অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল: সাংবাদিক যখন ক্ষমতার পাহারাদার

সাংবাদিকতার সবচেয়ে পুরোনো আদর্শটি খুব সহজ—‘Comfort the afflicted and afflict the comfortable’ বা নিপীড়িতকে সান্ত্বনা দাও এবং ক্ষমতাবানকে অস্বস্তিতে ফেলো। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় এমন বহু উজ্জ্বল নাম আছে, যাঁরা এই আদর্শকে সম্পূর্ণ উল্টে দিয়েছেন। তাঁরা ক্ষমতাবানকে সান্ত্বনা দিয়েছেন এবং নিপীড়িতকে আরো অস্বস্তিতে ফেলেছেন। ইতালির বিখ্যাত মার্ক্সবাদী লেখক ও চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামসির ভাষায় এঁরা হলেন ‘অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়ালস’ বা জৈব বুদ্ধিজীবী। এঁরা একটি বিশেষ ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত থেকে সেই কাঠামোকে তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক বৈধতা দিয়ে থাকেন। এঁরা হোমো সাকার তৈরি করে শাসকগোষ্ঠীর সব অপরাধ ও হত্যাকাণ্ডকে টকশো, নিউজ-কলাম ও বইয়ের মাধ্যমে স্বাভাবিক বা ‘নরমালাইজড’ করে তোলেন। তাঁরা শাসকগোষ্ঠীর জনসংযোগ বিভাগের কর্মীর মতো অবলীলায় বলতে পারেন—গণতন্ত্র নয়, উন্নয়ন দরকার; প্রচারের অংশ হিসেবে রাষ্ট্রের স্বার্থে তাঁরা ‘ডেভেলপমেন্ট থিওরি’ সামনে নিয়ে আসেন। তাঁরা কেবল সরকারের কাজকে সমর্থনই করেননি, বরং সাফাই গাইতে গিয়ে নিজেদের মেধা ও প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতার আখ্যানকেই চূড়ান্ত ‘সত্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীর সাংবাদিকতার ইতিহাসে এই ‘জৈব বুদ্ধিজীবী’ ধারণাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আন্তোনিও গ্রামসি তাঁর বিখ্যাত ‘প্রিজন নোটবুকস’-এ এই ধারণাটির প্রবর্তন করেছিলেন। তাঁর মতে, জৈব বুদ্ধিজীবীরা কেবল বায়বীয় তত্ত্বের চর্চা করেন না, বরং তাঁরা যে শাসক শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করেন, সেই শ্রেণির সমস্যা, আকাঙ্ক্ষা এবং অধিকারের কথা অত্যন্ত সুকৌশলে গণমাধ্যমে তুলে ধরেন। তাঁরা ক্ষমতার কাঠামোর একেবারে কেন্দ্রে অবস্থান করেও সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠার নিপুণ ভান করেন। বিশ্বের সাংবাদিকতার ইতিহাস ঘাঁটলে এমন বহু নামিদামি নারী ও পুরুষ সাংবাদিকের দেখা মেলে, যাঁরা ক্ষমতার পক্ষে কলম চালিয়েছেন এবং পরবর্তীতে আত্মপক্ষ সমর্থন করে সেই ঘৃণ্য ভূমিকাকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য বইও লিখেছেন।
লেনি রিফেনস্টাল : সৌন্দর্যের আবরণে ফ্যাসিবাদ
ইতিহাসের দিকে তাকালে প্রথমেই আসে লেনি রিফেনস্টালের নাম, যিনি সৌন্দর্যের আবরণে ফ্যাসিবাদকে মহিমান্বিত করেছিলেন। ১৯০২ সালে জন্ম নেওয়া এই জার্মান নারী ছিলেন বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রতিভাবান চলচ্চিত্র নির্মাতাদের একজন। তাঁর চলচ্চিত্র নির্মাণের কৌশল আজও বিশ্ব সিনেমায় অনুসরণীয়। কিন্তু তিনি তাঁর এই অসাধারণ প্রতিভাকে স্রেফ নাৎসি জার্মানির প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। ১৯৩৫ সালে নির্মিত তাঁর ‘ট্রায়াম্ফ অব দ্য উইল’ (Triumph of the Will) মূলত নাৎসি পার্টির নুরেমবার্গ সমাবেশের ওপর নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র, যা হিটলারকে একজন অলৌকিক নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেছিল। লেনি এতে এমন সব ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল, মিউজিক এবং ক্রাউড কন্ট্রোল ব্যবহার করেছিলেন, যা দর্শকদের অবচেতন মনে হিটলারকে এক ‘ত্রাতা’ বা ‘ঈশ্বরতুল্য’ নেতা হিসেবে গেঁথে দেয়। এটি ছিল শৈল্পিক দক্ষতার চরম শিখর, কিন্তু এর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক মিথ্যাচারকে বৈধতা দেওয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নাৎসিদের পতন ঘটলে লেনিকে আটক করা হয়। যদিও তিনি বারবার দাবি করেছেন যে তিনি কেবল একজন ‘শিল্পী’ ছিলেন এবং রাজনীতির সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক ছিল না, কিন্তু ইতিহাসবিদরা তাঁকে ছাড় দেননি। গ্রামসির ভাষায়, তিনি ছিলেন শাসকগোষ্ঠীর সেই বুদ্ধিজীবী যিনি শিল্পের মাধ্যমে নাৎসি সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত নিজের আত্মজীবনী ‘Leni Riefenstahl: A Memoir’-এ তিনি দাবি করেন যে নাৎসিদের অপরাধ সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না। কিন্তু সুসান সনট্যাগ তাঁর ‘Fascinating Fascism’ প্রবন্ধে এই দাবিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। এডওয়ার্ড সাঈদ বা জন পিলজাররা যেখানে শোষিতের পক্ষে দাঁড়িয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই করেছেন, লেনি রিফেনস্টাল ঠিক তার উল্টো কাজটি করে ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে শোষকের শক্তিকে মহিমান্বিত করেছেন।
জুডিথ মিলার : ইরাক যুদ্ধের কলম-সৈনিক
একইভাবে ইরাক যুদ্ধের প্রাক্কালে ক্ষমতার কলম-সৈনিক হিসেবে আবির্ভূত হন নিউইয়র্ক টাইমসের সিনিয়র সাংবাদিক এবং পুলিৎজার পুরস্কারজয়ী জুডিথ মিলার। ২০০২-০৩ সালে তিনি একাধিক প্রতিবেদন লেখেন, যেখানে দাবি করা হয় ইরাকে মারণাস্ত্র বা উইপনস অব ম্যাস ডেসট্রাকশন (WMD) রয়েছে। এই প্রতিবেদনগুলো মূলত বুশ প্রশাসনের সরকারি সূত্র থেকে নেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছিল এবং তা আমেরিকান জনমতকে ইরাক আক্রমণের পক্ষে প্রস্তুত করতে বড় ভূমিকা রেখেছিল। পরবর্তীতে যখন প্রমাণিত হলো ইরাকে কোনো মারণাস্ত্র ছিল না এবং নিউইয়র্ক টাইমস নিজেই ক্ষমা চাইল, মিলার তখন পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ২০১৫ সালে প্রকাশিত নিজের লেখা ‘The Story: A Reporter’s Journey’ গ্রন্থে তিনি নিজেকে সৎ সাংবাদিক হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করেন। কিন্তু মাইকেল ম্যাসিং তাঁর ‘Now They Tell Us’ গ্রন্থে স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে, মিলার মূলত বুশ প্রশাসনের যুদ্ধের আখ্যানকেই সচেতনভাবে বৈধতা দিয়েছেন।
ওয়াল্টার ডুরান্টি : স্তালিনের দুর্ভিক্ষ ঢাকার চেষ্টা
ইতিহাসের আরেক কলঙ্কিত অধ্যায়ের নাম ওয়াল্টার ডুরান্টি, যিনি স্তালিনের আমলের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষকে সুকৌশলে ধামাচাপা দিয়েছিলেন। নিউইয়র্ক টাইমসের মস্কো প্রতিনিধি ও পুলিৎজার পুরস্কারজয়ী এই সাংবাদিক ১৯৩২-৩৩ সালে সোভিয়েত ইউক্রেনে ঘটে যাওয়া ‘হলোদোমোর’ (Holodomor) বা কৃত্রিম দুর্ভিক্ষকে ইচ্ছাকৃতভাবে অস্বীকার করেন, যেখানে ৩৫ থেকে ৭৫ লাখ মানুষ মারা গিয়েছিলেন। উল্টো তিনি স্তালিনের সোভিয়েত ব্যবস্থার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন এবং নির্লজ্জভাবে ঘোষণা করেছিলেন—‘There is no famine’ বা দুর্ভিক্ষ বলে কিছু নেই।
মস্কোতে তিনি অত্যন্ত বিলাসবহুল জীবনযাপন করতেন, যা সোভিয়েত সরকারের আশীর্বাদ ছাড়া কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। পরবর্তীকালে প্রকাশিত তাঁর ‘I Write as I Please’ (১৯৩৫) গ্রন্থে ডুরান্টি নিজেকে একজন নিরপেক্ষ সাংবাদিক হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং সোভিয়েত ব্যবস্থার ইতিবাচক দিকগুলো অত্যন্ত সুকৌশলে তুলে ধরেন। অথচ ইতিহাসবিদরা অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে দেখিয়েছেন যে, ওয়াল্টার ডুরান্টি জেনেশুনেই এই মিথ্যা রিপোর্টগুলো করেছিলেন। ১৯৩২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন নিয়ে তাঁর ধারাবাহিক প্রতিবেদনের জন্য তিনি সাংবাদিকতার সর্বোচ্চ সম্মান ‘পুলিৎজার পুরস্কার’ লাভ করেন। সত্য গোপন করে এই সম্মান হাতিয়ে নেওয়ার কারণে পরবর্তী সময়ে তাঁকে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। ২০০৩ সালে পুলিৎজার বোর্ড তাঁর পুরস্কার বাতিলের বিষয়টি বিবেচনা করলেও আনুষ্ঠানিকভাবে তা আর বাতিল করেনি। ইতিহাসবিদ এস. জে. টেইলর তাঁর ‘Stalin’s Apologist’ (১৯৯০) গ্রন্থে ডুরান্টির সাংবাদিকতার এই প্রতারণামূলক দিকটি অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে উন্মোচন করেছেন।
এই কলঙ্কিত অধ্যায়ের সবচেয়ে ট্র্যাজিক অংশ হলো তরুণ সাংবাদিক গ্যারেথ জোনসের পরিণতি। জোনস পায়ে হেঁটে ইউক্রেনের গ্রামে গ্রামে গিয়ে মানুষের মৃতদেহ ও কঙ্কালসার শিশুদের ছবি তুলেছিলেন এবং লন্ডনে ফিরে সংবাদ সম্মেলন করে সেই ভয়াবহ সত্য তুলে ধরেন। কিন্তু ওয়াল্টার ডুরান্টি তাঁর প্রভাব খাটিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে জোনসকে ‘মিথ্যাবাদী’ হিসেবে প্রমাণের অপচেষ্টা চালান। শেষ পর্যন্ত সত্য সাময়িকভাবে চাপা পড়লেও জোনসকে অবর্ণনীয় লাঞ্ছনা সইতে হয়েছিল। ডুরান্টি ছিলেন ঠিক তেমনই একজন সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী, যিনি সত্যকে ক্ষমতার দাসে পরিণত করেছিলেন। আন্তোনিও গ্রামসি যেমন বলেছিলেন, বুদ্ধিজীবীরা হয় জনগণের পক্ষে কাজ করেন, নয়তো শাসকগোষ্ঠীর হাতিয়ার হন; ওয়াল্টার ডুরান্টি এখানে সোভিয়েত সরকারের সাংস্কৃতিক আধিপত্য বা প্রোপাগান্ডা রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী হিসেবেই নিজের ভূমিকা পালন করেছিলেন।
থমাস ফ্রিডম্যান ও নব্য উদারবাদের ট্রাম্পেটার
সমকালীন বিশ্বে নব্য উদারবাদের সবচেয়ে বড় ট্রাম্পেটার বা প্রচারক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন থমাস ফ্রিডম্যান। একজন সাংবাদিক যখন তিনবার পুলিৎজার পুরস্কার পান, যখন তাঁর বই বিশ্বের ৩০টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয় এবং তাঁর কলাম ৭০০-এরও বেশি পত্রিকায় ছাপা হয়, তখন সেই কলাম আসলে কার স্বার্থে লেখা হচ্ছে—সেটি অনুধাবন করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে। নিউইয়র্ক টাইমসের অন্যতম প্রভাবশালী এই কলামিস্ট বিশ্বের কোটি কোটি পাঠকের কাছে ‘বৈশ্বিক বিশেষজ্ঞ’ হিসেবে পরিচিত হলেও, বাস্তবে তিনি বৈশ্বিক পুঁজিবাদ ও আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে সোচ্চার সমর্থকদের একজন। ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের শুরুতে তিনি নির্লজ্জভাবে সেই যুদ্ধকে সমর্থন করেছিলেন। তাঁর সবচেয়ে বিতর্কিত মুহূর্তটি আসে যখন চার্লি রোজ-এর (Charlie Rose) টেলিভিশন অনুষ্ঠানে তিনি দম্ভভরে বলেন, ‘আমরা ইরাকিদের বলতে চেয়েছিলাম Suck on this… আমরা মধ্যপ্রাচ্যের হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করতে চেয়েছিলাম।’ তাঁর এই ভয়াবহ উক্তিটি বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। মিডিয়া সমালোচক গ্লেন গ্রিনওয়াল্ড যথার্থই উল্লেখ করেছেন যে, এই একটি উক্তিতেই ফ্রিডম্যানের প্রকৃত মতাদর্শ উন্মোচিত হয়ে যায়। তাঁর মুখে উচ্চারিত ‘গণতন্ত্র প্রসার’ ও ‘মানবতাবাদী হস্তক্ষেপ’ আসলে সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতারই ভিন্ন নাম। ফ্রিডম্যানের প্রভাব শুধু সাধারণ পাঠকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তিনি হোয়াইট হাউস, বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক করপোরেট সংস্থাগুলোর উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেছেন এবং তাঁর বইগুলো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমের অংশ। কিন্তু আন্তোনিও গ্রামসির তত্ত্বের আলোকে যদি প্রশ্ন করা হয়, ফ্রিডম্যান আসলে কার ‘অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল’? তাহলে উত্তরটি অত্যন্ত অস্বস্তিকর।
থমাস ফ্রিডম্যানের বিখ্যাত বই ‘The World is Flat’ (২০০৫)-এ তিনি যুক্তি দেন যে, বৈশ্বিক পুঁজিবাদ নাকি সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করছে। এর আগে ‘The Lexus and the Olive Tree’ (১৯৯৯) গ্রন্থে তিনি নব্য উদারবাদী বিশ্বায়নকে ‘অনিবার্য ও কল্যাণকর’ হিসেবে উপস্থাপন করেন। কিন্তু সমালোচকদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে এটি স্পষ্ট যে, ফ্রিডম্যানের লেখা মূলত আমেরিকান করপোরেট স্বার্থ ও বৈশ্বিক পুঁজিবাদের জৈব বুদ্ধিজীবীরই কাজ। মিডিয়া সমালোচক ম্যাট তাইবি (Matt Taibbi) বলেছেন, থমাস ফ্রিডম্যান জটিল বিষয়গুলোকে এমনভাবে সরলীকরণ করেন, যা চূড়ান্ত বিচারে সর্বদা ক্ষমতাবানদের পক্ষেই যায়। ‘The World is Flat’ বইটিতে তাঁর কেন্দ্রীয় দাবি ছিল, প্রযুক্তি ও বিশ্বায়নের কারণে পৃথিবী ‘সমতল’ হয়ে গেছে, অর্থাৎ সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি হয়েছে। অথচ অক্সফামের (Oxfam) ২০২৩ সালের প্রতিবেদন দ্ব্যর্থহীনভাবে দেখিয়ে দেয় যে, বিশ্বের ১ শতাংশ ধনী মানুষ বাকি ৯৯ শতাংশের মিলিত সম্পদের চেয়েও বেশি সম্পদ কুক্ষিগত করে রেখেছে। পৃথিবী মোটেও সমতল নয়, বরং এটি আগের চেয়ে বহুগুণ বেশি অসম।
প্রখ্যাত তাত্ত্বিক ডেভিড হার্ভে (David Harvey) তাঁর ‘A Brief History of Neoliberalism’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, নব্য উদারবাদ মূলত একটি রাজনৈতিক প্রকল্প, যা উচ্চবিত্ত শ্রেণির ক্ষমতা পুনরুদ্ধার ও সুরক্ষার জন্যই তৈরি হয়েছিল। থমাস ফ্রিডম্যান এই মতাদর্শের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বাকপটু প্রচারক। তিনি জটিল অর্থনৈতিক তত্ত্বকে সহজ উপমায় রূপান্তরিত করে সাধারণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেন ঠিকই, কিন্তু সমালোচকরা মনে করিয়ে দেন যে, এই ‘সহজ উপমা’গুলো প্রায়ই বাস্তবতাকে বিকৃত করে এবং ক্ষমতাবানদের স্বার্থকে ‘সর্বজনীন সত্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে। গ্রামসির তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ফ্রিডম্যানের এই উপমাগুলো আসলে এক ধরনের ‘হেজিমোনিক কমন সেন্স’ (Hegemonic Common Sense) তৈরি করে। তিনি যখন বলেন পৃথিবী সমতল, তখন বৈশ্বিক অসমতার রূঢ় বাস্তবতা সেই সমতলের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়। যখন তিনি ‘Golden Straitjacket’-এর কথা বলেন, তখন নব্য উদারবাদী নীতি মেনে নেওয়াটাকেই ‘অনিবার্য’ বলে মনে হয়। এই চাতুর্যপূর্ণ ভাষাগত কৌশলেই করপোরেট পুঁজিবাদের স্বার্থটি অবলীলায় ‘মানবতার স্বার্থ’ হিসেবে উপস্থিত হয়।
বাংলাদেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি প্রায়ই ফ্রিডম্যানের বই পড়েন এবং তাঁকে একজন ‘নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ’ মনে করেন। কিন্তু প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক—যে ‘বিশেষজ্ঞ’ ইরাক যুদ্ধ সমর্থন করেছেন, বিশ্বায়নের ক্ষতিকর দিকগুলো সযত্নে এড়িয়ে গেছেন এবং করপোরেট স্বার্থকে মানবতার স্বার্থ বলে চালিয়ে দিয়েছেন, তাঁর বিশ্লেষণ আসলে কতটা নির্ভরযোগ্য? ফ্রিডম্যান নিঃসন্দেহে একজন প্রতিভাবান লেখক। কিন্তু তাঁর সেই অসামান্য প্রতিভা ব্যবহৃত হয়েছে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির স্বার্থ রক্ষায়। তাই তাঁর কলাম পড়ার সময় একজন সচেতন পাঠককে প্রতিনিয়ত নিজেকে জিজ্ঞেস করতে হবে—এই বিশ্লেষণ কার স্বার্থে? এই উপমা কোন বাস্তবতাকে লুকিয়ে রাখছে? কেবল এই প্রশ্নগুলোই একজন পাঠককে জৈব বুদ্ধিজীবীদের সূক্ষ্ম প্রভাব বলয় থেকে মুক্ত রাখতে পারে।
অ্যান কুল্টার : রিপাবলিকান আধিপত্যের পাহারাদার
আমেরিকার সবচেয়ে বিতর্কিত কলামিস্ট ও লেখিকাদের অন্যতম হলেন অ্যান কুল্টার। তিনি রক্ষণশীল রিপাবলিকান রাজনীতির সোচ্চার সমর্থক এবং উদারপন্থীদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করার জন্য পরিচিত। তিনি তাঁর ‘Treason: Liberal Treachery from the Cold War to the War on Terrorism’ (২০০৩) গ্রন্থে উদারপন্থীদের ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে চিত্রিত করেছেন। ‘Godless: The Church of Liberalism’ (২০০৬)-এ তিনি উদারপন্থাকে একটি ‘ধর্মবিরোধী মতাদর্শ’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন এবং ‘Demonic: How the Liberal Mob Is Endangering America’ (২০১১) গ্রন্থে রিপাবলিকান আধিপত্যের আখ্যানকেই ‘সত্যিকারের আমেরিকা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন। মিডিয়া বিশ্লেষকদের মতে, কুল্টার মূলত রিপাবলিকান ক্ষমতাকাঠামোর একজন জৈব বুদ্ধিজীবী, যিনি সেই কাঠামোর আদর্শকে অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে সাধারণ মানুষের ভাষায় প্রচার করেন।
পিটার আর্নেট : সরকারি আখ্যানের বাইরে গিয়েও বিতর্কিত
সিএনএন-এর প্রখ্যাত যুদ্ধ সংবাদদাতা এবং পুলিৎজার পুরস্কারজয়ী পিটার আর্নেট ভিয়েতনাম থেকে শুরু করে গালফ যুদ্ধ পর্যন্ত তাঁর সাহসী সাংবাদিকতার জন্য কিংবদন্তিতুল্য। কিন্তু ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের সময় তিনি ইরাকি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে একটি সাক্ষাৎকার দেন, যেখানে তিনি উল্লেখ করেন যে যুদ্ধের প্রাথমিক পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে। তাঁর এই সাক্ষাৎকার তাৎক্ষণিকভাবে ইরাকি সরকারের প্রচারণায় ব্যবহৃত হয়। পরবর্তীতে ‘Live from the Battlefield’ (১৯৯৪) গ্রন্থে আর্নেট নিজেকে একজন নির্ভীক সত্যসন্ধানী হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সমালোচকদের মতে, তাঁর কিছু কাজের ভেতর দিয়ে ক্ষমতার পক্ষে অবস্থান নেওয়ার প্রবণতাটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
দক্ষিণ এশিয়ার ‘অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল’
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি, ক্ষমতার পালাবদল এবং রাজনৈতিক বাস্তববাদের (Political Realism) দিকে গভীরভাবে তাকালে দেখা যায়, সংবাদমাধ্যম ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা প্রায়শই ক্ষমতাসীনদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং অতি সাম্প্রতিক ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান—ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকেই এমন কিছু ‘অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল’ বা জৈব বুদ্ধিজীবীর দেখা মেলে, যাঁরা সাংবাদিকতা ও বুদ্ধিবৃত্তিকে নির্লজ্জভাবে ক্ষমতার সেবায় নিয়োজিত করেছেন।
পশ্চিমা বিশ্বের সাংবাদিকতায় যেমন লেনি রিফেনস্টাল বা ওয়াল্টার ডুরান্টিরা ক্ষমতার মুখপাত্র হয়েছিলেন, তেমনি দক্ষিণ এশিয়াতেও এর কোনো অভাব নেই। জর্জ অরওয়েল বা আই. এফ. স্টোনের মতো ক্ল্যাসিক সাংবাদিকদের আদর্শ ছিল রাষ্ট্র বা সরকারের ভুলত্রুটি জনগণের সামনে উন্মোচন করা। কিন্তু বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার এমন অসংখ্য সাংবাদিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব আছেন, যাঁরা সাংবাদিকতার নীতি বিসর্জন দিয়ে নিজেদের মেধা ও প্রতিষ্ঠানের শক্তিকে ব্যবহার করে উল্টো শাসকের ভুলগুলোকেই আড়াল করার চেষ্টা করেছেন।
বাংলাদেশ : ক্ষমতার ছায়ায় ‘জৈব বুদ্ধিজীবী’
আন্তোনিও গ্রামসির ‘জৈব বুদ্ধিজীবী’ কিংবা নোয়াম চমস্কির ‘ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট’ তত্ত্বের আলোকে বাংলাদেশের গণমাধ্যম ইতিহাসের দিকে তাকালে বিগত দেড় দশকে ক্ষমতার অক্ষের সাথে মিশে যাওয়া বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী সাংবাদিকের নাম সামনে আসে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর এই সাংবাদিকদের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক জনবিক্ষোভ তৈরি হয় এবং পরবর্তীতে তাঁরা আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হন।
বাংলাদেশের সংবাদপত্র জগতে একসময় আধুনিক ধারার প্রবর্তক হিসেবে পরিচিত নাঈমুল ইসলাম খান পরবর্তীতে পরিণত হন ক্ষমতার একনিষ্ঠ সমর্থকে। টকশো ও কলামের মাধ্যমে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিগত সরকারের নানা অগণতান্ত্রিক আচরণ, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং গুম-খুনের ঘটনাগুলোকে বুদ্ধিবৃত্তিক মোড়কে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় যখন রাজপথে শত শত ছাত্র-জনতা নিহত হচ্ছিলেন, তখন তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব হিসেবে গণমাধ্যমে রাষ্ট্রের দমন-পীড়নের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন এবং আন্দোলনকারীদের ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে রাষ্ট্রীয় বয়ান প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছেন।
একাত্তর টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবু বাংলাদেশে এমন একটি মিডিয়া ইকোসিস্টেম তৈরি করেছিলেন, যা সরাসরি সরকারের প্রোপাগান্ডা মেশিনে পরিণত হয়। তিনি সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করে ভিন্নমতাবলম্বীদের প্রতিনিয়ত ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ বা ‘উন্নয়নের শত্রু’ হিসেবে চিত্রিত করেছেন। সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি ‘সবার জন্য কথা বলার সমান সুযোগ’ তিনি সম্পূর্ণ বাতিল করেছিলেন এবং সরকারের যেকোনো দমন-পীড়নকে “রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে অপরিহার্য” বলে প্রচার করেছেন।
মূলধারার সাংবাদিক না হলেও সুভাষ সিংহ রায় মিডিয়া ও টকশোগুলোতে বিগত সরকারের সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক ঢাল হিসেবে কাজ করেছেন। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনকালে নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস, বিরোধী দলের ওপর নির্যাতন বা দুর্নীতির পাহাড়—যেকোনো রাষ্ট্রীয় অপরাধের পক্ষে তিনি অবলীলায় ‘উন্নয়ন তত্ত্ব’ ও ‘স্থিতিশীলতার’ বয়ান হাজির করেছেন।
দৈনিক ‘ভোরের কাগজ’-এর দীর্ঘকালীন সম্পাদক এবং জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শ্যামল দত্ত বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি সরকারের একতরফা নির্বাচন, সুশাসনের অভাব এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো বিষয়গুলোকে ঢাকা দেওয়ার জন্য নানা রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক যুক্তি হাজির করতেন। একইভাবে মুন্নী সাহাও তাঁর সংবাদ উপস্থাপনা ও মাঠপর্যায়ের টকশোর মাধ্যমে সরকারের উন্নয়ন আখ্যানকে একচেটিয়াভাবে প্রচার করতেন। ভিন্নমতাবলম্বীদের প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে তাঁর আক্রমণাত্মক ভঙ্গি এবং ক্ষমতাসীনদের প্রতি নমনীয়তা সাংবাদিকতার মৌলিক নিরপেক্ষতাকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করেছিল।
একাত্তর টেলিভিশনের সাংবাদিক দম্পতি শাকিল আহমেদ এবং ফারজানা রূপা বিগত সরকারের অন্যতম শক্তিশালী মিডিয়া ঢাল হিসেবে কাজ করেছেন। কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিত্রিত করতে এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বলপ্রয়োগকে ন্যায্যতা দিতে তাঁদের সংবাদ পরিবেশনা তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়।
দেশের কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলের প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা একজন সুবক্তা ও লেখক হিসেবে টকশো এবং কলামের মাধ্যমে সরকারের রাজনৈতিক অবস্থানের পক্ষে অত্যন্ত কৌশলী বুদ্ধিবৃত্তিক সাফাই গাইতেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ মুক্ত গণমাধ্যমের পরিপন্থী বিভিন্ন কালো আইনের পক্ষে তাঁর অবস্থান তাঁকে একজন নিরেট জৈব বুদ্ধিজীবীতে পরিণত করেছিল।
সময় টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ জোবায়ের দীর্ঘ সময় ধরে চ্যানেলটিকে সরকারের একচ্ছত্র প্রোপাগান্ডা মেশিন হিসেবে ব্যবহার করেছেন। বিরোধী দলের আন্দোলন বা সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে তিনি ক্ষমতার আখ্যানকে সাধারণের মগজে গেঁথে দিতে বড় ভূমিকা রাখেন। ডিবিসি নিউজের সম্পাদক প্রণব সাহাও টকশোগুলোতে অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে সরকারের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং সীমাহীন দুর্নীতিকে বিশ্বমন্দা বা ‘উন্নয়নের প্রসববেদনা’ হিসেবে জায়েজ করার চেষ্টা করতেন। একই চ্যানেলের প্রধান সম্পাদক জায়েদুল আহসান পিন্টুও টকশোগুলোতে প্রায়শই সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বয়ানকে হুবহু জনগণের সামনে ‘নিষ্ঠুর সত্য’ হিসেবে হাজির করার চেষ্টা করতেন।
সাংবাদিক সমাজের শীর্ষ নেতা শাবান মাহমুদ সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ করার পরিবর্তে ইউনিয়নকে ব্যবহার করেছেন সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণকারী আইনের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান না নিয়ে তিনি ক্ষমতার তোষামোদে ব্যস্ত ছিলেন, যার পুরস্কারস্বরূপ তিনি পেশাদার সাংবাদিকতার পথ ছেড়ে বাংলাদেশ হাইকমিশনের ‘প্রেস মিনিস্টার’ হিসেবে রাজনৈতিক নিয়োগ পান। প্রবীণ সাংবাদিক নেতা মনজুরুল আহসান বুলবুলও সাংবাদিক ইউনিয়নগুলোকে ক্ষমতাসীনদের অনুগত রাজনৈতিক বলয়ে রূপান্তর করতে প্রধান ভূমিকা পালন করেন।
বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক নঈম নিজামের পত্রিকার নীতিতে চমস্কির ‘ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট’ তত্ত্বের ফিল্টারগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট ছিল। করপোরেট ও রাজনৈতিক ক্ষমতার পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে তিনি এমন এক সাংবাদিকতা পরিচালনা করতেন, যা সুনিপুণভাবে শাসকের স্বার্থ রক্ষা করত। আর সাংবাদিক ও লেখক শাহরিয়ার কবির মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বিরোধী মত বা যেকোনো যৌক্তিক সমালোচনাকারীকে ‘দেশদ্রোহী’ বা ‘মৌলবাদী’ হিসেবে চিত্রিত করার তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করতেন।
ভারত : উগ্র জাতীয়তাবাদ ও করপোরেট মিডিয়া
রিপাবলিক টিভির প্রধান সম্পাদক অর্ণব গোস্বামী ভারতের বর্তমান হিন্দুত্ববাদী ও উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক কাঠামোর সবচেয়ে বড় মিডিয়া মুখপাত্র। তিনি তাঁর টেলিভিশন চ্যানেলে প্রতিদিন ‘বিচারসভা’ বসিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা, মানবাধিকার কর্মী এবং সরকারের সমালোচকদের ‘দেশদ্রোহী’ উপাধি দেন। শাসকগোষ্ঠীর নীতিকে প্রশ্ন করার বদলে, যারা প্রশ্ন করে তিনি উল্টো তাদেরই কাঠগড়ায় দাঁড় করান, যা ক্ষমতার পক্ষে এক ধরনের মিডিয়া ফ্যাসিবাদের জ্বলন্ত উদাহরণ। জি নিউজ এবং পরবর্তীতে আজ তক-এর উপস্থাপক সুধীর চৌধুরী ভারতে ইসলামোফোবিয়া এবং সরকারি প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর অন্যতম প্রধান কারিগর। ২০১৬ সালে ভারতে যখন নোট বাতিল করা হয়, তখন তিনি সংবাদে দাবি করেছিলেন যে নতুন ২০০০ টাকার নোটে ‘ন্যানো জিপিএস চিপ’ লাগানো আছে।
ভারতের শীর্ষস্থানীয় কলামিস্ট এবং বুদ্ধিজীবী স্বপন দাশগুপ্ত ডানপন্থী হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করেছেন। থমাস ফ্রিডম্যান যেমন নব্য-উদারবাদের তাত্ত্বিক, স্বপন দাশগুপ্ত তেমনি ভারতের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্যমূলক নীতিগুলোকে বুদ্ধিবৃত্তিক ও ঐতিহাসিক বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা : এস্টাবলিশমেন্টের মুখপাত্র
১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানে সামরিক শাসনকে একটি ‘উন্নয়নশীল গণতন্ত্র’ হিসেবে তুলে ধরার প্রধান কারিগর ছিলেন আইয়ুব খানের তথ্যসচিব আলতাফ গওহর। তিনি ১৯৬২ সালের ‘প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন অর্ডিন্যান্স’ তৈরি করে পাকিস্তানের স্বাধীন সাংবাদিকতার টুঁটি চেপে ধরেছিলেন। বর্তমান সময়ের অন্যতম বিতর্কিত টেলিভিশন উপস্থাপক মুবাসির লুকমানকেও সামরিক এস্টাবলিশমেন্টের অঘোষিত মুখপাত্র হিসেবে ধরা হয়। যখনই কোনো নির্বাচিত বেসামরিক সরকার সামরিক বাহিনীর বিরাগভাজন হয়, তখনই লুকমান তাঁর শো-তে ওই রাজনীতিবিদদের চরিত্রহনন শুরু করেন।
অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার প্রভাবশালী মিডিয়া নেটওয়ার্ক ‘দেরানা টিভি’-এর প্রতিষ্ঠাতা দিলিথ জয়াউইরা তাঁর মিডিয়া এম্পায়ার ব্যবহার করে শ্রীলঙ্কায় সিংহলি-বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের উগ্র বয়ান তৈরি করেন এবং রাজাপাকসে ভাইদের ‘জাতীয় বীর’ হিসেবে তুলে ধরে তাদের ক্ষমতায় আসার পথ প্রশস্ত করেন। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের জন্য রাজাপাকসেদের দুর্নীতি দায়ী থাকলেও, তাঁর মিডিয়া দীর্ঘদিন তা আড়াল করে রেখেছিল।
ক্ষমতার আখ্যান বনাম সত্যের লড়াই
আন্তোনিও গ্রামসির তত্ত্বের আলোকে এই সাংবাদিকদের মধ্যে কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। প্রথমত, তাঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রতিভাবান এবং এই প্রতিভাই তাঁদের ক্ষমতার পক্ষের কাজকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে। দ্বিতীয়ত, তাঁরা প্রত্যেকেই দাবি করেছেন যে তাঁরা নিরপেক্ষ সত্যের সন্ধান করছেন, কিন্তু তাঁদের ‘সত্য’ সবসময় ক্ষমতার স্বার্থের সঙ্গে মিলে গেছে। তৃতীয়ত, তাঁরা বই লিখে তাঁদের ক্ষমতানুগ অবস্থানকে ‘তাত্ত্বিক ভিত্তি’ দিয়েছেন। নোয়াম চমস্কি ও এডওয়ার্ড হারম্যান তাঁদের ‘Manufacturing Consent’ গ্রন্থে যে পাঁচটি ‘ফিল্টার’ চিহ্নিত করেছিলেন, এই সাংবাদিকরা মূলত সেই ফিল্টারগুলোর মধ্য দিয়েই কাজ করেছেন।
তবে এই অন্ধকারের বিপরীতে ইতিহাসে কিছু উজ্জ্বল সাংবাদিকের নামও রয়েছে। আই. এফ. স্টোন বলেছিলেন, ‘সব সরকারই মিথ্যা বলে।’ তাঁর ‘I.F. Stone’s Weekly’ ছিল ক্ষমতার বিরুদ্ধে একাকী কলমের লড়াই। সিআইএ ও ড্রাগ পাচারের সম্পর্ক উন্মোচন করে ক্যারিয়ার হারিয়েছিলেন গ্যারি ওয়েব। রাশিয়ায় সত্য বলতে গিয়ে জীবন দিয়েছিলেন আনা পলিটকোভস্কায়া। মাই লাই গণহত্যা এবং আবু গারিব কেলেঙ্কারি উন্মোচন করেছিলেন সেমুর হার্শ। এঁরা প্রমাণ করেছেন যে প্রতিকূলতার মধ্যেও সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো সম্ভব।
জর্জ অরওয়েল একবার লিখেছিলেন, ‘সাংবাদিকতা হলো এমন কিছু ছাপানো, যা অন্য কেউ প্রকাশ করতে চায় না। বাকি সবকিছুই নিছক জনসংযোগ।’ এই প্রবন্ধে আলোচিত সাংবাদিকরা প্রতিভায় অতুলনীয় ছিলেন। কিন্তু যখন তাঁরা ক্ষমতার আখ্যানকে প্রশ্নহীনভাবে প্রচার করেছেন, তখন তাঁরা অরওয়েলের ভাষায় সাংবাদিকতা ছেড়ে মূলত ‘জনসংযোগে’ নেমে গেছেন। ইতিহাস তাঁদের প্রতিভাকে মনে রাখবে ঠিকই, কিন্তু এটাও মনে রাখবে যে, যখন সত্য বলার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, তখন তাঁদের কলম অন্যদিকে তাকিয়েছিল। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রতিটি দেশের সাংবাদিকদের জন্য এই ইতিহাস একটি চিরন্তন সতর্কবার্তা—প্রতিভা ও পুরস্কার একজন সাংবাদিককে তাঁর মূল দায়িত্ব থেকে কখনো মুক্তি দেয় না; আর সেই দায়িত্ব হলো ক্ষমতার নয়, সর্বদা সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো।
তথ্যসূত্র
- ১. Antonio Gramsci, Prison Notebooks, International Publishers, 1971.
- ২. Noam Chomsky & Edward Herman, Manufacturing Consent, Pantheon Books, 1988.
- ৩. Susan Sontag, ‘Fascinating Fascism’, New York Review of Books, 1975.
- ৪. S. J. Taylor, Stalin’s Apologist: Walter Duranty, Oxford University Press, 1990.
- ৫. Michael Massing, ‘Now They Tell Us’, New York Review of Books, 2004.
- ৬. Judith Miller, The Story: A Reporter’s Journey, Simon & Schuster, 2015.
- ৭. Thomas Friedman, The World is Flat, Farrar, Straus and Giroux, 2005.
- ৮. Ann Coulter, Treason, Crown Forum, 2003.
- ৯. Peter Arnett, Live from the Battlefield, Simon & Schuster, 1994.
- ১০. George Orwell, ‘In Front of Your Nose’, Collected Essays, 1946.
- ১১. Matt Taibbi, The Great Derangement, Spiegel & Grau, 2008.
- ১২. New York Times, ‘The Times and Iraq’, May 26, 2004.
- ১৩. Columbia Journalism Review, Various Issues.
- ১৪. Committee to Protect Journalists (CPJ), Annual Reports.
- ১৫. Reporters Without Borders (RSF), Press Freedom Index, 2023.







Comments