পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন: সম্পর্কের নতুন মেরুকরণ?

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন কেবল ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, বরং বাংলাদেশের জন্যও এক বিশেষ গুরত্ব বহন করছে। সীমান্ত নিরাপত্তা থেকে শুরু করে তিস্তার পানি বণ্টন কিংবা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য—দুই দেশের সম্পর্কের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ নির্ভরশীল এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপর।
বাংলাদেশের জন্য এই নির্বাচনের সবচেয়ে স্পর্শকাতর দিক হলো ‘অবৈধ অভিবাসী’ ইস্যু। বিতর্কিত ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯০ লাখ মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, যা মোট নিবন্ধিত ভোটারের প্রায় ১৯ শতাংশ। নাগরিক পরিচয় আর ‘কারা এই মাটির সন্তান’—এমন বিতর্ক বহু বছর ধরেই পূর্ব ভারতের রাজনীতিতে বড় ফ্যাক্টর। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সীমান্তবর্তী এই উদ্বেগগুলো সরাসরি আমাদের জাতীয় ও কৌশলগত অবস্থানের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ভৌগোলিক অবস্থানই পশ্চিমবঙ্গকে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী করে তুলেছে। বাংলাদেশ ও ভারতের স্থলসীমান্তের অর্ধেকেরও বেশি অংশ এই রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত। ফলে দুই দেশের বাণিজ্যিক রুট, অভিবাসনের ধরন কিংবা রাজনৈতিক বয়ান সবকিছুই এই অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এর বাইরেও রয়েছে ভাষার টান; সীমান্তের দুই পাড়েই মানুষের প্রধান ভাষা বাংলা।
কলকাতা ভারতের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ না করলেও, সেই নীতির বাস্তব প্রয়োগ বা ফলাফল কী হবে তা অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণ করে এই রাজ্যের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি থেকে শুরু করে সীমান্তের ব্যবস্থাপনা, এমনকি তিস্তার পানি বণ্টনের মতো স্পর্শকাতর আলোচনাও পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ওপর নির্ভরশীল। আর ঠিক এই কারণেই কলকাতার মসনদে কে বসছেন, তা নিয়ে ঢাকার আগ্রহ বরাবরের মতোই তুঙ্গে।
পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণ বুঝতে হলে একটু পেছনে ফিরে তাকানো দরকার। টানা তিন দশকের বেশি সময় রাজ্যটি শাসন করেছে বামপন্থীরা। তবে ২০১১ সালে সেই দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপসহীন আন্দোলন আর তৃণমূল পর্যায়ের শক্তিশালী সংগঠনের জোয়ারে ক্ষমতাচ্যুত হয় সিপিএম। এরপর থেকে গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে দিদির একক আধিপত্য বজায় রয়েছে। ভারতের রাজনীতিতে তিনি এখন অন্যতম প্রভাবশালী আঞ্চলিক নেত্রী। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও ৪২টি আসনের মধ্যে ২৯টি জিতে তিনি নিজের শক্তিমত্তার প্রমাণ দিয়েছেন।
তবে এবারের লড়াইটা কেবল ক্ষমতা ধরে রাখার নয়, বরং প্রভাব বিস্তারেরও। গত এক দশকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো বিজেপির উত্থান। একসময়ের অপ্রাসঙ্গিক এই দলটি এখন রাজ্যের প্রধান বিরোধী শক্তি। বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসকে পেছনে ফেলে তারা তৃণমূলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। বিজেপির এই নাটকীয় উত্থান পশ্চিমবঙ্গের চিরাচরিত রাজনীতিতে মেরুকরণের নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সেখানে ধর্ম এবং কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদ এখন বড় ইস্যু।
