ইটন-এর কৃষক ও বাংলার ইসলামের ভবিষ্যৎ

বাংলার প্রান্তিক কৃষক কেন ইসলাম গ্রহণ করেছিল? রিচার্ড ইটনের গবেষণার সূত্র ধরে পেছনের দিকে তাকালে দেখা যায়, এই অঞ্চলের মানুষ দীর্ঘকাল ধরে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত ছিল। মোঘল আমলে সুফিদের সংস্পর্শে বাংলার কৃষকদের মাঝে শুধু সামাজিক পরিবর্তনই ঘটেনি। সুফিরা একদিকে যেমন জঙ্গল সাফ করে নতুন গ্রাম গড়েছেন, কৃষিব্যবস্থার প্রসার ঘটিয়েছেন; ঠিক তেমনি মানুষের সামনে একটি মেটাফিজিক্যাল বা ‘নাজাতের’ পথও উন্মোচন করেছেন। এই পার্থিব অধিকার এবং পারলৌকিক মুক্তির দ্বিমুখী আকাঙ্ক্ষাই বাংলার সাধারণ মানুষের যাপিত জীবনে ইসলামকে গভীরভাবে প্রোথিত করেছে।
সমসাময়িক বুদ্ধিবৃত্তিক ডিসকোর্সে ফরহাদ মজহার বা সলিমুল্লাহ খানের মতো তাত্ত্বিকরা একটি নতুন রাষ্ট্রকল্প হাজির করতে চান। তারা ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের তিনটি মূলনীতি—সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারকে (যাকে তাজউদ্দীন আহমদরা সেন্টারে রেখেছিলেন) নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। এর পেছনের কারণ হলো, ১৯৭২ সালের সংবিধানের ভেতর দিয়ে আওয়ামী লীগ যে রাষ্ট্রকল্প করেছিল, তা একটি ফেইলড প্রজেক্টে পরিণত হয়েছে। সেই ফেইলড স্টেট প্রজেক্টকেই তারা এই তিন মূলনীতির ভেতর দিয়ে তাজদিদ বা নবায়ন করার চেষ্টা করছেন।
কিন্তু এই ত্রিমাত্রিক রাজনৈতিক কাঠামোটি আদতে একটি সেকুলার প্যারাডাইমের অংশ। এটি বাংলার মুসলিম মানসের মূল আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করতে পারে না। বাংলার কৃষক যে ইথস বা স্পিরিট থেকে ইসলাম গ্রহণ করেছিল, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও বেঙ্গল রেনেসাঁর লোকেরা সেখান থেকে তাদের বঞ্চিত করেছে। সেই বঞ্চনা কাটাতে গেলে কৃষকের আদি স্পিরিটের সাথেই পুনঃসংযোগ করতে হবে। ইসলামের নিজস্ব মেটাফিজিক্যাল পথকে বাদ দিয়ে কেবল এই তিন মূলনীতির ওপর ভর করলে তা সমাজে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা বা ‘সেপারেশন’ তৈরি করবে। এই সেকুলার কাঠামোর সীমাবদ্ধতা আমরা ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানেও দেখি। এই ত্রিমাত্রিক বয়ান চব্বিশে গড়ে ওঠা ছাত্র-তরুণদের পোস্টইডিওলজিক ঐক্যের জন্য পজিটিভ নয়।
