নতুন ডিপ্লোমা প্রোগ্রাম ২০২৬ শুরু হয়েছে! ক্রিটিক্যাল সোশ্যাল থট অ্যান্ড ইসলামিক ট্র্যাডিশন ডিপ্লোমা সম্পর্কে জানুন → নতুন ডিপ্লোমা প্রোগ্রাম ২০২৬ — ডিপ্লোমা সম্পর্কে জানুন →

ইতিহাসইসলামের ইতিহাসপাশ্চাত্যবাদপ্রাচ্যবাদ

আত্মপরিচয়ের সংকট ও মুসলিম সভ্যতার জ্ঞান-ঐতিহ্য: এক বৌদ্ধিক পুনর্মূল্যায়ন

Share
Share
ইতিহাসMay 9, 2026

আত্মপরিচয়ের সংকট ও মুসলিম সভ্যতার জ্ঞান-ঐতিহ্য: এক বৌদ্ধিক পুনর্মূল্যায়ন

পৃথিবীতে মানবসভ্যতার ইতিহাসের ক্রমধারা প্রায় ৪০ হাজার বছরের। আজ থেকে প্রায় তিন হাজার বছর আগে গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাসের হাত ধরে ইতিহাস রচনার এক নতুন ধারার সূচনা ঘটে। বর্তমান বৈজ্ঞানিক অনুমান অনুযায়ী পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪.৫৪ ± ০.০৫ বিলিয়ন বছর (অর্থাৎ ৪৫৪ ± ৫ কোটি বছর)। যদিও এ নিয়ে প্রত্নতত্ত্ববিদদের মাঝে বিস্তর মতপার্থক্য রয়েছে, তাই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া বেশ কঠিন।

তবে জেনে রাখা ভালো যে, মানবসভ্যতার ইতিহাস ৪০ হাজার বছরের হলেও আমরা মূলত তিন হাজার বছর আগেকার ইতিহাস সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারি। বাকি ৩৭ হাজার বছরের ইতিহাস সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য আমাদের হাতে নেই। সভ্যতাকেন্দ্রিক ইতিহাস রচনার ঝোঁক তৈরি হয়েছিল সেই তিন হাজার বছর আগে গ্রিসের এথেন্সে। এ সময়ে পৃথিবীতে নানাবিধ সভ্যতার উত্থান-পতন হয়েছে; এক সভ্যতার ইতি ঘটেছে তো অন্য সভ্যতার যাত্রা শুরু হয়েছে। যুগের পর যুগ এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী এই পরিক্রমা অব্যাহত ছিল, যার ধারাবাহিকতায় আজকের এই আধুনিক সভ্যতার গোড়াপত্তন হয়েছে। 

সভ্যতার বিলুপ্তি, কীর্তির অমরতা

পৃথিবীতে বহু সভ্যতার নিদর্শন থাকলেও তার গুটিকয়েক সভ্যতার নামই কেবল আমরা বলতে পারি; কারণ, সেগুলোর অধিকাংশই কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গিয়েছে। মানবেতিহাসে সভ্যতার গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ এক সভ্যতার সাথে অপর সভ্যতা মিথস্ক্রিয়ায় আবদ্ধ। ব্যাবিলনীয় সভ্যতাকে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতা হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে এবং এই ব্যাবিলনীয় সভ্যতাকে কেন্দ্র করে মিসরীয় সভ্যতা গড়ে ওঠে। এভাবে সিন্ধু সভ্যতা, মায়া সভ্যতা, হেলেনিক সভ্যতা ও রোমান সভ্যতার মতো উন্নত সভ্যতাগুলোকে কেন্দ্র করে আজকের আধুনিক সভ্যতার ভিত গড়ে উঠেছে। একেক সভ্যতার জ্ঞান-বিজ্ঞান অপর সভ্যতার জন্য মাইলফলক হিসেবে কাজ করে। তাই কোনো সভ্যতাকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই; সকল সভ্যতাই স্বমহিমায় অধিষ্ঠিত। একটি সভ্যতার গোড়াপত্তন হয় মানুষের সামগ্রিক জীবনাচার, চিন্তা, মননশীলতা, জ্ঞানগত আদান-প্রদান এবং আবিষ্কার ও উৎকর্ষের মধ্য দিয়ে।

সভ্যতার পতন হয়। কিন্তু তার কীর্তি, আবিষ্কার, উন্নত সামাজিক কাঠামো এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষ পরবর্তীকালে তাকে স্মরণীয় করে তোলে। সেজন্য সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটল, হোমার, হেরোডোটাস, পিথাগোরাস এবং টলেমির মতো ব্যক্তিরা হাজার বছর পরও আমাদের কাছে সমানভাবেই প্রাসঙ্গিক ও সমাদৃত; যাদের কৃতিত্ব বিশ্ববাসী অকপটে স্বীকার করে। তাই কোনো সভ্যতাকে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ নেই।

