মজলুমের ভাষা-রাজনীতি ও লুম্পেন সংস্কৃতির ফাঁদ

কবি হেলাল হাফিজের একটা কবিতা আছে ‘যার যেখানে জায়গা’। কবি এই কবিতাটিতে গ্রাম-শহরের বৈষম্য, মোসাহেবী, এবং রাজনীতিবিদদের মিথ্যা আশ্বাসের বিরুদ্ধে গ্রামীণ শোষিত মানুষের পুঞ্জিভূত এক তীব্র ক্ষোভের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। এই কবিতার শেষ পংক্তিটিতে শোষিতের অসহায় ক্ষোভ পূর্ণমাত্রায় প্রকাশিত হয়, যখন গ্রামের পোলা বলে ‘আমিও গেরামের পোলা/‘চুত্মারানি’ গাইল দিতে জানি’।
স্বাভাবিক অবস্থায় শেষ পঙক্তির বন্ধনীবদ্ধ শব্দটি একটা অশ্লীল গালি হিসেবেই বিবেচিত। কেউ যদি এরকম শব্দ উচ্চারণ করে তাকে আমরা নিম্ন-রুচিসম্পন্ন খারাপ মানুষ মনে করি, আর যাকে এই গালি দেয়া হয় তিনিও খুব অপমানিত বোধ করেন।
বিএনপির সংরক্ষিত মহিলা আসন থেকে নির্বাচিত সাংসদ শাম্মী আক্তার ২০১৩ সালে সংসদে এই কবিতাটি কোনো সেন্সর ছাড়াই আবৃতি করে আলোচনার জন্ম দেন। তবে, শাম্মী আক্তারের মুখ দিয়ে তখন আওয়ামী ফ্যাসিবাদের জুলুমে নিষ্পেষিত জনগণের মনের কথাগুলোই উঠে এসেছিলো বলে মনে হয়েছিলো।
২০১৮-২০১৯ এর কোটা এবং সড়ক আন্দোলনেও আমরা গালির ব্যবহার দেখেছি। স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের শ্লোগানে রাষ্ট্রের নিপীড়নমূলক কাঠামোর বিরুদ্ধে গালি ব্যবহার হয়েছে, দেয়াল এবং সড়কে চুনকাম করে তারা লিখেছিলো ‘পুলিশ কোন চ্যাটের বাল’।
২০২৪ এর জুলাই আন্দোলনেও আমরা একই চক্র লক্ষ্য করেছি। এখানে চ-বর্গীয় গালির উপস্থিতি ছিলো বেশি; হাসিনা এবং তার হিন্দুত্ববাদী কালচারাল ইন্ডাস্ট্রির বিরুদ্ধে-যারা এই দেশের মানুষের কালচারাল এজেন্সিকে দমন করে ভিনদেশী কালচার চাপিয়ে দিতে চায়।
৫-ই আগস্টের পরেও গালি দেয়া জারি ছিলো; কারণ, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থেকে আওয়ামীলীগ বিদায় নিলেও তার কালচারালগোষ্ঠী এবং আমলাতান্ত্রিক সেট-আপ বহাল তবিয়তে ছিলো (বস্তুত এখনও আছে) এবং পরিবর্তনের পথে বারবার বাঁধার সৃষ্টি করছিলো। আরেকদিকে চলছিলো গোপালগঞ্জে আওয়ামীলীগের আস্ফালন। তখন শরিফ ওসমান হাদী তার বহুল প্রচারিত গালিটি দিয়েছিলো। আর জনগণও মনে হয় এটার সাথে একাত্মতা অনুভব করতে পেরেছিলো।
এর পরে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গালি মনে হয় আরও বেশি ফ্যাশনেবল হয়ে উঠেছিলো।
জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের শেষ হাতিয়ার হচ্ছে দুইটা; গালি আর বদদোয়া। প্রান্তিক মানুষের যখন করার কিছু থাকে না, তখন সর্বশেষ দৃশ্যমান অনিবার্য প্রতিক্রিয়া হিসেবে অবচেতনেই গালি বের হয়ে আসে। গালি এক প্রকারের ভাষা। এটা মজলুমের ক্ষোভের দূর্বল এবং অসহায় প্রকাশ। আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটা অনেকটা লোকরঞ্জনবাদীও বটে।
ক্ষমতার প্রশ্নে ভাষার একটা রাজনীতি আছে। এই রাজনীতিকে একটু বুঝার চেষ্টা করবো আমরা।
কোনো সমাজে কোন ভাষাটি ‘সিদ্ধ’ আর কোনটি ‘অসিদ্ধ’, তা নির্ধারণ করে সমাজের প্রভাবশালী বা শাসক শ্রেণি।
