গ্রন্থালোচনা ।। কারাযাভীর 'ফিকহুল জিহাদ'

‘ফিকহুল জিহাদ’ বলতে আমরা আমাদের বড় ভাই, বিশিষ্ট আলিম ড. ইউসুফ আল কারজাভীর (আল্লাহ তাঁকে হিফাজত করুন ও তাঁর দ্বারা উম্মাহর কল্যাণ করুন) বিখ্যাত বইটিকেই বুঝাচ্ছি। ‘ফিকহুল জিহাদ’ বইটি তাঁরই অপর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ফিকহুজ যাকাত’-এর যমজ ভাইয়ের মতো। হিজরি চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতাব্দীর ফকিহদের মাঝে ড. কারজাভীর যে অনন্য ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান রয়েছে, তা এই দুটি গ্রন্থের মাধ্যমেই চিরস্থায়ী রূপ পেয়েছে।
‘ফিকহুল জিহাদ’ বইটি দুটি বিশাল খণ্ডে বিভক্ত। এর পৃষ্ঠা সংখ্যা বারো শ’রও বেশি। শুধু এর শেষে যুক্ত নির্ঘণ্ট বা ইনডেক্সেরই পৃষ্ঠা সংখ্যা প্রায় দুই শ। এই নির্ঘণ্টে কুরআনের আয়াত, হাদিস, সাহাবি-তাবেয়িদের আসার, ফকিহ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের নাম, তথ্যসূত্র এবং সূচিপত্র খুব সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে।
পৃষ্ঠা সংখ্যার বিশালত্বের কারণেই বইটি জিহাদ বিষয়ে লেখা এ যাবৎকালের সবচেয়ে বিস্তারিত গ্রন্থ। বইটির প্রচ্ছদে বইটির যে শিরোনাম ও উপশিরোনাম দেওয়া হয়েছে, তা অক্ষরে অক্ষরে সত্য। সেখানে লেখা আছে—‘ফিকহুল জিহাদ : দিরাসা মুকারিনাহ লি আহকামিহি ওয়া ফালাসাফাতিহি ফি দ্বাওয়িল কুরআন ওয়াস সুন্নাহ’ অর্থাৎ ‘ফিকহুল জিহাদ : কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এর হুকুম-আহকাম ও দর্শনের একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা’।
সত্যি কথা বলতে, আল্লামা কারজাভী জিহাদের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছোট-বড় কোনো বিষয়ই বাদ দেননি। তিনি প্রতিটি বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এবং তার হক আদায় করে ছেড়েছেন। প্রতিটি মাসআলায় তার কাছে যা সঠিক মনে হয়েছে—তা কোনো হুকুম, মতামত, বর্ণনা বা ঐতিহাসিক তথ্য যা-ই হোক না কেন—তা দিয়ে নিজের বক্তব্যকে জোরালোভাবে সমর্থন করেছেন। বইটির আলোচনা এতটাই সমৃদ্ধ যে, এটি পড়ার পর এ বিষয়ে অন্য কোনো বই দেখার প্রয়োজন পড়ে না। আমরা দুআ করি—আল্লাহ তায়ালা এর লেখককে সর্বোত্তম প্রতিদান দিন, যা তিনি দ্বীনের ইলম প্রচার-প্রসার এবং মানুষের কাছে তা সহজে পৌঁছে দেওয়ার কারণে কোনো আলিমকে দিয়ে থাকেন।
তবে আমাদের এই অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত আলোচনা কখনোই মূল বইটি পড়ার বিকল্প হতে পারে না। জিহাদের কোনো মাসআলা গভীরভাবে জানতে হলে অবশ্যই মূল বইটির দ্বারস্থ হতে হবে। কারণ, কোনো বইয়ের আলোচনার উদ্দেশ্যই হলো পাঠককে সেই বইটির পথ দেখানো, তার সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং আলিম ও তালিব-ই ইলমদের জন্য তা থেকে উপকৃত হওয়ার পথ সুগম করা। এর চেয়ে বেশি ফায়দা পেতে হলে অবশ্যই মূল বইটি পড়তে হবে। একজন পাঠক যখন মূল বইটি পড়বেন, তখন তিনি সঠিক বিষয়টি জানতে পেরে আনন্দিত ও উৎফুল্ল হবেন। আর যদি কোথাও লেখকের সাথে তার দ্বিমত হয়, তবে তিনি লেখকের প্রতি সুধারণা রাখবেন, তাঁর অজুহাত বিবেচনা করবেন এবং মন থেকে তাঁর জন্য দুআ করবেন। কারণ, যিনি আপনাকে সত্য পথ দেখিয়ে তা অনুসরণের তাওফিক দেন, তাঁর মর্যাদা কোনো অংশে তাঁর চেয়ে কম নয়, যিনি আপনাকে ভুলের পথ দেখিয়ে তা থেকে বেঁচে থাকার সুযোগ করে দেন।
যেহেতু আল্লামা কারজাভীর এই বইটি এত বিশাল যে, এমন একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনায় তার পুরোটা ফুটিয়ে তোলা অসম্ভব; তাই আমি বইটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় বেছে নিয়েছি। বিশেষ করে যেখানে লেখকের নিজস্ব ইজতিহাদ বা গবেষণা প্রকাশ পেয়েছে, সেগুলোই পাঠকের সামনে তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এর মাধ্যমে লেখকের লেখার পদ্ধতি যেমন স্পষ্ট হবে, তেমনি বইয়ের বাকি বিষয়গুলো সম্পর্কেও একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
কিতাবের ভূমিকা : আলাপের সূচনা
হামদ ও সালামের পর এই গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের ভূমিকাটি শুরু হয়েছে মুসলিম উম্মাহর জন্য জিহাদের গুরুত্ব ও এর তাৎপর্যের বিবরণ দিয়ে। এখানে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, জিহাদ ছাড়া এই উম্মাহর সীমানা, এর অনুসারীদের খুন-জান এবং পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তা রক্ষা করা সম্ভব নয়। ভূমিকায় আরও দেখানো হয়েছে, উম্মাহর কর্মপরিকল্পনা থেকে জিহাদকে বাদ দিলে তা কীভাবে ধ্বংস ডেকে আনে। যেমন হাদিস শরিফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
এই বর্ণনার পাশাপাশি ভূমিকায় একটি বাস্তব সত্যের উপর বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়েছে। তা হলো—
যারা জিহাদের বিধানকে পুনরুজ্জীবিত করতে চান এবং যারা মুজাহিদদের দলে শামিল হতে ডাক দেন, এই ধরনের দাঈদের সামনে এই সত্যটি সবসময় স্পষ্ট থাকা উচিত। জিহাদ যেমন কিয়ামত পর্যন্ত জারি থাকা একটি ফরজ বিধান, তেমনি একে আল্লাহ তায়ালার বেঁধে দেওয়া সীমানার ভেতরেই রাখা এবং এতে কোনো রকম অতিরঞ্জন বা শিথিলতা না করা—এই ফরজেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। যারা তরুণদের হাতে ভুল জায়গায় তরবারি তুলে দেওয়ার অজুহাত তৈরি করে দেয়, তাদের গুনাহ কিন্তু মূল অপরাধীদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়; বরং বেশি। অনেক আগে কবি আবু তায়্যিব মুতানাব্বি বলেছিলেন—
مُضِرٌّ كَوَضْعِ السَّيْفِ فِي مَوْضِعِ النَّدَى
ক্ষমার জায়গায় তরবারি— সর্বনাশের আগুন জ্বলে!
উল্টো কাজে উল্টো ফল, বৃথা যায় সব বাহুবল।
বইটির ভূমিকায় জিহাদ সম্পর্কে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম দল হলো তারা, যারা জিহাদের ওপর মাটি চাপা দিতে চায় এবং উম্মাহর জীবন থেকে একে পুরোপুরি মুছে ফেলতে চায়। দ্বিতীয় দল হলো তারা, যারা গোটা পৃথিবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে বসেছে (!)। যুদ্ধকামী কিংবা সন্ধিকামী—যারাই হোক না কেন, যারা তাদের ওপর চড়াও হয়েছে কিংবা যারা বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে এবং উম্মাহর শত্রুদের সাহায্য করেনি—সবার বিরুদ্ধেই তারা যুদ্ধ করতে চায়। তারা এই দুই পক্ষের মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না। তাদের মতে, দ্বীনের ভিন্নতাই ভিন্নধর্মীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য যথেষ্ট। অমুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করার পেছনে কেবল এই একটি কারণই তাদের কাছে যথেষ্ট মনে হয়।
আর তৃতীয় দলটি হলো মধ্যমপন্থা ও ভারসাম্যের অনুসারী (আহলুল ই’তিদাল ওয়াল ওয়াসাত্বিয়্যাহ)। এই দলের আলিমদের আল্লাহ তায়ালা শরীয়তের ফিকহ (ফিকহুশ শারিঈ) এবং সমকালীন বাস্তবতার সঠিক বোঝাপড়া (ফিকহুল ওয়াকি) দান করেছেন। তারা প্রথম দলের মতো জিহাদকে একেবারে বর্জন করেননি এবং তা বর্জনের ডাকও দেননি। আবার তারা দ্বিতীয় দলের মতো সীমালঙ্ঘন ও চরমপন্থার পথও বেছে নেননি। বরং তারা হিদায়াত ও হকের পথ অনুসরণ করেছেন। তারা প্রতিটি অস্ত্রকে তার সঠিক জায়গায় ব্যবহার করেছেন। শরীয়তের দলিল, এর হুকুম-আহকামের মূল স্পিরিট এবং কুরআনের সুষ্পষ্ট আয়াত ও হাদিসের নির্দেশনা ছাড়া তারা কারো রক্ত বা সম্পদ হালাল মনে করেননি। সমসাময়িক গবেষকদের কাজের মধ্যে এই মধ্যমপন্থার ফিকহ, এর সামগ্রিক রূপরেখা এবং মানুষের ওপর এর প্রভাব নিয়ে লেখা অন্য কোনো বই আমি দেখিনি। এই পদ্ধতির রূপরেখা ও এর কর্মপদ্ধতিগুলো ড. কারজাভীর এই বইটির মতো এত স্পষ্ট করে আর কোথাও ফুটিয়ে তোলা হয়নি। আমি এই সারসংক্ষেপে যত চেষ্টাই করি না কেন, বইটির যে আসল হক, তা পুরোপুরি আদায় করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
ভূমিকাটিতে ‘ফিকহুল জিহাদ’ বইটির গবেষণা পদ্ধতিও স্পষ্ট করা হয়েছে। আসলে এটাই সেই পদ্ধতি, যা আল্লামা কারজাভী তাঁর সমস্ত বইপত্রে নিজের জন্য বেছে নিয়েছেন। এই পদ্ধতির মূল কথা হলো—কোনো রকম টানা-হেঁচড়া বা কৃত্রিমতা ছাড়াই আরবি ভাষারীতির আলোকে কুরআনুল কারিমের আয়াতের ব্যাখ্যার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা। এক্ষেত্রে মুতাশাবিহ আয়াতগুলোকে মুহকাম আয়াতের আলোকে বুঝতে হবে। এই নীতি মেনে চলতে হবে যে, কুরআনের এক অংশ অন্য অংশকে সত্যায়ন করে এবং এক আয়াত অন্য আয়াতের তাফসির করে। সাথে সাথে এই বিশ্বাস রাখতে হবে যে, কুরআনের দুই মলাটের ভেতরের কোনো আয়াতই বাতিল বা মানসুখ (রহিত) হয়ে যায়নি। কারণ, যা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত, তা কোনো সন্দেহের কারণে বাতিল হতে পারে না। ‘ফিকহুল জিহাদ’ বইটিতে এই বিষয়ে একটি বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে, যা আমরা যথাস্থানে তুলে ধরব। কুরআনের পরেই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সহিহ ও সুপ্রমাণিত সুন্নাহর ওপর নির্ভর করা হয়েছে, কারণ সুন্নাহই কুরআনের বাণীকে ব্যাখ্যা করে।
