা শায়খ আহমাদ ইয়াসিন ‘আল-মুজাম্মা আল-ইসলামি’ বা ইসলামিক সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর সাথে ছিলেন মাহমুদ আল-জাহার, আবদেল আজিজ আল-রান্তিসি ও সালাহ শেহাদের মতো ব্যক্তিত্বরা, যারা পরে হামাসের মূল নেতৃত্বে আসেন। সে সময় এই সেন্টারের মূল লক্ষ্য ছিল শরণার্থী শিবির ও দরিদ্র শহরগুলোতে সমাজকল্যাণমূলক কাজ করা, যা অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর নজর এড়িয়ে গিয়েছিল।

শাউল মিশাল ও আব্রাহাম সেলা তাঁদের বইতে দেখিয়েছেন, ১৯৬৭ থেকে ১৯৮৬ সালের মধ্যে—অর্থাৎ হামাস গঠনের আগে—গাজায় মসজিদের সংখ্যা ৭৭টি থেকে বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে ১৫০টিতে দাঁড়ায়। ১৯৮৯ সাল নাগাদ এই সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়ে যায়।

এই মসজিদগুলো ছিল গোপন রাজনৈতিক আশ্রয়স্থলের মতো। এখানে ইসরায়েলি নজরদারি এড়িয়ে অনায়াসেই কার্যক্রম চালানো যেত। একইসাথে এগুলো ছিল ইসলামি আন্দোলনের আদর্শ প্রচার ও জনসমর্থন তৈরির মূল কেন্দ্র।

এই প্রক্রিয়াটি এমন এক সময়ে ঘটেছিল যখন পুরো অঞ্চল জুড়ে ‘ইসলামপন্থার রাজনৈতিক উত্থান’ ঘটছিল। প্রতিবেশী জর্ডানের পরিস্থিতিও ছিল প্রায় একই রকম। সেখানে ১৯৮৯ সালের নির্বাচনে ইসলামপন্থীরা মোট আসনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জিতে নেয়।

আঞ্চলিক এই পরিবর্তনের হাওয়ায় ফিলিস্তিনি ইসলামপন্থীরাও তাদের কৌশল বদলে ফেলে। তারা শুধু সমাজ সংস্কার বা দাতব্য কাজের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সরাসরি সশস্ত্র প্রতিরোধের পথে হাঁটা শুরু করে।

কৌশলের এই পরিবর্তনের সাথে তাল মেলাতেই ফিলিস্তিনি মুসলিম ব্রাদারহুড নিজেদের নাম বদলে ‘হামাস’ রাখে। ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরে গাজায় প্রথম ইন্তিফাদা বা গণঅভ্যুত্থান শুরু হওয়ার সাথে সাথেই মূলত হামাস আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে।

ইসরায়েলি অনুমতিপত্র

‘ইসরায়েলই হামাস সৃষ্টি করেছে’—এই মিথটি ডালপালা মেলার প্রধান কারণ হলো হামাস গঠনের আগের সেই প্রাতিষ্ঠানিক সময়কাল।

খালেদ হ্রুবের মতে, এখানে মূলত দুটি কেন্দ্রের কথা আসে: ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ইসলামিক সেন্টার’ এবং ১৯৭৮ সালের ‘গাজা ইসলামিক ইউনিভার্সিটি’।

ইসলামিক সেন্টার প্রতিষ্ঠার ছয় বছর পর ইসরায়েল তাদের বৈধভাবে কাজ করার অনুমতি দেয়। এই একটি বিষয় থেকেই গুজবের সূত্রপাত যে, ইসরায়েল কেবল সম্মতিই দেয়নি বরং হামাস গঠনে উৎসাহ দিয়েছিল।

কিন্তু সেই অনুমতিপত্র দেওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই তা বাতিল করা হয়। পরে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই কেবল সেটি ফিরে পাওয়া গিয়েছিল।

মিশাল এবং সেলা স্পষ্ট করেছেন, ১৯৭০ সাল থেকেই শায়খ ইয়াসিন ও তাঁর সঙ্গীরা লাইসেন্সের জন্য আবেদন করে আসছিলেন। কিন্তু ইসরায়েলি সামরিক প্রশাসন বারবার তা প্রত্যাখ্যান করে। এর মূল কারণ ছিল ইসলামি শক্তির প্রতি ইসরায়েলের ঘোর বিরোধিতা।