উচ্চবিত্ত বা শাসক শ্রেণির ভাষাকে ‘ভদ্র’ বা ‘উন্নত’ এবং প্রান্তিক মানুষের ভাষাকে ‘বর্বরোচিত’ হিসেবে দেগে দেওয়া কোনো প্রাকৃতিক বা নান্দনিক বিভাজন নয়; এটি একটি সুপরিকল্পিত আধিপত্যবাদী নির্মাণ (Hegemonic Construct)। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বুর্দিয়ুর মতে- এলিট শ্রেণি রাষ্ট্রযন্ত্র, শিক্ষাব্যবস্থা ও গণমাধ্যমের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ খাটিয়ে নিজেদের ভাষাগত বৈচিত্র্যকে ‘একমাত্র বৈধ ভাষা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। একে তিনি বলেছেন ‘অরবিট্রারি স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন’। এই প্রক্রিয়ায় এলিটদের ভাষা হয়ে ওঠে ‘সাংস্কৃতিক পুঁজি’।
বিপরীতে, প্রান্তিক, শ্রমিক বা উপসংস্কৃতিগত গোষ্ঠীগুলোর ভাষাকে যখন ‘অধঃপতন’ বা ‘বর্বরোচিত’ হিসেবে তকমা দেওয়া হয়, তখন মূলত তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক যোগ্যতাকে পদ্ধতিগতভাবে অস্বীকার করা হয়। আফ্রিকার চিন্তাবিদ নগুগি ওয়া থিয়ঙ্গো একে ‘ভাষাগত উপনিবেশবাদ’ হিসেবে চিহ্নিত করেন, যার মাধ্যমে শাসক মানুষকে মনস্তাত্ত্বিক দাস হিসেবে তৈরি করতে চায়। ভাষা এখানে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম থাকে না, বরং তা সামাজিক স্তরবিন্যাসকে বৈধতা দেওয়ার এবং একটি নির্দিষ্ট শ্রেণিকে ‘স্বভাবজাতভাবে শ্রেষ্ঠ’ প্রমাণ করার রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই— শোষিত বা প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলোর দ্বারা স্ল্যাং বা অপভাষার ব্যবহার কেবল যোগাযোগের অভাবজনিত কারণে ঘটেনি; এটি ছিল একটি সচেষ্ট ভাষাগত অন্তর্ঘাত। জেমস সি. স্কট তাঁর Domination and the Arts of Resistance গ্রন্থে শোষিত মানুষের প্রতিরোধের দুটি রূপ দেখিয়েছেন: একটি প্রকাশ্য, অন্যটি প্রচ্ছন্ন।
দমনপীড়নমূলক ব্যবস্থার মধ্যে যখন সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিরোধ অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন স্ল্যাং কাজ করে এক ধরনের ‘ভাষাগত ক্রিপ্টোগ্রাফি’ বা গোপন সংকেত হিসেবে। এর ধ্রুপদী উদাহরণ আফ্রো-আমেরিকানদের ‘আফ্রিকান আমেরিকান ভার্নাকুলার ইংলিশ’ বা ইবোনিক্স। দাসপ্রথা এবং পরবর্তী জিম ক্রো আইনের বর্ণবাদী যুগে, কৃষ্ণাঙ্গরা শ্বেতাঙ্গ প্রভুদের নজরদারি এড়াতে এবং নিজেদের মধ্যে বিদ্রোহের রসদ জোগাতে এমন এক স্ল্যাং-সংস্কৃতি তৈরি করেছিল, যা পরে সত্তরের দশকের ব্ল্যাক প্যান্থার পার্টি এবং নাগরিক অধিকার আন্দোলনের অন্যতম প্রতীকে রূপান্তরিত হয়। প্রতিষ্ঠিত ভাষার ব্যাকরণ, বাক্যগঠন এবং উচ্চারণরীতিকে ইচ্ছাকৃতভাবে ভেঙে ফেলা আসলে এক ধরনের অহিংস নাগরিক অবাধ্যতা। মিশেল ফুকোর ‘ডিসকোর্স’ তত্ত্বের আলোকে বলা যায়, রাষ্ট্র যখন ভাষার নিয়ম ঠিক করে দিয়ে মানুষের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তখন স্ল্যাং সেই নিয়মের শৃঙ্খলাকে ভেঙে দিয়ে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের ভিত্তিমূলে আঘাত হানে।
কোনো নির্দিষ্ট স্ল্যাং বা কোড ব্যবহার করার অর্থ হলো এক ধরনের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর, যা ব্যক্তিকে তার অজান্তেই একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক এজেন্ডার সাথে যুক্ত করে।
