কাঁটাতারের ওপারে ছুঁড়ে ফেলা মানুষ: পুশ-ইন সংকটের ভেতর-বাহির

২০২৫ সালের ২৭ মে ভোরের আলো তখনো ফোটেনি। ভারতের আসামের গোয়ালপাড়া জেলার মাটিয়া ডিটেনশন সেন্টার থেকে একটি ভ্যানে তুলে নেওয়া হলো ৬৭ বছর বয়সী উফা আলীসহ ১৪ জনকে, যাদের মধ্যে পাঁচজন নারী।
সীমান্তে নিয়ে গিয়ে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ তাদের বাধ্য করল বাংলাদেশের দিকে হেঁটে যেতে। ওপারে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বিজিবি ও স্থানীয় বাসিন্দারা বললেন, এদের তারা নেবেন না — কারণ এরা ভারতীয়।
চারদিন ধরে দুই দেশের সীমান্তের মাঝখানে, কোনো রাষ্ট্রের নয় এমন এক টুকরো জমিতে আটকে রইলেন এই মানুষগুলো। উফা আলী আল-জাজিরাকে বলেছিলেন, বাংলাদেশ নামটি তিনি জন্ম থেকে শুধু একটি গালি হিসেবে শুনে এসেছেন। অথচ সেই দেশেই তাকে ছুঁড়ে ফেলা হলো।
উফা আলী বলেছিলেন, বাংলাদেশ নামটি তিনি জন্ম থেকে শুধু একটি গালি হিসেবে শুনে এসেছেন। অথচ সেই দেশেই তাকে ছুঁড়ে ফেলা হলো।
আসামের মরিগাঁওয়ের সাবেক সরকারি স্কুলশিক্ষক ৫১ বছর বয়সী খায়রুল ইসলামকে ২৩ মে ২০২৫-এ তার বাড়ি থেকে তুলে নেওয়া হয়, চারদিন পর সীমান্তের ওপারে ফেলে দেওয়া হয় — যদিও পরিবার সব নথি দিয়েছিল।
পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার অন্তঃসত্ত্বা সোনালি বিবিকে তার স্বামী ও সন্তানসহ ছয় সদস্যের পরিবারকে ২০ আগস্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে পুশ-ইন করা হয় — পরে ভারতীয় আদালত সরকারকে তাদের ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেয়। আরেক ব্যক্তি জব্বার জানান, তার ১৪ সদস্যের পরিবারকে ভারতের আটগড় কারাগারে ৩৫ দিন আটকে রাখার পর ২৫ ডিসেম্বর মুক্তি দিয়েই সেই রাতে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়। চিকিৎসার পর বিজিবি তাদের দর্শনা সীমান্ত দিয়ে ভারতে ফেরত পাঠায় — এক নিষ্ঠুর পিং-পং খেলা, যেখানে মানুষগুলো বল।
এমন হাজারো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দৃশ্য মিলেই তৈরি হয়েছে পুশ-ইন সংকটের নিষ্ঠুর ফেনোমেনা। এক দেশ যাকে নিজের নাগরিক নয় বলে তাড়িয়ে দিচ্ছে, অন্য দেশ তাকে আমাদের নয় বলে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকছে রাষ্ট্রহীন কিছু জীবন।
পুশ-ইন আসলে কী, পুশব্যাক থেকে কোথায় আলাদা
প্রথমেই দুটি শব্দের পার্থক্য বোঝা জরুরি, কারণ এই পার্থক্যেই লুকিয়ে আছে পুরো বিতর্কের মর্মমূল। ভারত একে বলছে “পুশব্যাক” — ইউরোপ-আমেরিকার সীমান্ত আইন থেকে ধার করা একটি শব্দ, যার অর্থ সীমান্ত পার হতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়া কাউকে আবার ফিরিয়ে দেওয়া।
কিন্তু যাদের নিয়ে এই হিসাব, তাদের অনেককে ধরা হয়েছে মহারাষ্ট্রের মুম্বাই, দিল্লি কিংবা আসামের অভ্যন্তরীণ গ্রাম থেকে — সীমান্ত পার হওয়ার সময় নয়। তাই বাংলাদেশের ব্যবহৃত শব্দ “পুশ-ইন” — অর্থাৎ জোর করে ঢুকিয়ে দেওয়া — অনেক বেশি সঠিক। যখন ১২০ জন প্রমাণিত ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশের মাটিতে ঠেলে দেওয়া হয়, তখন “পুশব্যাক” শব্দটি অর্থ হারিয়ে ফেলে।
যখন ১২০ জন প্রমাণিত ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশের মাটিতে ঠেলে দেওয়া হয়, তখন ‘পুশব্যাক’ শব্দটি অর্থ হারিয়ে ফেলে।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি — এই আট মাসে দেশের ৩২টি জেলার সীমান্ত দিয়ে মোট ২,৪৭৯ জনকে বাংলাদেশে পুশ-ইন করা হয়েছে। এদের মধ্যে অন্তত ১২০ জনকে পরে বিজিবি শনাক্ত করেছে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে, ৩৮ জন মিয়ানমারের, আর কিছু ছিলেন নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থী। ২০২৬ সালের জুনের প্রথম দুই সপ্তাহেই বিজিবি ৩০টির বেশি পুশ-ইন প্রচেষ্টা ব্যর্থ করেছে।
