অস্তিত্ববাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও জবাব || জঁ-পল সার্ত্র

সম্পাদকের প্রাক্-কথন
১৯৪৫ সালের ২৯ অক্টোবর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক মাস পর প্যারিসের ‘ক্লাব ম্যাঁতনঁ’-এ জাঁ-পল সার্ত্র যে বক্তৃতাটি দিয়েছিলেন, পরের বছর সেটিই ‘অস্তিত্ববাদ একটি মানবতাবাদ’ (L’existentialisme est un humanisme) নামে গ্রন্থাকারে বের হয়। রাতারাতি এই ছোট্ট বইটি অস্তিত্ববাদের অঘোষিত ইশতেহারে পরিণত হয়; সার্ত্র হয়ে ওঠেন যুদ্ধোত্তর ইউরোপের সবচেয়ে আলোচিত বুদ্ধিজীবী। সার্ত্রের দর্শনে প্রবেশের সবচেয়ে সুগম দরজা আজও এই লেখাটি। বর্তমান অনুবাদটি সেই বক্তৃতারই বাংলা রূপান্তর।
কিন্তু এই লেখাটি নিয়ে সার্ত্র নিজেই শেষ পর্যন্ত স্বস্তিতে ছিলেন না। দীর্ঘ লেখকজীবনে এটিই তাঁর একমাত্র প্রকাশনা, যা ছাপার অক্ষরে দেখে তিনি প্রকাশ্যে অনুতাপ করেছিলেন। সাধারণ শ্রোতার কাছে নিজের দর্শনকে সহজবোধ্য করতে গিয়ে অনেক জটিল প্রশ্নকে তিনি এখানে অতিসরলীকৃত করেন, যার ফলে পরবর্তী জীবনে এর বেশ কিছু বক্তব্য থেকে তাঁকে সরে আসতে হয়। সেই পরিবর্তনগুলোর কয়েকটির দিকে এখানে শুধু ইঙ্গিত করব।
এই বক্তৃতায় সার্ত্র মানুষের স্বাধীনতাকে শর্তহীন ও নিরঙ্কুশ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর মতে, মানুষ স্বাধীন হতে বাধ্য। তাকে নিজের প্রতিটি কাজের সম্পূর্ণ দায়ভার নিতেই হয়।
কিন্তু পরিণত বয়সে তিনি এই চরম ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী অবস্থান থেকে সরে আসেন। ১৯৬০ সালে তাঁর ‘ক্রিটিক অব ডায়ালেক্টিক্যাল রিজন’ প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থের ভূমিকা ‘সার্চ ফর আ মেথড’ প্রবন্ধে মার্কসবাদের প্রতি তাঁর গভীর আনুগত্য প্রকাশ পায়। মার্কসবাদকে তিনি সেকালের অনতিক্রম্য দর্শন হিসেবে ঘোষণা করেন। আর অস্তিত্ববাদ হয়ে দাঁড়ায় সেই বৃহত্তর দর্শনের ভেতরে থাকা একটি সহায়ক ভাবাদর্শ মাত্র।
এই নতুন পর্বে ব্যক্তির স্বাধীন নির্বাচনের চেয়ে পরিস্থিতি বেশি গুরুত্ব পায়। মানুষের সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা বড় হয়ে ওঠে। পাশাপাশি ঐতিহাসিক ও বস্তুগত সীমাবদ্ধতা এবং সম্পদের অভাব বা ‘স্ক্যার্সিটি’ সামনে আসে। অতীত কর্মের ফলে তৈরি হওয়া জমাটবদ্ধ জড় কাঠামোকেও তিনি তাঁর চিন্তায় যুক্ত করেন। এই জড় কাঠামোর নাম তিনি দিয়েছিলেন ‘প্র্যাকটিকো-ইনার্ট’।
মানুষ ইতিহাস নির্মাণ করে ঠিকই। কিন্তু সেই ইতিহাস নির্মাণের পরিস্থিতি সে নিজে বেছে নিতে পারে না। মার্কসের এই সূত্রটিই তখন সার্ত্রের চিন্তার কেন্দ্রে জায়গা করে নেয়।
‘মানবতাবাদ’ শব্দটির প্রতিও তাঁর মোহ কাটতে থাকে। বিদ্রূপের বিষয়, এই বক্তৃতার আগেই ‘লা নজে’ (বমি) উপন্যাসে তিনি মানবতাবাদের নানা সংস্করণকে তীব্র আক্রমণ করেছিলেন। বক্তৃতার প্রায় দেড় দশক পর, ফ্রাঞ্জ ফানোঁর ‘দ্য রেচেড অব দ্য আর্থ’ (১৯৬১) গ্রন্থের বহুল আলোচিত ভূমিকায় তিনি ইউরোপীয় মানবতাবাদকে সরাসরি উপনিবেশবাদের শোভন মুখোশ হিসেবে চিহ্নিত করেন—যে ইউরোপ মুখে সার্বজনীন মর্যাদার বুলি আওড়ায়, সে-ই উপনিবেশের মানুষকে অমানুষ বানিয়ে রাখে। ‘অস্তিত্ববাদ একটি মানবতাবাদ’ শিরোনামের যে আত্মবিশ্বাসী ঘোষণা, পরবর্তী সার্ত্রের কাছে তা আর নিষ্কণ্টক থাকেনি।
এই বক্তৃতায় সার্ত্র একটি মূল দাবি করেছেন যে, নিজের জন্য কোনো পথ বেছে নেওয়ার মাধ্যমে মানুষ আসলে পুরো মানবজাতির জন্যই সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু দার্শনিক মহলে তাঁর এই যুক্তিটি বরাবরই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। কান্টীয় সার্বজনীনতার এই অনুরণন তাঁর মূল দার্শনিক গ্রন্থ ‘বিং অ্যান্ড নাথিংনেস’-এর (১৯৪৩) সাথে পুরোপুরি খাপ খায় না; সার্ত্র নিজেও পরে এমন ঢালাও নৈতিক সূত্রায়ন থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছেন। তাই একে সার্ত্র-দর্শনের চূড়ান্ত ভাষ্য ভাবার সুযোগ কম। বরং এটি একটি বিশেষ ঐতিহাসিক মুহূর্তের দলিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত এক প্রজন্মের সামনে দাঁড়িয়ে একজন দার্শনিক তাঁর কঠিন দর্শনকে আত্মপক্ষ সমর্থনের ভঙ্গিতে সহজ করে বলছেন।
অস্তিত্ববাদ ও রাজনৈতিক সক্রিয়তার সুবাদে সার্ত্র জনপ্রিয় হলেও তাঁর প্রকৃত দার্শনিক গভীরতার পরিচয় মেলে তারুণ্যের একটি ছোট্ট রচনায় যার শিরোনাম ‘দ্য ট্রান্সেন্ডেন্স অব দ্য ইগো’ (১৯৩৬)। হুসার্লের ফেনোমেনোলজির সাথে তীব্র বোঝাপড়ার ফসল এই প্রবন্ধে তিনি দেখান, চেতনার ভেতরে ‘অহং’ বা ‘আমি’ নামের কোনো স্থায়ী সত্তা বাস করে না; অহং বরং চেতনার বাইরে জগতের অন্য সব বস্তুর মতোই একটি বস্তু, যা কেবল প্রতিফলনমূলক চিন্তার মুহূর্তে ধরা দেয়। চেতনা নিজে স্বচ্ছ, নৈর্ব্যক্তিক ও শূন্য—ঠিক এই শূন্যতাই মানুষের নিরঙ্কুশ স্বাধীনতার উৎস। ‘বিং অ্যান্ড নাথিংনেস’-এর গোটা কাঠামো এই ছোট্ট রচনার ভিতের ওপরেই দাঁড়িয়ে। এখানে একটি বৈপরীত্যও দৃশ্যমান: বর্তমান বক্তৃতায় সার্ত্র দেকার্তের ‘আমি চিন্তা করি’-কে তাঁর দর্শনের যাত্রাবিন্দু বলে ঘোষণা করছেন, অথচ ১৯৩৬ সালের রচনায় তিনি দেখিয়েছিলেন, চিন্তার আদিতম স্তরে কোনো ‘আমি’-রই দেখা মেলে না। এই বৈপরীত্যই স্পষ্ট করে দেয় বক্তৃতাটি তাঁর দর্শনের কতখানি সরলীকৃত সংস্করণ।
অবশ্য এর আবেদন আজও ফুরোয়নি। স্বাধীনতা, দায়, উৎকণ্ঠা, আত্মপ্রবঞ্চনা আর অজুহাতহীন জীবনযাপনের যেসব প্রশ্ন সার্ত্র এখানে তুলেছেন, সমকালেও তার ধার একটুও কমেনি। অনুবাদটি সেই প্রশ্নগুলোরই একটি প্রত্যক্ষ মুখোমুখি হওয়ার পরিসর।
প্রাসঙ্গিক পাঠ:
১. দ্য ট্রান্সেন্ডেন্স অব দ্য ইগো (১৯৩৬): এটি সার্ত্রের দর্শনের মূল ভিত্তি। এই বইয়ে তিনি দেখিয়েছেন, মানুষের চেতনা সম্পূর্ণ নৈর্ব্যক্তিক। অর্থাৎ, চেতনার ভেতরে আগে থেকে কোনো ‘আমি’ বা অহংবোধ লুকিয়ে থাকে না।
২. বিং অ্যান্ড নাথিংনেস (১৯৪৩): এটি সার্ত্রের সবচেয়ে বড় এবং মূল দার্শনিক গ্রন্থ। এই বইয়ের মূল কথা হলো, সত্তা বা অস্তিত্ব দুই ধরনের। প্রথমটি হলো ‘নিজের-মধ্যে-সত্তা’, যা মূলত জড় বস্তু। জড় বস্তু যেমন আছে ঠিক তেমনই থাকে। দ্বিতীয়টি হলো ‘নিজের-জন্য-সত্তা’, যা আসলে মানুষের চেতনা। এই চেতনা এক ধরনের শূন্যতা, যা কখনোই স্থির থাকে না। চেতনার এই শূন্যতা থেকেই জন্ম নেয় মানুষের চরম স্বাধীনতা, বেঁচে থাকার উৎকণ্ঠা এবং আত্মপ্রবঞ্চনার মতো বিষয়গুলো। পাশাপাশি, অন্যের দৃষ্টিতে মানুষের অস্তিত্ব কেমন হয়, তার বিশ্লেষণও এই শূন্যতার ধারণা থেকেই আসে।
৩. সার্চ ফর আ মেথড (১৯৫৭): এই গ্রন্থে সার্ত্র মার্কসবাদকে সেকালের সবচেয়ে শক্তিশালী দর্শন হিসেবে মেনে নেন। কিন্তু তাঁর উদ্দেশ্য ছিল মার্কসবাদের ভেতরে ব্যক্তিমানুষের নিজস্ব অভিজ্ঞতাকে ফিরিয়ে আনা। এখানে তিনি ছকে-বাঁধা ও যান্ত্রিক মার্কসবাদের তীব্র সমালোচনা করেন। সমাজ ও মানুষকে বোঝার জন্য তিনি ‘প্রগ্রেসিভ-রিগ্রেসিভ’ নামের একটি নতুন পদ্ধতির প্রস্তাব দেন। এই পদ্ধতি অনুযায়ী, একজন মানুষকে বুঝতে হলে দুটি দিক থেকে বিচার করতে হবে। প্রথমত, তাকে তার সমাজ ও ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে, যা হলো ‘রিগ্রেসিভ’ বা পেছনের দিক। দ্বিতীয়ত, দেখতে হবে সে কীভাবে এই সামাজিক সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে ভবিষ্যতের দিকে নিজের লক্ষ্য ঠিক করছে, যা হলো ‘প্রগ্রেসিভ’ বা সামনের দিক।
৪. ক্রিটিক অব ডায়ালেক্টিক্যাল রিজন (১৯৬০): এই বইটিতে সার্ত্র ইতিহাস ও সমাজের ব্যাখ্যায় অস্তিত্ববাদ এবং মার্কসবাদকে একীভূত করেন। এখানে তিনি সম্পদের অভাব এবং অতীত কর্মের জড় কাঠামোর মতো বেশ কিছু ধারণা তুলে ধরেন। পাশাপাশি তিনি বিচ্ছিন্ন মানুষের ভিড়কে বলেছেন ‘সিরিয়ালিটি’। আর কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ বিদ্রোহী জনতাকে বলেছেন ‘ফিউজড গ্রুপ’। এই ধারণাগুলোর সাহায্যে তিনি দেখিয়েছেন, মানুষ তার নিজের প্রয়োজনে স্বাধীনভাবে অনেক কিছু তৈরি করে বা নতুন ব্যবস্থা চালু করে। কিন্তু একটা সময় পর সেই তৈরি করা জিনিসগুলোই মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তখন সেগুলোই উল্টো মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।
অস্তিত্ববাদের বিরুদ্ধে এযাবৎ যত অভিযোগ উঠেছে, তার একটি যুক্তিসঙ্গত জবাব দেওয়া বা এই দর্শনের পক্ষসমর্থন করাই আমার বর্তমান আলোচনার মূল উদ্দেশ্য।
প্রথম অভিযোগটি হলো, এই দর্শন মানুষকে এক ধরনের হতাশাপূর্ণ নিষ্ক্রিয়তার দিকে প্ররোচিত করে। সমালোচকদের যুক্তি হলো— সমাধানের সব রাস্তাই যদি রুদ্ধ থাকে, তবে পৃথিবীতে মানুষের যেকোনো কাজই সম্পূর্ণ অর্থহীন ও নিষ্ফল মনে হবে; ফলে মানুষ অবধারিতভাবেই একপ্রকার চিন্তাবিলাসী দর্শনের আশ্রয়ে নিপতিত হবে। তা ছাড়া, এই ধ্যানমগ্নতা বা চিন্তাবিলাস যেহেতু একপ্রকার বিলাসিতা ছাড়া আর কিছু নয়, তাই শেষ পর্যন্ত এটি নিছক আরেকটি বুর্জোয়া দর্শনে পরিণত হতে বাধ্য। বলাই বাহুল্য, কমিউনিস্টদের দিক থেকেই এই অভিযোগটি সবচেয়ে জোরালোভাবে আসে।
ভিন্ন আরেকটি শিবির থেকেও আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়। তাঁদের বক্তব্য হলো, মানব-অস্তিত্বের যা কিছু হীন ও কদর্য, আমরা কেবল তার ওপরেই জোর দিয়েছি। মানুষের স্বভাবের যে একটি উজ্জ্বল দিক রয়েছে, যেখানে সৌন্দর্য ও মাধুর্যের বাস, তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে আমরা কেবল মানুষের নীচতা, মলিনতা আর জঘন্যতাকেই বড় করে দেখিয়েছি। যেমন, ক্যাথলিক সমালোচক মাদমোয়াজেল মার্সিয়ে তো বলেই বসলেন— একটি শিশু কীভাবে হাসে, সে কথাটি আমরা নাকি একেবারে ভুলেই গেছি!