বার্মিংহাম স্কুলের উপসংস্কৃতিগত অধ্যয়নের (Sub-cultural Studies) তাত্ত্বিক কাঠামো অনুযায়ী, স্ল্যাং বা অপভাষা হলো একটি বিচ্যুতিমূলক বা বিপ্লবী উপসংস্কৃতির ‘শৈলীগত প্রতিরোধ’ (Stylistic Resistance)। একজন ব্যক্তি যখন সচেতন বা অবচেতনভাবে কোনো স্ল্যাং উচ্চারণ করেন, তখন তিনি মূলত সমাজের মূলধারার আধিপত্যবাদী মূল্যবোধকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং নিজের গোষ্ঠীর ভেতর একটি অভ্যন্তরীণ সংহতি (In-group Solidarity) গড়ে তোলেন। সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইমের ‘জৈব সংহতি’ বা অর্গানিক সলিডারিটির ধারণাকে যদি আমরা এখানে সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে ফেলি, তবে দেখা যাবে স্ল্যাং মানুষের মধ্যে একটি অভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক স্তর (Psycho-social Membrane) তৈরি করে। এই যৌথ ভাষাগত অভিজ্ঞতা প্রান্তিক মানুষকে ইঙ্গিত দেয় যে তাদের ক্ষোভ এবং বঞ্চনা একক কোনো বিষয় নয়, বরং তা সামষ্টিক। ভাষা যখন এভাবে একটি সমান্তরাল পরিচয় তৈরি করতে পারে, ঠিক তখনই তা যেকোনো আমূল পরিবর্তনকামী (Radical) রাজনৈতিক আন্দোলন বা গণঅভ্যুত্থানের ‘জাগরণের শক্তি’ (Mobilizing Force) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
তাই, ভারতীয় আধিপত্যবাদের বাংলাদেশি অগ্রগামী শক্তি বা ভ্যানগার্ডের (Vanguard) বিরুদ্ধে সাংসদ শাম্মী আক্তার যখন কবি হেলাল হাফিজের কবিতা আবৃত্তি করেন, তখন সেটা আর কেবল শাম্মী আক্তারের একার কণ্ঠস্বর (Voice) থাকে না; সেটা হয়ে ওঠে দিল্লির প্রক্সি নির্যাতনে অতিষ্ঠ মজলুম জনতার ক্ষোভ। কিংবা যখন জেন-জি’র (Gen-Z) কিশোর শিক্ষার্থীরা সড়কে বসে চ-বর্গীয় স্লোগান দিতে থাকে, কিংবা হাদি মাইক হাতে নিয়ে সাংস্কৃতিক ডাকু আর আমলাতান্ত্রিক জোঁকদের শ ম ছিঁড়ে ফেলতে বলে, সেখানেও থাকে নিপীড়িত-নিষ্পেষিত মানুষের পুঞ্জীভূত রাগ আর প্রতিরোধের ভাষিক একাত্মতা।
আন্দোলন এবং প্রতিরোধের মুহূর্তে অন্তর্ঘাতমূলক ভাষা (Subversive Language/اللُّغَة التَّخْرِيبِيَّة) যে অভূতপূর্ব মনস্তাত্ত্বিক সংহতি তৈরি করে, তা অনস্বীকার্য। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি সংকটও তৈরি করে। যখন ক্রান্তিকালীন উত্তেজনা বা লিমিনাল পিরিয়ডের (Liminal Period) অবসান ঘটে এবং সমাজ আবার একটি ‘স্বাভাবিক’ বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দিকে যাত্রা শুরু করে, তখন ভাষার এই অন্তর্ঘাতমূলক রূপটি আর কার্যকর থাকে না।
এই ক্রান্তিকালীন রূপান্তর (Liminal Transition) বা ক্রান্তিকালের একটি বড় সংকট হলো— রাজপথের ক্ষোভ যখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে চায়, তখন ভাষার চরিত্রই নির্ধারণ করে দেয় সেই নতুন সমাজ কোন অভিমুখে যাবে। সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের আলোকে, ক্রান্তিকালীন বা লিমিনাল পর্যায়ে সাময়িক বিশৃঙ্খলা বা উগ্রতা মনস্তাত্ত্বিকভাবে কার্যকর মনে হলেও, একটি টেকসই রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের জন্য প্রয়োজন শৃঙ্খলা (Order) এবং সুশৃঙ্খল রীতিনীতি (Norms)।
