নতুন ডিপ্লোমা প্রোগ্রাম ২০২৬ শুরু হয়েছে! ক্রিটিক্যাল সোশ্যাল থট অ্যান্ড ইসলামিক ট্র্যাডিশন ডিপ্লোমা সম্পর্কে জানুন → নতুন ডিপ্লোমা প্রোগ্রাম ২০২৬ — ডিপ্লোমা সম্পর্কে জানুন →

ভূরাজনীতিসমসাময়িক বিশ্লেষণ

ইরান যুদ্ধ: একশ বছরের উত্থান-পতন ও মধ্যপ্রাচ্যের অনিশ্চিত ভবিষ্যত

Share
Share

ইরান যুদ্ধ: একশ বছরের উত্থান-পতন ও মধ্যপ্রাচ্যের অনিশ্চিত ভবিষ্যত

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি রাতে মাত্র ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েল ১,২০০-এর বেশি বোমা ফেলেছিল ইরানের ওপর। প্রথম আঘাতেই নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিজে। কিন্তু এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল এমন এক মুহূর্তে, যখন ওয়াশিংটন আর তেহরানের মধ্যে পারমাণবিক আলোচনা তখনো চলছিল, আর মাত্র ছয় সপ্তাহ আগে তেহরানের রাস্তায় নিজের সরকারের গুলিতে মারা গিয়েছিল হাজার হাজার ইরানি বিক্ষোভকারী।

অর্থাৎ, এই যুদ্ধকে যতটা সহজে ‘আমেরিকা-ইসরায়েল বনাম ইরান’ বলে সরলীকরণ করা হয়, বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। একদিকে ইরানি জনগণ নিজেদের সরকারের হাতে নিহত হচ্ছে, অন্যদিকে সেই একই সরকারের ওপর বিদেশি আক্রমণ চলছে। ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান নেওয়া একটি রাষ্ট্র নিজেই তার প্রতিবেশী উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ছে।

এই যুদ্ধ বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে একশ বছর পেছনে — এক সেনা কর্মকর্তার সিংহাসন দখল থেকে শুরু করে ইরানি বিপ্লব হয়ে আজকের ধ্বংসস্তূপ পর্যন্ত আসতে হবে।

প্রতিটা ঘটনা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণের দাবি রাখে। কিন্তু আমরা একই প্রবন্ধে সবগুলো অন্তর্ভুক্ত করতে গেলে সেটা বরং প্রবন্ধের পরিবর্তে বইয়ে পরিণত হবে।

তাই যথাসম্ভব প্রতিটা ঘটনায় আলোকপাত করার চেষ্টা করেছি। প্রেক্ষাপট বোঝার জন্য আশা করি এটুকু যথেষ্ট হবে।

কাজার রাজবংশের পতন ও রেজা শাহের উত্থান

উনিশ শতকের ইরান শাসন করত কাজার রাজবংশ (১৭৮৯-১৯২৫), যাদের রাজধানী ছিল তেহরান। এই রাজবংশ ক্রমশই দুর্বল হয়ে পড়েছিল কারণ তারা একের পর এক বৈদেশিক শক্তির কাছে অর্থনৈতিক সুবিধা (‘কনসেশন’) বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছিল রাজকোষ ভরার জন্য।

যেমন ১৮৯০ সালে পুরো ইরানের তামাক ব্যবসার একচেটিয়া অধিকার একজন ব্রিটিশ ব্যবসায়ীকে দেওয়া হয়, যা জনরোষে পরে বাতিল করতে হয়। আবার ১৯০১ সালে ব্রিটিশ ধনকুবের উইলিয়াম নক্স ডি’আর্সিকে দেওয়া হয় ইরানের তেল অনুসন্ধান ও উত্তোলনের ৬০ বছরের একচেটিয়া অধিকার, বিনিময়ে ইরান পেত মুনাফার মাত্র ১৬ শতাংশ।

ফলে কাজার রাজবংশের শাসনকাল মূলত ইরানের অন্ধকার সময়। যে সময় ইরান ক্রমাগত ভূখণ্ড হারিয়েছে, অর্থনীতি বিদেশিদের হাতে বর্গা দিয়েছে। এবং এমনকি দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব পর্যন্ত বিদেশিদের ইচ্ছায় যখন তখন লুণ্ঠিত হত।

ইরানিরা অনুভব করে তাদের একটা শক্তিশালী রাষ্ট্র দরকার। এই অনুভবটা অনেক পুরোনো বোঝাই যাচ্ছে। বিপ্লবেরও আরও অন্তত একশ বছর আগে। ফলে ইরানিদের দীর্ঘমেয়াদী মনস্তত্ত্বে এটি দৃঢ়ভাবে বসে আছে যে—তাদের লাগবে শক্তিশালী রাষ্ট্র।

এই চিন্তা থেকে ১৯০৫-১৯১১ সালে ইরানে সাংবিধানিক বিপ্লব শুরু হয়। এর মাধ্যমে ইরানে প্রথম সংসদ (মজলিস) প্রতিষ্ঠিত হয় এবং একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্রিক কাঠামো তৈরি হয়। ফলে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য বিদেশিদের হাতে দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দেওয়ার যে ধারা, ইরানিরা মনে করেছিল সেটাতে আপাতত বাঁধ দেওয়া গেছে। ইরানিরা প্রথমবারের মতো একটা ‘রাষ্ট্র’ পেয়েছে বলে ভেবেছে।

রাজা রাষ্ট্রপ্রধান থাকলেও প্রশাসনিক ক্ষমতা ছিল একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রিসভার হাতে, যারা আবার সদ্যগঠিত মজলিসের নিকট দায়বদ্ধ ছিল। বলাই বাহুল্য ইরানের এই সাংবিধানিক বিপ্লব মূলত ফরাসি বিপ্লবের হুবহু অনুকরণ ছিল।  

এই দ্বৈত কাঠামোই (রাজা বনাম নির্বাচিত/মনোনীত প্রধানমন্ত্রী) পরবর্তী অর্ধশতাব্দী ধরে ইরানের রাজনৈতিক সংঘাতের মূল কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

তবে ১৯০৭ সালে ব্রিটেন ও রাশিয়া নিজেদের মধ্যে একটি চুক্তির (অ্যাংলো-রাশিয়ান কনভেনশন) মাধ্যমে ইরানকে দুই ভাগে ভাগ করে নেয়। উত্তরাঞ্চল ছিল রাশিয়ার প্রভাবাধীন, দক্ষিণাঞ্চল ব্রিটেনের প্রভাবাধীন, আর মাঝখানে একটি ‘নিরপেক্ষ’ অঞ্চল ছিল।

ইতোপূর্বে বৃটিশ রাজ, যা তখন ভারত থেকে পরিচালিত হত, তা ছিল ইরানের একপাশে। আরেক পাশে ছিল রাশিয়ান সাম্রাজ্য। দুই সাম্রাজ্যের মাঝে ইরান ছিল নিরপেক্ষ অঞ্চল (বাফার জোন)।

রাশিয়া এবং বৃটেন নিজেদের মধ্যে সরাসরি সংঘাত এড়ানোর জন্য ইরানকে দখলহীন ছেড়ে দেয়। কিন্তু সাংবিধানিক বিপ্লবের পর দুইপক্ষই বুঝতে পারে ইরানকে এভাবে রেখে দিলে নিজেদের ইচ্ছেমত ব্যবহার করা যাবে না। লুটপাট করা যাবে না।

তাই নতুন ব্যবস্থা শক্তিশালী হয়ে দাঁড়ানোর আগেই তাকে ভাগবাটোয়ারা করে নেয়। আর এই পুরো প্রক্রিয়ায় ইরান সরকারকে কোনোভাবেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

প্রথমবারের মতো ইরানিরা উপলব্ধি করতে পারে যে, সীমানা সুরক্ষিত না করে রাষ্ট্রের ভেতরে সম্পদ পুঞ্জীভূত করলে তা যেকোনো সময় সাম্রাজ্যবাদীদের লুণ্ঠনের শিকার হতে পারে। এই উপলব্ধি থেকে ইরানিদের ভেতর দুইটা চাহিদা তৈরি হয়।

এক; বড় শক্তি বা সাম্রাজ্যবাদীদের প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা। যা ক্রমাগত পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে কেবল বৃদ্ধিই পেয়েছে। দুই; শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের জন্য শক্তিশালী শাসক অপরিহার্য। ফলে গণতন্ত্র কিংবা রাজতন্ত্রের বাইরে গিয়ে ইরানিদের প্রধান চাওয়া হয়ে ওঠে শক্তিশালী ‘শাসক’। এই দুটো পয়েন্ট বুঝতে পারলে আজকের দিন পর্যন্ত ইরানিদের মনস্তত্ত্ব খুব সহজেই বোঝা যাবে।

এই ভাগাভাগিতে রাশিয়ার দায়িত্বে পড়ে ইরানের সামরিক বিভাগ। আর বৃটেনের ভাগে পড়ে ইরানের অর্থনীতি। ফলে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয় বৃটিশ ব্যবসায়ীদের হাত ধরে। ইরানের সমস্ত খনিজ সম্পদের ইজারা যায় বৃটিশদের হাতে। আর রাশিয়া ইরানের সামরিক বাহিনী পরিচালনার দায়িত্ব পায়। রুশ জেনারেলরা এই বাহিনী পরিচালনা করত।

এই পটভূমিতেই ১৮৭৯ সালে তৎকালীন শাসক নাসেরউদ্দিন শাহ রাশিয়ার কাছে অনুরোধ জানিয়ে গড়ে তোলেন ‘পার্সিয়ান কস্যাক ব্রিগেড’— রুশ কস্যাক বাহিনীর আদলে তৈরি একটি অশ্বারোহী সামরিক ইউনিট, যার নেতৃত্বে ছিলেন রুশ সেনা কর্মকর্তারা এবং যাদের প্রশিক্ষণ ও অর্থায়ন আসত রাশিয়া থেকে।

তখনকার ইরানি রাজকীয় বাহিনী ছিল সম্পূর্ণ অপ্রশিক্ষিত ও বিশৃঙ্খল, তাই এই ব্রিগেডই হয়ে ওঠে ইরানের একমাত্র সুশৃঙ্খল ও কার্যকর সামরিক শক্তি। কিন্তু একই সাথে এটি ছিল ইরানের মাটিতে রাশিয়ার প্রভাব বিস্তারের একটি হাতিয়ার, যা ইরানি জাতীয়তাবাদীদের চোখে বৈদেশিক আধিপত্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।

এই কস্যাক ব্রিগেডেরই এক অফিসার ছিলেন রেজা খান। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইরান তখন কার্যত বিশৃঙ্খল এক রাষ্ট্র— কেন্দ্রীয় সরকার দুর্বল, ইরানের উত্তর অংশে এখন শুধু রাশিয়ান প্রভাববলয়ই নয় বরং সরাসরি রাশিয়ার সমর্থনে ইরানের ভূখণ্ড নিয়ে একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী ‘গিলান সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, দুর্ভিক্ষ ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় চলছে।

ইরানের রাস্তায় রাস্তায় একদিকে দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের সারি। আরেকদিকে সোভিয়েতপন্থী, সোভিয়েত অস্ত্রে সজ্জিত তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবীদের বাড়বাড়ন্ত। এই বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইরানের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মনস্তত্ত্বে নতুন করে সমাজতন্ত্রবিরোধী মনস্তত্ত্ব যুক্ত হয়। ইরানের বিপ্লব পরবর্তী সময়ে সমাজতান্ত্রিকদেরকে ঠেকিয়ে দেওয়া কিংবা মোসাদ্দেককে হটিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই মনস্তত্ত্ব আমাদেরকে সহায়তা করবে।

