ইরান যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির দেউলিয়াত্ব

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধ পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে। চলমান কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেই ২৮ ফেব্রুয়ারির আকস্মিক বিমান হামলা ছিল এক বড় ধাক্কা, যা বিশ্বজুড়ে নিন্দা ও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।
এই যুদ্ধে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল বেশ সতর্ক। বাংলাদেশ ইরানি পাল্টা হামলায় উপসাগরীয় দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের নিন্দা জানালেও, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কর্তৃক ইরানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের বিষয়টি এড়িয়ে গেছে। ইরান যে এখানে মূল ভুক্তভোগী, সেই প্রসঙ্গটি অনুপস্থিত থাকায় বাংলাদেশের কেবল অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতাই নয়, বরং পররাষ্ট্রনীতির কাঠামোগত দুর্বলতাও প্রকাশ পেয়েছে। যুদ্ধ এই দুর্বলতা তৈরি করেনি, স্রেফ তা উন্মোচন করে দিয়েছে।
বাংলাদেশ এখন জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আর কূটনৈতিক ধোঁয়াশা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে; চেষ্টা করছে কোনো পরাশক্তিকেই যেন চটানো না হয়। সরকারের এই অতি-সতর্ক অবস্থান দেশে যেমন সমালোচিত হচ্ছে, বিদেশেও তেমনি নজরে পড়ছে। তবে এর পেছনে আসল সত্য হলো, বাংলাদেশের সুসংহত কোনো পররাষ্ট্রনীতি নেই। এর বদলে শুধু ঝুঁকি এড়িয়ে চলার একটি চেষ্টা দেখা যায়, যা নীতির চেয়ে পরনির্ভরশীলতার ওপর বেশি দাঁড়িয়ে।
সহজ কথায় একে পররাষ্ট্রনীতির দেউলিয়াপনা বলা যেতে পারে।
দূরদেশের যুদ্ধ ও তার প্রভাব
ইরান যুদ্ধ ভৌগোলিকভাবে অনেক দূরে হলেও এর প্রভাব সরাসরি এবং তাৎক্ষণিক পড়ে। বাংলাদেশ এই যুদ্ধের অংশ না হয়েও এর ফল ভোগ করছে। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য এটাই বাস্তবতা।
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ করা হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। ফলে সেখানে সামান্য অস্থিরতাও বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের কম্পন সৃষ্টি করে। যখনই এই করিডোরে উত্তেজনা বাড়ে, বাংলাদেশ তার প্রভাব টের পায় মুহূর্তের মধ্যেই। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, পণ্য পরিবহনে জটিলতা আর মুদ্রাস্ফীতি ঘটে।
এর প্রভাব ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। জ্বালানি সংকটের কারণে সরকার অফিসের কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনতে এবং জ্বালানি সাশ্রয়ে বিভিন্ন কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছে। জ্বালানি স্বল্পতাকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মাঝে আতঙ্কিত হয়ে পণ্য কেনা, এমনকি সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে; যা আমাদের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির নাজুকতাকে আবারও আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন যে, এই যুদ্ধ বাংলাদেশের ওপর ‘ভূমিকম্পের’ মতো আঘাত হানতে পারে। এর ফলে এক ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জ্বালানি ও পণ্যের দাম বৃদ্ধি, রপ্তানি কমে যাওয়া, প্রবাসী আয়ে ধাক্কা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর তীব্র চাপ বাড়তে পারে। বাংলাদেশ এই যুদ্ধ কেবল পর্যবেক্ষণই করছে না, বরং এর নেতিবাচক প্রভাবগুলো সরাসরি হজম করছে।
নিরপেক্ষতার বিভ্রম
এমন সংকটের মুখে আশা করা হয়েছিল বাংলাদেশ একটি স্পষ্ট কূটনৈতিক অবস্থান তুলে ধরবে। কিন্তু তার বদলে বাংলাদেশ বেছে নিয়েছে এক তথাকথিত নিরপেক্ষতা। সরকারি বক্তব্যে সংযম, সংলাপ এবং শান্তির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। ওপর ওপর দেখলে একে যৌক্তিক মনে হতে পারে। কারণ বড় কোনো ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে কোনো এক পক্ষ নিয়ে বাংলাদেশের পাওয়ার কিছু নেই। তবে নিরপেক্ষতা মানেই কেবল কোনো পক্ষে না থাকা নয়; এর জন্য প্রয়োজন অবস্থানের ধারাবাহিকতা, গ্রহণযোগ্যতা এবং ভারসাম্য। আর এখানেই মূল সমস্যার শুরু।
