নতুন ডিপ্লোমা প্রোগ্রাম ২০২৬ শুরু হয়েছে! ক্রিটিক্যাল সোশ্যাল থট অ্যান্ড ইসলামিক ট্র্যাডিশন ডিপ্লোমা সম্পর্কে জানুন → নতুন ডিপ্লোমা প্রোগ্রাম ২০২৬ — ডিপ্লোমা সম্পর্কে জানুন →

সমসাময়িক বিশ্লেষণ

ইতিহাসের নতুন বিন্যাস: ব্রাহ্মণ বনাম নমশূদ্র মনস্তত্ত্ব এবং জুলাইয়ের রূপান্তর

Share
Share

ইতিহাসের নতুন বিন্যাস: ব্রাহ্মণ বনাম নমশূদ্র মনস্তত্ত্ব এবং জুলাইয়ের রূপান্তর

সম্প্রতি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আলাপের জন্য অক্সফোর্ড ইউনিয়নে বাংলাদেশের কয়েকজন আলোচকের যাওয়া নিয়ে এক নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এই দলে ছিলেন হাসনাত আব্দুল্লাহ, নাবিলা ফেরদৌস, সাদিক কায়েম এবং বিএনপির নীতিনির্ধারক ড. আলিয়ার। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ডক্টর ইউনূসের প্রেস সেক্রেটারি শফিকুল আলমেরও যাওয়ার কথা থাকলেও ব্যক্তিগত কারণে তিনি যেতে পারেননি।

এদের যাওয়া নিয়ে আমাদের সুশীল ও বুদ্ধিজীবী মহলের অনুসারীদের মধ্যে একধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়তো অনেকেই খেয়াল করেছেন। বিরোধিতাকারীদের মধ্যে কয়েকজন বিএনপির সমর্থকও ছিলেন; তবে আমার ঘোর সন্দেহ আছে—ড. আলিয়ার যে তাদের দলেরই একজন নীতিনির্ধারক, সে খবর তারা রাখতেন কি না। জানলে হয়তো এমনটি করতেন না। মূলত তারা রাজনৈতিক বিরোধিতাকে রাজনৈতিক বিদ্বেষে রূপ দিয়েছেন এবং তারই প্রতিফলন ঘটাতে গিয়ে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছেন, যা খুব একটা সচেতন কোনো সিদ্ধান্ত নয়।

তাহলে এই বিরোধিতার পেছনে সচেতন সিদ্ধান্ত আসলে কাদের ছিল? তা নিয়েই আজকের আলাপ। রাজনীতি এবং সমাজনীতির ভেতরে দৃষ্টি দিলে স্পষ্ট একটি শ্রেণীবিন্যাস চোখে পড়ে। একাডেমিক ভাষায় একে বলা যায় ‘এলিট’ আর ‘সাব-অল্টার্ন’। তথাকথিত বেঙ্গল রেনেসাঁর ইতিহাসে খুঁজলে এদেরই আপনি পাবেন ‘ভদ্রলোক সমাজ’ এবং ‘নিম্নবর্গ’ নামে।

তবে আমার ভাষায় এই শ্রেণীবিন্যাস হলো—ব্রাহ্মণ আর নমশূদ্র। এই বিভাজনটি কোনোভাবেই ধর্মভিত্তিক নয়, বরং একান্তই শ্রেণীভিত্তিক। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা পেয়েছিলাম নতুন এক ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজ। মীর জাফর, ঘসেটি বেগম, রায় দুর্লভ, জগৎশেঠ প্রমুখ যার প্রতিভূ। অন্যদিকে নমশূদ্র হলো এ মাটির আসল সন্তানেরা। রূপক অর্থে তারা নবাব সিরাজউদ্দৌলার চিন্তাভাবনার উত্তরসূরী।

১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে শুধু স্বাধীন নবাবির পতন ঘটেনি; জন্ম হয়েছিল এক নতুন ‘ব্রাহ্মণ’ শ্রেণীর, যারা ঔপনিবেশিক প্রভুদের আশীর্বাদে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে জায়গা করে নেয়। এই ব্রাহ্মণ্যবাদের আধুনিক রূপান্তর আমরা দেখতে পাই কলকাতার ‘ভদ্রলোক’ সমাজে। লর্ড কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে যে নতুন জমিদার শ্রেণীর উদ্ভব হলো, তারা রাতারাতি সমাজের চালিকাশক্তি বনে গেল। এদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, ভাষা এবং জীবনবোধ নির্ধারিত হতো লর্ড মেকলের ছাঁচে, যা সাধারণ মানুষের যাপিত জীবন থেকে ছিল যোজন যোজন দূরে।