এই পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ সেনা কর্মকর্তা জেনারেল এডমন্ড আয়রনসাইডের প্রত্যক্ষ মদদে ১৯২১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রেজা খান ও সাংবাদিক-রাজনীতিবিদ জিয়াউদ্দিন তাবাতাবাইর নেতৃত্বে কস্যাক ব্রিগেড তেহরান দখল করে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে।

ব্রিটেনের লক্ষ্য ছিল এমন একজন ‘শক্তিশালী মানুষ’কে ইরানের ক্ষমতায় বসানো, যে সোভিয়েত প্রভাব ঠেকিয়ে ইরানকে ব্রিটিশ প্রভাববলয়ে ধরে রাখবে।

রেজা খান প্রথমে সেনাপ্রধান, পরে যুদ্ধমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী হন, এবং শেষে ১৯২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর ইরানের মজলিস দুর্বল কাজার রাজাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতাচ্যুত ঘোষণা করে। পরিবর্তে রেজা খানকে নতুন রাজা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তিনি নাম নেন রেজা শাহ পাহলভি।

তার শাসনামলে ইরানে ব্যাপক আধুনিকীকরণ চলে। এক্ষেত্রে তার রোল মডেল ছিল সীমান্তের ওপারে মোস্তফা কামাল আর তার তুরস্ক। তুরস্কের মতোই রেজা খান ইরানকে সাম্রাজ্য থেকে ‘রিপাবলিক’ বানাতে চেয়েছিলেন। যেমনটা করেছিলেন মোস্তফা কামাল, যিনি উসমানি সালতানাতকে হটিয়ে তুর্কি প্রজাতন্ত্র গঠন করেছিলেন।

ফলে রেজা খান রেলপথ, বিশ্ববিদ্যালয়, নারীশিক্ষা এবং আতাতুর্কের অনুকরণে ধর্মনিরপেক্ষ পোশাকবিধি চালু করেন। ইরান নিপতিত হয় অতি কট্টর, অতি উগ্র সেক্যুলারিজমের কবলে।

কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে রেজা শাহের জার্মানির প্রতি ঝোঁক ব্রিটেন ও সোভিয়েত ইউনিয়নকে শঙ্কিত করে তোলে। তাদের আশঙ্কা ছিল, জার্মান প্রকৌশলী ও উপদেষ্টাদের মাধ্যমে ইরানের তেলক্ষেত্র নাৎসি বাহিনীর হাতে চলে যেতে পারে।

এখানে ইরানের পররাষ্ট্রনীতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা মূলনীতি বুঝে নেওয়া জরুরি। সেটা হলো—এখনো পর্যন্ত আমরা ইরানের ইতিহাসের যেটুকু অংশ দেখেছি, সেটুকুতে দেখা গেছে ইরান বিগত দেড়-দুইশত বছর ধরে বড় শক্তিগুলোর শিকার হয়ে আসছে। এক্ষেত্রে প্রথম ও দ্বিতীয় শক্তি কর্তৃক ইরান আক্রান্ত হয়ে থাকে।

অর্থাৎ যখন বৃটিশ রাজ ছিল, তখন ইরান আক্রান্ত হয়েছে বৃটিশ ও রাশিয়া কর্তৃক। রাশিয়া ছিল ইউরোপের দ্বিতীয় শক্তি। যখন আমেরিকান যুগ এসেছে, তখন ইরান আক্রান্ত হয়েছে আমেরিকা এবং সোভিয়েত কর্তৃক। ফলে ইরানের পররাষ্ট্রনীতিতে ‘তৃতীয় শক্তি’ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

অর্থাৎ প্রথম ও দ্বিতীয় শক্তির কবল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ইরান তৃতীয় যে পরাশক্তি আছে, তার সাথে জোটবদ্ধ হয়। এই নীতির কারণেই চীন-রাশিয়ার সাথে ইরানের সম্পর্ক ভালো। এবং এই একই নীতির ফলে তৎকালীন জার্মানির সাথে ইরানের সুসম্পর্ক ছিল।

কারণ তখনকার ইউরোপে প্রধান শক্তি ছিল বৃটেন, দ্বিতীয় শক্তি ছিল রুশ সাম্রাজ্য। তৃতীয় এবং উদীয়মান শক্তি ছিল জার্মানি। ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই জার্মানির সাথে ইরানের মৈত্রী গড়ে উঠবে। হয়েছেও তাই। আর এর খেসারত পুনরায় ইরানকে দিতে হয়েছে। বিনিময়ে ইরানের তৃতীয় শক্তি তত্ত্ব আরও শক্তিশালী ও আরও তীব্র হয়েছে।

যাইহোক, ১৯৪১ সালের আগস্টে অ্যাংলো-সোভিয়েত বাহিনী যৌথভাবে ইরান দখল করে, রেজা শাহকে দক্ষিণ আফ্রিকায় নির্বাসনে পাঠানো হয়, আর তার তরুণ পুত্র মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে সিংহাসনে বসানো হয়, একজন বহিঃশক্তি-নিয়ন্ত্রিত রাজা হিসেবে। এই একটি ঘটনাই ভবিষ্যতের ইরানি জাতীয়তাবাদের মজ্জায় ঢুকিয়ে দেয় একটি ধারণা: বিদেশি শক্তি ইচ্ছেমতো ইরানের শাসক বদলে দিতে পারে।

এখানে কাকতাল হোক বা ভিন্নকিছু, ইরানিরা দেখেছে যেসব শাসককে বহিরাগতরা বসিয়েছে বা নিয়ন্ত্রণ করেছে, তাদের সবাই কট্টর সেক্যুলার। একজনের চাইতে আরেকজন অধিকতর সেক্যুলার ও পশ্চিমা হওয়ার চেষ্টা করেছে।

ফলে ইরানি মনস্তত্ত্বে ১০০ বছরের ইতিহাস এভাবে মিলিত হয়েছে যে—সেক্যুলারিজম ইকুয়াল টু পরাধীনতা। ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই রুহুল্লাহ খোমেনি তার বেলায়েতে ফকিহ তত্ত্ব ঘোষণা করেন। যার সারকথা এটাই ছিল যে রাষ্ট্র শাসিত হবে ফকিহ কর্তৃক, যদি সেই রাষ্ট্র বহিরাগতদের ক্রীড়নক হতে না চায়। সহজ কথায় সেক্যুলারিজম ইকুয়াল টু পরাধীনতা। ইসলামি শাসন ইকুয়াল টু স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, সম্মান ও আত্মমর্যাদা।

এই বিষয়টি না বুঝলে আমরা কখনোই এই ধাঁধার জট খুলতে পারব না যে ইরানের শাসকদের মনস্তত্ত্বে ইসলাম, বিপ্লব এগুলো কী অর্থ ধারণ করে। কিংবা এমনকি সেক্যুলাররা পর্যন্ত কেন ইরানে ইসলামি শাসনব্যবস্থার পক্ষে ছিল বা এখনো ক্ষেত্রবিশেষে আছে।

মোসাদ্দেক, তেল জাতীয়করণ, আর ১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থান

১৯০৮ সালে ব্রিটিশ অনুসন্ধানকারীরা দক্ষিণ ইরানের খুজেস্তান প্রদেশের মাসজেদ সোলাইমানে তেল আবিষ্কার করে। ১৯০৯ সালে গঠিত হয় অ্যাংলো-পার্সিয়ান অয়েল কোম্পানি (পরবর্তীতে অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি, বর্তমানে BP বা বৃটিশ পেট্রোলিয়াম)।

১৯০১ সালের মূল ডি’আর্সি চুক্তিতে ইরান পেত মুনাফার মাত্র ১৬ শতাংশ, যা নিয়ে ইরানিদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ছিল। ১৯৩৩ সালে রেজা শাহ পুরনো চুক্তি বাতিল করে নতুন এক চুক্তি করেন, যেখানে ইরানের হিস্যা বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করা হয় এবং একটি নির্দিষ্ট ন্যূনতম রয়্যালটির নিশ্চয়তা দেওয়া হয় — কিন্তু বিনিময়ে কোম্পানির ইজারার মেয়াদ আরও ৩২ বছর বাড়িয়ে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত করে দেওয়া হয়।

ব্রিটিশ সরকার নিজেই ১৯১৪ সাল থেকে এই কোম্পানির ৫২.৫৫ শতাংশ শেয়ারের মালিক ছিল। অর্থাৎ এটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মত নিছক একটি বেসরকারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছিল না, ছিল ব্রিটিশ রাষ্ট্রীয় স্বার্থের প্রত্যক্ষ হাতিয়ার। মূলত ব্রিটিশ রাজকীয় নৌবাহিনীর জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা দেওয়ার জন্য। কারণ বৃটিশরাজ মানেই বৃটিশ রয়াল নেভি। নেভি নাই তো বৃটিশরাজও নাই।

১৯১২ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত এই ৩৯ বছরে কোম্পানি ইরান থেকে ৩৩৮ মিলিয়ন টন তেল রপ্তানি করে ইরানকে দেয় মোট ১১৮ মিলিয়ন পাউন্ড। অথচ একই সময়ে কোম্পানির শেয়ারহোল্ডাররা লভ্যাংশ হিসেবে পান ১১৫ মিলিয়ন পাউন্ড এবং ব্রিটিশ সরকারকে কর হিসেবে দেওয়া হয় আরও ১৭৫ মিলিয়ন পাউন্ড। অর্থাৎ ইরানের নিজের ভূগর্ভস্থ সম্পদ থেকে ব্রিটিশ রাষ্ট্র ও শেয়ারহোল্ডাররা মিলে ইরানের প্রাপ্তির প্রায় আড়াই গুণ বেশি অর্থ নিজেদের ঘরে তুলেছিল।

এই বৈষম্যের বিরুদ্ধেই জনপ্রিয় জাতীয়তাবাদী নেতা মোহাম্মদ মোসাদ্দেক — যিনি এর আগে ১৯৪০ সালে রেজা শাহের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় কারাবন্দি হয়েছিলেন এবং তখন থেকেই রাজতন্ত্রবিরোধী মনোভাব পোষণ করতেন। তখনও প্রধানমন্ত্রী নন, বরং মজলিসের তেল-বিষয়ক কমিটির প্রধান হিসেবে ১৯৫১ সালের মার্চে তেল জাতীয়করণের বিলটি খসড়া করে মজলিসে পাস করান।

এই বিলের পক্ষে তার জনপ্রিয়তা এপ্রিলের শেষে এতটাই বেড়ে যায় যে সাংবিধানিক নিয়ম মেনে রাজা মোহাম্মদ রেজা শাহ ২৮ এপ্রিল তাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিতে বাধ্য হন। প্রধানমন্ত্রী হয়ে মোসাদ্দেক এরপর ১৯৫১ সালের ১ মে আগে-পাস-হওয়া সেই আইনটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করেন। অর্থাৎ কাগজে-কলমে পাস হওয়া বিলকে বাস্তবে অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেওয়ার পদক্ষেপে রূপান্তরিত করেন, যা মধ্যপ্রাচ্যে এই ধরনের প্রথম বাস্তবায়িত পদক্ষেপগুলোর একটি। ব্রিটেন প্রবল আপত্তি জানায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানি তেল বয়কটের ব্যবস্থা করে, যার ফলে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের মূল্য প্রায় ৪৫ শতাংশ কমে যায় এবং ইরানের অর্থনীতি কার্যত ধসে পড়ে।

