মুফতি শামাইল বনাম জাভেদ আখতার: নাস্তিকতার সীমারেখা

মুফতি শামাইল নদভি বনাম জাভেদ আখতার। দক্ষিণ এশিয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে এই দুই মেরুর বিতর্ক এড়িয়ে যাওয়া এখন প্রায় অসম্ভব। সাম্প্রতিক সময়ে এই আলোচনাটি এতটাই তুঙ্গে যে, চায়ের টেবিল থেকে সোশ্যাল মিডিয়া সবখানেই এটি আলোচনার খোরাক জোগাচ্ছে। তবে সব বড় ঘটনার মতোই এই বিতর্ক নিয়েও নানা মহলে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ আর সমালোচনা।
বিশেষ করে আকরাম নদভির মতো সংস্কারবাদী ঘরানা কিংবা ওয়াহাবি মতাদর্শের অনুসারীদের মধ্যে এক ধরনের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এই বিতর্কের সংস্কৃতি এবং পুরো আয়োজনটি নিয়েই তারা এক ধরনের তাচ্ছিল্য বা বিদ্রূপাত্মক অবস্থানে রয়েছেন। এর পাশাপাশি উগ্র জাতীয়তাবাদী কিছু পক্ষও এই বিতর্কে নেতিবাচক রং চড়ানোর চেষ্টা করছে।
কিন্তু নেতিবাচকতাকে ছাপিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে এই বিতর্ক দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। প্রচারের মাত্র কয়েক দিনেই এটি কয়েক মিলিয়ন ভিউ কুড়িয়েছে। ইউটিউবের বিভিন্ন চ্যানেল আর রিআপলোড হওয়া ক্লিপগুলো হিসেব করলে দেখা যায়, দর্শকসংখ্যা এরই মধ্যে কোটির ঘর ছাড়িয়ে গেছে। তবে শুধু সংখ্যাই শেষ কথা নয়; বিভিন্ন সূত্রের দাবি, এই বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেকেই ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন।
উর্দু ও হিন্দিভাষী দর্শকদের একটি বড় অংশ মনে করছে, মুফতি শামাইল নদভি কেবল তর্কেই জেতেননি, বরং তাঁর চমৎকার যুক্তি ও উপস্থাপনার স্বচ্ছতা প্রতিপক্ষকে ম্লান করে দিয়েছে। তাঁর সাবলীল বয়ান সাধারণ মানুষের কাছে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য ও সংগতিপূর্ণ মনে হয়েছে।
অন্যদিকে জাভেদ আখতারের অবস্থানটাও কম শক্তিশালী নয়। ভারতের সাংস্কৃতিক জগতে তিনি এক প্রকাণ্ড নাম। কেবল একজন সোচ্চার নাস্তিক হিসেবেই নয়, বরং একজন মেধাবী সাহিত্যিক হিসেবেও তাঁর কদর সর্বত্র। এক সময় সেলিম খানের সাথে জুটি বেঁধে তিনি বলিউডের চলচ্চিত্রের যে ‘ফর্মুলা’ তৈরি করে দিয়েছিলেন, তা আজও ভারতীয় সিনেমার ভিত্তি হয়ে আছে। নব্বইয়ের দশক থেকে তিনি নিজেকে একজন দাপুটে গীতিকার ও কবি হিসেবেও অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
যুক্তি আর দর্শনের লড়াই: জাভেদ আখতার কি তবে খেই হারিয়ে ফেললেন?