৩১ মে ২০২৬-এ বেনাপোলের সাদিপুর সীমান্তে বিএসএফ কাঁটাতারের একাংশ খুলে নারী-শিশুসহ ১৩ জনকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করলে বিজিবি পুরো সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করে। ঝিনাইদহে এক ঘটনায় বিএসএফ একটি কারাগারের ভ্যান কাঁটাতারের দিকে নিয়ে গিয়েছিল, পরে পিছু হটতে বাধ্য হয়।
পেছনের ইতিহাস: কেন এই সংকটের শিকড় এত গভীর
এই সংকট হঠাৎ আকাশ থেকে পড়েনি। এর শিকড় ১৯৪৭ সালের দেশভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত। বিশেষত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে — যা শুরু হয়েছিল ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর “অপারেশন সার্চলাইট” দিয়ে। তখন পূর্ববঙ্গ থেকে বিপুল মানুষ আসামসহ ভারতের পূর্বাঞ্চলে আশ্রয় নেয়।
জাতিসংঘের হিসাবে সেই বছর প্রায় এক কোটি মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে যায়। এই অভিবাসন আসামের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে জনমিতিক উদ্বেগ তৈরি করে এবং সেই উদ্বেগ থেকেই ১৯৭৯ সাল থেকে শুরু হয় ছয় বছরব্যাপী “আসাম আন্দোলন”, যার নেতৃত্বে ছিল অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (আসু)।
এই আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটে ১৯৮৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাক্ষরিত আসাম চুক্তি দিয়ে — ভারত সরকার, আসু ও অল আসাম গণ সংগ্রাম পরিষদের মধ্যে এক সমঝোতা, যার মূল শর্ত ছিল একটি কাট-অফ তারিখ নির্ধারণ: ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগে যারা আসামে এসেছে তারা নাগরিকত্ব পাবে, আর তারপরে আসা সবাইকে শনাক্ত করে বিতাড়িত করা হবে।
কাট-অফ তারিখ হল সুনির্দিষ্ট তারিখ, যেটাকে বেঞ্চমার্ক ধরে নাগরিকত্ব যাচাই করা হয়। ফলে আসামে যেহেতু কাট অফ তারিখ ধরা হয়েছে ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ, তাই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে প্রমাণ করতে হয় যে তিনি বা তার পূর্বপুরুষ ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগে আসামে বাস করতেন — এবং সেটা সরকারি নথি, জমির দলিল, ভোটার তালিকা বা স্কুলের সনদ দিয়ে। অর্থাৎ আজ থেকে ৫৪ বছর আগের কাগজ দেখাতে না পারলে আপনি সম্ভাব্য “বিদেশি।”
সেই কাগজ দেখাতে না পারা দরিদ্র, নিরক্ষর বা প্রান্তিক মানুষের জন্য প্রায় অসম্ভব — অথচ তাদের বাবা-দাদা হয়তো জন্মসূত্রেই ওই মাটিতে ছিলেন। এই “ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট” বা শনাক্ত-বাতিল-বিতাড়নের অঙ্গীকার এক জাতীয় প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হয়, কিন্তু চার দশক পরেও পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি — আজকের পুশ-ইনের রাজনৈতিক যুক্তি এখান থেকেই আসে।
এর পরের ধাপ আরও জটিল। ২০১৯ সালের ৩১ আগস্ট আসামে প্রকাশিত হয় হালনাগাদ জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি), যেখানে নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য সেই একই কাট-অফ তারিখ মেনে পূর্বপুরুষের নথি দেখাতে হয়েছিল। প্রায় তিন কোটি মানুষ ছয় কোটির বেশি নথি নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন; চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়েন ১৯ লাখ মানুষ।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে পাস হওয়া নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ), যা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, খ্রিষ্টান ও পার্সিদের জন্য নাগরিকত্বের কাট-অফ ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর রেখে মুসলিমদের বাদ দেয়। ফলে একটি কাঠামো দাঁড়িয়ে যায়: বাঙালি হিন্দু “শরণার্থী”, বাঙালি মুসলিম “অনুপ্রবেশকারী।”
