কলোনিয়ালিটি এবং আধুনিক জ্ঞানব্যবস্থার নির্মাণ || শাহেদ হাসান

লন্ডনের সেন্টার-রাইট পত্রিকা আনহার্ডে মাইকেল লিন্ড সম্প্রতি লিখেছেন, পশ্চিমা সভ্যতা ভেতর থেকে ভেঙে পড়ছে।
কথাটা অবাক করার মতো না। পৃথিবীর দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ এটা অনেক আগে থেকেই জানত। কিন্তু উত্তর আটলান্টিকে এটা পারিবারিক রহস্যের মতো ধামাচাপা দেওয়া ছিল। এখন পশ্চিমের ভেতর থেকেই কথাটা উঠছে। এই বিষয়টা নিজেই একটা উপসর্গ।
১৫০০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত বিশ্বব্যবস্থার কেন্দ্রে ছিল উত্তর আটলান্টিকের রাষ্ট্রগুলো। স্পেন, ফ্রান্স, হল্যান্ড, ইংল্যান্ড এবং ১৯৪৫ সালের পর থেকে আমেরিকা। ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তির পর ইউরোপীয় জাতিরাষ্ট্রগুলো গঠিত হয়, আর বিশ্বব্যবস্থা পরিচালিত হতে থাকে পশ্চিমের একমেরুকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। ২০০০ সাল থেকে এই আধিপত্য দুর্বল হতে শুরু করেছে। হেজেমনি হাতছাড়া হচ্ছে। এখন সেই ক্ষয় পূরণ করতে জোর করে কর্তৃত্ব চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
কিন্তু এই দুর্বলতা শুধু ভূরাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক না। আধুনিক বিশ্বের গঠন আর জ্ঞানের আধিপত্যমূলক কাঠামোর গঠন আলাদা করা যায় না।
পশ্চিম যখন পৃথিবীর বাকি অংশ দখল করল, সে শুধু ভূমি ও সম্পদ নেয়নি। সে নির্ধারণ করে দিয়েছে কোনটা জ্ঞান আর কোনটা কুসংস্কার। কোন প্রশ্ন বৈধ আর কোন প্রশ্ন অপ্রাসঙ্গিক। কে বিশেষজ্ঞ আর কে স্রেফ “লোকাল”। ইউনিভার্সিটি, একাডেমিক ডিসিপ্লিন, রিসার্চ মেথডলজি — এসব কিছু নির্ধারণের ক্ষমতা ছিল এই কাঠামোর হাতে। ওয়ালটার মিনিওলো এই কাঠামোটার নাম দিয়েছেন কলোনিয়ালিটি অফ নলেজ।
সমস্যাটা শুধু কে ক্ষমতায় আছে সেটা না। সমস্যাটা হল এই কাঠামো অদৃশ্য হয়ে গেছে। এটা এখন “স্বাভাবিক”।কলোনিয়ালিটির ধারণাটা এসেছিল স্নায়ুযুদ্ধের শেষ মুহূর্তে, দক্ষিণ আমেরিকার আন্দেস অঞ্চলের স্থানীয় ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতা এবং সোভিয়েত পতনের বৈশ্বিক ঢেউয়ের সংযোগস্থলে। এটা আমাদের সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্ট।
১৫০০ সাল থেকে বিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত পৃথিবীজুড়ে বিভিন্ন রূপের ঔপনিবেশিকতা যে যুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, কলোনিয়ালিটি সেই যুক্তির মুখোশ খুলে দিয়েছে। আধুনিকতা সবসময় নতুনত্ব, অগ্রগতি, উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু এই প্রতিটি প্রতিশ্রুতির আড়ালে ছিল আধিপত্য, শোষণ এবং নিপীড়ন। এই প্রতিশ্রুতিগুলোই কলোনিয়ালিটিকে আড়াল করে রেখেছিল। স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে ব্যাপক ডিকলোনাইযেশন সংগ্রাম ছিল এই ইঙ্গিত যে ওয়েস্টার্নাইযেশনের যুগ শেষ হয়ে আসছে। কিন্তু ওয়েস্টার্নাইযেশনের ক্ষয় কলোনিয়ালিটিকে শেষ করেনি।
মিনিওলো যেটাকে ডিলিংকিং বলেন, অর্থাৎ এই বিদ্যমান জ্ঞানকাঠামো থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা, তা শুধু পশ্চিমা জ্ঞানের বিরোধিতা নয়; বরং চিন্তাকে নতুনভাবে গড়ে তোলার একটি প্রক্রিয়া। নিজের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা, নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য এবং নিজের প্রশ্নগুলো থেকে চিন্তা শুরু করা। পশ্চিমা এপিস্টেমলজিকে সার্বজনীন ধরে নেওয়া বন্ধ করা। এখানে একটা পার্থক্য মাথায় রাখা দরকার।
ডি-ওয়েস্টার্নাইযেশন এবং ডিকলোনিয়ালিটি এক জিনিস না। ডি-ওয়েস্টার্নাইযেশন মূলত রাষ্ট্র পরিচালিত। চীনের উত্থান সেই অর্থে ডি-ওয়েস্টার্নাইযেশন, কিন্তু এটা মুক্তির পথ না। একটা হেজেমনির জায়গায় আরেকটা হেজেমনি আসা। ডিকলোনিয়ালিটি পরিচালিত হয় রাজনৈতিক সমাজ ও পাবলিক ডিসকোর্স থেকে, রাষ্ট্র থেকে না। ডিকলোনাইযেশন সংগ্রামের গৌরব ছিল দখলদারদের তাদের নিজের দেশে ফেরত পাঠানোয়। কিন্তু সরকার এক জিনিস আর রাষ্ট্র আরেক জিনিস। প্রগতিশীল সরকার সাধারণত ভালো উদ্দেশ্য নিয়েই কাজ করে, কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্রের কাঠামো কর্পোরেশন ও গণমাধ্যমের সাথে মিলিতভাবে এমন একটি শক্তি-ব্যবস্থা তৈরি করে, যেখানে সরকারি উদ্যোগের জন্য কার্যকর সুযোগ খুবই সীমিত হয়ে পড়ে।
ডিকলোনাইযেশন সংগ্রাম নতুন জাতিরাষ্ট্র তৈরি করল ঠিকই, কিন্তু সেগুলো একদিকে স্থানীয় অভিজাতদের নিয়ন্ত্রণে, অন্যদিকে সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর ওপর নির্ভরশীল হয়েই রইল।
তবুও এই সংগ্রাম এক অমূল্য উত্তরাধিকার রেখে গেছে।
সেই উত্তরাধিকার আজ জাতিরাষ্ট্রের হাতে নেই। আছে রাজনৈতিক সমাজের হাতে, পাবলিক স্ফিয়ারে। মিনিওলো মনে করেন “রাজনৈতিক” ধীরে ধীরে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রণ থেকে সরে রাজনৈতিক সমাজের দিকে যাবে। যেখানে “আমরা, জনগণ” নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই গড়বে। রাষ্ট্র, গণমাধ্যম কিংবা কর্পোরেশন কোনোটিই জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধি নয়। এই উপলব্ধি থেকেই স্বশাসনের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে।
জ্ঞানের উপনিবেশ থেকে বের হওয়ার প্রথম শর্ত হল এটা স্বীকার করা যে উপনিবেশ শুধু মাটিতে হয় না, মগজেও হয়।







Comments