মুসলিম সভ্যতার আলোয় আধুনিক বিজ্ঞানের জাগরণ

আমরা এতক্ষণ যে আলোচনাগুলো করলাম তা প্রাচীন সভ্যতাগুলোকে কেন্দ্র করে। এখন আমরা আলোচনা করব কীভাবে আজকের বিশ্ব ও পশ্চিমা সভ্যতা গড়ে উঠেছে। সভ্যতার ইতিহাসে ইসলামী সভ্যতাই সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা, যাকে কেন্দ্র করে আজকের আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎপত্তি। শুনতে অবাক লাগলেও এটাই বাস্তব সত্য। যেখানে ভাবা হয় যে, গ্রিক ও রোমান সভ্যতা হয়ে মানবসভ্যতা রেনেসাঁর মাধ্যমে ক্রমশ উন্নতির পথে এগিয়েছে, সেখানে অনেকেই মনে করেন আরব মরু বেদুইনরা দাঙ্গা-হাঙ্গামা ছাড়া বিশ্বের জন্য উল্লেখযোগ্য কিছুই দিতে পারেনি। হ্যাঁ, যদি কিছু দিয়ে থাকে, তবে তা ‘Dark Age’ বা অন্ধকার যুগ। অথচ এর বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন, যার আলোচনা সামনে আসবে। গ্রিক, রোমান, পারস্য ইত্যাদি সভ্যতা হয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞান ইউরোপে এক লাফে আসেনি; বরং তা এক সোনালি যুগ পাড়ি দিয়ে এসেছে, যার কারিগর ছিল তিন মহাদেশে বিস্তৃত বৃহত্তর মুসলিম সভ্যতা।

আজকের জ্ঞান-বিজ্ঞান যে উচ্চতায় আসীন হয়েছে, তার পেছনে গ্রিক, রোমান ও অন্যান্য সভ্যতার যত অবদান রয়েছে, তার চেয়ে বেশি অবদান বৃহত্তর মুসলিম সভ্যতার—এটি কোনো অতিশয়োক্তি নয়, বরং অকাট্য সত্য। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই সত্যটুকুর দশ ভাগের এক ভাগও আমরা মুসলিমরা জানি না।

বিস্মৃত গৌরব, উপেক্ষিত জ্ঞানের উত্তরাধিকার

কথিত আছে যে, একটি জাতিকে পিছিয়ে রাখার জন্য তার ইতিহাস ভুলিয়ে দেওয়াই যথেষ্ট। আর মুসলিমদের ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে। আজ আমরা বিজ্ঞান, গবেষণা ও দর্শন-নির্ভর কোনো কথা বলতেই বুঝি সক্রেটিস, অ্যারিস্টটল বা প্লেটোর গবেষণা ও তত্ত্ব। কিন্তু আমরা জানি না আমাদের মুসলিমদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। এটি কতই না আক্ষেপ ও বিস্ময়ের ব্যাপার! আজ যখন বিশ্বের সকল জাতি নিজেদের বিশ্বদরবারে তুলে ধরার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত, তখনও সর্বাধিক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অধিকারী মুসলমানগণ নিজেদের ইতিহাস সম্পর্কে উদাসীন ও নীরব। আমরা এমন এক ঐতিহাসিক জাতি, যে জাতির সৃষ্টিকর্ম, জ্ঞানচর্চা ও গবেষণা অনুসরণ করে ভিন্ন জাতি ও ভিন্ন মতাদর্শের মানুষেরা এগিয়ে গিয়েছে। শুধুমাত্র ওরিয়েন্টালিস্টদের জ্ঞানের ধারা পর্যালোচনা করলেই বিষয়টি আমাদের সামনে দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে যায়।

জ্ঞানের শাখাগুলো যদি পর্যবেক্ষণ করি, তবে সেখানে আমরা পাব—চিকিৎসাবিদ্যা, গণিতশাস্ত্র, রসায়নশাস্ত্র, পদার্থবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিদ্যা, জীববিজ্ঞান, উদ্ভিদবিজ্ঞান, নিউরোলজি, মনোবিজ্ঞান, ভূগোল, দর্শন, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ইত্যাদি।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিটি ক্ষেত্রে মুসলিমদের সরব পদচারণা ছিল। মুসলিম বিজ্ঞানীগণ তাঁদের নিরন্তর সাধনা, যুগান্তকারী আবিষ্কার ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে জ্ঞান-বিজ্ঞানের নতুন নতুন দ্বার উন্মোচিত করেছিলেন এবং আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত গড়ে এক অভাবনীয় যুগের অবতারণা করেছিলেন; যার ওপর আজকের আধুনিক বিজ্ঞানের পাটাতন তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে মুসলিমগণ অজ্ঞাত থাকলেও পশ্চিমা গবেষকদের কেউ কেউ মুসলমানদের অবদান ও কৃতিত্বকে অকপটে স্বীকার করেছেন। জন উইলিয়াম ড্রেপার তাঁর গ্রন্থ “History of the Intellectual Development of Europe”-এ বলেন—

Not one of the purely mathematical, mixed or practical science omitted by Arabs.

—vol 1- page 325.

এমন কোন গাণিতিক,  জটিল অথবা প্রায়োগিক বিজ্ঞান নেই যা মুসলমানরা বিশুদ্ধভাবে সমাধান করেনি।

রবার্ট ব্রিফল্ট আরো জোরলোভাবে উল্লেখ করেন—

Science is the most momentous contribution of Arabs civilization to the modern World.  The debt of our science to the Arabs does not consist in startling discoveries or revolutionary theories – science owes a great deal more to Arab culture…  it owes its existence..  

—page 190.