সুন্নাহর ক্ষেত্রে কেবল সেটাই গ্রহণযোগ্য, যার সনদ রাসূলুল্লাহ (সা.) পর্যন্ত সহিহ হিসেবে প্রমাণিত। সনদের দিক থেকে দুর্বল (জয়িফ) হাদিস এখানে গ্রহণযোগ্য নয়, তা কোনো বিখ্যাত আলিম সহিহ বললেও নয়। ড. কারজাভী তাঁর ইলমি গবেষণা পদ্ধতিতে কেবল অনেকগুলো সূত্র বা শাহিদের কারণে কোনো হাদিসকে ঢালাওভাবে শক্তিশালী বলার নীতি গ্রহণ করেন না। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে, যেমন অন্যান্য জাতির ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে? অন্য দেশের সাথে ইসলামের সম্পর্ক কি যুদ্ধের ভিত্তিতে তৈরি হবে নাকি শান্তির ভিত্তিতে? ড. কারজাভীর গবেষণা পদ্ধতিতে ইসলামি ফিকহ-ই হলো একক উৎস, বা তাঁর ভাষায় এটি এক ‘উথাল-পাথাল সমুদ্র’। তিনি কোনো নির্দিষ্ট মাজহাবের প্রতি পক্ষপাতিত্ব না করে বা কোনো নির্দিষ্ট ইমামের গণ্ডিতে আটকে না থেকে এই ফিকহ থেকে মুক্তমনে জ্ঞান আহরণ করেন। তিনি ইসলামি ফিকহের সমস্ত ধারার তুরাস, উৎস এবং কিতাবাদি থেকে উপকৃত হয়েছেন; বিশেষ করে যেসব বইয়ে দলিলের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একারণে তিনি তুলনামূলক ফিকহ (আল ফিকহুল মুকারান)-এর বইগুলোর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
তিনি মাজহাবগুলোর বিখ্যাত উৎসগ্রন্থের পরবর্তী যুগের ব্যাখ্যাকার ও টীকাকারদের (হাশিয়া লেখক) বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। আবার শুধু পূর্ববর্তী যুগের ইমামদের কিতাবের ওপরও নির্ভর করেননি। বরং তিনি এই দুই যুগের আলিমদের জ্ঞানকে সমন্বয় করেছেন এবং উভয় পক্ষ থেকেই উপকৃত হয়েছেন। উস্তায কারজাভী সেই মতটিকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছেন যা বলে—
তাঁর মতে, শরীয়ত আর ফিকহ এক জিনিস নয়। শরীয়ত হলো ওহি, আর ফিকহ হলো সেই ওহির অর্থ ও তা থেকে বিধান আহরণে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টা। তবে ইসলামি ফিকহের পুরো পরিসরের ভেতরেই শরীয়ত বিদ্যমান রয়েছে। প্রকৃত ফিকহ হলো সমকালীন ফকিহদের নিজ জামানা ও স্থানের উপযোগী ইজতিহাদ, যেমনটি পূর্ববর্তী ইমামগণ তাঁদের নিজ নিজ জামানা ও স্থানের উপযোগী ইজতিহাদ করে গিয়েছিলেন।
ওপরের এই নিয়মগুলো যদি আল্লামা কারজাভীর সমস্ত বইয়ের সাধারণ পদ্ধতি হয়ে থাকে—যা ইসলামি জ্ঞানচর্চার জন্য নিঃসন্দেহে সবচেয়ে সঠিক পথ—তবুও এই বইটিতে তিনি বিষয়ের খাতিরে আরও কিছু নতুন দিক যুক্ত করেছেন। যেমন ইসলামের সাথে অন্যান্য ধর্ম ও আইনের তুলনা করা এবং ইসলামি ফিকহের সাথে সমকালীন বিশ্ব বাস্তবতার যোগসূত্র তৈরি করা। প্রকৃত ফকিহ তিনিই, যিনি বাস্তবতার সাথে শরীয়তের বিধানের সমন্বয় ঘটান। তিনি অতীত নিয়ে পড়ে থেকে বর্তমানের করণীয়কে ভুলে যান না। তিনি সাওয়াবিত (অপরিবর্তনশীল) এবং মুতাগায়্যিরাত (পরিবর্তনশীল) বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য করতে পারেন।
এই সঠিক ইলমি মানহাজ বা গবেষণা পদ্ধতি অনুসরণের ফলাফল জানাতে গিয়ে উস্তায কারজাভী বলেন—
আসল কথা হলো—আমাদের প্রথম এবং সবচেয়ে বড় সমস্যাটি তৈরি হয়েছে আমাদেরই কিছু অতি-কঠোর ও চরমপন্থী ভাইদের কারণে। তারা নিজেদের সব জানালা বন্ধ করে রেখেছেন। তারা কেবল একটিমাত্র দৃষ্টিভঙ্গির ওপর জেদ ধরে বসে আছেন। তারা অন্য কোনো দিকে তাকাতেই চান না। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া নিজেদের চিন্তাভাবনাগুলোকে তারা কখনো পরীক্ষা করে দেখার সামান্য চেষ্টাও করেননি। কেউ যদি তাদের সেই অনড় অবস্থান থেকে একটু নড়াতে চায়, তবে তারা তার ইলম ও ফিকহের কথা তো বাদই দিলাম, সরাসরি তার দ্বীন ও ঈমান নিয়েই প্রশ্ন তোলেন। তাদের মূল রোগ হলো—তারা বর্তমানে নয়, বাস করেন অতীতে; তারা বাস্তবতায় নয়, বেঁচে আছেন কেবল কিতাবের পাতায়।
এরপর ভূমিকাটি ড. কারজাভীর সেই মানহাজের দিকে মোড় নিয়েছে, যা তিনি তাঁর সমস্ত ইলমি, দাওয়াতি, ইসলাহি ও পুনর্জাগরণধর্মী কাজে আপন করে নিয়েছেন। আমরা তাঁর ‘ওয়াসাতিয়্যাহ’ বা মধ্যমপন্থার মানহাজের কথাই বলছি। আল্লামা কারজাভীর ভাষায়—
ড. কারজাভী একটি দীর্ঘ অনুচ্ছেদে এই ওয়াসাতিয়্যাহ মানহাজের বৈশিষ্ট্যগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরেছেন। এই ওয়াসাতিয়্যাহর সুন্দর ব্যাখ্যা, এর দিকে আহ্বান এবং এর ওপর শক্তভাবে টিকে থাকার কারণেই তাঁকে ‘ইমামুল ওয়াসাতিয়্যাহ’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। এই উপাধিটি যে তাঁর একেবারে যোগ্য প্রাপ্য, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে তাঁর এই মানহাজ নিয়ে বিস্তারিত বা সংক্ষেপে আলোচনা করার সুযোগ নেই। তাই আমরা পাঠকদের আল্লামা কারজাভীর অন্যান্য বই পড়ার অনুরোধ করব, বিশেষ করে তাঁর লেখা ‘মাআলিমুল ওয়াসাতিয়্যাহ আল ইসলামিয়্যাহ’ বইটি এ বিষয়ে অন্যতম।[৫]
ভূমিকা শেষ করার আগে উস্তায কারজাভী এমন দশটি শ্রেণির কথা উল্লেখ করেছেন, যাদের জন্য এই বইটি পড়া এবং এ থেকে ফায়দা নেওয়া খুবই জরুরি। এই দশ শ্রেণি হলো—
১. আলিম ও ফকিহগণ : কারণ পূর্ববর্তী ফকিহদের লেখার অনেক কিছুই ছিল তাঁদের নিজস্ব সময় ও পরিবেশের আলোকে। সেগুলোর পেছনে অনেক সময় কুরআন বা সহিহ হাদিসের কোনো স্পষ্ট দলিল ছিল না। সমকালীন কোনো ফকিহর জন্য সেই যুগের ও পরিবেশের রায় মেনে চলা আবশ্যক নয়। সমকালীন ফকিহদের জন্য আবশ্যক হলো কুরআন ও সুন্নাহর মুহকাম (সুস্পষ্ট) বিধানগুলো মেনে চলা। সেই সাথে উম্মাহর সুনিশ্চিত ‘ইজমা’ বা ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত মেনে চলা। তবে শর্ত হলো, সেই ইজমা যেন সাময়িক কোনো কল্যাণের ওপর ভিত্তি করে না হয়, যা পরিবেশ পরিবর্তনের সাথে সাথে বদলে যায়।
২. আইনবিদ ও গবেষকগণ : তাঁদের অনেকেই ইসলাম ও শরীয়ত সম্পর্কে ধারণা নিয়েছেন বাজারে প্রচলিত সাধারণ বইপত্র এবং মানুষের মুখে মুখে ফেরা কথাবার্তা থেকে। এই বইটি তাঁদের সামনে জিহাদের বিষয়ে ইসলামের আসল সত্যটিকে একদম পরিষ্কারভাবে তুলে ধরবে। এখানে প্রতিটি বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহর দলিল দেওয়া হয়েছে। এর ভিত্তি এমন এক ইজতিহাদের ওপর, যা দ্বীনের মূল উৎসের সাথে গভীরভাবে যুক্ত এবং পাশাপাশি যা আধুনিক বিশ্বের নানা মাত্রিক বাস্তবতাকে পুরোপুরি বিবেচনায় রাখে।
৩. ইসলামপন্থীগণ : আল্লামা কারজাভী এখানে মূলত বিভিন্ন ইসলামি দল ও সংগঠনকে বুঝিয়েছেন, যারা ইসলামের পক্ষে কাজ করছে। পৃথিবীর নানা প্রান্তে, মুসলিম কিংবা অমুসলিম দেশে, যেসব তরুণ ইসলামি পুনর্জাগরণ আন্দোলনের পতাকাতলে জড়ো হয়েছে, তারা এর অন্তর্ভুক্ত। এই দলগুলোর মধ্যে যাদের এই বইটি সবচেয়ে বেশি পড়া এবং চর্চা করা দরকার, তারা হলো ইসলামের নামে সহিংসতায় জড়িয়ে পড়া দলগুলো। এই বইয়ে এমন গাইডলাইন আছে যা তাদের হকের পথ দেখাবে। এটি তাদের এমন সহজ ও সরল পথের সন্ধান দেবে, যেখানে কোনো বক্রতা বা জটিলতা নেই। বরং এটি এক উদার ও শাশ্বত পথ, যা হিকমত, উত্তম উপদেশ ও সুন্দর বিতর্কের মাধ্যমে সবাইকে আল্লাহর দিকে ডাকে। এরপর যদি বোঝানো অসম্ভব হয়ে পড়ে, তবেই কেবল বিচ্ছিন্ন হওয়ার পথ আসে। যেমন কুরআনে বলা হয়েছে—
৪. ইতিহাসবিদগণ : বিশেষ করে যারা সিরাতুন্নবী এবং ইসলামি ইতিহাস নিয়ে কাজ করেন। এদের মাঝে একটি কথা বেশ ছড়িয়ে পড়েছে যে, ইসলাম নাকি কেবল তরবারি আর শক্তির জোরে পৃথিবীতে ছড়িয়েছে; দাওয়াত, যুক্তি বা মুসলমানদের আখলাকের মাধ্যমে ছড়ায়নি। এই বইটি তাদের সেই ভুল ভাঙবে।
৫. চিন্তক ও বুদ্ধিজীবীগণ : যারা ইসলামি চিন্তাধারা এবং এর থেকে তৈরি হওয়া বিভিন্ন আন্দোলন নিয়ে ভাবেন। তারা এই ‘ফিকহুল জিহাদ’ বইটিতে প্রতিটি চিন্তার মূল শিকড় ও উৎসের সন্ধান পাবেন। বইটি প্রমাণ করবে যে, ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদ থেকে কত দূরে! এটি আরও স্পষ্ট করবে যে, মুসলমানদের মধ্যে সহিংসতায় বিশ্বাসীরা একেবারে সংখ্যালঘু। সাধারণ মুসলমান এবং বিশেষ করে ‘আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত’-এর বিশাল জনগোষ্ঠী এদের পথকে ভুল মনে করে ও তাদের প্রত্যাখ্যান করে।
৬. প্রাচ্যবিদ বা ওরিয়েন্টালিস্টগণ : যারা ইসলামি খবরাখবর ও গবেষণা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। তাদের অনেকেই ইসলামকে পৃথিবীর শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য একটা হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছেন। তারা প্রচার করেছেন যে, জিহাদের ‘ফরজ’ বিধানের কারণে মুসলমানরা নাকি গোটা দুনিয়ার সাথে যুদ্ধ করতে বাধ্য। ‘ফিকহুল জিহাদ’ বইটি এই ধারণার অসারতা প্রমাণ করেছে। এটি দেখিয়েছে যে, ইসলাম আসলে শান্তির ধর্ম এবং এটি সর্বদা শান্তির দিকেই আহ্বান জানায়।