যাঁরা মুফতি শামাইল নদভি আর জাভেদ আখতারের সেই বহুল আলোচিত বিতর্কটি আদি ভাষায় (উর্দু) মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন, তাঁরা দর্শনের এক মারপ্যাঁচ লক্ষ্য করে থাকবেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ঈশ্বরবাদ আর নাস্তিক্যবাদ নিয়ে কথা বললেও জাভেদ আখতারের বক্তব্যে এক ধরনের তাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে দর্শনের অতি মৌলিক দুটি ধারণা—‘কন্টিনজেন্সি আর্গুমেন্ট’ (সাপেক্ষ অস্তিত্বের যুক্তি) এবং ‘ইনফিনিট রিগ্রেস’ (অনন্ত কার্যকারণ পরম্পরা)—সম্পর্কে তিনি নিজের অজ্ঞতা স্বীকার করে নিয়েছেন। অথচ ইসলামিক থিওলজি বা ইলমুল কালামের জগতে এগুলো শত বছরের পুরনো ভিত্তি।
‘সাপেক্ষ সত্তা’ হলো এমন কিছু যা নিজে নিজে অস্তিত্ব লাভ করতে পারে না, বরং অন্য কিছুর ওপর নির্ভরশীল। যেমন—মানুষ, গাছপালা বা মহাবিশ্ব। এগুলো থাকতেও পারত, আবার নাও থাকতে পারত। কিন্তু যুক্তির খাতিরেই এমন একজন ‘আবশ্যিক সত্তা’র প্রয়োজন হয়, যিনি নিজে কারও ওপর নির্ভর করেন না, কিন্তু তাঁর মাধ্যমেই অন্য সব কিছুর অস্তিত্ব সম্ভব হয়। ইসলামি দর্শনে একেই বলা হয় ‘ওয়াজিবুল ওয়াজুদ’ বা আল্লাহ। বিতর্কটি বিজ্ঞান বা মহাবিশ্বের সৃষ্টি নিয়ে ছিল না, বরং ছিল এর অস্তিত্বের পেছনের সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে।
ইসলামিক দর্শনের ইতিহাসে বিতর্কিত অনেক পণ্ডিতও কিন্তু এই যুক্তির ধারে বেশ ধারালো ছিলেন। এমনকি ইবনু সিনার মতো দার্শনিকও—যাঁর অনেক মতামত নিয়ে আলেমদের কড়া আপত্তি আছে—তিনিও এই ‘সাপেক্ষতা ও আবশ্যিকতা’র ধারণাটি নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁর মতে, যত বিশাল মহাবিশ্বই হোক না কেন, সেটি নিজে নিজের স্রষ্টা হতে পারে না। ঠিক যেমন অনেকগুলো শূন্য যোগ করলে কখনো ‘এক’ পাওয়া যায় না, তেমনি অনেকগুলো নির্ভরশীল সত্তা মিলে কখনো একটি স্বাধীন অস্তিত্ব তৈরি করতে পারে না। অস্তিত্বের এই শেকলকে অবশ্যই এমন একজনের কাছে গিয়ে থামতে হবে, যিনি নিজেই অস্তিত্বের উৎস।
এখানেই আসে ‘অনন্ত কার্যকারণ পরম্পরা’ বা ইনফিনিট রিগ্রেসের বিষয়টি। ইমাম গাজালির মতে, আপনি যদি শুধু কারণের পেছনে কারণ খুঁজতে থাকেন আর এর কোনো শেষ না থাকে, তবে শেষ পর্যন্ত কোনো ব্যাখ্যাই পাওয়া যাবে না। কোনো কাজের অনুমতি যদি অনন্তকাল ধরে একজনের পর একজন দিতেই থাকে এবং শেষ পর্যন্ত কেউ মূল হুকুম না দেয়, তবে সেই কাজ কোনোদিনই শুরু হবে না। অস্তিত্বের বেলাতেও বিষয়টি ঠিক তাই।
ইমাম ফখরুদ্দীন রাজি দেখিয়েছিলেন, মহাবিশ্ব যদি অনাদি কাল ধরে চলেও আসে, তবুও তাকে বর্তমান অবস্থায় টিকে থাকার জন্য একজন ‘আবশ্যিক সত্তা’র মুখাপেক্ষী হতেই হবে।
অনেকেই ভুল করে বিজ্ঞানের ডেইটা আর দর্শনের যুক্তিকে এক পাল্লায় মাপতে চান। মুফতি শামাইল এই তফাতটাই স্পষ্ট করেছেন। বিজ্ঞান কেবল মহাবিশ্বের কার্যকর প্রক্রিয়া বা নিয়মগুলো ব্যাখ্যা করে। কিন্তু কোনো কিছু অস্তিত্বহীন থাকার বদলে কেন অস্তিত্বশীল হলো—এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞানের আওতায় নেই; এটি পুরোপুরি দর্শনের বিষয়।