এক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে—ইরানের তেলের উপর অবরোধ, নতুন কিছু নয়। পরাশক্তিগুলো যখনই নিজেদের স্বার্থে আঘাত লেগেছে, ইরানের তেলের উপর অবরোধ আরোপ করেছে। চাই তা আমেরিকার মত অর্থনৈতিক অবরোধ হোক কিংবা বৃটেনের মত সরাসরি নৌবাহিনীর মাধ্যমে সামরিক অবরোধ। ফলে ইরানিরা বিগত প্রায় এক শতাব্দি ধরে তেল অবরোধের সাথে পরিচিত।

এই পর্যায়ে আমরা একটু বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের দিকে চোখ ফেরাব। স্নায়ুযুদ্ধ তখন তুঙ্গে। যুক্তরাষ্ট্র সদ্য কোরিয়া যুদ্ধে জড়িয়েছে এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে সীমান্তবর্তী যেকোনো দেশে কমিউনিস্ট প্রভাবের সম্ভাবনাকে অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে দেখছিল। মোসাদ্দেক নিজে ছিলেন ঘোষিত কমিউনিস্ট-বিরোধী। কিন্তু তার দুর্বল হয়ে পড়া সরকারের প্রতি ইরানি কমিউনিস্ট পার্টি তুদেহ্‌-র সমর্থন বাড়তে থাকে। ব্রিটেন এই সুযোগে যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝাতে সক্ষম হয় যে মোসাদ্দেক ক্ষমতায় থাকলে ইরান সোভিয়েত প্রভাবাধীন হয়ে পড়তে পারে।

প্রথম দফায় আগস্ট ১৬, ১৯৫৩ সালে শাহ রাজকীয় ফরমান জারি করে মোসাদ্দেককে বরখাস্ত করার চেষ্টা করেন, কিন্তু মোসাদ্দেক এই ফরমানকে অসাংবিধানিক আখ্যা দিয়ে মানতে অস্বীকার করেন এবং তার সমর্থকরা রাস্তায় নেমে আসে। পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যাওয়ায় শাহ নিজেই ভয় পেয়ে ১৬ আগস্ট ইরাকের বাগদাদে এবং তারপর ১৮ আগস্ট রোমে পালিয়ে যান।

সেখানে সাংবাদিকদের তিনি দাবি করেন এটি নিছক ‘ছুটি কাটানো’, পালিয়ে যাওয়া নয়। কিন্তু মাত্র দুই দিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ ও ব্রিটিশ MI6-এর যৌথ পরিকল্পনায়  এক অপারেশন পরিচালিত হয়, যার কোডনেম ছিল ‘অপারেশন আজাক্স’। জেনারেল ফজলুল্লাহ জাহেদির নেতৃত্বে সামরিক অফিসার ও ভাড়াটে জনতা, সিআইএ থেকে প্রায় এক লাখ ডলারে কেনা, দ্বিতীয় দফায় ১৯ আগস্ট তেহরানের রাস্তা দখল করে।

তারা মোসাদ্দেকের বাসভবন ঘিরে ফেলে এবং মোসাদ্দেক সরকারের পতন ঘটায়। এই সংঘর্ষে প্রায় ২০০-৩০০ মানুষ নিহত হন। শাহ ২২ আগস্ট বিজয়ীর বেশে ইরানে ফিরে আসেন। মোসাদ্দেককে গ্রেপ্তার করে বিচারে রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়, এরপর তাকে বাকি জীবন গৃহবন্দি রাখা হয়।

মোহাম্মদ রেজা শাহ ফিরে এসে পূর্ণ ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন এবং পরবর্তী ২০ বছরের জন্য তেল শিল্পের নিয়ন্ত্রণ পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর একটি কনসোর্টিয়ামের হাতে ছেড়ে দেন, যদিও দেশীয় রাজস্ব আগের চেয়ে কিছুটা বাড়ে। এই অভ্যুত্থান পরবর্তী দশকগুলোতে ইরানি রাজনৈতিক চেতনায় এক স্থায়ী ক্ষত হয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র ২০০০ সালে এই হস্তক্ষেপের কথা স্বীকার করে।

শাহ এরপর মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্রে পরিণত হন। তিনি ১৯৬৩ সালে ‘শ্বেত বিপ্লব’ নামে ভূমি সংস্কার ও আধুনিকীকরণ কর্মসূচি চালু করেন। কিন্তু তার গোপন পুলিশ সাভাক-এর দমনপীড়ন এবং পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রতি অন্ধ অনুকরণ ধর্মীয় ও বামপন্থী— উভয় শ্রেণিকে বিক্ষুদ্ধ করে তোলে।

এই সময়েই মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি বড় ঘটনা চলছিল— মিশরের জামাল আবদেল নাসেরের নেতৃত্বে ধর্মনিরপেক্ষ, সোভিয়েতপন্থী ‘আরব জাতীয়তাবাদ’, যা আরব বিশ্বজুড়ে রাজতন্ত্রগুলোর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটেই ইসরায়েল একটি ‘পেরিফেরি জোট’ (Periphery Doctrine) কৌশল গ্রহণ করে, যেখানে অ-আরব রাষ্ট্রগুলো ইসরায়েলের সাথে মিলে একটি অ-আরব মৈত্রী জোট গড়ে তোলে। যাতে ইরান, তুরস্ক, ইজরাইল, ইথিওপিয়া ছিল। এই জোটের উদ্দেশ্য ছিল অ-আরব রাষ্ট্রগুলোকে ঘিরে থাকা আরব জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে ভারসাম্য তৈরি করা।

শাহের ইরান এই কৌশলে ইসরায়েলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে ওঠে। গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, তেল সরবরাহ এবং সামরিক সহযোগিতা চলে প্রকাশ্য কূটনৈতিক স্বীকৃতি ছাড়াই। আজকের ইরান-ইসরায়েল শত্রুতা তাই কোনো ‘চিরন্তন’ বৈরিতা নয় — এটি ১৯৭৯ সালের পরের একটি রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস মাত্র।

১৯৭৯: বিপ্লব যা সবকিছু বদলে দেয়

১৯৭৩ এর তেল সঙ্কটের ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম চারগুণ বেড়ে যাওয়ায় ইরানে বিপুল রাজস্ব ঢোকে আর শাহ সেই অর্থ উচ্চাভিলাষী শিল্পায়ন প্রকল্প ও সামরিক খাতে ঢালতে থাকেন। কিন্তু অর্থনীতির এত দ্রুত প্রবৃদ্ধি সামলাতে না পারায় সত্তরের দশকের শেষভাগে তীব্র মূল্যস্ফীতি, অবকাঠামোগত সংকট এবং শহরে ব্যাপক অভিবাসনজনিত চাপ তৈরি হয়। এই প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব স্তরে সমানভাবে পৌঁছায়নি, যা শ্রমিক ও মধ্যবিত্তের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ায়। বরং হটাৎ আসা এই বিপুল অর্থ সমাজে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য তীব্রতর করে। দুর্নীতি ও বিলাসিতাকে অকল্পনীয় পর্যায়ে নিয়ে যায়।

রাজনৈতিকভাবে শাহ ১৯৭৫ সালে বহুদলীয় ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে একদলীয় ‘রাস্তাখিজ’ পার্টি চালু করেন, যা বিরোধী কণ্ঠস্বরকে আরও সংকুচিত করে দেয়। সাভাক-এর নজরদারি ও নির্যাতন বুদ্ধিজীবী, বামপন্থী ও ধর্মীয় নেতাদের বিক্ষুদ্ধ করে তোলে।

এই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৭৮ সালের ৮ সেপ্টেম্বর, যা ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ নামে পরিচিত। তেহরানের জালেহ স্কয়ারে সামরিক আইন জারির পরও জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীদের ওপর সেনাবাহিনী গুলি চালিয়ে কয়েকশ থেকে কয়েক হাজার মানুষ হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডই বিপ্লবের চূড়ান্ত অনুঘটক হয়ে ওঠে। এরপর সারাদেশে সাধারণ ধর্মঘট শুরু হয়ে যায়, তেল শ্রমিকরাও কর্মবিরতিতে যোগ দেয়, আর রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব কার্যত ভেঙে পড়তে থাকে।

চাপের মুখে শাহ ১৯৭৯ সালের ১৬ জানুয়ারি ‘ছুটিতে যাওয়ার’ ভান করে স্ত্রীসহ মিশরে পালিয়ে যান। বিদায়বেলায় তার নিয়োগ করা প্রধানমন্ত্রী শাপুর বখতিয়ারকে বলে যান ‘ইরানকে তোমার আর ঈশ্বরের হাতে সঁপে দিলাম।’ প্যারিসে নির্বাসিত ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ১ ফেব্রুয়ারি তেহরানে ফিরে আসেন এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের বিশাল সংবর্ধনা পান।

খোমেনি ৪ ফেব্রুয়ারি মেহেদি বাজারগানকে—যিনি ছিলেন জাতীয়তাবাদী-ধর্মীয় ‘ফ্রিডম মুভমেন্ট’ দলের নেতা এবং শাহবিরোধী ‘ন্যাশনাল ফ্রন্ট’ জোটের অংশ—অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেন। এভাবে শাহের নিয়োগ করা বখতিয়ার সরকার এবং খোমেনির সমান্তরাল সরকার, এই দুই সরকার একসাথে ইরানে বিদ্যমান থাকে কয়েকদিন। শেষ পর্যন্ত ১১ ফেব্রুয়ারি সেনাবাহিনী শাহ এর উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করলে বখতিয়ার পদত্যাগ করেন এবং পাহলভি রাজতন্ত্রের ৩৭ বছরের শাসনের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে। ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সেনাবাহিনী বিপ্লবীদের দমন করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু সফল হয়নি। অবশেষে রণে ভঙ্গ দেয়।

ইরানের ইসলামি বিপ্লব কোনো একক শক্তির আন্দোলন ছিল না। এতে অন্তত চারটি ভিন্ন স্রোত একসাথে মিশেছিল: (১) খোমেনির নেতৃত্বাধীন শিয়া ধর্মীয় নেতৃত্ব, যাদের লক্ষ্য ছিল ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা; (২) বাজারগানের ‘ফ্রিডম মুভমেন্ট’ ও সেক্যুলারদের ‘ন্যাশনাল ফ্রন্ট’-এর মতো উদারপন্থী জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী, যারা গণতান্ত্রিক সংসদীয় ব্যবস্থা চেয়েছিল; (৩) তুদেহ্‌ পার্টির মতো বামপন্থী-কমিউনিস্ট গোষ্ঠী ও মোজাহেদিন-ই-খালকের মতো ইসলামি-মার্কসবাদী সশস্ত্র সংগঠন, যারা শ্রেণিসংগ্রামভিত্তিক বিপ্লব চেয়েছিল; এবং (৪) কুর্দি ও আজেরির মতো জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠী, যারা আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন চেয়েছিল।

বিপ্লব সফল হওয়ার পেছনে এই বিচিত্র জোটের সম্মিলিত শক্তি কাজ করলেও, বিজয়ের পরপরই ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়। খোমেনি ও তার অনুগত বিপ্লবী পরিষদ ধীরে ধীরে বাজারগানের উদারপন্থী সরকারকে পাশ কাটিয়ে সমান্তরাল কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে থাকে। পরবর্তীতে গঠিত বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি) বাজারগানের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ক্ষয় করতে থাকে।

নতুন সরকার অর্থাৎ খোমেনির অনুমোদনে গঠিত বাজারগানের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে, ইসরায়েলকে ফিলিস্তিনের ‘দখলদার’ হিসেবে চিহ্নিত করে।  যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয়কে আঞ্চলিক বিষয়ে হস্তক্ষেপকারী শক্তি হিসেবে গণ্য করে শত্রু ঘোষণা করে।  