ক্যাথলিক এবং কমিউনিস্ট— উভয় শিবির থেকেই আমাদের বিরুদ্ধে আরেকটি বড় অভিযোগ হলো, আমরা মানুষের পারস্পরিক সংহতির বিষয়টি ধর্তব্যের মধ্যেই আনিনি; বরং মানুষকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন সত্তা হিসেবেই বিবেচনা করেছি।
কমিউনিস্টদের ভাষ্যমতে, এমনটা ঘটার কারণ, আমরা মতবাদটিকে সম্পূর্ণ ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার (সাবজেক্টিভিটি) ওপর দাঁড় করিয়েছি। আরো স্পষ্ট করে বললে, দেকার্তের সেই বিখ্যাত সূত্র ‘আমি চিন্তা করি’ (I think) থেকেই আমাদের যাত্রার সূত্রপাত। এটি হলো সেই বিন্দু, যেখানে নিঃসঙ্গ মানুষ কেবল নিজের সত্তার নাগাল পায়। কিন্তু মুশকিল হলো, একবার এই অবস্থানে পৌঁছালে নিজের বৃত্তের বাইরের মানুষদের সাথে নতুন করে সংহতি গড়ে তোলা একপ্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। কেবল নিজের অস্তিত্ববোধের (cogito) মারফতে ব্যক্তিসত্তা কখনো অন্যের জগতে প্রবেশ করতে পারে না।
খ্রিষ্টানদের তরফ থেকে অভিযোগ করা হয়, আমরা মানবজীবনের বাস্তবতা এবং এর অন্তর্নিহিত গাম্ভীর্যকে অস্বীকার করি। তাদের যুক্তি হলো, আমরা যেহেতু ঈশ্বরের অনুশাসন ও শাশ্বত যাবতীয় মূল্যবোধকে উপেক্ষা করি, তাই মানুষের ইচ্ছাপ্রসূত সিদ্ধান্ত ছাড়া জগতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। ফলে প্রতিটি মানুষ নিজের মর্জিমাফিক যা খুশি করার স্বাধীনতা পেয়ে যায়। আর এই অবস্থান থেকে বিচার করলে, অন্য কারো দৃষ্টিভঙ্গি বা কাজকে দোষারোপ বা নিন্দা করার ক্ষমতা আর কারো থাকে না।
আজ আমি মূলত এই বিবিধ অভিযোগগুলোরই জবাব দেওয়ার চেষ্টা করব। আর সে কারণেই আমার এই নাতিদীর্ঘ আলোচনার শিরোনাম দিয়েছি ‘অস্তিত্ববাদ একটি মানবতাবাদ’। মানবতাবাদের উল্লেখ দেখে অনেকেই হয়তো বিস্মিত হবেন, কিন্তু শব্দটি আমরা ঠিক কোন অর্থে ব্যবহার করছি, তা মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করব। শুরুতেই বলে রাখা ভালো, আমরা যে অর্থে শব্দটি ব্যবহার করছি, তাতে অস্তিত্ববাদ মানবজীবনকে সম্ভবপর করে তোলে। এটি এমন একটি মতবাদ যা প্রতিষ্ঠা করে যে, প্রতিটি সত্য এবং কাজের পেছনে নির্দিষ্ট পরিবেশ ও মানুষের আত্মসচেতনতা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে।
আমাদের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ হলো, আমরা মানবজীবনের মন্দ দিকটির ওপর অতিরিক্ত জোর দিই। সম্প্রতি এক ভদ্রমহিলার কথা আমার কানে এসেছে। স্নায়বিক চাপের মুহূর্তে মুখ ফসকে কোনো অশ্লীল শব্দ উচ্চারণ করে ফেললেই আত্মপক্ষ সমর্থন করে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় আমি একজন অস্তিত্ববাদী হয়ে যাচ্ছি।’ মনে হচ্ছে, যাবতীয় কদর্যতাকেই অস্তিত্ববাদের সমার্থক ধরে নেওয়া হচ্ছে। এ কারণেই কেউ কেউ আমাদের ‘প্রকৃতিবাদী’ আখ্যা দেন। আমরা যদি তা-ই হই, তবে এটা দেখে অবাক হতে হয় যে, আমরা তাদের কতটা ক্ষুব্ধ ও আতঙ্কিত করি। অথচ আজকাল প্রকৃত অর্থে যাকে প্রকৃতিবাদ বলা হয়, তা দেখে কেউ খুব একটা ভয় পান বা অপমানিত বোধ করেন বলে মনে হয় না। এমিল জোলার ‘লা তের’-এর মতো উপন্যাস যারা অনায়াসেই হজম করতে পারেন, একটি অস্তিত্ববাদী উপন্যাস পড়া মাত্রই তাদের গা গুলায়। যারা সাধারণ মানুষের লোকায়ত প্রজ্ঞার দোহাই দেন, যে প্রজ্ঞা মূলত এক ধরনের বিষাদগ্রস্ত প্রজ্ঞা, তারা আমাদের দর্শনকে আরও বেশি বিষাদময় বলে মনে করেন। অথচ, ‘আগে ঘর তবে তো পর’ কিংবা ‘দুরজনকে প্রশ্রয় দিলে সে মাথায় চড়বে, আর দাবিয়ে রাখলে সে বশ্যতা স্বীকার করবে’ গোছের প্রবাদগুলোর চেয়ে মোহমুক্ত আর কী হতে পারে?
আমরা সবাই জানি এই প্রসঙ্গে ঠিক কতগুলো লোকপ্রবাদ তুলে ধরা সম্ভব। আর এগুলোর সবকটিরই সারমর্ম প্রায় একই রকম। যেমন, প্রচলিত ক্ষমতার কখনোই বিরোধিতা করতে নেই; নিজের চেয়ে বড় শক্তির সাথে কখনো লড়তে নেই; নিজের সীমানার বাইরের কোনো বিষয়ে নাক গলাতে নেই। অথবা, প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী না হলে কোনো কাজ নেহায়েত ভাববিলাস ছাড়া আর কিছু নয়। কিংবা প্রমাণিত অভিজ্ঞতার সমর্থন নেই এমন যেকোনো উদ্যোগ নিশ্চিতভাবেই ব্যর্থ হতে বাধ্য। অভিজ্ঞতা যেহেতু দেখিয়েছে মানুষ স্বভাবতই মন্দের দিকে ধাবিত হয়, তাই তাদের দমন করতে কঠোর নিয়ম বাধ্যতামূলক, অন্যথায় সমাজে নৈরাজ্য দেখা দেবে।
অথচ যেসব মানুষ সারাক্ষণ এমন নৈরাশ্যজনক প্রবাদ আওড়ান এবং ন্যক্কারজনক ঘটনা শুনলেই বলে ওঠেন ‘এটাই তো মানুষের স্বভাব!’, বাস্তবতার দোহাই দেওয়া সেই মানুষগুলোই আবার অভিযোগ করেন যে অস্তিত্ববাদ জীবনকে অত্যন্ত অন্ধকারাচ্ছন্নভাবে তুলে ধরে। সত্য বলতে কি, তাদের এই মাত্রাতিরিক্ত প্রতিবাদ আমাকে এই সন্দেহের দিকেই ঠেলে দেয় যে, আমাদের নৈরাশ্যবাদ তাদের ততটা বিরক্ত করছে না, যতটা করছে আমাদের আশাবাদ। কারণ, যে মতবাদটি আজ আপনাদের সামনে ব্যাখ্যা করব, তার একেবারে মূলে সবচেয়ে ভীতিকর ব্যাপারটি হলো, এটি মানুষকে তার নিজের পছন্দের বা নির্বাচনের স্বাধীনতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। বিষয়টি যাচাই করার জন্য আসুন পুরো প্রশ্নটি কঠোর দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করি। তাহলে, এই যে আমরা যাকে অস্তিত্ববাদ বলছি, আসলে জিনিসটা কী?
আজকাল যারা শব্দটি হরহামেশা ব্যবহার করছেন, তাদের বেশির ভাগকেই এর অর্থ বুঝিয়ে বলতে বললে রীতিমতো বিভ্রান্তিতে পড়বেন। কারণ শব্দটি এখন রীতিমতো ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে; মানুষ বেশ উল্লসিত হয়েই এই সুরকার কিংবা ওই চিত্রশিল্পীকে ‘অস্তিত্ববাদী’ বলে ঘোষণা দিচ্ছে। ‘ক্লার্তে’ পত্রিকার একজন কলামিস্ট তো নিজের নামের নিচেই ‘দি এক্সিসটেনশিয়ালিস্ট’ স্বাক্ষর করছেন। বস্তুত, শব্দটি আজকাল এত ঢালাওভাবে এত বিচিত্র সব ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে যে, এর নিজস্ব আর কোনো অর্থই অবশিষ্ট নেই। মনে হচ্ছে যেন পরাবাস্তববাদের মতো কোনো আনকোরা নতুন মতবাদের অভাবে, যারা হাল আমলের যেকোনো হুজুগ বা আন্দোলনে গা ভাসাতে উদগ্রীব, তারা এখন এই দর্শনের ওপরেই ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। অথচ তাদের নিজ নিজ উদ্দেশ্য সাধনের মতো কোনো রসদই এই দর্শনে নেই। কারণ সত্য বলতে কী, সমস্ত মতাদর্শের মধ্যে এটিই হলো সবচেয়ে কম হুজুগে; এটি কঠোরভাবে কেবল দার্শনিক আর বিশেষজ্ঞদের জন্যই উদ্দিষ্ট। তা সত্ত্বেও, বিষয়টির একটি সহজ সংজ্ঞা দাঁড় করানো সম্ভব।
প্রশ্নটি জটিল আকার ধারণ করেছে মূলত একটি কারণে, তা হলো অস্তিত্ববাদীরা আসলে দুই প্রকারের। একপক্ষে রয়েছেন খ্রিষ্টান অস্তিত্ববাদীরা, যাঁদের মধ্যে আমি কার্ল জ্যাসপার্স এবং গ্যাব্রিয়েল মার্সেলের নাম করব, যাঁরা উভয়েই ঘোষিত ক্যাথলিক। অন্যদিকে রয়েছেন নাস্তিক অস্তিত্ববাদীরা, যাঁদের সারিতে হাইডেগারের পাশাপাশি ফরাসি অস্তিত্ববাদীদের এবং আমাকেও স্থান দিতে হবে। এই দুই পক্ষের মধ্যে একমাত্র মিল হলো, তাঁরা উভয়েই বিশ্বাস করেন যে সারসত্তার (Essence) পূর্বে অস্তিত্বের (Existence) আগমন ঘটে, কিংবা আপনি যদি এভাবে বলতে চান, আমাদের যাত্রা শুরু করতে হবে সাবজেক্টিভিটি থেকে। কথাটির মধ্য দিয়ে আমরা ঠিক কী বোঝাতে চাইছি?
আমরা যদি মানুষের তৈরি কোনো জিনিসের কথা ধরি, ধরা যাক একটি বই কিংবা একটি কাগজ কাটার ছুরি, তাহলে আমরা দেখব যে এটি এমন একজন কারিগরের হাতে তৈরি হয়েছে, যার মনে জিনিসটি সম্পর্কে পূর্ব থেকেই একটি স্পষ্ট ধারণা ছিল। তিনি ওই ছুরির ধারণার প্রতি যতটা মনোযোগ দিয়েছেন, ঠিক ততটাই মনোযোগ দিয়েছেন তা উৎপাদনের পূর্বনির্ধারিত কলাকৌশলের প্রতিও, যা মূলত ওই ধারণারই অংশ এবং এক অর্থে একটি সূত্র। সুতরাং এই পেপার-নাইফ জিনিসটি একই সাথে নির্দিষ্ট উপায়ে উৎপাদনযোগ্য একটি বস্তু এবং অন্যদিকে তা একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যও সাধন করে। কারণ, একজন মানুষ একটি পেপার-নাইফ তৈরি করে ফেলবে অথচ সে নিজেই জানে না জিনিসটা কী কাজে লাগবে, এমনটা তো আর ভাবা যায় না। তাহলে পেপার-নাইফটির বিষয়ে এ কথা আমরা বলতেই পারি যে এর সারসত্তা, অর্থাৎ ওই সূত্র আর গুণাবলির সমষ্টি, যা এর উৎপাদন এবং সংজ্ঞায়নকে সম্ভব করেছে, তা তার অস্তিত্বের পূর্বেই বর্তমান ছিল। এভাবে আমার চোখের সামনে একটি নির্দিষ্ট পেপার-নাইফ বা বইয়ের উপস্থিতি আগে থেকেই নির্ধারিত। এ ক্ষেত্রে আমরা জগৎটাকে দেখছি একটি কারিগরি দৃষ্টিকোণ থেকে, আর আমরা বলতে পারি যে, অস্তিত্বের আগে আসে উৎপাদন।
ঈশ্বরকে যখন আমরা স্রষ্টা হিসেবে কল্পনা করি, তখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাঁকে আমরা একজন অতিজাগতিক কারিগর হিসেবেই ধরে নিই। আমরা যে মতবাদই বিবেচনা করি না কেন, তা দেকার্তেরই হোক বা স্বয়ং লাইবনিজেরই হোক, আমরা সবসময়ই এ কথাটি ধরে নিই যে, ইচ্ছা বা সংকল্পের জন্ম হয় বোধ থেকে, বা অন্ততপক্ষে তা বোধের অনুগামী হয়েই থাকে। ফলে ঈশ্বর যখন সৃষ্টি করেন, তিনি ঠিক কী সৃষ্টি করছেন সে সম্পর্কে তাঁর নির্ভুল জ্ঞান থাকে। সুতরাং, ঈশ্বরের মনে মানুষের যে ধারণা, তা ওই কারিগরের মনে থাকা পেপার-নাইফের ধারণার সাথেই তুলনীয়। কারিগর যেমন একটি নির্দিষ্ট সংজ্ঞা ও সূত্র মেনে পেপার-নাইফ উৎপাদন করে, ঈশ্বরও ঠিক তেমনি একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া ও ধারণা অনুসরণ করে মানুষ সৃষ্টি করেন। এভাবেই প্রতিটি একক মানুষ হয়ে ওঠে সেই নির্দিষ্ট ধারণারই বাস্তব রূপ, যে ধারণা খোদ ঈশ্বরের বোধের ভেতরেই বিরাজমান।
আঠারো শতকের দার্শনিক নাস্তিকতায় ঈশ্বরের ধারণাকে বাতিল করে দেওয়া হলেও, ‘অস্তিত্বের আগে সারসত্তা’, এই ধারণাটিকে কিন্তু কোনোভাবেই ছুঁড়ে ফেলা হয়নি। দিদেরো, ভলতেয়ার, এমনকি কান্টের দর্শনেও এই চিন্তার কিছু না কিছু রেশ আমরা সবখানেই দেখতে পাই। মানুষ মাত্রই একটি মানব-প্রকৃতির অধিকারী; এই ‘মানব-প্রকৃতি’ বা মানুষ সম্পর্কে এই মূল ধারণাটি প্রতিটি মানুষের মাঝেই নিহিত থাকে। এর অর্থ দাঁড়ায়, প্রতিটি মানুষই হলো একটি সার্বজনীন ধারণার, অর্থাৎ ‘মানুষ’ নামক ধারণার একেকটি নির্দিষ্ট দৃষ্টান্ত। কান্টের দর্শনে এই সার্বজনীনতা এতদূর পর্যন্ত গড়িয়েছে যে, জঙ্গলের বন্য মানুষ, প্রকৃতির আদিম অবস্থায় থাকা মানুষ এবং শহুরে বুর্জোয়া, সবাই একই সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত এবং সকলের মৌলিক গুণাবলিও অভিন্ন। এখানেও সেই একই ব্যাপার, অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমরা যে ঐতিহাসিক অস্তিত্বের মুখোমুখি হই, মানুষের সারসত্তা তার পূর্বেই বিদ্যমান থাকে।
আমি যে নাস্তিক্যবাদী অস্তিত্ববাদের প্রতিনিধিত্ব করি, তা অত্যন্ত সুসংগতভাবেই এই ঘোষণা প্রদান করে যে, ঈশ্বরের অস্তিত্ব যদি না-ও থাকে, এ জগতে অন্তত এমন একটি সত্তার অবির্ভাব ঘটেছে যার অস্তিত্ব তার সারসত্তার (Essence) পূর্বে বিরাজমান; এমন একটি সত্তা, যাকে কোনো নির্দিষ্ট ধারণার ছাঁচে ফেলে সংজ্ঞায়িত করার পূর্বেই সে অস্তিত্বশীল হয়ে ওঠে। সেই সত্তাটি হলো মানুষ, অথবা হাইডেগারের ভাষায় যাকে বলা যায় মানবীয় বাস্তবতা।
অস্তিত্ব সারসত্তার আগে আসে, এ কথার প্রকৃত অর্থ কী? এর অর্থ হলো, মানুষ সর্বাগ্রে পৃথিবীতে অস্তিত্ব লাভ করে, নিজের মুখোমুখি দাঁড়ায়, এই জগতে তার আকস্মিক স্ফুরণ ঘটে এবং ঠিক তার পরেই সে নিজেকে সংজ্ঞায়িত করে। অস্তিত্ববাদীদের দৃষ্টিতে মানুষকে যদি গোড়াতেই সংজ্ঞায়িত করা না যায়, তার কারণ হলো আদতে সে একটি শূন্যতা বৈ কিছু নয়। পরবর্তীতে সে নিজেকে যা হিসেবে গড়ে তুলবে, সে ঠিক তা-ই হয়ে উঠবে। সুতরাং, পূর্বনির্ধারিত ‘মানব-প্রকৃতি’ বলতে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই, কারণ তা পূর্বে থেকে ধারণা করার মতো কোনো ঈশ্বরও নেই। মানুষ কেবলই অস্তিত্বশীল। মানুষ নিজেকে যা বলে ধারণা করে সে কেবল তা-ই নয়, বরং সে তা-ই যা সে হতে সংকল্প করে। অস্তিত্বের অভিমুখে উল্লম্ফনের পর সে নিজেকে যা হিসেবে কামনা করে, মানুষ তা-ই। মানুষ নিজেকে যা বানায়, সে তা ছাড়া অন্য কিছুই নয়। এটিই অস্তিত্ববাদের পয়লা নম্বর নীতি।
আর একেই লোকে আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সুর তুলে ‘সাবজেক্টিভিটি’ আখ্যা দিয়ে থাকে। কিন্তু এই কথার মধ্য দিয়ে আমরা কি বস্তুত এটাই প্রমাণ করি না যে, একটি পাথরখণ্ড কিংবা টেবিলের তুলনায় মানুষের মর্যাদা ঢের বেশি? আমরা মূলত এ কথাই বলতে চাই যে, মানুষের অস্তিত্বই হলো প্রাথমিক, মানুষ সর্বাগ্রে এমন একটি সত্তা যা নিজেকে ভবিষ্যতের দিকে নিক্ষেপ করে এবং সে যে এই কাজটি করছে, সে বিষয়ে সে সম্পূর্ণ সজাগ। মানুষ প্রকৃতপক্ষে একটি চলমান প্রকল্প, যার রয়েছে একটি আত্মসচেতন জীবন; সে কোনো শেওলা, ছত্রাক কিংবা ফুলকপি নয়। নিজের এই অভিক্ষেপের পূর্বে কোনো কিছুরই অস্তিত্ব নেই; এমনকি বুদ্ধিবৃত্তিক স্বর্গেও নয়। মানুষ কেবল তখনই অস্তিত্ব লাভ করবে, যখন সে নিজের উদ্দেশ্যকে বাস্তবে রূপায়ণ করতে পারবে।