১৯৬৪ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ১৯৪৬ সালের ফরেনার্স অ্যাক্টের ৩ ধারার আওতায় “ফরেনার্স (ট্রাইব্যুনালস) অর্ডার” জারি করে একটি আধা-বিচারিক সংস্থা প্রতিষ্ঠা করে। এর বিশেষত্ব হলো উল্টো প্রমাণের বোঝা — সাধারণ আদালতে রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হয় আপনি দোষী, কিন্তু এই ট্রাইব্যুনালে আপনাকেই প্রমাণ করতে হয় আপনি ভারতীয়।
সাধারণ আদালতে রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হয় আপনি দোষী, কিন্তু এই ট্রাইব্যুনালে আপনাকেই প্রমাণ করতে হয় আপনি ভারতীয়।
১৯৮৫ সালে আসাম চুক্তির পর বারপেটায় প্রথম স্থায়ী ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠিত হয়, ২০১৫ সালে আরও আটটি যোগ হয় এবং ২০১৯-এ এনআরসি-বাদ পড়াদের আপিলের জন্য মোট ১০০টি ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করা হয়।
ভারতীয় সাংবাদিক রোহিণী মোহন এই ট্রাইব্যুনাল নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান করেছেন। তার দুটি কাজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য: ২০১৮ সালে HuffPost India-তে প্রকাশিত প্রতিবেদন “What’s Going On Is Really Unfair: Inside The Foreigners Tribunals In Assam” এবং ২০১৯ সালে VICE News-এ Type Investigations-এর সহযোগিতায় প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।
রোহিণী মোহন ট্রাইব্যুনালের ৫০০টি রায় বিশ্লেষণ করে দেখেছেন হিন্দুদের তুলনায় অনেক বেশি মুসলিমকে “বিদেশি” ঘোষণা করা হয়েছে এবং ৭৮ শতাংশ রায় হয়েছে বিবাদী পক্ষকে শুনানির সুযোগ না দিয়ে।
এই ট্রাইব্যুনাল-ব্যবস্থার ভয়াবহতা একটি ঘটনাতেই স্পষ্ট। আসামের বাসিন্দা রহিম আলীকে একটি ট্রাইব্যুনাল “বিদেশি” ঘোষণা করেছিল; নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণে তাকে ১২ বছর আইনি লড়াই চালাতে হয়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যখন সুপ্রিম কোর্ট তাকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, ততদিনে রহিম আলী মারা গেছেন।
কাঁটাতার যখন কফিন: সীমান্ত হত্যার রক্তাক্ত ইতিহাস
২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি ভোরে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে ১৫ বছরের ফেলানী খাতুন বাবার সঙ্গে কাঁটাতার পেরিয়ে দেশে ফিরছিল — কয়েকদিন পরেই তার বিয়ে ছিল। মই বেয়ে ওঠার সময় তার জামা কাঁটাতারে আটকে যায়, আতঙ্কে চিৎকার করলে বিএসএফের ৮১ ব্যাটালিয়নের কনস্টেবল অমিয় ঘোষ গুলি চালান।
আহত ফেলানী প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা কাঁটাতারে ঝুলে ছিল। রক্তক্ষরণে ধীরে ধীরে মৃত্যু হয় তার। অভিযুক্ত অমিয় ঘোষকে বিএসএফের নিজস্ব জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্স কোর্ট ২০১৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর খালাস দেয়, পরে আবার বিচারের পর ২০১৫ সালেও খালাস পান। ভারতের সুপ্রিম কোর্টে মামলা আজও নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের সামনের সড়কটির নাম রাখা হয় “ফেলানী সরণি।”
ফেলানী ব্যতিক্রম নন, বরং একটি প্যাটার্নের সবচেয়ে পরিচিত মুখ। উইকিপিডিয়ার “Deaths along the Bangladesh–India border” নিবন্ধের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিএসএফের হাতে অন্তত ১,৯৮৭ জন বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নিহত হয়েছেন ৩৪ জন — ২৪ জন গুলিতে, ১০ জন নির্যাতনে।
এই পরিসংখ্যান বিশ্বপরিসরে দেখলে পরিসংখ্যানের মর্মান্তিক দিকটা আরও স্পষ্ট হয়। ২০১৩ সালে মার্কিন সংবাদমাধ্যম Global Post ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তকে পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক সীমান্ত হিসেবে চিহ্নিত করে। The Diplomat-এর ২০২৪ সালের বিশ্লেষণে বলা হয়, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সীমান্তের পরে এটিই বিশ্বের দ্বিতীয় প্রাণঘাতী সীমান্ত।
ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে দুই দেশের সেনা ও বেসামরিক মিলিয়ে ১৩০-১৭০ জন নিহত হয়েছেন — সেটিও সক্রিয় সামরিক উত্তেজনার সময়ে। অথচ ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে দুটি দেশ কাগজে-কলমে বন্ধু, কোনো সক্রিয় সংঘাত নেই — তবুও গড়ে বছরে ৩০ জন করে নিহত হচ্ছেন। ২০০০ থেকে এখন পর্যন্ত প্রতি ১০ দিনে একজন বাংলাদেশি মারা গেছেন এই “বন্ধুত্বপূর্ণ” সীমান্তে।
একজন বাংলাদেশি মারা গেছেন
এই হত্যাযজ্ঞের সবচেয়ে নির্মম সত্যটি হলো জবাবদিহিহীনতা। আজ পর্যন্ত একজন বিএসএফ সদস্যকেও এই সীমান্তে হত্যার জন্য দণ্ড দেওয়া হয়নি। একাধিক মহাপরিচালক-পর্যায়ের বৈঠকে দুই দেশ “সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার” অঙ্গীকার করেছে বারবার, কিন্তু প্রতিশ্রুতির কালি শুকানোর আগেই নতুন লাশ পড়েছে। পুশ-ইন তাই বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং এই জবাবদিহিহীন সীমান্ত-সংস্কৃতিরই ভিন্ন একটি রূপ।
২০২৫ সালের বাঁকবদল
দীর্ঘদিনের এই চাপা আগুন ২০২৫ সালে দাবানলে রূপ নেয় তিনটি কারণে।
প্রথমত, পেহেলগাম হামলার প্রতিক্রিয়া। ২০২৫ সালের এপ্রিলে জম্মু-কাশ্মীরের পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার পর ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাজ্যগুলোকে নির্দেশ দেয় ৩০ দিনের মধ্যে সন্দেহভাজন “অবৈধ অভিবাসী” শনাক্ত করতে। ৭ মে থেকে শুরু হয় দেশব্যাপী ধরপাকড়। বিশ্লেষকরা বলছেন, সন্ত্রাসী হামলা ও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের মধ্যে কোনো প্রমাণিত সম্পর্ক না থাকলেও, একটি ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে গোটা একটি জনগোষ্ঠীকে সন্দেহভাজন করা হয়।
দ্বিতীয়ত, আইনি কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তন। ২০২৫ সালে ভারতের সংসদে পাস হয় ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্ট ২০২৫ — লোকসভায় ২৭ মার্চ, রাজ্যসভায় ২ এপ্রিল এবং রাষ্ট্রপতির সম্মতি ৪ এপ্রিল। এটি ১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে কার্যকর হয়।
এই আইন চারটি পুরনো ঔপনিবেশিক আইন — ১৯২০ সালের পাসপোর্ট (এন্ট্রি ইনটু ইন্ডিয়া) অ্যাক্ট, ১৯৩৯ সালের রেজিস্ট্রেশন অব ফরেনার্স অ্যাক্ট, ১৯৪৬ সালের ফরেনার্স অ্যাক্ট এবং ২০০০ সালের ইমিগ্রেশন (ক্যারিয়ার্স লায়াবিলিটি) অ্যাক্ট — একত্রিত করে নতুন কাঠামো দাঁড় করায়। এর ফলে অভিবাসন কর্মকর্তাদের হাতে কাউকে ১০ দিনের নোটিশে “বিদেশি” ঘোষণার ক্ষমতা আসে।
সমান্তরালে আসামে ১৯৫০ সালের ইমিগ্র্যান্টস (এক্সপালশন ফ্রম আসাম) অ্যাক্ট পুনরুজ্জীবিত হয় এবং ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর আসাম মন্ত্রিসভা একটি SOP বা স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর অনুমোদন করে। SOP হলো প্রশাসনিক নির্দেশিকা — এটি মন্ত্রিসভার আদেশ, সংসদের আইন নয়। এই SOP-এর আওতায় জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে ট্রাইব্যুনাল বা নাগরিকত্ব যাচাই–সবকিছুকে পুরোপুরি এড়িয়ে বহিষ্কারের আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়।
তৃতীয়ত, নির্বাচনী রাজনীতি। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা রাজ্য বিধানসভায় বলেন, “এই পুশব্যাক আরও জোরদার করা হবে। রাজ্যকে বাঁচাতে আমাদের আরও সক্রিয় হতে হবে।” পশ্চিমবঙ্গে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী “ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট” অভিযানে দাবি করেন অন্তত ৪,৮৮০ জন “অনুপ্রবেশকারীকে” ফেরত পাঠানো হয়েছে।