একই বছরের ৪ নভেম্বর একটি ইসলামি বিপ্লবী ছাত্র সংগঠন তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল করে ৫২ জন মার্কিন কূটনীতিককে ৪৪৪ দিন ধরে জিম্মি করে রাখে। এর তাৎক্ষণিক কারণ ছিল কার্টার প্রশাসনের সিদ্ধান্ত। ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য পদচ্যুত শাহকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়। যা ইরানিদের মনে ১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থানের পুনরাবৃত্তির শঙ্কা জাগিয়ে তোলে, যে যুক্তরাষ্ট্র আবারও শাহকে পুনর্বহাল করার ষড়যন্ত্র করছে।

এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী: ইরানের রাজনীতিতে, বাজারগানের উদারপন্থী সরকার দূতাবাস দখলের কয়েকদিনের মধ্যেই পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়। দখলের ঠিক আগে বাজারগান যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ব্রেজিনস্কির সাথে বৈঠক করেছিল। ফলে প্রতিবিপ্লবের শঙ্কা তীব্রতর হয়।

বাজারগানের সরকার পদত্যাগের পর বিপ্লবী পরিষদ ও খোমেনির হাতে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয় এবং উদারপন্থী-ধর্মনিরপেক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বীরা কার্যত রাজনীতির বাইরে চলে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে, দীর্ঘ ৪৪৪ দিনের অচলাবস্থা এবং ১৯৮০ সালের ২৪ এপ্রিল ব্যর্থ উদ্ধার অভিযান ‘অপারেশন ঈগল ক্ল ‘-এ মরুঝড়ে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় ৮ মার্কিন সেনার মৃত্যু প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের প্রশাসনকে চরমভাবে দুর্বল করে দেয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইরাস ভ্যান্স পদত্যাগ করেন, আর ১৯৮০ সালের নির্বাচনে কার্টার রোনাল্ড রেগানের কাছে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত হন। জিম্মিদের রেগানের অভিষেকের মিনিট কয়েক পরেই মুক্তি দেওয়া হয়। এই সংকটই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের তিক্ততার সূচনাবিন্দু হিসেবে কাজ করেছে।

ইরান-ইরাক যুদ্ধ: আট বছরের রক্তক্ষরণ

বিপ্লব-উত্তর বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে ১৯৮০ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ইরান আক্রমণ করেন। এর পেছনে সাদ্দামের হিসাব-নিকাশ ছিল বহুস্তরীয়।

প্রথমত, ১৯৭৫ সালের আলজিয়ার্স চুক্তিতে শাত আল-আরব জলপথের সীমানা ইরানের পক্ষে গিয়েছিল। সাদ্দাম এটিকে ‘অপমানজনক আত্মসমর্পণ’ হিসেবে দেখতেন এবং বিপ্লব-উত্তর দুর্বল ইরানের কাছ থেকে পূর্ণ জলপথ নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেখতে পান। দ্বিতীয়ত, তিনি তেলসমৃদ্ধ খুজেস্তান প্রদেশ দখল করে ইরাকের অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক অবস্থান শক্তিশালী করতে চেয়েছিলেন। এটি ইরানের সর্বপ্রথম ও অন্যতম প্রধান তেলসমৃদ্ধ প্রদেশ। এই প্রদেশে আরব জনগোষ্ঠী সংখ্যাগুরু। ফলে সাদ্দাম ভেবেছিল সহজেই এই প্রদেশ দখল করা যাবে। তৃতীয়ত, খোমেনি ক্ষমতায় এসেই ইরাকসহ প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে শিয়া ইসলামী বিপ্লব রপ্তানির ডাক দিচ্ছিলেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়া জনগোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও ধর্মনিরপেক্ষ সুন্নি-নেতৃত্বাধীন বাথ পার্টির শাসনাধীন ইরাকের জন্য এটি ছিল অস্তিত্বের হুমকি। চতুর্থত, মিশর ১৯৭৯ সালে ইসরায়েলের সাথে পৃথক শান্তিচুক্তি করায় আরব বিশ্বে নেতৃত্বের যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, সাদ্দাম সেই শূন্যস্থান পূরণ করে নিজেকে ‘আরব জাতীয়তাবাদের রক্ষক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন।

তার জেনারেলরা তাকে জানিয়েছিলেন বিপ্লব-উত্তর শুদ্ধি অভিযানে অভিজ্ঞ অফিসারদের বহিষ্কারের ফলে ইরানি সামরিক বাহিনী দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং মাত্র তিন সপ্তাহেই দ্রুত বিজয় সম্ভব। যদিও যুদ্ধে এই মূল্যায়ন ভুল প্রমাণিত হয়। কারণ ইরানি জনগণের বিপ্লবোত্তর জাতীয়তাবাদী মনোবল ও ধর্মীয় আত্মত্যাগের মানসিকতা প্রতিরোধকে অপ্রত্যাশিতভাবে দীর্ঘায়িত করে।

এই যুদ্ধ চলে আট বছর ১৯৮৮ সালের আগস্ট পর্যন্ত। উভয় পক্ষের মিলিয়ে প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ মানুষের প্রাণ যায়। যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে সরাসরি সাদ্দামকে সমর্থন দেয়। গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার করা থেকে শুরু করে অস্ত্র সরবরাহ, সবকিছু। যদিও সাদ্দাম কুর্দি ও ইরানি সেনাদের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করছিলেন। ১৯৮৮ সালে একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইরানি মাইনে আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন প্রেয়িং ম্যান্টিস’ চালিয়ে ইরানের নৌবাহিনীর একটি বড় অংশ ধ্বংস করে দেয়। এর কয়েক মাস পরে মার্কিন রণতরী একটি ইরানি বেসামরিক যাত্রীবাহী বিমান ইরান এয়ার ফ্লাইট ৬৫৫ কে গুলি করে ভূপাতিত করে, যাতে ২৯০ জন যাত্রী নিহত হন। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণের হুমকি, ইরাকের কাছে ভূখণ্ড হারানো, সব মিলে ইরান—রাক যুদ্ধ বন্ধে সম্মত হয়। এবং এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে ইরানিদের মানসে আমেরিকা বিরোধিতা আরও তীব্রতর হয়।

ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে ইরান নিজেদের প্রতিরক্ষা কৌশল ঢেলে সাজায়। ইরান দেখতে পেয়েছে কোনো আঞ্চলিক দেশ ইরানের পাশে দাঁড়ায়নি। ফলে ‘দেশ’ নয়, এমন মিত্র খুঁজতে শুরু করে ইরান। আর এখান থেকেই জন্ম হয় ইরানের প্রক্সি মিলিশিয়াদের। নিষেধাজ্ঞার কারণে আধুনিক বিমানবাহিনী গড়ে তুলতে না পারায় বিকল্প হিসেবে ইরান নিজস্ব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি শুরু করে।

যুক্তি ছিল সরল: বিমানবাহিনী যেখানে আমদানিনির্ভর ও নিষেধাজ্ঞা-সংবেদনশীল, সেখানে দেশীয়ভাবে তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরোধ সক্ষমতা দেবে। ১৯৮২ সাল থেকেই ইরাক যুদ্ধের চাপ কমানোর জন্য ইরান আরেকটি ফ্রন্ট খুলে, লেবাননে। যেখান থেকে জন্ম হিযবুল্লাহর। যা পরবর্তীতে ইরানের আঞ্চলিক ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ (Axis of Resistance) কৌশলের ভিত্তি হয়ে উঠে।

এই কৌশলের মূল যুক্তি ছিল—সরাসরি সামরিক সংঘাতে ইরান প্রচলিত অস্ত্রশক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সমকক্ষ নয়, তাই আঞ্চলিক মিত্র মিলিশিয়াদের মাধ্যমে বহুস্তরীয় প্রতিরোধ গড়ে তোলাই তার নিরাপত্তার মূল স্তম্ভ। পরবর্তী দশকগুলোতে এই কৌশল ধাপে ধাপে বিস্তৃত হয় — ইরাকে শিয়া মিলিশিয়া, ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহী এবং সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের প্রতি সমর্থনের মধ্য দিয়ে, যার প্রতিটিতেই লক্ষ্য ছিল ইসরায়েল ও মার্কিন স্বার্থকে একযোগে একাধিক ফ্রন্টে চাপে রাখা।

পারমাণবিক কর্মসূচি ও নিষেধাজ্ঞার যুগ

ইরানের সামরিক পারমাণবিক প্রচেষ্টা মূলত শুরু হয় ১৯৮৯ সালে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে তেহরানের লাভিজান-শিয়ান এলাকার একটি পদার্থবিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র থেকে, যা পরে ‘আমাদ প্রজেক্ট’ নামে পরিচিতি পায় এবং যার নেতৃত্বে ছিলেন বিজ্ঞানী মোহসেন ফাখরিজাদেহ।

মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল পাঁচটি পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরি করা এবং শাহাব-৩ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে তা সংযোজন করা। এর আওতায় ওয়ারহেড নকশা তৈরি, বিস্ফোরক পরীক্ষা (মূলত পারচিন এলাকায়) এবং একটি ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক পরীক্ষাস্থল প্রস্তুতির কাজ এগিয়েছিল। যদিও অস্ত্র তৈরির উপযোগী সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তখনও তাদের হাতে ছিল না।

২০০২ সালের আগস্টে ইরানের নির্বাসিত বিরোধী সংগঠন ন্যাশনাল কাউন্সিল অব রেজিস্ট্যান্স অব ইরান (NCRI, যার সশস্ত্র শাখা মোজাহেদিন-ই-খালক) এক সংবাদ সম্মেলনে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে জানায় যে ইরান নাতাঞ্জে গোপন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা এবং আরাকে ভারী পানি স্থাপনা তৈরি করছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করে।

২০০৩ সালের মার্চে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণ ইরানি নেতৃত্বকে সতর্ক করে দেয় যে অনুরূপ অভিযোগে তাদের ওপরও হামলা হতে পারে। এই আশঙ্কা থেকেই ২০০৩ সালের অক্টোবরে ইরান ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির (ইইউ-৩) সাথে সমঝোতার মাধ্যমে নিউক্লিয়ার সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করতে রাজি হয়। একই বছরের শেষদিকে আমাদ প্রজেক্ট আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে আইএসআইএস গবেষণা সংস্থার বিশ্লেষণ অনুযায়ী এই স্থগিতাদেশ ছিল কৌশলগত পশ্চাদপসরণ মাত্র। এরপর পরমাণু কর্মসূচিকে দুই ভাগে ভাগ করে ফেলা হয়। একটি প্রকাশ্য বেসামরিক অংশ (নাতাঞ্জ, আরাক) এবং একটি গোপন সামরিক অংশ। সেখানে ইতোপূর্বে প্রাপ্ত জ্ঞান ও প্রযুক্তি গোপনে সংরক্ষণ করে রাখা হয়।

স্থগিতাদেশের পরও কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা লড়াই থামেনি। ২০০৬ সাল থেকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে থাকে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গোপনে কর্মসূচি বিলম্বিত করার প্রচেষ্টা চালায়। ২০০৯-১০ সালে ‘স্টাক্সনেট’ নামের একটি অত্যাধুনিক কম্পিউটার ভাইরাস (যা যৌথভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তৈরি বলে ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয়) নাতাঞ্জের যন্ত্রগুলো ধ্বংস করে দেয়। এর পাশাপাশি ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে অন্তত চারজন ইরানি পারমাণবিক বিজ্ঞানী তেহরানের রাস্তায় গাড়িবোমা বা চুম্বক-বোমা হামলায় নিহত বা আহত হন, যার পেছনে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের হাত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

