কেন আধুনিক মুসলিম নারী স্বামীকে অপছন্দ করে?

স্ত্রীদের মনে স্বামীর প্রতি অবজ্ঞা বা তুচ্ছতাবোধ মূলত আধুনিক উন্নত বিশ্বের একটি ব্যাধি। অথচ ইতিহাসে বা ভিন্ন সংস্কৃতিতে এই চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ বিরল। সেখানে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের রসায়ন ছিল অন্যরকম।
বর্তমানে ধনী দেশগুলোতে আইনের শাসন অত্যন্ত শক্ত। নারীবাদের প্রভাব বেড়েছে এবং আধুনিক কাজগুলো এখন অনেকটাই আরামদায়ক হয়ে গেছে। জীবন এখন আর আগের মতো কঠিন নয়। ফলে অনেক নারী ভাবতে শুরু করেছেন যে, পুরুষ আসলে খুব একটা প্রয়োজনীয় কেউ নয়; চাইলেই তাকে বদলে ফেলা যায়। এই মানসিকতার কারণে একজন ভালো স্বামীও তার প্রাপ্য সম্মান পান না। তাকে তুচ্ছজ্ঞান করা হয়, এমনকি অপ্রয়োজনীয় মনে করে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়।
এক সময় স্বামীর মূল কাজ ছিল উপার্জন করা আর পরিবারকে রক্ষা করা। কিন্তু আজকের যুগে একজন নারী যখন নিজেই নিজের খরচ মেটাতে পারেন এবং চারপাশের পরিবেশ যখন পুলিশের পাহারায় নিরাপদ—তখন তার কাছে স্বামীর বীরত্ব বা প্রয়োজনীয়তা ম্লান হয়ে যায়। এমন অবস্থায় অনেক স্ত্রী তার স্বামীকে নিজের উন্নতির পথে একটি বোঝা মনে করেন।
আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজ জীবনকে এতটাই সহজ করে দিয়েছে যে, এই আরামের আতিশয্যে অনেক নারী চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে বসেন। তারা মনে করেন—পুরুষজাতি আসলে মূল্যহীন।
কিন্তু এই পশ্চিমা কৃত্রিম আধুনিকতার বাইরে পরিস্থিতি একদম উলটো। সেখানে একজন স্ত্রী খুব ভালো করেই জানেন যে, তার স্বামীই তার জীবনের মূল ভরসা।
মানব ইতিহাসের প্রায় সব প্রাচীন সংস্কৃতি এবং সভ্যতায় নারীরা সহজাতভাবেই পুরুষের গুরুত্ব অনুভব করত। একজন ভালো স্বামী থাকা মানেই ছিল আর্থিক স্বচ্ছলতা, নিরাপত্তা, শক্তিশালী সামাজিক অবস্থান এবং মাথা গোঁজার ঠাঁই। স্বামী থাকা মানেই ছিল সামাজিক মর্যাদা। এর মাধ্যমে নারী পেত একটি শক্তিশালী পরিবারের ভিত্তি।
এখানে শুধুমাত্র ইতিহাসের কথা বলা হচ্ছে না। আজও পৃথিবীর অনেক প্রান্তে একজন স্বামী মানেই তার স্ত্রীর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক মজবুত ঢাল। ডাকাতি, সহিংসতা, গৃহহীনতা বা ক্ষুধার মতো যে কঠিন বাস্তবতাগুলো পশ্চিমা আরামদায়ক জীবনের নারীরা কল্পনাও করতে পারে না—সেই বিপদগুলো থেকে স্বামীই তার স্ত্রীকে রক্ষা করেন।
এই সমাজগুলোতে নারীরা স্বামীর কদর বোঝেন এবং একজন ভালো জীবনসঙ্গী পাওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। একজন ভালো স্বামী পাওয়া মানে যেন হাতে চাঁদ পাওয়া। এখানকার নারীরা স্বামীর পুরুষালি দায়িত্বগুলোকে সম্মান করেন।
তাই স্বামীর পাশে দাঁড়াতে এই স্ত্রীরা হাসিমুখে সব করতে পারেন। তারা হন স্বামীর যোগ্য সহচর ও সমর্থক। স্বামী যখন দিনশেষে পরিবারের জন্য হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে ঘরে ফেরেন, তখন স্ত্রী তার সবটুকু দিয়ে স্বামীর ক্লান্তি দূর করার চেষ্টা করেন। ঘর গোছানো, রান্না করা বা সন্তান লালনপালন করা—এসব তার কাছে কোনো আপদ মনে হয় না। বরং তিনি স্বামীর প্রয়োজনগুলো বলার আগেই বুঝে নেন। তিনি জানেন, তিনি স্বামীর যত্ন নিচ্ছেন যাতে স্বামীও সারা জীবন পরম মমতায় তার দেখাশোনা করতে পারেন।
এটি দাম্পত্য জীবনের একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা। মিশরে আমার বাবা-মায়ের সময়ে কিংবা তারও আগে একটি চমৎকার আরবি প্রবাদ প্রচলিত ছিল:
