সার্বভৌম সত্তা হিসেবে মুজিব : একটি নাগরিক ধর্মের নির্মাণ

সমকালীন বাংলাদেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম ও প্রতিকৃতি এক প্রকার সর্বব্যাপী। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি দপ্তর থেকে শুরু করে কাগজের মুদ্রা কিংবা রাজপথ—সর্বত্রই তাঁর ছবি দৃশ্যমান। দেশের বিভিন্ন সেতু, হাসপাতাল, সরকারি কর্মসূচি ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতাসমূহ তাঁর নামে নামাঙ্কিত হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যেমন তাঁর কর্মময় জীবন উদ্যাপিত হয়, তেমনি রাষ্ট্রীয় শোক দিবসে গভীর শ্রদ্ধায় তাঁকে স্মরণ করা হয়। এমনকি সরকারের বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তি ও অনুপ্রেরণা হিসেবে মন্ত্রীগণ প্রায়শই তাঁর নাম এবং তাঁর আদর্শের কথা উল্লেখ করেন।
বঙ্গবন্ধুর এই প্রতীকী প্রচারকে অনেকে বর্তমান শাসক দলের নিজেদের বৈধতা প্রমাণের একটি চেষ্টা হিসেবে দেখেন। গত দুটি নির্বাচন নিয়ে দেশে ও বিদেশে নানা প্রশ্ন থাকায় আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুকে জাতির মূর্ত প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে চাইছে। তবে এই বিতর্কের মূল বিষয় বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত মর্যাদা নয়, বরং তাঁকে কেবল একটি দলের ‘একচেটিয়া’ সম্পদ বানানোর প্রবণতা। জাতির পিতা হিসেবে তাঁর অবস্থান নিয়ে বিতর্ক খুব কম। এমনকি বঙ্গবন্ধুর এক সময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও বর্তমান বিরোধী নেতা কামাল হোসেনও মনে করেন, বঙ্গবন্ধুকে শুধু একটি দলের সম্পত্তি বানানো মানে তাঁকে অসম্মান করা এবং তাঁর আদর্শকে অমান্য করা।
তা সত্ত্বেও, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে এক ধরনের ‘কাল্ট’ গড়ে উঠেছে। এখানে বঙ্গবন্ধুকে প্রতিদিনকার সাধারণ রাজনীতির ঊর্ধ্বে এক অমর ও পবিত্র কর্তৃপক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস রয়েছে। এর দ্বারা মূলত একটি ‘নাগরিক ধর্ম’ তৈরি হয়, যার মাধ্যমে জাতীয় ইতিহাস এবং এর মহান নেতাকে এক আধ্যাত্মিক পবিত্রতা দেওয়া হয়। এগুলো আবেগ, আনুগত্য ও ত্যাগের গল্প। এই প্রক্রিয়াটি সফল হলেও এর পেছনে একটি দ্বন্দ্ব আছে। এটি একদিকে যেমন রাষ্ট্রের সাজানো একটি কৌশল, অন্যদিকে তেমনি এটি মানুষের সহজাত আবেগের ওপর নির্ভরশীল।
এই প্রবন্ধটিতে মূলত বঙ্গবন্ধু কাল্টের প্রতীকী দিকগুলো নিয়ে কাজ করা হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো এই অনুসন্ধান করা যে, কীভাবে স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন নেতা কার্যত একটি পবিত্র প্রতীক এবং জাতির অমর সার্বভৌম কর্তৃপক্ষে পরিণত হলেন। আলোচনার শুরুতে বঙ্গবন্ধুর একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়া হবে এবং এরপর ‘নাগরিক ধর্ম’ ধারণাটি নিয়ে আলোচনা করা হবে। সবশেষে গবেষক অ্যান ট্যাভসের চিহ্নিত ‘বিশেষ সত্তার’ চারটি দিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই আলোচনা শেষ হবে।