এই চাপ সত্ত্বেও ইরানের সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম থেমে থাকেনি। ২০১৩ সালের মধ্যে ইরান প্রায় ১৮,০০০ প্রথম প্রজন্মের সেন্ট্রিফিউজ স্থাপন করে ফেলে। এই বাস্তবতা এবং ২০১৩ সালে মধ্যপন্থী প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির নির্বাচনী বিজয় ইরান ও পশ্চিম—দুই পক্ষকেই আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনে। হাসান রুহানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার লক্ষ্যে কূটনীতির প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচারণা চালিয়েছিলেন এবং সর্বোচ্চ নেতা খামেনির সতর্ক সমর্থনও পেয়েছিলেন। ওমানের গোপন মধ্যস্থতায় ওবামা প্রশাসনের সাথে পূর্বনির্ধারিত সংলাপের ভিত্তিতে ২০১৩ সালের নভেম্বরে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি (জয়েন্ট প্ল্যান অব অ্যাকশন) স্বাক্ষরিত হয়, যেখানে ইরান তার উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত সীমিত করার বিনিময়ে আংশিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ ও প্রায় ৪২০ কোটি ডলারের ফ্রোজেন সম্পদে প্রবেশাধিকার পায়।

দীর্ঘ আলোচনার পর ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন ও জার্মানি — এই ছয় শক্তির সাথে ইরান স্বাক্ষর করে যৌথ ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা (JCPOA)। ওবামা প্রশাসন ও ইউরোপীয় মিত্ররা এই চুক্তির পক্ষে ছিল, কারণ যুদ্ধের চাইতে এটি ভাল।

অন্যদিকে ইসরায়েল ও সৌদি আরব প্রকাশ্যে এই চুক্তির বিরোধিতা করে। তাদের যুক্তি ছিল— চুক্তিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণের কোনো শর্ত নেই, আর চুক্তির ‘সানসেট ক্লজ’ অনুযায়ী ২০৩০-এর দশকে সীমাবদ্ধতাগুলো নিজে থেকেই উঠে যাবে। ফলে এটি সাময়িক বিরতি মাত্র, স্থায়ী সমাধান নয়।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) বারবার নিশ্চিত করেছিল যে ইরান এই চুক্তির শর্ত মেনে চলছে। তা সত্ত্বেও ২০১৮ সালের ৮ মে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েল ও সৌদি আরবের যুক্তিতে সহমত জানিয়ে চুক্তিটিকে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ চুক্তি’ আখ্যা দিয়ে একতরফাভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে এই চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নেয়। এবং ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি চালু করে নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এই সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের হিসাব ছিল—অর্থনৈতিক শ্বাসরোধের মাধ্যমে ইরানকে আরও কঠোর শর্তে নতুন চুক্তিতে বাধ্য করা যাবে। কিন্তু বাস্তবে হয় উল্টো। ইরান ধীরে ধীরে সমৃদ্ধকরণের মাত্রা বাড়াতে থাকে এবং IAEA পরিদর্শনে সহযোগিতা কমিয়ে দেয়। ফলে ২০১৯ সালের মধ্যেই ইরান চুক্তির ৩০০ কেজি মজুত-সীমা ও ৩.৬৭ শতাংশ সমৃদ্ধকরণ-সীমা উভয়ই লঙ্ঘন করে। বিশ্লেষকদের অনেকেই ট্রাম্পের এই প্রত্যাহারকে ইরানের সাথে বর্তমান সংকটের একটি মূল সূচনাবিন্দু বলে চিহ্নিত করেন।

সোলাইমানি হত্যা ও প্রতিরোধ অক্ষের সংকোচন

কাসেম সোলাইমানি ছিল ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) অধীন কুদস ফোর্সের কমান্ডার। অর্থাৎ ইরানের বিদেশনীতি শাখার প্রধান, যে শাখা লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইরাকি শিয়া মিলিশিয়া, সিরিয়ার আসাদ বাহিনী ও ইয়েমেনের হুথিদের প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন ও কৌশলগত দিকনির্দেশনা দিত। খামেনির পরই তাকে ইরানের দ্বিতীয় সর্বাধিক ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হতো।

তার হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরি হয় ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে। ২৭ ডিসেম্বর ইরাকে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া কাতাইব হিজবুল্লাহর রকেট হামলায় এক মার্কিন সামরিক ঠিকাদার নিহত হয়। জবাবে ২৯ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র ইরাক ও সিরিয়ায় কাতাইব হিজবুল্লাহর ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে অন্তত ২৫ জন যোদ্ধাকে হত্যা করে। এর প্রতিক্রিয়ায় ৩১ ডিসেম্বর মিলিশিয়া-সমর্থকরা বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসের প্রধান ফটক ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে এবং প্রাচীরের একাংশে আগুন ধরিয়ে দেয়। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, সোলাইমানি নিজে এই দূতাবাস হামলার অনুমোদন দিয়েছিল এবং অঞ্চলজুড়ে মার্কিন কূটনীতিক ও সেনাদের ওপর আরও হামলার পরিকল্পনা করছিল।

এই যুক্তিতে ট্রাম্প ২০২০ সালের ৩ জানুয়ারি বাগদাদ বিমানবন্দরের কাছে ড্রোন হামলার নির্দেশ দেন, যাতে সোলাইমানি ও কাতাইব হিজবুল্লাহর প্রতিষ্ঠাতা আবু মাহদি আল-মুহান্দিসও নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ড ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে এক নতুন উত্তেজনাকর স্তরে নিয়ে যায়। ইরান কয়েকদিন পরে ইরাকে মার্কিন ঘাঁটিতে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, যদিও তাৎক্ষণিক পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়ানো গিয়েছিল।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েলে হামলা এবং তার পরবর্তী গাজা যুদ্ধ পুরো আঞ্চলিক সমীকরণ বদলে দেয়। ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ, হুথি ও ইরাকি মিলিশিয়ারা একে একে ইসরায়েল ও মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়ে ওঠে।  তবে ইরানের কৌশলগত হিসাব ছিল সতর্ক নিয়ন্ত্রিত সংঘাত, সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে প্রক্সিদের মাধ্যমে চাপ ধরে রাখা। কারণ ইরান নিজে জানত যে সরাসরি সামরিক সংঘাতে সে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ নয়।

২০২৪ সালের এপ্রিলে দামেস্কে ইরানি কনস্যুলেটে ইসরায়েলি হামলায় সিনিয়র ইরানি সামরিক কর্মকর্তারা নিহত হওয়ার জবাবে ইরান সরাসরি ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ে। এটি ছিল ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ইরানি ভূখণ্ড থেকে সরাসরি ইসরায়েলে আক্রমণ। যদিও এটি ছিল সতর্ক ও নিয়ন্ত্রিত প্রতীকী জবাব, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরুর উদ্দেশ্যে নয়।

জুলাই ২০২৪-এ হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়াকে তেহরানে শহিদ করা হয়, যা ছিল ইরানের নিজের ভূখণ্ডে গুরুতর নিরাপত্তা ব্যর্থতা এবং গভীর অপমান। এর জবাবে অক্টোবরে ইরান দ্বিতীয়বার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এই দুই সংঘর্ষেই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ব্যাপকভাবে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে ব্যর্থ হয়, যা বিশ্লেষকদের মতে ইরানের সামরিক দুর্বলতা এবং কৌশলগত ঝুঁকিগুলো প্রকাশ্যে নিয়ে আসে। অর্থাৎ ইরানের ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ কৌশল যতটা শক্তিশালী মনে করা হতো, বাস্তবে তার প্রচলিত সামরিক সক্ষমতা অনেক দুর্বল প্রমাণিত হয়।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর-নভেম্বরে ইসরায়েল লেবাননে হিজবুল্লাহর নেতৃত্বকাঠামো কার্যত ধ্বংস করে দেয়। প্রথমে পেজার বিস্ফোরণ, এরপর হাসান নাসরুল্লাহর হত্যাকাণ্ড। এই অভিযানের পেছনে ইজরাইলের যুক্তি ছিল গাজা যুদ্ধের সুযোগে হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতৃত্বকে বিনাশ করে দেওয়া, যেন ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ সবচেয়ে শক্তিশালী অংশটিকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলা যায়।  ফলে ইরানের ওপর ভবিষ্যতে সরাসরি চাপ প্রয়োগের পথ পরিষ্কার হবে।

এই ধ্বংসযজ্ঞ পরোক্ষভাবে সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতনের পথ প্রশস্ত করে। কারণ আসাদের ক্ষমতা টিকে থাকার প্রধান স্তম্ভ ছিল হিজবুল্লাহ ও ইরানের সামরিক সহায়তা, যা তখন নিজেই বিপর্যস্ত। একইসাথে আসাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক রাশিয়া তখন ইউক্রেন যুদ্ধে সামরিক সক্ষমতার সিংহভাগ ব্যয় করছিল। ফলে সিরিয়ায় হস্তক্ষেপের সামর্থ্য কমে গিয়েছিল।

এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর বিদ্রোহী নেতা আহমেদ আল-শারার বাহিনী আকস্মিক অগ্রাভিযানে দামেস্ক দখল করে নেয়। আসাদ রাশিয়ায় পালিয়ে যায়। ইরানের ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক সংযোগের (লেবানন-ইরাক-সিরিয়া করিডোর) পতন ঘটে। এভাবে ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাববলয় ধারাবাহিকভাবে সংকুচিত হতে থাকে, আর ঠিক এই দুর্বল অবস্থাতেই ইরান ২০২৫-২৬ সালের সরাসরি যুদ্ধের মুখোমুখি হয়।

টুয়েলভ-ডে ওয়ার: জুন ২০২৫-এর পূর্বাভাস

২০২৫ সালের ১৩ জুন ইসরায়েল ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’ কোডনেমে ইরানে আকস্মিক হামলা চালায়। নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনাসহ প্রায় ১০০টি লক্ষ্যবস্তুতে ২০০-র বেশি যুদ্ধবিমান দিয়ে ৩৩০-এর বেশি বোমা ফেলে এবং একইসাথে ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার ও পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের হত্যা করে।

এই হামলার অজুহাত ছিল একদিন আগে IAEA বোর্ডের একটি প্রস্তাব, যেখানে ২০০৫ সালের পর প্রথমবারের মতো ইরানকে তার পারমাণবিক বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘনকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। IAEA  এর ৩১ মের একটি প্রতিবেদনে বলা হয় ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত আছে যা দিয়ে নয়টি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি সম্ভব। তবে একই সময়ে মার্কিন জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড কংগ্রেসে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন যে মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী ‘ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না’।

ইজরাইলের হামলার পাল্টা জবাবে ইরান ৫৫০-এর বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ১,০০০-এর বেশি ড্রোন ছোঁড়ে, যেগুলো তেল আবিব ও হাইফায় আঘাত হানে। ১২ দিন ধরে চলা এই সংঘর্ষে ২২ জুন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জড়িয়ে পড়ে। B-2 স্টেলথ বোমারু বিমান দিয়ে নাতাঞ্জ, ইসফাহান ও ফোরদো— এই তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় ‘বাংকার-বাস্টার’ বোমা ফেলে। HRANA-র হিসাবে ইরানে অন্তত ১,১৯০ জন নিহত ও ৪,০০০-এর বেশি আহত হন, আর ইসরায়েলে নিহত হন ২৮ জন।

২৩ জুন ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়, যাকে ট্রাম্প নিজেই ‘১২ দিনের যুদ্ধ’ নাম দেন। তবে যুদ্ধবিরতির পরও ইরান IAEA পরিদর্শকদের ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনায় প্রবেশাধিকার দেয়নি। এবং ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের প্রায় ৪০০ কিলোগ্রামের ভাগ্য অজানাই থেকে যায়, যা পরবর্তী যুদ্ধের একটি বড় অজুহাত হয়ে দাঁড়ায়।