৭. আন্তঃধর্ম ও আন্তঃসভ্যতা সংলাপের সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গ : ‘ফিকহুল জিহাদ’ বইটি এই সংলাপের দেয়ালে একটি মজবুত ইট হিসেবে কাজ করবে। যারা না জেনে ইসলামের ওপর নানা মিথ্যা অপবাদ দেয়, তারা এই বইয়ের মাধ্যমে ইসলামকে একটি নতুন আলোয় দেখার সুযোগ পাবেন। এর ফলে ইসলাম, মুসলিম উম্মাহ এবং এর সভ্যতা সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যাবে।
৮. রাজনীতিক ও নীতিনির্ধারকগণ : এই রাজনীতিক ও নীতিনির্ধারকগণ এমন এক ধর্ম সম্পর্কে নিজেদের ভুল ধারণার ওপর ভিত্তি করে পৃথিবীর ভাগ্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন, যে ধর্মটিকে তারা ভালো করে চেনেনই না। তারা ইসলামের কিতাব পড়েননি, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনী দেখেননি এবং মুসলিম উম্মাহর বৈচিত্র্যময় বাস্তবতা ও তাদের সংস্কৃতির ভিন্নতা সম্পর্কে কোনো ধারণাই রাখেন না।
৯. সামরিক বাহিনীর সদস্যগণ : মুসলিম ও অমুসলিম সামরিক কর্মকর্তাদের জন্য বইটি সমান দরকারী। এর মাধ্যমে তারা ইসলামি জিহাদ, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর গাজওয়া এবং ইসলামের প্রথম জামানায় সাহাবি ও মুসলমানদের বিজয়াভিযান সম্পর্কে একটি সঠিক ও পরিষ্কার ধারণা পাবেন।
১০. সাধারণ ও সচেতন পাঠক সমাজ : সর্বশেষে আল্লামা কারজাভী বলেছেন যে, এই বইটি সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে শিক্ষিত সমাজের একটি বড় সাংস্কৃতিক শূন্যতা পূরণ করবে—তারা মুসলিম হোক বা অমুসলিম। দুনিয়ার প্রতি ইসলামের আসল দৃষ্টিভঙ্গি কী, আল্লাহর পথে জিহাদের প্রকৃত রূপ, এর নিয়মকানুন ও আদব কেমন—তা জানার প্রয়োজন সবারই আছে। একজন মুসলমানের জন্য এটি জানা ফরজ, কারণ এটি তার দ্বীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যা মেনে চলা তার দায়িত্ব। আর একজন অমুসলিমের জন্য এটি জানা দরকার এই কারণে, যেন সে ইসলাম ও মুসলমানদের সাথে সঠিক জানা-শোনার ভিত্তিতে লেনদেন করতে পারে। সে যেন ইসলাম ও শরীয়ত সম্পর্কে কোনো ভুল ধারণা হৃদয়ে পুষে না রাখে। ভুল ধারণা রাখলে সে যেমন ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি জুলুম করবে, তেমনি নিজের প্রতিও বড় অন্যায় করবে।
সত্যি কথা বলতে, ‘ফিকহুল জিহাদ’ বইটি এই সবকটি শ্রেণির বর্তমান সময়ের একটি বড় চাহিদা পূরণ করেছে। এমনকি ড. কারজাভী যাদের নাম উল্লেখ করেননি, এমন আরও অনেকের উপকারে আসবে এই কিতাব। এটি মূলত একটি বিশ্বকোষ—এনসাইক্লোপিডিয়া। কোনো গবেষকের যদি কেবল একটি বা কয়েকটি নির্দিষ্ট মাসআলা জানার দরকার হয়, সে-ও এই বইয়ে তার কাঙ্ক্ষিত সমাধান পেয়ে যাবে। আবার একজন তালিব-ই ইলম যখন এটি পড়বে, তখন সে এর ফিকহ ও হাদিসভিত্তিক চমৎকার আলোচনা এবং সমকালীন বাস্তবতার নিখুঁত বিশ্লেষণ থেকে নিজের জ্ঞান ও কর্মের জন্য দারুণভাবে উপকৃত হতে পারবে। ইসলামের নামে যেসব সহিংসতা চালানো হয়, সেগুলোর কোনটি সঠিক আর কোনটি ভুল—বইটি পাঠককে তা স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেয়। ফলে দেশি-বিদেশি মিডিয়াগুলো এসব সহিংস কর্মকাণ্ড নিয়ে যে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালায়, তা পড়ে সাধারণ মানুষের মনে যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়, এই বইটি তা একেবারে দূর করে দেয়।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, ‘ফিকহুল জিহাদ’ বইটি সেসব লোকের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী দলিল, যারা ইসলামের ওপর এমন সব মিথ্যা অপবাদ দেয় যার সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্কই নেই। তারা মুমিনদের এমন সব বিশেষণে ডাকে, যা এই দ্বীনের আখলাক বা শিক্ষার ধারেকাছেও নেই। আল্লাহ তায়ালা আল্লামা কারজাভীকে উত্তম প্রতিদান দিন। তিনি এই বইটির পেছনে নিজের প্রচুর সময় ও শ্রম ঢেলে দিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি আলিমদের ওপর আল্লাহর অর্পিত দ্বীন স্পষ্ট করার সেই ফরজ দায়িত্বেরই একাংশ আদায় করেছেন। যেমন আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেছেন—
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেছেন—
জিহাদ কি ফরজ নাকি নফল?
আল্লামা কারজাভী জিহাদের বিধানকে ইসলামি দাওয়াতের মূল উদ্দেশ্যের সাথে যুক্ত করেছেন। ইসলামের মূল লক্ষ্যই হলো হকের আসনকে উচ্চে তুলে ধরা এবং বাতিল ও বাতিলপন্থীদের বিনাশ করা। একারণে ইসলাম কেবল সুপরিচিত ও সুনির্দিষ্ট কিছু ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং ইসলাম—
মহান রাব্বুল আলামিন মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলেছেন—
ড. কারজাভী ইসলামে জিহাদের এই সুউচ্চ মর্যাদার পেছনের কারণটি স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেন—
ড. কারজাভীর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জিহাদ মূলত উম্মাহ ও রাষ্ট্রীয় ফিকহের অংশ। অর্থাৎ এটি মুসলিম জামায়াত বা রাষ্ট্রের কাজ, কোনো একক ব্যক্তির খেয়ালখুশির বিষয় নয়। কারণ জিহাদের মূল কাজই হলো উম্মাহর বাহ্যিক ও আত্মিক অস্তিত্ব রক্ষা করা। এটি পুরো উম্মাহর দায়িত্ব। এই দায়িত্ব একক ব্যক্তির ওপর ততক্ষণ পর্যন্ত বর্তায় না, যতক্ষণ না উম্মাহর অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়, শত্রু মুসলমানদের ঘরে ঢুকে পড়ে এবং দেশ রক্ষা করার মতো অন্য আর কেউ না থাকে। কেবল এমন চরম পরিস্থিতিতেই শত্রুর মোকাবিলা করতে এবং নিজেদের ভূমি আজাদ করতে ব্যক্তি পর্যায়ে নিজেদের সংগঠিত করা ফরজ হয়ে দাঁড়ায়। আর শরীয়তের একটি উসুলই আছে—“যে মাধ্যম ছাড়া কোনো ওয়াজিব কাজ সম্পন্ন হয় না, সেই মাধ্যমটি গ্রহণ করাও ওয়াজিব।”[১১]
জিহাদ মুসলিম জামায়াত, উম্মাহ ও রাষ্ট্রের সামষ্টিক বিষয় হওয়ার অর্থ এই নয় যে, এটি ইবাদতের গণ্ডি থেকে আলাদা। বরং—
জিহাদ : ফরজে আইন নাকি ফরজে কিফায়া?
ড. কারজাভী অত্যন্ত নিখুঁত ও সংক্ষেপে সাহাবি এবং তাঁদের পরবর্তী যুগের আলিমদের মতামত তুলে ধরেছেন। সেখানে জিহাদ ফরজ নাকি নফল—এই মাসআলাটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। আর জিহাদ যদি ফরজই হয়, তবে তা কি ফরজে আইন (প্রত্যেকের জন্য বাধ্যতামূলক) নাকি ফরজে কিফায়া (সামষ্টিক দায়িত্ব)?
সবগুলো মত পর্যালোচনার পর তিনি এমন একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, যা আমার জানা মতে তাঁর আগে অন্য কেউ এভাবে দেখাতে পারেননি। সাহাবি আব্দুল্লাহ বিন উমর (রা.)-এর একটি মত আছে যে, জিহাদ হলো ফরজে কিফায়া। ড. কারজাভী (আল্লাহ তাঁকে হিফাজত করুন) এই মতটিকে জোরালোভাবে সমর্থন করেছেন। তিনি বলেন—
বিভিন্ন মাজহাবের ইমামদের মতামত পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনার পর আল্লামা কারজাভী এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, অমুসলিমদের ব্যাপারে ইসলামের সাধারণ নীতি হলো—যারা মুসলমানদের শান্তিতে থাকতে দেয় এবং তাদের কোনো ক্ষতি করে না, মুসলমানরাও তাদের শান্তিতে থাকতে দেবে। যারা মুসলমানদের সাথে চুক্তি ও সন্ধিতে বসবাস করতে চায়, মুসলমানরাও তাদের সাথে সন্ধির সম্পর্ক বজায় রাখবে। তিনি আরও স্পষ্ট করেছেন যে, ‘জিহাদ তলাবি’ বা আগ বাড়িয়ে আক্রমণাত্মক যুদ্ধ করা উম্মাহর ওপর ফরজ কি না—এ নিয়ে কোনো ইজমা নেই। বছরে অন্তত একবার যুদ্ধ করা ফরজ কি না, কিংবা এটি ফরজে কিফায়া কি না—এ নিয়েও আলিমদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। তবে যে বিষয়ে উম্মাহর সব আলিমের ইজমা হয়েছে, তা হলো—শত্রু যদি কোনো মুসলিম দেশে আক্রমণ করে বা সেখানে ঢুকে পড়ে, তবে তাকে পরাজিত না করা পর্যন্ত যুদ্ধ করা ফরজে আইন। একইসাথে শত্রুর আক্রমণ বা আগ্রাসন ঠেকাতে মুসলমানদেরকে আগে থেকেই প্রতিরোধমূলক প্রতিরক্ষা শক্তি তৈরি করে রাখা ফরজ। যেমন আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে নির্দেশ দিয়েছেন—
নিঃসন্দেহে বলা যায়, ফিকহি দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে দলিলের চুলচেরা বিশ্লেষণ করার পর এটাই সবচেয়ে সঠিক ও অকাট্য সিদ্ধান্ত।[১৫]
জিহাদ ফরজ হওয়ার বিষয়ে আল্লামা কারজাভীর ফিকহি পর্যালোচনার সারকথা হলো, জমহুর বা অধিকাংশ আলিম—
অন্যদিকে, জিহাদের ক্ষেত্রে ফরজে কিফায়া আদায়ের আসল রূপটি কেমন হবে—তাও তিনি স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেন—
জিহাদ কখন ফরজে আইন হয়?