মূলত বিজেপির নির্বাচনী রাজনীতি, উগ্রপন্থীদের ভোট টানা, দেশের সব সঙ্কটের শেকড় হিসেবে অভিভাসন সমস্যাকে দায়ী করে প্রকৃত সমস্যা সমাধানে নিজেদের দায় এড়ানোর পরিবেশের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে পুশ ইন তীব্রতর হয়েছে। ভোট ব্যাংক ধরে রাখতে নিরীহ মানুষের জীবনকে কাঁটাতারের ওপারে নো ম্যান্স ল্যান্ডে ফেলে রাখা হচ্ছে।
সীমান্তের অর্থনীতি: গরু, চোরাচালান আর ছিদ্রযুক্ত কাঁটাতার
এই সংকটের একটি কম-আলোচিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো অর্থনীতি। এর কেন্দ্রে আছে সীমান্তে ভারতে উৎপন্ন দেশীয় মদ, অবৈধ অস্ত্র, ইয়াবা, কাপড়, চিনি-সহ নানাবিধ পণ্য পাচার। বাংলাদেশ থেকেও ইলিশ, চিংড়ি, গরুর চামড়া ইত্যাদি ভারতে পাচার হয়।
তবে একসময় এই পাচার সংস্কৃতিতে গরু ছিল প্রধান পণ্য। ভারতে যে গরুর দাম ১০০ থেকে ৪০০ ডলার, বাংলাদেশে তার দাম ওঠে ১,০০০ ডলার ছাড়িয়ে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এই অবৈধ বাণিজ্যের আনুমানিক মূল্য ছিল ৬৭৫ মিলিয়ন ডলার। মোদি সরকারের গো-রক্ষা অভিযানের ফলে পাচার কমলেও বন্ধ হয়নি। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে জুলাই — মাত্র চার মাসে মেঘালয়ে বিএসএফ ৬২২টি গরু ও ১.৩ কোটি রুপির চোরাই পণ্য জব্দ করে।
ইয়াবা, ফেনসিডিল, সোনা, জাল মুদ্রা, অস্ত্র ও মানব পাচারও এই সীমান্তের নিত্য বাস্তবতা। এই বিপুল অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিই সীমান্তকে “ছিদ্রযুক্ত” রাখে — আর সেই ছিদ্র দিয়েই অবৈধ অভিবাসন ও পুশ-ইন দুই-ই ঘটে। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডিসেম্বর ২০২৪ লোকসভা তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি ২০১৪ থেকে নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৮,৬৩২টি অনুপ্রবেশ প্রচেষ্টায় ২১,৪০৭ জন আটক হয়েছে — যা ভারতের যেকোনো সীমান্তের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বিজিবির সীমাবদ্ধতা: ৭০,০০০ সদস্য, ৪,৪২৭ কিলোমিটার সীমান্ত
বাংলাদেশের সীমান্ত পাহারার বাস্তব হিসাবটা বুঝলে সংকটের গভীরতা স্পষ্ট হয়। উইকিপিডিয়া ও বিজিবির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিজিবির মোট জনবল প্রায় ৭০,০০০। বাংলাদেশের মোট সীমান্ত ৪,৪২৭ কিলোমিটার — এর মধ্যে ভারতীয় সীমান্ত ৪,০৯৬ কিলোমিটার, মিয়ানমারের সঙ্গে বাকিটুকু। অর্থাৎ সব সীমান্ত মিলিয়ে প্রতি কিলোমিটারে গড়ে মাত্র ১৫.৮ জন বিজিবি সদস্য আছেন — এবং তারা তিন শিফটে কাজ করেন, মানে একটি মুহূর্তে প্রতি কিলোমিটারে সক্রিয় থাকেন মাত্র ৫-৬ জন।
গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী, একটি কার্যকর সীমান্ত পাহারায় প্রতি কিলোমিটারে কমপক্ষে ৮-১০ সক্রিয় সদস্য প্রয়োজন। তার ওপর আছে নদীবেষ্টিত এলাকা — সুন্দরবন থেকে পদ্মার চর পর্যন্ত এমন বিস্তীর্ণ অঞ্চল আছে যেখানে স্থলপথে পাহারা দেওয়া শারীরিকভাবে অসম্ভব। ভারতের দিক থেকেও প্রায় ৮৫৭ কিলোমিটার সীমান্ত এখনও বেড়াবিহীন। এই পাহারার ফাঁকফোকরই উভয় দিকের পাচারকারী ও পুশ-ইন পরিচালনাকারীদের কাজে লাগে।
ভারত-বাংলাদেশের পাল্টাপাল্টি যুক্তি ও অভিযোগ
ভারতের সবচেয়ে মৌলিক যুক্তি হলো সার্বভৌম অধিকার — যেকোনো রাষ্ট্রেরই অবৈধ অভিবাসীদের বিতাড়নের অধিকার আছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল ২০২৬ সালের ৭ মে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ২,৮৬০টির বেশি নাগরিকত্ব যাচাইয়ের মামলা বাংলাদেশের কাছে পাঠানো হয়েছে, যাদের কিছু মামলা ২০২০ সাল থেকে আটকে আছে।
৩০ এপ্রিল ২০২৬-এ পাঠানো ভারতীয় কূটনৈতিক নোটে বলা হয়, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত ১,০০০-এরও বেশি কূটনৈতিক নোট ও ৪৫০টির বেশি সম্মিলিত স্মারকপত্র পাঠানো হয়েছে, বাংলাদেশ যথাযথ সাড়া দেয়নি।