অর্থনৈতিক ধস ও জানুয়ারির গণহত্যা

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ ‘স্ন্যাপব্যাক’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইরানের ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। যার ফলে ইরানি রিয়ালের মূল্য ধসে পড়ে এবং খাদ্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে।

ডিসেম্বরে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এই মুদ্রা ধসকে ‘সর্বোচ্চ চাপ নীতির চূড়ান্ত পরিণতি’ বলে অভিহিত করেন।

প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সরকার সরাসরি নগদ ভাতা (মাথাপিছু প্রায় এক মিলিয়ন তোমান বা সাত ডলার) চালু করে, কিন্তু ততদিনে ভোজ্যতেলের দাম ২০০ শতাংশের বেশি এবং ডিমের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যাওয়ায় এই ভাতা স্বস্তির বদলে অপমানজনক বলে বিবেচিত হয়।

২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের বাজারিরা মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক দুর্দশার প্রতিবাদে দোকান বন্ধ করে রাস্তায় নামেন, যা দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। বিশ্লেষকদের মতে এই আন্দোলনের একটি বিশেষত্ব ছিল। ঐতিহ্যগতভাবে রাজনৈতিক আন্দোলনের মূল নিয়ামক মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবার দরিদ্র শ্রেণির সাথে একই কাতারে নেমে আসে, কারণ ততদিনে মধ্যবিত্তরাও দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল।

২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি সর্বোচ্চ নেতা খামেনি বিক্ষোভকারীদের ‘দাঙ্গাবাজ’ আখ্যা দিয়ে কঠোর দমনের নির্দেশ দেন। ৮ ও ৯ জানুয়ারি— এই দুই দিনে ইরান জুড়ে নিরাপত্তা বাহিনী, বিশেষত বিপ্লবী গার্ড ও এর অধীনস্থ বাসিজ মিলিশিয়া ইন্টারনেট প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়ে বিক্ষোভকারীদের ওপর সরাসরি গুলি চালায়। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী এই নির্দেশ এসেছিল সরাসরি খামেনির কাছ থেকে, সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের অনুমোদনক্রমে।

রাষ্ট্র কেন এত কঠোরভাবে দমন করল— এর পেছনে বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন হলো, ২০২৫ সালের টুয়েলভ-ডে ওয়ারে ইতিমধ্যে সামরিকভাবে ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়া শাসনব্যবস্থা বিশ্বাস করত যে এবার বিক্ষোভ দমনে ব্যর্থ হলে তা শুধু অর্থনৈতিক দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সরাসরি সরকারের পতন ডেকে আনবে। তাই তারা আপসের বদলে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগকেই টিকে থাকার একমাত্র পথ বলে বেছে নেয়।

জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি মাই সাতো জানুয়ারির ১৬ তারিখে জানান অন্তত ৫,০০০ জন নিহত হয়েছেন এবং সংখ্যাটি ২০,০০০ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। মানবাধিকার সংস্থা HRANA পরবর্তীতে ৭,০০৭ জনের নামসহ একটি তালিকা প্রকাশ করে। ২০২২ সালের মাহসা আমিনি বিক্ষোভে মৃতের সংখ্যা ছিল ৫৫১ জন, অর্থাৎ এবারের দমন তার প্রায় ৫৫ থেকে ৬৫ গুণ রক্তক্ষয়ী। ইরান সরকার নিজে দাবি করে ৩,১১৭ জন নিহত হয়েছেন, যাদের একাংশ ‘সন্ত্রাসী’।

২১ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে বিক্ষোভের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়, আর ২৪ ফেব্রুয়ারি একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বাসিজ বাহিনী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। এই পটভূমিতেই বিপ্লবের সাতচল্লিশতম বার্ষিকীতে, ১১ ফেব্রুয়ারি, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে বলেন তিনি সরকারের ‘ত্রুটির’ জন্য ‘লজ্জিত’ এবং খামেনির ‘প্রজ্ঞাবান নেতৃত্বে’ সমস্যার সমাধান করবেন। এই ভাষণে জানুয়ারির ঘটনাকে তিনি ‘মহাশোক’ বলে উল্লেখ করেন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর প্রশংসাও করেন।

অর্থাৎ এই ক্ষমাপ্রার্থনা কোনো পূর্ণাঙ্গ দায় স্বীকার ছিল না, বরং শাসনতন্ত্রের ভেতরে থেকেই জনরোষ প্রশমনের একটি সীমিত প্রচেষ্টা। একই ভাষণে তার সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে কোনো জবাবদিহিতার প্রতিশ্রুতি ছিল না, উল্টো এই দিনই তেহরান ও অন্যান্য শহরে ছাদ থেকে ‘খামেনির মৃত্যু হোক’ স্লোগান শোনা যায়, যা দেখায় ক্ষমাপ্রার্থনা জনরোষ প্রশমনে ব্যর্থ হয়েছিল। এই গণহত্যাই যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপ করার একটা মোক্ষম অজুহাত তৈরি করে দেয়। যদিও সমালোচকরা বলেন মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবাদ আর আরেকটি রাষ্ট্রের ওপর সামরিক আগ্রাসন সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

অপারেশন এপিক ফিউরি: চলমান যুদ্ধের সূচনা

২০২৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ট্রাম্প দাবি করেন ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুনরায় শুরু করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে।  

এটি ছিল এমন দাবি যা তার নিজেরই আগের বক্তব্যের সাথে সাংঘর্ষিক। আগে তিনি বলছিলেন যে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ‘নিশ্চিহ্ন’ হয়ে গেছে। যদিও মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনের সাথে তার এই দাবি অসামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। সেগুলো বলেছিল ইরানের এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে হলে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত সময় লাগবে। কয়েকদিন পর IAEA জানায় ২০২৫ সালের মার্কিন বোমাবর্ষণে অক্ষত থাকা একটি ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত করে রেখেছে।

২০২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি আমেরিকান ইস্টার্ন টাইম বিকাল ৩টা ৩৮ মিনিটে এয়ার ফোর্স ওয়ানে থাকা অবস্থায় ট্রাম্প ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ চালুর নির্দেশ দেন। পরদিন ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানি সময় সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান একযোগে ইরানে হামলা শুরু করে। তখন রোজা চলে।

প্রথম আঘাতেই নিহত হন সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি, তার কন্যা, জামাতা ও নাতি-নাতনি। ইরান সরকার ৪০ দিনের শোক ঘোষণা করে, আর খামেনির দ্বিতীয় পুত্র মোজতবা খামেনিকে ৮ মার্চ নতুন সর্বোচ্চ নেতা মনোনীত করা হয়। ইসরায়েল একে ‘রোয়ারিং লায়ন’ অপারেশন নামে অভিহিত করে এবং দাবি করে এক দিনেই ৫০০ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে যা ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অভিযান।

ট্রাম্প ২৮ ফেব্রুয়ারি রাতে ৮ মিনিটের এক ভিডিও বার্তায় ঘোষণা দেন যে এই হামলার লক্ষ্য ইরানের সরকার পরিবর্তন বা রেজিম চেঞ্জ। পাশাপাশি জিম্মি সংকট, হামাস-হিজবুল্লাহকে সমর্থন এবং বিক্ষোভকারী হত্যার কথা উল্লেখ করেন তিনি।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ একে ‘প্রতিরোধমূলক আক্রমণ’ বলে অভিহিত করেন। অন্যদিকে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ও একাধিক দেশ এই হামলার নিন্দা জানায়। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা একে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও ইরানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন বলে সমালোচনা করেন।

উল্লেখযোগ্য যে, IAEA নিজেই জানায় যে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রায়নের কোনো প্রমাণ তারা পায়নি, যদিও ইরান ‘নিউক্লিয়ার হেজিং’ কৌশল অনুসরণ করছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। অর্থাৎ প্রয়োজনে দ্রুত অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা রাখা, কিন্তু প্রকৃত উৎপাদন এড়িয়ে চলা।

যুদ্ধের বিস্তার: একাধিক ফ্রন্ট একসাথে খুলে যায়

খামেনি হত্যার দুই দিনের মধ্যেই লেবাননের হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলে রকেট হামলা শুরু করে, যা ‘২০২৬ সালের লেবানন যুদ্ধ’ নামে পরিচিত একটি পূর্ণাঙ্গ সংঘাতে রূপ নেয়। ৩ মার্চ ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী দক্ষিণ লেবাননে স্থল অভিযানের অনুমোদন দেন এবং ১৭ মার্চ ইসরায়েল ঘোষণা দেয় যে তারা লিতানি নদী পর্যন্ত এলাকা দখল করবে, ঠিক যেভাবে ১৯৮২ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ইসরায়েল দক্ষিণ লেবানন দখল করে রেখেছিল। এই অভিযানে মার্চের শেষ নাগাদ ১১ লাখেরও বেশি লেবানিজ বাস্তুচ্যুত হয়।

একই সাথে ইরান বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়, এই দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে। কাতার প্রথম দেশ হিসেবে দুটি ইরানি সু-২৪ বোমারু বিমান গুলি করে নামায়। তুরস্কের আকাশসীমায় একাধিকবার ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রবেশ করে, যা ন্যাটো বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে প্রতিহত করা হয়। এই ঘটনা প্রথমবারের মতো ন্যাটোকে যুদ্ধের সরাসরি কক্ষপথে টেনে আনার ঝুঁকি তৈরি করে। সাইপ্রাসে ব্রিটিশ আকরোতিরি বিমানঘাঁটিতেও ড্রোন হামলা হয়।

মার্চের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্র স্ট্রেইট অব হরমুজে ইরানি নৌবাহিনীর ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে এবং একটি মার্কিন সাবমেরিন শ্রীলঙ্কার উপকূলে একটি নিরস্ত্র ইরানি রণতরী (IRIS দেনা) ডুবিয়ে দেয়। ফকল্যান্ডস যুদ্ধের পর এটি ছিল সাবমেরিন দিয়ে ডোবানো প্রথম যুদ্ধজাহাজ।

মার্চের শেষে ও এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধ সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক পর্যায়ে পৌঁছায়। ২১ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র বাংকার-বাস্টার বোমা দিয়ে নাতাঞ্জ স্থাপনায় দ্বিতীয়বার আঘাত হানে। ২ এপ্রিল তেহরান-কারাজ সংযোগকারী B1 সেতুতে মার্কিন হামলায় অন্তত ৮ জন ইরানি বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। তারা সেই সময় সিজদাহ বেদার উৎসব উদযাপনের জন্য সেতুর নিচের পার্কে জড়ো হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা এই হামলাকে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

৭ এপ্রিল ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখে ‘একটি সম্পূর্ণ সভ্যতা আজ রাতে ধ্বংস হবে, যা আর কখনো ফিরে আসবে না’, যা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব ‘গণহত্যার হুমকি’ বলে অভিহিত করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রেই একাধিক রাজনীতিবিদ ট্রাম্পকে ২৫তম সংশোধনীর আওতায় অপসারণের দাবি তোলেন।

যুদ্ধবিরতি, ভাঙন আর পুনরাবৃত্তি

২০২৬ সালের ৭ এপ্রিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়, যা কার্যকর হয় ৮ এপ্রিল থেকে। কিন্তু যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরপরই ইসরায়েল ‘অপারেশন ইটার্নাল ডার্কনেস’ নামে লেবাননে ব্যাপক হামলা চালায়, যাতে অন্তত ৩৫৭ জন নিহত ও ১,২০০-র বেশি আহত হন। এটি ছিল এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় হামলাগুলোর একটি। ইরান দাবি করে লেবানন যুদ্ধবিরতির অন্তর্ভুক্ত না হলে তারা হরমুজ পুনরায় খুলবে না।