একদলীয় শাসন থেকে বেরিয়ে রাজ্যটি এখন কার্যত দ্বিমুখী লড়াইয়ের ময়দানে পরিণত হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ের ইস্যুগুলো এখন স্থানীয় রাজনীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়ছে; বিশেষ করে নাগরিকত্ব, অভিবাসন ও নিরাপত্তা নিয়ে বিতর্কগুলো এখন অনেক বেশি জোরালো।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় ফেরার লড়াইয়ে আছেন। যদি তিনি সফল হন, তবে তাঁর শাসনকাল দুই দশক পূর্ণ করবে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালের সবশেষ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল ২১১টি থেকে বেড়ে ২১৩টি আসন পেয়েছিল। অন্যদিকে মাত্র ৩টি আসন নিয়ে চলা বিজেপি একলাফে ৭৭টি আসন জিতে নিজেদের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির এই পরিসংখ্যানগুলো এক দ্রুত পরিবর্তনশীল বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। মাত্র এক দশকের ব্যবধানে বিজেপি প্রান্তিক অবস্থান থেকে উঠে এসে এখন তৃণমূলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। ২০২৬ সালের এই নির্বাচনকে তারা দিল্লির মসনদের সমর্থন আর তৃণমূল পর্যায়ের সাংগঠনিক বিস্তারের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছে।
কলকাতার রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সব্যসাচী বসু রায় চৌধুরীর মতে, ‘বিজেপির এই জয়যাত্রা উত্তর, মধ্য ও পশ্চিম ভারতে দাপট দেখালেও দক্ষিণ ভারতে ডিএমকে, কংগ্রেস ও বামপন্থীদের কারণে এখনো থমকে আছে। তবে পূর্ব ভারতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন পর্যন্ত এই তরঙ্গ সামলে রাখতে পেরেছেন।’
নির্বাচনী প্রচারণার ভাষা বিশ্লেষণেও এই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের উত্তাপ স্পষ্ট। বিজেপি মূলত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সীমান্ত নিরাপত্তা আর তাদের ভাষায় ‘অনুপ্রবেশ’ ইস্যুকে সামনে রেখে এগোচ্ছে। এর সাথে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি ও জাতীয় পরিচয়ের মতো বিষয়গুলোকেও তারা হাতিয়ার করেছে।
অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) এই লড়াইকে দেখছে জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সাফল্য, সামাজিক সম্প্রীতি আর বাংলার নিজস্ব স্বায়ত্তশাসন রক্ষার চ্যালেঞ্জ হিসেবে। নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির অতন্দ্র প্রহরী দাবি করে দলটি বলছে, তারা বিভাজনমূলক রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়ছে।
প্রাথমিক আভাস বলছে, লড়াই হবে সমানে সমান। দীর্ঘ শাসনামলের কারণে সরকারের ওপর মানুষের যে স্বাভাবিক অসন্তোষ বা ‘অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি’ তৈরি হয়, তার একটা প্রভাব অবশ্যই থাকবে। তবে তা মমতাকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য যথেষ্ট কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে।
সব্যসাচী বসু রায় চৌধুরী মনে করেন, সাংগঠনিক শক্তির বিচারে তৃণমূল এখনো কিছুটা এগিয়ে। পশ্চিমবঙ্গের ভোটে বুথ পর্যায়ের যে শক্ত ভিত প্রয়োজন, বিজেপির সেখানে এখনো কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া এসআইআর ইস্যু এবং বাঙালি বনাম অ-বাঙালি তর্কের মতো বিষয়গুলো ভোটারদের মনে বড় প্রভাব ফেলছে। তবে বিজেপির ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি এটুকু নিশ্চিত করেছে যে, এবারের লড়াই আর একতরফা হওয়ার সুযোগ নেই।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. এসকে তৌফিক এম হক বিষয়টিকে আরও বৃহত্তর প্রেক্ষাপট থেকে দেখছেন। তাঁর মতে, অভিবাসন বা ধর্মভিত্তিক রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গে নতুন নয়, তবে এর তীব্রতা এখন কয়েক গুণ বেড়েছে। এটি মূলত ভারতীয় রাজনীতির সেই ধারারই অংশ যেখানে পরিচয় এবং সীমান্তকেন্দ্রিক বয়ানগুলো এখন ভোটের মেরুকরণে বড় ভূমিকা রাখছে।