পাশ্চাত্যের জ্ঞানতাত্ত্বিক চশমা দিয়ে ইসলামকে পড়ার বড় বিপদ হলো, এটি ইসলামের নিজস্ব এপিস্টেমিক সভ্রিনিটি বা জ্ঞানতাত্ত্বিক সার্বভৌমত্বকে বিনষ্ট করে। এই সংকট নতুন নয়। বাগদাদের বায়তুল হিকমার যুগে যখন ইবনু সিনা বা আল-ফারাবিরা গ্রিক দর্শনের সংস্পর্শে এসে নতুন চিন্তার জন্ম দিচ্ছিলেন, তখন ইমাম গাজালি তার ‘তাহফুত আল-ফালাসিফা’ গ্রন্থে অত্যন্ত পদ্ধতিগতভাবে এর ক্রিটিক করেছিলেন। গাজালি দর্শনকে খারিজ করেননি, বরং তাদেরই লজিক্যাল এক্সপোজিশন ব্যবহার করে তাদের পদ্ধতিগত ত্রুটিগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিলেন। বর্তমানেও পশ্চিমা দর্শনের টুলস (যেমন: হাইডেগারের বিং, ফ্রয়েডের অবচেতন বা লাকঁ-র ভাষাতত্ত্ব) ব্যবহার করে ইসলামকে ব্যাখ্যা করার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তার বিপরীতে গাজালির সেই ক্রিটিক্যাল এপ্রোচটি পুনরায় প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
কলোনিয়াল লিগ্যাসির অংশ হিসেবে পাওয়া আধুনিক জাতিরাষ্ট্র, প্রচলিত আইনি কাঠামো এবং বায়োপলিটিক্যাল এ্যারেঞ্জমেন্টের ভেতর ইসলামের সাম্য বা শাসনকল্পকে কার্যকর করা একেবারেই অসম্ভব। আধুনিকতার বিপরীতে না গিয়েও কীভাবে একটি নিজস্ব ‘আখলাকি’ বা নৈতিক কাঠামো দাঁড় করানো যায়, সেটিই এখনকার বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের মূল জায়গা।
এই লড়াইয়ে অনেকেই নিজস্ব জায়গা থেকে কন্ট্রিবিউট করেছেন। সৈয়দ হোসাইন নাসর দেখিয়েছেন বিজ্ঞানবাদের সমস্যা, ইকবাল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিথস্ক্রিয়ায় নতুন চিন্তার জন্ম দিয়েছেন, আর সৈয়দ মুহাম্মদ নাকিব আল-আত্তাস দেখিয়েছেন সেকুলার এডুকেশন কীভাবে আমাদের ধ্বংস করেছে।
তবে রাজনৈতিক তত্ত্বে সবচেয়ে যুগান্তকারী ব্রেক-থ্রু এনেছেন ওয়ায়েল হাল্লাক। কার্ল স্মিট যেমন ‘পলিটিক্যাল থিওলজি’ নিয়ে কাজ করেছেন, হাল্লাক তেমনি পলিটিক্যাল থিওরিটাকে শরিয়ার ওপর এস্টাবলিশ করে ‘থিওলজাইজেশন অফ ইসলামিক পলিটিক্স’-এর একটি শক্ত ভিত্তি দাঁড় করিয়েছেন। তিনি শরিয়াকে যান্ত্রিক শাস্তিব্যবস্থার অপবাদ থেকে মুক্ত করে একে সম্পূর্ণ ইন্টেলেকচুয়ালাইজ করেছেন। হাল্লাক দেখিয়েছেন, খোদার সার্বভৌমত্বের অধীনে ফুকাহাদের আইনের ব্যাখ্যা এবং শাসকদের তা কার্যকর করার যে সুষম ক্ষমতার বিন্যাস মুসলিম শাসনে ছিল, তা কীভাবে আবার ফেরত পাওয়া সম্ভব।
অন্যদিকে, তোহা আবদুর রহমান সমসাময়িক লজিক ও লিঙ্গুইস্টিকস ব্যবহার করে ইসলামের জ্ঞানতাত্ত্বিক ও অন্টোলজিক্যাল ভিত্তিকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি পশ্চিমা চিন্তার টুলসগুলো গভীরভাবে আয়ত্ত করেছেন ঠিকই, কিন্তু নিজের প্যারাডাইম থেকে এক চুলও নড়েননি।
বাংলার নদীপাড়ের কৃষকের নাজাতের বাসনাকে ধারণ করে, পশ্চিমা তাত্ত্বিক গোলকধাঁধায় না হারিয়ে এই নিজস্ব জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোর ওপর ভর করেই আগামী দিনের নতুন শাসনকল্প রচনা করতে হবে।







Comments