নতুন ডিপ্লোমা প্রোগ্রাম ২০২৬ শুরু হয়েছে! ক্রিটিক্যাল সোশ্যাল থট অ্যান্ড ইসলামিক ট্র্যাডিশন ডিপ্লোমা সম্পর্কে জানুন → নতুন ডিপ্লোমা প্রোগ্রাম ২০২৬ — ডিপ্লোমা সম্পর্কে জানুন →

ইসলামি ঐতিহ্য

মুসলিম কর্তৃত্বের সংকট || ড. ওভামির আনজুম

Share
Share

মুসলিম কর্তৃত্বের সংকট || ড. ওভামির আনজুম

একটি (সুস্থ) ঐতিহ্যের ভূমিকা কী?

একটি ঐতিহ্য তার নিজস্ব বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সমস্যাগুলোর উৎকৃষ্ট সমাধানগুলোকে আলাদা করে এবং সেগুলোকেই আরও বিকশিত করে। একইসঙ্গে, দুর্বল বা খারাপ সমাধানগুলোকে ছেঁটে ফেলে।

সফল কোনো ঐতিহ্যের মূল লক্ষ্য হচ্ছে: সঠিক উত্তর খোঁজা। ইসলামী ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে ‘সঠিক উত্তর’ বলতে বোঝায় আল্লাহর প্রকৃত ইচ্ছা কী ছিল, তা নির্ধারণ করার চেষ্টা। পূর্ববর্তী প্রজন্মের বিতর্ক ও আলোচনাগুলোকে লিপিবদ্ধ ও সংরক্ষণ করে এবং পরবর্তী প্রজন্মে তা আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনার মাধ্যমেই এই কাজটি করা হয়। এতে করে কোন ব্যাপারে ঐকমত্য ছিল আর কোন ব্যাপারে মতবিরোধ ছিল সবকিছু স্পষ্ট হয়ে যায়। সুস্থ ও মজবুত ঐতিহ্যগুলো শুধু সফল মতামতই সংরক্ষণ করে না, বরং ব্যর্থ বা প্রত্যাখ্যাত মতগুলোকেও লিপিবদ্ধ করে রাখে, যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শিখতে পারে; বুদ্ধিবৃত্তিক সততার জন্যও এটি জরুরি।

ধরুন আপনি একটি আয়াত পড়লেন: ‘দ্বীনে কোনো জবরদস্তি নেই।’ আপনি মনে করলেন, এর মানে কাউকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা যাবে না। কিন্তু আপনার উদারপন্থী বন্ধু বলল, না, এর মানে হলো—তোমার ধর্ম তুমি পালন করো, অন্যকে নামাজ পড়তে বা আল্লাহর পথে আসতে বোলো না, কারণ সেটাও একধরনের মানসিক চাপ সৃষ্টি। আরেকজন বলল, আয়াতটার মানে হলো মুসলমানদের ইসলাম ছাড়তে বাধ্য করা যাবে না, কিন্তু কাউকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা ঠিক আছে।

এখন প্রশ্ন হলো, আপনি কীভাবে বুঝবেন আয়াতটির প্রকৃত অর্থ কী? আপনি কি বলবেন, ‘যার যা ইচ্ছা বুঝুক’?

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এটাই অনেক তরুণ মুসলমানের সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ? তারা ‘সঠিক উত্তরটি’ শুনেছে ঠিকই—হয়তো তাদের বাবা-মা কিংবা মসজিদের ইমামের কাছ থেকে—কিন্তু তারা তা বিশ্বাস করতে পারেনি। কারণ, সেসব ব্যাখ্যা অনেক সময় ছিল অত্যন্ত দুর্বল: ‘আমি তোমার বাবা, আমাকে মানতে হবে,’ বা ‘কারণ এটাই একমাত্র সঠিক ব্যাখ্যা।’ কখনো কখনো কেউ ভাষাগত বা প্রেক্ষাপটভিত্তিক যুক্তি দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যায়—‘আমি কেন তোমার ব্যাখ্যা বিশ্বাস করব, আর অন্য কারওটা নয়?’ এই প্রশ্নটাই আজকের অসংখ্য তরুণ মুসলমানের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।