ফরজে আইন হলো এমন বিধান যা প্রত্যেক মুসলমানের ওপর আলাদাভাবে অর্পিত হয়। পরকালে এর জন্য প্রত্যেকে আল্লাহর দরবারে এককভাবে জবাবদিহি করবে। যেমন কুরআনে এসেছে—
একইভাবে, এই দায়িত্ব পালন না করলে যদি জাতীয় বা সামষ্টিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে পুরো উম্মাহর সামনেও তাকে অপরাধী হতে হবে। এমনকি তার অবহেলার কারণে যদি কারো ব্যক্তিগত ক্ষতি হয়, তবে দুনিয়ার আদালতেও তাকে জবাবদিহি করতে হবে। এর উদাহরণ হলো—সামর্থ্য থাকার পরও পরিবারের খোরপোষ না দেওয়া, কিংবা আমানত রক্ষায় উদাসীনতা ও অবহেলার কারণে অন্যের সম্পদ নষ্ট হওয়া।
মূলগতভাবে জিহাদ ফরজে কিফায়া হলেও বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে তা ফরজে আইনে পরিণত হয়। ড. কারজাভী এমন চারটি অবস্থার কথা উল্লেখ করেছেন—
দ্বিতীয় অবস্থা : যখন রাষ্ট্রপ্রধান বা ইমাম[১৯] নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা দলকে যুদ্ধের জন্য ডাক দেবেন। ইমামের নির্দেশের পর তাদের ওপর জিহাদ ফরজে আইন হয়ে যায়। কোনো যৌক্তিক ও জোরালো ওজর ছাড়া তখন ঘরে বসে থাকা হারাম। এই হুকুমের ভিত্তি হলো—উলিল আমরের আদেশ মেনে চলার সাধারণ শরীয়তি হুকুম। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন—
জিহাদের ডাক দেওয়ার জন্য শাসকের ব্যক্তিগত আমল বা ‘আদালত’ (শরীয়তসম্মত ন্যায়পরায়ণতা) শর্ত নয়। শাসক ব্যক্তিগতভাবে জালিম বা পাপিষ্ঠ হলেও দেশের সুরক্ষায় তার ডাকে সাড়া দিয়ে যুদ্ধে যাওয়া ফরজ। কারণ এখানে মূল উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তির আনুগত্য নয়, বরং স্বয়ং ইসলাম ও মুসলিম ভূখণ্ডের হিফাজত করা।[৮]
তৃতীয় অবস্থা : যখন মুসলিম সেনাবাহিনীর কোনো নির্দিষ্ট কাজের জন্য কোনো বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তির প্রয়োজন দেখা দেয়। অথচ সেনাবাহিনীতে ঐ কাজের জন্য পর্যাপ্ত বা বিকল্প কোনো জনবল নেই। এমন পরিস্থিতিতে ঐ দক্ষ ব্যক্তির ওপর ফরজ হয়ে যায় নিজেকে সেনাবাহিনীর কাছে সঁপে দেওয়া। কেউ তাকে ডাকুক বা না ডাকুক, সে নিজে থেকেই গিয়ে সেনাপতির অধীনে নিজের দক্ষতা ও মেধা বিলিয়ে দেবে। এই ব্যক্তিগত ফরজের ভিত্তি হলো কুরআনের সেই আয়াত ও হাদিসগুলো, যেখানে সৎ ও তাকওয়ার কাজে পরস্পরকে সাহায্য করার এবং এক মুসলমানের বিপদে অন্য মুসলমানের এগিয়ে আসার জোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।[২০]
চতুর্থ অবস্থা : যখন কোনো ব্যক্তি সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত থাকে এবং বাহিনীর সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বা শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার পর, তার জন্য ময়দান ছেড়ে পালিয়ে আসা কোনোভাবেই জায়েজ নয়। সে যে যুদ্ধের জন্য ঘর থেকে বের হয়েছিল, তা শুরুতে ফরজে কিফায়া থাকলেও এখন তার জন্য ময়দানে অটল ও অবিচল থাকা ফরজে আইন। এই অবস্থায় যুদ্ধক্ষেত্রে অবিচল থাকা ফরজ হওয়ার কারণ হলো—কেউ ময়দান ছেড়ে পালালে পুরো বাহিনীর মনোবল ভেঙে যায়। মুসলমানদের কাতার দুর্বল হয়ে পড়ে, সৈন্যদের ভেতর ভীরুতা ভর করে এবং প্রতিপক্ষ সাহসী হয়ে ওঠে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ময়দানে টিকে থাকার এই ফরজ বিধানটি পবিত্র কুরআনের বেশ কিছু আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলছেন—
وَمَن يُوَلِّهِمْ يَوْمَئِذٍ دُبُرَهُۥٓ إِلَّا مُتَحَرِّفًا لِّقِتَالٍ أَوْ مُتَحَيِّزًا إِلَىٰ فِئَةٍ فَقَدْ بَآءَ بِغَضَبٍ مِّنَ اللّٰهِ وَمَأْوَىٰهُ جَهَنَّمُ ۖ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ ﴿١٦﴾
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেছেন—
وَأَطِيعُوا اللّٰهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا ۚ إِنَّ اللّٰهَ مَعَ الصَّابِرِينَ ﴿٤٦﴾
একইভাবে, হাদিস শরিফেও যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যেতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। বুখারি ও মুসলিমের একটি সুপরিচিত হাদিসে একে ‘সাতটি ধ্বংসাত্মক মহাপাপ’-এর (আস সাবউল মুবিকাত) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একারণেই উম্মাহর সব আলিম একমত হয়েছেন যে, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করা একটি কবিরা গুনাহ।[২২]
জিহাদ ফরজে কিফায়া থেকে ফরজে আইনে পরিণত হওয়ার এই যে রূপরেখা, তা এ যাবৎকালের সবচেয়ে বিস্তারিত আলোচনা। এখানে উল্লেখ করা তৃতীয় ও চতুর্থ অবস্থা দুটি মূলত আল্লামা কারজাভীর নিজস্ব ইজতিহাদ ও গবেষণার ফসল। তিনি কুরআন ও সুন্নাহর নসগুলোকে বর্তমানের আলোকে গভীর ও সূক্ষ্ম পর্যালোচনার মাধ্যমেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।[২৩] ড. কারজাভী তাঁর সমস্ত ফিকহি গবেষণায় এই চমৎকার পদ্ধতিটিই অনুসরণ করেছেন। তিনি প্রথমে কুরআন ও সুন্নাহর মূল দলিলের দিকে তাকান। দলিল তাকে যে সত্যের পথ দেখায়, তিনি সাহসের সাথে সেটাই ব্যক্ত করেন—তাতে আগে কেউ সেই কথা বলুক বা না বলুক। আর দলিল যে বিষয়টিকে প্রত্যাখ্যান করে বা যার দুর্বলতা প্রমাণ করে, তিনি তা অবলীলায় বর্জন করেন; এমনকি এর জন্য যদি পূর্ববর্তী বড় বড় কোনো আলিমের মতের বিরোধিতাও করতে হয়, তিনি তাতে পিছপা হন না।
ফিকহের ময়দানে এমন নিরপেক্ষ ও সঠিক পথে চলা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। কেবল তিনিই এটা পারেন, যিনি নিজেকে এই উচ্চতায় তৈরি করেছেন এবং যাঁর উস্তায ও শিক্ষকগণ তাঁকে ইজতিহাদের এই যোগ্য স্তরে পৌঁছানোর জন্য উপযুক্ত ইলমি তরিবিয়ত দিয়েছেন। ইমাম শাফেয়ি (রহ.) তাঁর বিখ্যাত ‘আর রিসালাহ’ কিতাবে এই বিষয়টি খুব চমৎকারভাবে স্পষ্ট করেছেন। শরীয়তের হুকুম-আহকাম আহরণে ইজতিহাদের পথে হাঁটতে হলে একজন মানুষের কী কী বিষয়ে গভীর জ্ঞান থাকতে হবে, তার বিস্তারিত বিবরণ তিনি সেখানে দিয়েছেন।[২৪]
যুগের পর যুগ ধরে এই সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ ইলমি ধারার টিকে থাকাই প্রমাণ করে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সেই হাদিসের সত্যতা, যা উম্মাহর মাঝে মশহুর—
জিহাদ তলাবি ও জিহাদ দিফায়ির তফাত
ইসলামি ফিকহে জিহাদের প্রকৃত রূপ নিয়ে প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত দুটি প্রধান চিন্তাধারা চলে আসছে।
প্রথম মতটি হলো : জিহাদের মূল লক্ষ্যই হলো সেইসব অমুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা যারা ইসলাম গ্রহণ করেনি, যতক্ষণ না তারা ইসলাম কবুল করে অথবা নতজানু হয়ে ‘জিজিয়া’ দেয়। এই মতের প্রাচীন ও আধুনিক অনুসারীদের কাছে আক্রমণকারী কাফির আর শান্তিকামী কাফিরের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তাদের দৃষ্টিতে কুফর সবার জন্য সমান অপরাধ। আর এই কুফরের কারণেই মুসলমানদের ওপর তাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদ করা ফরজ হয়ে যায়।
দ্বিতীয় মতটি হলো : মুসলমানদের ওপর কেবল তাদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করা ফরজ, যারা তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে, তাদের জান-মাল ও ভূমির ওপর চড়াও হয় এবং অন্যায়-নির্যাতন চালিয়ে মুসলমানদের দ্বীন থেকে ফিরিয়ে রাখার চেষ্টা (ফিতনা) করে।
এই দুই মতের মূল পার্থক্যটি একটি সহজ প্রশ্নের মাধ্যমে বোঝা যায়। তা হলো : মুসলমানরা কাফিরদের সাথে কেন যুদ্ধ করবে? কেবল তাদের কুফরের কারণে? নাকি মুসলমানদের ওপর তাদের অন্যায় ও আগ্রাসনের কারণে?
আল্লামা কারজাভী এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আলোচনার জন্য ‘ফিকহুল জিহাদ’ বইয়ের তৃতীয় অধ্যায়টি বেছে নিয়েছেন। এটি বইটির সবচেয়ে দীর্ঘ ও তথ্যবহুল অধ্যায়, যা কুরআন, হাদিস ও ফিকহের দলিলে সমৃদ্ধ। আলোচনার শুরুতে তিনি ‘জিহাদ দিফায়ি’ এবং ‘জিহাদ তলাবি’ এই পরিভাষা দুটি পরিষ্কার করেছেন। ‘জিহাদ দিফায়ি’ হলো প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ। অর্থাৎ মুসলমানদের জান, মাল ও ভূমি রক্ষায় শত্রুর আগ্রাসন প্রতিহত করা। আর ‘জিহাদ তলাবি’ হলো আক্রমণাত্মক যুদ্ধ। অর্থাৎ ভবিষ্যতে কোনো বড় বিপদ এড়াতে, উম্মাহকে শত্রুর অনিষ্ট থেকে নিরাপদ রাখতে, শত্রুর অতর্কিত আক্রমণ থেকে বাঁচতে আগেভাগেই তাদের দেশে গিয়ে আঘাত হানা, ইসলাম প্রচারের, ইলাহি বাণী পৌঁছানোর পথের বাধাগুলো দূর করা, কিংবা কেবল ইসলামি রাষ্ট্রের অধীনে তাদের নিয়ে আসার জন্য যুদ্ধ করা।[২৬]