তাছাড়া সেই সময়ে ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোকেও একই কর্তৃপক্ষের অধীনে কাজ করতে হতো। তারাও বৈধতার জন্য ইসরায়েলের অনুমতি নিত—যেমনটি ১৯৭৮ সালে নিয়েছিল পশ্চিম তীরের বিরজেত বিশ্ববিদ্যালয়।

‘ইসরায়েলই হামাসকে সব কাজের অনুমতি দিয়েছিল’—এই দাবিটি আজও টিকে আছে এবং বিরোধীরা একে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।

এই গল্পের শুরু ১৯৮৫ সালে, গাজা ইসলামিক ইউনিভার্সিটির এক বিতর্ক থেকে। একদিকে ছিলেন ‘ইসলামিক ব্লক’-এর তরুণ নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার, আর অন্যদিকে ফাতাহর মোহাম্মদ দাহলান। নিহাদ আল-শায়খ খলিল তাঁর বইতে লিখেছেন, ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৬ সালের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফাতাহ ও ইসলামিক ব্লকের ছাত্রদের মাঝে নিয়মিত এমন বিতর্ক হতো।

অধ্যাপক সুব্হি আল-ইয়াজজির মতে, এসব আলোচনার মূল বিষয় ছিল ফিলিস্তিন সংকট ও সশস্ত্র সংগ্রাম। সবচেয়ে আলোচিত ছিল সিনওয়ার ও দাহলানের সেই বিতর্ক। সেখানে দুই পক্ষই একে অপরকে আক্রমণ করছিল।

সিনওয়ার ফাতাহর ‘শান্তি আলোচনার’ প্রস্তাবের কড়া সমালোচনা করেন। জবাবে দাহলান খোঁচা দিয়ে বলেন, ব্রাদারহুড কেন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়ছে না? কেন তারা দখলদারদের অনুমতি নিয়ে ‘ইসলামিক অ্যাসোসিয়েশন’ চালাচ্ছে?

পরবর্তী কয়েক দশকে দাহলান এই দাবিকে বারবার সামনে এনেছেন। এমনকি ২০১৫ সালে আল জাজিরাতেও তিনি দাবি করেন, সীমান্ত পাহারা দেওয়ার মাধ্যমে হামাস আসলে পরোক্ষভাবে ইসরায়েলকেই সহযোগিতা করছে।

বিচিত্র এক পরিহাস যে, এই মোহাম্মদ দাহলানই পরে সরাসরি সিআইএ-র সাথে কাজ শুরু করেন। ২০০৬ সালের নির্বাচনে হামাস সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর, সেই ফলাফল পাল্টে দিতে দাহলান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে হাত মেলান।

এরই জেরে ২০০৭ সালে ফাতাহ ও হামাসের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। গাজায় ফাতাহর অভ্যুত্থানচেষ্টা হামাস কঠোরভাবে দমন করলে দাহলান পালিয়ে যান। তবে পশ্চিম তীরে তাদের এই চক্রান্ত সফল হয়। সেখানে মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বাধীন পিএ (PA) আজও ইসরায়েলের আজ্ঞাবহ হিসেবে কাজ করছে এবং নতুন কোনো নির্বাচন দিচ্ছে না।

ইসরায়েলের সাথে হামাসের সহযোগিতার এই মিথ্যা দাবিগুলো তাদের বিরোধীদের মধ্যে খুব জনপ্রিয়তা পায়। ইয়াসির আরাফাতের কড়া মন্তব্যের পর ইসরায়েলি মিডিয়া এবং গোয়েন্দা সংস্থা ‘শিন বেট’ এই ‘অনুমতি তত্ত্ব’-কে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। হ্রুবের মতে, ইসরায়েল প্রমাণ করতে চেয়েছিল যে তাদের নজরদারি এড়িয়ে ফিলিস্তিনিরা বড় কিছু করার ক্ষমতা রাখে না।