তাই, আন্দোলন ও প্রতিরোধের মুখে যে ভাষা বিস্ফোরিত হয়, তার সামগ্রিক চরিত্রকে ঢালাওভাবে এক পাল্লায় মাপা মস্ত বড় তাত্ত্বিক ভুল বলে জ্ঞান করি। রাজপথের এই উত্তাল ভাষিক প্রকাশকে যদি আমরা কেবল ‘অশ্লীলতা’ বলে নাকচ করি কিংবা স্রেফ ‘বিপ্লবী চেতনা’ বলে সবটুকুকেই মহিমান্বিত করি, তবে তা হবে এক ধরনের সরলীকরণ। সুতরাং, দীর্ঘমেয়াদি সমাজ ও সভ্যতা বিনির্মাণের স্বার্থে এই প্রতিরোধমূলক ভাষার ভেতরে একটি গুণগত ও ইতিবাচক বিভাজন (Positive Distinction) টানা অপরিহার্য। এই বিভাজনটি মূলত দুই প্রকার বিপরীতমুখী ভাষিক অভিব্যক্তির একটি চিত্র: একদিকে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আঞ্চলিকতা ও লোকজ কথ্য রূপ (Vernacular/Colloquialism), অন্যদিকে অবক্ষয়িত অশ্লীল শব্দাবলি ও গালি (Profanity/Vulgarism)।
এই দুইয়ের পার্থক্যকরণ একই সাথে নৈতিক, রাজনৈতিক এবং সভ্যতাগত।
একটি দীর্ঘস্থায়ী স্বৈরতান্ত্রিক ও আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থায় ক্ষমতার কেন্দ্র সব সময় একটি ‘মানসম্মত ভদ্র ভাষা’ (Standard Language) তৈরি করে, যা আসলে প্রান্তিক মানুষকে শাসন করার হাতিয়ার। পিয়ের বুর্দিয়ু তাঁর ‘ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড সিম্বলিক পাওয়ার’ (Language and Symbolic Power) তত্ত্বে দেখিয়েছেন, শাসকশ্রেণি কীভাবে রাষ্ট্রযন্ত্র ও শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে নিজেদের ভাষাগত বৈচিত্র্যকে ‘সাংস্কৃতিক পুঁজি’ (Cultural Capital) বা ‘একমাত্র বৈধ ভাষা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। এর বিপরীতে প্রান্তিক মানুষের ভাষাকে তারা ‘অশিক্ষিত’ বা ‘অনগ্রসর’ বলে দেগে দেয়।
এই প্রেক্ষাপটে, প্রতিরোধের মুখে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আঞ্চলিক ভাষা বা লোকজ বুলি যখন সামনে চলে আসে, তখন তা গভীর অর্থেই তাৎপর্যপূর্ণ। এটি মিখাইল বাখতিনের ‘কার্নিভালেস্ক’ (Carnivalesque) ধারণার মতো— যেখানে রাজপথের সাধারণ মানুষ তাদের নিজস্ব আঞ্চলিকতায় কথা বলে শাসকের আরোপিত কৃত্রিম বয়ানকে বুড়ো আঙুল দেখায়। বাখতিনের মতে, কার্নিভালেস্ক মুহূর্তে সমাজের প্রতিষ্ঠিত শ্রেণিবিন্যাস বা উঁচু-নিচু ভেদাভেদ ভেঙে পড়ে এবং লোকজ সংস্কৃতি ক্ষমতার মূল কেন্দ্রকে উপহাস করার স্পর্ধা দেখায়।
আঞ্চলিকতার এই প্রকাশ রাষ্ট্রকে বৃহত্তর হয়ে উঠতে সাহায্য করে। এটি ঘোষণা করে যে রাষ্ট্র কেবল ঢাকা-কেন্দ্রিক বা সুনির্দিষ্ট কোনো অভিজাত শ্রেণির নয়, বরং এটি সমতলের, পাহাড়ের, প্রান্তিক মানুষের। এই অর্থে আঞ্চলিক ভাষা আমাদের দীর্ঘমেয়াদি সভ্যতারই অংশ এবং তা সমাজ বিনির্মাণের জন্য অত্যন্ত জরুরি ও টেকসই উপাদানও বটে। এটি ভাষার একচেটিয়া আধিপত্যকে ভেঙে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠা করে।
বিপরীতে, চ-বর্গীয় গালি কিংবা সামাজিক মাধ্যমে বা রাজপথে বহুল প্রচারিত শহীদ শরীফ ওসমান হাদির শ-বর্গীয় গালির মতো অশ্লীল শব্দাবলির যখন রাজনৈতিক সংস্কৃতির ফ্যাশন বা ঝোঁকে রূপান্তর ঘটে, তখন সেটা ‘প্রতিরোধের হাতিয়ার’ হিসেবে আর কাজ করে না। বরং তা দীর্ঘমেয়াদে সমাজের নৈতিক ও সভ্যতাগত ভিত্তিকে দুর্বল করে ফেলে।