এরপর ড. কারজাভী ‘জিহাদ তলাবি’-এর শরীয়তসম্মত রূপগুলো স্পষ্ট করেছেন, যা নিয়ে আলিমদের মাঝে কোনো দ্বিমত নেই। এর মাধ্যমে তিনি সেইসব ‘আক্রমণাত্মক’ চিন্তার ধারকদের জবাব দিয়েছেন, যারা অভিযোগ করে যে—দ্বিতীয় মতের আলিমগণ নাকি কোনো অবস্থাতেই ‘জিহাদ তলাবি’ বা আগ বাড়িয়ে যুদ্ধ করা স্বীকার করেন না। তিনি দেখিয়েছেন যে, তিনটি বিশেষ পরিস্থিতিতে ‘জিহাদ তলাবি’ বা শত্রুর ভূমিতে গিয়ে যুদ্ধ করার ব্যাপারে কোনো মতভেদ নেই—
১. ইসলাম প্রচারের স্বাধীনতা রক্ষা করা এবং দ্বীনের পথে ফিতনা বা বাধা দূর করা।
২. ইসলামি রাষ্ট্র ও তার সীমানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
৩. জালিম শাসকদের হাতে নির্যাতিত ও বন্দী মুসলমানদের উদ্ধার করা কিংবা অমুসলিম দেশে বন্দি মুসলিম সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়ানো।
এর বাইরে ‘জিহাদ তলাবি’-এর চতুর্থ আরেকটি রূপ ছিল। তা ছিলো আরবের জমিন থেকে উদ্ধত ও অহংকারী ‘মুশরিক যুদ্ধপ্রিয়দের’ চিরতরে উচ্ছেদ করা। এই বিশেষ ক্ষেত্রে যুদ্ধ করার সবকটি শরীয়তি কারণ বিদ্যমান ছিল। তবে বর্তমান যুগে এই রূপটি কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ, বাস্তবে এর আর কোনো অস্তিত্ব নেই।[২৭]
ড. কারজাভী পবিত্র কুরআনের চৌদ্দটি স্পষ্ট আয়াত উপস্থাপন করেছেন যা প্রমাণ করে যে, ইসলাম শান্তিকামীদের সাথে শান্তি বজায় রাখে। ইসলাম কেবল তাদের সাথেই যুদ্ধ করার নির্দেশ দেয় যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে, আল্লাহর দ্বীনের পথে বাধা দেয় এবং মুমিনদের দ্বীন থেকে ফিরিয়ে রাখার জন্য নির্যাতন চালায়। অন্যদিকে, যারা কোনো কারণ ছাড়াই কেবল কুফরের কারণে যুদ্ধের ফতোয়া দেন, তাদের কাছে ‘আয়াতুস সাইফ’ বা তরবারির আয়াতের দাবি ছাড়া আর কোনো জোরালো দলিল নেই। তাদের দাবি হলো, জিহাদের এই আয়াতগুলো যা শান্তিকামীদের সাথে শান্তি বজায় রাখতে বলে—তা নাকি তরবারির আয়াত দ্বারা মানসুখ বা রহিত হয়ে গেছে।[২৮]
এই গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের মূল নির্যাস পাঠক সমীপে তুলে ধরার স্বার্থে আমরা এখন এই অধ্যায়ের দুটি প্রধান কুরআনি আয়াত এবং দুটি হাদিস নিয়ে আল্লামা কারজাভীর চূড়ান্ত ইজতিহাদ আলোচনা করব। এর মাধ্যমে জিহাদ সম্পর্কে ইসলামের আসল অবস্থানটি একেবারে স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
‘আর তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো, যতক্ষণ না ফিতনা দূর হয়’ শীর্ষক আয়াত
এটি সূরা বাকারার ১৯৩ নম্বর আয়াতের প্রথমাংশ। আয়াতের পুরো অংশটি হলো—
ঠিক একইভাবে সূরা আনফালের ৩৯ নম্বর আয়াতেও ইরশাদ হয়েছে—
এখানে ‘ফিতনা’ শব্দের সঠিক ও আসল অর্থ হলো— আল্লাহর পথ ও মসজিদে হারামে যেতে বাধা দেওয়া, মক্কার মুসলমানদের নিজ ঘরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া এবং নির্যাতন ও কষ্টের মাধ্যমে তাদের দ্বীন ত্যাগ করতে বাধ্য করা।
ইসলাম প্রচারের সূচনা লগ্নে ঠিক এই ঘটনাটিই ঘটেছিল। মদিনার আনসারগণ যখন আকাবার বাইয়াতের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাতে হাত রাখলেন, তখন মক্কার কুরাইশরা মক্কার দুর্বল মুমিনদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা চরমভাবে বাড়িয়ে দিয়েছিল।
অতএব, এই আয়াতটি কোনোভাবেই শান্তিকামী অমুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার দলিল হতে পারে না। এটি কেবল সেইসব জালিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেয়, যারা মুসলমানদের দ্বীনের কারণে নির্যাতন করে এবং আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। যারা কোনো আগ্রাসন বা আক্রমণ করেনি, নিজেদের ভূমিতে শান্তিতে অবস্থান করছে—তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সপক্ষে এই আয়াত দিয়ে দলিল উপস্থাপন করা একেবারে ভুল ও অযৌক্তিক।[২৯]
উভয় সূরায় বর্ণিত এই আয়াতের সঠিক ব্যাখ্যাটি সেইসব লোকের ভুল ভাঙার জন্য যথেষ্ট, যারা দুনিয়ার সবার বিরুদ্ধে যুদ্ধের ডঙ্কা বাজাতে চায়। তারা এই আয়াতটিকে যুদ্ধের প্রথম দলিল হিসেবে উপস্থাপন করে এবং দাবি করে যে, কেবল অমুসলিম হওয়ার কারণেই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে—সেখানে মুসলমানদের ওপর কোনো আক্রমণ বা শত্রুতা থাকা শর্ত নয়। এই ব্যাখ্যার সত্যতার পক্ষে সহিহ বুখারির একটি বড় দলিল রয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা.)-এর জামানায় যখন ফিতনা দেখা দিল, তখন আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-কে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য ডাকা হয়েছিল। তখন যুদ্ধ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন—
‘আয়াতুস সাইফ’ বা তরবারির আয়াত [১৯]
যারা নাসিখ ও মানসুখ, তাফসির এবং ফিকহের কিতাবাদি পড়েছেন, তাদের কাছে একটি বিষয় বেশ অদ্ভুত ঠেকবে। কিছু আলিম দাবি করেন যে, পবিত্র কুরআনের মাত্র একটি আয়াত নাকি বহু আয়াতের হুকুম বাতিল করে দিয়েছে! এই বাতিল হওয়া আয়াতের সংখ্যা নিয়েও আবার আলিমদের মধ্যে বেশ মতভেদ আছে। কেউ বলেন, সেই একটি আয়াত ১১৪টি আয়াতকে রহিত করেছে। কেউ বলেন, ১৪০টি আয়াতকে রহিত করেছে। এমনকি কারো কারো মতে, রহিত হওয়া আয়াতের সংখ্যা প্রায় ২০০ পর্যন্ত (!!)। যে আয়াতগুলোকে রহিত বলে দাবি করা হচ্ছে, সেগুলো মূলত মানুষের প্রতি উদারতা, ক্ষমা, মুশরিকদের উপেক্ষা করা এবং হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকার নির্দেশ দেয়। তাদের দাবি অনুযায়ী, এই সুন্দর আয়াতগুলো এখন কুরআনে কেবল নামাজে তিলাওয়াত করার জন্য বা ওয়াজ-নসিহতে বলার জন্যই রয়ে গেছে; বাস্তব জীবনে এগুলোর আর কোনো কার্যকারিতা বা হুকুম বাকি নেই।
আশ্চর্যের বিষয় হলো—যে আয়াতটি অমুসলিমদের সাথে ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইসলামি শরীয়তের এমন মহৎ ও উদার নীতি সম্বলিত বিশাল সংখ্যক আয়াতকে রহিত করে দিয়েছে বলে দাবি করা হয়, সেই আয়াতটি আসলে কোনটি, তা নিয়ে এই দাবির সপক্ষের আলিমরাই একমত হতে পারেননি। কেউ কেউ বলেন, আয়াতটি হলো সূরা তাওবার ৫ নম্বর আয়াত। যেখানে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন—
আবার কেউ কেউ বলেন, আয়াতটি হলো সূরা তাওবার ২৯ নম্বর আয়াত। যেখানে ইরশাদ হয়েছে—
অন্য এক দলের মতে, আয়াতটি হলো সূরা তাওবার ৩৬ নম্বর আয়াতের এই অংশটি—
আরেক দলের দাবি হলো, আয়াতটি মূলত সূরা তাওবার ৪১ নম্বর আয়াত। যেখানে বলা হয়েছে—
তবে ‘আয়াতুস সাইফ’ বা তরবারির আয়াতের অস্তিত্বে বিশ্বাসী অধিকাংশ আলিমের মতেই সূরা তাওবার ৫ নম্বর আয়াতটিই হলো সেই আয়াত। অবশ্য অন্য আয়াতগুলোর দাবিও তাদের মাঝে বেশ আলোচিত।[৩২]
ড. কারজাভী এই সংবেদনশীল বিষয়টি নিয়ে একেবারে ইলমি ও তাত্ত্বিক আলোচনা করার সিদ্ধান্ত নেন। এজন্য তিনি উসুলুদ্ দ্বীন (আকিদা), উসুলুল ফিকহ (আইনশাস্ত্রের মূলনীতি), উসুলুত তাফসির এবং উসুলুল হাদিসের সমস্ত জ্ঞানকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এই সবকটি শাস্ত্রের আলোকে তিনি মূল বিষয়ের সাথে জড়িত তিনটি মৌলিক প্রশ্ন নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন। প্রথমত, তিনি আলোচনা করেছেন—কুরআনে নাসিখ বা বিধান রহিতকরণের বিষয়টি কি একেবারে সুনিশ্চিত ও সর্বসম্মত? নাকি এটি একটি জন্নি (ধারণানির্ভর) বিষয়, যা নিয়ে দ্বিমতের অবকাশ আছে?
দ্বিতীয়ত, কোনো আয়াতকে রহিত বা মানসুখ বলতে হলে শরীয়তসম্মত কী কী শর্ত পূরণ হতে হয়, তা নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন।
তৃতীয়ত, তিনি খতিয়ে দেখেছেন—এই শর্তগুলো তথাকথিত ‘আয়াতুস সাইফ’-এর ওপর কতটুকু খাটে। তিনি নির্দিষ্ট করে দেখিয়েছেন যে, কোনো একটি আয়াত দিয়ে অন্য অনেক আয়াতকে রহিত করার যে দাবি করা হচ্ছে, তা একেবারে স্ববিরোধী। কারণ, যে আয়াতটিকে তারা রহিতকারী (নাসিখ) বলছেন, সেটি কালানুক্রমিক দিক থেকে তথাকথিত রহিত হওয়া আয়াতের অনেক আগেই নাজিল হয়েছিল!