অর্থাৎ, বিজ্ঞানে আমরা আরব মুসলিমদের কাছে শুধু এ জন্য ঋণী নয় যে, তারা আমাদের বিপ্লবী ধারণা ও সৃজনশীলতা উপহার দিয়েছে; বরং বিজ্ঞানের উত্থানে আরব কালচার ও বেশ প্রভাব রেখেছে। এক কথায়, বিজ্ঞানের অস্তিত্বই আরবদের থেকে….এটাও স্বতঃসিদ্ধ যে, আধুনিক শিল্প-সভ্যতার সূচনাতেও এ আরবদেরই অবদান। 

পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু ব্রিফল্টের এই দাবিকে ‘Glimpses of World History’ গ্রন্থে আরও জোরালোভাবে ব্যক্ত করেন—

Among the ancients we do not find the scientific method in Egypt or China or India. We just find a bit of it in Greece. In Rome again it was absent. But the Arabs had this scientific spirit of inquiry, and so they may be considered the fathers of Modern science. (Page 175).

অর্থাৎ, মিসর, চীন কিংবা ভারতে যেসব প্রাচীন সভ্যতা গড়ে উঠেছে, আমরা তাতে কোনো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি দেখতে পাই না। এর কিছুটা দেখতে পাই গ্রিক সভ্যতায়, যা আবার রোমান সভ্যতায় অনুপস্থিত। তবে আরবদের মধ্যে সেই বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসু মনোভাব ছিল; তাই তাঁদের আধুনিক বিজ্ঞানের জনক হিসেবে অভিহিত করা যেতে পারে।

অমুসলিম পণ্ডিতগণ বিজ্ঞানে মুসলিমদের অবদান ও কৃতিত্বকে অকপটে স্বীকার করলেও একটি শ্রেণি রয়েছে, যারা সবসময়ই মুসলিমদের অবদানকে খাটো করে দেখার চেষ্টা করে। অপরদিকে বসওয়ার্থ স্মিথ ‘Mohammed and Mohammedanism’ গ্রন্থে সাহসী কণ্ঠে বলেন—

…during the darkest period of European history for five hundred years, held up the torch of learning to humanity. (Page 7).

অর্থাৎ, ‘ইউরোপের ইতিহাসের দীর্ঘ পাঁচশ বছরের সেই চরম অন্ধকার যুগে মুসলিমরাই মানবজাতির জন্য শিক্ষার মশাল উঁচিয়ে ধরেছিল।’

দুঃখজনক হলেও সত্য, মুসলমানরা তাদের স্বর্ণালি অতীত ভুলে গিয়ে আজ পরাধীনতার আত্মগ্লানি ও পরাজিত মনোভাব লালন করছে। এটি বাস্তব যে, আমাদের নতুন প্রজন্ম বিশ্বাস করে বিজ্ঞানের উন্নতি ও অগ্রগতিতে মুসলমানদের কোনো অবদান নেই। তবে তাদের এই বিশ্বাস সঠিক নয়; মূলত বিজ্ঞানের আজ যে উত্থান ও অগ্রগতি, তার পেছনে মৌলিক ভূমিকা ছিল পূর্ববর্তী মুসলিম মনীষীদের। বিজ্ঞানকে উন্নতির শিখরে পৌঁছানোর মূল কারিগর ছিলেন মুসলিম বিজ্ঞানীরা। কিন্তু বর্তমানে বিজ্ঞানে মুসলমানদের উল্লেখযোগ্য দখল নেই। এই ময়দানে যখন তারা পিছিয়ে পড়ে, তখন এর নেতৃত্বে আসে পশ্চিমারা এবং তাদের হাত ধরেই বিজ্ঞানের আজকের এই অবস্থান। তবে ইতিহাস এখনো এ কথা ভুলে যায়নি যে, যে সময় মুসলিম আন্দালুসের (স্পেন) অলিগলি জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতার আলোয় রঙিন ছিল, তখন পশ্চিমে বিরাজ করছিল অসভ্যতা ও মূর্খতার গাঢ় অন্ধকার। মুসলমানদের এই উন্নতির নেপথ্যে ছিল তাদের ধর্ম ইসলাম; যে ধর্ম তার অনুসারীদের এ কথা জানায় যে—আসমান ও জমিনে যা কিছু বিদ্যমান, তার সবই মানুষের সেবার জন্য মহান আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন।

বেশিরভাগ পশ্চিমা লেখক বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদানের কথা কৌশলে চেপে রাখলেও তাঁদের উদারপন্থী একাধিক গবেষক এই স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছেন যে, পশ্চিমারা বিজ্ঞানের পুনরুজ্জীবনে আরব মুসলিমদের কাছে ঋণী। কেননা, বিজ্ঞান ও গবেষণালব্ধ জ্ঞান মুসলমানদেরই উদ্ভাবন। তারাই এর গভীরে প্রথম প্রবেশ করে এবং পরে তা ইউরোপসহ গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়। ফিলিপ হিট্টি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘History of the Arabs’-এ লিখেছেন—

No people in the Middle Ages contributed to human progress so much as did the Arabians and the Arabic-speaking peoples. (Page 43).

