বাংলাদেশের ইসলামি পুনর্জাগরণ কেন শহুরে মধ্যবিত্তকেন্দ্রিক?

ইসলামি পুনর্জাগরণের কথা উঠলেই আমাদের মানসপটে কিছু পরিচিত দৃশ্য ফুটে ওঠে—বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য দাড়ি রাখা সেই তরুণ, নিকাব পরা শুরু করা কোনো নারী, কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইসলামি জ্ঞানতত্ত্ব নিয়ে সরব কোনো গ্রুপ। ইউটিউবের পডকাস্ট বা তাত্ত্বিক আলোচনায় আমরা যে স্রোত দেখি, তার একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য খুব স্পষ্ট: এই জাগরণের কারিগর এবং ভোক্তা উভয়ই মূলত শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত। অথচ এই বিশাল আলাপচারিতার কোথাও গ্রামের সাধারণ মসজিদের ইমাম সাহেব নেই, রোদে পোড়া কোনো কৃষক নেই, নেই শহরের শ্রমজীবী কোনো মুসলিম। তবে কি এই পুনর্জাগরণ মূলত একটি শহুরে ঘটনা? প্রশ্নটি আরও গভীরে নিয়ে গেলে দাঁড়ায়, এটি কি ধর্মের পুনর্জাগরণ, নাকি খেই হারিয়ে ফেলা শহুরে মুসলিমের আত্মপরিচয় খোঁজার এক ব্যাকুল চেষ্টা?
এই প্রশ্নটি আমাদের জন্য অস্বস্তিকর। কারণ, আমরা নিজেরাও এই ডিসকোর্স এর অংশ। আমরা যখন পডকাস্ট তৈরি করি কিংবা ইনটেলেকচুয়াল ফ্রেমিং দিই, তখন অবচেতনেই আমাদের সামনে থাকে এক নির্দিষ্ট অডিয়েন্স। এই সীমাবদ্ধতাটুকু স্বীকার করা জরুরি, কারণ নিজেরা যখন কোনো স্রোতের ভেতরে থাকি, তখন সেই স্রোতকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে ভিন্নধর্মী সাহসের প্রয়োজন হয়।
ইসলামকে প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে যাপন করা এবং ইসলামকে একটি সচেতন ‘রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয়’ হিসেবে দেখা এক বিষয় নয়। একজন গ্রামীণ মুসলিমের কাছে ধর্ম উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া একটি সহজাত বিষয়। তিনি যখন ফজরের নামাজ পড়েন বা রমজানের রোজা রাখেন, সেটাকে তিনি কোনো ‘মুভমেন্ট’ বা পুনর্জাগরণের ভাষায় সংজ্ঞায়িত করেন না। তাঁর ইসলাম তাঁর জীবনবুননের ভেতরে এমনভাবে মিশে আছে যে, একে আলাদা করে চিহ্নিত করার বা তাত্ত্বিক রূপ দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।
কিন্তু শহরের শিক্ষিত তরুণ যখন বলে “আমি দীনে ফিরে এসেছি”, তখন সে আসলে এক অবধারিত বিচ্ছিন্নতাকেই স্বীকার করে নেয়। তার এই ‘ফিরে আসা’র ব্যাকুলতাই প্রমাণ করে যে, জীবনের কোনো এক পর্যায়ে ধর্মের সাথে তার এক গভীর দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। শহর সেই ব্যবধান তৈরি করে। গ্রামে মানুষের পরিচয় তার শেকড়ে—সে কার ছেলে, তার পরিবার কী, তার মসজিদ কোনটি—এগুলো নির্ধারিত। কিন্তু শহরের নাগরিক জীবনে এই পরিচয়গুলো আলগা হয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকুলার প্রতিষ্ঠান আর পেশাগত জীবনের তীব্র প্রতিযোগিতার ভিড়ে মানুষ যখন নিজেকে আবিষ্কার করে এক পরিচয়হীন সত্তা হিসেবে, তখনই সে নিজেকে প্রশ্ন করতে বাধ্য হয়—”আমি আসলে কে?”