পরবর্তীতে এই বয়ান পশ্চিমা একাডেমিয়াতেও জায়গা করে নেয়। বেভারলি মিল্টন-এডওয়ার্ডসের বই এবং নোয়াম চমস্কির মতো বুদ্ধিজীবীদের বক্তব্যেও এই দাবি বারবার উঠে আসে।

এই পুরো বিষয়টি ফাতাহ নেতাদের জন্য খুব সুবিধাজনক ছিল। একদিকে তারা সশস্ত্র সংগ্রাম ত্যাগ করছিল, অন্যদিকে এই গুজব ব্যবহার করে হামাসকে বিতর্কিত করার সুযোগ পাচ্ছিল।

‘নিরীহ হামাস’ তত্ত্ব

‘ইসরায়েলই হামাস তৈরি করেছে’—এই মিথের সাথে আরেকটি দাবিও জড়িয়ে আছে। বলা হয়, প্রথম ইন্তিফাদার আগে শায়খ ইয়াসিন ও তার দলকে ইসরায়েল কোনো হুমকিই মনে করত না এবং তাদের সাথে সেভাবেই ডিল করা হতো।

এই দাবির মূলে আছে ১৯৮৪ সালের একটি ঘটনা, যখন গাজায় অস্ত্রভাণ্ডারসহ শায়খ ইয়াসিন ধরা পড়েন। মূলত ইসরায়েলিরা ভেবেছিল ১৯৪৮-এ লড়া মুসলিম ব্রাদারহুড হয়তো সশস্ত্র সংগ্রামের পথ ছেড়ে দিয়েছে। বিশেষ করে ১৯৬৮ থেকে ১৯৭০ সালের দিকে জর্ডান থেকে কিছু গেরিলা হামলার পর তারা একদম চুপচাপ হয়ে যাওয়ায় এই ধারণা আরও পোক্ত হয়।

হামাসের ইতিহাস নিয়ে লিখতে গিয়ে হ্রুব একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তিনি জানান, ওই গেরিলা হামলাগুলো মূলত শুরু করেছিল বৃহত্তর আরব নেতৃত্ব। গাজার শাখা এর বিপক্ষে ছিল, কারণ তারা এই লড়াইকে ‘নিরর্থক’ মনে করত।

হ্রুবের মতে, হামলার পরের এক দশক ফিলিস্তিনি মুসলিম ব্রাদারহুড সদস্য সংগ্রহেই বেশি মন দেয় এবং ইসরায়েলের সাথে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলে। তাদের লক্ষ্য ছিল ‘একটি নতুন প্রজন্মকে সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করা’।

সত্তরের দশকে তাদের এই পিছু হটা দেখে সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানে অনেকেই ধরে নিয়েছিল যে, শায়খ ইয়াসিনের জমানো অস্ত্রগুলো ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নয়, বরং ফিলিস্তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীদের দমনের জন্য।

তবে এই প্রচলিত ধারণাটি প্রকৃত ইতিহাসের সাথে একেবারেই মেলে না। ইসলামি সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রথম লক্ষণ স্পষ্ট হয় ১৯৮০ সালেই, যখন ব্রাদারহুড নেতৃত্ব তাদের সদস্যদের সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশে পাঠাতে শুরু করেন।

আশির দশকের শুরুর দিকে ইরানে ইসলামি বিপ্লব এবং পুরো অঞ্চল জুড়ে রাজনৈতিক ইসলামের উত্থানের প্রেক্ষাপটে, ফিলিস্তিনি মুসলিম ব্রাদারহুড সরাসরি সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য বেশ কয়েকটি সংগঠন গড়ে তোলে। এর মধ্যে ছিল ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স মুভমেন্ট’ নামক একটি সামরিক কাঠামো—যেটি ছিল মূলত হামাসের আনুষ্ঠানিক নামেরই পূর্বরূপ। পরবর্তীতে ‘মাজদ’ নামে একটি নিরাপত্তা শাখা এবং ১৯৮২-৮৩ সালের দিকে একটি গোপন সামরিক কমিটিও গঠন করা হয়।