পরিচয় আর সীমান্তের রাজনীতির বাইরে বিজেপি এবার পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক অবস্থাকেও বড় ইস্যু করতে চাইছে। তাদের প্রচারণায় বারবার উঠে আসছে বর্তমান শাসনামলে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের বেহাল দশার কথা। বিকল্প হিসেবে তারা নারী ও বেকার যুবকদের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতা, নতুন বন্দর এবং বড় বড় শিল্প হাব তৈরির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। মূলত বিনিয়োগ আর চাকরির কথা বলে নিজেদেরকে উন্নয়নের কাণ্ডারি হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা চালাচ্ছে বিজেপি।
কাগজে-কলমে পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের শেষে পশ্চিমবঙ্গের বেকারত্বের হার ছিল ৩.৬ শতাংশ, যা ভারতের জাতীয় গড়ের (৪.৮ শতাংশ) চেয়েও কম। কিন্তু মাঠপর্যায়ের চিত্রটা একটু অন্যরকম। স্থায়ী চাকরির অভাব, কাজের খোঁজে ভিনরাজ্যে পাড়ি দেওয়া আর সরকারি ভাতার ওপর অতিনির্ভরশীলতা—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা চাপা অর্থনৈতিক উদ্বেগ কাজ করছে। বিশেষ করে কয়েকটি জেলায় এই ইস্যুগুলোই এবার ভোটারদের মাথার ওপর চড়ে বসেছে। ফলে এবারের নির্বাচনে অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান কেবল আলোচনার বিষয় নয়, বরং বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে এই নির্বাচনের প্রভাব শুধু ভারতের সীমানায় আটকে নেই; ঢাকার জন্যও এর প্রতিটি মোড় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরাসরি ফলাফল হয়তো আজই টের পাওয়া যাবে না, কিন্তু সামনের দিনগুলোতে সীমান্ত রাজনীতি, অভিবাসন বিতর্ক, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য আর তিস্তার পানি বণ্টন সবকিছুতেই এর আঁচ লাগবে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট এখন একেবারেই ভিন্ন। গত দুই বছরে দেশটিতে ঘটে গেছে বিশাল রাজনৈতিক পরিবর্তন। ২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশ পরিচালনা করে। এরপর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বড় জয় নিয়ে প্রায় ২০ বছর পর ক্ষমতার মসনদে ফেরে বিএনপি। ঢাকায় এখন একটি নির্বাচিত সরকার কাজ করছে।
হাসিনা সরকারের পতনের পর দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা এখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার পথে। ভিসা বন্ধ থাকা, সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা আর বাণিজ্যের টানাপোড়েন কাটিয়ে দুই দেশ এখন আবার সম্পর্কের শীতলতা ভাঙার চেষ্টা করছে। ঠিক এই সন্ধিক্ষণেই পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন এক নতুন সমীকরণ হাজির করেছে।
সবচেয়ে বড় শঙ্কার জায়গা হলো সীমান্ত নিরাপত্তা আর ‘অনুপ্রবেশ’ নিয়ে বিজেপির আক্রমণাত্মক প্রচার। অমিত শাহসহ বিজেপির শীর্ষ নেতারা সাফ জানিয়েছেন, তাদের নীতি হলো—‘চিহ্নিত করো, তালিকা বাদ দাও এবং বের করে দাও’।
এমনকি পশ্চিমবঙ্গ থেকে কথিত অবৈধ অভিবাসীদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকিও বারবার উঠে আসছে। বিজেপির দাবি, বাংলাদেশ থেকে আসা মানুষের কারণে পশ্চিমবঙ্গের জনতাত্ত্বিক কাঠামো বদলে যাচ্ছে। তবে সমালোচকরা বলছেন ভিন্ন কথা। অনেক ক্ষেত্রে কোনো বাছবিচার ছাড়াই বাংলাভাষী মুসলিমদের ভারতের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও জোর করে সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠছে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জামায়াতে ইসলামীর সক্রিয়তাকে বিজেপি এখন তাদের নির্বাচনী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকায় তারা একে নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে প্রচার করছে। এর ফলে ঢাকার কূটনৈতিক মহলে এক ধরণের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে—নির্বাচন শেষ হলে সীমান্তে ‘পুশব্যাক’ বা রাজনৈতিক চাপ কি আরও বাড়বে?