সমালোচকরা বলছেন, বাংলাদেশের বিবৃতিতে নির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপের—বিশেষ করে পাল্টা হামলার—নিন্দা জানানো হলেও, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা সামরিক আগ্রাসনের সরাসরি কোনো সমালোচনা করা হয়নি। অনেকের মতে, এই ভাষা ছিল একপেশে; সেখানে নিরপেক্ষ থাকার চেয়ে পশ্চিমা অবস্থানকে সন্তুষ্ট করার এক সূক্ষ্ম চেষ্টা ছিল।
প্রকৃত নিরপেক্ষতা বলতে আসলে একটি নীতিগত অবস্থানকে বোঝায়: সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন যে-ই করুক না কেন তার বিরোধিতা করা, আন্তর্জাতিক আইনের ধারাবাহিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং একটি স্বচ্ছ নৈতিক কাঠামো বজায় রাখা।
একে নিরপেক্ষতা বলা যায় না; এটি আসলে বেছে বেছে সতর্কতা অবলম্বন করা।
বাংলাদেশের এই অবস্থান নীতিগত কোনো আদর্শের চেয়ে বরং সম্ভাব্য পরিণতির ভয়েই বেশি তাড়িত বলে মনে হয়।
নীতি হিসেবে পরনির্ভরশীলতা
বিষয়টি বুঝতে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কূটনীতির কাঠামোগত বাস্তবতার দিকে তাকাতে হবে। বাংলাদেশ তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে বাইরের শক্তির ওপর প্রবলভাবে নির্ভরশীল: জ্বালানি আমদানি, রপ্তানি বাজার (বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলো) এবং মধ্যপ্রাচ্যে থাকা প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো আয়। এই প্রতিটি খাতই আমাদের পররাষ্ট্রনীতিকে সংকুচিত করে ফেলেছে।
জ্বালানি নির্ভরতা সম্ভবত সবচেয়ে বড় সংকট। বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় জ্বালানির বড় অংশই আমদানি করে, ফলে বিশ্ববাজারে দামের ওঠানামা বা সরবরাহ বিঘ্নিত হলে দেশ সরাসরি সংকটে পড়ে। যখন কোনো যুদ্ধ সরবরাহ ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলে, তখন বাংলাদেশ এমন কোনো পক্ষকে চটানোর ঝুঁকি নিতে পারে না, যারা এই জ্বালানি পাওয়ার পথে বাধা হতে পারে।
প্রবাসী আয় বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যে লাখ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক কর্মরত, যাদের অনেকে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এই যুদ্ধের সাথে জড়িত দেশগুলোতে আছেন। সামান্য একটি কূটনৈতিক ভুল পদক্ষেপ এই শ্রমিকদের ওপর এবং তাদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল আমাদের অর্থনীতির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
সবশেষে আসে ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্ন। বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতার জন্য পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের যেমন অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে, তেমনি চীন ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সাথেও আমাদের সংশ্লিষ্টতা আছে। এই সম্পর্কগুলোর ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে যে কৌশলী অবস্থানের প্রয়োজন হয়, তা অনেক সময় স্থবিরতায় রূপ নেয়।
পররাষ্ট্রনীতি মানে কেবল ঝুঁকি এড়িয়ে চলা নয়; বরং নিজের অবস্থানকে জোরালোভাবে তুলে ধরা। যখন বড় কোনো আন্তর্জাতিক ইস্যুতে বাংলাদেশ স্পষ্ট অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়, তখন বিশ্বমঞ্চে দেশটি গুরুত্বহীন অথবা সুবিধাবাদী হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। এর কোনোটিই কাম্য নয়।
কৌশলগত অস্পষ্টতা
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে প্রায়ই ‘কৌশলগত অস্পষ্টতা’ দেখা যায়। তবে কৌশলগত অস্পষ্টতা আর অসংলগ্নতার মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
আন্তর্জাতিক রীতিনীতির ওপর ভিত্তি করে একটি সুসংহত অবস্থান তুলে ধরতে ব্যর্থ হওয়ায় বাংলাদেশ তার নিজস্ব গ্রহণযোগ্যতাকেই সংকটে ফেলছে। ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য বিশ্ব রাজনীতিতে নৈতিক ও আইনি কাঠামোর গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ তাদের হাতে একতরফাভাবে স্বার্থ আদায়ের মতো সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তি থাকে না।