শায়খ আহমাদ ইয়াসিন গাজা উপত্যকায় এই সামরিক শাখাটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শুরুতে এর নেতৃত্বে ছিলেন আবদুর রহমান তামরাজ এবং পরবর্তীতে সালাহ শেহাদে—যিনি শেষ পর্যন্ত হামাসের সশস্ত্র শাখার অন্যতম প্রধান নেতায় পরিণত হন। ইয়াসিনের গড়ে তোলা এই প্রাথমিক সামরিক কাঠামোটি শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলিদের নজরে চলে আসে। ফলে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ধরপাকড় শুরু করে এবং ১৯৮৪ সালের শুরুর দিকে ইয়াসিনকে গ্রেফতার করা হয়।

সে সময়ের ইসরায়েলি ইংরেজি সংবাদপত্র ‘দ্য জেরুজালেম পোস্ট’-এর একটি নিবন্ধ অনুযায়ী, গাজার একটি সামরিক আদালত নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরের এক ব্যক্তিকে কারাদণ্ড দেয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি এমন একটি ইসলামি গোপন গোষ্ঠীর কাছে অস্ত্র বিক্রি করেছিলেন যারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘ধর্মযুদ্ধের’ পরিকল্পনা করছিল।

সেই প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয় যে, ইয়াসিনসহ গাজার আরও পাঁচজন নাগরিক ‘সাব-মেশিনগান, গ্রেনেড, রাইফেল এবং পিস্তল অবৈধভাবে রাখার দায়ে দোষ স্বীকার করেছেন।’ সেখানে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর একজন মুখপাত্রের বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানানো হয়, ধারণা করা হচ্ছে এই ব্যক্তিরাই গাজায় ইসরায়েল-বিরোধী ধর্মীয় তৎপরতার মূল কেন্দ্রবিন্দু।

হামাস গঠিত হওয়ার আগে দখলদার বাহিনীর হাতে ইসলামিক মুভমেন্টের নিগৃহীত হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম নয়।

২০১১ সালে গাজার মুসলিম ব্রাদারহুডের ওপর করা এক গবেষণায় নিহাদ আল-শায়খ খলিল বিস্তারিত দেখিয়েছেন যে, ১৯৭২ সালে ইসলামিক মুভমেন্ট ধর্মীয় ওয়াকফ কর্তৃপক্ষের সহায়তায় গাজা শহরের আল-আব্বাস মসজিদে একটি পাঠাগার স্থাপনের চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তাদের বাধা দেওয়া হয়।

এর প্রতিক্রিয়ায়, আল-শায়খ খলিলের মতে, ইয়াসিন ‘পাঠাগারটি তৈরির দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন।’ কিন্তু নির্মাণের শুরুর দিকেই ইসরায়েলি পুলিশ এর ভিত্তি ধ্বংস করে দেয় ‘যাতে ভবনটির কাজ কোনোভাবেই শেষ না হতে পারে।’

মসজিদ নির্মাণের প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত ধীর এবং বারবার বাধার সম্মুখীন হয়। কারণ, ‘যখনই নির্মাণকাজ শুরু হতো, ইসরায়েলি পুলিশ বা দখলদার সেনাবাহিনী এসে ভবনটি গুঁড়িয়ে দিত, বিশেষ করে কাজ একদম শুরুর দিকে থাকলে তো কথাই নেই।’

ইসলামিক মুভমেন্টের মসজিদ নির্মাণের বিষয়ে ইসরায়েলের অবস্থান ছিল স্ববিরোধী। কখনো তারা নির্মাণের অনুমোদন দিত—যেমন ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বরে জাওরাত আল-শামস মসজিদের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে খোদ ইসরায়েলি সামরিক গভর্নর উপস্থিত ছিলেন। আবার অন্য ক্ষেত্রে তারা বাধা হয়ে দাঁড়াত।

এই দৃষ্টিভঙ্গি মূলত নির্দিষ্ট ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত মর্জির ওপর নির্ভর করত, যা প্রমাণ করে যে মসজিদগুলোর বিষয়ে সরকারের সুসংহত কোনো নীতি ছিল না।