“দেয়ালের ছায়ার চেয়ে একজন পুরুষের ছায়াও অনেক উত্তম।”
অর্থাৎ একা থাকার চেয়ে স্বামীর ছায়াতলে থাকাই পরম স্বস্তির। একজন স্ত্রী হিসেবে আপনি অন্তত তার আশ্রয়ে নিরাপদে থাকতে পারেন।
অর্থাৎ স্বামী যেন এক বিশাল বটবৃক্ষ, যার আশ্রয়ে স্ত্রী নিরাপদ। একজন নারীর জন্য বাহ্যিক জগত আর নিজের মাঝখানে স্বামীকেই ঢাল হিসেবে রাখা উত্তম; স্বামী যেন বাইরের কঠিন পৃথিবীর ঝাপটা থেকে বাঁচানোর এক মজবুত দেয়াল।
এই প্রাচীন প্রবাদগুলো কেবল কথার কথা নয়, বরং এর গভীরে গভীর জীবনবোধ লুকিয়ে আছে। এমন পরিবেশে বেড়ে ওঠা স্ত্রীরা স্থিরচিত্ত, ধৈর্যশীল এবং পরিণত হন। তারা স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকেন এবং জীবনের যেকোনো ঝড়-ঝাপটায় স্বামীর হাত শক্ত করে ধরে রাখেন। তারা নমনীয় ও বিশ্বস্ত হন; কঠিন সময়েও স্বামীকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবতেই পারেন না।
তবে এখানে ভুল বোঝার সুযোগ নেই। আমি বলছি না যে সব আধুনিক নারীই খারাপ, কিংবা সব স্বামীই দুধে ধোয়া তুলসী পাতা। আবার স্বামীর কদর করতে হলে যে সব সময় ভয়ংকর বা অভাবী পরিবেশে থাকতে হবে, এমনটিও নয়।
আসল বিষয়টি হলো আমাদের সামাজিক পরিবেশ বা মানসিকতা। সমাজ কি বিয়েকে মূল্যায়ন করছে, নাকি একে মূল্যহীন করে তুলছে—সেটাই দেখার বিষয়। এই পরিবেশই ঠিক করে দেয় একজন স্ত্রী তার স্বামীকে পরম আশীর্বাদ হিসেবে দেখবেন, নাকি তুচ্ছ জ্ঞান করবেন।
দুটি ভিন্ন বাস্তবতা তাই ভিন্ন ফলাফল বয়ে আনে। বিলাসবহুল আধুনিক সমাজে দাম্পত্য কলহের দ্রুত সমাধান হলো বিচ্ছেদ। কারণ স্ত্রী অনেক আগে থেকেই তার স্বামীকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে আসছিলেন; তার ওপর তিনি হয়তো স্বামীর চেয়ে বেশি আয় করেন এবং নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাবেন। তার কাছে স্বামীকে বিদায় দিয়ে নতুন জীবনের দিকে এগিয়ে যাওয়াই সহজ মনে হয়। আর এই আগুনেই ঘি ঢালেন তার ডিভোর্সি বান্ধবীরা। শেষ পর্যন্ত নারীবাদী আদালত আর আইনও তার পক্ষ নেয়; ফলে স্বামীর সম্পত্তি আর সন্তানদের অধিকার নিয়ে তিনি অনায়াসেই আলাদা হয়ে যান।
অন্যদিকে, চিরায়ত সমাজগুলোতে স্ত্রীরা যেকোনো মূল্যে বৈবাহিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে চান। কোনো সমস্যা তৈরি হলে তা মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়। পরিবারের বড়রা এগিয়ে আসেন, দুই পক্ষকেই বুঝিয়ে সংশোধন করার চেষ্টা করেন।
এই প্রেক্ষাপটে বিচার করলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম-এর একটি হাদিসের মর্মার্থ বোঝা সহজ হয়। তিনি বলেন,
আমি যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা করার নির্দেশ দিতাম, তবে স্ত্রীদের নির্দেশ দিতাম তাদের স্বামীদের সিজদা করতে; কারণ আল্লাহ স্বামীদের ওপর বিশেষ অধিকার দিয়েছেন।
এটি ইবাদতের সিজদা নয়। বরং এটি স্ত্রীর পক্ষ থেকে স্বামীর প্রতি সম্মান, কৃতজ্ঞতা ও বিনয়ের প্রকাশ। আধুনিক যুগের অনেক নারী এই মানবিক গুণগুলো হারিয়ে ফেলেছেন।
কিন্তু বিলাসবহুল জগতের বাইরে যেখানে জীবন কঠিন, সেখানে নারীরা স্বাভাবিকভাবেই স্বামীর প্রতি পরম শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা অনুভব করেন। আমরা যারা আধুনিক ও অতি-আরামদায়ক সমাজে বাস করি, তাদের মাঝে মাঝে এই ধ্রুব সত্যটি মনে করিয়ে দেওয়া খুবই জরুরি।
আল্লাহ সকল মুসলিম দম্পতিকে শান্তিপূর্ণ ও বরকতময় দাম্পত্য জীবন দান করুন। আমিন।
লেখাঃ উম্মু খালিদ
অনুবাদঃ রিফাহ তাসফিয়াহ শশী









Comments