অর্থাৎ, ‘মধ্যযুগে কোনো জাতিই মানবজাতির অগ্রগতির ক্ষেত্রে এতটা অবদান রাখতে পারেনি, যতটা আরব ও আরবি ভাষাভাষী মানুষ করেছে’।

বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় মুসলিম বিজ্ঞানীগণ যে অভূতপূর্ব উৎকর্ষ অর্জন করেছিলেন, তা পরবর্তীকালে ইউরোপের শিল্পবিপ্লব ও রেনেসাঁয় মাইলফলক হিসেবে কাজ করেছে।

মধ্যযুগে জ্ঞান-বিজ্ঞানের মুসলিম দীপ্তি ও পাশ্চাত্যের অজ্ঞতার যুগ

পশ্চিমা গবেষক ও প্রাচ্যবিদরা মুসলিমদের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন, যেন মুসলিমরা আদর্শহীন, নৈতিকতাবর্জিত এক বর্বর জাতি এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন; তা হলো—পশ্চিমারা আমাদের সামনে ‘মধ্যযুগের বর্বরতা’ নামক এক বয়ান হাজির করে। অথচ মধ্যযুগ মুসলিমদের জন্য ছিল এক স্বর্ণালি অধ্যায়। মধ্যযুগে জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসা, স্থাপত্যশিল্প, গণিত, রসায়ন, ভূগোল, প্রকৌশল, অধিবিদ্যা, শিল্প, সাহিত্য ও দর্শনশাস্ত্র প্রভৃতি প্রতিটি শাখায় মুসলিম পণ্ডিতগণ অসামান্য অবদান রেখেছেন। মধ্যযুগের বর্বরতা বা অন্ধকার বলতে যা বোঝায়, তার সাথে মুসলমানদের ন্যূনতম সম্পর্কও ছিল না। বরং সেই সময়ে মুসলিমরাই জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিটি ক্ষেত্রে চালকের আসনে সমাসীন ছিলেন।

রোমান সভ্যতার পতনের পর ইউরোপে নেমে আসে নিকষ কালো অন্ধকার। সেখানে অজ্ঞতা, বর্বরতা, অবাধ যৌনাচার, কুসংস্কার ও লুটতরাজ সয়লাব করেছিল। নানাবিধ সমস্যা ও প্রতিকূলতা তাদের জনজীবনকে বিষিয়ে তুলেছিল। তাদের জীবনমান এত নিচে নেমে গিয়েছিল যে, পশুর সাথে তাদের তেমন কোনো পার্থক্য ছিল না। এস. পি. স্কটের ভাষায়—

যে অঞ্চলে জ্ঞানের কোনো বালাই ছিল না, সেটি হলো ক্যাথলিক ইউরোপ। আমরা এমন এক সময়ের কথা বলছি, যখন ইউরোপের রাজা-সম্রাটরাও লিখতে বা পড়তে জানতেন না। সে সময় এক মুসলিম শাসকের একান্ত ব্যক্তিগত লাইব্রেরির বইসংখ্যা ছিল ৬ লাখ। ম্যুর আমলের কর্ডোভায় ছিল ৮০০ কলেজ; আর সাম্রাজ্যের এমন কোনো গ্রাম ছিল না, যেখানে সবচেয়ে গরিব চাষির সন্তানরাও লেখাপড়া জানত না এবং অশিক্ষিত কোনো চাষিরও খোঁজ পাওয়া যেত না।

ওলন্দাজ পণ্ডিত ডোজি মন্তব্য করেন— “সেই সময় মুসলিম স্পেনের প্রায় প্রত্যেকেই লেখাপড়া জানত।” অথচ সে সময়ে খ্রিষ্টান ইউরোপে সামান্যই লেখাপড়ার প্রচলন ছিল, যা সীমাবদ্ধ ছিল পাদ্রি ও পুরোহিতদের মধ্যে। পশ্চিমারা তাদের এই লজ্জা লুকানোর জন্য অনেকটা ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা’র চেষ্টা করে। তাই তারা মুসলিমদের যেকোনো কাজকে ‘মধ্যযুগের বর্বরতা’ বলে চালিয়ে দেওয়ার পাঁয়তারা করে। যেমন—তারা কথায় কথায় মুসলিম মুজাহিদদের উদ্দেশ্য করে বলে, ‘মধ্যযুগীয় কায়দায় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে’ ইত্যাদি।

অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী ছিল পাশ্চাত্যের জন্য অন্ধকার যুগ, মুসলিমদের জন্য নয়। মুসলিম বিজ্ঞানীরা এই সময়ে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছেন, যার ওপর ভিত্তি করেই আজকের আধুনিক বিজ্ঞান গড়ে উঠেছে। প্রতিটি শাখায় মুসলিম বিজ্ঞানীরা বিস্ময়কর সাফল্য দেখিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন:

১. আবুল কাসিম আল-জাহরাউয়ি: শল্যচিকিৎসার জনক; তিনিই সর্বপ্রথম সিজারিয়ান অপারেশন করেছিলেন।
২. ইবনে সিনা: আধুনিক ওষুধের জনক।
৩. মুহাম্মদ ইবনে জাকারিয়া আল-রাজি: প্রথম শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ এবং সালফিউরিক অ্যাসিডের আবিষ্কারক।
৪. আলি ইবনে আব্বাস আল-মাজুসি: প্রথম চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ।
৫. মুহাম্মদ বিন মুসা আল-খাওয়ারিজমি: বীজগণিত ও অ্যালগরিদমের জনক।
৬. ইবনুল হাইসাম: আলোকবিদ্যার জনক; তিনি ‘ক্যামেরা অবসকিউরা’ আবিষ্কার করেন।
৭. জাবির ইবনে হাইয়ান: রসায়নের জনক।
৮. ইসমাইল আল-জাজারি: অটোমেশন এবং রোবোটিকসের জনক।
৯. মুহাম্মদ আল-ইদ্রিসি: বিশ্ব মানচিত্রের জনক।
১০. ইবনে খালদুন: সমাজবিজ্ঞানের জনক।
১১. নাসিরুদ্দিন তুসি: ত্রিকোণমিতির জনক।
১২. আল-বিরুনি: পদার্থবিদ, ভূ-গণিতবিদ এবং প্রথম নৃতাত্ত্বিক।
১৩. ইবনে রুশদ: মুক্তচিন্তা ও যুক্তিবাদের প্রবক্তা।

