নতুন ডিপ্লোমা প্রোগ্রাম ২০২৬ শুরু হয়েছে! ক্রিটিক্যাল সোশ্যাল থট অ্যান্ড ইসলামিক ট্র্যাডিশন ডিপ্লোমা সম্পর্কে জানুন → নতুন ডিপ্লোমা প্রোগ্রাম ২০২৬ — ডিপ্লোমা সম্পর্কে জানুন →

রাজনৈতিক দর্শন

রাষ্ট্র কেন ইতিহাস নিয়ন্ত্রণ করতে চায়? 

Share
Share

রাষ্ট্র কেন ইতিহাস নিয়ন্ত্রণ করতে চায়?

ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার নেশায় প্রায় প্রতিটি একনায়কই সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক জগৎ কবজা করার চেষ্টা চালায়। এই প্রক্রিয়ায় ইতিহাসের ওপর চলে কাটাছেঁড়া; জন্ম নেয় শাসকের পছন্দমাফিক এক কাল্পনিক বয়ান। এক সময় পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, ক্ষমতার দাপটে হওয়া নানা নীতিহীন কাজকেও সাধারণ মানুষ স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শুরু করে। 

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের সমাজে ইতিহাসের বয়ানগুলো বেশ দ্বিধাবিভক্ত। কখনো ঘোষণা বা ঘোষক নিয়ে চলে অন্তহীন বিতর্ক, আবার কখনো পুরো যুদ্ধের কৃতিত্ব কেবল একজনের কাঁধে তোলার একটা চেষ্টা দেখা যায়। অথচ ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, আমাদের স্বাধীনতা কোনো একক ব্যক্তির জাদুমন্ত্রে আসেনি। এটি ছিল কয়েক দশকের ধারাবাহিক রাজনৈতিক আন্দোলন, গণবিস্ফোরণ এবং সবশেষে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের চূড়ান্ত ফসল। যেখানে আমজনতা থেকে শুরু করে ছাত্র, শিক্ষক আর আপামর বাঙালির রক্ত মিশে আছে।

দুর্ভাগ্যজনক হলো, ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথে স্বাধীনতার এই বিশাল ক্যানভাসকেও ছোট-বড় করা হয়েছে। শাসকরা নিজেদের গদি সামলাতে ইতিহাসের সেই সব অংশই বারবার সামনে এনেছেন যা তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করে। এতে কখনো কারো অবদানকে আকাশচুম্বী করা হয়েছে, আবার কখনো কাউকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে বিস্মৃতির আড়ালে। ফলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মহাকাব্যটি এখন মুক্তবুদ্ধির গবেষণার চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ঢাল হিসেবেই বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে এইসব বয়ান পরিবর্তনের পেছনে মূল কারণ কী? রাষ্ট্র কেন বারবার ইতিহাসকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে চায়? এই প্রশ্নের সহজ উত্তর আমরা পাই Nineteen Eighty-Four (1984) উপন্যাসে। জর্জ অরওয়েল তাঁর ১৯৪৯ সালের এই ডিস্টোপিয়ান ফিকশনে একটি বিখ্যাত উক্তি করেছিলেন—

Who controls the past controls the future; who controls the present controls the past.

অর্থাৎ, যে বর্তমানকে নিয়ন্ত্রণ করে সে অতীতের ব্যাখ্যাও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে; আর যে অতীতকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে ভবিষ্যৎ সমাজের চিন্তা, চেতনা ও দিকনির্দেশনাকেও প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়।

অরওয়েল তাঁর এই উপন্যাসে দেখিয়েছেন, কীভাবে রাষ্ট্র রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য ইতিহাস পুনর্লিখন, তথ্য গোপন এবং প্রোপ্যাগান্ডা ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে জনগণের স্মৃতি ও চেতনাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। এই ধারণার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় জোসেফ স্ট্যালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং অ্যাডলফ হিটলারের নাৎসি জার্মানিতে।

১৯২৪ সালে ভ্লাদিমির লেনিনের মৃত্যুর পর সোভিয়েত ইউনিয়নে স্টালিন ক্ষমতায় আসে। ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরপরই স্টালিন ইতিহাসকে ব্যাপকভাবে পুনর্লিখনের প্রক্রিয়া শুরু করে। যেসব বিপ্লবী নেতা একসময় বলশেভিক বিপ্লবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন কিন্তু পরে স্টালিনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হন, তাদের ধীরে ধীরে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা হতো।  

পুরোনো ছবি কাট-ছাট সম্পাদনা করে তাদের সরিয়ে দেওয়া হতো, বই ও সংবাদপত্র পরিবর্তন করা হতো, এমনকি স্কুলের পাঠ্যবইয়েও নতুন ব্যাখ্যা সংযুক্ত করা হতো। ফলে সোভিয়েত ইউনিয়নের জনগণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এমন এক অতীত সম্পর্কে শিক্ষা পেতে থাকে, যেখানে স্টালিনকেই প্রায় এককভাবে সোভিয়েত রাষ্ট্রের রক্ষক ও বিপ্লবের প্রধান নায়ক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