তবে তা নিছক ইচ্ছা করার ব্যাপার নয়। কারণ ইচ্ছা করা বা সংকল্প করা বলতে আমরা সচরাচর যা বুঝি, তা হলো এক ধরনের সচেতন সিদ্ধান্ত, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা গ্রহণ করি নিজেকে একটি নির্দিষ্ট আকার দেওয়ার পর। আমি হয়তো কোনো রাজনৈতিক দলে যোগদান করতে, একটি গ্রন্থ রচনা করতে কিংবা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে ইচ্ছা প্রকাশ করতে পারি, কিন্তু এসব ক্ষেত্রে যাকে আমার ইচ্ছা বলা হচ্ছে, তা সম্ভবত এর চেয়েও প্রাথমিক এবং স্বতঃস্ফূর্ত কোনো সিদ্ধান্তের একটি বাহ্যিক প্রকাশ মাত্র। তবে, অস্তিত্ব যে সারসত্তার আগে আসে, এ কথা যদি অকাট্য হয়, তবে মানুষ সে যা, তার সম্পূর্ণ দায়ভার তার নিজের। সুতরাং, অস্তিত্ববাদের প্রথম কার্যকর দিকটি হলো, এটি প্রত্যেকটি মানুষকে তার নিজের সম্পূর্ণ আয়ত্তে সমর্পণ করে এবং তার অস্তিত্বের তাবৎ দায়দায়িত্ব সরাসরি তার নিজ কাঁধেই ন্যস্ত করে। আর যখন আমরা বলি মানুষ নিজের জন্য নিজেই দায়ী, তখন এর অর্থ কেবল এই নয় যে সে তার ব্যক্তিসত্তার জন্যই দায়ী; বরং সে সমগ্র মানবজাতির জন্যই দায়ী।
‘সাবজেক্টিভিজম’ কথাটিকে দুটি ভিন্ন অর্থে অনুধাবন করতে হবে, আর আমাদের প্রতিপক্ষ ধূর্ততার সাথে এর কেবল একটি অর্থ নিয়েই খেলায় মেতে ওঠে। শব্দটি দিয়ে একদিকে বোঝায় ব্যক্তিমানুষের স্বাধীনতা, অন্যদিকে বোঝায় যে, মানুষ মানবীয় আত্মসচেতনতার গণ্ডি অতিক্রম করতে অক্ষম। এই দ্বিতীয় অর্থটিই হলো অস্তিত্ববাদের সবচেয়ে গভীর তাৎপর্য।
যখন আমরা বলি মানুষ নিজেকে নিজেই নির্বাচন করে, তখন আমরা বোঝাই যে আমাদের প্রত্যেককেই নিজের পথ নিজেকে বেছে নিতে হবে; কিন্তু সেই সাথে আমরা এ-ও বোঝাতে চাই যে, নিজের জন্য কোনো পথ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সে আসলে সমগ্র মানবজাতির জন্যই পথ নির্বাচন করে। কারণ বাস্তবে, একজন মানুষ নিজেকে নিজের ইচ্ছামাফিক গড়ে তোলার জন্য যে পদক্ষেপই গ্রহণ করুক না কেন, একই সাথে তা এমন একটি মানুষের প্রতিচ্ছবিও নির্মাণ করে, একজন মানুষের ঠিক যেমন হওয়া উচিত বলে সে বিশ্বাস করে। এটা বা ওটার মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নেওয়ার অর্থ হলো, আমরা যা বেছে নিচ্ছি তার মূল্যমানকেও একই সাথে সগর্বে স্বীকার করে নেওয়া; কারণ আমরা কখনোই নিকৃষ্টতর জিনিসটি বেছে নিতে পারি না। আমরা সর্বদা উৎকৃষ্টতর জিনিসটিই বেছে নিই; আর কোনো কিছুই আমাদের জন্য উৎকৃষ্ট হতে পারে না, যদি না তা সকলের জন্য উৎকৃষ্ট হয়।
অধিকন্তু, অস্তিত্ব যদি সারসত্তার আগে আসে এবং নিজেদের প্রতিচ্ছবি নির্মাণের সাথে সাথেই যদি আমরা অস্তিত্বশীল হতে সংকল্পবদ্ধ হই, তবে আমাদের নির্মিত সেই প্রতিচ্ছবি সকলের জন্য এবং আমাদের নিজস্ব কালখণ্ডের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। সুতরাং, আমাদের দায়বদ্ধতা আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী, কারণ এটি সমগ্র মানবজাতিকে ঘিরেই আবর্তিত। দৃষ্টান্তস্বরূপ, আমি যদি একজন শ্রমিক হই, তবে আমি হয়তো কমিউনিস্টদের কোনো ট্রেড ইউনিয়নে যোগ না দিয়ে একটি খ্রিষ্টান ট্রেড ইউনিয়নে যোগদান করাটাই বেছে নিতে পারি। আর এই যোগদানের মধ্য দিয়ে আমি যদি এই বার্তাটি জ্ঞাপন করতে চাই যে, ভাগ্যের হাতে আত্মসমর্পণ করাই হলো মানুষের জন্য সবচেয়ে শোভনীয় আচরণ, কারণ মানুষের আসল রাজত্ব এই পৃথিবীতে নয়, তবে আমি কেবল নিজেকেই এই মতাদর্শের সাথে আবদ্ধ করলাম না। এই আত্মসমর্পণকে আমি সকলের জন্য আমার স্বীয় ইচ্ছা হিসেবেই সাব্যস্ত করলাম এবং ফলস্বরূপ, আমার এই কাজটি হয়ে দাঁড়াল সমগ্র মানবজাতির পক্ষ থেকে গৃহীত একটি অঙ্গীকার।
অথবা, যদি আরও ব্যক্তিগত একটি দৃষ্টান্ত হাজির করি, আমি যদি বিবাহ করার এবং সন্তান গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিই, এই সিদ্ধান্তটি যদিও কেবল আমার নিজস্ব পরিস্থিতি, আমার আবেগ বা আমার ব্যক্তিগত বাসনা থেকেই উদ্ভূত, তদুপরি এর মধ্য দিয়ে আমি কেবল নিজেকেই নয়, বরং সমগ্র মানবজাতিকেই একগামী প্রথার অনুশীলনের সাথে যুক্ত করছি। এভাবেই আমি আমার নিজের জন্য এবং অন্য সকল মানুষের জন্য দায়বদ্ধ। আমি ঠিক যেমনটি কামনা করি, মানুষের তেমনই একটি সুনির্দিষ্ট প্রতিচ্ছবি আমি নির্মাণ করছি। নিজেকে গঠন করার মধ্য দিয়ে আমি বস্তুত মানুষকেই গঠন করছি।
এর মধ্য দিয়ে আমরা হয়তো উৎকণ্ঠা, নিঃসঙ্গতা কিংবা হতাশার মতো খানিকটা গালভরা শব্দগুলোর প্রকৃত অর্থ অনুধাবন করতে সক্ষম হব। আপনারা অচিরেই দেখতে পাবেন যে, বিষয়টা আসলে অত্যন্ত সোজা।
প্রথমেই প্রশ্ন আসে, উৎকণ্ঠা বলতে আমরা কী বুঝি? অস্তিত্ববাদীরা অকপটে স্বীকার করেন যে, মানুষ সর্বদা উৎকণ্ঠার ভেতরেই বসবাস করে। এর অন্তর্নিহিত অর্থটি হলো, যখন কোনো মানুষ কোনো নির্দিষ্ট কাজের প্রতি নিজেকে দায়বদ্ধ করে এবং সে পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারে যে, সে কেবল নিজের ভবিষ্যৎই নির্বাচন করছে না, বরং সেই সাথে সমগ্র মানবজাতির জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী একজন আইনপ্রণেতার ভূমিকায়ও অবতীর্ণ হচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে এই বড় দায়িত্ববোধের হাত থেকে তার নিস্তার পাওয়ার কোনো উপায় থাকে না। এ কথা সত্য যে, অনেকেই এমন কোনো উদ্বেগের লক্ষণ প্রকাশ করেন না। কিন্তু আমরা জোর দিয়ে বলতে চাই যে, তারা মূলত নিজেদের উৎকণ্ঠাকে আড়াল করছেন অথবা তার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। নিশ্চিতভাবেই বহু মানুষ মনে করেন, তারা যা করছেন তার ফলে অন্য কারও ওপর কোনো দায় বর্তাচ্ছে না, বরং তারা কেবল নিজেদেরই জড়াচ্ছেন। আর যদি তাদের জিজ্ঞেস করা হয়, সবাই যদি এমনটা করত তবে কী হতো, তখন তারা কাঁধ ঝাঁকিয়ে নির্লিপ্তভাবে উত্তর দেন, সবাই তো আর এমনটা করছে না।
কিন্তু প্রত্যেকেরই নিজেকে সর্বদা এই প্রশ্নটি করা উচিত যে, সে যা করছে সবাই যদি ঠিক তা-ই করত তবে পরিণতি কী দাঁড়াত। এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনার আশ্রয় নেওয়া ছাড়া এই অস্বস্তিকর চিন্তার হাত থেকে কারও নিস্তার পাওয়ার কোনো পথ খোলা নেই। যে ব্যক্তি আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে ‘সবাই তো আর এমনটা করবে না’ বলে মিথ্যার আশ্রয় নেয়, নিশ্চিতভাবেই তার বিবেক তাকে শান্তিতে থাকতে দেয় না; কারণ মিথ্যা বলার এই কাজটি এমন একটি সার্বজনীন মূল্যবোধকেই নির্দেশ করে, যাকে সে নিজেই আবার অস্বীকার করছে। এই ছদ্মবেশের আড়ালেই তার অন্তর্নিহিত উৎকণ্ঠাটি প্রকাশিত হয়ে পড়ে।
কিয়ের্কেগার্দ ঠিক এই উৎকণ্ঠাকেই ‘ইবরাহিমের উৎকণ্ঠা’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। আপনারা গল্পটি জানেন। এক ফিরিশতা ইবরাহিমকে নির্দেশ দিয়েছিলেন নিজ পুত্রকে কুরবানি দেওয়ার জন্য। সত্যিই যদি কোনো ফিরিশতা আবির্ভূত হয়ে বলে থাকেন যে, ‘হে ইবরাহিম, তুমি তোমার পুত্রকে কুরবানি করো’, তবে সেই নির্দেশ পালন করা ছিল বাধ্যতামূলক। কিন্তু এ ধরনের পরিস্থিতিতে যে কারও মনেই প্রথমে এই প্রশ্ন জাগবে যে, নির্দেশদাতা সত্যিই কোনো ফিরিশতা কি না এবং দ্বিতীয়ত, আমি সত্যিই সেই ইবরাহিম কি না। এর প্রমাণ কোথায়? দৃষ্টিবিভ্রমে ভোগা জনৈকা উন্মাদ নারী একবার দাবি করেছিলেন যে, মানুষজন তাকে টেলিফোন করে নানা আদেশ দিচ্ছে। চিকিৎসক তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কিন্তু আপনার সাথে কথা বলে কে? উত্তরে সেই নারী বললেন, সে নিজেকে ঈশ্বর বলে দাবি করে। এখন প্রশ্ন হলো, কোন জিনিসটা সত্যিই তাকে প্রমাণ করে দেখাতে পারত যে ওই কণ্ঠস্বরটি খোদ ঈশ্বরেরই ছিল? যদি কোনো ফিরিশতা আমার সামনে এসে হাজির হন, তবে তিনি যে সত্যিই একজন ফিরিশতা, তার প্রমাণ কী? অথবা, আমি যদি কোনো কণ্ঠস্বর শুনতে পাই, তবে কে প্রমাণ করবে যে সেই শব্দ স্বর্গ থেকে আসছে এবং নরক থেকে নয়, কিংবা আমার নিজের অবচেতন মন বা কোনো স্নায়বিক অসুস্থতা থেকে নয়? কে প্রমাণ করবে যে কথাগুলো সত্যিই আমাকে উদ্দেশ্য করেই বলা হচ্ছে?
তাহলে কে প্রমাণ করবে যে, আমিই সেই উপযুক্ত ব্যক্তি যে কি না নিজের পছন্দের ভিত্তিতে মানবজাতির ওপর মানুষ সম্পর্কে নিজের ধারণাকে চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার রাখে? আমি কখনোই এর কোনো প্রমাণ খুঁজে পাব না; আমাকে নিশ্চিত করার মতো কোনো চিহ্নই সেখানে থাকবে না। যদি কোনো কণ্ঠস্বর আমার সাথে কথা বলে, তবে সেই কণ্ঠস্বরটি কোনো ফিরিশতার কি না, সেই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত আমাকেই গ্রহণ করতে হবে। আমি যদি নির্দিষ্ট কোনো কাজকে ভালো বলে বিবেচনা করি, তবে কেবল আমিই সিদ্ধান্ত নিই যে সেটি ভালো এবং মন্দ নয়। আমি যে ইবরাহিম, তা প্রমাণ করার মতো কোনো কিছুই আমার কাছে নেই; তা সত্ত্বেও প্রতিনিয়ত এমন সব কাজ করে যেতে আমি বাধ্য, যা অন্যের কাছে দৃষ্টান্ত হিসেবে গণ্য হবে। প্রতিটি মানুষের বেলায় সবকিছু এমনভাবেই ঘটে যেন সমগ্র মানবজাতি তার প্রতিটি কাজের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ করে আছে এবং সেই অনুযায়ী নিজেদের আচরণকে পরিচালিত করছে। সুতরাং প্রতিটি মানুষেরই উচিত নিজেকে এই প্রশ্নটি করা, আমি কি সত্যিই এমন একজন মানুষ, যার এই অধিকার রয়েছে যে সে এমনভাবে কাজ করবে যার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে সমগ্র মানবজাতি নিজেদের পরিচালিত করবে? যদি কোনো মানুষ নিজেকে এই প্রশ্নটি না করে, তবে বুঝতে হবে সে নিজের উৎকণ্ঠাকেই লুকিয়ে রাখছে।
এটা স্পষ্ট যে, আমরা এখানে যে উৎকণ্ঠার কথা বলছি তা এমন কোনো উৎকণ্ঠা নয় যা মানুষকে নিষ্ক্রিয়তা বা স্থবিরতার দিকে ঠেলে দেবে। এটি হলো অত্যন্ত সাধারণ একটি উৎকণ্ঠা, যার সাথে সেই সমস্ত মানুষের খুব ভালো পরিচয় আছে, যারা জীবনে দায়িত্বভার কাঁধে তুলে নিয়েছেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ, যখন একজন সামরিক নেতা কোনো আক্রমণের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন এবং বেশ কিছু মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেন, তখন তিনি কাজটি নিজের ইচ্ছাতেই নির্বাচন করেন এবং চূড়ান্ত বিচারে তিনিই কেবল এই সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করেন। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে তিনি হয়তো আরও উচ্চতর কোনো কর্তৃপক্ষের অধীনস্থ, কিন্তু তাদের সেই আদেশগুলো মূলত সাধারণ প্রকৃতির হয়ে থাকে, যা ওই নেতাকে তার নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে নিতে হয় এবং তার সেই ব্যাখ্যার ওপরই দশ, চৌদ্দ কিংবা বিশজন মানুষের জীবন নির্ভর করে। এই সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করার সময় তিনি এক প্রকার উৎকণ্ঠা বোধ না করে পারেন না।
সকল নেতাই এই উৎকণ্ঠার সাথে পরিচিত। এটি তাদের কাজে কোনো বাধা সৃষ্টি করে না, বরং বিপরীত দিক থেকে বিবেচনা করলে, এটি তাদের কাজ করার প্রাথমিক শর্তই বটে; কারণ যেকোনো কাজের পূর্বশর্ত হলো সেখানে একাধিক সম্ভাবনার উপস্থিতি থাকে এবং এর মধ্য থেকে যেকোনো একটিকে বেছে নেওয়ার সময় তারা অনুধাবন করতে পারেন যে, বিষয়টিকে বেছে নেওয়া হয়েছে বলেই এর একটি নিজস্ব মূল্য তৈরি হয়েছে। অস্তিত্ববাদ মূলত এই বিশেষ ধরনের উৎকণ্ঠার কথাই বর্ণনা করে থাকে এবং উপরন্তু, আমরা যেমনটা দেখতে পাব, এটি অন্যান্য সংশ্লিষ্ট মানুষদের প্রতি প্রত্যক্ষ দায়িত্ববোধের মধ্য দিয়ে নিজেকে আরও সুষ্পষ্ট করে তোলে। এই উৎকণ্ঠা এমন কোনো আড়াল নয় যা আমাদের কর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে, বরং এটি হলো খোদ কর্মেরই একটি অবিচ্ছেদ্য শর্ত।
আমরা ‘নিঃসঙ্গতা’ বা ‘পরিত্যক্ত অবস্থা’ কথাটি ব্যবহার করি। হাইডেগারের খুব প্রিয় একটি শব্দ এটি। এর মধ্য দিয়ে আমরা কেবল একটি কথাই বোঝাতে চাই। কথাটি হলো, ঈশ্বরের কোনো অস্তিত্ব নেই। আর ঈশ্বরের এই অনুপস্থিতির চূড়ান্ত পরিণতিটুকু আমাদের মেনে নিতে হবে। এক ধরনের ধর্মনিরপেক্ষ নৈতিকতাবাদ ঈশ্বরের ধারণাকে খুব সস্তায় বাতিল করতে চায়। অস্তিত্ববাদীরা এই ধরনের নৈতিকতাবাদের ঘোর বিরোধী।