কেউ যদি বলে মধ্যযুগে বৈজ্ঞানিকভাবে মুসলিমরা বন্ধ্যা ছিল, তবে তাকে এই মহান মনীষীদের নাম শুনিয়ে দিন; যাঁরা সবাই ৭৫০ থেকে ১১০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে আবির্ভূত হয়েছিলেন।

সিসিলি ও ক্রুসেড: মরুর বাতিঘর থেকে ইউরোপীয়  জ্ঞানের রূপকথা 

ইউরোপে ইসলামি সংস্কৃতি পৌঁছানোর বড় একটি মাধ্যম ছিল ইতালীয় উপদ্বীপের দক্ষিণে, ভূমধ্যসাগরের মাঝ বরাবর অবস্থিত সিসিলি দ্বীপ। এখানে মুসলমানরা অন্তত ১৩০ বছর শাসন করেছিলেন। সে সময়ে এটিকে ইউরোপে ইসলামি সংস্কৃতি বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র বিবেচনা করা হতো। একই সঙ্গে ক্রুসেড এবং বায়তুল মাকদিস দর্শন ইউরোপীয়দের আরবদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ করে দেয়। ঠিক সে সময় তারা আরবদের কাছ থেকে সভ্যতা ও শিক্ষা-দীক্ষার তালিম নেয়। ফরাসি চিকিৎসক ও ঐতিহাসিক গুস্তাভ লে বোন (১৮৪১-১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দ) তাঁর গ্রন্থ ‘আরব সভ্যতা’য় লিখেছেন—

পশ্চিমাদের ওপর আরবদের যে বিশাল অবদান, আমরা তা ততক্ষণ পর্যন্ত অনুধাবন করতে পারব না, যতক্ষণ আমরা ইউরোপের সেই অতীতের সঙ্গে পরিচিত না হব, যখন তারা আক্ষরিক অর্থে অজ্ঞতার কালো অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। মধ্যযুগে ইউরোপীয় এই অজ্ঞতার দীর্ঘ এক ইতিহাস রয়েছে। যখন ওখানের কিছু সচেতন ও বুদ্ধিমান লোক আরবদের সঙ্গে নিজেদের তুলনা করল, তখন দেখল—মরুর লোকদের থেকে তারা বেশ পশ্চাৎপদ এবং প্রায় সব ক্ষেত্রেই পিছিয়ে রয়েছে। ফলে তারা ইউরোপ থেকে অজ্ঞতার অন্ধকার নির্মূলের ইচ্ছা করল। কিন্তু জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোর উৎস তো আরবদের কাছে; তাই বাধ্য হয়ে আরব মুসলিমদের দরজাতেই কড়া নাড়ল তারা। আরবদের থেকে সাধ্যমতো জ্ঞান অর্জন করল। আসলে সেকালে জ্ঞান-বিজ্ঞানের রাজভাণ্ডারের অধিপতি তো ছিল আরবরাই।

আরেক ফরাসি দার্শনিক রেনো গেনন—যিনি পরে ইসলাম গ্রহণ করে ‘আব্দুল ওয়াহেদ’ নাম ধারণ করেন—বলেন, ‘মুসলিমদের সাংস্কৃতিক প্রভাব ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ‘আত-তাসরিফ’ ও অন্যান্য আরব গবেষকদের বইপত্রে ব্যবহৃত শব্দগুলো এমন আরবি ভাষা ছিল, যার মাধ্যমে ইউরোপে আরবীয় চিন্তাধারা স্থানান্তরিত হয়। এ সময় ইসলামি দর্শন ও আদর্শের স্থানান্তরে আমরা চিকিৎসাবিদ্যার পাশাপাশি আরও অনেক কিছুই অর্জন করতে সক্ষম হই।’

মুসলিমদের জ্ঞানযুগের ভাষিক প্রতিধ্বনি

আরবদের জ্ঞানভাণ্ডার—বিশেষত চিকিৎসা, গণিত, রসায়ন, দর্শন, ভূগোল ও সাহিত্যবিষয়ক অসংখ্য গ্রন্থ মধ্যযুগে ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনূদিত হয়ে নতুন জ্ঞানবিপ্লবের সূচনা করেছিল। আরবি ভাষার এই বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব এতই গভীর ছিল যে, বহু আরবি শব্দ ইংরেজি ভাষায় শাব্দিক ও অর্থগত রূপান্তরের মাধ্যমে স্থায়ী আসন গেড়ে নিয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ, ‘আমীরুল বাহার’ (নৌবাহিনীর প্রধান) পদবি থেকে ‘Admiral’ শব্দের জন্ম হয়েছে। একইভাবে ‘আল-কিমিয়া’ থেকে ‘Chemistry’, ‘আল-জাবর’ (الجبر) থেকে ‘Algebra’, ‘কাহওয়া’ থেকে ‘Coffee’, আরবের সুগন্ধি ফুল ‘ইয়াসমিন’ থেকে ‘Jasmine’, আরবি ‘লাইমুন’ থেকে ‘Lemon’, ‘মাখাজিন’ (যার অর্থ ভাণ্ডার) থেকে ‘Magazine’, ‘সুক্কার’ থেকে ‘Sugar’ এবং ‘শারাব’ থেকে ‘Syrup’ শব্দের উৎপত্তি।