ভারতের “ধীরগতি” অভিযোগের বিপরীতে বাংলাদেশও মে ১২ এবং মে ২৭, ২০২৬-এ পাঠানো দুটি বিস্তারিত কূটনৈতিক নোটে জবাব দিয়েছে । বাংলাদেশের অবস্থান তিনটি মূল বিন্দুতে:
প্রথমত, বাংলাদেশ বলছে তাদের “নিষ্ক্রিয়তা” নয়, বরং ভারতের পাঠানো তালিকায় কাঠামোগত সমস্যা আছে। নামের বানান অমিল, একাধিক তালিকায় একই ব্যক্তির ভিন্ন পরিচয়, ঠিকানার গরমিল — এই কারণে যাচাই আটকে যাচ্ছে। উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, বাংলাদেশ বহু বছর ধরে প্রমাণিত বাংলাদেশিদের ফেরত নিয়েছে — প্রক্রিয়াটা নিয়ে আপত্তি, পরিচয় নিয়ে নয়।
দ্বিতীয়ত, ভারত ২০২৫ সালের জুনে বাংলাদেশের কনস্যুলার বৈঠকের অনুরোধে এখনো সাড়া দেয়নি — The Print-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বৈঠকের মাধ্যমেই প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনার কথা ছিল। বাংলাদেশ ১২-১৩ বার চিঠি লিখেছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ কখনোই দাবি করেনি যে প্রকৃত বাংলাদেশি নাগরিকদের ফেরত নেবে না। বাংলাদেশের তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা স্পষ্ট করেছেন বলেছিলেন — “যদি তারা আমাদের নাগরিক হয়, তাদের ফিরিয়ে দেওয়ার অধিকার আমাদের নেই।”
১২ মে ২০২৫-এ পাঠানো এক বিস্তারিত কূটনৈতিক নোটে বাংলাদেশ পুনর্ব্যক্ত করে যে তারা প্রমাণিত বাংলাদেশি নাগরিকদের আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে ফেরত নিয়েছে সবসময়। আসল আপত্তি প্রক্রিয়া নিয়ে — যাচাই-বাছাই ছাড়া, আদালতের তত্ত্বাবধান ছাড়া জোর করে ঠেলে দেওয়ার বিরুদ্ধে।
এছাড়াও ভারতীয় নাগরিকদের পুশ-ইন ভারতের পুরো যুক্তিকে দুর্বল করে দেয়। যখন ১২০ জন প্রমাণিত ভারতীয় নাগরিক ও ৩৮ জন মিয়ানমারের মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়, তখন “অবৈধ বাংলাদেশি বিতাড়ন” যুক্তিটি ভেঙে পড়ে। ভারতের নিজের আদালতই একাধিকবার সরকারকে পুশ-ইন করা ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনতে বাধ্য করেছে।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন। জোরপূর্বক পুশ-ইন জাতিসংঘের নন-রিফাউলমেন্ট নীতির লঙ্ঘন। ভারত ১৯৫১ সালের জাতিসংঘ শরণার্থী কনভেনশনের স্বাক্ষরকারী নয় বলে এই মানদণ্ড এড়িয়ে যায়। অথচ বাংলাদেশ — যে দেশও ওই কনভেনশনের স্বাক্ষরকারী নয় — দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে এক মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১,৮২,৭৫৫ জন। ফলে স্বাক্ষর করেছে কি করেনি, তারচেয়ে বড় প্রশ্ন হল সদিচ্ছা আছে কি নেই। বিশেষত অভিবাসীরা যখন ভোটব্যাংকের হাতিয়ার হয়ে উঠে, তখন মানবতার চাইতে রাজনীতিটাই মুখ্য হয়ে উঠে।
পুশ-ইন সংকটের সবচেয়ে স্পর্শকাতর দিকটি হলো রোহিঙ্গা। ভারত যাদের পুশ-ইন করছে তাদের মধ্যে আছেন ইউএনএইচসিআর-নিবন্ধিত কার্ডধারী রোহিঙ্গা। গুজরাটে একটি বাঙালি বসতি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর পুশ-ইনের সংখ্যা বেড়ে যায়। এর ফলে এমন কিছু মানুষ সীমান্তের মাঝখানে আটকা পড়ছেন যারা না ভারতীয়, না বাংলাদেশি — আন্তর্জাতিক আইন যাদের সুনির্দিষ্টভাবে সুরক্ষা দেয়। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে আটকে পড়া ১১ লাখ রোহিঙ্গার সাথে এখন যুক্ত হচ্ছে ভারত থেকে আসা রোহিঙ্গাদের স্রোত।
দুই দেশের রাজনৈতিক নেতারা কী বলছেন