এই ভদ্রলোক সমাজ তথা ব্রাহ্মণদের প্রধান বৈশিষ্ট্যই ছিল একধরনের সাংস্কৃতিক আধিপত্য বা হেজেমনি। তারাই ঠিক করে দিত কে সভ্য আর কে অসভ্য, কার ভাষা শুদ্ধ আর কার ভাষা ‘গেঁয়ো’। দুর্ভাগ্যবশত, ১৯৭১-এর পর বাংলাদেশে ক্ষমতার হাতবদল হলেও এই মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোর খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। কলকাতার সেই ভদ্রলোক সংস্কৃতির উত্তরাধিকার ঢাকার এক শ্রেণীর সুশীল ও বুদ্ধিজীবী মহলের মগজে শক্ত হয়ে জাঁকিয়ে বসে। তারা নিজেদের এই ভূখণ্ডের জ্ঞানের একমাত্র ইজারাদার মনে করতে শুরু করে—অর্থাৎ, আধুনিক যুগের ‘ব্রাহ্মণ’।

অন্যদিকে, ‘নমশূদ্র’ শিবিরটি গড়ে উঠেছিল এই আধিপত্যের একেবারে বিপরীতে। ঐতিহাসিকভাবেই এরা এই মাটির আসল সন্তান—নিপীড়িত নিম্নবর্গীয় হিন্দু এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ গ্রামীণ মুসলমান। এই দুই গোষ্ঠীই কলকাতার ভদ্রলোক বাবুদের দ্বারা সমানভাবে শোষিত ও অবহেলিত হয়েছে। এদের ভাষা ছিল ব্রাত্য, সংস্কৃতিকে আখ্যা দেওয়া হতো ‘ছোটলোকী’ বলে। কিন্তু এই নমশূদ্রদের ভেতরেই ধিকিধিকি জ্বলছিল প্রতিরোধের আগুন। সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা, হাজী শরীয়তুল্লাহর ফরায়েজী আন্দোলন, কিংবা পরবর্তীকালে ড. পি আর ঠাকুর এবং যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের নেতৃত্বে দলিত-মুসলিম ঐক্য এগুলো সবই ছিল ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে নমশূদ্রদের ঐতিহাসিক লড়াইয়ের একেকটি জ্বলন্ত অধ্যায়।

এই একই অক্সফোর্ড ইউনিয়নে হাসনাত আব্দুল্লাহ বা সাদিক কাইয়েমদের বদলে যদি ঢাকার তথাকথিত ‘ভদ্রলোক’ সমাজের কোনো সুশীল প্রতিনিধি, চেনা কোনো বামপন্থী তাত্ত্বিক কিংবা তাদের ড্রয়িংরুম সংস্কৃতির কোনো মননশীল বুদ্ধিজীবী আমন্ত্রিত হতেন তাহলে কী হতো?

তাহলে ঢাকার এই বুদ্ধিজীবী আর সুশীল মহলের অনুসারীদের সোশ্যাল মিডিয়া টাইমলাইনজুড়ে আনন্দের বন্যা বয়ে যেত। তখন আর ড. আলিয়ারের রাজনৈতিক পরিচয় বা অন্য কারও ব্যক্তিগত কারণে না যাওয়াটা ধর্তব্যের মধ্যেই পড়ত না। উল্টো চারদিকে রব উঠত—”দেখো, বিশ্বমঞ্চে বাঙালির মেধার কী জয়জয়কার!”, “কী চমৎকার ইংরেজি উচ্চারণ!”, কিংবা “বাঙালির মননশীলতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি!”। পত্রিকাগুলোতে কলামের পর কলাম লেখা হতো তাদের জৌলুস আর পারিবারিক আভিজাত্য নিয়ে। চায়ের কাপে ঝড় উঠত যে, অমুক ভাইয়ের বা তমুক আপার এই অর্জন আসলে পুরো জাতির গৌরব।