নাগরিক ধর্ম ও জাতীয়তাবাদ
সমকালীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ভক্তি বা শ্রদ্ধাবোধ মূলত বঙ্গবন্ধু ও রাষ্ট্রকে একীভূত করে দেখারই একটি বহিঃপ্রকাশ। এখানে রাষ্ট্রকে শ্রদ্ধা জানানো মানেই বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা জানানো, এবং এর উল্টোটিও সমানভাবে সত্য। বঙ্গবন্ধুর এই ‘কাল্ট’ বা ব্যক্তিবন্দনাকে ‘নাগরিক ধর্ম’ হিসেবে বিশ্লেষণ করা যুক্তিযুক্ত; কারণ এই ধারণাটি মূলত একটি জাতির পবিত্রিকরণ এবং একটি জনসমষ্টির নিজেদের প্রতি নিজেদের পরম শ্রদ্ধাবোধকে নির্দেশ করে। জাতির এই পবিত্রতার ধারণাটি মূলত সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুরখেইমের চিন্তা থেকে এসেছে, যিনি দেশপ্রেমকে ‘আধুনিক সমাজের নাগরিক ধর্ম’ হিসেবে দেখেছিলেন। জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেম মিলে সমাজে এক ধরনের ‘সম্মিলিত ভক্তি’ তৈরি করে, যেখানে জাতি নিজেই পরম শ্রদ্ধার বিষয়ে পরিণত হয়।
নাগরিক ধর্মের এই ধারণার পেছনে দুটি ধারা কাজ করে: একটি হলো জাতীয়তাবাদ বিষয়ক গবেষণা এবং অন্যটি ধর্মতত্ত্ব। অ্যান্থনি ডি. স্মিথ জাতীয়তাবাদের ‘পবিত্র দিক’ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ডুরখেইমের পথ অনুসরণ করেছেন এবং জাতীয়তাবাদকে এক বিশেষ ধরনের ‘রাজনৈতিক ধর্ম’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। স্মিথের মতে, জাতিকে ‘নাগরিকদের এক পবিত্র জনসমষ্টি’ হিসেবে দেখা যেতে পারে, যা মূলত মানুষের ইচ্ছাশক্তি এবং অভিন্ন ঐতিহ্যের অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। কট্টর জাতীয়তাবাদীদের কাছে জাতির এই পবিত্রতার মূল কারণ হলো—জাতিই সকল রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতার উৎস এবং জাতির প্রতি আনুগত্য অন্য সবকিছুর ঊর্ধ্বে। যারা নিজেদের জাতির সাথে একাত্ম মনে করেন, তারা বিশ্বাস করেন যে নিজেরা স্বাধীন থাকতে হলে জাতির স্বাধীন হওয়া সবার আগে জরুরি। এই অনুভূতির কারণেই মানুষ এমনকি স্বৈরাচারী শাসকের অধীনেও দেশের জন্য যুদ্ধে যেতে দ্বিধা করে না। মূলত এই জনগোষ্ঠী, তাদের ভূখণ্ড, ঐতিহ্যগত স্মৃতি, প্রতীক এবং কিংবদন্তিগুলোর ওপরই এক ধরনের পবিত্রতা আরোপ করা হয়।
নাগরিক ধর্মের ধারণার দ্বিতীয় ধারাটি এসেছে ধর্মতত্ত্ব বা ধর্মবিষয়ক গবেষণা থেকে। এ বিষয়ে রবার্ট বেলাহ একজন প্রধান গবেষক। তিনি ১৯৬৭ সালে তাঁর এক প্রবন্ধে পশ্চিমা গণতন্ত্রের পবিত্র দিকগুলো বোঝাতে এই শব্দটি ব্যবহার করেন। সাধারণত ‘নাগরিক ধর্ম’ নিয়ে বেশির ভাগ আলোচনা আমেরিকা বা ইউরোপের প্রেক্ষাপটেই হয়ে থাকে। তবে এমিলিও জেন্টিল এক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রম; তিনি গণতন্ত্রের পাশাপাশি ফ্যাসিবাদ বা একনায়কতন্ত্রের মতো রাজনৈতিক আদর্শগুলো নিয়েও আলোচনা করেছেন। তিনি মূলত গণতন্ত্রের ‘নাগরিক ধর্ম’ এবং একনায়কতন্ত্রের ‘রাজনৈতিক ধর্ম’—এই দুইয়ের মধ্যে একটি পার্থক্য করার চেষ্টা করেছেন। এই দুটি বিষয়ের পার্থক্য করা বেশ কঠিন। তবে এখান থেকে একটি বিষয় বোঝা যায়। জাতীয় পতাকাকে সম্মান জানানো বা জাতীয় দিবস পালনের মতো গণতান্ত্রিক নিয়মগুলো আর একনায়কতান্ত্রিক শাসনে বাধ্য হয়ে আনুগত্য প্রকাশ করা এক নয়। যদিও দুটোর পেছনেই মানুষের একই রকম মানসিক তাড়না কাজ করে।