এ বিষয়ে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. এসকে তৌফিক এম হক মনে করেন, ভারতের কেন্দ্র ও রাজ্যে যদি একই দল ক্ষমতায় থাকে, তবে বাংলাদেশের ওপর চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসে, তবে দিল্লি ও কলকাতার মধ্যে রাজনৈতিক সমন্বয় বাড়বে। এটি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে অনাকাঙ্ক্ষিত সীমান্ত জটিলতাকে আরও উসকে দিতে পারে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মিয়ানমার ও বাংলাদেশ বিষয়ক সিনিয়র কনসালট্যান্ট থমাস কিন মনে করেন, এই নির্বাচন দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে কিছুটা উত্তেজনা ছড়াতে পারে। পশ্চিমবঙ্গে যদি বিজেপি ক্ষমতায় আসে, তবে সীমান্ত এলাকা অনেক বেশি সামরিকায়িত হয়ে উঠতে পারে। এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতেও এক ধরণের চাপ তৈরি করবে।
ইতিমধ্যেই ভারত থেকে বাংলাদেশে ‘পুশ-ইন’ বা মানুষকে ঠেলে পাঠানোর ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় আড়াই হাজার মানুষকে সীমান্তে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১২০ জনকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) নিশ্চিতভাবে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করেছে। অনুপ্রবেশ নিয়ে স্রেফ রাজনৈতিক মাঠ গরম করা বয়ানগুলো কীভাবে বাস্তবে আন্তঃসীমান্ত সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে তা বোঝা যাচ্ছে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক সব্যসাচী বসু রায় চৌধুরী মনে করেন, এসব বয়ানেরও একটা সীমাবদ্ধতা আছে। কাউকে চাইলেই হুট করে ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে ফেরত পাঠানো বাস্তবিকভাবে এতটা সহজ নয়। তাই ভোটের মাঠে কী বলা হচ্ছে, তার চেয়েও বড় কথা হলো ভোটের পর বাস্তবে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ঢাকাকে এখন সেদিকেই কড়া নজর রাখতে হবে।
উদ্বেগের দ্বিতীয় বড় ক্ষেত্রটি হলো বাণিজ্য ও কানেক্টিভিটি। মুখে দুই দেশই অর্থনৈতিক সম্পর্ক মজবুত করার কথা বললেও বাস্তবে তার অগ্রগতি বেশ মন্থর। ২০২৫ সাল থেকে বাণিজ্যে নানা বিধিনিষেধ ও অস্থিরতা থাকলেও মজার ব্যাপার হলো, দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ কিন্তু কমেনি, বরং বেড়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, নির্বাচনের পর এই বাণিজ্য কোন পথে হাঁটবে? পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি জিতলে দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে তাদের কাজের সমন্বয় বাড়বে, যা হয়তো পরিবহন বা বাণিজ্যিক জটিলতা কিছুটা কমাতে পারে। তবে রাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়ে গেলে এই অর্থনৈতিক অর্জনগুলো আবার বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও থেকে যায়।
অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) ক্ষমতায় থাকলে রাজ্য পর্যায়ের সম্পর্ক অনেকটা বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর থাকবে বলে আশা করা যায়, যদিও দিল্লির সাথে মমতার মতপার্থক্য আগের মতোই বজায় থাকতে পারে। তবে অধ্যাপক চৌধুরীর মতে, নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক টানে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের প্রাত্যহিক সম্পর্ক সময়ের সাথে উন্নতির দিকেই যাবে। যদিও ভোটের রাজনীতিতে ‘অবৈধ অভিবাসী’ ইস্যুটি বারবার তুরুপের তাস হিসেবে ফিরে আসবে।
পানি বণ্টন ইস্যুটি সবচেয়ে জটিল ও অমীমাংসিত ইস্যু হয়ে ঝুলে আছে। ২০১১ সালে মমতার আপত্তির কারণেই থমকে গিয়েছিল তিস্তা চুক্তি। এবার গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদও ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হতে চলেছে। ফলে গঙ্গা ও তিস্তা—এই দুই নদীর পানির হিস্যা নিয়ে সামনে যে বড় ধরণের কূটনৈতিক লড়াই হবে, তার গতিপথ অনেকটাই ঠিক করে দেবে এবারের বিধানসভা নির্বাচন।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের থমাস কিন মনে করেন, তিস্তা ইস্যুর দীর্ঘস্থায়ী জট খোলা কঠিন হলেও তা একেবারে অসম্ভব নয়। পশ্চিমবঙ্গে যদি বিজেপি জয়ী হয়, তবে চুক্তির পথে থাকা দীর্ঘদিনের একটি বড় বাধা হয়তো দূর হতে পারে।