১৮৮০ সালের দিকের কথা। ফরাসি অধ্যাপকেরা একটি ধর্মনিরপেক্ষ নৈতিকতা দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছিলেন। তাঁরা তখন এ রকম একটা দাবি তুলেছিলেন। দাবিটি হলো, ঈশ্বর একটি অপ্রয়োজনীয় এবং ব্যয়বহুল অনুমিতি। তাই ঈশ্বরকে ছাড়াই আমরা আমাদের কাজ চালিয়ে নেব। কিন্তু আমাদের একটি নৈতিকতা দরকার। একটি সমাজ ও আইনকানুন মেনে চলা পৃথিবীও দরকার। তাই কিছু মূল্যবোধকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করা অপরিহার্য। এই মূল্যবোধগুলোর একটি পূর্বনির্ধারিত বা স্বতঃসিদ্ধ অস্তিত্ব থাকতে হবে।
সততা বজায় রাখা, মিথ্যা না বলা, স্ত্রীকে প্রহার না করা, সন্তানদের লালনপালন করা, এগুলোকে পূর্বনির্ধারিত কর্তব্য হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। তাই আমরা এই বিষয়টি নিয়ে একটু কাজ করতে চাই। ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই বটে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই মূল্যবোধগুলো আগের মতোই বহাল আছে। এগুলো বোধগম্য কোনো এক স্বর্গে খোদাই করা আছে। আমরা মূলত এটাই দেখাতে চাই।
অন্য কথায় বলতে গেলে, ঈশ্বরের অস্তিত্ব না থাকলেও আসলে কিছুই বদলাবে না। আমি বিশ্বাস করি, ফ্রান্সে আমরা যাকে র্যাডিক্যালিজম বা চরমপন্থা বলি, তার মূল উদ্দেশ্য এটাই। আমরা সততা, প্রগতি এবং মানবতার সেই একই নিয়মগুলো নতুন করে আবিষ্কার করব। ঈশ্বরকে আমরা কেবল একটি সেকেলে অনুমিতি হিসেবে বাতিল করব। আর তা আপন নিয়মেই নীরবে বিলীন হয়ে যাবে।
এর বিপরীতে অস্তিত্ববাদীরা ঈশ্বরের অস্তিত্বহীনতাকে অত্যন্ত অস্বস্তিকর বলে মনে করেন। তাঁর অন্তর্ধানের সাথে সাথেই কোনো এক বুদ্ধিবৃত্তিক স্বর্গে মূল্যবোধ খোঁজার সমস্ত সম্ভাবনাও তিরোহিত হয়। পূর্বনির্ধারিত ভালো বলে আর কিছুর অস্তিত্ব থাকতে পারে না। এই বিষয়ে চিন্তা করার মতো কোনো অসীম এবং নিখুঁত চেতনার আর অস্তিত্ব নেই। ‘ভালো’ বলে কিছুর অস্তিত্ব আছে, এটা কোথাও লেখা নেই। মানুষকে সৎ হতে হবে বা মিথ্যা বলা চলবে না, এমন কথাও কোথাও লেখা নেই। আমরা এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সমতলে দাঁড়িয়ে আছি। এখানে কেবল মানুষেরই বসবাস।
দস্তয়েভস্কি একবার লিখেছিলেন, ঈশ্বরের অস্তিত্ব না থাকলে সবকিছু করারই বৈধতা মিলত। অস্তিত্ববাদের যাত্রাবিন্দু হলো ঠিক এই জায়গাটি। ঈশ্বরের অস্তিত্ব না থাকলে আসলেই সবকিছু করার বৈধতা থাকে। আর এর ফলে মানুষ সম্পূর্ণ নিরাশ্রয় হয়ে পড়ে। সে নিজের ভেতরে বা বাইরে নির্ভর করার মতো কোনো আশ্রয়ই খুঁজে পায় না। সে তৎক্ষণাৎ নিজের আত্মপক্ষ সমর্থনের সমস্ত সুযোগ হারিয়ে ফেলে। অস্তিত্ব আসলেই সারসত্তার আগে আসে। তাই মানুষ আর কখনোই পূর্বনির্ধারিত কোনো নির্দিষ্ট মানব-প্রকৃতির দোহাই দিতে পারে না। নিজের কাজের সাফাই গাইতে পারে না। অন্যভাবে বললে, এখানে কোনো নিয়তিবাদ নেই। মানুষ স্বাধীন, মানুষ নিজেই স্বাধীনতা।
অন্যদিকে ঈশ্বরের অস্তিত্ব না থাকলে আমাদের কোনো ঐশী আদেশ দেওয়া হয় না। কোনো মূল্যবোধও দেওয়া হয় না। এগুলো আমাদের আচরণকে বৈধতা দিতে পারত। ফলে মূল্যবোধের কোনো উজ্জ্বল রাজ্যে আমাদের সামনে বা পেছনে কোনো কিছুরই অস্তিত্ব নেই। নিজের সাফাই গাওয়ার কোনো উপায় আমাদের নেই। আমরা কোনো অজুহাত ছাড়াই সম্পূর্ণ একা পড়ে থাকি।
মানুষ স্বাধীন হতে বাধ্য বা অভিশপ্ত। এই কথাটি দিয়ে আমি ঠিক এটাই বোঝাতে চাই। অভিশপ্ত, কারণ সে নিজেকে নিজে সৃষ্টি করেনি। কিন্তু তা সত্ত্বেও সে স্বাধীন। তাকে এই পৃথিবীতে নিক্ষেপ করা হয়েছে। আর সেই মুহূর্ত থেকেই সে তার প্রতিটি কাজের জন্য সম্পূর্ণ দায়ী।
অস্তিত্ববাদীরা আবেগের অন্ধ ক্ষমতায় বিশ্বাস করেন না। প্রবল আবেগ কোনো ধ্বংসাত্মক স্রোত নয়। এই স্রোতে মানুষ ভাগ্যের তাড়নায় ভেসে গিয়ে কোনো কাজ করে বসবে, বিষয়টা এমন নয়। আবেগ কোনো কাজের অজুহাত হতে পারে না। মানুষ তার নিজের আবেগের জন্যও নিজেই দায়ী। পৃথিবীতে পথনির্দেশনার জন্য কোনো ঐশী সংকেত পাওয়া যাবে, অস্তিত্ববাদীরা এমনটাও মনে করেন না। মানুষ নিজেই নিজের পছন্দমতো সেই সংকেতের ব্যাখ্যা দাঁড় করায়। প্রতিটি মানুষই কোনো রকম সাহায্য বা সমর্থন ছাড়া প্রতি মুহূর্তে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে বাধ্য।
ফরাসি কবি পঁজে একটি চমৎকার প্রবন্ধে একটি কথা লিখেছেন। মানুষই হলো মানুষের ভবিষ্যৎ। কথাটি একদম অক্ষরে অক্ষরে সত্য। তবে কেউ কেউ মনে করতে পারেন ভবিষ্যৎ স্বর্গে নির্ধারিত হয়ে আছে। ঈশ্বর তা আগে থেকেই জানেন। এমনটা ভাবা সম্পূর্ণ মিথ্যা। তখন তা আর ভবিষ্যৎ থাকে না। মানুষ বর্তমানে যেমনই হোক না কেন, তাকে একটি ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে হবে। একটি কুমারী ভবিষ্যৎ তার জন্য অপেক্ষা করছে। কথাটি এই অর্থে গ্রহণ করলে তা সম্পূর্ণ সত্য। কিন্তু বর্তমানের বাস্তবতায় মানুষ একেবারেই নিরাশ্রয়।
এই নিরাশ্রয় বা পরিত্যক্ত অবস্থাকে আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য আমি একটি উদাহরণ দেব। আমি আমার একজন ছাত্রের কথা উল্লেখ করব। সে বিশেষ একটি পরিস্থিতিতে আমার কাছে এসেছিল। তার বাবা তার মায়ের সাথে নিয়মিত ঝগড়া করতেন। তিনি জার্মান দখলদারদের সহযোগী হতেও ইচ্ছুক ছিলেন। ১৯৪০ সালের জার্মান আগ্রাসনে তার বড় ভাই নিহত হয়েছিলেন। এই তরুণের ভেতর কিছুটা আদিম অথচ উদার এক ধরনের আবেগ কাজ করছিল। সে তার ভাইয়ের হত্যার প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল।
তার মা কেবল তার সাথেই থাকতেন। স্বামীর বিশ্বাসভঙ্গ এবং বড় ছেলের মৃত্যু তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। এই তরুণটিই ছিল তার মায়ের একমাত্র সান্ত্বনা। এই মুহূর্তে তরুণটির সামনে দুটি পথ খোলা ছিল। ইংল্যান্ডে গিয়ে সে ‘ফ্রি ফ্রেঞ্চ ফোর্সেস’-এ যোগ দিতে পারত। অথবা সে তার মায়ের কাছে থেকে তাঁকে বাঁচতে সাহায্য করতে পারত। সে বাস্তব পরিস্থিতি পুরোপুরি বুঝতে পারছিল। এই নারীটি কেবল তার জন্যই বেঁচে আছেন। তার চলে যাওয়া কিংবা মৃত্যু তার মাকে চরম হতাশায় ডুবিয়ে দেবে।
সে আরেকটি বিষয়ও খুব স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারছিল। মায়ের জন্য করা তার প্রতিটি কাজ একটি নিশ্চিত ফল বয়ে আনবে। এটি তার মাকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করবে। অন্যদিকে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য সে যা-ই করুক না কেন, তা হবে চূড়ান্ত অনিশ্চিত একটি কাজ। বালিতে জল ঢালার মতো এই কাজ সম্পূর্ণ নিষ্ফলও হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা দিলে স্পেনে তাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কোনো ক্যাম্পে আটকে থাকতে হতে পারে। অথবা ইংল্যান্ড বা আলজেরিয়ায় পৌঁছানোর পর তাকে হয়তো কোনো অফিসে বসে নিছক ফর্ম পূরণের কাজে লাগিয়ে দেওয়া হতে পারে।
ফলস্বরূপ, সে নিজেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি কর্মপদ্ধতির মুখোমুখি আবিষ্কার করল। প্রথমটি ছিল সুনির্দিষ্ট ও তাৎক্ষণিক। কিন্তু এটি কেবল একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির প্রতি নিবেদিত। আর দ্বিতীয়টি ছিল একটি বৃহত্তর লক্ষ্যের প্রতি নিবেদিত একটি কাজ। এটি ছিল জাতীয় সম্মিলিত লড়াই। কিন্তু ঠিক এই কারণেই তা ছিল চূড়ান্ত অনিশ্চিত। আর পথিমধ্যেই তার এই লক্ষ্য ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। একই সাথে সে দুধরনের নৈতিকতার মাঝে দ্বিধায় ভুগছিল। একদিকে ছিল ব্যক্তিগত ভক্তি ও সহানুভূতির নৈতিকতা। অন্যদিকে ছিল বৃহত্তর পরিসরের একটি নৈতিকতা। কিন্তু দ্বিতীয়টির বৈধতা বেশ বিতর্কমূলক। তাকে এই দুটির মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতেই হতো।
কোন বিষয়টি তাকে এই সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করতে পারে? খ্রিষ্টান ধর্মতত্ত্ব কি পারবে? না। খ্রিষ্টীয় মতবাদে বদান্যতার সাথে কাজ করার কথা বলা হয়। প্রতিবেশীকে ভালোবাসার কথা বলা হয়। অপরের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়। সবচেয়ে কঠিন পথটি বেছে নিতে বলা হয়। কিন্তু সবচেয়ে কঠিন পথ কোনটি? মানুষের সবচেয়ে বেশি ভ্রাতৃসুলভ ভালোবাসা কার প্রাপ্য? দেশপ্রেমিক নাকি মা? কোন লক্ষ্যটি বেশি কার্যকর? সমগ্র সম্প্রদায়ের জন্য লড়াই করার সাধারণ লক্ষ্য নাকি একজন নির্দিষ্ট মানুষকে বাঁচতে সাহায্য করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য?
পূর্ব থেকেই কে এর উত্তর দিতে পারবে? কেউই না। কোনো নৈতিক ধর্মগ্রন্থেও এর উত্তর দেওয়া নেই। কান্টের নৈতিকতায় একটি কথা বলা হয়। অপরকে কখনোই মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করো না। সর্বদা তাদের একটি চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করো। খুব ভালো কথা। আমি আমার মায়ের কাছে থেকে যেতে পারি। তখন তাঁকে আমি চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবেই বিবেচনা করব। তাঁকে আমি মাধ্যম হিসেবে ধরব না। কিন্তু একই যুক্তিতে আমি আমার পক্ষে লড়াই করা মানুষদের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করার ঝুঁকিতে পড়ব। এর বিপরীত দিকটিও সমান সত্য। আমি যোদ্ধাদের সাহায্য করতে যেতে পারি। তখন তাদের আমি চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করব। আর তখন আমার মাকে নিছক মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করার ঝুঁকি তৈরি হবে।
মূল্যবোধগুলো চূড়ান্ত অনিশ্চিত। বিবেচনাধীন নির্দিষ্ট ও বাস্তব পরিস্থিতি নির্ধারণের জন্য এগুলো মাত্রাতিরিক্ত বিমূর্ত। তাই আমাদের প্রবৃত্তি বা আবেগের ওপর ভরসা করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। এই তরুণটি ঠিক সেই কাজটিই করার চেষ্টা করেছিল। আমি তার সাথে দেখা করলাম। সে আমাকে বলল, দিনশেষে আবেগটাই আসল ব্যাপার। এই আবেগ আমাকে প্রবলভাবে একটি নির্দিষ্ট দিকে টানছে। আমার সেই দিকটিই বেছে নেওয়া উচিত।
তার ভাষ্যমতে, মায়ের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা থাকতে পারে। মায়ের জন্য সে বাকি সবকিছু বিসর্জন দিতে প্রস্তুত থাকতে পারে। প্রতিশোধ নেওয়ার ইচ্ছা এবং রোমাঞ্চের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে পারে। এমনটা হলে সে মায়ের সাথেই থেকে যাবে। এর বিপরীতে মায়ের প্রতি তার ভালোবাসা যথেষ্ট না-ও হতে পারে। তেমনটা হলে সে যুদ্ধে যাবে।
কিন্তু একজন মানুষ একটি আবেগের শক্তি ঠিক কীভাবে পরিমাপ করবে? তার মায়ের প্রতি তার অনুভূতির মূল্য ঠিক একটি ঘটনার দ্বারাই নির্ধারিত হচ্ছিল। ঘটনাটি হলো, সে তার মায়ের পাশেই অবস্থান করছিল। আমি আমার এক বন্ধুকে যথেষ্ট ভালোবাসার দাবি করতে পারি। তার জন্য আমি অনেক টাকা বিসর্জন দেওয়ার কথাও বলতে পারি। কিন্তু কাজটি বাস্তবে করার আগে আমি তা প্রমাণ করতে পারব না। আমি বাস্তবে মায়ের কাছে থেকে যাওয়ার পরেই কেবল এই কথাটি বলতে পারব। আমি বলতে পারব যে আমি মাকে যথেষ্ট ভালোবাসি।
আমি একটি কাজের মাধ্যমেই কেবল এই অনুরাগের শক্তি পরিমাপ করতে পারি। কাজটির মাধ্যমেই এই অনুরাগ সংজ্ঞায়িত ও অনুমোদিত হয়। কিন্তু নিজের কাজের সাফাই গাইতে আমি এই অনুরাগের দোহাই দিতে পারি। তখন আমি নিজেকে একটি দুষ্টচক্রে আটকা পড়তে দেখি।
আঁদ্রে জিঁদ অত্যন্ত চমৎকার একটি কথা বলেছেন। লোক দেখানো আবেগ এবং সত্যিকারের আবেগের মধ্যে পার্থক্য করাটা প্রায় অসম্ভব। মায়ের পাশে থেকে তাঁকে ভালোবাসার সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং তাঁকে ভালোবাসার একটি নিখুঁত অভিনয় করা, এই দুটি বিষয় মূলত একই রকম। অন্য কথায়, মানুষের কাজের মাধ্যমেই তার অনুভূতি গড়ে ওঠে। তাই কাজের পথনির্দেশক হিসেবে আমি কেবল অনুভূতির ওপর নির্ভর করতে পারি না। এর অর্থ হলো, কাজের জন্য খাঁটি অনুপ্রেরণা আমি নিজের ভেতরেও খুঁজে পাব না। আবার কোনো নৈতিকতার কাছ থেকে কাজের সূত্র পাওয়ার আশাও আমি করতে পারি না।
আপনাদের মনে হতে পারে, ওই তরুণ অন্তত একজন শিক্ষকের কাছে তো পরামর্শ চাইতে গিয়েছিল। কিন্তু আপনি যখন কোনো যাজকের কাছে পরামর্শ চাইতে যান, তখন আপনি নিজেই সেই যাজককে নির্বাচন করেন। আর তিনি কী পরামর্শ দেবেন, তা আপনি মনে মনে আগে থেকেই কমবেশি জানেন। অন্যভাবে বললে, একজন উপদেষ্টাকে বেছে নেওয়ার মধ্য দিয়ে আপনি মূলত নিজের সিদ্ধান্তের প্রতিই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন। আপনি খ্রিষ্টান হলে হয়তো কোনো যাজকের শরণাপন্ন হতে বলবেন। কিন্তু যাজকদের মধ্যেও শ্রেণিভেদ আছে। দখলদারদের সহযোগী যাজক আছেন, আবার প্রতিরোধকারী যাজকও আছেন। কিছু যাজক আবার সুসময়ের অপেক্ষায় থাকেন। আপনি এদের মধ্যে কাকে বেছে নেবেন?