তাত্ত্বিকভাবে গালি হলো ভাষার সবচেয়ে আদিম এবং অবক্ষয়িত রূপ। স্বৈরাচার তো কেবল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে না, সে দীর্ঘমেয়াদে সমাজের রুচি, মনস্তত্ত্ব ও সংস্কৃতিরও লুম্পেনায়ন ঘটায়। তার প্রাতিষ্ঠানিক এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলো মানুষকে নির্যাতন এবং মানসিকভাবে দুর্বল করতে লাঠিয়ালির পাশাপাশি ভাষাকেও অস্ত্র বানায়; সে তার কদর্য এবং অবক্ষয়িত ভাষা দিয়ে মানুষের সম্মান হননের চেষ্টা করে। যখন প্রতিবাদের ভাষা হিসেবেও আমরা সেই একই লুম্পেন বা অবক্ষয়িত ভাষিক উপাদানকে আপন করে নিই, তখন আমরা মূলত স্বৈরাচারের তৈরি করা রুচিহীন সংস্কৃতির ফাঁদেই আটকা পড়ে যাই। ফ্রান্টজ ফানো তাঁর The Wretched of the Earth গ্রন্থে সতর্ক করেছিলেন যে, শোষিতের অবদমিত ক্ষোভ যখন কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও নৈতিক দিকনির্দেশনা ছাড়া স্রেফ আদিমতা ও রূঢ় অভিব্যক্তিতে রূপ নেয়, তখন তা দীর্ঘমেয়াদে নিজের সমাজকেই ধ্বংস করে।
প্রত্যেক সমাজ ও সভ্যতার নিজস্ব একটি সামাজিক চুক্তি এবং সাংস্কৃতিক পাটাতন থাকে। আমাদের বাঙালি সমাজের চিরায়ত রীতিনীতি বা পাটাতনের একটি প্রধান শর্ত হলো— ব্যক্তিগত ক্ষোভ যতই থাকুক, জনপরিসরে গালি দেওয়া একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ও গর্হিত কাজ। জালিমের প্রতিরোধের মুখে দুর্বলের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গালিকে সাময়িক প্রশ্রয় দেওয়া গেলেও এটাকে যখন ফ্যাশনেবল এবং লোকরঞ্জনবাদী রাজনীতির প্রধান পুঁজি বা কারেন্সি বানিয়ে ফেলা হয়, তখন সমাজের এই অলিখিত সামাজিক চুক্তিটি অকার্যকর হয়ে পড়ে। এর ফলে যা তৈরি হয় তা কোনো মুক্ত সমাজ নয়, বরং এক ধরনের সামাজিক বিশৃঙ্খলা, যেখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সামাজিক রীতিনীতির ন্যূনতম সীমারেখাও ভেঙে পড়ে। সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইম এই ‘অ্যানোমি’ বা আদর্শহীনতাকে সমাজের এমন এক অবস্থা বলেছেন, যেখানে মানুষ তার নৈতিক কম্পাস হারিয়ে ফেলে, যার ফলে সমাজ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।
আমাদের সমাজ ও সভ্যতার দীর্ঘমেয়াদি মনস্তাত্ত্বিক বিনির্মাণের ক্ষেত্রে নৈতিকতা এবং মূল্যবোধের প্রধান ও চূড়ান্ত মানদণ্ড বা উৎস হলো ইসলাম। ইসলাম কেবল একটি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সমষ্টি নয়, বরং এটি মানুষের সামাজিক আচরণ, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং জনপরিসরে ভাষার ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট ও উচ্চতর মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেয়। ইসলামি ডিসকোর্সে গালি এবং অশ্লীল শব্দাবলির উচ্চারণকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। কারণ, ইসলাম বিশ্বাস করে— অপবিত্র মাধ্যম বা ভাষা দিয়ে কখনো একটি পবিত্র ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ করা সম্ভব নয়।
আল-কুরআনে মানুষের মুখের ভাষার দায়বদ্ধতা সম্পর্কে অত্যন্ত কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে:
‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার জন্য একজন সদা তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে।’
– সূরা ক্বাফ: ১৮
অর্থাৎ, আন্দোলনের বা আবেগের অজুহাতে জনপরিসরে উচ্চারিত গালি বা কুৎসিত শব্দাবলী কেবল সামাজিক পরিবেশকেই দূষিত করে না, বরং তা ব্যক্তির আধ্যাত্মিক ও নৈতিক ভিত্তিকেও ধসিয়ে দেয়। ইসলামের দৃষ্টিতে, ভাষা হলো আল্লাহর দেওয়া এক মহান নিয়ামত, যা দিয়ে ইনসাফ ও হকের দাওয়াত দিতে হয়। একে গালির ফ্যাশনে রূপান্তর করা এই নেয়ামতের চরম অপব্যবহার।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুমিনের সামাজিক পরিচয় এবং তার ভাষাগত মান সুনির্দিষ্ট করে দিয়ে বলেছেন:
‘মুমিন কখনো লানতকারী, খোটা দানকারী, অশ্লীলভাষী ও গালিগালাজকারী হতে পারে না।’ (তিরমিজি, আহমাদ, হাকিম, ইবনু হিব্বান।)
অন্য একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছেন, যা বর্তমান পপুলিস্ট গালির সংস্কৃতির ব্যাপারে অশনিসংকেত হিসেবে কাজ করে:
‘নিশ্চয় আল্লাহ অশ্লীলভাষী ও বাচাল লোককে পছন্দ করেন না।’ [তিরমিজি, আবু দাউদ]
আমাদের সমাজ দর্শনের অন্যতম স্তম্ভ হলো ‘হায়া’ বা শালীনতা। হায়া কেবল পোশাকের বিষয় নয়, এটি চিন্তার এবং ভাষারও শালীনতা। যখন রাজপথে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গালি দেওয়াকে বীরত্ব বা ‘ফ্যাশন’ হিসেবে জাস্টিফাই করা হয়, তখন মূলত সমাজের সেই হায়া-কেই ভেঙে ফেলা হয়। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, জালিমের জুলুমের প্রতিবাদ করতে হবে ইনসাফ, সত্য এবং নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে, শাসকের লুম্পেন সংস্কৃতির অনুকরণ করে নয়। সুতরাং, আমাদের দীর্ঘমেয়াদী সভ্যতা বিনির্মাণের যে নৈতিক লড়াই, তার ভাষা অবশ্যই আমাদের নর্মসের আলোকে পবিত্র, পরিশীলিত এবং মর্যাদাপূর্ণ হতে হবে।
অথচ সমসাময়িক বাস্তবতার দিকে তাকালে আমরা ঠিক এই লুম্পেন সংস্কৃতির কদর্য এক পুনরুৎপাদনই আমাদের চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। বিগত ফ্যাসিবাদী আমলে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগের অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের ভাষা-সন্ত্রাস আমরা দেখেছি, যেখানে মা-বোন কিংবা পরিবারকে জড়িয়ে অশ্লীল গালাগালির কোনো লাগাম ছিল না। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে চূর্ণ ও হেনস্তা করার জন্য গালিকে তারা একটি প্রাতিষ্ঠানিক হাতিয়ারে পরিণত করেছিল। ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পরও সেই সাইবার-লিংগুইস্টিক সন্ত্রাস থামেনি; বরং পতিত এবং নির্বাসিত ফ্যাসিবাদী কুশীলবেরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জুলাই আন্দোলনের অংশীজন ও তাদের পরিবারকে একইভাবে কুরুচিপূর্ণ গালির লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এই কদর্য লিগ্যাসির মোকাবিলা করতে গিয়ে খোদ জুলাই আন্দোলনের কর্মীদের একাংশও একইরকম অবক্ষয়িত ভাষার বৃত্তে জড়িয়ে পড়ছে। এমনকি যারা ‘ইসলামের রাজনীতি’ করে বলে দাবি করে তারাও। ইদানিং ‘এক টাকায় গালি’র মতো অনলাইন সার্ভিসও নেমে গেছে বাজারে। ইয়া আসাফা!