একই ঘটনার এই যে দুই রকম প্রতিক্রিয়া এটাই প্রমাণ করে এদের বিরোধিতা কোনো আদর্শিক বা রাজনৈতিক কারণে নয়; এদের মূল সমস্যাটা ‘প্রতিনিধিত্বে’।

এই ভদ্রলোক সমাজ মনপ্রাণ দিয়ে বিশ্বাস করে, বিশ্বমঞ্চে যাওয়ার, সুটেড-বুটেড হয়ে ভাঙা কিংবা চোস্ত ইংরেজিতে কথা বলার এবং ‘বাঙালি’র প্রতিনিধিত্ব করার একচেটিয়া অধিকার কেবল তাদেরই। তাদের চোখে, প্রান্তিক পর্যায় থেকে উঠে আসা, মাঠের রাজনীতি করা এই ‘নমশূদ্র’ শিবিরের তরুণেরা বড়জোর রাজপথে স্লোগান দিতে পারে, কিন্তু অক্সফোর্ডের মতো এলিট ডেস্কে বসার যোগ্যতা তাদের নেই। এটি তাদের সেই চিরন্তন সামন্তবাদী মনস্তত্ত্বের বহিঃপ্রকাশ যেখানে মনে করা হয়, কামার-কুমার বা মাঠের মানুষজন জমিদারবাড়ির বারান্দায় এসে বসলে বাড়ির ‘পবিত্রতা’ নষ্ট হয়ে যায়।

যখন তারা দেখে, তাদের তৈরি করা সেই তথাকথিত ‘এলিট ক্লাবের’ দেয়াল ভেঙে এই তরুণেরা সরাসরি বৈশ্বিক দরবারে নিজেদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরছে, তখন তাদের ভেতরকার সেই শ্রেণীগত অহংকারে চরম আঘাত লাগে। এই নব্য-ব্রাহ্মণেরা সহ্যই করতে পারছে না যে, যাদের তারা সবসময় ‘ছোটলোক’ বা ‘গেঁয়ো’ ভেবে অবজ্ঞা করে এসেছে, তারা আজ তাদের কোনো ছাড়পত্র ছাড়াই ইতিহাস গড়ে ফেলছে। তাই এই অন্ধ হিংসা আর আস্ফালন মূলত নিজেদের আধিপত্য হারানোরই এক চরম হাহাকার।

তবে ২০২৪-এর জুলাই আমাদের ইতিহাসের সেই মহত্তম ক্ষণ, যা এই অঞ্চলের চিরন্তন শ্রেণীবিন্যাসকে এক ঝটকায় ওলটপালট করে দিয়েছে। পলাশীর আম্রকাননে মীর জাফর আর জগৎশেঠদের যে কুৎসিত আঁতাত শুরু হয়েছিল, যার উত্তরাধিকার গত আড়াইশ বছর ধরে এই সমাজের ‘ব্রাহ্মণ’ বা ভদ্রলোক শ্রেণী টিকিয়ে রেখেছিল—জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান সেই আধিপত্যের সিংহাসনেই সরাসরি আঘাত হেনেছে।

এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছে তারাই, যারা মনস্তাত্ত্বিকভাবে নবাব সিরাজউদ্দৌলার সত্যিকারের উত্তরসূরী। যারা আপস করেনি, যারা মীরজাফরি চক্রান্তের মুখে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বিজয়ের মূল কারিগর কোনো ড্রয়িংরুমের এলিট বুদ্ধিজীবী ছিলেন না; ছিলেন মফস্বল থেকে আসা আবু সাঈদ, মুগ্ধ কিংবা মাঠের সেই অগণিত ‘নমশূদ্র’ শিবিরের সাধারণ তরুণ-তরুণী। ঢাকার সুশীল সমাজ যখন সুরক্ষিত আবাসে বসে বয়ানের ব্যবচ্ছেদ করছিল, তখন এই প্রান্তিক তরুণেরাই নিজেদের রক্ত দিয়ে স্বাধীনতার এক নতুন সংজ্ঞা লিখেছে। জুলাই আমাদের আগের সমস্ত শ্রেণীবিন্যাস ভেঙে দিয়েছে।

তাহলে এই লড়াইয়ের ভবিষ্যৎ কী?