এই শূন্যতা থেকেই জন্ম নেয় আত্মপরিচয় নির্মাণের এক সচেতন সংগ্রাম। নিজেকে আপন প্রচেষ্টায় গড়ে নিতে হয়। প্রতিটা পদক্ষেপেই তাকে নতুন করে নিজেকে প্রমাণ করতে হয়। পাশের ফ্ল্যাটের লোকটা যেখানে তার নামও জানে না, সেখানে তাকে প্রতিদিন নিজের ইমেজের ইট-সুরকি গেঁথে নিজেকে চেনাতে হয়—সেটা কখনো লিঙ্কডইন প্রোফাইলে, কখনো ড্রয়িংরুমের সুবিন্যস্ত বুকশেলফে, আবার কখনো জুতসই একটা তাত্ত্বিক তর্কে। এই পরিচয় তাকে কেউ উপহার দেয়নি; বরং একাকীত্বের বিস্বাদ থেকে বাঁচতে তাকে এটি নিজের ক্লান্তিকর শ্রমে তিল তিল করে নির্মাণ করতে হয়েছে।
এই নির্মাণপ্রক্রিয়া কারো ক্ষেত্রে আধ্যাত্মিক রূপান্তরের পথ খুলে দেয়, আবার কারো ক্ষেত্রে এটি কেবল একটি নতুন পরিচয়ের মোড়ক হিসেবে ধরা দেয়। দাড়ি রাখা, জোব্বা পরা কিংবা আরবি শব্দ বলা, সাথে বিভিন্ন প্রশ্নের তাত্ত্বিক উদ্ধৃতি দেওয়া—সব মিলিয়ে অনেক সময় ধর্মের চেয়ে একটি নতুন ‘ভার্সন’ বা ‘পারসোনা’ হয়ে ওঠাই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়।
তাহলে কি আমরা বলছি এই পুনর্জাগরণ একটা মিথ্যা বিষয়? না, মোটেও তা নয়।
কিন্তু এটি আধুনিকতার বাইরের কিছু নয়, বরং আধুনিকতার বিরুদ্ধে এক প্রবল প্রতিক্রিয়া। এখানেই বড় দ্বন্দ্ব। নারীবাদের ঢেউ, লিবারেলিজমের অদৃশ্য চাপ, পুঁজিবাদী ভোগবাদ আর ডিজিটাল সংস্কৃতির যে অশুভ স্পর্শ—শহুরে মুসলিমের গায়ে সেটা সরাসরি লাগে। তার পাশের টেবিলের বন্ধুটি সেকুলার, তার প্রিয় শিক্ষক সেকুলার, তার ক্যারিয়ারের ব্যাকরণও আগাগোড়া সেকুলার। তাকে প্রতি মুহূর্তে নিজের ইমানের স্বপক্ষে ওকালতি করতে হয়, যুক্তি সাজাতে হয়, নিজেকে প্রমাণ করতে হয়।
গ্রামের সেই সাধারণ মুসলিমের জীবনে এই ‘অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই’ নেই। তার আকাশ-বাতাস তাকে এই প্রশ্নগুলো করে না। তাই এই পুনর্জাগরণের আলাপ যে আদ্যোপান্ত শহুরে হবে—এটাই স্বাভাবিক। কারণ এই লড়াইয়ের রসদ বা জ্বালানি আসে আধুনিকতার সাথে সংঘাত থেকে, আর সেই সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দু তো এই শহরই।
এই পুনর্জাগরণের অবকাঠামোটা ঠিক কী? ইউটিউব চ্যানেল, পডকাস্টের দামি লেন্স, ট্যালেন্টভিত্তিক ফেসবুক পেজ আর নান্দনিক প্রচ্ছদের বই। এগুলো পুরোপুরি শহুরে মধ্যবিত্তের হাতিয়ার। এখানকার ভাষা, নান্দনিকতা, এমনকি উদ্বেগের বিষয়গুলোও আসে কর্পোরেট জীবন থেকে। কেউ যখন পডকাস্টে ‘ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স’ নিয়ে ইসলামি সমাধান দেয়, সে আসলে ওই এসি রুমে কাজ করা ক্লান্ত কর্মীর কথা বলছে। এখানে কৃষকের আলাপ উঠে আসে না। যখন ‘টক্সিক ম্যাসকুলিনিটি’ নিয়ে বিতর্ক হয়, তখন সেটা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের টাইমলাইনে চলা ঝগড়ারই প্রতিফলন। ফলে এই পুরো আয়োজনটা একটা চক্রের মতো। শহুরে নির্মাতারা শহুরে শ্রোতাদের জন্য শহুরে ভাষায় কনটেন্ট বানাচ্ছেন। যার হাতে এই বিলাসী অবকাঠামো নেই, সে এই উৎসবে স্রেফ দর্শকও হতে পারে না।