তাত্ত্বিকভাবে বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট হয় যে, এই ধরণের সাইবার-লিংগুইস্টিক সন্ত্রাস মূলত ফ্যাসিবাদের একটি কাঠামোগত হাতিয়ার। স্বৈরাচারী লিগ্যাসি কেবল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে না, তা জনপরিসরের মনস্তাত্ত্বিক রুচিরও পচন ঘটায়। এই গালিগালাজের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রতিপক্ষের মনুষ্যত্বহরণ করা, যাতে তাদের ওপর যেকোনো নিপীড়নকে সমাজে স্বাভাবিক প্রতিপন্ন করা যায়। ক্ষমতার মসনদ হারানোর পরও তাদের এই চরিত্র বিন্দুমাত্র বদলায়নি। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, এই ফ্যাসিবাদী অপসংস্কৃতির মোকাবিলা করতে গিয়ে যখন অভ্যুত্থানোত্তর প্রজন্মের একটি অংশ অবচেতনেই বা ক্ষণকালীন পপুলিজমের প্ররোচনায় গালিকে নিজেদের রাজনৈতিক ফ্যাশন বানিয়ে তোলে, তখন তারা প্রকারান্তরে শত্রুর তৈরি করা ‘ফ্যাসিবাদী ডিসকোর্সের’ ফাঁদেই পা দেয়। বর্তমান ভার্চুয়াল ও রিয়েল লাইফ কালচারে গালি দেওয়া কিংবা মানুষের মুখের ওপর কুরুচিপূর্ণ কথা বলে দেয়াকে এক ধরণের তথাকথিত ‘সিগমা ক্যারেক্টার’ বা আলফা-মেইল সুলভ বীরত্ব হিসেবে জাস্টিফাই করার যে মস্ত বড় মানসিক ব্যাধি তরুণদের একাংশকে গ্রাস করেছে, তা মূলত এই লুম্পেন সংস্কৃতিরই একটা এক্সটেনশন। নিজেকে ‘কুল’ বা ‘দুর্দান্ত বিদ্রোহী’ প্রমাণ করতে গিয়ে ভাষার যে অবক্ষয়কে এরা আইডোলাইজ করছে, তা আদতে কোনো বীরত্ব নয়; বরং এক ধরণের চরম মনস্তাত্ত্বিক দৈন্যতা। ফুকোর তাত্ত্বিক কাঠামো অনুযায়ী, আপনি যখন শত্রুর অস্ত্র ও ভাষিক রূপকে অবিকল অনুকরণ করে তার মোকাবিলা করতে চান, তখন আপনি নিজের অজান্তেই সেই শত্রুর মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোর ‘কালচারাল রিপ্রোডাকশন’ বা সাংস্কৃতিক পুনরুৎপাদন ঘটিয়ে চলেন। এর ফলে স্বৈরাচারের ব্যক্তি বা দলের অবসান ঘটলেও, তার রেখে যাওয়া কদর্য ও অবক্ষয়িত রুচির লিগ্যাসি সমাজে বহাল তবিয়তেই টিকে থাকে।
গালির লাভ-ক্ষতিগুলো বুঝা যাবে আরও পরিষ্কারভাবে যখন আমরা আমাদের প্রতিরোধকে নিছক ‘রেজিম চেইঞ্জ’ এর প্রতিরোধ হিসেবে না দেখে একটা সভ্যতাগত পরিবর্তন হিসেবে দেখবো। রাজনৈতিক পরিবর্তন যদি নিছক একটি দলের বিদায় এবং আরেকটি দলের ক্ষমতায় বসার বিষয় হয়, তবে ক্ষণকালীন পপুলিজম বা তরুণদের তাৎক্ষণিকভাবে রাস্তায় নামানোর জন্য গালি একটি অত্যন্ত কার্যকর শর্টকাট টুল হতে পারে। গালির একটি আদিম, পাশবিক আকর্ষণ আছে যা যুবসমাজকে দ্রুত উত্তেজিত ও সংহত করতে পারে। কিন্তু পরিবর্তনকে আমরা সভ্যতাগত পরিবর্তন (Civilizational Transformation) হিসেবে দেখলে দেখবো যে, এই পপুলিস্ট গালির রাজনীতি শেষ পর্যন্ত আত্মঘাতী হতে বাধ্য।