২০১১ সালে তিস্তার খসড়া চুক্তি সই হওয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা আটকে দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুষ্ক মৌসুমে নিজের রাজ্যে পানির সংকটের অজুহাত দেখিয়ে তিনি বরাবরই এই চুক্তির বিরোধিতা করে আসছেন।
কিন অবশ্য সতর্ক করে বলছেন, বিজেপি জিতলে অগ্রগতির সম্ভাবনা তৈরি হবে ঠিকই, কিন্তু এখনই খুব বেশি আশাবাদী হওয়া কঠিন। কারণ ২০১১ সালে দিল্লি আসলে কতটা আন্তরিক ছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। এ ছাড়া পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় পর্যায়ে পানি নিয়ে যে রাজনৈতিক ও জনমতের চাপ রয়েছে, তা রাতারাতি মিলিয়ে যাবে না।
এখনই হয়তো পূর্ণাঙ্গ কোনো চুক্তি হবে না। তবে চীনের প্রভাব মোকাবিলা আর ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক ঝালিয়ে নিতে দিল্লি চাইলে নতুন কোনো ফর্মুলা নিয়ে এগোতে পারে। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হতে পারে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির নবায়ন। এটি তিস্তার তুলনায় কম বিতর্কিত। তবে বাংলাদেশ চাইবে শুষ্ক মৌসুমে পানির নায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে।
এদিকে অধ্যাপক তৌফিক এম হক মনে করেন, তিস্তা চুক্তির ভবিষ্যৎ কেবল পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতার রদবদলের ওপর নয়, বরং ঢাকা ও দিল্লির সামগ্রিক সম্পর্কের ওপর নির্ভর করছে। বিজেপি জিতলেই যে জাদুকরী কিছু ঘটে যাবে, তেমন নিশ্চয়তা নেই। আবার তৃণমূল যদি ক্ষমতায় ফেরে, তবে পরিস্থিতির পরিবর্তনের আশা আরও কম। কারণ মমতার দল শুরু থেকেই সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারা আগে রাজ্যের পানির চাহিদাকেই গুরুত্ব দেবে।
এই পুরো সমীকরণ বাংলাদেশকে এক কঠিন দোটানায় ফেলেছে। তৃণমূল জিতলে রাজনৈতিক পরিবেশ হয়তো কিছুটা স্বস্তিদায়ক থাকবে, কিন্তু পানির হিস্যা পাওয়ার আশা থাকবে ক্ষীণ। অন্যদিকে বিজেপি জিতলে পানির আলোচনায় নতুন মোড় আসতে পারে ঠিকই, কিন্তু তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে একরাশ অনিশ্চয়তা।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারণায় যেভাবে ধর্ম, সংখ্যালঘু ইস্যু আর ‘অনুপ্রবেশ’ বারবার সামনে আসছে। এই পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি সীমান্তের দুই পাশেই মানুষের মনে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানকেই এখানে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ভোটের মাঠে বাংলাদেশকে একটি ‘সহজ ইস্যু’ বানিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার এই প্রবণতা নির্বাচনের পরেও থামার সম্ভাবনা কম। বিজেপি ক্ষমতায় থাকুক বা বিরোধী দলে, তীব্রতা কমবেশি হলেও এই ইস্যুটি তারা জিইয়ে রাখবে।
সবকিছুর উর্ধ্বে রয়েছে বৃহত্তর কূটনৈতিক বাস্তবতা। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক এখন বেশ নাজুক ও সংবেদনশীল। দুই পক্ষই সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চাইলেও ভেতরে-ভেতরে এক ধরণের সন্দেহ ও অবিশ্বাস দানা বেঁধেছে। তবে বাণিজ্য, কানেক্টিভিটি ও নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোতে দুই দেশ এখন এতটাই একে অপরের ওপর নির্ভরশীল যে, চাইলেই কেউ কাউকে উপেক্ষা করতে পারবে না।
বিশ্লেষক সব্যসাচী বসু রায় চৌধুরীর মতে, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন হয়তো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মূল কাঠামোকে সরাসরি প্রভাবিত করবে না। কারণ দুই দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ একে অপরের পরিপূরক। থমাস কিনও আশাবাদী যে, দুই দেশ শেষ পর্যন্ত সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখতে পারবে।
অনুবাদঃ আশরাফুল ইসলাম







Comments