প্রশ্নের উত্তর অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়, যদি তা একটি দীর্ঘস্থায়ী, আত্মসমালোচনামূলক, শক্তিশালী ও যুক্তিভিত্তিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে দেওয়া হয়। তাই আমি একক কোনো ব্যাখ্যার বদলে বলি এই আয়াত ও অন্যান্য আয়াত বা হাদিস নিয়ে জ্ঞানী আলেমদের শত শত বছরের গবেষণা আছে। তাঁরা আয়াতটির সবদিক বুঝতে চেষ্টার কোনো কমতি রাখেননি। অন্য আয়াতের সঙ্গে এর সম্পর্ক, রাসূল ﷺ এবং সাহাবিদের আচরণ সব বিশ্লেষণ করে গেছেন। অনেক সময় তাঁরা একটিমাত্র উত্তর দেননি, কিন্তু তাঁদের প্রতিটি আলোচনার রেকর্ড রাখা হয়েছে, যাতে ঐকমত্য ও মতবিরোধ উভয়ই স্পষ্ট থাকে।

আজ আপনি যদি কোনো ব্যাখ্যা নিয়ে আসেন, কাল আপনার চেয়েও বুদ্ধিমান কেউ তার চেয়েও উন্নত ব্যাখ্যা দিতে পারে। কিন্তু আপনি যদি জানেন যে, এই চিন্তাগুলো আগেই অনেক বেশি যোগ্য এবং কুরআনের যুগের নিকটবর্তী মানুষেরা করে গেছেন—তবে হয়তো নিজের ব্যাখ্যার ওপর আপনি এতটা অতি-আত্মবিশ্বাসী থাকতেন না। আপনি একা থাকলে আপনি আর আপনার বন্ধুরা হয়তো কখনোই কোনো বিষয়ের ওপর একমত হতে পারবেন না। কিন্তু ঐতিহ্য আপনাদের জন্য হয়তো একটিমাত্র উত্তর না-ও দিতে পারে, তবে এটি সুসংগঠিত মতবিরোধ ও দিকনির্দেশনা দিতে সক্ষম, যা আপনাদের উত্তম সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।

আপনি যদি কুরআনের ভাষা শিখতে শুরু করেন, ইতিহাস বোঝেন, সম্পর্কিত সব আয়াত ও হাদিস পড়েন, আর ফিকহ ও দার্শনিক আলোচনার জটিলতা বুঝে নিতে চান তাহলে জীবনের অনেকটা সময় আপনাকে এই সাগরে ডুবে থাকতে হবে। সেই পথে এমন সব স্কলারদের সম্মুখীন হবেন, যাঁদের জ্ঞান, নিষ্ঠা ও প্রতিভা দেখে আপনি অভিভূত হবেন। এটাও আল্লাহর একটি নিদর্শন। এতসব পড়ার পর নিজের ব্যাখ্যা নিয়ে গর্বে মত্ত থাকার কোনো সুযোগই আপনি পাবেন না। ইসলামী ঐতিহ্য এমনকি কঠোরতম হৃদয়কেও বিনয়ী করে তোলে।

শুধু মতবিরোধই নয়, ইসলামী ঐতিহ্যের মধ্যে যে বিশাল পরিমাণে ঐকমত্য সম্ভব হয়েছে তা আরও অনুপ্রেরণাদায়ক। অন্য অনেক ধর্মীয় ঐতিহ্যের চেয়ে বেশি মতবিরোধের স্বাধীনতা থাকা সত্ত্বেও, প্রাথমিক যুগের মুসলমানরা বিস্ময়করভাবে বহু বিষয়ের ওপর একমত হতে পেরেছিলেন।

ইসলামী ঐতিহ্যের সবচেয়ে বড় গৌরব—বিশেষ করে সুন্নি ঐতিহ্যে—হলো বিভিন্ন মাজহাব বা ফিকহি স্কুলের পারস্পরিক স্বীকৃতি ও সম্মান। ঐতিহ্যের লক্ষ্য হলো একমত হওয়া। আর যদি তা না-ও হয়, তবে মতবিরোধকে সুবিন্যস্ত ও শ্রেণিবদ্ধ করা। হানাফি, মালিকি, শাফিঈ ও হাম্বলি—এই চারটি প্রসিদ্ধ মাজহাবকে সুন্নিরা সমানভাবে গ্রহণ করে। আমার জানামতে দুনিয়ার আর কোনো ধর্মীয় ঐতিহ্যে এমন পারস্পরিক শ্রদ্ধাশীল সহাবস্থান দেখা যায় না।