কৌশলগত অস্পষ্টতার একটা লক্ষ্য থাকে—এর মাধ্যমে নমনীয় থাকা যায় এবং দরকষাকষির সুযোগও বজায় রাখা যায়। অন্যদিকে, অসংলগ্নতা কেবল দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে দেয়। ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান এই দ্বিতীয় দিকটি অর্থাৎ দুর্বলতা বা অসংলগ্নতার দিকেই বেশি গেছে।
পরিবর্তে, এই দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক নিয়ম, প্রতিষ্ঠান এবং জোটের ওপর নির্ভর করতে হয়। বাংলাদেশ যদি ধারাবাহিকভাবে সেই নিয়মগুলোর পক্ষে না দাঁড়ায়, তবে প্রকারান্তরে সেটি দেশটির নিজের অবস্থানকেই দুর্বল করে দেয়।
পররাষ্ট্রনীতির ব্যর্থতা ও অভ্যন্তরীণ প্রভাব
পররাষ্ট্রনীতির এই দুর্বলতা কেবল কূটনৈতিক মহলেই সীমাবদ্ধ নেই; এর নেতিবাচক প্রভাব এখন জনজীবনেও স্পষ্ট। বর্তমান জ্বালানি সংকট এর একটি বড় উদাহরণ। জ্বালানি আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং বিকল্প উৎসের অভাব বাংলাদেশকে বাইরের যে কোনো সংকটের মুখে চরমভাবে অরক্ষিত করে ফেলেছে। যুদ্ধ যখন সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটাল, তখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো কোনো বাফার বা আপৎকালীন প্রস্তুতি দেশের ছিল না। এটি কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, বরং একটি নীতিগত ব্যর্থতা। জ্বালানি ঘাটতি মেটাতে কয়লার দিকে ঝুঁকে পড়ার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা একটি টেকসই জ্বালানি কৌশলের অভাবকেই তুলে ধরেছে। দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের বদলে এখানে কেবল জোড়াতালি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হচ্ছে।
পররাষ্ট্রনীতি মানেই শুধু বিবৃতি বা জোটবদ্ধ হওয়া নয়; এটি আসলে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার নাম। এর জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বাণিজ্যে বৈচিত্র্য আনা এবং প্রতিকূলতা মোকাবিলার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। সেই অর্থে, বাংলাদেশের বর্তমান এই সংকট আসলে বছরের পর বছর ধরে চলা কৌশলগত চিন্তার দীনতাকেই প্রতিফলিত করে।
বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়
ইরান যুদ্ধে বাংলাদেশের এই অবস্থানকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে; বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী অভ্যাসের অংশ। বহু আন্তর্জাতিক ইস্যুতে বাংলাদেশ সবসময়ই এমন এক অতি-সতর্ক ও দায়সারা অবস্থান নিয়ে থাকে। প্রায়শই এই অবস্থানকে ‘বাস্তববাদ’ বা প্রাগম্যাটিজম হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই প্রবণতা বিশ্বদরবারে আমাদের এক অসংলগ্ন ভাবমূর্তি তৈরি করে।
কূটনীতিতে নমনীয়তার পাশাপাশি একটি নিজস্ব পরিচয় থাকা জরুরি। প্রতিটি দেশকেই নির্দিষ্ট কোনো কাজের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত হতে হয়। সেটা হতে পারে শান্তি রক্ষা, মানবাধিকার কিংবা বিশেষ কোনো বিষয়ে নেতৃত্ব দেওয়া।
জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা মিশনে কাজ করে বাংলাদেশ মাঝে মাঝে সেই সম্ভাবনার কথা জানান দিয়েছে। কিন্তু এই কাজগুলো একটি শক্তিশালী ও সুসংহত পররাষ্ট্রনীতি হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়নি। এর বদলে দেশটি প্রায়ই পরিস্থিতির চাপে পড়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখায় যার পেছনে দীর্ঘমেয়াদী কোনো পরিকল্পনা থাকে না।
ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশের এই অবস্থানের পক্ষে যারা আছেন তারা হয়তো বলবেন যে, ছোট রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের হাতে বিকল্প খুব কম। পরাশক্তি শাসিত এই পৃথিবীতে সাবধানে চলাটাই জরুরি। এই কথায় সত্যতা আছে। বাংলাদেশ অবশ্যই তার প্রধান অংশীদারদের চটানো বা নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরের কোনো দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নিতে পারবে না। কিন্তু সতর্ক থাকার মানেই যে নিস্ক্রিয় হয়ে থাকা তা কিন্তু নয়।
বিশ্বের অনেক ছোট রাষ্ট্রই প্রমাণ করেছে যে নিজেদের নীতিতে অটল থেকেও স্বাধীনতা ও গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখা সম্ভব। তারা যেমন অযথা ঝগড়া করতে যায় না তেমনি প্রয়োজনে স্পষ্ট অবস্থান নিতেও দ্বিধা করে না।
পার্থক্যটা মূলত কৌশলে। একটি শক্তিশালী কৌশলগত অবস্থানে থাকতে হলে প্রয়োজন: জাতীয় স্বার্থের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা, নীতির ধারাবাহিক প্রয়োগ, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কে বৈচিত্র্য আনা এবং দীর্ঘমেয়াদী সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করা। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই পিছিয়ে আছে।
সামনের ঝুঁকি
ইরান যুদ্ধ হয়তো একসময় শেষ হবে, কিন্তু এর পেছনের মূল সমস্যাগুলো থেকেই যাবে। বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ক্রমেই আরও অস্থির হয়ে উঠছে। বর্তমানের সংঘাতগুলো এখন আর কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় আটকে নেই বরং একটির প্রভাব দ্রুত অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এর অর্থ হলো ভবিষ্যতে বাইরের এই ধাক্কাগুলো আরও ঘন ঘন আসবে।
একটি শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি ছাড়া বাংলাদেশ পরিস্থিতির শিকার হয়েই থাকবে। এমন অবস্থায় সংকট আসার পর তা সমাধানের চেষ্টা করা হবে কিন্তু আগে থেকে প্রস্তুতির সুযোগ থাকবে না। আর এর বড় খেসারত দিতে হয়। অর্থনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক অসন্তোষ এবং কূটনৈতিক গুরুত্ব হারিয়ে ফেলা কেবল তাত্ত্বিক ঝুঁকি নয় বরং এগুলোই এখন কঠিন বাস্তবতা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই ঝুঁকিগুলো ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গির পথে
ইরান যুদ্ধ থেকে যদি কোনো শিক্ষা নেওয়ার থাকে, তবে তা হলো—বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। এর অর্থ এই নয় যে প্রাগম্যাটিজম বিসর্জন দিতে হবে, বরং একে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। বাস্তববাদ মানে সব ধরনের ঝুঁকি এড়িয়ে চলা নয়; বরং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে ঝুঁকিগুলো সঠিকভাবে মোকাবিলা করা।
বাংলাদেশের জন্য এই নতুন পথ হতে পারে জ্বালানি কৌশলে বৈচিত্র্য এনে পরনির্ভরশীলতা কমানো এবং কেবল তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক স্বার্থের বাইরে গিয়ে আঞ্চলিক অংশীদারিত্ব শক্তিশালী করা। একইসাথে আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্বের বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া এবং বিশ্বমঞ্চে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার মতো কূটনৈতিক সক্ষমতা তৈরি করা প্রয়োজন।
এর কোনোটিই সহজ কাজ নয়। এগুলোর জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং দীর্ঘমেয়াদী অঙ্গীকার প্রয়োজন। তা না হলে বাংলাদেশকে আগের মতোই পরিস্থিতির শিকার হয়ে থাকতে হবে যেখানে কেবল অনিশ্চয়তা, সীমাবদ্ধতা আর ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিই বাড়বে।
পরিশেষে বলা যায়, ইরান যুদ্ধ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন কোনো সমস্যা তৈরি করেনি; বরং আগে থেকে থাকা সমস্যাগুলোকে সামনে এনেছে। যাকে নিরপেক্ষতা বলে মনে হচ্ছে, তা আসলে বেছে বেছে সতর্কতা অবলম্বন করা। যাকে বাস্তববাদ হিসেবে চালানো হচ্ছে, তা মূলত পরনির্ভরশীলতারই নামান্তর। আর যাকে ভারসাম্য বলা হচ্ছে, তা আসলে সিদ্ধান্তহীনতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
বিরামহীন অনিশ্চয়তার এই বিশ্বে এই ধরনের নীতি নিয়ে টিকে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। পররাষ্ট্রনীতি কেবল বর্তমান পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেওয়া নয়, বরং ভবিষ্যতের প্রস্তুতি নেওয়ার নামও বটে। বাংলাদেশ এই মুহূর্তে এই দুটির কোনোটি করতেই হিমশিম খাচ্ছে। আর ঠিক এ কারণেই বর্তমান সময়টিকে এক ধরনের ‘দেউলিয়া দশা’ বলে মনে হয়। এটি কোনো হঠাৎ ঘটা ধস নয়, বরং সক্ষমতা, স্বচ্ছতা আর আত্মবিশ্বাসের ক্রমে ঘটে চলা এক ক্ষয়।
প্রশ্ন হলো—এই সংকট কি আমাদের জন্য কোনো মোড় পরিবর্তনকারী হিসেবে দেখা দেবে, নাকি স্রেফ আরও একটি হাতছাড়া হওয়া সুযোগ হয়েই ইতিহাসে লেখা থাকবে।
সূত্রঃ Middle East Monitor
লেখাঃ ড. মুহাম্মদ নুরুজ্জামান
তরজমা : শাহেদ হাসান, রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, দ্য মুসলিম মাইন্ডস












Comments