একইভাবে নাৎসি জার্মানিতে অ্যাডলফ হিটলার ‘ইতিহাস’কে ব্যবহার করেছিল জার্মান জাতীয়তাবাদ ও বর্ণবাদী মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে। নাৎসি মিডিয়া ব্যবস্থা জার্মানির অতীতকে এমনভাবে উপস্থাপন করত, যেন জার্মান জাতি একটি ‘শ্রেষ্ঠ জাতি’, যারা ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতার কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছে।  

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পরাজয়ের জন্য তারা ইহুদি জাতি ও রাজনৈতিক বিরোধীদের দায়ী করত। বিভিন্ন প্রোপ্যাগান্ডার মাধ্যমে জনগণকে বোঝানো হতো যে, এই গোষ্ঠীগুলোই জার্মানির পরাজয়, অর্থনৈতিক সংকট ও দুর্বলতার জন্য দায়ী। ফলে তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও প্রতিশোধের মানসিকতা তৈরি হতে থাকে। পরবর্তীতে হলোকস্ট সংঘটিত হয়। 

যখন রাষ্ট্র মানুষের অতীত স্মৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন মানুষ ধীরে ধীরে সত্য যাচাই করার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে। কারণ সাধারণ মানুষ ইতিহাস, সংবাদপত্র, শিক্ষা ও সরকারি বয়ানের মাধ্যমেই অতীতকে জানতে পারে। যদি এই সমস্ত মাধ্যম রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তাহলে ‘সত্য’ বলতে যা বোঝানো হবে, মানুষ সেটাকেই সত্য হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য হবে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরেও মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে বিভিন্ন শ্রেণি ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থ ও অবস্থান অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন ন্যারেটিভ নির্মাণের চেষ্টা করেছে। অথচ মোটাদাগে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছিল অন্যায় ও দমননীতির বিরুদ্ধে একটি মিশ্র রাজনৈতিক-সামরিক-জনগণভিত্তিক মুক্তিসংগ্রাম, যেখানে রাজনৈতিক আন্দোলন, সশস্ত্র যুদ্ধ এবং জনসমর্থন—সবকিছু মিলেই একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। 

কিন্তু ১৯৭১ সালের পর থেকে এই মৌলিক সত্যকে বারবার আড়াল করার প্রবণতা দেখা গেছে। বিশেষ করে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে স্বাধীনতার ইতিহাসকে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে যেভাবে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে পুরো কৃতিত্ব এককভাবে তুলে ধরা হয়েছে, তা অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে অতিরঞ্জিত ব্যাখ্যার দিকে নিয়ে যায়। এর ফলে মুক্তিযুদ্ধের বহুমাত্রিক যে বাস্তবতা—যেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সশস্ত্র সংগ্রাম এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত ভূমিকা ছিল—তা দিনশেষে সংকুচিত হয়ে গিয়েছে। 

এমনকি ইতিহাসকে সংকুচিত করা কিংবা ধামাচাপা দেওয়ার এই প্রবণতা যে কেবল অতীতের বিষয়, তা নয়। বরং জুলাই পরবর্তী সময়েও আমরা দেখেছি, কীভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু বাস্তবতা আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে। একইভাবে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তিগুলোও নিজেদের স্বার্থ ও বৈধতা রক্ষার জন্য মিডিয়া ও রাষ্ট্রীয় বয়ানের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে এবং বর্তমানেও করছে। 

কিন্তু কেন এমনটি ঘটে? কেন ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠী বারবার ইতিহাস ও জনস্মৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়? মোটাদাগে এই প্রশ্নের কয়েকটি উত্তর পাওয়া যায়। 

প্রথমত, ক্ষমতার বৈধতা তৈরি করার জন্য। শাসকগোষ্ঠী চায় জনগণ যেন তাদের শাসনকে স্বাভাবিক ও ন্যায়সঙ্গত বলে মনে করে। তাই তারা ইতিহাসকে এমনভাবে উপস্থাপন করে, যাতে জনগণের মধ্যে এই ধারণা তৈরি হয় যে বর্তমান ক্ষমতাসীনরাই রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের স্বাভাবিক অধিকারী। ফলে রাষ্ট্র বৈষম্যকে ইতিহাসের স্বাভাবিক বিবর্তন হিসেবে দেখানোর একটি সুযোগ পায়, যার মাধ্যমে শাসকশ্রেণী নিপীড়নমূলক কাঠামোকেও সমাজে ন্যায্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সুযোগ লাভ করে। 