শুধু এগুলোই নয়, আরবি ভাষার ‘নাফতা’ (পেট্রোলিয়ামজাত পদার্থ) থেকে ‘Naphtha’, ‘সাফার’ (ভ্রমণ) থেকে ‘Safari’ এবং ‘তারিফ’ (মূলত পরিচয় প্রদান বা ঘোষণা) থেকে ‘Tariff’ প্রভৃতি শব্দ ইংরেজি ভাষার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এমনকি ‘Zero’ শব্দটির উৎসও আরবি ‘সিফর’ (صفر)। এ ছাড়া চিকিৎসা, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা ও দর্শনের বহু পরিভাষা আরবি থেকে সরাসরি ল্যাটিন বা ইংরেজিতে গৃহীত হয়েছে—যা ইউরোপীয় জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিসরে আরব সভ্যতার অপরিহার্য অবদানকে প্রমাণ করে।

দুঃখজনকভাবে, এই বাস্তবতা অনেক মুসলিমই জানেন না। অথচ আরব-ইসলামি সভ্যতা যে মধ্যযুগে ইউরোপকে আলোকিত করেছিল, তার অন্যতম বড় প্রমাণ এই ভাষাগত উত্তরাধিকার। ভাষা কখনো নিছক শব্দের বিনিময় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে জ্ঞান, চিন্তাধারা ও সংস্কৃতির গভীর লেনদেন।

মুসলিম মনীষীদের নামবিকৃতি

মুসলিম বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের বহু আবিষ্কার ও বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ইউরোপীয়রা সচেতনভাবে নিজেদের নামে চালিয়ে দিয়েছিল—অনেকটা গোয়েবলসীয় কায়দায়। দশবার মিথ্যা বলে তাকে সত্য বানাবার প্রচেষ্টায় তারা খানিকটা সফলতাও অর্জন করেছে বলতে হবে। এ কারণেই তাদের লোভ বেড়ে যায় এবং নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য তারা এতটাই তৎপর ছিল যে, পুরো মুসলিম জাতির কাছেই এখন তাদের অতীত গৌরব ধোঁয়াশাচ্ছন্ন হয়ে গেছে। এটি তাদেরই ‘কৃতিত্ব’। আজকের মুসলিম দেশগুলোর ছাত্রছাত্রীরাও দুর্ভাগ্যজনকভাবে জানে না—বিজ্ঞান বিষয়ে তারা যেসব তত্ত্ব ও সূত্র পশ্চিমাদের আবিষ্কার বলে মুখস্থ করছে, তার অনেকগুলিই আসলে তাদেরই পূর্বপুরুষ, কোনো এক মহান মুসলিম বিজ্ঞানীর মেধা ও গবেষণার ফসল। এমনকি কালজয়ী বহু মুসলিম বিজ্ঞানীর নামও তারা কিম্ভূতকিমাকার করে ফেলেছে, যাতে তাঁদের জাতি-পরিচয় চেনা না যায়। মুসলিম বিজ্ঞানীদের নাম ও আবিষ্কার বেনামীকরণের যে নমুনাগুলো দৃষ্টিগোচর হয়, তার কয়েকটি নিম্নরূপ:

  • আল-বাত্তানি – (অ্যালবাটেগনিয়াস / Albategnius)
  • আবু ইউসুফ ইয়াকুব আল-কুন্দি – (অ্যালকাইন্ডাস / Alkindus)
  • আল-রাজি – (রাজিস / Rhazes)
  • আল-খাওয়ারিজমি – (অ্যালগোরিদম / Algorithmi)
  • ইবনে সিনা – (এভিসিনা / Avicenna)
  • ইবনুল হাইসাম – (অ্যালহাজেন / Alhazen)
  • আজ-যারকালি – (আর্জাসেল / Arzachel)
  • ইবনে বাজ্জাহ – (অ্যাভেম্পেস / Avempace)
  • আল-বিতরুজি – (অ্যালপেট্রাজিয়াস / Alpetragius)
  • ইবনে রুশদ – (অ্যাভেরোস / Averroes)

এই ঘটনাকে নিছক ‘অগোচরে ঘটে যাওয়া’ বলা ভ্রান্ত; বরং এটি ছিল এক সচেতন ও সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা। এটি ইতিহাস বিকৃতি ও আত্মস্থ করার একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প, যা শতাব্দী আগে পাশ্চাত্যের এক শ্রেণির চিন্তাবিদ গ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম সভ্যতার অবদান আড়াল করে গ্রিক ও রোমান ঐতিহ্যকে আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতার একমাত্র উৎস হিসেবে উপস্থাপন করা।

পশ্চিমা গবেষকদের স্বীকারোক্তি

এখানে বলা প্রয়োজন যে, পাশ্চাত্যের একাধিক খ্যাতিমান ইতিহাসবিদ, জ্ঞানতাত্ত্বিক ও বিজ্ঞান-ইতিহাসের নিরপেক্ষ গবেষকেরা অকপটে স্বীকার করেছেন—আরব-ইসলামি সভ্যতাই ইউরোপের বৌদ্ধিক পুনর্জাগরণের প্রকৃত ভিত্তি স্থাপন করেছিল। মধ্যযুগের ঘোর অজ্ঞানতা ও বৌদ্ধিক অন্ধকারে নিমজ্জিত ইউরোপকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করার দায়িত্ব মুসলিম মনীষীরাই পালন করেছিলেন।