২০১০ সালে প্রকাশিত ‘হামাস’ বইতে বেভারলি মিল্টন-এডওয়ার্ডস এবং স্টিফেন ফেরেল উল্লেখ করেছেন যে, উপরে উল্লিখিত ধর্মীয় বিষয়ক কর্মকর্তা আভনার কোহেনের মনে ‘ক্রমশ সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকে’—ইসলামিক মুভমেন্ট সম্ভবত মসজিদগুলোকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের জন্য ব্যবহার করছে।

সাংবাদিক চার্লস এন্ডারলিন তার ২০০৯ সালের বই ‘ল্য গ্র্যান্ড এভিউগ্লেমেন্ট’-এ লিখেছেন, কোহেন ইসলামিক সেন্টারকে বেআইনি ঘোষণা করার জন্য ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর কাছে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু তাকে জানানো হয় যে উপাসনালয় নিষিদ্ধ করা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হবে। তবে কোহেনের প্রচেষ্টা একেবারে বৃথা যায়নি; ১৯৮৪ সালে গাজার মসজিদগুলোর ওপর তার অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন প্রকাশের মাত্র তিন দিন পরেই ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ শায়খ ইয়াসিনকে গ্রেফতার করে।

আযযাম তামিমি ২০০৯ সালে তাঁর ‘হামাস: দ্য আনরিটেন চ্যাপ্টার্স’ বইতে লেখেন, ইসরায়েলি সামরিক আদালত ইয়াসিনকে “রাষ্ট্র ধ্বংসের ষড়যন্ত্রে” দোষী সাব্যস্ত করে ১৩ বছরের কারাদণ্ড দেয়।

তবে লেবানন যুদ্ধে বন্দি হওয়া তিন ইসরায়েলি সেনার বিনিময়ে এক বছর পরেই তিনি মুক্তি পান। জেল থেকে বেরোনোর পর ‘ইসলামিক সেন্টার’-এ তাঁর যুক্ত হওয়া নিষিদ্ধ থাকলেও তিনি থেমে থাকেননি। সালাহ শেহাদের সাথে মিলে তিনি গোপনে ব্রাদারহুডের সামরিক কাঠামো পুনর্গঠন করেন। এবার এর নাম দেওয়া হয় ‘ফিলিস্তিনি মুজাহিদিন’, যার মূল লক্ষ্য ছিল গাজায় সরাসরি সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা। ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৭ সালের মধ্যে শেহাদেই এই প্রতিরোধের নেতৃত্ব দেন।

এখন প্রশ্ন হলো, ইয়াসিনের অস্ত্রগুলো ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধেই ব্যবহৃত হবে—এমন ধারণা কেন ছড়ালো? তামিমি জানাচ্ছেন, গাজায় তখন গুজব রটে গিয়েছিল যে ব্রাদারহুড আসলে তাদের ফিলিস্তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর চড়াও হওয়ার জন্যই অস্ত্র কিনছে।

তখনকার উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে এই গুজব খুব দ্রুতই ডালপালা মেলে। বিশেষ করে গাজা ইসলামিক ইউনিভার্সিটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফাতাহ ও ব্রাদারহুডের মধ্যকার রেষারেষি মানুষের মনে এই সন্দেহ আরও পাকাপোক্ত করে তুলেছিল।

“ইসরায়েল হামাসকে অর্থায়ন করেছে”

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর ‘ইসরায়েলই হামাসকে সৃষ্টি করেছে’—এই গুজবটি আরও ব্যাপক আকার ধারণ করে। এর সাথে এবার নতুন একটি দাবি যুক্ত হয়: নেতানিয়াহু কাতারকে গাজায় অর্থ পাঠানোর অনুমতি দিয়ে আসলে হামাসকে এই হামলার সুযোগ করে দিয়েছেন।