এখানে একটা অদৃশ্য আভিজাত্যের দেয়ালও তৈরি হচ্ছে। ‘ভালো মুসলিম’ বা ‘জাগরিত মুসলিম’ হওয়ার জন্য এখন কিছু নির্দিষ্ট যোগ্যতা লাগে। হাতে গোনা কয়েকটা তাত্ত্বিক বই পড়া থাকতে হবে, ইবনু খালদুন বা মালিক বিন নবির উদ্ধৃতি জানতে হবে, এমনকি পডকাস্ট শোনার রুচিও থাকতে হবে। ধার্মিকতা এখানে একধরনের ‘ইন্টেলেকচুয়াল ব্র্যান্ডিং’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপনার বইয়ের তাকে কী আছে, সেটা দিয়েই নির্ধারিত হচ্ছে আপনার ইসলামের গভীরতা। প্রশ্ন জাগে—এই যে ‘আদর্শ মুসলিম’-এর ছবি আমরা আঁকছি, সেটা কি কুরআন-সুন্নাহ থেকে আসা সহজ সরল দীন, নাকি শিক্ষিত মধ্যবিত্তের রুচি ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার এক সংকর সংস্করণ?
অথচ গ্রামীণ ইসলামের একটি শক্তি হলো ধারাবাহিকতা। সেখানে ইসলামকে প্রতিদিন নতুন করে ডিফেন্ড করতে হয় না। জন্ম থেকে মৃত্যু, রোদ থেকে বৃষ্টি—সবকিছুর ভেতরেই সেখানে ধর্ম মিশে আছে এক সহজাত সত্য হিসেবে। শহুরে পুনর্জাগরণ এই শিকড়টা হারিয়ে ফেলেছে বলেই সে এতো বেশি ব্যাখ্যাপ্রবণ। তাকে সারাক্ষণ প্রমাণ করতে হয় যে সে যৌক্তিক, সে আধুনিক, সে কার্যকর। এই চেষ্টার মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক ধার থাকতে পারে, কিন্তু দিনের শেষে সেখানে এক ভয়াবহ আধ্যাত্মিক উদ্বেগ কাজ করে।
অবশ্যই গ্রামীণ ইসলাম যে ত্রুটিহীন তা নয়। সেখানে কুসংস্কার আছে, ক্ষমতার নোংরা খেলা আছে, বিদআত কিংবা নারীর প্রতি অবিচারও আছে। তাকে রোমান্টিসাইজ করার সুযোগ নেই। কিন্তু শহুরে মুসলিমদের সমস্যা হলো—আমরা মনে করি আমরাই বুঝি সব সমাধান নিয়ে আসছি। অথচ আমাদের এই সংস্কৃতির আড়ালে যে কী পরিমাণ আধ্যাত্মিক শূন্যতা আর সামাজিক বিচ্ছিন্নতা লুকিয়ে আছে, তা আমরা তলিয়ে দেখার সাহস পাই না।
এখন প্রশ্ন হলো, আমরা যারা এই আলাপের ভেতরে আছি, তারা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি? এই সততাটুকু থাকা জরুরি যে, এখনকার এই জাগরণ ইসলামের চেয়ে বরং আধুনিক শহুরে মানুষের নিজের মোরাল কম্পাস খুঁজে পাওয়ার লড়াই। নিজের অস্তিত্বকে অর্থবহ করার এই লড়াই মোটেও ছোট কিছু নয়। কিন্তু এই আন্দোলন যদি নিজের শ্রেণিগত সীমাবদ্ধতা না বোঝে, তবে সে এমন সব বড় বড় বুলি আউড়াতে শুরু করবে যা আদতে সে বহন করতে পারবে না। নিজের আসল রূপটা চিনতে না পারলে, এই বিশাল বুদ্ধিবৃত্তিক আয়োজন একদিন স্রেফ নিজের ওজনের চাপেই ভেঙে পড়বে। আমরা কি সেই অস্বস্তিকর অবস্থানে যেতে প্রস্তুত?







Comments