তরুণটি যদি প্রতিরোধকারী কিংবা সহযোগী, এই দুই দলের যেকোনো এক পক্ষের যাজককে বেছে নিত, তবে সে আগেই নিজের কাঙ্ক্ষিত পরামর্শটি নির্ধারণ করে ফেলত। একইভাবে, আমার কাছে আসার সময় সে জানত আমি তাকে কী পরামর্শ দেব। আমার দেওয়ার মতো কেবল একটিই উত্তর ছিল। তুমি স্বাধীন, তাই নিজের পথ নিজেকেই বেছে নাও। অর্থাৎ নিজের পথ নিজেকেই আবিষ্কার করো। সাধারণ নৈতিকতার কোনো নিয়ম আপনাকে আপনার কর্তব্য বাতলে দিতে পারবে না। এই পৃথিবীতে আগে থেকে দেওয়া কোনো ঐশী সংকেত নেই। ক্যাথলিকরা হয়তো বলে উঠবেন, পৃথিবীতে অবশ্যই সংকেত আছে! খুব ভালো কথা। কিন্তু তারপরও প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাকে নিজেই সেই সংকেতের অর্থ উদ্ধার করতে হবে।
বন্দিশিবিরে থাকার সময় আমার এক অসাধারণ মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছিল। তিনি ছিলেন একজন জেসুইট। তিনি একটি বিশেষ ঘটনার মধ্য দিয়ে এই যাজক সম্প্রদায়ের সদস্য হয়েছিলেন। জীবনে তাঁকে একের পর এক চরম ব্যর্থতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছিল। শৈশবেই তিনি পিতৃহীন হন। ফলে তাঁকে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে হয়। পরে একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে তিনি বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ পান। সেখানে তাঁকে প্রতিনিয়ত একটি কথা মনে করিয়ে দেওয়া হতো। তাঁকে কেবল করুণা করেই সেখানে জায়গা দেওয়া হয়েছে। ফলস্বরূপ, একটি শিশুর প্রাপ্য সমস্ত সম্মান ও স্বীকৃতি থেকে তাঁকে বঞ্চিত করা হয়।
পরবর্তীতে, আঠারো বছর বয়সে তিনি একটি প্রেমের সম্পর্কে নিদারুণ আঘাত পান। এরপর বাইশ বছর বয়সে তিনি সামরিক পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। এমনিতে এটি খুব সামান্য একটি ঘটনা। কিন্তু এটিই ছিল তাঁর সহ্যের শেষ বিন্দু। এই তরুণ তখন নিজেকে একজন চরম ব্যর্থ মানুষ হিসেবেই ধরে নিতে পারতেন। এটি ছিল একটি সংকেত। কিন্তু কিসের সংকেত? তিনি চাইলে তিক্ততা বা হতাশার আশ্রয় নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি বিষয়টিকে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে গ্রহণ করলেন। তিনি ধরে নিলেন, জাগতিক সাফল্যের জন্য তাঁর জন্ম হয়নি। কেবল ধর্ম, পবিত্রতা এবং বিশ্বাসের জগতেই তাঁর প্রবেশের অধিকার আছে। তিনি তাঁর জীবনের এই ব্যর্থতার ইতিহাসকে ঈশ্বরের একটি বার্তা হিসেবেই ব্যাখ্যা করলেন। এরপর তিনি যাজক সম্প্রদায়ের সদস্য হয়ে গেলেন।
সংকেতের অর্থ উদ্ধারের এই সিদ্ধান্তটি যে একান্তই তাঁর নিজস্ব ছিল, সে বিষয়ে কে সন্দেহ পোষণ করবে? এই ধারাবাহিক ব্যর্থতা থেকে যে কেউ সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো উপসংহারেও পৌঁছাতে পারতেন। তিনি হয়তো একজন ছুতোর মিস্ত্রি বা একজন বিপ্লবী হওয়ার সিদ্ধান্তও নিতে পারতেন। কিন্তু সংকেতের অর্থ উদ্ধারের এই সম্পূর্ণ দায়ভার কেবল তাঁর কাঁধেই বর্তায়। ‘নিঃসঙ্গতা’ বলতে আমরা ঠিক এটাই বোঝাই। আমরা নিজেরাই নিজেদের সত্তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আর এই নিঃসঙ্গতার সাথেই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে উৎকণ্ঠা।
‘হতাশা’ শব্দটির অর্থ অত্যন্ত সোজা। এর অর্থ হলো, আমরা কেবল নিজেদের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করি। অথবা আমরা সেই সম্ভাবনাগুলোর ওপর নির্ভর করি, যা আমাদের কাজকে সম্ভবপর করে তোলে। মানুষ যখনই কোনো কিছুর আকাঙ্ক্ষা করে, তখন সেখানে এই সম্ভাবনার উপাদানগুলো উপস্থিত থাকে। আমি হয়তো কোনো বন্ধুর আগমনের অপেক্ষায় আছি। সে ট্রেন বা ট্রামে করে আসতে পারে। এ ক্ষেত্রে আমি ধরে নিই যে, ট্রেনটি নির্ধারিত সময়েই পৌঁছাবে। অথবা ট্রামটি লাইনচ্যুত হবে না। আমি কেবল সম্ভাবনার জগতেই অবস্থান করি। কিন্তু নিজের কাজের সাথে সরাসরি যুক্ত নয়, এমন কোনো সম্ভাবনার ওপর মানুষ নির্ভর করে না। বিবেচ্য সম্ভাবনাগুলো যখন আমার কাজের ওপর প্রভাব ফেলা বন্ধ করে দেয়, তখন সেই বিষয়ে আমার আগ্রহ হারিয়ে ফেলা উচিত। কারণ পৃথিবীতে কোনো ঈশ্বর নেই। পূর্বনির্ধারিত কোনো নকশাও নেই, যা আমার ইচ্ছামতো এই জগৎ ও তার যাবতীয় সম্ভাবনাকে মানিয়ে নিতে পারে। দেকার্ত বলেছিলেন, জগৎকে নয়, বরং নিজেকে জয় করো। তাঁর কথার অন্তর্নিহিত অর্থও একই রকম। আমাদের কোনো রকম আশা ছাড়াই কাজ করে যেতে হবে।
মার্ক্সবাদীদের কাছে আমি এই কথাটি বলেছিলাম। তাঁরা আমাকে উত্তর দিয়েছেন, আপনার কাজ আপনার মৃত্যুর সাথে সাথেই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু আপনি অন্যদের সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে পারেন। এর অর্থ হলো, চীন বা রাশিয়ার মতো অন্যান্য জায়গায় অন্যরা আপনাকে সাহায্য করার জন্য যা করছে, আপনি তার ওপর নির্ভর করতে পারেন। আপনার মৃত্যুর পর তারা আপনার কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তারা বিপ্লবের চূড়ান্ত সফলতার দিকে আপনার কাজকে পৌঁছে দেবে। আপনি এই বিষয়গুলোর ওপরও ভরসা করতে পারেন। অধিকন্তু আপনাকে এর ওপর নির্ভর করতেই হবে। তা না করা হবে সম্পূর্ণ অনৈতিক।
এর জবাবে আমি প্রথমেই বলি, আমি সংগ্রামে সর্বদাই আমার কমরেডদের ওপর ভরসা করব। তারা আমার মতোই একটি নির্দিষ্ট এবং সাধারণ লক্ষ্যের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমি মোটামুটিভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, এমন কোনো দল বা গোষ্ঠীর ঐক্যের ওপরও আমি ভরসা করব। অর্থাৎ আমি নিজে যে দলের একজন সক্রিয় সদস্য এবং যার প্রতিটি পদক্ষেপ সম্পর্কে আমি অবগত। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দলের ঐক্য ও ইচ্ছার ওপর নির্ভর করা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক একটি ব্যাপার। এটি অনেকটা ট্রেন সঠিক সময়ে পৌঁছানোর বা ট্রাম লাইনচ্যুত না হওয়ার ওপর নির্ভর করার মতোই।
কিন্তু অপরিচিত মানুষদের ওপর আমি নির্ভর করতে পারি না। মানুষের ভালোত্ব বা সমাজের মঙ্গলের প্রতি মানুষের আগ্রহের ওপর আমি আমার বিশ্বাস স্থাপন করতে পারি না। কারণ মানুষ স্বাধীন। পূর্বনির্ধারিত এমন কোনো মানব-প্রকৃতি নেই, যাকে আমি ভিত্তি হিসেবে ধরে নিতে পারি। রুশ বিপ্লব শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা আমি জানি না। আমি এর প্রশংসা করতে পারি এবং একে দৃষ্টান্ত হিসেবে গ্রহণ করতে পারি। কারণ আজকে এটা স্পষ্ট যে, রাশিয়ার সর্বহারা শ্রেণি এমন একটি ভূমিকা পালন করছে, যা অন্য কোনো জাতির সর্বহারারা পারেনি। কিন্তু এর ফলে সর্বহারা শ্রেণিরই চূড়ান্ত বিজয় হবে, এমন নিশ্চয়তা আমি দিতে পারি না। আমি কেবল চোখের সামনে যা দেখতে পাচ্ছি, তার মধ্যেই আমাকে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে।
আমার মৃত্যুর পর আমার কমরেডরা আমার কাজের হাল ধরবে কি না, সে বিষয়েও আমি নিশ্চিত হতে পারি না। তারা আমার কাজকে চূড়ান্ত সফলতার দিকে নিয়ে যাবে কি না, তা-ও বলতে পারি না। কারণ সেই মানুষগুলোও স্বাধীন। আগামীকালের মানুষের রূপ কী হবে, তারা নিজেরাই স্বাধীনভাবে সেই সিদ্ধান্ত নেবে। আমার মৃত্যুর পর আগামীকাল একদল মানুষ হয়তো ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আর অন্যরা হয়তো কাপুরুষের মতো তাদের সেই সুযোগ করে দিতে পারে। যদি তা-ই হয়, তবে ফ্যাসিবাদই হবে মানুষের চরম সত্য। আর আমাদের জন্য তা হবে চূড়ান্ত দুর্ভাগ্যজনক। বাস্তবে পরিস্থিতি ঠিক তেমনই হবে, মানুষ যেমনটা নির্ধারণ করবে।
তাহলে এর অর্থ কি এই যে, আমি নিষ্ক্রিয়তার কাছে নিজেকে সমর্পণ করব? একেবারেই না। প্রথমে আমার নিজেকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করতে হবে। এরপর সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ করে যেতে হবে। একটি পুরোনো প্রবাদে বলা হয়, কাজ শুরু করার জন্য কোনো আশার প্রয়োজন নেই। আমাকে এই সূত্র অনুসারেই কাজ করতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমি কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দেব না। বরং এর অর্থ হলো, আমি সমস্ত মোহ থেকে মুক্ত থাকব এবং আমার সাধ্যমতো কাজ করে যাব। উদাহরণস্বরূপ, আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করতে পারি, সামাজিক আদর্শগুলো কি কখনো বাস্তবে পরিণত হবে? আমি এর উত্তর জানি না। আমি কেবল এটুকু জানি, একে বাস্তবে রূপ দিতে আমার সাধ্যমতো যা কিছু করার আছে, আমি তা-ই করব। এর বাইরে আমি আর কোনো কিছুর ওপরই নির্ভর করতে পারি না।
নিষ্ক্রিয়তাবাদ হলো সেই সব মানুষের মনোভাব যারা বলে, আমি যা করতে পারি না তা অন্যেরা করুক। আপনাদের সামনে আমি যে মতবাদটি তুলে ধরছি তা এর ঠিক বিপরীত। কারণ এই মতবাদ স্পষ্ট ঘোষণা করে যে, কাজের বাইরে বাস্তবের কোনো অস্তিত্ব নেই। এটি বরং আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বলে, মানুষ তার নিজের সংকল্প ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষ ঠিক ততটুকুই অস্তিত্বশীল যতটুকু সে নিজেকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে। সুতরাং মানুষ মূলত তার সমস্ত কাজের সমষ্টি ছাড়া আর কিছু নয়, তার জীবন ঠিক যেমন, সে কেবল তা-ই।
এই জায়গা থেকে আমরা খুব সহজেই বুঝতে পারি কেন কিছু মানুষ আমাদের এই শিক্ষা দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। কারণ দুঃখ-কষ্টের মধ্যে নিজেদের টিকিয়ে রাখার জন্য অনেকের কাছে কেবল একটিমাত্র উপায়ই অবশিষ্ট থাকে। তারা ভাবতে ভালোবাসেন, পরিস্থিতি আমার প্রতিকূলে ছিল, তাই এমনটা হয়েছে; আমি আসলে আমার বর্তমান অবস্থার চেয়েও অনেক ভালো কিছু হওয়ার যোগ্য ছিলাম। তারা বলেন, আমি স্বীকার করছি জীবনে আমি কোনো গভীর প্রেম বা মহান বন্ধুত্বের দেখা পাইনি; কিন্তু তার কারণ হলো, আমি কখনো এমন কোনো নারী বা পুরুষের দেখা পাইনি যারা এর যোগ্য ছিল। আমি যদি খুব ভালো কোনো বই লিখতে না পারি, তার কারণ হলো তা লেখার মতো যথেষ্ট অবসর আমি পাইনি। অথবা, আমি যদি এমন কোনো সন্তান না পাই যার জন্য আমি নিজের জীবন উৎসর্গ করতে পারতাম, তার কারণ হলো আমি এমন কোনো পুরুষ খুঁজে পাইনি যার সাথে আমি জীবন কাটাতে পারি।
সুতরাং আমার ভেতরে বহু রকমের যোগ্যতা, প্রবণতা এবং সম্ভাবনা অব্যবহৃত অবস্থায় রয়ে গেছে। সেগুলো এখনো পুরোপুরি কার্যকর। আর এই সম্ভাবনাগুলো আমাকে এমন একটি মূল্য এনে দেয়, যা কেবল আমার কাজের ইতিহাস দেখে কখনোই অনুমান করা সম্ভব নয়। কিন্তু বাস্তবে এবং একজন অস্তিত্ববাদীর চোখে, ভালোবাসার কাজের বাইরে ভালোবাসার আলাদা কোনো অস্তিত্ব নেই। ভালোবাসার মধ্য দিয়ে যা প্রকাশ পায়, তার বাইরে ভালোবাসার কোনো সুপ্ত সম্ভাবনাও নেই। একইভাবে শিল্পের মধ্য দিয়ে যা ফুটে ওঠে, তার বাইরে কোনো প্রতিভার অস্তিত্ব নেই।
প্রুস্তের প্রতিভা মানে হলো প্রুস্তের লেখা সমস্ত সাহিত্যকর্মের সমষ্টি। রেসিনের প্রতিভা মানে হলো তাঁর লেখা বিয়োগান্তক নাটকগুলোর সমাহার। এর বাইরে তাদের আর কোনো অস্তিত্ব নেই। রেসিন আরও একটি বিয়োগান্তক নাটক লিখতে পারতেন, এমন একটি অহেতুক ক্ষমতা আমরা কেন তাঁর ঘাড়ে চাপাতে যাব, যখন তিনি বাস্তবে তা লেখেননি? জীবনে একজন মানুষ নিজেকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করে, নিজের প্রতিকৃতি সে নিজেই আঁকে এবং সেই প্রতিকৃতির বাইরে আর কিছুই থাকে না। যে ব্যক্তি জীবনে সফল হতে পারেননি, তার কাছে এই চিন্তা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক মনে হতে পারে। তবে অন্যদিকে, এটি মানুষকে এই সত্যটুকু বোঝার সুযোগ করে দেয় যে, কেবল বাস্তবতার ওপরই নির্ভর করা যায়। এটি পরিষ্কার করে দেয় যে, স্বপ্ন, প্রত্যাশা এবং আশা একজন মানুষকে কেবল নেতিবাচকভাবেই সংজ্ঞায়িত করে, ইতিবাচকভাবে নয়। এগুলো কেবল প্রতারণামূলক স্বপ্ন, ব্যর্থ আশা এবং অপূর্ণ প্রত্যাশা হিসেবেই তাকে পরিচয় করিয়ে দেয়।
তা সত্ত্বেও, মানুষ তার নিজের জীবনের চেয়ে বেশি কিছু নয়, এই কথাটি বলার অর্থ এই নয় যে একজন শিল্পীকে কেবল তার শিল্পকর্ম দিয়েই বিচার করতে হবে। কারণ মানুষ হিসেবে তার পরিচয়ের পেছনে আরও হাজারটা বিষয়ের কম অবদান নেই। আমরা মূলত এ কথাই বলতে চাই যে, একজন মানুষ তার ধারাবাহিক উদ্যোগগুলো ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষ হলো সেই উদ্যোগগুলোর সমষ্টি, তাদের বিন্যাস এবং সেই উদ্যোগগুলোকে ঘিরে গড়ে ওঠা সম্পর্কের একটি সার্বিক রূপ।