অধিকাংশ গবেষকের মতে, নাগরিক ধর্ম মূলত কোনো এক উচ্চতর কর্তৃপক্ষ এবং অতি-মানবিক মূল্যবোধের ওপর বিশ্বাসের নাম। এটি মানুষের সেই মৌলিক প্রয়োজন ও অনুভূতিগুলো থেকেই তৈরি হয়েছে, যা থেকে একসময় বড় বড় ধর্মগুলোর জন্ম হয়েছিল। অবশ্যই প্রচলিত ধর্মগুলোর মধ্যে অনেক বৈচিত্র্য আছে, যেমন—একেশ্বরবাদী ধর্ম থেকে শুরু করে প্রাচ্যের আধ্যাত্মিক ধর্ম কিংবা আধুনিক কালের নানা মতবাদ। জাতীয়তাবাদ এবং নাগরিক ধর্ম এই দুই প্রান্তের মাঝামাঝি কোথাও অবস্থান করে। নাগরিক ধর্মে এমন কোনো অতি-মানবিক ‘ঈশ্বর’ নেই যার কাছে মানুষ দয়া বা করুণা ভিক্ষা করতে পারে। তবুও এটি কিছু আচার-অনুষ্ঠান ও উপকথার মাধ্যমে মৃত, জীবিত এবং অনাগত প্রজন্মের মধ্যে একটি পবিত্র বন্ধন তৈরি করে। এই বন্ধনের মাধ্যমেই মানুষ পৃথিবীতে তার জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য ও অর্থ খুঁজে পায়।
রাজনৈতিক কাঠামোর জন্যও জাতীয়তাবাদ ও নাগরিক ধর্ম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রুশো, ডুরখেইম, হান্না আরেন্ট বা আগামবেনের মতো দার্শনিকরা দেখিয়েছেন যে, ধর্মীয় শাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য আইনের একটি উচ্চতর এবং স্বাধীন ভিত্তি খুঁজে পাওয়া ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সমাজকে সুশৃঙ্খল রাখতে এমন এক সার্বভৌম কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন, যা কোনো বিশেষ নেতার ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা ক্ষণস্থায়ী জনমতের ঊর্ধ্বে থাকবে। নাগরিক ধর্ম ঠিক সেই উচ্চতর কর্তৃপক্ষ বা মানদণ্ড হিসেবে কাজ করে সমাজকে নিয়ন্ত্রিত ও ঐক্যবদ্ধ রাখে।
ইতিহাসবিদ ডেভিড গিলমার্টিনের মতে, পার্থিব ক্ষমতা নিজে নিজে নিজের বৈধতা প্রমাণ করতে পারে না। ক্ষমতাকে সঠিক বা ন্যায্য হিসেবে তুলে ধরতে হলে কোনো না কোনো উচ্চতর শক্তির সাহায্য নিতে হয়। প্রাচীনকালে রাজারা বলতেন তারা ঈশ্বরের নির্দেশে দেশ চালাচ্ছেন। রোমান সম্রাটরা তাঁদের ক্ষমতার ভিত্তি হিসেবে পুরোনো রীতিনীতিকে তুলে ধরতেন। আবার ব্রিটিশরা দাবি করত তারা বিশ্বকে সভ্য করার দায়িত্ব নিয়ে এসেছে।
বর্তমানের গণতান্ত্রিক বিশ্বে ঈশ্বরের সেই জায়গা আর নেই। এখন মানুষ সমতা, মর্যাদা আর পারস্পরিক শ্রদ্ধার কথা বলে। কিন্তু এই ধারণাগুলো বেশ জটিল। এগুলো নিয়ে সবসময় বিতর্ক হতে পারে। আধুনিক গণতন্ত্রে ক্ষমতার একটি বড় শূন্যতা আছে। কারণ এখানে ক্ষমতার মালিক কোনো এক ব্যক্তি নয়, বরং ‘জনগণ’। কিন্তু ‘জনগণ’ আসলে একটি বিমূর্ত ধারণা। তাই এই শূন্যতা পূরণ করতে সবসময় নতুন নতুন প্রতীক, ছবি বা বক্তৃতার প্রয়োজন হয়। যেমন দক্ষিণ ভারতে সিনেমার জনপ্রিয় নায়করা রাজনীতিতে এসে এই অভাব দূর করেন।