কুরআনে নাসখের বিষয়ে ড. কারজাভী স্পষ্ট করে বলেছেন যে, “এই বিষয়ে কোনো অকাট্য নস বা সুনিশ্চিত ইজমা নেই।” পূর্ববর্তী যুগের সালাফগণ যখন ‘নাসিখ’ শব্দটি ব্যবহার করতেন, তখন তারা সবসময় পরবর্তী যুগের ফকিহদের পরিভাষাগত অর্থ বোঝাতেন না। পরবর্তী যুগের পরিভাষায় নাসিখ মানে হলো—পরের কোনো শরীয়তি দলিলের মাধ্যমে আগের কোনো হুকুম বা বিধান পুরোপুরি তুলে নেওয়া।[৩৩]
যারা নাসখের সপক্ষে ও বিপক্ষে দলিল দিয়েছেন, তাদের সবার মতামত পর্যালোচনার পর ড. কারজাভী এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে—নাসখ মানা ও না-মানার এই বিতর্কটি আজও একেবারে জীবন্ত। নাসখপন্থীদের সবচেয়ে বড় দলিল হলো সূরা বাকারার ১০৬ নম্বর আয়াত। যেখানে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন—
ড. কারজাভী প্রমাণ করেছেন যে, এই আয়াতটি তাদের দাবির পক্ষে কোনো অকাট্য বা সুনিশ্চিত দলিল (কাতয়ি) নয়। অথচ আল্লাহর কিতাবের কোনো আয়াতের হুকুম বা কার্যকারিতা শেষ হয়ে গেছে—এমন বড় দাবি করতে হলে একেবারে সুনিশ্চিত ও অকাট্য দলিলের প্রয়োজন। কারণ উসুল হলো—কুরআনের প্রতিটি আয়াত সুপ্রতিষ্ঠিত, বাধ্যতামূলক এবং কিয়ামত পর্যন্ত চিরস্থায়ী। তিনি এই মতটিকেই বেছে নিয়েছেন যে—এই আয়াত এবং এর পরের দুটি আয়াতের মূল উদ্দেশ্য হলো, আমাদের শরীয়তের আগের অন্য সব শরীয়তের (যেমন ইহুদি বা খ্রিষ্টানদের বিধান) হুকুম রহিত করা। একইভাবে যারা সূরা নাহলের ১০১ নম্বর আয়াত দিয়ে নাসখ প্রমাণ করতে চান, ড. কারজাভী তাদের দাবিও নাকচ করে দিয়েছেন। আয়াতটি হলো—
ড. কারজাভী বলেন—সব আলিমের ঐক্যমত্যে এই আয়াতটি এবং পুরো সূরা নাহলই মক্কি যুগে নাজিল হয়েছে। আর মক্কি যুগে নাসখ বা বিধান রহিত হওয়ার কোনো সুযোগই ছিল না। কারণ, যে আয়াতগুলোর হুকুম রহিত হওয়া সম্ভব, সেগুলো হলো মূলত আহকাম বা বিধিবিধানের আয়াত (যা মদিনায় নাজিল হয়েছে)। সুতরাং, এই আয়াত দিয়েও নাসখ প্রমাণ করার কোনো সুযোগ নেই।[৩৪]
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ বা হাদিসেও নাসখের পক্ষে কোনো স্পষ্ট দলিল নেই। অথচ আল্লাহর ওহি মানুষের সামনে পরিষ্কার করার দায়িত্ব স্বয়ং রাসূল (সা.)-এর ওপরই ছিল। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন—
নাসখের মতো এত বড় ও জরুরি বিষয়টি মানুষের জানা থাকা অত্যন্ত আবশ্যক ছিল। অথচ রাসূলুল্লাহ (সা.) কুরআনের তাফসির করতে গিয়ে যা বলেছেন, তার কোথাও এমন কোনো কথা পাওয়া যায় না যা প্রমাণ করে যে, কুরআনের একটি আয়াত অন্য আয়াতকে রহিত করে দিয়েছে।[৩৫]
ইসলামের দীর্ঘ ইতিহাসে কুরআনে নাসখ হওয়া এবং বাস্তবে তা ঘটার ব্যাপারে উম্মাহর কোনো ইজমা বা সর্বসম্মত ঐক্য গড়ে ওঠেনি। বরং সব যুগেই এমন অনেক নামী ও নির্ভরযোগ্য আলিম ছিলেন—যাদের বাদ দিয়ে ইজমা কল্পনাই করা যায় না—যারা কুরআনে নাসখ হওয়ার বিষয়টি একেবারে অস্বীকার করেছেন। আল্লামা কারজাভী এই মতটিকে জোরালোভাবে সমর্থন করেছেন। তিনি বলেন—
তিনি আরও বলেন—
তাঁর ভাষায়—
যারা নাসখ বা রহিতকরণের বিষয়টি মেনে নেন, তাদের জন্য ড. কারজাভী কয়েকটি শর্তের কথা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে প্রথম শর্ত হলো—নাসিখ (রহিতকারী) এবং মানসুখ এই দুই নসের মধ্যে কোনোভাবেই যেন সমন্বয় করা সম্ভব না হয়। অর্থাৎ নস দুটির মধ্যে একটি বাস্তব ও প্রকাশ্য বৈপরীত্য থাকতে হবে। কিন্তু কোনো না কোনো উপায়ে যদি দুই নসের মধ্যে সমন্বয় করা যায়, তবে নাসখ প্রমাণিত হবে না। কারণ এটি আসল বা মূল নিয়মের বিপরীত। নিজের এই মতের পক্ষে তিনি ইমাম ইবনে জারির তাবারি (রহ.)-এর একটি চমৎকার বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। যারা আল্লাহর এই বাণীর হুকুম রহিত হয়ে গেছে বলে দাবি করেন—
ইমাম তাবারি তাদের এই দাবি নাকচ করে দিয়ে বলেন—
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছ থেকে সরাসরি কোনো সহিহ ও স্পষ্ট বর্ণনা ছাড়া নাসখের বিষয় জানা সম্ভব নয়। কিংবা কোনো সাহাবির স্পষ্ট বক্তব্য থাকতে হবে যে, এই আয়াতটি অমুক আয়াতকে রহিত করেছে। অথবা দুই আয়াতের মধ্যে এমন স্পষ্ট বৈপরীত্য থাকতে হবে যা দূর করা যায় না। সাথে সাথে দুই আয়াতের নাজিল হওয়ার সময়কাল জানতে হবে, যেন আগের ও পরের (অর্থাৎ নাসিখ ও মানসুখ) আয়াত চেনা যায়। আর এই পুরো বিষয়টি জানার একমাত্র মাধ্যম হলো বিশুদ্ধ রিওয়ায়াত, মানুষের নিজস্ব রায় বা ইজতিহাদ এখানে কোনো কাজে আসবে না। আল্লামা কারজাভী বলেন—
সাহাবিদের বক্তব্য এ বিষয়ে তখনই গ্রহণ করা হবে, যখন তিনটি শর্ত পূরণ হবে। প্রথমত, সাহাবি পর্যন্ত পৌঁছানোর সূত্র বা সনদ সহিহ হতে হবে। দ্বিতীয়ত, বক্তব্যটি যেন কেবল তাঁর ব্যক্তিগত ইজতিহাদ বা মতামত না হয়। কারণ অন্য কোনো সাহাবির মতামত তার বিপরীত হতে পারে। তৃতীয়ত, সাহাবি যখন ‘নাসিখ’ শব্দটি ব্যবহার করবেন, তখন তার উদ্দেশ্য যেন পরবর্তী যুগের পরিভাষাগত অর্থই হয়। অর্থাৎ পরের কোনো দলিলের মাধ্যমে আগের কোনো শরীয়তি হুকুম পুরোপুরি তুলে নেওয়া। কারণ পূর্ববর্তী যুগের ইমাম ও সাহাবিদের কথায় ‘নাসিখ’ শব্দটি প্রায়শই এই পরিভাষাগত অর্থে ব্যবহৃত হতো না। তারা ‘নাসিখ’ বলতে আম বা সাধারণ নির্দেশকে খাস বা সুনির্দিষ্ট করা, মুতলাক বা শর্তহীন বিষয়কে মুকাইয়্যাদ বা শর্তযুক্ত করা, মুজমাল বা সংক্ষিপ্ত বিষয়ের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া (মুফাসসাল করা), কিংবা কোনো কিছুর ব্যতিক্রম বা সীমা নির্ধারণ করা বোঝাতেন। আর এই বিষয়গুলোর কোনটিই মূলত আসল নাসখ বা রহিতকরণের অন্তর্ভুক্ত নয়।[৩৮]
মুফাসসিরদের পরিভাষায় কোন আয়াতটিকে ‘আয়াতুস সাইফ’ বা তরবারির আয়াত বলা হবে, তা নিয়ে ড. কারজাভী বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি তাফসিরবিদদের মতামতগুলো অত্যন্ত ইলমি, উচ্চমার্গীয়, যুক্তিপূর্ণ ও আকর্ষণীয় পদ্ধতিতে পর্যালোচনা করেছেন। পরিশেষে তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন—যে চারটি আয়াতকে বিভিন্ন সময়ে ‘আয়াতুস সাইফ’ বলা হয়েছে, সেগুলোর কোনটিই এই নামের উপযুক্ত নয়। এই আয়াতগুলো কুরআনের অন্যান্য শান্তি ও সন্ধির কথা বলা আয়াতগুলোকে রহিত করে দেয়নি। যেমন—ক্ষমা ও উপেক্ষা করার আয়াত, আশ্রয়প্রার্থী মুশরিককে আল্লাহর কালাম শোনার সুযোগ দেওয়ার এবং তাকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়ার আয়াত। কিংবা যেসব মুশরিক মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়নি, তাদের সাথে করা চুক্তি ও ওয়াদা রক্ষা করার নির্দেশ সম্বলিত আয়াতগুলোকে এই আয়াতগুলো বাতিল করেনি।
পূর্ববর্তী আলিমদের এক আয়াত দিয়ে অন্য আয়াত রহিত করার এই পারস্পরিক দ্বিমতের কথা তুলে ধরার পর ড. কারজাভী একটি চমৎকার মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন—
আল্লামা কারজাভীর মতে, যারা ‘আয়াতুস সাইফ’-এর দলিল দিয়ে দুনিয়ার সব মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কথা বলেন, তাদের দাবির পক্ষে এই আয়াতে দূরতম কোনো ইশারা বা দলিল নেই। ইসলাম আমাদের কেবল তাদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করার অনুমতি দেয় যারা আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। কিন্তু যারা আমাদের থেকে দূরে থাকে এবং শান্তির হাত বাড়ায়, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কোনো নির্দেশ ইসলামে নেই।[৪০]
এই সুদীর্ঘ ও তথ্যবহুল আলোচনা পড়ার পর পাঠকের মন অনায়াসেই এই সিদ্ধান্তে থিতু হয় যে, ‘আয়াতুস সাইফ’ বা তরবারির আয়াত বলে আসলে আলাদা কোনো বিষয়ের অস্তিত্বই নেই। এটি প্রাচীন ও আধুনিক যুগের কিছু মুফাসসিরের নিজস্ব ব্যক্তিগত মতামতের ফসল মাত্র। এই মতামতগুলোর পেছনে রাসূলুল্লাহ (সা.) কিংবা তাঁর সাহাবিদের কোনো সহিহ বর্ণনা বা হাদিসের ভিত্তি নেই। এগুলো পুরোপুরি কিছু আলিমের ব্যক্তিগত ইজতিহাদ, যাঁদের ভুল হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। তাই তাঁদের কথা নির্দ্বিধায় গ্রহণ বা বর্জন করা যেতে পারে। কোনো পাঠক যখন গভীরভাবে বিষয়টি লক্ষ্য করবেন, তখন তিনি অবাক হয়ে দেখবেন যে, মুফাসসিরদের এই দলটি—
আমি বলব, কোনো চিন্তাশীল ব্যক্তি যখন এই পুরো বিষয়টি গভীরভাবে লক্ষ্য করবেন, তখন তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে যে—যারা এই রহিতকরণের দাবি করেন, তাদের কাছে নিজেদের মতের পক্ষে গ্রহণযোগ্য একটি দলিলও নেই। আসলে—
এটি একেবারে “স্পষ্ট ভুল যে—কুরআনে মুশরিকদের উপেক্ষা করার যত নির্দেশ এসেছে, তার সবকটিকে ‘আয়াতুস সাইফ’ (তরবারির আয়াত) দ্বারা মানসুখ বলে ধরে নেওয়া হবে। কারণ এগুলো মূলত কুরআনের আখলাকি নির্দেশনা। এগুলো ইসলামি ব্যক্তিত্বের নৈতিক দিক গড়ে তোলার জন্য নাজিল হয়েছে। আর এই ধরনের নৈতিক ও আখলাকি হুকুম কখনো রহিত হয় না।”[৪৩]
তাছাড়া পবিত্র কুরআন যেভাবে মুশরিকদের উপেক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছে, ঠিক একইভাবে মুনাফিকদেরও উপেক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছে। যেমন আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন—
অন্য আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন—
এখন মুশরিক বা কাফিরদের উপেক্ষা করার আয়াতগুলোর ব্যাপারে যেভাবে দাবি করা হয়, মুনাফিকদের উপেক্ষা করার এই আয়াতগুলোর ক্ষেত্রে কিন্তু কোনোভাবেই ‘আয়াতুস সাইফ’ দ্বারা রহিত হওয়ার দাবি কল্পনাও করা যায় না। এর মূল কারণ হলো—মুনাফিকদের বিরুদ্ধে তরবারি দিয়ে যুদ্ধ করা হয় না। কারণ তারা বাহ্যিকভাবে মুসলমান। ফলে মুসলমানদের ব্যাপারে শরীয়তের যে প্রকাশ্য হুকুম-আহকাম প্রযোজ্য হয়, তাদের ব্যাপারেও তা জারি হয়। সুতরাং, এখানে মুনাফিকদের উপেক্ষা করার অর্থ হলো—তাদের এবং তাদের চক্রান্তকে কোনো পাত্তাই না দেওয়া। একই সাথে রাসূলুল্লাহ (সা.) যেন মুনাফিকদের এই আচরণগুলোকে নিজের দাওয়াতের পথের বাধা বা অন্তরায় মনে না করেন।[৪৪]
“কিয়ামতের আগে আমাকে তরবারি দিয়ে পাঠানো হয়েছে” শীর্ষক হাদিস
এই বাক্যটি মূলত একটি হাদিসের শুরুর অংশ, যা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী হিসেবে চালানো হয়। ইমাম আহমাদ এবং অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
যারা দাবি করেন যে—অমুসলিমরা যতক্ষণ না ইসলাম কবুল করবে অথবা অপদস্থ হয়ে জিজিয়া কর দেবে, ততক্ষণ পর্যন্ত দুনিয়ার সব মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা মুসলমানদের ওপর ফরজ, তাদের চিন্তাধারার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো এই হাদিসটি!