বিজ্ঞান বা বিবর্তনবাদের দোহাই দিয়ে মহাবিশ্বের এই যৌক্তিক বিচারকে উড়িয়ে দেওয়া মূলত এক ধরনের ‘ক্যাটাগরি এরর’ বা শ্রেণিগত ভুল। মুফতি শামাইল যে ‘সাপেক্ষ অস্তিত্বের যুক্তি’ দিয়েছেন, তার লক্ষ্য মহাবিশ্বের বিবর্তন বা গতির ব্যাখ্যা দেওয়া নয়; বরং মহাবিশ্বের খোদ অস্তিত্বের পেছনের সত্যটি খুঁজে বের করা। এই যুক্তিটি নাস্তিক্যবাদকে এমন এক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়, যার উত্তর দেওয়া বিজ্ঞানের নিজস্ব সীমাবদ্ধতার কারণেই অসম্ভব। বিজ্ঞান বলে মহাবিশ্ব কীভাবে চলে, কিন্তু কেন মহাবিশ্ব অনস্তিত্বের বদলে অস্তিত্বশীল হলো—সেই ‘কেন’র উত্তর বিজ্ঞানের কাছে নেই।
মুফতি শামাইলের যুক্তিকে খণ্ডন করতে ভারতের কিছু সমালোচক বৌদ্ধ দার্শনিক নাগার্জুনের ‘শূন্যতা’ (Emptiness) তত্ত্বকে ঢাল হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন। তবে এই চেষ্টা আদতে বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রান্তি ছাড়া আর কিছু নয়। তাঁরা ‘সত্তাতাত্ত্বিক নির্ভরশীলতা’র (Ontological dependency) সাথে ‘সত্তার সেমান্টিক সমালোচনা’কে গুলিয়ে ফেলেছেন। নাগার্জুনের দর্শন ছিল মূলত কোনো বস্তুর ‘স্থূল সারবত্তা’ বা ‘স্বভাব’ (Svabhava) ধারণার বিরুদ্ধে, যুক্তির মূল ভিত্তির বিরুদ্ধে নয়।
ঈশ্বরবাদকে ঠেকাতে ‘মাধ্যমিক’ (Madhyamaka) দর্শনের এই অপপ্রয়োগ এমন এক সর্বগ্রাসী সংশয়বাদ তৈরি করে, যা কেবল ঈশ্বরবাদকেই নয়, স্বয়ং যুক্তি এবং বিজ্ঞানের ভিত্তিকেও অর্থহীন করে দেয়। সমালোচকদের বৌদ্ধ দর্শনের এই দোহাই কোনো নিষ্ঠাবান তাত্ত্বিক অবস্থান থেকে আসেনি; বরং এটি মুফতি শামাইলকে ঠেকানোর এবং ইসলামি দর্শনের মূল কাঠামোতে আঘাত হানার একটি কৌশল মাত্র।
নাগার্জুন তাঁর বক্তব্যগুলো একটি সুনির্দিষ্ট দার্শনিক কাঠামোর ভেতর থেকেই দিয়েছেন। তিনি কার্যকারণ সম্পর্ককে অভিজ্ঞতাবাদ বা সায়েন্টিজমে বিলীন করতে চাননি। তাঁর লক্ষ্য ছিল বস্তুর সারবত্তার স্থূল ধারণাকে ভেঙে আরও গভীর ও ইন্দ্রিয়াতীত এক বাস্তবতার ইঙ্গিত দেওয়া—যাকে বৌদ্ধ পরিভাষায় ‘বুদ্ধত্ব’ বলা হয়। তিনি অনড় সত্তা বা ‘বস্তুকরণ’ (Reification) ধারণার বিরোধী ছিলেন, কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যার নয়।
নিশ্চিতভাবেই তাঁর দর্শন আধুনিক যুগের সেই সেকুলারদের হাতে পড়ার জন্য তৈরি হয়নি, যারা কেবল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বা বিজ্ঞানসর্বস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে বন্দি। নাগার্জুনের দর্শনে এক ধরণের শূন্যতাবাদ থাকলেও, তিনি দৃশ্যমান জগতের উর্ধ্বে কোনো চূড়ান্ত ভিত্তি নেই—এমন এক নিছক বস্তুবাদী কাঠামোকে সমর্থন করতেন, তা কল্পনা করাও কঠিন।