দ্বিতীয়ত, আধিপত্য বজায় রাখার জন্য। প্রভাবশালী শাসকগোষ্ঠী সাধারণত চায় না যে, ইতিহাসের পুনর্লিখন বা পুনর্ব্যাখ্যার মাধ্যমে তাদের অতীতের দমন-পীড়ন, সহিংসতা, দুর্নীতি কিংবা রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার বিষয়গুলো জনগণের সামনে প্রকাশিত হোক। কারণ এসব তথ্য প্রকাশিত হলে রাষ্ট্রের উপর থেকে জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হতে পারে এবং শাসকগোষ্ঠীর প্রতি জবাবদিহিতার চাপও বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে তারা প্রায়শই নিজেদের স্বার্থকে অনুকূল করে এমন ব্যাখ্যাকে ‘সর্বজনীন সত্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে। এভাবেই তৈরি হয় এক ধরণের স্মৃতি-দখলদারি। যেখানে শাসক নিজের স্বার্থে ইতিহাসের কিছু অধ্যায়কে খুব বড় করে দেখায়, আর অস্বস্তিকর ঘটনাগুলোকে কৌশলে মানুষের মন থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করে। 

তৃতীয়ত, বিরোধী মতকে কোণঠাসা করার জন্য। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর শাসকগোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় সেইসব ব্যক্তি, দল বা মতাদর্শ যারা তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। ফলে ক্ষমতাসীনদের জন্য হুমকি হতে পারে—এমন ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা মতাদর্শকে ইতিহাস থেকে আড়াল করা হয় কিংবা নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়। 

অর্থাৎ, রাষ্ট্র তার নিজস্ব ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠার জন্য ইতিহাসের ভেতরে রাষ্ট্রবিরোধী বা প্রতিদ্বন্দ্বী মতাদর্শগুলোকে সমাজের ‘সামষ্টিক স্মৃতি কাঠামো’-এর মধ্যে এমনভাবে উপস্থাপন করে, যাতে সেগুলোকে জাতীয় ঐক্য বা রাষ্ট্রীয় স্বার্থের পরিপন্থী বলে মনে করা হয়। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা কমে যায় এবং শাসকগোষ্ঠী তুলনামূলকভাবে আরও দৃঢ়ভাবে তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। 

চতুর্থত, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তা ও চেতনাকে প্রভাবিত করার জন্য। রাষ্ট্র খুব ভালো করেই জানে, একটি সমাজ তার অতীতকে যেভাবে স্মরণ করে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মও ঠিক সেভাবেই নিজেদের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা বুঝে সমাজে বেড়ে উঠে। তাই পাঠ্যবই, শিক্ষাব্যবস্থা, স্মৃতিসৌধ, জাতীয় দিবস ও মিডিয়ার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে একটি নির্দিষ্ট বয়ান পৌঁছে দেওয়া হয়, যাতে তারা রাষ্ট্রের কাঙ্ক্ষিত দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী অতীতকে ব্যাখ্যা করে। এর ফলে এমন এক প্রজন্ম গড়ে ওঠে, যারা ভবিষ্যতে রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত যেকোনো কার্যকলাপের বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্তভাবে শাসকগোষ্ঠীর পক্ষেই অবস্থান নেয়। অর্থাৎ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে চারদিক থেকে এমন এক বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর মধ্যে কোণাঠাসা করে রাখা হয়, যাতে রাষ্ট্রনির্ধারিত সীমার বাইরে তাঁরা কখনো ভিন্ন কোনো দৃষ্টিভঙ্গি কল্পনাও না করতে পারে। 

আর এটি কোনো মনগড়া দাবি নয়; বরং বহু সমাজবিজ্ঞানী ও দার্শনিক ক্ষমতা, জ্ঞান ও মতাদর্শের (Power, Knowledge and Ideology) সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে একই ধরনের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। 

উদাহরণস্বরূপ, কার্ল মার্ক্স বলেন, 

The ruling ideas of each age have ever been the ideas of its ruling class.

অর্থাৎ, যে সমাজে যে শাসকশ্রেণী ক্ষমতায় থাকে, তারা শুধু অর্থনীতি বা রাষ্ট্রীয় কাঠামোকেই নিয়ন্ত্রণ করে না—বরং সেই সময়ের চিন্তা-ভাবনা, মূল্যবোধ, নৈতিকতা এবং সত্য সম্পর্কে ধারণাগুলোকেও প্রভাবিত করে। ফলে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিই সমাজে ‘প্রভাবশালী চিন্তা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। 

অর্থাৎ, ইতিহাস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রাষ্ট্র শুধু অতীতকেই ব্যাখ্যা করে না; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কীভাবে চিন্তা করবে, তাদের কাছে সত্যের মানদণ্ড কী হবে এবং কোন সীমার ভেতরে থেকে তারা রাজনৈতিক বাস্তবতাকে মূল্যায়ন করবে—সেটিও অনেকাংশে তারাই নির্ধারণ করার চেষ্টা করে। 