আল্লামা কারজাভী বলেন—
এরপর তিনি এই হাদিসটির সনদ (বর্ণনাসূত্র) এবং মতন (মূল বক্তব্য) উভয় দিক নিয়ে গভীর আলোচনা করেছেন। সনদের দিক থেকে তিনি এই হাদিসের বিশুদ্ধতা নিয়ে মুহাদ্দিসদের মতামত এবং এর রাবিদের ব্যাপারে আসমাউর রিজাল শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য পর্যালোচনা করেছেন। বিশেষ করে আব্দুর রহমান ইবনে সাবিত ইবনে সাওবানকে নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন, কারণ এই হাদিসের বর্ণনার পুরো কেন্দ্রবিন্দুই হলেন তিনি।
এই দীর্ঘ গবেষণার পর ড. কারজাভী যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, তা হলো—
এবার হাদিসটির মতন বা মূল বক্তব্যের দিকে তাকালেও আমরা এই কথার প্রমাণ পাব। ড. কারজাভী অত্যন্ত নিখুঁতভাবে প্রমাণ করেছেন যে—
এরপর ড. কারজাভী মাক্কি ও মাদানি জীবনের এমন ১৬টি আয়াত তুলে ধরেছেন, যার প্রতিটি ইসলামের এই শাশ্বত ও স্থায়ী রূপটিকে প্রমাণ করে। এই আয়াতগুলো—
“আমাকে মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে” শীর্ষক হাদিস
এই বাক্যটি আব্দুল্লাহ ইবনে উমরের (রা.) একটি হাদিসের অংশ। হাদিসটি ‘মুত্তাফাকুন আলাইহি’ (অর্থাৎ বুখারি ও মুসলিম উভয় গ্রন্থে বর্ণিত)। হাদিসটি হলো—
এই হাদিসের সনদের ধারাবাহিকতা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। এটি একটি সহিহ হাদিস এবং এর সত্যতায় কোনো সন্দেহ নেই।[৫০] আর এই কারণেই, যারা পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার ডাক দেয়, তারা তাদের দাবির পক্ষে এটিকে একটি প্রধান দলিল হিসেবে গ্রহণ করেছে।
আল্লামা ইউসুফ আল কারজাভী এই মতামতের একটি সামগ্রিক জবাব দিয়েছেন। তিনি এই হাদিসটি সম্পর্কে বলেছেন—
হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি ‘ফাতহুল বারি’ গ্রন্থে এই হাদিসের যে ব্যাখ্যাগুলো দিয়েছেন, তা উল্লেখ করার পর কারজাভী বলেন—
“অনেকের কাছেই এই মতটি জোরালো মনে হয় যে, এই হাদিসে ‘আন নাস’ (মানুষ) শব্দটি ‘আম’ শব্দ, যা দ্বারা ‘খাস’ বা বিশেষ কিছু মানুষকে বোঝানো হয়েছে। এখানে মূলত আরবের মুশরিকদের বোঝানো হয়েছে, যারা ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই এই দাওয়াতের সাথে শত্রুতা পোষণ করেছিল। তারা মক্কায় তেরো বছর ধরে মুসলমানদের নির্যাতন করেছিল এবং মদিনায় নয় বছর ধরে রাসূলের (সা.) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। এমনকি তারা রাসূলকে ও তাঁর সাহাবিদের নিশ্চিহ্ন করতে এবং ইসলামের দাওয়াত মিটিয়ে দিতে দুই দুইবার মদিনায় এসেও আক্রমণ করেছিল। এই লোকগুলোর চরিত্র কেমন ছিল, তা সূরা তাওবায় এভাবে বর্ণিত হয়েছে—
রাসূল (সা.) তাদের দিক থেকে হাত গুটিয়ে নিয়েছিলেন এবং তাদের সংশোধনের আর কোনো আশা ছিল না।
আল্লামা কারজাভী এই হাদিসটি নিয়ে তাঁর আলোচনার শেষে এই মতটিকেই বেছে নিয়েছেন যে, হাদিসের ‘মানুষ’ শব্দটি আসলে একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে বোঝায়। এখানে নির্দিষ্টভাবে সেই যুদ্ধংদেহী মুশরিকদের বোঝানো হয়েছে, যাদের কথা সূরা বারায়াতের (তাওবা) শুরুতে এসেছে এবং যাদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এরা তারাই, যারা—
এর আগে তিনি হাদিসটির ব্যাখ্যায় শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়ার বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। ইবনে তাইমিয়ার বক্তব্যের সারকথা হলো—
এই হাদিসটি আসলে যুদ্ধের শেষ সীমানা নির্ধারণ করে দেয়। অর্থাৎ, শত্রুরা যদি এই কাজগুলো (ঈমান, নামাজ, যাকাত) করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হারাম হয়ে যাবে। এর অর্থ এই নয় যে, রাসূলকে (সা.) এই উদ্দেশ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সবার সাথে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কারণ, এমন অর্থ করা কুরআনের স্পষ্ট বিধান এবং উম্মাহর ইজমার (ঐকমত্য) পরিপন্থী। রাসূল (সা.) নিজে কখনো এমনটি করেননি। বরং তাঁর নীতি ছিল—যে তাঁর সাথে শান্তিতে থাকত, তিনি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেন না।
ইবনে তাইমিয়ার এই বক্তব্যের ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে আল্লামা কারজাভী বলেন—
এভাবে প্রত্যেক সঠিক বুঝসম্পন্ন মানুষের কাছে এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, যারা দাবি করে ‘ইসলাম তার অনুসারীদের পৃথিবীর সব মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেয়’, তাদের জন্য এই হাদিসটি দলিল হতে পারে না। কুরআন ও হাদিসের দলিল এবং সঠিক বিচার-বুদ্ধির আলোকে এটাই প্রমাণিত হয় যে, ইসলাম কেবল আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য যুদ্ধ করার নির্দেশ দেয়, নিজে থেকে আক্রমণ শুরু করার জন্য নয়। যেমনটি উস্তায আব্বাস মাহমুদ আল আক্কাদ বলেছেন—
আল্লামা কারজাভী হাদিসটি অধ্যয়ন করে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, তা বড় বড় আলিমদের বক্তব্য দিয়ে সমর্থন করেছেন। যেমন—ইবনুল কাইয়্যিম আল জাওযিয়্যাহ, আব্দুল্লাহ ইবনে যায়িদ আল মাহমুদ, মুহাম্মদ আল গাজালি এবং আহমাদ জাকি পাশা। এরপর তিনি তাঁর এই মূল্যবান গবেষণার সমাপ্তি টেনেছেন—তৃতীয় অধ্যায়ের সপ্তম পরিচ্ছেদের শেষে—উস্তায আল আক্কাদের একটি চমৎকার ও সত্যনিষ্ঠ বক্তব্যের বরাত দিয়ে—
যেসব অমুসলিম মুসলমানদের ক্ষতি করে না, শান্তিতে বাস করে এবং মুসলমানদের শত্রুদের কোনো সাহায্য করে না, তাদের সাথে যুদ্ধ না করে হাত গুটিয়ে রাখাই ইসলামের মূল নীতি।
আমি এখানে যেসব বিষয় উল্লেখ করলাম এবং বিস্তারিত আলোচনা করলাম, তা মূলত আল্লামা ড. ইউসুফ আল কারজাভীর এই অনন্য ও অসাধারণ গ্রন্থ ‘ফিকহুল জিহাদ’ (দুই খণ্ড)-এর সমুদ্র থেকে কয়েক ফোঁটা মাত্র। শুরু থেকেই আমার ইচ্ছা ছিল এই বইটির ওপর আলোকপাত ও মন্তব্য করার।
আমার খুব ইচ্ছা ছিল যে, আমি যদি সুযোগ ও পর্যাপ্ত জায়গা পেতাম, তবে তাঁর আরও কিছু বিষয়ের ওপর মন্তব্য করতাম। যেমন—
শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার জন্য মুসলমানদের যে সব ধরনের শক্তি অর্জন করা উচিত, যাতে তারা শত্রুর চেয়ে দুর্বল না থাকে, সে বিষয়ে তাঁর বক্তব্য।
জিহাদ ও আল্লাহর রাস্তায় লড়াইয়ের জন্য সব দিক থেকে উম্মাহকে প্রস্তুত করার আলোচনা।
কাদিয়ানি সম্প্রদায়ের সেই বাতিল মতবাদের জবাব—যারা দাবি করে জিহাদের বিধান নাকি পুরোপুরি রহিত হয়ে গেছে।
জিহাদে নারীর ভূমিকার প্রশংসা, বিশেষ করে ফিলিস্তিনি শহীদ নারী মুজাহিদদের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা।
মুসলমানদের ও তাদের শত্রুদের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি এবং এর মূল ভিত্তি যে উম্মাহর মাসলাহাত আম্মাহ বা সামগ্রিক কল্যাণসাধন, সে বিষয়ে আলোচনা।
অমুসলিমদের (আহলে কিতাব ও মুশরিক, আরব ও অনারব নির্বিশেষে) কাছ থেকে জিজিয়া গ্রহণ করার বৈধতা এবং এর পরিমাণ যে শাসকের বিবেচনার ওপর নির্ভরশীল (যাতে প্রজাদের ধনী বা দরিদ্র অবস্থার দিকে লক্ষ রাখা হয়)।
রাষ্ট্রের প্রধানের মতো একজন সাধারণ মুসলমানও যে কোনো অমুসলিমকে নিরাপত্তা দিতে পারে এবং এই নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো সন্দেহ তৈরি হলে তা দুর্বল পক্ষের (নিরাপত্তা প্রার্থীর) স্বার্থে ব্যাখ্যা করা।
দারুল ইসলামে (মুসলিম রাষ্ট্রে) গির্জা নির্মাণের বিষয়ে তাঁর সাহসী ইজতিহাদ।
অমুসলিমদের সালামের জবাব দেওয়ার বিষয়ে তাঁর সঠিক ও জোরালো মতামত; এবং
ফিলিস্তিনে শহীদী হামলার বিষয়ে তাঁর সঠিক ও শক্তিশালী দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ।
কিন্তু যেহেতু আমার লেখাটি এই সমস্ত বিষয় বিস্তারিত তুলে ধরতে অপূর্ণ থেকে গেল, তাই আমি এ বিষয়ে আগ্রহী প্রত্যেক ব্যক্তিকে মূল বইটি পড়ার পরামর্শ দিচ্ছি। কারণ, আমার এই লেখা কোনোভাবেই মূল বইয়ের বিকল্প হতে পারে না।
আমি আল্লাহর কাছে দুআ করি, তিনি যেন আমাদের বড় ভাই আল্লামা ড. ইউসুফ আল কারজাভীকে তাঁর এই কাজ, জ্ঞান এবং জিহাদের জন্য সর্বোত্তম পুরস্কার দান করেন—যেভাবে তিনি একজন আলিমকে তাঁর কর্মের জন্য পুরস্কৃত করে থাকেন।
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জন্য।
তথ্যসূত্র
- আবু ‘দাউদ’ : ৪২৯৭।
- ফিকহুল জিহাদ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১ ও ১২।
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৮-২৯, (অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত)।
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৯।
- এছাড়াও দেখা যেতে পারে তাঁর বই—‘কালিমাতু ফিল ওয়াসাত্বিয়্যাহ আল ইসলামিয়্যাহ ওয়া মাআলিমুহা’, এবং ‘আস সাহওয়াহ আল ইসলামিয়্যাহ বাইনাল জুহুদ ওয়াত তাতাররুফ’-সহ আরও অনেক বই।
- ইবনে আতিয়্যাহ বলেন—
“এই আয়াতটি এমন প্রত্যেক ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করে, যে আল্লাহর দীনের কোনো জ্ঞান গোপন করে, যা মানুষের কাছে প্রচার করা প্রয়োজন…। আর এখানে ‘কিতাব’ বলতে তাওরাত ও ইঞ্জিলকে বোঝানো হয়েছে—আয়াতটি নাজিল হওয়ার প্রেক্ষাপটের কারণে, কারণ এটি মুহাম্মদ (সা.)-এর ব্যাপারে নাজিল হয়েছিল। তবে আয়াতের সাধারণ অর্থের কারণে এর মধ্যে কুরআনও অন্তর্ভুক্ত হবে।” (দেখুন—‘আল মুহাররারুল ওয়াজিয ফি তাফসিরিল কিতাবিল আজিজ’, দারু ইবনে হাযম, বৈরুত, ১৪২৩ হিজরি/২০০২ খ্রিষ্টাব্দ।) - ইবনে আতিয়্যাহ বলেন—
“স্পষ্টত এই আয়াতটি ইহুদিদের ব্যাপারে নাজিল হয়েছে এবং তারাই এখানে উদ্দেশ্য। তবে এই উম্মাহর মধ্যে যারা জ্ঞান গোপন করবে, তারাও এই নিন্দার অংশীদার হবে এবং এই দোষে দোষী হবে।” (প্রাগুক্ত) - ফিকহুল জিহাদ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৫৫-৫৬।
- একই স্থানে কিতালের মর্যাদা ও গুরুত্ব নিয়ে বেশ কিছু আয়াত উল্লেখ করা হয়েছে।
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৫৫-৫৮; ব্র্যাকেটের ভেতরের ডট চিহ্নগুলো (…) দ্বারা সংক্ষিপ্ত করা অংশ বোঝানো হয়েছে।
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৬০। এখানে তাঁর ব্যবহৃত শব্দগুচ্ছ—