বিশ্বজোড়া খ্যাতির অধিকারী ইতিহাসবিদ জর্জ সার্টন (George Sarton), যিনি ‘Introduction to the History of Science’ গ্রন্থে মুসলিম সভ্যতাকে আধুনিক বিজ্ঞানচর্চার সূচক শক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন; স্যার টি. আর্নল্ড, আর. এ. নিকোলসন, ফিলিপ কে. হিট্টি, জন উইলিয়াম ড্রেপার, ব্রিফল্ট, জোসেফ হেল, ম্যাকডোনাল্ড, পিকথাল, রিচমন্ড, ইমানুয়েল ডয়েচ, সেডিলট, ম্যাক্স নিউবার্গার, আর্নেস্ট রেনান, স্ট্যানলি লেন-পুল, রজার বেকন, হামবোল্ট প্রমুখ বহু জ্ঞানসন্ধানী মনীষীর গবেষণা ও রচনায় এই সত্য বারবার উঠে এসেছে।

তাঁরা যুক্তি ও প্রমাণের আলোকে দেখিয়েছেন—আরবরাই প্রথম প্রাচীন গ্রিক পণ্ডিতদের দর্শন, চিকিৎসাবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত ও বিজ্ঞানের অমূল্য ভাণ্ডারকে অনুবাদ ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে বিশ্বসভ্যতার সামনে উন্মুক্ত করে দেন। মুসলিমদের অনুবাদ-আন্দোলন, বায়তুল হিকমাহ (House of Wisdom) এবং বাগদাদ, কর্ডোভা, সিসিলি প্রভৃতি শহরের বিশাল লাইব্রেরি ও গবেষণাগার হয়ে ওঠে ইউরোপের জ্ঞানপিপাসুদের আশ্রয়কেন্দ্র।

এই মনীষীরা সুস্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করেছেন— ‘আরবরাই প্রথমে গ্রিক লেখকদের বিশ্বজগতে পরিচিত করে দিয়েছিল। ইউরোপের বর্তমান জ্ঞান ও বিজ্ঞানের যে উন্নত পরিসর, তা বহু পূর্বে আরবদের জ্ঞানান্বেষী সাধনা ও বৌদ্ধিক সংগ্রামেরই ফল। আরবরাই ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায়ে প্রথম জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালিয়েছিল।’

এই ঐতিহাসিক সত্য প্রমাণ করে, ইউরোপের রেনেসাঁ, শিল্পবিপ্লব ও আধুনিক বিজ্ঞানচর্চার মূলে ছিল আরব মুসলিমদের অনন্য সাধনা ও অবদানের উত্তরাধিকার। পাশ্চাত্যের কিছু নীতিনিষ্ঠ গবেষক তাঁদের রচনায় নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন যে, ইউরোপের গৌরবময় জ্ঞানচর্চার ভেতর গ্রিক-রোমান সূত্রের চেয়ে মুসলিম সভ্যতার সেতুবন্ধনই ছিল সর্বাধিক কার্যকর ও গঠনমূলক শক্তি।

উপসংহার

আজ আমাদের শিক্ষাঙ্গনের পাঠ্যসূচি থেকে মুসলমানদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস প্রায় সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলা হয়েছে। ইসলামের প্রতিদ্বন্দ্বীরা সুচতুরভাবে ইসলামের শাশ্বত সত্য বিকৃত করেছে, আর আমাদের বংশধরদের কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছে বিকল্প এক ইতিহাস—যে ইতিহাস মুখস্থ করতে করতে একদিন আমাদের শিক্ষাজীবন ফুরিয়ে যায়, অথচ নিজেদের মহান অতীত জানার অবকাশ আর মেলে না।

ইতিহাসের এই পরিকল্পিত বিকৃতির জালে নতুন প্রজন্মের মন-মানস জড়িয়ে পড়েছে; অথচ ইউরোপীয় ঐতিহাসিকেরা যখন ইতিহাসশাস্ত্রের খুঁটিনাটি নিয়ে গভীর অনুসন্ধান চালায়, তখন মুসলমানরা বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে এবং অনায়াসে তাদের মতামতকে গ্রহণও করে—ভুলে যায় নিজেদের অবিস্মরণীয় অবদান।

কিন্তু এমনটা সবসময় ছিল না। একসময় এই মুসলমানরাই দুনিয়ার বুকে আল্লাহর দেওয়া দায়িত্ব নিয়ে মানুষের শিরোমণি হয়েছিল—মানুষের দাসত্ব নয়, একমাত্র প্রভুর দাসত্ব কায়েম করেছিল দিগন্তজোড়া মানবসমাজে। এখন সময় এসেছে আবার জাগরণের, আবার নিজের শিকড় ও আত্মপরিচয়কে চিনে নেওয়ার। আমাদের সন্তানদের জানতে হবে তারা কারা, তাদের ঐতিহ্য কী এবং তাদের আসল পরিচয় কী। জাগিয়ে তুলতেই হবে এই ঘুমন্ত মুসলিম মানসকে—যে মানস আবার সত্য, জ্ঞান ও মর্যাদার দীপ্তি ছড়িয়ে দেবে সমগ্র পৃথিবীর বুকে।