ভারতের দিক থেকে দেখলে বিষয়টি কার্যত দলীয় অবস্থানে রূপ নিয়েছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মা বিধানসভায় ঘোষণা করেছেন পুশব্যাক আরও জোরদার হবে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নির্বাচনী প্রচারণায় “অবৈধ বাংলাদেশি তাড়ানো” ছিল কেন্দ্রীয় প্রতিশ্রুতি। বিজয়ের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী থ্রি-ডি অভিযানের ঘোষণা দেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রাই রাজ্যসভায় ইমিগ্রেশন বিল পাসের সময় বিরোধী কংগ্রেস ও তৃণমূলকে সরাসরি “অনুপ্রবেশকারীদের সহায়তাকারী” বলে আক্রমণ করেন। এই পুরো চিত্রে পরিষ্কার, পুশ-ইন ভারতে কেবল নীতি নয়, রাজনৈতিক পুঁজি।
প্রধানমন্ত্রী মোদি অবশ্য নিজে কূটনৈতিক সুর বজায় রেখেছেন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমান বিজয়ী হলে মোদি বাংলায় অভিনন্দন জানান এবং “ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার” প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি রহমানকে পরিবারসহ ভারত সফরের আমন্ত্রণও জানান।
বাংলাদেশের দিক থেকে ইউনূস সরকারের আমলে পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন কড়া ভাষায় পুশ-ইনের প্রতিবাদ করে বলেছিলেন, “এটা আন্তর্জাতিক আইন ও ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা চুক্তির সরাসরি লঙ্ঘন।” পররাষ্ট্র উপদেষ্টা পাঁচবার ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব করেছিলেন। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (পরবর্তীতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী) খলিলুর রহমান ২০২৬ সালের মে মাসে সতর্ক করেন, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা পরিবর্তনের পর পুশ-ইন বাড়লে বাংলাদেশ “পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেবে।”
তারেক রহমানের বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর কৌশলগত ভারসাম্য খোঁজার চেষ্টা চলছে। ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভা স্পিকার ওম বিরলা ও পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি উপস্থিত ছিলেন। উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন বিজিবি পুশ-ইন “কোনোভাবেই গ্রহণ করবে না,”।
২০২৬ সালের ১৫ জুন ঢাকায় ভারতীয় মহাসাগর রিম অ্যাসোসিয়েশনের (আইওআরএ) বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল নেতৃত্ব দিতে গিয়ে দিল্লি বিমানবন্দরে আটকে দেওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশ ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীকে তলব করেছে।
যদিও সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের নানা মন্ত্রী-উপদেষ্টারা বলার চেষ্টা করেছেন যে পুশ ইন ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এ নিয়ে দেশের রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
মূলত ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার পতন এবং তার ভারতে আশ্রয় নেওয়া দিল্লি-ঢাকা পুরাতন সম্পর্কের ভিত নাড়িয়ে দেয়। ইউনূস সরকারের আমলে সম্পর্ক সর্বনিম্নে পৌঁছায়। বাংলাদেশ হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়েছিল, ভারত দেয়নি। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ডিসেম্বর ২০২৫ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সীমান্ত বিরোধ, পাল্টাপাল্টি বাণিজ্য বিধিনিষেধ এবং কূটনৈতিক বিবৃতিযুদ্ধ বেড়েছে।
উপসংহার
পুশ-ইন সংকট মূলত অভিবাসনের গল্প নয় — বরং এটি ভারতের জাস্টিস সিস্টেম ভেঙে পড়ার আউটকাম। উফা আলী, খায়রুল ইসলাম কিংবা সোনালি বিবির গল্পগুলো ব্যতিক্রম নয় — এগুলো একটি পরিকল্পিত ব্যবস্থার ফল, যেখানে বাংলাভাষী মুসলিমরা সন্দেহভাজন হয়ে ওঠেন কেবল ভাষা ও ধর্মের কারণে। ১৯৭১-এর কাট-অফ তারিখ, ১৯৮৫-এর আসাম চুক্তি, ২০১৯-এর এনআরসি — প্রতিটি ধাপে নাগরিকত্বের বোঝা চাপানো হয়েছে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের কাঁধে। ২০২৫-এর পুশ-ইন তারই সর্বশেষ ও সবচেয়ে নগ্ন রূপ।