يحق على الأفراد…
অত্যন্ত নিখুঁত, কারণ বাচনভঙ্গির দিক থেকে এর অর্থ হলো—“তাদের ওপর এটি আবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়”। এটি কিছু পাঠকের বোঝার বিপরীত, যারা মনে করেন এর দ্বারা বিষয়টি ঐচ্ছিক বোঝানো হয়েছে। এজন্যই ড. কারযাভী তাঁর কথার শেষে একটি ফিকহি নীতি উল্লেখ করেছেন, “যা ছাড়া ওয়াজিব কাজ সম্পন্ন হয় না, সেটিও ওয়াজিব।” - প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৬২।
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৬৯।
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৭৯।
- আল্লামা শাইখ ড. ইব্রাহিম আবদুল হামিদ ইব্রাহিমও একই ধরনের সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। তিনি ১৩৬৩ হিজরি মোতাবেক ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দে আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শরিয়াহ অনুষদে জমা দেওয়া তাঁর ডক্টরেট ডিগ্রির থিসিসে এই মত ব্যক্ত করেন। তাঁর থিসিসের শিরোনাম ছিল—“আল আলাকাত আদ দুওয়ালিয়্যাহ আল আম্মাহ ফিল ইসলাম – কিসমুল হারব : দিরাসাহ মুকারানাহ” (ইসলাম ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক – যুদ্ধ অধ্যায় : একটি তুলনামূলক সমীক্ষা)। মিশরের দারুল ইফতা কর্তৃক প্রকাশিত তাঁর রচনাসমগ্রের প্রথম অংশ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮৭ এবং তৎপরবর্তী পৃষ্ঠা এবং পৃষ্ঠা ১১১ ও তৎপরবর্তী পৃষ্ঠা দেখুন। ড. কারযাভীর সিদ্ধান্তকে সমর্থন করার জন্যই আমি এটি উল্লেখ করছি। আমার ধারণা, ড. কারযাভী এই থিসিসটি দেখার সুযোগ পাননি, কারণ তিনি তাঁর রেফারেন্স তালিকায় এটির নাম উল্লেখ করেননি। তা ছাড়া দারুল ইফতা কর্তৃক প্রকাশের আগে এটি এক প্রকার হারিয়েই গিয়েছিল।
- ফিকহুল জিহাদ, পৃষ্ঠা ৮৯।
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৮৯-৯৪, সংক্ষিপ্ত।
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৯৫।
- এটি হলো “রাষ্ট্রের উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ” বুঝাতে ব্যবহৃত একটি ঐতিহ্যবাহী ফিকহি পরিভাষা। এর অর্থ এই নয় যে, একজন মাত্র ব্যক্তি এই ক্ষমতার মালিক। হ্যাঁ, ফিকহ সংকলনের শুরুর যুগে এটি সত্য ছিল, কিন্তু বর্তমানে রাষ্ট্রগুলো বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। অতএব, সমকালীন ফিকহি লেখায় ‘ইমাম’ শব্দটিকে এই আধুনিক অর্থেই বুঝতে হবে।
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৯৯-১০০।
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১০১।
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১০২, যেখানে বুখারি ও মুসলিমসহ অন্যান্য গ্রন্থে আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসটির সূত্র উল্লেখ করা হয়েছে।
- তুলনা করে দেখুন—শাইখ ইব্রাহিম আবদুল হামিদ ইব্রাহিম, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১১১; এবং আমাদের বন্ধু আল্লামা ড. মুহাম্মদ লুতফি আস সাব্বাগ, ইমাম ইবনে রজব হাম্বলির পুস্তিকা “আল হিকামুল জাদিদাহ বিল ইজআহ”-এর সম্পাদনার ভূমিকা, দারুল ওয়াররাক (রিয়াদ) এবং দারুন নাইরাইন (দামেস্ক), ১৪২২ হিজরি-২০০২ খ্রিষ্টাব্দ, পৃষ্ঠা ২৮।
- ইমাম শাফেয়ি, ‘আর রিসালাহ’, শাইখ আহমাদ শাকিরের সম্পাদনা, কায়রো সংস্করণ, (প্রকাশক ও সন উল্লেখ নেই), অনুচ্ছেদ ১৪৬৯-১৪৭৯। ফতোয়া বা শিক্ষাদানে নিয়োজিত হওয়ার আগে প্রত্যেক ইলম অর্জনকারীর জন্য তাঁর এই কথাগুলো ভালোভাবে বোঝা আবশ্যক।
- দেখুন—মুত্তাকি হিন্দির ‘কানযুল উম্মাল’, হাদিস নম্বর ২৮৯১৮। আমরা বুঝাতে চাচ্ছি—ইজতিহাদের এই সঠিক ধারার ধারাবাহিকতাই হাদিসটির সত্যতার প্রমাণ। অর্থাৎ, বাস্তব পরিস্থিতি যদি কোনো দুর্বল বা মতভেদপূর্ণ হাদিসের সাথে মিলে যায়, তবে এই মিলটি হাদিসটিকে যারা সহিহ বলেছেন, তাদের মতকে জোরালো করে অথবা হাদিসটির মান দুর্বলতার স্তর থেকে সহিহ বা গ্রহণযোগ্যতার স্তরে উন্নীত করে। এখানে আমি পরিভাষাগত ‘সহিহ’ বুঝাচ্ছি না, বরং মানুষের বাস্তব জীবনের সত্যতা বুঝাচ্ছি। এটি বিশেষ করে ভবিষ্যদ্বাণীমূলক হাদিসগুলোর ক্ষেত্রে ঘটে, যেমন এই হাদিসটি এবং কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের হাদিস, যা মুসনাদে আহমাদে বিশর আল খাসআমির সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, হাদিস নম্বর (১৮৯৫৭) এবং এই জাতীয় অন্যান্য হাদিস।
- কারযাভী, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৪০। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে, ‘জিহাদ তলাবি’ (আক্রমণাত্মক জিহাদ)-এর এই ব্যাখ্যাগুলো এই বিষয়ে কারযাভীর নিজস্ব ইজতিহাদলব্ধ ফিকহ। তবে যারা নিজেদের ‘আক্রমণাত্মক’ (হুজুমি) জিহাদের সমর্থক মনে করেন, তারা সবাই এই ব্যাখ্যার সাথে একমত নন। তারা মনে করেন যে, কাফিরদের কেবল কাফির হওয়ার কারণেই প্রথমে আক্রমণ করে জিহাদ করা ফরজ, যা তিনি তাঁর বইয়ের অন্যান্য স্থানে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৪০-২৪২।
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৪৩-২৪৫।
- কারযাভী, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৫৯-২৬৬।
- বুখারি (৪৫১৪) এবং ড. কারযাভী এর উল্লেখ করেছেন, পৃষ্ঠা ২৬৬।
- এই শিরোনামের অধীনে যা কিছু আছে, তা মূলত নেওয়া হয়েছে—‘ফিকহুল জিহাদ’, প্রথম খণ্ড, তৃতীয় অধ্যায়, চতুর্থ পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা ২৬৭-৩১৪ এবং তৎপরবর্তী পরিচ্ছেদগুলো থেকে।
- এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ‘তরবারি’ (সাইফ) শব্দটি পবিত্র কুরআনে একবারের জন্যও আসেনি।
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৭১।
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৭৭।
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৭৮।
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৭৮-২৮২।
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৮৩।
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৮৩-২৮৪।
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৮৬ এবং এর ১ নম্বর টীকা।
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৯২।
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৩০০।
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৩০২।
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৩০৭।
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৩০৯। আল্লামা শাইখ ইব্রাহিম আবদুল হামিদের কথার সাথে এটি মিলিয়ে দেখুন, প্রাগুক্ত, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৮৪ এবং তৎপরবর্তী পৃষ্ঠা।
- আহমাদ : ৫১১৫। আহমাদের এর আরও দুটি বর্ণনা রয়েছে (৫১১৪) এবং (৫৬৬৭)। প্রতিটির শব্দে সামান্য পার্থক্য আছে।
- ফিকহুল জিহাদ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩১৬।
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৩২০। আমার মতে, অনেক সূত্র বা সনদের কারণে হাদিস সহিহ হওয়ার বিষয়টি—যদিও পরবর্তীকালের আলিমরা এটি বেশি উল্লেখ করেছেন—গ্রহণের ক্ষেত্রে তাওয়াক্কুফ করা উচিত। কারণ, দুর্বল সূত্রগুলো যত বেশিই হোক না কেন, তা কোনো দুর্বল হাদিসকে গ্রহণযোগ্য করার মতো শক্তি তৈরি করতে পারে না। আর যদি কোনো একটি সূত্র সহিহ হয়, তবে অন্য দুর্বল সূত্রগুলোর সমর্থনের কোনো প্রয়োজনই নেই। সহিহ হাদিসই অন্য সবকিছুর জন্য যথেষ্ট। আল্লাহই ভালো জানেন। এই বিষয়ে ড. আবদুল লতিফ সাইয়িদ আলি সালিহমের একটি মূল্যবান গবেষণা রয়েছে, যার শিরোনাম—“তাহরিমুল আমাল বিল হাদিসিল হাসান ওয়াদ দায়িফ ফিল আহকাম” (বিধানের ক্ষেত্রে হাসান ও যয়িফ হাদিসের ওপর আমল করার নিষেধাজ্ঞা), এটি ২০১৩ সালে আলেকজান্দ্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ থেকে প্রদত্ত একটি পিএইচডি থিসিস।
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৩২৫-৩২৬।
- বুখারি : ২৫, এবং মুসলিম : ২২; শব্দগুলো বুখারি থেকে নেওয়া।
- তা সত্ত্বেও, বর্তমান যুগের কেউ কেউ অনেক কষ্ট করে এবং অনেক সময় ব্যয় করে একটি গবেষণা তৈরি করেছেন, যার উদ্দেশ্য ছিল এই হাদিসটির সনদকে বাতিল ও দুর্বল প্রমাণ করা; দেখুন—মিতওয়াল্লি ইব্রাহিম সালিহ, ‘বুতলানু আকিদাতিল ইকরাহ ফিদ দীন’, কায়রো ২০০৩ (আমার কাছে থাকা সংস্করণটি টাইপরাইটারে কপি করা), এটি ১৬০ পৃষ্ঠারও বেশি একটি দীর্ঘ গবেষণা। এই গবেষণার মূল ভিত্তি ও প্রেরণা ছিল হাদিসের ‘আন নাস’ শব্দটিকে ‘পৃথিবীর সব মানুষ’ হিসেবে ভুল বোঝা। অথচ এই ভুল অর্থ ইসলামের কোনো আলিম কখনোই করেননি, যা মূল লেখার আলোচনা থেকে স্পষ্ট হবে।
- ফিকহুল জিহাদ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩২৭।
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৩২৮। হাদিসের এই অর্থটি হাফিজ ইবনে হাজার তাঁর ‘ফাতহুল বারি’ গ্রন্থে যে ব্যাখ্যাগুলো দিয়েছেন, তারই একটি, যা লেখক এখানে উদ্ধৃত করেছেন।
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৩৩৭।
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৩৩৫। ইবনে তাইমিয়ার এই উদ্ধৃতিটি নেওয়া হয়েছে তাঁর “কায়িদাহ মুখতাসারাহ ফি কিতালিল কুফফার ওয়া মুহাদানাতুহুং ওয়া তাহরিমি কাতলিহিম লিমুজাররাদি কুফরিহিম” (কাফিরদের সাথে যুদ্ধ, চুক্তি এবং কেবল কুফরির কারণে তাদের হত্যা করার নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত নিয়ম) নামক পুস্তিকা থেকে।
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৩৩৬।
- ড. কারযাভী এটি আব্বাস মাহমুদ আল আক্কাদ-এর “হাকায়িকুল ইসলাম ওয়া আবাতিয়্যালু খুসুমিহ” (ইসলামের সত্যতা ও শত্রুদের অসারতা) বই থেকে একটি দীর্ঘ অনুচ্ছেদে (তাঁর বইয়ের পৃষ্ঠা ৩৩১-৩৩৫)-এ উদ্ধৃত করেছেন। আর আমাদের প্রবন্ধের অংশটি ফিকহুল জিহাদ, পৃষ্ঠা ৩৩৩ থেকে নেওয়া।
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৩৬৪।
- প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৩৮৩।







Comments