১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ২১ ঘণ্টার আলোচনা হয়, যা ছিল ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর দুই দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সংলাপ। কিন্তু কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়। ১৩ এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্র স্ট্রেইট অব হরমুজে নিজস্ব নৌ-অবরোধ শুরু করে, ফলে একটি ‘দ্বৈত অবরোধ’ পরিস্থিতি তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরমুখী জাহাজ আটকায়, আর ইরান নিজেই প্রণালী বন্ধ রাখে। মে মাসের প্রথম সপ্তাহে ৫ মে থেকে প্রধান সামরিক অভিযান আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়, যদিও থেমে থেমে সংঘর্ষ চলতেই থাকে।

জুন মাসে দুই পক্ষ একটি মেমোরান্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং এ একমত হয়, যা ১৪ জুন ঘোষিত হয় এবং ১৭ জুন ভার্সাই প্রাসাদে ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান স্বাক্ষর করেন। কিন্তু জুলাইয়ে এসে পরিস্থিতি আবার অবনতির দিকে যায়। ইরান দাবি করে তারা স্ট্রেইটের ওপর কার্যত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে এবং জাহাজ চলাচলের ওপর ফি আরোপ করবে; ৬-৭ জুলাই তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে গুলি চালানোর পর যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা হামলা শুরু করে। ৯ জুলাই মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড দাবি করে তারা প্রায় ৯০টি ইরানি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে, আর ইরান জর্ডান, কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনে পাল্টা ড্রোন হামলা চালায়।

১০ জুলাই ট্রাম্প ঘোষণা দেন যুদ্ধবিরতি ‘শেষ হয়ে গেছে,’ যদিও পরদিনই তিনি বলেন এই সংঘর্ষ দীর্ঘমেয়াদী সামরিক অভিযানে রূপ নেবে না। অর্থাৎ, এই প্রতিবেদন লেখার সময় (১২ জুলাই ২০২৬) থেমে থেমে সংঘর্ষ চলছে এবং কোনো স্থায়ী ও চূড়ান্ত সমঝোতা এখনো হয়নি।

মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির হিসাব বিশাল এবং সব পক্ষেই ছড়িয়ে আছে। মার্কিন ও ইসরায়েলি হিসাব অনুযায়ী ইরানে ৬,০০০-এর বেশি সামরিক বাহিনী সদস্য নিহত হয়েছে। আর HRANA-র হিসাবে সামরিক-বেসামরিক মিলিয়ে মোট মৃতের সংখ্যা প্রায় ৩,৬৩৬ জন; ইরানের নিজস্ব হিসাবে অর্থনৈতিক ক্ষতি ৩০০ বিলিয়ন থেকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের মধ্যে।

যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে হিসাব করলে করদাতাদের ওপর যুদ্ধের খরচ ১১৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে বলে জুনের হিসাবে জানা যায়। অবশ্য মার্কিন সামরিক বাহিনীর সরাসরি প্রাণহানি তুলনামূলক সীমিত ছিল। কারণ যুদ্ধের বেশিরভাগ অংশ আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র-নির্ভর ছিল, স্থল অভিযান ছিল না। লেবাননে ১১ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর বিমান ও নৌ অবকাঠামোতে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ইউনিসেফ জানায়, যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহেই অন্তত ১,১০০ শিশু নিহত বা আহত হয়েছে। ইসফাহানের সাফাভি আমলের ঐতিহাসিক রাশক প্রাসাদসহ একাধিক ইউনেস্কো-স্বীকৃত ঐতিহ্যস্থাপনা ধ্বংস হয়েছে, যা ব্লু শিল্ড ইন্টারন্যাশনাল যুদ্ধাপরাধ বলে অভিহিত করেছে।

উভয় পক্ষের কৌশলগত হিসাব-নিকাশ

এই যুদ্ধকে বুঝতে হলে জানতে হবে, দুই পক্ষই কেন মনে করেছিল যুদ্ধ তাদের স্বার্থে যাবে।

যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের হিসাব: ২০২৬ সালের প্রথম দিকে ইরান ছিল তার সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে। ২০২৪ সালে হিজবুল্লাহ কার্যত ধ্বংস হয়ে যায়, আসাদ পলাতক, হামাস বিধ্বস্ত, আর ২০২৫ সালের টুয়েলভ-ডে ওয়ারে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মজুত ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।

ইসরায়েলি নেতৃত্বের কাছে এটি ছিল সুবর্ণ সুযোগ। এমন এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত যেখানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও নেতাদেরকে একসাথে ‘নিষ্ক্রিয়’ করে দেওয়া সম্ভব, স্থায়ীভাবে। নেতানিয়াহু জানুয়ারি ২০২৬-এ ট্রাম্পের কাছে যৌথ হামলার জন্য তৎপরতা শুরু করে। জানুয়ারি মাসেই নিজ জনগণের উপর ইরান সরকারের গণহত্যা তাদের এই যুক্তিকে নৈতিক আবরণ দেয় যে তেহরানের শাসনব্যবস্থা তার নিজের জনগণের প্রতিই সহিংস, ফলে আন্তর্জাতিক সমাজের কাছে তা অপসারণযোগ্য।

ইরানের হিসাব: ইরানি নেতৃত্বের মূল লক্ষ্য ছিল যুদ্ধকে যতটা সম্ভব ছড়িয়ে দেওয়া, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কূটনৈতিক চাপ তৈরি হয় এবং যুদ্ধ দ্রুত শেষ করতে বাধ্য করা যায়। এ কারণেই ইরান একসাথে ছয়-সাতটি দেশে হামলা চালিয়েছে, হরমুজ বন্ধ করে বিশ্ব অর্থনীতিতে আঘাত হেনেছে এবং হিজবুল্লাহকে যুদ্ধে জড়িয়ে যুদ্ধবিরতির শর্তে লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেছে।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই কৌশল আংশিক সফল হয়েছে। কারণ ইরান যুদ্ধ শেষ না করেই স্ট্রেইট অব হরমুজের ওপর নজিরবিহীন নিয়ন্ত্রণ অর্জন করেছে, যা যুদ্ধ-পূর্ববর্তী অবস্থাতেও ছিল না।

যুদ্ধ কি তার লক্ষ্য অর্জন করেছে? এখানেই সবচেয়ে বড় বিতর্ক। ট্রাম্প প্রশাসন বারবার ‘বিজয়’ ঘোষণা করেছে এবং দাবি করেছে ইরানি সামরিক বাহিনী ‘ধ্বংস’ হয়ে গেছে।

কিন্তু ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ও স্মল ওয়ারস জার্নালের বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন যে যুদ্ধের ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর—ক্ষমতা পরিবর্তন, স্ট্রেইট অব হরমুজ পুনরায় খোলা, ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব শেষ করা— কোনোটিই স্পষ্টভাবে অর্জিত হয়নি। মার্কিন কংগ্রেসের সমালোচকরা এই যুদ্ধকে ‘ব্যয়বহুল’ এবং লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, ইরানের নিজস্ব ভাষ্য অনুযায়ী তারা ‘প্রতিরোধে’ সফল হয়েছে এবং কোনো আপস ছাড়াই টিকে গেছে।

ইরানের পারমাণবিক দ্বিধা: ‘থ্রেশহোল্ড’ কৌশলের ব্যর্থতা

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ধারণা ব্যাখ্যার দাবি রাখে। ‘থ্রেশহোল্ড’ বা পারমাণবিক ল্যাটেন্সি কৌশল মানে হলো— একটি দেশ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রায় সব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যেমন সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম, মূল যন্ত্রপাতি, প্রকৌশল জ্ঞান ইত্যাদি হাতে রাখে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে অস্ত্র সংযোজন ও পরীক্ষা থেকে বিরত থাকে, যাতে আন্তর্জাতিকভাবে নিষেধাজ্ঞা বা হামলার মুখোমুখি না হতে হয় আবার প্রয়োজনে দ্রুত অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা বজায় থাকে।

জাপান এই কৌশলের একটি সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। ২০০৬ সাল থেকেই ইরানি কর্মকর্তারা ‘জাপান মডেল’ অনুসরণের কথা বলে আসছিল। ২০১৫ সালের JCPOA স্বাক্ষরের মাধ্যমে ইরান কার্যত এই মডেলই বেছে নিয়েছিল।

কিন্তু ২০২৫-২৬ সালের যুদ্ধ এই কৌশলের একটি বড় দুর্বলতা প্রকাশ্যে নিয়ে আসে। বিশ্লেষকদের মতে থ্রেশহোল্ড কৌশল প্রকৃত পারমাণবিক অস্ত্রের মতো কার্যকর প্রতিরোধ ক্ষমতা দেয় না, বরং উল্টো প্রতিপক্ষকে উৎসাহিত করে অস্ত্র চূড়ান্তভাবে তৈরি হওয়ার আগেই আক্রমণ করে কর্মসূচি ধ্বংস করে দিতে। কারণ প্রতিপক্ষ নিশ্চিত নয় ইরান আসলে কতদূর এগিয়েছে, আর সেই অনিশ্চয়তাই আক্রমণের যুক্তি জোগায়।

এর বিপরীতে উত্তর কোরিয়া ২০০৬ সালে সরাসরি পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়ে থ্রেশহোল্ড অতিক্রম করে ফেলেছিল এবং এরপর থেকে কোনো বৃহৎ শক্তি তাদের ওপর সামরিক হামলা চালানোর ঝুঁকি নেয়নি। কারণ প্রতিশোধমূলক পারমাণবিক জবাবের নিশ্চয়তা উত্তর কোরিয়াকে কার্যকর প্রতিরোধ দিয়েছে।

এই বৈপরীত্য দেখে ইরানের হার্ডলাইনার অংশ মনে করছে থ্রেশহোল্ড কৌশলের কারণে তারা ‘নিরাপত্তা গ্যারান্টি’ ছাড়াই (যা পরমাণু অস্ত্রের মাধ্যমে অর্জিত হবে) আক্রমণের মুখে পড়েছে। আর ভবিষ্যতে টিকে থাকতে হলে হয়তো সরাসরি উত্তর কোরিয়ার পথ অনুসরণ করাই একমাত্র বিকল্প। যদিও অপর অংশ মনে করে কূটনৈতিক সমঝোতাই এখনো ভালো পথ।

উভয় বিকল্পই ঝুঁকিপূর্ণ। অস্ত্র তৈরির দিকে গেলে নতুন করে হামলার আশঙ্কা বাড়বে। আর কূটনীতি চালিয়ে গেলে আরেকটি ‘সারপ্রাইজ অ্যাটাক’-এর সামনে দুর্বল থেকে যাওয়ার শঙ্কা থেকেই যাবে।

আঞ্চলিক জোট বিন্যাস: কে কোন পক্ষে

এই যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি কোনো পরিষ্কার দ্বি-মেরু সংঘাত নয়। উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলো ২০২৬ সালের শুরুতে আসলে এক ধরনের ‘মধুর অবস্থানে’ ছিল। ব্রুকিংসের ফিলিপ গর্ডনের ভাষায় ইরানের সামরিক শক্তি, পারমাণবিক কর্মসূচি ও প্রক্সি নেটওয়ার্ক আগের বছরগুলোর সংঘর্ষে ইতিমধ্যেই মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু দুর্বল ইরানি শাসনব্যবস্থা এখনো ক্ষমতায় ছিল, যা আরব রাষ্ট্রগুলোর জন্য অস্থিতিশীল ক্ষমতা পরিবর্তনের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ ছিল।