ইমাম শাফিঈ (রহ.)-এর বিখ্যাত কথাটি এই মানসিকতার চূড়ান্ত উদাহরণ:

‘আমার মত সঠিক, কিন্তু ভুল হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আর আমার প্রতিপক্ষের মত ভুল, কিন্তু সঠিক হওয়ার সম্ভাবনাও আছে।’

চার সংখ্যাটি কোনো জাদুকরি সংখ্যা নয়। চারটি মাজহাব টিকে আছে ও বিকশিত হয়েছে মানুষের নিরন্তর চেষ্টার মাধ্যমে এবং পুরো উম্মাহ এগুলোকে গ্রহণ করার কারণে। আমাদের সুন্নি ব্যাখ্যাগুলোর মধ্যে চার বা তার চেয়েও বেশি মাজহাব পারস্পরিক স্বীকৃতি দিয়ে চলে—এই বিষয়টি আমাদের জন্য গর্বের। এই ব্যবস্থাই ইসলামকে এমন এক কঠোর শাসনে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করেছে, যেখানে কোনো এক সরকার, কোনো এক শ্রেণির আলেম, বা কোনো এক পরিবারের হাতে পুরো ধর্ম বন্দী হয়ে যায়। খ্রিষ্টান ইউরোপের ইতিহাসে ধর্মের নামে দীর্ঘকাল ধরে যে নিপীড়ন চলে এসেছিল, এবং যার ফলে পরবর্তীকালে ধর্মের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়—ইসলামে এমনটা কখনোই ঘটেনি।

আমার তরুণ শ্রোতারা খুব উৎসাহ পেয়েছিল (যদিও কিছুটা তথ্যভারে ভারাক্রান্তও বোধ করেছিল)। আমি খুশি ছিলাম যে তারা আবার এমন আড্ডা ও আলোচনার জন্য আমাকে ডাকার আগ্রহ দেখিয়েছে। কারণ এমন আলোচনা, জ্ঞান বিনিময় ও বোঝাপড়ার চর্চাই হলো আমাদের মধ্যপন্থী ঐতিহ্যের মূল সুর।

একটি উপমা: ঐতিহ্য মানে একটা শহর

আধুনিক দুনিয়ায় ‘ঐতিহ্য’ অনেকটাই অপরিচিত বিষয়, এমনকি ধর্মীয় ঐতিহ্যের অনুসারীদের কাছেও। যারা মুসলিম ঐতিহ্য মেনে চলে, তারাও অনেক সময় জানে না এই ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে, কেন এটা মহৎ, আর কীভাবে একটা ঐতিহ্য দুর্বল বা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে।

যখন কোনো ঐতিহ্য বহিরাগত আক্রমণ বা অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খল মতপার্থক্যে আক্রান্ত হয়, তখন সেটার প্রভাব ও প্রেরণা হারিয়ে যায়—কখনো সেটা দমনমূলক হয়ে ওঠে, কখনো আবার একেবারেই নির্জীব ও প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলে। আধুনিক যুগের আগে অধিকাংশ সভ্য জাতিই ধর্মীয় ঐতিহ্যের ভেতরে থেকে জীবন চালাতো। কখনো ঐতিহ্য হতো শক্তিশালী, উদার ও চিন্তাশীল, কখনো বা সংকীর্ণ ও গোঁড়া। কিছু ঐতিহ্য সত্যের ওপর দাঁড়ানো ছিল (ইসলাম), কিছু বিকৃত বা হারিয়ে গিয়েছিল (খ্রিষ্টধর্ম, ইহুদিধর্ম)।

বর্তমান যুগে যেহেতু ‘জীবন্ত ও কার্যকর ঐতিহ্য’ অনেকটাই অচেনা, তাই ইতিহাস বা প্রথাগত জ্ঞানের বিশেষজ্ঞ না হয়েও এটি বোঝার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো একটি উপমা ব্যবহার করা। ধরুন, ইসলামী ঐতিহ্য হলো একটা শহর।