এই সবকিছুর আলোকে বলতে হয়, শেষ পর্যন্ত মানুষ আমাদের নৈরাশ্যবাদ নিয়ে অভিযোগ করে না। বরং তারা আমাদের আশাবাদের কঠোরতা নিয়েই আপত্তি তোলে। মানুষ যখন আমাদের লেখা উপন্যাসগুলোর নিন্দা করে, যেখানে আমরা নিচ, দুর্বল, কাপুরুষ এবং ক্ষেত্রবিশেষে সরাসরি খারাপ চরিত্রগুলোর বর্ণনা দিই, তখন এর কারণ কেবল এটা নয় যে চরিত্রগুলো নিচ, দুর্বল, কাপুরুষ বা খারাপ। কারণ ধরা যাক জোলার মতো আমরাও দেখালাম যে, এই চরিত্রগুলোর আচরণের পেছনে তাদের বংশগতি দায়ী। অথবা তাদের ওপর পারিপার্শ্বিক পরিবেশের প্রভাব দায়ী। কিংবা কোনো মানসিক বা জৈবিক নিয়ামক দায়ী। এমনটা দেখালে মানুষ বেশ স্বস্তি পেত। তারা বলত, দেখছেন তো, আমরা তো এমনই, এই বিষয়ে কারও কিছু করার নেই।
কিন্তু একজন অস্তিত্ববাদী যখন কোনো কাপুরুষের চরিত্র আঁকেন, তখন তিনি সেই কাপুরুষতার জন্য ওই ব্যক্তিকেই দায়ী করেন। তার হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস বা মস্তিষ্ক কাপুরুষের মতো বলে সে এমনটা হয়নি। তার শরীরবৃত্তীয় গঠনের কারণেও সে এমন কাপুরুষ হয়ে ওঠেনি। বরং সে কাপুরুষসুলভ কাজ করেছে বলেই সে আজ কাপুরুষ। কাপুরুষসুলভ মেজাজ বা স্বভাব বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। স্নায়বিক দুর্বলতার মেজাজ থাকতে পারে। শরীরে রক্তাল্পতাও থাকতে পারে। আবার বেশ সতেজ মেজাজও থাকতে পারে। কিন্তু যার রক্তাল্পতা আছে, সে কেবল সেই কারণেই কাপুরুষ হয়ে যায় না। কারণ হাল ছেড়ে দেওয়া বা পিছিয়ে পড়ার কাজের মধ্য দিয়েই কাপুরুষতার জন্ম হয়। আর মেজাজ বা স্বভাব কখনো কোনো কাজ হতে পারে না। একজন কাপুরুষ তার করা কাজের মধ্য দিয়েই সংজ্ঞায়িত হয়।
মানুষ অত্যন্ত অস্পষ্টভাবে এবং আতঙ্কের সাথে এই বিষয়টি অনুভব করে যে, আমরা যে কাপুরুষটিকে তাদের সামনে তুলে ধরছি, সে তার নিজের কাপুরুষতার জন্যই অপরাধী। মানুষের বরং এটাই বেশি পছন্দ যে, একজন মানুষ জন্মগতভাবেই কাপুরুষ অথবা জন্মগতভাবেই বীর হিসেবে পৃথিবীতে আসবে। ‘শেম্যাঁ দ্য লা লিবার্তে’ বইটির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি যে অভিযোগটি আনা হয়, তা হলো, এই মানুষগুলো এত নিচ হওয়ার পরও আপনি কীভাবে তাদের বীর বানাতে পারেন? এই আপত্তিটি আসলেই বেশ হাস্যকর। কারণ এটি ধরে নেয় যে, মানুষ জন্মগতভাবেই বীর হয়। আর মূলত এই ধরনের মানুষেরা মনে মনে ঠিক এটাই ভাবতে ভালোবাসেন।
আপনি যদি জন্মগতভাবেই কাপুরুষ হন, তবে আপনি বেশ শান্তিতে থাকতে পারবেন। আপনি ভাববেন এই ব্যাপারে আপনার কিছুই করার নেই এবং আপনি যা-ই করুন না কেন, সারা জীবন আপনি কাপুরুষই থেকে যাবেন। আর আপনি যদি জন্মগতভাবেই বীর হন, তবে সে ক্ষেত্রেও আপনি বেশ শান্তিতে থাকতে পারবেন। আপনি সারা জীবন বীরের মতোই খাওয়া দাওয়া করবেন এবং বীরই থেকে যাবেন। অথচ অস্তিত্ববাদীরা বলেন, কাপুরুষ নিজেকে নিজেই কাপুরুষ বানায়, আর বীর নিজেকে নিজেই বীর হিসেবে গড়ে তোলে। কাপুরুষের পক্ষে তার কাপুরুষতা ত্যাগ করার সম্ভাবনা সর্বদা উন্মুক্ত থাকে। ঠিক একইভাবে বীরের পক্ষেও যেকোনো সময় বীরত্ব থেকে সরে আসার সুযোগ থাকে। সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি এখানে গুরুত্ব বহন করে তা হলো, সামগ্রিক প্রতিশ্রুতি। কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘটনা বা নির্দিষ্ট কাজের মধ্য দিয়ে আপনি পুরোপুরিভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে পড়েন না।
আমার মনে হয়, অস্তিত্ববাদের বিরুদ্ধে তোলা বেশ কয়েকটি অভিযোগের উত্তর আমরা এতক্ষণে দিয়েছি। আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন যে, একে কোনোভাবেই নিষ্ক্রিয়তাবাদের দর্শন হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। কারণ এটি মানুষকে তার কাজের মাধ্যমেই সংজ্ঞায়িত করে। একে মানুষের কোনো নৈরাশ্যবাদী বর্ণনা হিসেবেও দেখার সুযোগ নেই। কারণ এর চেয়ে আশাবাদী মতবাদ আর একটিও নেই। এটি মানুষের ভাগ্যকে তার নিজের হাতের মুঠোয় এনে দেয়। এটি মানুষকে কাজ থেকে নিরুৎসাহিত করার কোনো চেষ্টাও করে না। কারণ এটি মানুষকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে, নিজের কাজের বাইরে তার জন্য আর কোনো আশা নেই। একমাত্র কাজের মাধ্যমেই সে নিজের জীবনকে সার্থক করে তুলতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে আমরা মূলত কাজ এবং আত্ম-প্রতিশ্রুতির একটি নৈতিকতা নিয়েই আলোচনা করছি। তবে এই সামান্য তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আমাদের বিরুদ্ধে এখনো একটি অভিযোগ করা হয়। বলা হয়, আমরা নাকি মানুষকে কেবল তার ব্যক্তিগত আত্মসচেতনতার (Subjectivity) গণ্ডিতে আটকে রাখছি। এখানেও মানুষ আমাদের কথাটি চরমভাবে ভুল বোঝে।
আমাদের যাত্রার শুরুটা অবশ্যই ব্যক্তির আত্মসচেতনতা থেকে ঘটে। আর তা ঘটে সম্পূর্ণ দার্শনিক কারণেই। আমরা বুর্জোয়া বলে এমনটা ঘটে না। বরং আমরা আমাদের শিক্ষাকে নিছক কিছু সুন্দর তত্ত্বের ওপর দাঁড় করাতে চাই না। এমন তত্ত্ব হয়তো আশায় ভরপুর, কিন্তু তার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। আমরা বরং সত্যের ওপরই দাঁড়াতে চাই। আর ঠিক যাত্রাবিন্দুতে ‘আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি’ কথাটি ছাড়া অন্য কোনো সত্য থাকতে পারে না। চেতনা যখন নিজের কাছে পৌঁছায়, তখন এটিই হয়ে ওঠে চূড়ান্ত সত্য। যে তত্ত্ব এই আত্ম-উপলব্ধির মুহূর্তের বাইরে গিয়ে মানুষকে নিয়ে শুরু হয়, তা মূলত সত্যকেই ধামাচাপা দেয়। কারণ দেকার্তের এই ‘কোগিটো’ বা আত্মবোধের বাইরে সমস্ত বস্তুই কেবল সম্ভাব্যতার স্তরে থেকে যায়। আর সত্যের সাথে যুক্ত নয় এমন যেকোনো সম্ভাব্যতার মতবাদ শেষ পর্যন্ত শূন্যতায় মিলিয়ে যাবে। সম্ভাব্য বিষয়কে সংজ্ঞায়িত করতে হলে আগে সত্যকে ধারণ করতে হবে। যেকোনো ধরনের সত্য প্রতিষ্ঠার আগে একটি চূড়ান্ত সত্যের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। আর এমন একটি চূড়ান্ত সত্য সত্যিই আছে, যা অত্যন্ত সরল, সহজেই অর্জনযোগ্য এবং সবার নাগালের মধ্যে অবস্থিত। এটি হলো নিজের সম্পর্কে মানুষের তাৎক্ষণিক আত্মবোধ।
দ্বিতীয়ত, কেবল এই তত্ত্বটিই মানুষের মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একমাত্র এই তত্ত্বটিই মানুষকে কোনো বস্তুতে পরিণত করে না। সব ধরনের বস্তুবাদই শেষ পর্যন্ত নিজেকে সহ প্রতিটি মানুষকে একটি বস্তু হিসেবেই বিবেচনা করতে শেখায়। অর্থাৎ মানুষকে পূর্বনির্ধারিত কিছু প্রতিক্রিয়ার সমষ্টি হিসেবে দেখা হয়। একটি টেবিল, একটি চেয়ার বা একটি পাথরের যে নির্দিষ্ট গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্য থাকে, বস্তুবাদ মানুষের ক্ষেত্রেও তার চেয়ে আলাদা কিছু ভাবে না। আমাদের উদ্দেশ্য হলো জড়জগতের বিপরীতে মানুষের নিজস্ব জগতকে একটি স্বাধীন মূল্যবোধের কাঠামো হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু সত্যের মানদণ্ড হিসেবে আমরা যে আত্মসচেতনতার কথা বলি, তা কোনো সংকীর্ণ ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিষয় নয়। আমরা আগেই দেখিয়েছি, আত্মবোধের মাধ্যমে মানুষ কেবল নিজেকেই আবিষ্কার করে না, সে অন্যদেরও আবিষ্কার করে। দেকার্ত বা কান্টের দর্শনের ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে আমরা বলি, যখন আমরা ‘আমি চিন্তা করি’ উচ্চারণ করি, তখন আমরা মূলত অপরের উপস্থিতিতেই নিজেদের কাছে পৌঁছাই। আমরা নিজেদের বিষয়ে যতটা নিশ্চিত, অপরের বিষয়েও ঠিক ততটাই নিশ্চিত হই। সুতরাং যে মানুষ আত্মবোধের মাধ্যমে সরাসরি নিজেকে আবিষ্কার করে, সে একই সাথে অন্য সকলকেও আবিষ্কার করে। সে অন্যদের তার নিজের অস্তিত্বের একটি অপরিহার্য শর্ত হিসেবেই স্বীকৃতি দেয়। সে বুঝতে পারে, অন্যেরা তাকে সেভাবে স্বীকৃতি না দিলে সে নিজে কিছুই হতে পারে না। আমি ধার্মিক, কিংবা আমি দুষ্ট, অথবা আমি ঈর্ষাকাতর, এ কথাগুলো অন্যের স্বীকৃতি ছাড়া মূল্যহীন। অন্যের মধ্যস্থতা ছাড়া আমি আমার নিজের সম্পর্কে কোনো সত্যই লাভ করতে পারি না। আমার অস্তিত্বের জন্য অন্য মানুষ অপরিহার্য। একইভাবে নিজেকে জানার জন্যও অন্য মানুষ সমানভাবে প্রয়োজনীয়। এই পরিস্থিতিতে, নিজেকে নিবিড়ভাবে আবিষ্কার করার অর্থ হলো একই সাথে অপরকে একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে আবিষ্কার করা। সেই স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতার মুখোমুখি দাঁড়ায়। সেই স্বাধীন সত্তা আমার পক্ষে বা বিপক্ষে না গিয়ে কোনো চিন্তা বা কাজ করতে পারে না। ফলে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে নিজেদের এমন এক জগতে আবিষ্কার করি, যাকে আমরা পারস্পরিক আত্মসচেতনতা বা ‘ইন্টার-সাবজেক্টিভিটি’ বলতে পারি। এই জগতেই মানুষকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় যে, সে নিজে কী এবং অন্যেরা কী।
অধিকন্তু, প্রতিটি মানুষের মধ্যে মানব-প্রকৃতি নামের কোনো সার্বজনীন সারসত্তা খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। তা সত্ত্বেও মানুষের অস্তিত্বগত পরিস্থিতির একটি সার্বজনীন দিক রয়েছে। আজকের দিনের চিন্তাবিদেরা মানুষের প্রকৃতির চেয়ে তার পরিস্থিতি বা অবস্থা নিয়ে কথা বলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এটি মোটেও কোনো কাকতালীয় ব্যাপার নয়। মানুষের পরিস্থিতি বলতে তাঁরা কমবেশি সেই সীমাবদ্ধতাগুলোকে বোঝেন, যা এই মহাবিশ্বে মানুষের মৌলিক অবস্থানকে আগে থেকেই সংজ্ঞায়িত করে দেয়। মানুষের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনশীল। একজন মানুষ পৌত্তলিক সমাজে দাস হিসেবে জন্ম নিতে পারে। সে সামন্ততান্ত্রিক সমাজে জমিদার হতে পারে। অথবা সে একজন শ্রমজীবী মানুষও হতে পারে। কিন্তু জগতে টিকে থাকার, পরিশ্রম করার এবং মৃত্যুবরণ করার প্রয়োজনীয়তা কখনোই বদলায় না। এই সীমাবদ্ধতাগুলো কেবল আত্মগত বা কেবল বস্তুগত নয়। বরং এগুলোর একটি আত্মগত এবং একটি বস্তুগত, উভয় রূপই রয়েছে। এগুলো বস্তুগত, কারণ আমরা সব জায়গায় এদের মুখোমুখি হই এবং সব জায়গায় এদের চেনা যায়। আর এগুলো আত্মগত, কারণ মানুষ এই সীমাবদ্ধতাগুলোর ভেতর দিয়েই বাঁচে। মানুষ যদি এগুলোর ভেতর দিয়ে জীবনযাপন না করে, তবে এগুলোর কোনো মূল্য থাকে না। অর্থাৎ মানুষ যদি এই সীমাবদ্ধতাগুলোর সাপেক্ষে স্বাধীনভাবে নিজেকে এবং নিজের অস্তিত্বকে নির্ধারণ না করে, তবে এগুলো অর্থহীন। মানুষের উদ্দেশ্য যতই বৈচিত্র্যময় হোক না কেন, তার কোনোটিই আমার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত নয়। কারণ মানুষের প্রতিটি উদ্দেশ্য মূলত এই সীমাবদ্ধতাগুলোকে অতিক্রম করার, অথবা সেগুলোকে প্রসারিত করার, অথবা সেগুলোকে অস্বীকার করার, কিংবা সেগুলোর সাথে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার একেকটি প্রচেষ্টা হিসেবেই হাজির হয়। ফলস্বরূপ প্রতিটি উদ্দেশ্য, তা যতই ব্যক্তিগত হোক না কেন, তার একটি সার্বজনীন মূল্য থাকে। একজন চীনা, একজন ভারতীয় বা একজন আফ্রিকান মানুষের উদ্দেশ্যও একজন ইউরোপীয় মানুষ বুঝতে পারে। বোঝা যায়, এর অর্থ হলো, ১৯৪৫ সালের একজন ইউরোপীয় মানুষ হয়তো একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতি থেকে একই সীমাবদ্ধতার দিকে একই উপায়ে অগ্রসর হচ্ছে। আর সে হয়তো তার নিজের ভেতরেই সেই চীনা, ভারতীয় বা আফ্রিকান মানুষের উদ্দেশ্যটিকে নতুন করে উপলব্ধি করতে পারছে। প্রতিটি উদ্দেশ্যের মধ্যেই একটি সার্বজনীনতা থাকে। প্রতিটি উদ্দেশ্যই প্রত্যেক মানুষের কাছে বোধগম্য, এই অর্থেই তা সার্বজনীন। এর অর্থ এই নয় যে একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য মানুষকে চিরকালের জন্য সংজ্ঞায়িত করে। বরং এর অর্থ হলো উদ্দেশ্যটি বারবার মানুষের চিন্তায় ফিরে আসতে পারে। যথেষ্ট তথ্য থাকলে একজন বুদ্ধিহীন মানুষ, একটি শিশু, একজন আদিম মানুষ অথবা একজন বিদেশিকে বোঝার কোনো না কোনো উপায় সবসময়ই থাকে। এই অর্থে আমরা বলতে পারি যে মানুষের একটি সার্বজনীনতা রয়েছে। কিন্তু এই সার্বজনীনতা আগে থেকে দেওয়া কোনো বিষয় নয়। এটি প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে। আমি নিজেকে বেছে নেওয়ার মাধ্যমেই এই সার্বজনীনতা তৈরি করি। যেকোনো যুগের যেকোনো মানুষের উদ্দেশ্য বোঝার মাধ্যমেই আমি তা তৈরি করি। স্বাধীনভাবে বেছে নেওয়ার এই পরম কাজ প্রতিটি যুগের আপেক্ষিকতাকে পরিবর্তন করে না।