ফরাসি চিন্তাবিদ আলবেয়ার কামু তাঁর The Rebel গ্রন্থে বিদ্রোহ ও বিপ্লবের মধ্যকার এই সূক্ষ্ম সীমারেখাটি টেনেছিলেন। তাঁর মতে, বিদ্রোহ যখন নিজের নৈতিক সীমানা হারিয়ে অন্ধ ধ্বংসাত্মক রূপ নেয়, তখন সে নিজেই আরেকটি নতুন একনায়কতন্ত্রের পথ প্রশস্ত করে। স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো তুলনামূলক সহজ, কিন্তু স্বৈরাচার যে মনস্তাত্ত্বিক অবক্ষয়, অসহিষ্ণুতা এবং হিংস্রতার জন্ম দিয়ে গেছে, সমাজ থেকে সেই বিষাক্ত ‘কালচারাল লিগ্যাসি’ দূর করে একটি সুস্থ ও উন্নত সভ্যতার ভিত গড়া কোটি গুণ বেশি কঠিন।
আমাদের জাতিগত শেকড়ে যাওয়া যাক একটু, তাহলে মনে হয় আমরা আরেকটু ভালোভাবে বুঝতে পারবো।
বাংলার ইতিহাস কি ১৯৪৭ থেকে শুরু হয়েছে? কিংবা ১৯৭১? নাকি নব্বই অথবা ২০২৪? না! এর কোনোটাই না। এর ঐতিহাসিক যাত্রা তো শুরু হয়েছে ১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজীর মাধ্যমে, লক্ষণ সেনদের বিতাড়িত করার মধ্য দিয়ে।
বখতিয়ার তো কেবল একজন পরিবর্তিত শাসক বা নিছক ‘রেজিম চেইঞ্জার’ হয়ে বাংলায় আসেননি; তিনি এসেছিলেন একটি গভীর সভ্যতাগত রূপান্তরের ইশতেহার নিয়ে। তাঁর হাত ধরে এই জনপদে পৌত্তলিকতার জায়গায় তাওহীদ স্থাপিত হয়েছিল। পৌত্তলিকতার বর্ণবাদী ও জাতিভেদ প্রথার শৃঙ্খলে পিষ্ট এই জনপদের মানুষকে তিনি মুক্ত করেছিলেন আদল, ইনসাফ ও তৌহীদি চেতনার উচ্চতর নৈতিক ডিসকোর্স দিয়ে। সেটাকে ভিত্তি করে পরবর্তীতে এই বাঙলা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সংস্কৃতি আত্মীকরণ করেছে; যেটার দাপট ছিলো প্রায় ছয়শ’ বছর।
এই দীর্ঘ সময়ের মুসলিম শাসনামলে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি তার নিজস্ব ও স্বতন্ত্র রূপ পরিগ্রহ করেছিল, যা ছিল রুচিশীল, আধ্যাত্মিক এবং নৈতিকতায় বলীয়ান।
তাই, সাময়িক ক্ষোভের বশে রাজপথে গালি দিয়ে সস্তা পপুলিস্ট হাততালি পাওয়া হয়তো সহজ, কিন্তু তা দিয়ে ইনসাফভিত্তিক ও গৌরবোজ্জ্বল সভ্যতার পুনর্নির্মাণ অসম্ভব। যে অপবিত্র ও অবক্ষয়িত ভাষা স্বৈরাচারী সংস্কৃতির অন্ধকার মনস্তত্ত্বকে অবচেতনে টিকিয়ে রাখে, তা কখনো একটি পবিত্র ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের ভিত্তি হতে পারে না। আমাদের মুখের স্বতঃস্ফূর্ত আঞ্চলিকতাকে উদযাপন করতে হবে ক্ষমতার কেন্দ্রকে চূর্ণ করার জন্য, কিন্তু একই সাথে সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণের বৃহত্তর ক্যানভাসে আমাদের চূড়ান্ত রেফারেন্স হতে হবে ইসলাম- যা প্রতিবাদের ভাষাকে লুম্পেনিজমের ফাঁদ থেকে মুক্ত করে এক সুউচ্চ বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক মর্যাদায় আসীন করে। ক্ষোভের আদিম প্রতিক্রিয়া পেরিয়ে আমাদের থিতু হতে হবে চিন্তার, যুক্তির এবং দীর্ঘমেয়াদী সভ্যতাগত বিশুদ্ধাচারের শক্ত পাটাতনে।







Comments