সমাধান অসম্ভব নয়। মাত্র এক দশক আগে ২০১৫ সালের স্থল সীমান্ত চুক্তি, যার মাধ্যমে দুই দেশ ১৬২টি ছিটমহল আদানপ্রদান করেছিল। তা প্রমাণ করে যে দুই দেশ চাইলে রাষ্ট্রহীন মানুষকে নাগরিকত্ব পর্যন্ত দিতে পারে। অথচ আজ একই সীমান্তে চলছে উল্টো প্রক্রিয়া। নাগরিকত্ব যাচাইয়ে যৌথ ব্যবস্থা, কনস্যুলার অ্যাক্সেস সহজীকরণ, তালিকার নাম-মিলানোর প্রযুক্তিগত সমাধান — এই পদক্ষেপগুলো নেওয়া যেত, নেওয়া যায়।
কিন্তু যতদিন ভারতের নির্বাচনী রাজনীতিতে “বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী”-ভোটের হাতিয়ার হয়ে থাকবে, যতদিন সীমান্তের অর্থনীতি প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের পরিবর্তে কাঁটাতারকে ছিদ্রযুক্ত রাখবে, যতদিন দুই দেশের রাজনৈতিক নেতারা কূটনীতির চেয়ে ঘরোয়া রাজনৈতিক লাভলোকসানকে বেশি গুরুত্ব দিবে — ততদিন প্রতিটি ভোরে সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডে আটকে থাকবে নতুন কিছু মুখ। ফেলানীর ঝুলে থাকা দেহ থেকে উফা আলীর চারদিনের অনিশ্চয়তা পর্যন্ত — এই কাঁটাতারের দুই পাশে যা ঝুলছে, তা কেবল মানুষের ভাগ্য নয়, হিন্দুত্ববাদি ভারতের সভ্যতাগত পরিপক্বতার পরীক্ষাও বটে।
তথ্যসূত্র
- The Real Crisis Behind India-Bangladesh Border Push-ins The Daily Star
- 2,479 people pushed into Bangladesh by BSF in 8 months Prothom Alo
- ‘Foreigners for both nations’: India pushing Muslims ‘back’ to Bangladesh Al Jazeera
- India’s Stealthy Pushback: Deportation Without Due Process CJP
- Assam Foreigners’ Tribunals CSB IAS Academy
- ‘What’s Going On Is Really Unfair’: Inside The Foreigners Tribunals In Assam HuffPost India
- Foreigners Tribunals Deeply Biased VICE News / Type Investigations
- An Assessment of Foreigners Tribunals in Assam ISAS Brief No. 696, NUS
- The Deadly Border Between Bangladesh and India The Diplomat
- Killings Along Indian Border Rise Again New Age BD
- Deaths along the Bangladesh–India border Wikipedia
- These Are The 7 Most Dangerous Borders Worldwide The Travel
- Bangladesh-India Border Is Among World’s Most Dangerous TBS News
- Immigration and Foreigners Act 2025: Parliament passes bill The Week / PTI
- Foreigners and Immigration Act 2025 Sanskriti IAS
- Immigration and Foreigners Bill 2025 PRS Legislative Research
- Executive Expulsions from Assam Oxford Border Criminologies Blog
- India Terms Repatriation ‘Core Issue’ in Push-In Row The Wire
- India-Bangladesh War of Diplomatic Notes The Print
- Bangladesh Vows to Resist India’s Push-ins Asian News Network
- BJP Victory in West Bengal Intensifies Push-in Anxieties The Diplomat
- ‘Push-ins unacceptable’: Bangladesh advises India to follow diplomatic process BDNews24
- India’s border policy testing fragile reset with Bangladesh National Herald India
- After the “Golden Era”: Getting Bangladesh-India Ties Back on Track International Crisis Group
- Can Tarique Rahman Overcome Obstacles to Reset Bangladesh-India Relations? Eurasia Review
- Bangladesh Summons Indian Diplomat Over Delhi Airport Hold-Up The Wire
- Border Guard Bangladesh Wikipedia
- India Bangladesh Border Highest Infiltration Attempts 2025 Deccan Herald
- India-Bangladesh Border Fencing and National Security IMPRI
- Shooting of Felani Khatun Wikipedia
- India’s cattle smuggling crackdown adds to Bangladesh’s GDP TRT World
- The 2015 India-Bangladesh Land Boundary Agreement Library of Congress







Comments