অস্তিত্ববাদের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে স্বাধীন প্রতিশ্রুতির এক চূড়ান্ত রূপ। এই প্রতিশ্রুতির মধ্য দিয়ে প্রতিটি মানুষ একটি নির্দিষ্ট মানবতাকে ফুটিয়ে তোলার মাধ্যমে নিজেকেই বাস্তবে রূপ দেয়। এই প্রতিশ্রুতি যেকোনো যুগের যেকোনো মানুষের কাছেই বোধগম্য। এই ধরনের চূড়ান্ত প্রতিশ্রুতি থেকে যে সাংস্কৃতিক কাঠামোর জন্ম হয়, তার আপেক্ষিকতার ওপর এই প্রতিশ্রুতির গভীর প্রভাব রয়েছে। দেকার্তের দর্শনের আপেক্ষিকতা এবং তাঁর প্রতিশ্রুতির চূড়ান্ত রূপ, এই দুটি বিষয়কেই সমানভাবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন। এই অর্থে আপনারা চাইলে বলতে পারেন, আমাদের শ্বাস নেওয়া, খাওয়া, ঘুমানো বা যেকোনো আচরণের মধ্য দিয়েই আমরা মূলত এই চূড়ান্ত রূপটিকেই নির্মাণ করি। স্বাধীন সত্তা এবং চূড়ান্ত সত্তার মধ্যে আসলে কোনো পার্থক্য নেই। স্বাধীন সত্তা বলতে বোঝায় সেই সত্তা যা নিজের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যে অস্তিত্ব নিজেই নিজের সারসত্তাকে বেছে নেয়। একইভাবে ইতিহাসে সাময়িকভাবে অবস্থান করা চূড়ান্ত সত্তা এবং সার্বজনীনভাবে বোধগম্য সত্তার মধ্যেও কোনো তফাত নেই।
তবে এর মাধ্যমে আত্মসচেতনতার অভিযোগটি পুরোপুরি খণ্ডিত হয় না। সত্যি বলতে, এই আপত্তিটি আরও বেশ কয়েকটি রূপে আমাদের সামনে হাজির হয়। এর মধ্যে প্রথমটি হলো, লোকেরা আমাদের বলে, তাহলে আপনি কী করছেন তাতে কিছুই যায় আসে না। কথাটি তারা নানাভাবে বলে থাকে। প্রথমেই তারা আমাদের নৈরাজ্যবাদের দায়ে অভিযুক্ত করে। এরপর তারা বলে, আপনারা অন্যকে বিচার করতে পারেন না, অথবা একটি লক্ষ্যের চেয়ে অন্যটিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ আপনাদের নেই। পরিশেষে তারা হয়তো বলে, আপনাদের এই নির্বাচনের ক্ষেত্রে যেহেতু সবকিছুই সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক, তাই আপনারা এক হাত দিয়ে যা পাওয়ার ভান করেন, অন্য হাত দিয়ে তা-ই আবার বিলিয়ে দেন।
এই তিনটি আপত্তি আসলে খুব একটা গুরুতর কিছু নয়। প্রথম আপত্তির জবাবে বলতে হয়, আপনি কী বেছে নিচ্ছেন তাতে কিছু যায় আসে না, কথাটি মোটেও সত্য নয়। এক অর্থে নির্বাচন করা সম্ভব। কিন্তু যা একেবারেই অসম্ভব তা হলো নির্বাচন না করা। আমি সর্বদা বেছে নিতে পারি। কিন্তু আমাকে অবশ্যই জানতে হবে, আমি যদি কিছু বেছে না নিই, তবে তা-ও এক ধরনের নির্বাচন। বিষয়টিকে নিছক আনুষ্ঠানিক মনে হলেও, কল্পনা এবং খেয়ালখুশির সীমারেখা নির্ধারণের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অপরিসীম।
কারণ আমি যখন কোনো বাস্তব পরিস্থিতির মুখোমুখি হই, তখন আমাকে তার প্রতি আমার মনোভাব বেছে নিতেই হয়। উদাহরণস্বরূপ, আমি একজন যৌন ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ। আমি বিপরীত লিঙ্গের কারও সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারি এবং সন্তান জন্ম দিতে পারি। এমন পরিস্থিতিতে আমি যে পথটি বেছে নিই, তার সবটুকু দায়ভার আমাকেই বহন করতে হয়। নিজেকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করার মধ্য দিয়ে আমি মূলত সমগ্র মানবজাতিকেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করি। আমার এই নির্বাচন যদি পূর্বনির্ধারিত কোনো মূল্যবোধ দ্বারা প্রভাবিত না-ও হয়, তবু এর সাথে খেয়ালখুশির কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না। কেউ যদি মনে করেন এটি কেবল জিঁদের ‘অহেতুক কাজ’ বা অ্যাক্ট গ্রাচ্যুই-এর তত্ত্বেরই পুনরাবৃত্তি, তবে তিনি এই তত্ত্ব এবং জিঁদের তত্ত্বের মধ্যকার বিশাল পার্থক্যটুকু ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন।
পরিস্থিতি বলতে কী বোঝায় জিঁদ তা জানেন না। তাঁর কাজগুলো হলো নিখাদ খেয়ালখুশি। এর বিপরীতে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, মানুষ নিজেকে এমন এক সুসংগঠিত পরিস্থিতির মধ্যে আবিষ্কার করে, যার সাথে সে নিজেই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। তার নির্বাচনের সাথে সমগ্র মানবজাতি জড়িয়ে থাকে এবং সে কোনোভাবেই নির্বাচন এড়াতে পারে না। তাকে হয়তো অবিবাহিত থাকতে হবে। অথবা তাকে সন্তান না নেওয়ার শর্তে বিয়ে করতে হবে। কিংবা তাকে বিয়ে করতে হবে এবং সন্তান নিতে হবে। পরিস্থিতি যা-ই হোক এবং সে যে পথটিই বেছে নিক না কেন, সেই পরিস্থিতির সাপেক্ষে সম্পূর্ণ দায়ভার এড়িয়ে যাওয়া তার পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। নিঃসন্দেহে সে পূর্বনির্ধারিত কোনো মূল্যবোধের পরোয়া না করেই নিজের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু তাকে খেয়ালখুশির দায়ে অভিযুক্ত করাটা চরম অন্যায়। বরং আমরা বলতে পারি, এই নৈতিক নির্বাচন একটি শিল্পকর্ম নির্মাণের সাথেই তুলনীয়।
তবে এখানে আমাকে সামান্য প্রসঙ্গ থেকে সরে গিয়ে একটি বিষয় খুব স্পষ্ট করতে হবে। আমরা কোনো নান্দনিক নৈতিকতার প্রস্তাব করছি না। আমাদের প্রতিপক্ষ এতটাই কপট যে তারা এই বিষয়টিকে নিয়েও আমাদের তিরস্কার করতে ছাড়ে না। আমি কেবল তুলনার খাতিরেই শিল্পকর্মের কথা উল্লেখ করেছি। এটুকু বোঝার পর, কোনো শিল্পী ছবি আঁকার সময় আগে থেকে ঠিক করা নিয়ম না মানলে কেউ কি তাঁকে তিরস্কার করে? তাঁর ঠিক কেমন ছবি আঁকা উচিত, এমন প্রশ্ন কি কেউ কখনো করে? সবাই জানে যে, তাঁর আঁকার জন্য আগে থেকে নির্ধারিত কোনো ছবি নেই। শিল্পী নিজের সমস্ত মনোযোগ দিয়ে একটি ছবি আঁকেন। আর তাঁর ঠিক যে ছবিটি আঁকা উচিত, বাস্তবে তিনি ঠিক সেই ছবিটিই আঁকেন। সবাই জানে, পূর্বনির্ধারিত কোনো নান্দনিক মূল্যবোধ বলে কিছু নেই। বরং ছবির অন্তর্নিহিত সংগতির ভেতরেই সেই মূল্যবোধ যথাসময়ে ফুটে ওঠে। সৃষ্টি করার ইচ্ছা এবং চূড়ান্ত কাজটির মধ্যকার সম্পর্কের মধ্যেই সেই মূল্যবোধ লুকিয়ে থাকে। আগামীকালের ছবিটি কেমন হবে, তা কেউ বলতে পারে না। আঁকা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো ছবির বিচার করা যায় না।
নৈতিকতার সাথে এর সম্পর্ক কী? আমরা ঠিক একই ধরনের সৃজনশীল পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছি। আমরা কখনোই কোনো শিল্পকর্মকে দায়িত্বজ্ঞানহীন বলি না। পিকাসোর কোনো চিত্রকর্ম নিয়ে আলোচনার সময় আমরা খুব ভালোভাবেই বুঝি যে, ছবি আঁকার ঠিক সেই মুহূর্তটিতেই শিল্পের রূপটি তৈরি হয়েছিল। তাঁর সৃষ্টিগুলো তাঁর সমগ্র জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
নৈতিকতার সমতলেও বিষয়টি একেবারে একই রকম। শিল্প এবং নৈতিকতা, এই দুটির মধ্যেই একটি অদ্ভুত মিল রয়েছে। দুটি ক্ষেত্রেই আমাদের সৃষ্টি এবং আবিষ্কারের কাজ করতে হয়। আমাদের কী করা উচিত, তা আমরা আগে থেকে সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। আমার কাছে পরামর্শ চাইতে আসা সেই ছাত্রটির উদাহরণের মাধ্যমে আমি বিষয়টি আপনাদের কাছে যথেষ্ট পরিষ্কার করেছি বলেই আমার বিশ্বাস। সে কান্ট বা অন্য যেকোনো নৈতিক ব্যবস্থার কাছেই সাহায্য চাক না কেন, কোথাও সে কোনো দিকনির্দেশনা পায়নি। সে নিজের জন্য নিজেই নিয়ম তৈরি করতে বাধ্য হয়েছিল। মায়ের কাছে থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার মধ্য দিয়ে সে আবেগ, ব্যক্তিগত ভক্তি এবং প্রত্যক্ষ বদান্যতাকে তার নৈতিক ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছিল। আমরা নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি না যে এটি তার একটি দায়িত্বজ্ঞানহীন সিদ্ধান্ত ছিল। সে যদি ত্যাগের পথ বেছে নিয়ে ইংল্যান্ডে চলেও যেত, তাহলেও তাকে আমরা দায়িত্বজ্ঞানহীন বলতে পারতাম না। মানুষ নিজেকে নিজে তৈরি করে। তাকে আগে থেকে তৈরি অবস্থায় পাওয়া যায় না। নিজের নৈতিকতা বেছে নেওয়ার মাধ্যমেই সে নিজেকে গড়ে তোলে। পরিস্থিতির চাপ এতই প্রবল যে তাকে একটি নৈতিকতা বেছে নিতেই হয়। আমরা মানুষকে কেবল তার প্রতিশ্রুতির আলোকেই সংজ্ঞায়িত করি। সুতরাং আমাদের নির্বাচনের ক্ষেত্রে দায়িত্বজ্ঞানহীনতার অভিযোগ তোলাটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।
দ্বিতীয়ত, লোকেরা আমাদের বলে, আপনারা অন্যদের বিচার করতে অক্ষম। কথাটি এক অর্থে সত্য এবং অন্য অর্থে মিথ্যা। কথাটি এই অর্থে সত্য যে, যখন কোনো মানুষ অত্যন্ত স্বচ্ছতা এবং আন্তরিকতার সাথে নিজের উদ্দেশ্য ও প্রতিশ্রুতি বেছে নেয়, তখন তার পক্ষে অন্য কোনো পথ বেছে নেওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। উদ্দেশ্যটি যা-ই হোক না কেন, এ কথা সত্য। আমরা প্রগতিতে বিশ্বাস করি না, এই অর্থেও কথাটি সত্য। প্রগতি বলতে আমরা সাধারণত উন্নতি বোঝাই। কিন্তু পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত বদলাতে থাকলেও মানুষ সব সময়ই একই রকম থাকে। আর একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতির ভেতরে মানুষের নির্বাচন সব সময়ই নির্বাচন হিসেবেই টিকে থাকে। যখন দাসপ্রথা এবং দাসপ্রথাবিরোধিতার মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হতো, তখন থেকে আজ পর্যন্ত নৈতিক সমস্যার কোনো পরিবর্তন হয়নি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময়কার পরিস্থিতির সাথে বর্তমান পরিস্থিতির কোনো তফাত নেই। বর্তমানে মানুষকে পপুলার রিপাবলিকান মুভমেন্ট এবং কমিউনিস্টদের মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হয়।
তা সত্ত্বেও আমরা বিচার করতে পারি। কারণ, আগেই বলেছি, মানুষ অপরের কথা বিবেচনায় রেখেই নির্বাচন করে এবং অপরের কথা বিবেচনায় রেখেই সে নিজেকে নির্বাচন করে। প্রথমেই একজন বিচার করে বলতে পারে, আর এটি হয়তো কোনো মূল্যবোধের বিচার নয়, বরং এটি একটি যৌক্তিক বিচার, যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানুষের নির্বাচন নিছক ভুলের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, আর অন্য ক্ষেত্রে তা সত্যের ওপর।
একজন মানুষকে আত্মপ্রবঞ্চক বলেও বিচার করা যেতে পারে। যেহেতু আমরা মানুষের পরিস্থিতিকে কোনো রকম অজুহাত বা সাহায্য ছাড়া স্বাধীন নির্বাচনের একটি ক্ষেত্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছি, সেহেতু যে মানুষই নিজের আবেগের অজুহাতে আশ্রয় নেয়, কিংবা পূর্বনির্ধারিত কোনো নিয়তিবাদী তত্ত্ব আবিষ্কার করে আত্মরক্ষা করতে চায়, সে আসলে একজন আত্মপ্রবঞ্চক।
কেউ হয়তো আপত্তি তুলে বলতে পারেন, কিন্তু সে নিজেকে প্রতারিত করার পথটি বেছে নেবে না কেন? এর জবাবে আমি বলি, নৈতিক দিক থেকে তার বিচার করা আমার কাজ নয়, কিন্তু তার এই আত্মপ্রবঞ্চনাকে আমি একটি ভুল হিসেবেই চিহ্নিত করি। এখানে সত্যের বিচারটি উচ্চারণ না করে কোনো উপায় থাকে না। এই আত্মপ্রবঞ্চনাটি যে নির্জলা মিথ্যা, তা একেবারেই স্পষ্ট। কারণ এটি মানুষের প্রতিশ্রুতির চূড়ান্ত স্বাধীনতাকে আড়াল করার একটি অপচেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়। একই সমতলে দাঁড়িয়ে আমি এ কথাও বলি যে, আমি যদি কিছু নির্দিষ্ট মূল্যবোধকে নিজের ওপর বাধ্যতামূলক বলে ঘোষণা করি, তবে তা-ও এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা। আমি নিজে এই মূল্যবোধগুলো কামনা করব, আবার একই সাথে বলব যে সেগুলো আমার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, এমনটা হলে আমি তো নিজের সাথেই স্ববিরোধিতায় জড়িয়ে পড়ি।
কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, আমি যদি নিজেকেই প্রতারিত করতে চাই, তাহলে কী হবে? আমি উত্তর দিই, আপনি তা করতে পারবেন না, এমন কোনো কারণ নেই। কিন্তু আমি ঘোষণা করছি যে আপনি ঠিক সেই কাজটিই করছেন। আর কেবল কঠোর ধারাবাহিকতার মনোভাবটিকেই আমরা সততা বা খাঁটি সত্তা বলে থাকি।
অধিকন্তু, আমি একটি নৈতিক বিচারও করতে পারি। কারণ আমি মনে করি, বাস্তব পরিস্থিতির সাপেক্ষে স্বাধীনতার নিজস্ব সত্তা ছাড়া আর কোনো লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য থাকতে পারে না। মানুষ যখন একবার বুঝতে পারে যে যাবতীয় মূল্যবোধ তার নিজের ওপরই নির্ভর করে, তখন সেই পরিত্যক্ত অবস্থার ভেতরে সে কেবল একটি জিনিসেরই আকাঙ্ক্ষা করতে পারে। আর তা হলো সমস্ত মূল্যবোধের ভিত্তি হিসেবে স্বাধীনতা। এর মানে এই নয় যে সে কোনো বিমূর্ত শূন্যতায় এই স্বাধীনতা কামনা করে। এর সোজা অর্থ হলো, সৎ বা শুদ্ধ চেতনার মানুষেরা যে কাজ করেন, তার চূড়ান্ত তাৎপর্য হলো স্বয়ং স্বাধীনতারই অন্বেষণ।