মহান আল্লাহর পরিকল্পনায়, নবী ﷺ-এর মাধ্যমে এই শহরটি গড়ে উঠেছিল। এরপর সময়ের সাথে সাথে এই শহর বড় হয়েছে; নতুন মানুষ, নতুন দিক, নতুন ভবন এসেছে।

একটা সফল শহর নানা ধরনের মানুষ, পেশা, রুচি আর চাহিদাকে জায়গা দেয়। তবুও, সেটি একটি সামগ্রিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, যেখানে নেতৃত্ব থাকে, সম্পদ থাকে, শৃঙ্খলা ও একসঙ্গে চলার ব্যবস্থাও থাকে। এই শহরে নতুন প্রজন্ম এসে নতুন ভবন নির্মাণ করে, পুরনোগুলো মেরামত করে, এবং কখনো ভুল করেও কিছু ভবন গড়ে তোলে। যুদ্ধ, মহামারী, আগ্রাসন—সবই শহরের ওপর আঘাত হানে, কিন্তু এসব পেরিয়ে শহর যদি টিকে যায়, তবে সেটা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

এই শহরটাকেই আপনি ইসলাম হিসেবে ধরে নিন। ইসলামের প্রাথমিক গাইডলাইন—কুরআন ও সুন্নাহ—একটি আলোকিত পথ দেখায়, কিন্তু সেখানে সবকিছু আগে থেকেই তৈরি করা নেই। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেই সেই ভিত্তির ওপর ভবন গড়তে হয়েছে, নতুন সমস্যার সমাধান করতে হয়েছে।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম নিজেদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও প্রয়াস দিয়ে এই শহরকে বড় করেছে। কিছু ভবন ঠিকঠাক হয়েছে, কিছু হয়তো ভুল পদ্ধতিতে তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ এই ঐতিহ্যকে মেরামত করেছে, কেউ সৌন্দর্য বাড়িয়েছে, কেউ আবার বিকৃত করেছে। কিন্তু তারপরও এই শহর চলছে।

তবে, যদি শহরের অবকাঠামো মানুষের সংখ্যা ও তাদের চাহিদা মেটাতে না পারে, তবে মানুষ সেখান থেকে অন্য কোথাও চলে যায়। তারা হয়তো গিয়ে নতুন জায়গা বেছে নেয়। মাঝে মাঝে পুরনো শহরে ছুটি কাটাতে বা আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করতে ফিরে আসে ঠিকই, কিন্তু তারা আর সেটাকে ‘বাড়ি’ মনে করে না।

আজ অনেকেই ইসলামের ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে অথবা শুধু মুখে সম্মান জানায়—তবে কুরআন ও সুন্নাহকে ধরে রাখে। এটা এমন, যেন কেউ গোটা শহরটাই ভেঙে ফেলে কেবল এই ভেবে যে কিছু ভবন ঠিকমতো কাজ করছে না, আর তারপর চেষ্টা করে দেড়-দুই বিলিয়ন মানুষকে একটা ছোট কটেজে ঠেসে দিতে! অবশ্যই, সেই প্রাথমিক ভিত্তি ও দিকনির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এর পাশাপাশি প্রজন্মের পর প্রজন্মের জ্ঞান, চেষ্টা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই তো আজকের মুসলিম বিশ্বের কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে।

হ্যাঁ, কিছু ভবন হয়তো আজ খারাপভাবে তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ, কিছু ঐতিহ্যগত ব্যাখ্যা হয়তো কুরআনের মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে গেছে। কিন্তু আল্লাহর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, “সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের” ধারাবাহিকতার মাধ্যমে উম্মাহ আল্লাহর পথে এগিয়ে গেলে, ভুলগুলো ঠিক হয়ে যাবে।

এই ইসলামী ঐতিহ্যের শহরই হলো আল্লাহর শেষ ও চূড়ান্ত আলো ছড়ানোর কেন্দ্র। যদি কিছু অংশ পুনর্গঠন করতে হয়, পুরনো সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে হয়, তবুও এই শহর পুরোপুরি ফেলে দিয়ে নতুন করে কিছু শুরু করা সম্ভব নয়। তা না হলে আমরা লাখো-কোটি মানুষকে এমন এক মরুভূমির মধ্যে ছেড়ে দেব, যার একদিকে দুনিয়ার মোহের আগুন, আর অন্যদিকে ইসলামের শত্রুদের তীব্র শীতলতা। সংস্কার দরকার হলে তা ঐতিহ্যের মূল আত্মা বোঝার ভিত্তিতেই হতে হবে। অন্ধভাবে বাইরের স্থাপত্য নকল করলে সেটা হবে বিপজ্জনক—যেমন উত্তরের বরফে একটা সৈকতের উপযোগী ঘর বানানো।