পুরো আলোচনা শেষে একটা বিষয় পরিষ্কার বোঝা গেছে। এই বিতর্ক কেবল দুটি ভিন্ন মতের লড়াই ছিল না। তাদের পড়াশোনারও গভীর পার্থক্য ছিল। মুফতি শামাইল পুরো সময়জুড়ে একটি শক্ত তাত্ত্বিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে কথা বলেছেন। তিনি খুব সহজভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন, বিজ্ঞান আর দর্শন এক জিনিস নয়। বিজ্ঞান বলে বস্তু কীভাবে কাজ করে, আর দর্শন খোঁজে এই অস্তিত্বের পেছনের আসল কারণ। দুই জগতের এই ফারাকটা তিনি নিপুণভাবে ধরতে পেরেছেন।
অন্যদিকে জাভেদ আখতারের নাস্তিক্যবাদ মূলত দাঁড়িয়ে ছিল তাঁর দীর্ঘদিনের চেনা কিছু ধ্যান-ধারণা আর আবেগের ওপর। তিনি তর্কের খাতিরে পৃথিবীতে ‘দুঃখ-কষ্ট কেন থাকে’—এই পুরনো প্রশ্নটিকেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। কিন্তু মুফতি শামাইল যেসব গভীর দার্শনিক যুক্তি তুলে ধরেছেন, সেগুলোর গূঢ় কাঠামো বোঝার মতো কোনো প্রস্তুতি জাভেদ আখতারের মধ্যে দেখা যায়নি। ফলে তাত্ত্বিক আলোচনায় তিনি অনেকটা খেই হারিয়ে ফেলেছিলেন।
উপযোগিতার ঊর্ধ্বে সৌন্দর্য: আফরিন আফরিন বনাম ডারউইন
এখানে আরেকটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন তোলা যায়। জাভেদ আখতারকে আমরা যে মাপের শিল্পী হিসেবে চিনি, তিনি যদি আদ্যোপান্ত কোনো কঠোর নাস্তিক পরিমণ্ডলে বড় হতেন, তবে কি তাঁর এই শিল্পীসত্তার আদৌ বিকাশ ঘটত? প্রশ্নটি তাঁর আন্তরিকতা নিয়ে নয়; বরং তাঁর শিল্পবোধ তৈরির পেছনের কারিগরটি কে, তা খোঁজার একটি চেষ্টা করব।
প্রকাশ্যে নাস্তিক হলেও জাভেদ আখতার আদতে উত্তর ভারতীয় ‘ইসলামি-উর্দু’ বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যেরই এক অনন্য সৃষ্টি। তাঁর পারিবারিক চিন্তাধারার শেকড় খুঁজলে আল্লামা ফজল-ই-হক খয়রাবাদীর মতো পণ্ডিতের দেখা মেলে। খয়রাবাদী একাধারে ছিলেন ধর্মতত্ত্ববিদ, দার্শনিক ও কবি; যাঁর পুরো কাজ ও চিন্তাধারাই দাঁড়িয়ে ছিল ইসলামি দর্শন ও ধ্রুপদী ইলমি ভিত্তির ওপর। একটু খেয়াল করলে দেখা যায়, জাভেদ আখতার যে উর্দু সাহিত্য সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করেন, তা মূলত শত শত বছরের ইসলামি ইলমুল কালাম, ইন্দো-পার্সিয়ান নন্দনতত্ত্ব এবং সুফি দর্শনের মিশেলে তৈরি। মজার ব্যাপার হলো, মানুষ যখন ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে সরে আসে, তখনও তার ভেতরে সেই পুরনো ঐতিহ্যের শিল্প ও চিন্তার কাঠামোটি থেকে যায়।
এই ঐতিহ্যের ছাপ তাঁর লেখা গানগুলোতে বেশ প্রকট। উদাহরণ হিসেবে তাঁর লেখা সাড়া জাগানো গান ‘আফরিন আফরিন’-এর কথাই ধরা যাক। ফারসি ভাষার এই শব্দের অর্থ মূলত প্রশংসা বা বিস্ময়—অনেকটা মুগ্ধ হয়ে ‘অপূর্ব’ বা ‘সাবাশ’ বলার মতো। পাকিস্তানের কিংবদন্তি শিল্পী নুসরাত ফতেহ আলী খানের কণ্ঠে গানটি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পায়। (এখানে উল্লেখ করা যায়, নুসরাত নিজেও কাওয়ালির মতো এমন এক ঘরানার শিল্পী ছিলেন, শরীয়তের মানদণ্ডে যা নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে)। গানটির পরতে পরতে কীভাবে সেই ধ্রুপদী নন্দনতত্ত্ব লুকিয়ে আছে, তার কয়েক চরণ পড়লেই সেটি পরিষ্কার হবে:
তার রূপের বর্ণনা দেওয়া আমার সাধ্যের অতীত,
অপূর্ব সে, অনবদ্য এক সৃষ্টি!