এ কারণেই সৌদি আরব, কাতারসহ অধিকাংশ উপসাগরীয় রাষ্ট্র প্রকাশ্যে যুদ্ধের বিরোধিতা করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি। যদিও গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ব্যক্তিগতভাবে হামলাকে উৎসাহিত করেছিল বলে জানা যায়। যা থেকে বোঝা যায় প্রকাশ্য অবস্থান আর ব্যক্তিগত হিসাব-নিকাশ ভিন্ন হতে পারে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত পাল্টা ইরানে হামলা চালাতে বাধ্য হয় এবং ইরাকের ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের সাথে খণ্ডযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।

তুরস্ক নিজের আকাশসীমা রক্ষার জন্য ন্যাটোর সহায়তায় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে, কিন্তু প্রত্যক্ষ যুদ্ধে জড়ায়নি। রাশিয়া চীন উভয়ই যুদ্ধের নিন্দা জানিয়েছে কিন্তু সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থেকেছে। স্মল ওয়ারস জার্নালের একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সংঘাতে সবচেয়ে বড় কৌশলগত লাভবান হতে পারে রাশিয়া ও চীন। কারণ যুক্তরাষ্ট্রকে তার সামরিক সম্পদ ও মনোযোগ মধ্যপ্রাচ্যে ব্যয় করতে হচ্ছে, ঠিক যখন ইউক্রেন যুদ্ধ ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলেও যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ প্রয়োজন।

ইউরোপীয় শক্তিগুলো বিভক্ত অবস্থানে ছিল। ব্রিটেন সাইপ্রাসের ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিলেও ইউরোপের ন্যাটো মিত্ররা স্ট্রেইট অব হরমুজ পুনরায় খুলতে সামরিক সহায়তা দিতে অস্বীকার করে, যার জবাবে ট্রাম্প তার নিজের ন্যাটো মিত্রদের ‘নির্বোধ’ বলে সমালোচনা করেন এবং জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়াকেও যুদ্ধে যোগ না দেওয়ার জন্য ভর্ৎসনা করেন।

মধ্যপ্রাচ্যের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ: চারটি দৃশ্যপট

বিশ্লেষকরা মূলত চার ধরনের সম্ভাব্য পরিণতির কথা বলছেন।

এক; শাসনব্যবস্থার পতন বিশৃঙ্খলা যদি বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি) দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনী (আরতেশ) জনগণের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে শাসনব্যবস্থার দ্রুত পতন ঘটতে পারে। কিন্তু ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণ সতর্ক করে দিয়েছে যে ‘শাসনব্যবস্থার পতন’ মানেই ‘ক্ষমতার সুশৃঙ্খল পরিবর্তন’ নয়। এর পরিণতি হতে পারে সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খলা, অথবা আসাদ বা সাদ্দামের মতো আরেকটি আগ্রাসী স্বৈরতন্ত্রের উদ্ভব। যারা হয়ত উগ্রতায় বর্তমান রেজিমের মতই হবে, জাস্ট ধর্মীয় মতাদর্শ তাড়িত হবে না।

দুই; স্থবির অচলাবস্থা ২০২৫ সালের টুয়েলভ-ডে ওয়ারের মতো একটি আংশিক সমঝোতা, যেখানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত হবে কিন্তু শাসনব্যবস্থা টিকে থাকবে। ফলে বিশাল সামরিক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও মৌলিক সমস্যার সমাধান হবে না।

তিন; পারমাণবিক দৌড়ঝাঁপ যদি ইরান মনে করে তার থ্রেশহোল্ড পারমাণবিক কৌশল ব্যর্থ হয়েছে, তাহলে তারা উত্তর কোরিয়ার মডেল অনুসরণ করে সরাসরি অস্ত্র পরীক্ষার দিকে যেতে পারে। যা গোটা অঞ্চলে নতুন করে অস্থিতিশীলতা তৈরি করবে এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের জন্য স্পষ্ট কৌশলগত পরাজয় হিসেবে গণ্য হবে।

চার; আঞ্চলিক পুনর্বিন্যাস ব্রুকিংসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইসরায়েল-আরব স্বাভাবিকীকরণ (আব্রাহাম অ্যাকর্ডস সম্প্রসারণ) এই যুদ্ধের কারণে অন্তত মধ্যমেয়াদে থমকে গেছে। সৌদি আরব ও কাতার ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সম্ভাবনা থেকে আরও দূরে সরে গেছে, যদিও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক আরও গভীর করতে পারে। উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে চীন, রাশিয়া ও পাকিস্তানের সাথে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বহুমাত্রিক করার দিকে ঝুঁকছে। কারণ এই যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সম্মিলিত আপত্তি উপেক্ষা করেও একতরফা সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং সেই যুদ্ধে তাদের নিরাপত্তারক্ষায় গুরুতরভাবে ব্যর্থ হতে পারে।

এই যুদ্ধে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে—যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক আধিপত্য!

উপসংহার: সরলীকরণের বিপদ

ইরানের গত একশ বছরের ইতিহাস আসলে একটি পুনরাবৃত্ত চক্রের ইতিহাস— বিদেশি হস্তক্ষেপ, তার বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী প্রতিক্রিয়া, এবং সেই প্রতিক্রিয়া থেকে জন্ম নেওয়া এক কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা, যে নিজের জনগণের ওপরই সবচেয়ে নিষ্ঠুর দমন-পীড়ন চালায়।

১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থান শাহের স্বৈরতন্ত্রকে শক্তিশালী করেছিল, আর সেই স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিক্ষোভই জন্ম দিয়েছিল ১৯৭৯ সালের ইসলামী প্রজাতন্ত্র, যে প্রজাতন্ত্র নিজেই ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে নিজ জনগণের ওপর ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়ন চালিয়েছে।

এই যুদ্ধে কোনো পক্ষকেই নির্দোষ বলা যায় না। ইরানি শাসনব্যবস্থা দশকের পর দশক ধরে প্রক্সি মিলিশিয়া দিয়ে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করেছে, নিজ জনগণকে দমন করেছে এবং পারমাণবিক কর্মসূচির অস্বচ্ছতা দিয়ে আন্তর্জাতিক অবিশ্বাস উস্কে দিয়েছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এমন একটি যুদ্ধ শুরু করেছে যার আইনি বৈধতা নিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক আইনবিদরা পর্যন্ত প্রশ্ন তুলেছেন, যে যুদ্ধে বেসামরিক অবকাঠামো, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল ও ঐতিহ্যস্থাপনা ধ্বংস হয়েছে, আর যার ঘোষিত মূল লক্ষ্য— ক্ষমতা পরিবর্তন —এখনো অধরা। কখনো ধরা দিবে সেই সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। ধরা দিলেও সেটা এই অঞ্চল ও বিশ্ববাসীর জন্য কল্যাণকর হবে তেমন কোনো নিশ্চয়তাও নেই।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী কোনো রাষ্ট্র নয়— সাধারণ ইরানি, লেবানিজ ও উপসাগরীয় নাগরিক। যারা নিজেদের সিদ্ধান্তে এই যুদ্ধে জড়ায়নি কিন্তু যুদ্ধের প্রধান শিকার হয়েছেন।

ইরানের সাধারণ মানুষ একদিকে নিজের সরকারের গুলিতে মরেছে, অন্যদিকে বিদেশি বোমায়ও মরেছে। কোনো পক্ষই তাদের নিরাপত্তা দিতে পারেনি বা হয়ত নিরাপত্তা দিতে চায়ও নি।

ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়— এই যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত থামবে কবে, এবং থামলেও, যে ধ্বংসস্তূপ আর অবিশ্বাসের ওপর মধ্যপ্রাচ্যের পরবর্তী অধ্যায় লেখা হবে, তা কি আদৌ আগের চেয়ে বেশি স্থিতিশীল হবে?

তথ্যসূত্র

  • Council on Foreign Relations (CFR). “The 2026 Iran War: A Strategic Overview.”
  • Center for Strategic and International Studies (CSIS). “The Twelve-Day War: Escalation and Ceasefire.”
  • Amnesty International. “Casualties of the Twelve-Day War.”
  • United Nations Human Rights Council (UNHRC). “Report on the 2025–2026 Iran Massacres.”
  • Human Rights Watch. “Iran: Growing Evidence of Countrywide Massacres.”
  • Iran International. “100 days on: the anatomy of Iran’s January crackdown.”
  • Amnesty International. “Iran: Lack of international justice six months after January protest massacres.”
  • Brookings Institution. “How the Iran war will change the Middle East.”
  • Atlantic Council. “Five ways the Iran war will forever alter the Middle East.”
  • Small Wars Journal. “From Bargain to Breakdown: Five Strategic Futures for the Iran War.”
  • Washington Institute for Near East Policy. “The Middle East After the Iran War: Lessons and Outcomes.”
  • World Economic Forum. “Iran war: What’s next for the Middle East?”
  • Encyclopedia Britannica. “1953 Iranian Coup d’État.”
  • Encyclopedia Britannica. “Mohammad Reza Shah Pahlavi.”
  • Encyclopedia Iranica. “The Iranian Revolution of 1978-79.”
  • History.com. “Iran Hostage Crisis.”
  • Encyclopedia Britannica. “Iran–Iraq War (1980–1988).”
  • Institute for Science and International Security (ISIS). “The AMAD Project.”
  • Council on Foreign Relations (CFR). “Nuclear Program of Iran.”
  • Center for Strategic and International Studies (CSIS). “The Stuxnet Worm.”
  • BBC News. “Assassination of Qasem Soleimani: US Strike Kills Top Iran General.”
  • Carnegie Endowment for International Peace. “2025–2026 Iranian Protests: The Economic Catalyst.”
  • Washington Institute for Near East Policy. “Iran’s Nuclear Model: Japan or North Korea?”
  • Foreign Affairs. “The North Korean Way of Proliferation.”
  • Texas National Security Review. “What Good Is a Nuclear Threshold Capability?”
  • What Good Is a Nuclear Threshold Capability? — Texas National Security Review

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles
সমসাময়িক বিশ্লেষণ

হেজাজ রেলওয়ের পুনরুজ্জীবন কেন ইজরায়েলের জন্য হুমকি?

সমসাময়িক বিশ্লেষণ•June 30, 2026সমসাময়িক বিশ্লেষণহেজাজ রেলওয়ের পুনরুজ্জীবন কেন ইজরায়েলের জন্য হুমকি?সাকিব রায়হান•22...

রাজনৈতিক দর্শনসমসাময়িক বিশ্লেষণ

মালয়েশিয়ার সংবিধানে ইসলাম ও শরিয়া গভর্ন্যান্স: একটি আইনি বিশ্লেষণ

রাজনৈতিক দর্শন•June 26, 2026রাজনৈতিক দর্শনসমসাময়িক বিশ্লেষণমালয়েশিয়ার সংবিধানে ইসলাম ও শরিয়া গভর্ন্যান্স: একটি...

সমসাময়িক বিশ্লেষণ

৫৪ দেশে জরিপঃ ধর্মীয় বিশ্বাসের বৈশ্বিক চিত্র

সমসাময়িক বিশ্লেষণ•June 23, 2026সমসাময়িক বিশ্লেষণ৫৪ দেশে জরিপঃ ধর্মীয় বিশ্বাসের বৈশ্বিক চিত্রদ্য মুসলিম...

ইসলামি ঐতিহ্যমডার্নিটিরাজনৈতিক দর্শনসমসাময়িক বিশ্লেষণ

নেশন-স্টেট, নৈতিকতা ও কাঠামোগত সংকট

ইসলামি ঐতিহ্য•June 22, 2026ইসলামি ঐতিহ্যমডার্নিটিরাজনৈতিক দর্শনসমসাময়িক বিশ্লেষণনেশন-স্টেট, নৈতিকতা ও কাঠামোগত সংকটআবদুল্লাহ আল-রায়হান•40...