আজ মানুষ দলবদ্ধভাবে ইসলামী ঐতিহ্যের শহর ছেড়ে দিচ্ছে—যেভাবে একসময় এ শহরে ঢুকেছিল। নামটা মুসলিম রয়ে গেছে, মাঝে মাঝে জন্ম, মৃত্যু বা বিয়ের সময় ঐতিহ্যের শহরে ঘুরে যায়, কিন্তু সেটাকে আর নিজের বাড়ি মনে করে না।

তাহলে প্রশ্ন হলো, আমরা কীভাবে আল্লাহর এই শহরকে আবার প্রাণবন্ত ও শক্তিশালী করতে পারি?

আমাদের জন্য এই ঐতিহ্য অপরিহার্য

আমার এই আলোচনার মাধ্যমে হয়তো উত্তর দেওয়ার চেয়ে আরও বেশি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেটাই ছিল আমার উদ্দেশ্য। সব প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর দেওয়া আমার লক্ষ্য নয়, বরং আমি চাইছি আমরা যেন সঠিক দৃষ্টিকোণ (paradigm) থেকে এই প্রশ্নগুলো করি। আমি এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার চাইছি, যার মধ্য দিয়ে আমরা সেই পুরাতন ‘জ্ঞান-নগরী’র ভেতর থেকেই আজকের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে পারি। আমরা যেন আবার নতুন করে একটা ঝুপড়ি শহর বানাতে না যাই, কিংবা পুরোনো শহরটাই ফেলে না দিই।

গত দুই শতকে মুসলিমদের মাঝে অনেক সংস্কারবাদী ও আধুনিকতাবাদী চিন্তাবিদ আবির্ভূত হয়েছেন। কিন্তু এদের মধ্যে কেবল তারাই দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলতে পেরেছেন, যারা এই ঐতিহ্যের শহরকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেছেন। আমি যুক্তি দিয়েছি, যতো সমস্যাই থাকুক না কেন, ইসলামী ঐতিহ্য ছেড়ে দিলে ইসলামকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

ইসলামী ঐতিহ্য: একটি জীবন্ত বয়ান

আমার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হলো—ইসলামী ঐতিহ্য এমন কিছু নির্দিষ্ট প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তরের তালিকা নয়। বরং এটি হচ্ছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ঈমানদার আলেমদের মধ্যে চলা এক বিস্তৃত, বিকশিত ও চলমান আলোচনার জাল। এই ধারাবাহিক আলাপের মাধ্যমেই অনেক বিষয়ে চূড়ান্ত ঐকমত্য গড়ে উঠেছে, কিছু ভ্রান্ত মতবাদ স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, আবার অনেক বিষয়ে মতভেদও থেকে গেছে—কিন্তু সেসবও একটি নিয়মবদ্ধ ও সংরক্ষিত আলোচনার আওতায় এসেছে।

উপনিবেশবাদী আক্রমণের পর থেকে মুসলিমরা ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, তবু এই যুগটি একইসঙ্গে এক নবজাগরণ, প্রতিরোধ, পুনর্বিবেচনা ও পুনর্গঠনের যুগও বটে। হ্যাঁ, এই যুগে কিছু ভণ্ড, উগ্রবাদী, ক্ষমতালোভী আর আল্লাহর আয়াতকে বিক্রি করে খাওয়া মানুষও ছিল, যেমনটা নবী ﷺ আগেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। কিন্তু আপনি যদি জ্ঞানের গভীরে নেমে যান, সংগ্রামের প্রান্তরে যান, তাহলে সেখানে আপনি এমন সব আলেম ও সাধারণ মুসলমানকে পাবেন, যারা জ্ঞান ও ঈমানের দুর্গস্বরূপ। যারা অবিশ্বাস আর নিপীড়নের ঝড় সামলায় এমন এক ঈমান নিয়ে, যা পাহাড়ও টলিয়ে দিতে পারে।