সুতরাং, আমাদের স্বর্ণালি অতীত আবার ফিরে পেতে হলে ব্যাপক পরিসরে ইতিহাসের অধ্যয়ন ও গবেষণা অতীব জরুরি। সত্যটা জানা আমাদের অধিকারের প্রশ্ন। যদি আমরা আমাদের অধিকার আদায় করতে না পারি, তবে ইতিহাসের এই পুনরাবৃত্তি আমাদের ক্ষেত্রে আবার ঘটতে পারে। পশ্চিমারা জ্ঞান-বিজ্ঞানে যে আধিপত্য কায়েম করেছে, তার বলয় থেকে বের হতে হলে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতা আরও জোরদার করতে হবে। মুসলিম ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে কলুষিত করতে গড়ে উঠেছিল ‘ওরিয়েন্টালিজম’। ইউরোপকে শ্রেষ্ঠ আর প্রাচ্যকে পশ্চাৎপদ দেখানোর জন্য সব রকমের চেষ্টা করা হয়েছে এই ‘ওরিয়েন্টালিজমে’। আসুন, আমরা প্রকৃত সত্য জানার চেষ্টা করি এবং পশ্চিমারা মুসলিম সভ্যতাকে কালিমা লেপনের যে হীন পথ বেছে নিয়েছে, তার বিরুদ্ধে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন গড়ে তুলি। আল্লাহ সবার সহায় হোন। আমিন।

তথ্যসূত্রঃ

  1. Ali, Syed Ameer. The Spirit of Islam: A History of the Evolution and Ideals of Islam. London: Christophers, 1922.
  2. Islamic Foundation. Muslim Contribution to Science and Technology. Dhaka: Islamic Foundation Bangladesh.
  3. 1001 Inventions: The Enduring Legacy of Muslim Civilization. London: National Geographic, 2012.
  4. Briffault, Robert. The Making of Humanity. London: George Allen & Unwin, 1919.
  5. Nehru, Jawaharlal. Glimpses of World History. London: Oxford University Press, 1934.
  6. أبو الحسن علي الندوي. ماذا خسر العالم بانحطاط المسلمين. Damascus: Dar Al-Andalus, circa 1970.
  7. مصطفى السباعي. روائع حضارتنا. Damascus: Dar Al-Qalam, 1970s.
  8. Hafiz, Musa Al. সহস্রাব্দের ঋণ. 1st ed. Dhaka: Fawara, 2018.
  9. Hitti, Philip K. History of the Arabs. London: Macmillan, 1937.
  10. Sarton, George. Introduction to the History of Science. 3 vols. Baltimore: Williams & Wilkins, 1927–1948.
  11. Smith, R. Bosworth. Mohammed and Mohammedanism. London: Smith, Elder & Co., 1874.
  12. Le Bon, Gustave. La Civilisation des Arabes (The Civilization of the Arabs). Paris: Firmin-Didot, 1884.
  13. Renan, Ernest. Averroès et l’Averroïsme. Paris: Calmann-Lévy, 1861.
  14. Dalrymple, G. Brent. The Age of the Earth. Stanford: Stanford University Press, 1991.
  15. Herodotus. The Histories. Translated by Robin Waterfield. Oxford: Oxford University Press, 1998.
  16. Durant, Will. The Story of Civilization. New York: Simon and Schuster, 1935–1975.
  17. Harari, Yuval Noah. Sapiens: A Brief History of Humankind. London: Harvill Secker, 2011.

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles
গ্রন্থালোচনাপ্রাচ্যবাদ

রিচার্ড ইটনের রাইজ অব ইসলাম অ্যান্ড দ্য বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার: সলিমুল্লাহ খানের পর্যালোচনা

গ্রন্থালোচনা•June 25, 2026গ্রন্থালোচনাপ্রাচ্যবাদরিচার্ড ইটনের রাইজ অব ইসলাম অ্যান্ড দ্য বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার: সলিমুল্লাহ...

ইতিহাসদর্শনবাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ

সার্বভৌম সত্তা হিসেবে মুজিব : একটি নাগরিক ধর্মের নির্মাণ

ইতিহাস•May 7, 2026ইতিহাসদর্শনবাঙ্গালী জাতীয়তাবাদসার্বভৌম সত্তা হিসেবে মুজিব : একটি নাগরিক ধর্মের নির্মাণদ্য...

ইতিহাসপ্রাচ্যবাদ

বাংলাদেশে খ্রিষ্টীয় মিশনারি: গোড়া ও ডালপালা

ইতিহাস•April 30, 2026ইতিহাসপ্রাচ্যবাদবাংলাদেশে খ্রিষ্টীয় মিশনারি: গোড়া ও ডালপালামুসা আল হাফিজ•54 min read1,235ViewsFacebookXWhatsApp1,235...

দর্শনপাশ্চাত্যবাদপ্রাচ্যবাদসমসাময়িক বিশ্লেষণ

জ্ঞান ও ক্ষমতার আন্তঃসম্পর্ক: ফুকোর বরাতে

দর্শন•April 11, 2026দর্শনপাশ্চাত্যবাদপ্রাচ্যবাদসমসাময়িক বিশ্লেষণজ্ঞান ও ক্ষমতার আন্তঃসম্পর্ক: ফুকোর বরাতেআসিফ আদনান•70 min read821ViewsFacebookXWhatsApp821...