এই বয়ানটি মূলত ২০১৮-২০১৯ সালের ‘গ্রেট মার্চ অফ রিটার্ন’ আন্দোলনের সময় হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে চলা দীর্ঘ আলোচনার একটি ভুল ব্যাখ্যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সেই আলোচনার ফলশ্রুতিতে ইসরায়েল কিছু বিষয়ে ছাড় দিতে রাজি হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল—গাজার স্থবির অর্থনীতিতে গতি আনা, মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামতের পাশাপাশি কাতারকে গাজার সরকারি চাকুরিজীবীদের বেতন দেওয়ার অনুমতি দেওয়া। বিনিময়ে হামাস ইসরায়েল-গাজা সীমান্তের প্রতিবাদ কর্মসূচিগুলোর তীব্রতা কমিয়ে আনতে সম্মত হয়।

নেতানিয়াহু সরকারের তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আভিগডোর লিবারম্যান এই কাতারি অর্থায়নের বিরোধিতা করে ২০১৮ সালের নভেম্বরে পদত্যাগ করেন। সে সময়ের শিক্ষামন্ত্রী নাফতালি বেনেটও অভিযোগ করেছিলেন যে, নেতানিয়াহু আসলে শান্ত পরিস্থিতি বজায় রাখার জন্য হামাসকে ‘প্রোটেকশন মানি’ বা মাসোহারা দিচ্ছেন।

নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক বিরোধীরা এখনো দাবি করে যাচ্ছেন যে, কাতার থেকে গাজায় আসা অর্থের প্রবাহই কাসসাম ব্রিগেডকে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের অভিযানের প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করেছে। অথচ সেই অর্থ যেন সরাসরি সরকারি চাকুরিজীবী এবং সাধারণ পরিবারগুলোর হাতে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে বেশ কিছু নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু ছিল। এমনকি চূড়ান্ত পর্যায়ে ইসরায়েল নিজেই এর ওপর নজরদারি করত এবং হামাসও দাতা সংস্থার তহবিলে হাত না দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিল।

পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো গাজায় কাতারি অর্থায়নকে হামাসের জন্য তহবিল হিসেবে তুলে ধরলেও, বাস্তবে সেই অর্থ ব্যয় করা হয়েছিল গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামো পরিচালনা এবং বছরের পর বছর ধরে ইসরায়েলি ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা গাজাবাসীর অর্থনৈতিক দুর্দশা লাঘব করতে।

গাজার মানবিক সংকট দূর করার জন্য দেওয়া এই সহায়তা আর হামাসকে সরাসরি অর্থায়ন করা—একই কথা নয়; যদিও একে ব্যাপকভাবে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়।

২০২৩ সালের অক্টোবরে পারস্য উপসাগরীয় এই দেশটির (কাতার) একজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছিলেন, “গাজা উপত্যকায় কাতারি সহায়তা ইসরায়েল, জাতিসংঘ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পূর্ণ সমন্বয়ের মাধ্যমেই দেওয়া হয়।”

কাতারের পাঠানো সেই অর্থ হামাসের হাতে পৌঁছেছে—এমন দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। তাছাড়া হামাসের সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অন্যান্য আর্থিক উৎস রয়েছে। বরং সেই সময়ে নথিপত্রে প্রচুর প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, যাদের টাকা পাওয়ার কথা ছিল সেই প্রকৃত উপকারভোগীদের হাতেই টাকা পৌঁছেছে।

হামাস ইসরায়েলের সৃষ্টি কিংবা ইসরায়েল এই সংগঠনটি গড়তে উৎসাহ দিয়েছে—এমন দাবি করাটা স্রেফ একটি ভ্রান্তি।

খালেদ হ্রুব ‘দ্য ইলেকট্রনিক ইন্তিফাদা’-কে বলেন, হামাস হুট করে আসা কিছু নয়; এটি অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিনিদের মাঝে গড়ে ওঠা একটি বড় সংগঠন। মূলত পুরো অঞ্চলে ইসলামপন্থার যে জোয়ার এসেছিল, হামাস তারই ফসল। এই ঐতিহাসিক আন্দোলনকে ‘ইসরায়েলের সৃষ্টি’ বলাটা স্রেফ অর্থহীন।

এটা সত্য যে, ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের মধ্যে বিভেদ বাড়াতে বা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে হামাসের অস্তিত্বকে ব্যবহার করতে চেয়েছে। কিন্তু ইসরায়েলই হামাসকে ‘আবিষ্কার’ করেছে—এমন দাবি করাটা হাস্যকর।

ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো হয়তো এই গুজবটি টিকে থাকায় খুশিই ছিল। কারণ, তাদের নাকের ডগা দিয়ে একটি সংগঠন এত শক্তিশালী হয়ে উঠেছে—এই চরম সত্যটি মেনে নেওয়ার চেয়ে ‘হামাস আমাদেরই সৃষ্টি’ বলাটা তাদের জন্য বেশি সুবিধাজনক। এই গুজবের মাধ্যমে ইসরায়েল আসলে তাদের ‘সর্বজয়ী’ ভাবমূর্তি ধরে রাখতে চায়। তারা মানুষের মনে এই ভয় গেঁথে দিতে চায় যে, পুরো অঞ্চলে যা কিছু ঘটে তার সব সুতোই তাদের হাতে।

এই মিথটি টিকে থাকার কারণেই অনেক বিশ্লেষক দাবি করেন, ‘অপারেশন আল-আকসা ফ্লাড’ সম্পর্কে শিন বেট আগে থেকেই জানত। গাজার জনসংখ্যা সমস্যার সমাধানের অজুহাত খুঁজতেই ইসরায়েল এই হামলাটি ঘটতে দিয়েছে। এ ধরণের দাবি মূলত ‘ইসরায়েলই হামাস সৃষ্টি করেছে’—এই তত্ত্বেরই চরম রূপ।

দুর্ভাগ্যবশত, অনেক বুদ্ধিমান মানুষও এখন অবলীলায় বলেন, ‘ইসরায়েল হামাসকে অর্থায়ন করেছে’। এই ধারণাটি আসলে ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তি, বিচারবুদ্ধি এবং লড়াই করার সক্ষমতাকে অস্বীকার করার নামান্তর। আর ফিলিস্তিনিদের এই সক্ষমতাকে অস্বীকার করাই হলো ইসরায়েলের মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের প্রধান হাতিয়ার।

তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের অভিযান ইসরায়েলের এই ‘অপরাজেয়’ হওয়ার মিথ চিরতরে ভেঙে দিয়েছে। আর পরবর্তীতে ইরানের পাল্টা হামলা এই বাস্তবতাকে আরও পরিষ্কার করে তুলেছে।

মূল : দ্য ইলেকট্রনিক ইন্তিফাদা
তরজমা : শাহেদ হাসান, রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, দ্য মুসলিম মাইন্ডস

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles
সমসাময়িক বিশ্লেষণ

ইরান যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির দেউলিয়াত্ব

সমসাময়িক বিশ্লেষণ•April 27, 2026সমসাময়িক বিশ্লেষণইরান যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির দেউলিয়াত্বদ্য মুসলিম মাইন্ডস...

সমসাময়িক বিশ্লেষণ

ইরান যুদ্ধ ও বিশ্ব-রাজনীতিতে আমেরিকার পতন

সমসাময়িক বিশ্লেষণ•April 12, 2026সমসাময়িক বিশ্লেষণইরান যুদ্ধ ও বিশ্ব-রাজনীতিতে আমেরিকার পতনদ্য মুসলিম মাইন্ডস...

দর্শনপাশ্চাত্যবাদপ্রাচ্যবাদসমসাময়িক বিশ্লেষণ

জ্ঞান ও ক্ষমতার আন্তঃসম্পর্ক: ফুকোর বরাতে

দর্শন•April 11, 2026দর্শনপাশ্চাত্যবাদপ্রাচ্যবাদসমসাময়িক বিশ্লেষণজ্ঞান ও ক্ষমতার আন্তঃসম্পর্ক: ফুকোর বরাতেআসিফ আদনান•70 min read613ViewsFacebookXWhatsApp613...

সমসাময়িক বিশ্লেষণ

হিটলারবাদ থেকে মাক্রোঁবাদ: রাজনীতির নানা রূপ — ইমানুয়েল টড

সমসাময়িক বিশ্লেষণ•April 9, 2026সমসাময়িক বিশ্লেষণহিটলারবাদ থেকে মাক্রোঁবাদ: রাজনীতির নানা রূপ — ইমানুয়েল...