যুদ্ধের মাধ্যমে আসা নতুন সরকারগুলোর জন্য ক্ষমতার এমন একটি ভিত্তি খুঁজে পাওয়া খুব জরুরি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এটি দারুণভাবে সত্য। ১৯৭১ সালের যুদ্ধ ছিল একটি বিশাল পরিবর্তন। এই যুদ্ধের মাধ্যমে আগের সব নিয়ম বাতিল করা হয়। নতুন এক ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ার শপথ নেওয়া হয়। এই নতুন ব্যবস্থার বৈধতা আসে সেই মহান যুদ্ধ এবং মানুষের বিশাল আত্মত্যাগ থেকে। তাই এই ব্যবস্থার ওপর প্রশ্ন তোলা মানে সেই বিশাল ত্যাগকে অসম্মান করা।
গবেষক রবার্ট ইয়েল সার্বভৌম ক্ষমতাকে এক বিশেষ শক্তির সাথে তুলনা করেছেন। তাঁর মতে, এই শক্তি অনেকটা ‘পবিত্র’ কিছুর মতো কাজ করে। এটি যেমন মানুষের জীবন-মৃত্যুর ওপর কর্তৃত্ব রাখে, তেমনি এটি মানুষের ভক্তি ও ত্যাগ গ্রহণ করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, বঙ্গবন্ধুকে দেবতা বানানো না হলেও তাঁকে এমন এক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে যার মর্যাদা প্রায় ‘পবিত্র’। তাঁর কথা বা অবস্থানকে তাই কেউ সহজে চ্যালেঞ্জ করতে পারে না।
বঙ্গবন্ধুকে যেভাবে পবিত্র ও শ্রদ্ধার আসনে বসানো হয়েছে, তার সাথে গবেষক অ্যান ট্যাভসের ‘বিশেষ সত্তা’ (special beings) ধারণার এক অভাবনীয় মিল পাওয়া যায়। কোনো কিছু বা কোনো ব্যক্তিকে ঠিক কী কারণে আমরা ‘পবিত্র’ বলে গণ্য করি, ট্যাভস মূলত তা-ই ব্যবচ্ছেদ করে দেখিয়েছেন। এই আলোচনায় আমরা বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রে বিশেষভাবে কার্যকর এমন চারটি দিক নিয়ে কথা বলব।
প্রথম বিষয়টি হলো ‘অনন্যতা’ (Singularity)। ট্যাভসের মতে, এই ধরনের অনন্য বৈশিষ্ট্য কেবল নিরস ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকে না। বরং এটি বেঁচে থাকে বিভিন্ন গল্প, আখ্যান এবং নানা আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সেই বিশেষ মুহূর্ত বা সত্তার বারবার স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে।
দ্বিতীয়ত, বঙ্গবন্ধুর এই অনন্য রূপটি গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে তাঁর ‘ব্যতিক্রমী সক্ষমতা’ (Anomalous agency)। এর অর্থ হলো সাধারণ মানুষের সীমানার বাইরে বিশেষ কোনো গুণের অধিকারী হওয়া। আমরা দেখতে পাই যে, ইতিহাসে তাঁর বিশেষ অবস্থান এবং তাঁর প্রখর ইচ্ছাশক্তি, জাদুকরী বাগ্মিতা ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে তিনি যেভাবে সাধারণ মানুষকে বিশাল আত্মত্যাগের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছিলেন—এই গুণগুলোই তাঁকে অনন্য করেছে।
তৃতীয় বিষয়টি হলো ‘আবেগীয় বন্ধন’ (Emotional lien)। কোনো একটি বিশেষ সত্তার সাথে কোনো ব্যক্তির বা একটি গোটা জনগোষ্ঠীর যে গভীর আত্মিক পরিচয় ও আবেগের টান থাকে, এটি মূলত তারই প্রতিফলন। অর্থাৎ, বঙ্গবন্ধুর সাথে এ দেশের মানুষের যে আত্মিক সম্পর্ক, তা এই ‘পবিত্রতার’ ধারণাকে আরও মজবুত করে।