ভবিষ্যৎ হলো, ক্ষমতার ভরকেন্দ্র এখন চিরতরে বদলে গেছে। ‘নমশূদ্র’ বা প্রান্তিক সমাজ আর কখনো এই নব্য-ব্রাহ্মণদের হাতে নিজেদের ভাগ্যের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেবে না। এতকাল ধরে যে এলিট শ্রেণীটি ভাবত—সমাজ কীভাবে চলবে, কারা কথা বলবে আর কারা চুপ থাকবে তা কেবল তারাই নির্ধারণ করবে, সেই দিনের অবসান ঘটেছে। জুলাইয়ের পর এই নিম্নবর্গীয় সমাজ বুঝতে পেরেছে যে, সংখ্যায় এবং শক্তিতে তারাই আসল রাষ্ট্র।

তবে লড়াইটা এখানেই শেষ নয়, বরং এটি এক দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক যুদ্ধের শুরু মাত্র। এই যে অক্সফোর্ড ইউনিয়ন নিয়ে সুশীলদের বিরক্তি কিংবা তরুণদের প্রতিটি পদক্ষেপকে খাটো করে দেখার অপচেষ্টা এগুলো মূলত পরাজিত ব্রাহ্মণ্যবাদের ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের শেষ কামড়। নানা রকম ছদ্ম-বয়ানের মধ্য দিয়ে তারা ক্ষমতার বলয়টিকে আবার দখল করার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। তরুণদের ভেতর বিভাজন তৈরি করে পুরোনো ‘ভদ্রলোক’ সংস্কৃতির আধিপত্য নতুন করে চাপিয়ে দেওয়ার এই চেষ্টা তারা চালিয়ে যাবে।

তবে আশার কথা হচ্ছে, সিরাজউদ্দৌলার উত্তরসূরীরা এবার আর ১৭৫৭-র মতো অসচেতন নয়। তারা এখন নিজেদের অধিকার ও মেধা সম্পর্কে পুরোপুরি সজাগ। অক্সফোর্ডের মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাসনাত-সাদিকদের কথা বলা কেবল একটি শুরু মাত্র। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ হবে এমন এক সমাজ, যেখানে প্রতিনিধিত্বের জন্য আর কোনো ‘লর্ড’ কিংবা লর্ডদের ‘বাবু’দের সিলমোহর লাগবে না। এই লড়াইয়ের চূড়ান্ত পরিণতি হলো ব্রাহ্মণ্যবাদের সেই মেকি এলিটতন্ত্রের অবসান এবং এ মাটির আসল সন্তানদের হাত ধরে এক খাঁটি, গণমুখী ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশের উত্থান।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles
ভূরাজনীতিসমসাময়িক বিশ্লেষণ

কাঁটাতারের ওপারে ছুঁড়ে ফেলা মানুষ: পুশ-ইন সংকটের ভেতর-বাহির

ভূরাজনীতি•June 19, 2026ভূরাজনীতিসমসাময়িক বিশ্লেষণকাঁটাতারের ওপারে ছুঁড়ে ফেলা মানুষ: পুশ-ইন সংকটের ভেতর-বাহিররাকিবুল হাসান•43...

রাজনৈতিক দর্শনসমসাময়িক বিশ্লেষণ

গোমাতা: বিশ্বাস ও রাজনীতির জটিল সমীকরণ

রাজনৈতিক দর্শন•June 17, 2026রাজনৈতিক দর্শনসমসাময়িক বিশ্লেষণগোমাতা: বিশ্বাস ও রাজনীতির জটিল সমীকরণমোহাম্মদ মোশাররফ...

ভূরাজনীতিসমসাময়িক বিশ্লেষণ

তুরষ্কের প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ ও ভূরাজনীতি

ভূরাজনীতি•June 15, 2026ভূরাজনীতিসমসাময়িক বিশ্লেষণতুরষ্কের প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ ও ভূরাজনীতিদ্য মুসলিম মাইন্ডস এডিটরিয়াল•59...

দর্শনবাঙালি মুসলিমমডার্নিটিসমসাময়িক বিশ্লেষণ

ইটন-এর কৃষক ও বাংলার ইসলামের ভবিষ্যৎ

দর্শন•May 13, 2026দর্শনবাঙালি মুসলিমমডার্নিটিসমসাময়িক বিশ্লেষণইটন-এর কৃষক ও বাংলার ইসলামের ভবিষ্যৎমনোয়ার শামসী সাখাওয়াত•9...