এই সব কারণেই মূলত ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র নিজস্ব স্বার্থ অনুযায়ী ইতিহাস নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। সময় ও প্রেক্ষাপট ভেদে বিভিন্ন ধরনের ন্যারেটিভ নির্মাণ করা হয়। একই সঙ্গে বিরোধী মতকে অনেক সময় ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এবং বিভিন্ন ধরনের লেবেলিং করা হয়—যেমন ‘সন্ত্রাসী’, ‘উগ্রবাদী’ কিংবা ‘জঙ্গি’ ইত্যাদি। 

আসলে রাষ্ট্র নিজের শাসনকে জায়েজ করতে ইতিহাস নিয়ে যতই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করুক, এই জনপদের মানুষের নাড়ির টান আর হাজার বছরের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে উপড়ে ফেলা অতটা সহজ নয়। এই অঞ্চলের ইতিহাস তো শুধু শাসকের ফরমায়েশি বয়ানে গড়ে ওঠেনি। এর পেছনে রয়েছে কয়েক শতাব্দীর সভ্যতাগত ধারাবাহিকতা।

এখানে স্রেফ কিছু সাময়িক স্লোগান বা রাজনৈতিক চেতনার মাপকাঠিতে ইতিহাসের বিচার করা কঠিন। আসলে আমাদের এই হাজার বছরের আত্মপরিচয় আর ঐতিহ্যের শেকড় এতই গভীরে যে, তাকে চাইলেই উপড়ে ফেলা যায় না; আর এটাই এই জনপদের মুসলমানদের বড় রক্ষাকবচ। তাই কৃত্রিমভাবে চাপিয়ে দেওয়া কোনো বয়ান হয়তো সাময়িকভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা মানুষের হৃদয়ে গেঁথে থাকা এই শিকড়কে উপড়ে ফেলতে পারবে না।

তথ্যসূত্রঃ

  1. Orwell, George (1949). Nineteen Eighty-Four. A novel. London: Secker & Warburg.
  2. Orwell, George. Notes on Nationalism. Penguin Classics, 2018. 
  3. McCauley, Martin. The Rise and Fall of the Soviet Union. Routledge, 2008. 
  4. King, David. The Commissar Vanishes: The Falsification of Photographs and Art in Stalin’s Russia. Metropolitan Books, 1997. 
  5. Lorenz, Dagmar C. G. Nazi Characters in German Propaganda and Literature. Brill, 2018.
  6. Bartov, Omer (2023). “The Holocaust”. The Oxford History of the Third Reich. Oxford University Press. pp. 190–216. 
  7. Gerlach, Christian (2016). The Extermination of the European Jews. Cambridge University Press. 
  8. Waters, Anita. How The Ruling Class Does It: 7 Strategies to Stay in Power. Communist Party USA, 9 Sept. 2022.  
  9. Light, Duncan, and Craig Young. Public Memory, Commemoration, and Transitional Justice: Reconfiguring the Past in Public Space. Cambridge University Press eBooks, 2015, pp. 233–51 
  10. Molden, Berthold. Resistant Pasts Versus Mnemonic Hegemony: On the Power Relations of Collective Memory. Memory Studies, vol. 9, no. 2, July 2015, pp. 125–42. 
  11. Power Dynamics and Class Struggle in the Academic System: A Conflict Theory Perspective. International Journal of Research and Innovation in Social Science, vol. 9, no. 10, Nov. 2025, pp. 3250–54.  
  12. Communist Manifesto (Chapter 2), Marxists Internet Archive. 
  13. Cultural Hegemony. Wikipedia.  
  14. Politics of Memory. Wikipedia.  
  15. Ruling Class. Wikipedia.  
  16. Dominant Ideology. Wikipedia. 

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles
রাজনৈতিক দর্শন

দর্শনের পদ্ধতিগত বর্ণবাদ

রাজনৈতিক দর্শন•May 19, 2026রাজনৈতিক দর্শনদর্শনের পদ্ধতিগত বর্ণবাদদ্য মুসলিম মাইন্ডস এডিটরিয়াল•51 min read582ViewsFacebookXWhatsApp582...

দর্শনরাজনৈতিক দর্শন

রাষ্ট্র যখন উপাস্য: জাতিরাষ্ট্রের মেটাফিজিক্যাল দাবি || শায়খ মুসা আল হাফিজের সাক্ষাৎকার

দর্শন•May 18, 2026দর্শনরাজনৈতিক দর্শনরাষ্ট্র যখন উপাস্য: জাতিরাষ্ট্রের মেটাফিজিক্যাল দাবি || শায়খ মুসা...