কমিউনিস্ট বা বিপ্লবী কোনো সমাজের অন্তর্ভুক্ত একজন মানুষ নির্দিষ্ট কিছু বাস্তব লক্ষ্য কামনা করেন। এই লক্ষ্যগুলো মূলত স্বাধীনতারই আকাঙ্ক্ষাকে নির্দেশ করে, তবে সেই স্বাধীনতাকে সামগ্রিক সমাজের ভেতরেই কামনা করা হয়। আমরা বিশেষ পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে এবং সেই পরিস্থিতির সাপেক্ষেই স্বাধীনতার খাতিরে স্বাধীনতা চাই। আর এভাবে স্বাধীনতা চাইতে গিয়ে আমরা আবিষ্কার করি যে, আমাদের স্বাধীনতা পুরোপুরি অন্যদের স্বাধীনতার ওপর নির্ভর করে, এবং অন্যদের স্বাধীনতা নির্ভর করে আমাদের ওপর। এটা স্পষ্ট যে মানুষ হিসেবে সংজ্ঞায়িত হতে গেলে স্বাধীনতা অপরের ওপর নির্ভর করে না। কিন্তু যেখানেই প্রতিশ্রুতির প্রশ্ন আসে, সেখানে আমি নিজের পাশাপাশি অন্যদের স্বাধীনতাও চাইতে বাধ্য। অন্যদের স্বাধীনতাকে সমানভাবে নিজের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ না করা পর্যন্ত আমি নিজের স্বাধীনতাকে লক্ষ্য বানাতে পারি সমাধা।
ফলস্বরূপ, আমি যখন পুরোপুরি খাঁটি সত্য হিসেবে এই কথাটি উপলব্ধি করি যে, মানুষ এমন এক সত্তা যার অস্তিত্ব তার সারসত্তার আগে আসে, এবং সে এমন এক স্বাধীন সত্তা যে যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজের স্বাধীনতা ছাড়া আর কিছুই চাইতে পারে না, ঠিক তখনই আমি বুঝতে পারি যে, আমি অন্যদের স্বাধীনতাও না চেয়ে পারি না। সুতরাং, খোদ স্বাধীনতার ভেতরেই স্বাধীনতার প্রতি যে আকাঙ্ক্ষা লুকিয়ে থাকে, তার নামেই আমি সেই সব মানুষের বিচার করতে পারি, যারা নিজেদের অস্তিত্বের সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক প্রকৃতি এবং এর চূড়ান্ত স্বাধীনতাকে খোদ নিজেদের কাছ থেকেই লুকাতে চায়।
যারা গাম্ভীর্যের ছদ্মবেশে কিংবা নিয়তিবাদের নানা অজুহাতে এই নিরঙ্কুশ স্বাধীনতার কাছ থেকে লুকিয়ে বেড়ায়, আমি তাদের কাপুরুষ বলব। অন্যদিকে এই পৃথিবীতে মানবজাতির আবির্ভাব কেবল একটি আকস্মিক দুর্ঘটনা ছাড়া আর কিছু নয়, তা সত্ত্বেও যারা প্রমাণ করতে চায় যে পৃথিবীতে তাদের অস্তিত্বটি একান্তই অপরিহার্য, আমি তাদের বলব নিকৃষ্ট জঞ্জাল। কিন্তু এই কাপুরুষ কিংবা জঞ্জালদের কেবল কঠোর সত্যনিষ্ঠার সমতলেই শনাক্ত করা সম্ভব। সুতরাং, নৈতিকতার বিষয়বস্তু পরিবর্তনশীল হলেও, এই নৈতিকতার একটি নির্দিষ্ট রূপ অবশ্যই সার্বজনীন।
কান্ট ঘোষণা করেছিলেন, স্বাধীনতা হলো নিজের এবং একই সাথে অন্যের স্বাধীনতার প্রতি আকাঙ্ক্ষা। কথাটি ঠিক। কিন্তু তিনি মনে করেন যে, নৈতিকতা গঠনের জন্য প্রথাগত এবং সার্বজনীন বিষয়গুলোই যথেষ্ট। এর বিপরীতে আমাদের অভিমত হলো, কাজের ক্ষেত্রটি যখন নির্দিষ্ট করতে হয়, তখন মাত্রাতিরিক্ত বিমূর্ত নীতিগুলো একেবারে ভেঙে পড়ে। সেই ছাত্রটির উদাহরণে আবার ফিরে যাওয়া যাক। কোন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে এবং নৈতিকতার কোন সুবর্ণ নিয়মের দোহাই দিয়ে সে সম্পূর্ণ মানসিক প্রশান্তির সাথে তার মাকে ছেড়ে যাওয়ার অথবা তার মায়ের কাছে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি নিতে পারত বলে আপনারা মনে করেন? এখানে বিচার করার কোনো উপায়ই নেই।
বিষয়বস্তু সর্বদা বাস্তব ও সুনির্দিষ্ট, আর সে কারণেই তা আগে থেকে অনুমান করা অসম্ভব। একে সব সময়ই নতুন করে আবিষ্কার করতে হয়। এখানে একটিমাত্র বিষয়ই বিবেচ্য, তা হলো এই আবিষ্কার স্বাধীনতার নামেই করা হয়েছে কি না।
উদাহরণস্বরূপ, আসুন আমরা নিচের দুটি ঘটনার দিকে তাকাই। আপনারা দেখতে পাবেন যে, এদের মধ্যে পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও এরা কতটা কাছাকাছি। আমরা ‘দ্য মিল অন দ্য ফ্লস’ উপন্যাসের কথা ধরতে পারি। এখানে আমরা ম্যাগি টুলিভার নামের এক তরুণীকে দেখতে পাই, যে কি না আবেগের মূল্যের এক জীবন্ত প্রতিমূর্তি এবং সে নিজেই এ বিষয়ে সচেতন। সে স্টিফেন নামের এক তরুণের প্রেমে পড়ে, যার সাথে নিতান্তই তুচ্ছ এক তরুণীর বাগদান হয়ে আছে। এই ম্যাগি টুলিভার অন্ধের মতো নিজের সুখের পেছনে না ছুটে, মানবিক সংহতির খাতিরে নিজেকে উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে ত্যাগ করে। অন্যদিকে স্টাঁদালের ‘চার্টারহাউস অব পারমা’ উপন্যাসের লা সানসেভেরিনার কথা ধরা যাক। সে বিশ্বাস করত যে আবেগই মানুষকে তার প্রকৃত মূল্য এনে দেয়। তাই সে নির্দ্বিধায় ঘোষণা করত, একটি মহৎ আবেগ নিজের সমস্ত ত্যাগকে যৌক্তিক করে তোলে এবং স্টিফেন আর তার বাগদত্তার মতো একটি বোকা মেয়ের মধ্যকার সাধারণ দাম্পত্য প্রেমের চেয়ে এই আবেগকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। নিজের সুখ পাওয়ার জন্য সে বরং সেই সাধারণ প্রেমকেই বিসর্জন দিত এবং স্টাঁদাল যেমনটি দেখিয়েছেন, জীবন যদি তার কাছে দাবি করত, তবে আবেগের সমতলে দাঁড়িয়ে সে নিজেকেও হাসিমুখে উৎসর্গ করত। এখানে আমরা দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী নৈতিকতার মুখোমুখি দাঁড়াচ্ছি। কিন্তু আমি দাবি করব যে এরা উভয়েই সমতুল্য, কারণ উভয় ক্ষেত্রেই চূড়ান্ত লক্ষ্যটি হলো স্বাধীনতা। আপনারা হয়তো এমন দুটি আচরণের কথা কল্পনা করতে পারেন যা ফলাফল বিবেচনায় একেবারেই একই রকম। যেমন একজন তরুণী হয়তো ভাগ্যের হাতে নিজেকে সমর্পণ করে তার প্রেমিককে ত্যাগ করতে পারে। আবার অন্য একজন তরুণী কেবল নিজের যৌন কামনা চরিতার্থ করার জন্য তার প্রেমিকের পূর্বের বাগদানের কথা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করতে পারে। বাহ্যিক দিক থেকে এই দুটি ঘটনা আমাদের আগের দুটি উদাহরণের মতোই মনে হতে পারে, অথচ বাস্তবে এরা সম্পূর্ণ আলাদা। লা সানসেভেরিনার আচরণের সাথে ম্যাগি টুলিভারের আচরণের যতটা মিল রয়েছে, তার সাথে নিছক বেপরোয়া লালসার কোনো মিল নেই। সুতরাং আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, দ্বিতীয় অভিযোগটি একই সাথে সত্য এবং মিথ্যা। একজন মানুষ যেকোনো কিছুই বেছে নিতে পারে, তবে শর্ত হলো তা কেবল স্বাধীন প্রতিশ্রুতির সমতলেই হতে হবে।
তৃতীয় অভিযোগটিতে বলা হয়, আপনারা এক হাত দিয়ে যা গ্রহণ করেন, অন্য হাত দিয়ে তা-ই আবার ফিরিয়ে দেন। কথাটির অন্তর্নিহিত অর্থ হলো, যেহেতু আপনারা নিজেদের মূল্যবোধ নিজেরাই তৈরি করেন, তাই আপনাদের মূল্যবোধের কোনো গুরুত্ব নেই। এর জবাবে আমি কেবল এটুকুই বলতে পারি যে, ব্যাপারটি এমন হওয়ায় আমি অত্যন্ত দুঃখিত। কিন্তু আমি যদি পিতা ঈশ্বরকেই বাদ দিয়ে থাকি, তবে মূল্যবোধ তৈরি করার জন্য কাউকে না কাউকে তো থাকতেই হবে। জিনিসগুলো যেমন, আমাদের তা ঠিক সেভাবেই গ্রহণ করতে হবে। অধিকন্তু, আমরা যে মূল্যবোধ তৈরি করি, তার অর্থ এর চেয়ে বেশি বা কম কিছু নয় যে, পূর্ব থেকেই নির্ধারিত জীবনের কোনো অর্থ নেই। জীবনকে যাপন করার আগে তা শূন্য ছাড়া আর কিছু নয়। কিন্তু এর অর্থ তৈরি করার দায়িত্ব একান্তই আপনার এবং আপনি যে অর্থ বেছে নেন, তা ছাড়া এই জীবনের আর কোনো মূল্য নেই। অতএব আপনারা বুঝতে পারছেন যে, একটি মানবিক সম্প্রদায় গড়ে তোলার সম্ভাবনা এখানে রয়েছে।
আমি অস্তিত্ববাদকে মানবতাবাদের একটি রূপ হিসেবে তুলে ধরায় অনেকেই আমাকে ভর্ৎসনা করেছেন। লোকেরা আমাকে বলেছে, আপনি আপনার ‘নজিয়া’ বইতে লিখেছেন যে মানবতাবাদীরা ভুল পথে আছে, এমনকি আপনি এক বিশেষ ধরনের মানবতাবাদকে বিদ্রূপও করেছেন, তাহলে এখন আবার নিজের কথায় ফিরে যাচ্ছেন কেন? বাস্তবে মানবতাবাদ শব্দটির সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি অর্থ রয়েছে। মানবতাবাদ বলতে কেউ কেউ এমন একটি তত্ত্বকে বুঝতে পারেন যা মানুষকে চূড়ান্ত লক্ষ্য এবং সর্বোচ্চ মূল্য হিসেবে তুলে ধরে। এই অর্থে মানবতাবাদকে আমরা ককতো-র গল্প ‘রাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি আওয়ার্স’-এ দেখতে পাই। সেখানে একজন চরিত্র উড়োজাহাজে করে পাহাড়ের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় বলে ওঠে, মানুষ কতই না মহান! কথাটির মানে দাঁড়ায়, যদিও আমি নিজে উড়োজাহাজ বানাইনি, তবু আমি ওই বিশেষ আবিষ্কারের সুবিধা ভোগ করছি এবং মানুষ হিসেবে কিছু নির্দিষ্ট মানুষের অর্জনগুলোর জন্য আমি নিজেকে সম্মানিত ও দায়িত্বশীল বলে ভাবতে পারি। এর মানে হলো, আমরা কয়েকজন বিশিষ্ট মানুষের মহৎ কাজের ওপর ভিত্তি করে সামগ্রিকভাবে মানুষের ওপর একটি মূল্য আরোপ করতে পারি। এই ধরনের মানবতাবাদ একেবারেই হাস্যকর। কারণ কেবল একটি কুকুর বা একটি ঘোড়াই মানুষের ওপর এমন ঢালাও বিচার করে ঘোষণা করতে পারে যে মানুষ সত্যিই মহান, অথচ তারা কখনো এমন বোকামি করেনি, অন্তত আমার জানামতে তো নয়ই। কিন্তু কোনো মানুষ যে সামগ্রিকভাবে মানুষ সত্তার ওপর বিচার করতে বসবে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অস্তিত্ববাদ এই ধরনের যেকোনো বিচারকে সম্পূর্ণ বাতিল করে দেয়। একজন অস্তিত্ববাদী কখনোই মানুষকে চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করবেন না, কারণ মানুষের স্বরূপ এখনো চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত নয়। আর ওগুস্ত কোঁতের মতো মানবজাতিকে আমরা এমন কোনো আরাধনার বস্তু বলে বিশ্বাস করারও অধিকার রাখি না, যার জন্য একটি ধর্মমত গড়ে তোলা যায়। মানবজাতির এই উপাসনা শেষ পর্যন্ত কোঁত-প্রবর্তিত মানবতাবাদেই গিয়ে ঠেকে, যা নিজের ভেতরেই আবদ্ধ থাকে এবং এ কথা বলতেই হবে যে এর চূড়ান্ত পরিণতি হলো ফ্যাসিবাদ। আমরা এমন কোনো মানবতাবাদ চাই না।
কিন্তু শব্দটির অন্য আরেকটি অর্থও রয়েছে, যার মূল কথা হলো, মানুষ সব সময়ই নিজের বাইরে অবস্থান করে। নিজের সীমানার বাইরে নিজেকে নিক্ষেপ করার এবং নিজেকে হারিয়ে ফেলার মধ্য দিয়েই সে মানুষকে অস্তিত্বশীল করে তোলে। অন্যদিকে, এই অতীন্দ্রিয় বা নিজের সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়া লক্ষ্যগুলো অনুসরণ করার মাধ্যমেই সে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়। যেহেতু মানুষ এভাবেই নিজেকে অতিক্রম করে যায় এবং কেবল নিজেকে অতিক্রম করার সাপেক্ষেই বাইরের জগৎকে ধরতে পারে, তাই সে নিজেই নিজের এই অতিক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু। মানুষের এই জগৎ বা মানবীয় আত্মসচেতনতার জগতের বাইরে আর কোনো জগতের অস্তিত্ব নেই। মানুষের গঠনের ভেতরে এই যে নিজেকে অতিক্রম করে যাওয়ার প্রবণতা, যা ঈশ্বরের অতীন্দ্রিয়তার মতো নয়, বরং নিজের সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়ার অর্থে, তার সাথে আত্মসচেতনতার একটি সম্পর্ক রয়েছে। এই আত্মসচেতনতার অর্থ হলো মানুষ কেবল নিজের ভেতরে গুটিয়ে থাকে না, বরং সর্বদাই একটি মানবীয় জগতের মধ্যে বিরাজ করে। এই সম্পর্কটিকেই আমরা অস্তিত্ববাদী মানবতাবাদ বলে থাকি। এটি মানবতাবাদ কারণ আমরা মানুষকে মনে করিয়ে দিই যে, সে নিজে ছাড়া আর কোনো আইনপ্রণেতা নেই। সম্পূর্ণ নিরাশ্রয় হয়ে তাকে নিজের সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে হবে। এটি মানবতাবাদ কারণ আমরা দেখিয়েছি যে, নিজের ভেতরে গুটিয়ে গিয়ে নয়, বরং নিজের বাইরে এমন একটি লক্ষ্য খোঁজার মাধ্যমেই মানুষ নিজেকে প্রকৃত অর্থে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে, যে লক্ষ্যটি মূলত মুক্তির বা বিশেষ কোনো অর্জনের।
এই সামান্য কয়েকটি চিন্তাভাবনা থেকেই আপনারা বুঝতে পারবেন যে, লোকেরা আমাদের বিরুদ্ধে যে আপত্তিগুলো তোলে তা কতটা অন্যায়। অস্তিত্ববাদ মূলত একটি সুসংগত নাস্তিক্যবাদী অবস্থান থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলো টেনে আনার একটি চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষকে হতাশায় ডুবিয়ে দেওয়া এর বিন্দুমাত্র উদ্দেশ্য নয়। আর হতাশা বলতে খ্রিষ্টানরা যেমন যেকোনো ধরনের অবিশ্বাসী মনোভাবকে বুঝিয়ে থাকেন, অস্তিত্ববাদীদের হতাশার অর্থ তেমন নয়, এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু। ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই, এই কথা প্রমাণের পেছনেই অস্তিত্ববাদ তার সমস্ত শক্তি ক্ষয় করে না। বরং এটি ঘোষণা করে যে, ঈশ্বরের যদি কোনো অস্তিত্ব থেকেও থাকে, তবু এর নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো কিছুই বদলাবে না। আমরা ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করি বলে এমনটা বলছি না, বরং আমরা মনে করি যে তাঁর অস্তিত্ব থাকা বা না থাকাটা আসলে আসল সমস্যা নয়। মানুষের এখন যেটা দরকার তা হলো নিজেকে নতুন করে খুঁজে পাওয়া এবং এই কথাটি বুঝতে পারা যে, সে নিজে ছাড়া আর কেউই তাকে তার নিজের হাত থেকে বাঁচাতে পারবে না, এমনকি ঈশ্বরের অস্তিত্বের কোনো অকাট্য প্রমাণও নয়। এই অর্থে অস্তিত্ববাদ চরম আশাবাদী। এটি হলো কাজের মতবাদ। আর খ্রিষ্টানরা কেবল আত্মপ্রবঞ্চনার আশ্রয় নিয়ে এবং নিজেদের হতাশার সাথে আমাদের মিলিয়ে ফেলেই আমাদেরকে আশাহীন বলে আখ্যা দিতে পারে।






Comments