তুমিও যদি দেখতে তাকে, তবে মুগ্ধ হয়ে বলতে—
অপূর্ব সে, অনবদ্য এক সৃষ্টি!
এমন অপরূপ সৌন্দর্য আগে চোখে পড়েনি,
যেন অজন্তার গুহায় খোদাই করা কোনো নিখুঁত ভাস্কর্য।
সে যেন চোখের পলকে তৈরি হওয়া কোনো মায়া,
যেন কোনো সুমধুর সুর, কিংবা স্নিগ্ধ সুবাস।
সে যেন নেচে ওঠা কোনো রাগিনী,
যেন সুবাস ছড়ানো মায়াবী জ্যোৎস্না।
সে যেন সদ্য ফুটে ওঠা কোনো বাগান,
কিংবা ভোরের প্রথম রোদ।
যেন নিখুঁতভাবে গড়া মন-কাড়া এক অবয়ব,
যেন চন্দনের স্নিগ্ধতা, শ্বেতপাথরের মসৃণতা।
কেউ যদি বলেন নাস্তিকরা সৌন্দর্য বোঝেন না বা শিল্প সৃষ্টি করতে পারেন না, তবে তা হবে নেহাতই এক বালখিল্য দাবি। কিন্তু ‘আফরিন আফরিন’-এর মতো গানে যে এক ধরণের অপার্থিব মুগ্ধতা আর ভক্তিভাব মিশে আছে, তার শেকড় খুঁজতে গেলে আপনি নিশ্চিতভাবেই হোঁচট খাবেন। কারণ, একটি নিরেট বস্তুবাদী বা যান্ত্রিক কাঠামোর ভেতর দিয়ে এই মাত্রার আধ্যাত্মিক আবেশ কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করা যায় না।
বিবর্তনবাদী মনোবিজ্ঞানীরা, যেমন জিওফ্রে মিলার, শিল্প ও সৌন্দর্যকে দেখার চেষ্টা করেন নিখাদ জৈবিক চশমায়। তাঁদের কাছে এসব হলো স্রেফ বিবর্তনের হাতিয়ার—হয়তো বিপরীত লিঙ্গকে আকৃষ্ট করার কৌশল, নয়তো টিকে থাকার লড়াইয়ের অংশ। বিজ্ঞান হয়তো বলতে পারে মানুষ কেন শিল্পের চর্চা ধরে রেখেছে। কিন্তু সৌন্দর্য কেন আমাদের কাছে কেবল একটি দরকারি বা ‘উপযোগী’ জিনিস হয়ে ধরা দেয় না? কেন একটি নিখুঁত সুর বা সুন্দর দৃশ্য আমাদের ভেতরে এমন তীব্র অনুভূতির জন্ম দেয় যার কারণ ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না? বিজ্ঞান এখানে এসে রীতিমতো বোবা হয়ে যায়।
জাভেদ আখতারের শৈল্পিক মানস ঠিক এই জায়গাটিতেই তাঁর ঘোষিত নাস্তিক্যবাদের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়। তাঁর গানে যে বিনম্র শ্রদ্ধা, মুগ্ধতা আর জাগতিক সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়ার আকুতি আমরা দেখি, তা মূলত ধার করা। তিনি এটি পেয়েছেন সেই পুরনো ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য থেকে, যা সৌন্দর্যকে স্রেফ বিবর্তনের কোনো বাই-প্রোডাক্ট বা উপজাত মনে করে না। বরং সেই ঐতিহ্যের কাছে সৌন্দর্য হলো এক পরম সত্যের কাছাকাছি পৌঁছানোর মাধ্যম।
যদি কেবল ডারউইনের তত্ত্ব আর বস্তুবাদী হিসেব-নিকেশের ওপর ভিত্তি করে কোনো পরিবেশ গড়ে উঠত, তবে সেখানে হয়তো শিল্পের এই গভীর বোধটুকু বেঁচে থাকার কোনো রসদই পেত না। কারণ, চারপাশের সবকিছুকে কেবল উপযোগিতার নিক্তিতে মাপার অভ্যাস ধীরে ধীরে শিল্পের সত্তাকেই মেরে ফেলে।