নাহলে বলুন তো, কীভাবে ইসলাম আজও বিশ্বের সবচেয়ে জীবন্ত ধর্মগুলোর একটি হয়ে আছে? বরং, একমাত্র বিশ্বধর্ম হিসেবে ইসলামই এমন, যা আধুনিক যুগের ধর্মহীনতা ও ভোগবাদিতার ঢেউকে শুধু মোকাবিলাই করেনি, বরং অনেক ক্ষেত্রেই তা উল্টো ঘুরিয়ে দিয়েছে। কেউ কেউ বলেন, ধর্মনিরপেক্ষ মানববাদী ভোগবাদিতার বিরুদ্ধে ইসলামই এখন একমাত্র সভ্যতাগত বিকল্প।

আমি যখন বলি, ‘ইসলামী ঐতিহ্য আমাদের জন্য অপরিহার্য’, তখন আমি এও বোঝাতে চাই না যে সব মুসলমানকেই এখন প্রাচীন গ্রন্থে পারদর্শী আলেম হয়ে যেতে হবে। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা; এর মধ্যে রাজনীতি, দাওয়াত, নির্মাণ, চিকিৎসা, আবিষ্কার, পুনরুদ্ধার, বিজ্ঞান ও শিল্প—সবকিছুই রয়েছে। তবে আমি যে দিকটির দিকে ইঙ্গিত করছি, তা হলো, আমাদের জ্ঞানের মূল উৎস এবং চিন্তার প্রাণকেন্দ্র। এই জায়গাটা যদি আমরা হারিয়ে ফেলি, তাহলে আমাদের চিন্তাজগৎ শূন্য হয়ে যাবে, আমাদের নৈতিকতা মরীচিকার মতো নিষ্প্রাণ হয়ে যাবে। অথচ এই জায়গাটিই হওয়া উচিত আমাদের জীবনচর্চার কেন্দ্রবিন্দু, যেটি আজকের দিনে অধিকাংশ মুসলমানের কাছে দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিস্মৃত ও উপেক্ষিত।

এই জ্ঞান-ঐতিহ্যের রূপক শহরকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে আমাদের প্রথম কাজ হলো—এ শহরে আবার স্থায়ীভাবে ফিরে আসা। হ্যাঁ, বাকি বিশ্বের চিন্তাভাবনা, দর্শন ও জ্ঞান থেকেও আমরা অনুপ্রেরণা নিতে পারি। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে—আমরা এক মহান শহরের অংশ, যা গঠিত হয়েছে আল্লাহর পরিকল্পনায়; যার সৌন্দর্য, আলো ও বীরত্ব ইতিহাসের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে। এই শহরকে গড়ে তোলা হয়েছিল নির্দিষ্ট আদর্শের ওপর ভিত্তি করে, আর সেই আদর্শ মেনে চললেই সে শহর নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারবে, আরও এগিয়ে নিতে পারবে।

তাই যখন আপনি ঐতিহ্যের শহরের দিকে তাকাবেন, তখন বুঝতে হবে—এই শহরের দালানকোঠাগুলো তৈরি করেছিলেন সেসব মানুষ, যারা আল্লাহর নকশার ওপর ঈমান রেখে নিজেদের সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে নির্মাণ করেছিলেন। এদের কেউ ছিলেন পুরুষ, কেউ নারী—সবাই গভীর মেধা ও অটল ভালোবাসা নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন এই নগরী। এখন আমরা যদি এটাকে সংস্কার করতে চাই, তবে আমাদের বুঝতে হবে, এই শহরের অতীত কাঠামো কেমন ছিল, তাদের নির্মাণের পেছনে কী প্রজ্ঞা ও রূহানী স্পৃহা কাজ করেছিল। হয়তো আজকের চোখে কিছু ভবন পুরনো ও বিধ্বস্ত লাগছে, কিন্তু এর নির্মাতাদের অন্তর্দৃষ্টি ও ঈমানী তেজ আমাদের বুঝতে হবে, তা না হলে কিছুই গড়া যাবে না।

মূল নিবন্ধ : https://www.aljumuah.com/the-crisis-of-authority-among-muslims-rediscovering-islamic-tradition-dr-ovamir-anjum/
তরজমা – সিদ্দিকে আকবর

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *