রিচার্ড ইটনের রাইজ অব ইসলাম অ্যান্ড দ্য বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার: সলিমুল্লাহ খানের পর্যালোচনা

রিচার্ড ইটনের The Rise of Islam and the Bengal Frontier বইটি বাংলাদেশে ইসলামের বিস্তার সংক্রান্ত আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বিবেচিত হয়ে আসছে। বইটির একাধিক বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ফিরোজ আহমেদের অনুবাদটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ এতে একটি নির্ঘণ্ট সংযোজিত হয়েছে যা অন্য অনুবাদগুলোতে দেখা যায় না।
একাডেমিক পরিসরে বইটির বহুল পাঠ হলেও, এর ঐতিহাসিক ভিত্তি ও তাত্ত্বিক কাঠামো নিয়ে সমালোচনামূলক আলোচনা সেভাবে হয়নি। সলিমুল্লাহ খানের সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এই প্রশ্নটি। আকবর আলি খানের আমন্ত্রণে এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশে সলিমুল্লাহ খান এ বিষয়ে একটি দীর্ঘ ইংরেজি বক্তৃতা দেন। সেই বক্তৃতায় তিনি ইটনের তত্ত্ব নিয়ে যে সমালোচনা উপস্থাপন করেছিলেন, এই প্রবন্ধে তারই মূল সূত্রগুলো তুলে ধরা হবে।
‘ফ্রন্টিয়ার’ প্রত্যয়ের উৎস ও সমস্যা
সলিমুল্লাহ খানের সমালোচনার শুরুটা হয় ইটনের বইয়ের শিরোনামের শেষ শব্দ ‘বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার’ নিয়ে। ইটন বাংলাকে ভারতবর্ষের প্রান্তিক অঞ্চল বা মুঘল সাম্রাজ্যের সীমান্ত এলাকা হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন। সলিমুল্লাহ খানের মতে, এটা মূলত বাংলার ইতিহাস না জানার ফল।
তিনি খুঁজে বের করেছেন ইটনের এই ফ্রন্টিয়ার তত্ত্বের আসল উৎস কোথায়। এর মূলে আছে মার্কিন ইতিহাসবিদ ফ্রেডারিক জ্যাকসন টার্নারের একটি তত্ত্ব। ১৮৯০ সালে প্রকাশিত The Frontier in American History বইয়ে টার্নার দেখান, আটলান্টিক থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত ইউরোপীয়দের বিস্তারের মধ্য দিয়ে আমেরিকার ফ্রন্টিয়ার শেষ হয়েছে। ইটন আমেরিকার সেই মডেল হুবহু বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন।
বইটির দ্বিতীয় সংস্করণে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ বছর পর ইটন নিজেই স্বীকার করেন যে তিনি টার্নারের থিসিস বাংলায় প্রয়োগ করেছিলেন। সলিমুল্লাহ খান একে ইতিহাসবিদের সততা বলে সাধুবাদ জানিয়েছেন।
কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, প্রথম সংস্করণেই যদি তিনি এই কথা স্বীকার করতেন, তাহলে বাংলাদেশের পাঠকরা কি বইটি একইভাবে গ্রহণ করত?
এই আপত্তির পক্ষে সলিমুল্লাহ খান কয়েকটি ঐতিহাসিক যুক্তি হাজির করেন। ভৌগোলিক বা সাংস্কৃতিক কোনো দিক থেকেই বাংলা কখনো ফ্রন্টিয়ার অর্থাৎ প্রান্ত ছিল না। আহমদ হাসান দানি ১৯৬৮ সালে তাঁর ‘আর্কিওলজিক্যাল ফাউন্ডেশনস অফ হিস্ট্রি’ বক্তৃতায় স্পষ্ট দেখিয়েছেন, বাংলা মূলত একটা কেন্দ্র ছিল।
টার্নারের মডেলে মূলত স্থলপথে উপনিবেশ দখলের চিত্র দেখা যায়। সেখানে আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ানদের রিজার্ভেশনে বন্দি করে আমেরিকার বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড দখল করা হয়েছিল। কিন্তু বাংলার বাস্তবতা ছিল একদম আলাদা। বাংলার ইতিহাস কেবল স্থলপথের ইতিহাস নয়, এটি দীর্ঘ সামুদ্রিক সভ্যতার ইতিহাস।
আবু মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহর গবেষণার সূত্র ধরে বলা যায়, আরবদের সাথে সামুদ্রিক বাণিজ্যের জোরেই বাংলার সুলতানি রাষ্ট্র দিল্লির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নিজেদের স্বাধীন অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিল। পরে পর্তুগিজদের কাছে আরব নৌ শক্তির পতন হলে বাংলার সেই সামুদ্রিক শক্তিরও পতন ঘটে। আর এর ফলেই মুঘলদের বাংলা বিজয়ের পথ সহজ হয়। আদতে বাংলা ছিল আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের একটি বিশাল কেন্দ্র। তাই আমেরিকান মডেল ধার করে একে মুঘল সাম্রাজ্যের অনাবাদী ফ্রন্টিয়ার হিসেবে প্রমাণের তত্ত্ব আর টেকে না।
রমেশচন্দ্র মজুমদারের Hindu Colonies in the Far East বইয়েও একই কথা বলা হয়েছে। সেখানে দেখানো হয়েছে, বাংলা থেকেই বহু মানুষ সুমাত্রা বা জাভার মতো অঞ্চলে গিয়ে উপনিবেশ গড়েছিল। এই বাস্তবতায় বাংলাকে ফ্রন্টিয়ার বলাটা তাই একেবারেই অযৌক্তিক।
ইসলামের আগমন প্রশ্নে ইটনের সীমাবদ্ধতা
ইটনের বইয়ের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হলো: বাংলায় কীভাবে এত বিপুলসংখ্যক মানুষ মুসলমান হলো? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তিনি যে তত্ত্ব হাজির করেন, তার মূল কথা হলো মুঘল আমলে পীর-ফকিরদের মাধ্যমে জমি বন্দোবস্তের বিনিময়ে ধর্মান্তর ঘটেছে। পাট্টা-কবুলিয়তের মাধ্যমে নতুন জমিতে বসতি স্থাপনের সুযোগ পেয়ে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে।
সলিমুল্লাহ খান এই তত্ত্বের দুর্বলতাগুলো একে একে চিহ্নিত করেন।
প্রথমত, ইটন তাঁর এই বিশাল তত্ত্বটি দাঁড় করিয়েছেন স্পষ্ট পদ্ধতিগত দুর্বলতার ওপর ভিত্তি করে। তিনি মূলত চট্টগ্রাম কোর্ট থেকে উদ্ধার করা সপ্তদশ বা অষ্টাদশ শতাব্দীর মাত্র দু-একটি দলিলের ওপর নির্ভর করেছেন—যেখানে ১৭০-১৭৫ বিঘার ‘নয়া আবাদ’ বা নতুন আবাদি জমির জন্য পাট্টা কবুলিয়ত দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এত অল্প তথ্য থেকে এমন বড় সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। দুর্বল প্রমাণের ওপর ভর করে ইটন ধরে নিয়েছেন যে মুঘল আমলের আগে পূর্ববাংলা মূলত অনাবাদী ছিল।
কিন্তু এটি ঐতিহাসিকভাবে সঠিক নয়। লালমাই পাহাড়ের প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার, চন্দ্রবংশের নিদর্শন, কুমিল্লা অঞ্চলে প্রাপ্ত ২০০০ বছরের পুরনো কষ্টি পাথরের বুদ্ধমূর্তি — এসব প্রমাণ করে যে এই অঞ্চলে সভ্যতার বিকাশ বহু আগেই ঘটেছিল। এরপরে ওয়ারি-বটেশ্বরের আবিষ্কার, যেখানে রোমান সাম্রাজ্যের মুদ্রা পাওয়া গেছে, সেটি নরসিংদী অঞ্চলে প্রাচীন বাণিজ্যিক সভ্যতার অস্তিত্বের প্রমাণ। এই সমস্ত তথ্যের বিপরীতে ইটনের ‘অনাবাদী ফ্রন্টিয়ার’ তত্ত্ব দাঁড়ায় না।
দ্বিতীয়ত, ইটন মুঘল আমলকে ধর্মান্তরের প্রধান কাল হিসেবে দেখিয়েছেন। কিন্তু শিরিন মুসাভির গবেষণা অনুযায়ী, মসজিদ নির্মাণের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় মুঘল আমলের আগেই বাংলায় ধর্মান্তরের বেশিরভাগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিল। হজরত শাহজালাল বা খানজাহান আলীর মাজারগুলো মুঘল আমলের বহু আগের। এগুলো ইটনের কালানুক্রমিক কাঠামোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
তৃতীয়ত, বাংলায় ইসলামের আগমন ঘটেছিল তুর্কি বিজয়েরও আগে — আরব বণিকদের সমুদ্রপথে। মুঘলদের জমি বন্দোবস্তের বহু আগে থেকেই সমুদ্রবর্তী অঞ্চলে স্থানীয় মানুষের সাথে মিশে গিয়ে ইসলামের একটি বিস্তার ঘটছিল। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো কেরালা। সেখানে আরব বণিকদের সাথে স্থানীয় নারীদের মেলবন্ধনে যে সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়, স্থানীয় মালয়ালম ভাষায় তাদের বলা হয় ‘মা পিলাই’ বা মায়ের ছেলে (যাদের কথা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ‘মোপলা বিদ্রোহ’ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন)। কেরালায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা কিংবা মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় ইসলামের বিস্তারের মূলে রয়েছে সামুদ্রিক প্রেক্ষাপট। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই সামগ্রিক ইতিহাসকে ইটন পুরোপুরি এড়িয়ে গেছেন। এর বদলে তিনি বাংলার ক্ষেত্রে কেবল মুঘল-কেন্দ্রিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
ধর্মান্তরের তত্ত্ব এবং ইটনের আসল লক্ষ্য
বাংলায় ইসলাম বিস্তারের কারণ নিয়ে মূলত তিনটি তত্ত্ব চালু আছে। প্রথমটি তরবারির তত্ত্ব, অর্থাৎ জোর করে ধর্মান্তর করা। দ্বিতীয়টি পৃষ্ঠপোষকতার তত্ত্ব, যেখানে বলা হয় মুঘল দরবারে চাকরি ও সুবিধার লোভে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে। আর তৃতীয়টি হলো সামাজিক মুক্তির তত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুসারে, বর্ণপ্রথার নির্যাতন থেকে বাঁচতে নিম্নবর্ণের মানুষ ইসলামের সাম্যের বাণীতে আকৃষ্ট হয়েছিল।
ইটন তাঁর বইয়ে তরবারির তত্ত্বটি বাতিল করে দিয়েছেন। একজন ইতিহাসবিদ হিসেবে এটি তাঁর সৎ সাহসের পরিচয়। কিন্তু ইটনের মূল উদ্দেশ্য ছিল মূলত তৃতীয় তত্ত্বটি অর্থাৎ সামাজিক মুক্তির তত্ত্বকে অস্বীকার করা। মানুষ যে বর্ণবৈষম্য থেকে মুক্তির আশায় ইসলামের দিকে ঝুঁকেছিল, ইটন সেই আদর্শিক কারণটিকে পুরোপুরি নাকচ করতে চেয়েছেন।
ইটনের মতে, জমির লোভে মানুষ রাতারাতি ধর্মান্তরিত হয়েছিল। এর পাল্টা জবাবে সলিমুল্লাহ খান ধর্মান্তর প্রক্রিয়ার বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন। ধর্মান্তর কোনো একদিনের ঘটনা ছিল না। নিম্নবর্ণের বঞ্চিত মানুষ শুরুতে হয়তো কোনো পীরের কাছে মুরিদ বা বয়াত হতো। এরপর ধীরে ধীরে তারা ইসলামিক রীতিনীতি পালন করতে শুরু করত এবং ধর্মীয় বিশ্বাসগুলো আয়ত্ত করত। ইতিহাসবিদ অসীম রায় তাঁর গবেষণায় একে মিশ্র সংস্কৃতির চর্চা বলেছেন। বাংলার ধর্মান্তরের আসল চিত্রটি ছিল এমনই।
পাশাপাশি আকবর আলি খানের সূত্র ধরে সলিমুল্লাহ খান জানান, আমাদের এই অঞ্চলে বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলে ধর্মান্তর কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যাপার ছিল না। বরং ধর্মান্তর হতো গোষ্ঠীগত বা সামষ্টিকভাবে। কোনো গোষ্ঠীপ্রধান ইসলাম গ্রহণ করলে দেখা যেত পুরো গ্রামই একসাথে ধর্মান্তরিত হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় নিয়ে মানুষের অভ্যাসের যে পরিবর্তন ঘটেছিল এবং তারা যে দলবেঁধে ধর্ম গ্রহণ করেছিল—ইটন এই বিষয়গুলো পুরোপুরি এড়িয়ে গেছেন। ইটন জোর দিয়েছেন কেবল মানুষের ব্যক্তিগত লোভ বা সুবিধার ওপর।
সামাজিক মুক্তির তত্ত্বকে পাশ কাটিয়ে ইটন মূলত দ্বিতীয় তত্ত্বটিকেই নতুন মোড়কে হাজির করেছেন। আগের তত্ত্বে বলা হয়েছিল চাকরির লোভের কথা, আর ইটন বলেছেন জমির লোভের কথা।
সলিমুল্লাহ খান মূলত ইটনের ইতিহাসচর্চার নিরপেক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন। প্রাচ্যবিদরা বরাবরই ইসলামের বিস্তারকে ধর্মের আদর্শ বা আধ্যাত্মিক আকর্ষণের বদলে স্রেফ বৈষয়িক ও অর্থনৈতিক সুবিধার ফল হিসেবে দেখাতে চান। বাংলার ক্ষেত্রে ইটনের এই তত্ত্বটিও ইতিহাস লেখার সেই পুরোনো ছকেরই অংশ।
‘rise’ এবং ইউরোপীয় চিন্তায় উত্থান-পতনের সরল অংক
সলিমুল্লাহ খান বইয়ের শিরোনামের ‘rise’ অর্থাৎ উত্থান শব্দটি নিয়ে বলেছেন, ইটন এই শব্দটি একেবারে ঠিকঠাক ব্যবহার করেছেন। কারণ ইটন অন্যান্যদের মতো ‘decline of Islam’ অর্থাৎ ইসলামের পতন কথাটি বলেননি।
ইউরোপীয়রা ইতিহাসকে প্রায়ই লাভ-ক্ষতির অংক হিসেবে দেখে। তাদের ধারণা, একজনের উত্থান মানেই আরেকজনের পতন হতে হবে। তারা মনে করে, আরবদের কাছ থেকে গ্রিক দর্শন ইউরোপে পৌঁছানোর পর যখন সেখানে রেনেসাঁ বা নবজাগরণ ঘটল, ঠিক তখন থেকেই ইসলামের পতন শুরু হয়েছে। মার্শাল হজসনের মতো বড় মাপের ইতিহাসবিদও তাঁর Venture of Islam বইয়ে ঘুরেফিরে ইসলামের পতনের কথা বলেছেন।
ইউরোপীয় পণ্ডিতদের এই পতনের ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করতেই ‘ইসলামিক’ আর ‘ইসলামিকেট’ নামের একটি নতুন বিতর্কের জন্ম হয়েছে। ইউরোপীয়রা দেখল, আরবকেন্দ্রিক আদি পর্বের পর তুর্কি বা মুঘলদের হাত ধরে ইসলামের নতুন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নতি হয়েছে। তখন তারা জোর করে একটি ভাগ তৈরি করল। ধর্ম বা বিশ্বাসের সাথে সরাসরি যুক্ত বিষয়গুলোকে তারা বলল ‘ইসলামিক’। আর ইসলামের বিশাল সাংস্কৃতিক অর্জন, যেমন শিল্প, সাহিত্য, সংগীত ও স্থাপত্যের নাম দিল ‘ইসলামিকেট’।
এখানেও সমালোচনা আছে। আওরঙ্গজেব ক্ষমতায় আসার ঠিক আগে ১৬৫৩ সালে তাজমহল তৈরি হয়। ইউরোপীয়রা একে ‘ইসলামিক’ না বলে ‘ইসলামিকেট’ বলে। একইভাবে স্পেনের বিখ্যাত ইয়াহুদি দার্শনিক মাইমোনাইডিসের কাজ পুরোপুরি ইসলামিক দর্শন বা ইলমুল কালামের অংশ। অথচ তাঁকেও স্রেফ ‘ইসলামিকেট’ কাঠামোর অংশ বা ‘ইসলামিক ইয়াহুদি চিন্তাবিদ’ বলা হয়।
ইউরোপীয়দের এই বিভাজনের আসল উদ্দেশ্যই হলো এটা প্রমাণ করা যে, খাঁটি ইসলামের পতন ঘটে গেছে এবং এখন যা টিকে আছে তা মূলত ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু সাংস্কৃতিক নিদর্শন। দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের দেশের পণ্ডিতরাও আজ বিনাপ্রশ্নে ইউরোপীয়দের চাপিয়ে দেওয়া এই ‘ইসলামিকেট’ পরিভাষাটি হরদম ব্যবহার করে চলেছেন।
কিন্তু ইতিহাস উত্থান-পতনের সাথে এই সরল হিসাব মেলে না। হালাকু খানের বাহিনী যখন বাগদাদ ধ্বংস করল, তখন অনেকেই ভেবেছিল ইসলাম শেষ। অথচ সেই বিজয়ী হালাকু খানের বংশধররাই পরে ইসলাম গ্রহণ করে। ইসলাম এক জায়গায় দুর্বল হয়ে আরেক জায়গায় ঠিকই শক্তিশালী হয়েছে। এটি কোনো পতনের গল্প নয়, বরং রূপান্তরের গল্প।
ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হার কারবালা কে বাদ। অর্থাৎ প্রতিটি কারবালার পরেই ইসলাম নতুন করে জেগে ওঠে। ২০১১ সালে প্রকাশিত টমাস বাওয়ারের Ambiguity of Islam এবং ২০১৫ সালে আজিজ আল-আজমেহর গবেষণাতেও ঠিক একই প্রমাণ পাওয়া যায়।
ওরিয়েন্টালিস্ট কর্তৃত্ব এবং প্রশ্নহীন গ্রহণ
সলিমুল্লাহ খানের সমালোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ওরিয়েন্টালিস্ট পণ্ডিতদের প্রতি আমাদের সমালোচনাহীন আনুগত্যের প্রশ্ন। অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হওয়ার কারণেই ইটন যে ভুল করেছেন সেটিও নিখুঁত সত্য বলে গ্রহণ করার প্রবণতা বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে প্রকট। মোহাম্মদ আজমের মতো বাংলা একাডেমির প্রধান ব্যক্তিত্বও ইটনকে ভ্রান্তভাবে প্রামাণিক সূত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন বলে সলিমুল্লাহ খান উল্লেখ করেন।
সম্প্রতি মোহাম্মদ আজম একটি প্রবন্ধ লিখে আহমদ ছফার বিখ্যাত ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ লেখাটিকে আক্ষরিক অর্থেই একটি ফেলনা প্রবন্ধ হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করেছেন। আর এই দাবির পক্ষে আজম ইউরোপীয় পণ্ডিতদের—যেমন আবে দ্যুবে (Abbé Dubois) বা রিচার্ড ইটনকে—নিজের প্রধান আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। নিজস্ব ইতিহাস ও ভূগোলের গভীর পাঠ না নিয়ে কেবল পশ্চিমা তাত্ত্বিকদের ওপর ভর করে নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যকে খারিজ করার এই প্রবণতা মূলত ‘অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী’রই একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
তাত্ত্বিক এই অন্ধ অনুকরণের পাশাপাশি ভাষাগত অনুকরণও সমানে চলছে। পশ্চিমা ধারণার হুবহু ভাষান্তর করতে গিয়ে আমাদের পণ্ডিতরা ‘Islamization’-এর বাংলা করেছেন ‘ইসলামায়ন’। সলিমুল্লাহ খান একে ‘অশ্লীল বাংলা’ এবং এক ধরনের ‘বুদ্ধিবৃত্তিক স্বৈরাচার’ বা ‘ফ্যাসিতন্ত্র’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। বাংলা ভাষার নিজস্ব শব্দতত্ত্ব ও প্রকৃতি না বুঝে ইংরেজি বা ফরাসি ধারণার গায়ে জোর করে সংস্কৃত প্রত্যয় জুড়ে দেওয়ার এই প্রবণতা আমাদের চিন্তার পরাধীনতাকেই স্পষ্ট করে। অনুবাদ করতে হলে ভাষার নাড়িনক্ষত্র বুঝতে হয়, যা না করে কেবল আক্ষরিক লিপান্তর করা ভাষার ওপর জুলুম ছাড়া আর কিছু নয়।
সমালোচনা মানে নেতিবাচক মন্তব্য নয়। ‘ক্রিটিক’ শব্দটি এসেছে ‘ক্রাইসিস’ থেকে, যার অর্থ গোড়ায় যাওয়া, মূলে অনুসন্ধান করা। বাংলায় ‘সমালোচনা’ মানেও ‘সমান আলোচনা’ নয় — এটি হলো ‘সম্মুখ আলোচনা’, যেখানে প্রশ্নটিকে তার মূল পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়। ইটনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেও, এবং প্রচলিত কর্তৃত্ববোধের বাইরে গিয়ে, ইতিহাস পাঠে এই গভীর অনুসন্ধানটিই আজ সবচেয়ে বেশি জরুরি। আর সলিমুল্লাহ খানের এই পর্যালোচনাটি ঠিক সেই কাজটিরই এক দৃষ্টান্ত।







Comments