জাভেদ আখতার মুখে নিজেকে নাস্তিক বললেও, তাঁর কলম থেকে যখন ‘আফরিন আফরিন’-এর মতো গান বের হয়, সেখানে অবচেতনভাবেই ‘স্রষ্টা’ বা ‘কারিগর’-এর বন্দনা চলে আসে। এর পেছনের কারণটা খুব একটা জটিল নয়। সৌন্দর্যের যে নিখুঁত রূপ আর গভীরতা, তা কেবল শুষ্ক যুক্তির ওপর ভর করে দাঁড়াতে পারে না। বিবর্তনবাদ হয়তো বলতে পারে আমাদের এই সৌন্দর্যবোধ কীভাবে তৈরি হলো; কিন্তু একটি সুন্দর দৃশ্য বা সুর কেন আমাদের ভেতরে মুগ্ধতা জাগায়—বিজ্ঞানের কাছে তার কোনো জুতসই জবাব নেই।
মানুষ যখন এমন কোনো অপরূপ সৌন্দর্যের মুখোমুখি হয়, যা নিছক কোনো দুর্ঘটনার ফল বলে মনে হয় না, তখন কবিরা আপন তাগিদেই আধ্যাত্মিক ভাষার আশ্রয় নেন। কারণ, নিরেট বস্তুবাদী বা যান্ত্রিক শব্দ দিয়ে এই অপার্থিব মুগ্ধতা বোঝানো যায় না।
তাই পুরো আলোচনা শেষে আসল প্রশ্ন এটা নয় যে, জাভেদ আখতার ধর্মবিশ্বাস ছেড়েছেন কি না। বরং বড় প্রশ্ন হলো—যে বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য তাঁকে আজকের এই শিল্পীসত্তায় পরিণত করেছে, তাকে চাইলেই কি চিরকাল অস্বীকার করা যায়?
তাঁর নিজের নামটার দিকেই একবার তাকানো যাক। ফারসি ভাষায় ‘জাভেদ’ মানে চিরঞ্জীব, আর ‘আখতার’ মানে পথপ্রদর্শক তারা। তাঁর পরিচয়ের মাঝেই লুকিয়ে আছে এক সমৃদ্ধ সংস্কৃতির ছাপ, যা বস্তুবাদী শুষ্কতার চেয়ে অনেক বেশি প্রাণবন্ত। তাঁর নামটার মাঝেই লুকিয়ে আছে এক সমৃদ্ধ তামাদ্দুনের গল্প। নিরেট বস্তুবাদে এই প্রাণের ছোঁয়া মেলা ভার। যে ঐতিহ্যের আলোয় তাঁর শিল্পীসত্তা গড়ে উঠেছে, সেখানে বিশ্বাস, চিন্তা ও নান্দনিকতা এক সুতোয় গাঁথা।
মানুষ যতই নিজের অতীত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিক, আপন ঘরের একটা টান সবসময়ই থেকে যায়। এই দার্শনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার শেষটাও হতে পারে সেই ফেরার ডাক দিয়ে। কুরআনে খুব সহজ ভাষায় এই আশ্বাসের কথাই বলা হয়েছে:
বলে দাও, হে আমার বান্দারা! তোমরা যারা নিজেদের ওপর অবিচার করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই
আল্লাহ সব পাপ ক্ষমা করে দেন। তিনি পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সুরা যুমার: ৫৩)
নাস্তিক্যবাদ হয়তো মানুষকে সাময়িকভাবে তার নিজস্ব শেকড় ও পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। কিন্তু এই বিশাল মহাবিশ্বের স্রষ্টার কাছে ভুল বুঝতে পেরে আপন ঠিকানায় ফেরার দরজা সবসময়ই খোলা থাকে।
মূলঃ Bheria. (2025, December 27). Mufti shamail vs javed akhtar: The limits of atheism. Muslim Skeptic. https://muslimskeptic.com/2025/12/27/mufti-shamail-vs-javed-akhtar-limits-of-atheism/
অনুবাদঃ জিসান আহমেদ







Comments