এবং সবশেষে রয়েছে বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে থাকা বিভিন্ন আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা এবং নিষেধাজ্ঞা। ট্যাভসের মতে, কোনো ব্যক্তি বা বিষয় যখন ‘পবিত্র’ হিসেবে গণ্য হয়, তখন সমাজ ও আইন তাকে বিশেষ সুরক্ষায় রাখে এবং তাকে নিয়ে যেকোনো নেতিবাচক বিষয়ে এক ধরনের অলিখিত বা লিখিত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রেও এই সুরক্ষার বিষয়টি স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়, যা তাঁর এই ‘পবিত্র’ বা ‘বিশেষ’ মর্যাদারই একটি বড় লক্ষণ।
অনন্যতা
ঐতিহাসিকভাবে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা। তিনি ছিলেন সেই আওয়ামী লীগের প্রধান ব্যক্তিত্ব, যার নেতৃত্বে এই স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালিত হয়েছিল। ১৯৫০-এর দশকে তিনি যখন প্রথম রাজনীতিতে সক্রিয় হন, তখন আজকের বাংলাদেশ ছিল পাকিস্তানের একটি প্রদেশ এবং দেশটির পূর্ব অংশ। একজন ছাত্রনেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান সেই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন, যা শুরুতে ছিল এই অবহেলিত প্রদেশের অধিকার আদায়ের লড়াই। তবে খুব দ্রুতই সেই আন্দোলন স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে রূপ নেয়। আওয়ামী লীগ দলটি প্রবীণ রাজনীতিকদের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করলেও, তরুণ ও প্রাণবন্ত মুজিবুর রহমান দ্রুত এর নেতৃত্বে চলে আসেন। পুরো ষাটের দশক জুড়ে তিনি ছিলেন আন্দোলনের প্রধান মুখ এবং তাঁর অনুসারীরা ভালোবেসে তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। তাঁর প্রখর ব্যক্তিত্ব এবং জাদুকরী বক্তৃতার প্রভাবে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী ও সামরিক নেতারা ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানালে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয়। দীর্ঘ যুদ্ধের পুরোটা সময় তিনি পাকিস্তানে বন্দি থাকলেও, তাঁর নামেই এই স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল। ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসার পর সাধারণ মানুষের উপচে পড়া ভিড় আর উচ্ছ্বাস প্রমাণ করে দেয় যে তিনি কতটা জনপ্রিয় ছিলেন। ১৯৭৫ সালে নির্মমভাবে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন এই নবজাতক রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী।
ব্যক্তিগতভাবে বঙ্গবন্ধু কেবল একটি জাতির বিমূর্ত প্রতীক ছিলেন না, বরং রাষ্ট্র গঠনের প্রতিটি বাস্তব কাজের সাথে তিনি সরাসরি জড়িত ছিলেন। দেশের সংবিধান তৈরি থেকে শুরু করে রাজনৈতিক জীবনের কাঠামো গঠন—সবই হয়েছে তাঁর হাত ধরে। বলা যায়, তাঁর হাত ধরেই এই জাতির জন্ম হয়েছে এবং এর সূচনালগ্ন ছিল তাঁরই ব্যক্তিত্বের ছাপে রঙিন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর এই অবস্থান নিয়ে বেশ কিছু ভক্তিমূলক লেখাও পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৩ সালে তাঁর ৯৩তম জন্মদিনে দৈনিক ‘নিউ এজ’ পত্রিকার একটি বিশেষ সাপ্লিমেন্টের কথা বলা যেতে পারে। পত্রিকাটি সাধারণত বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত। অথচ সেখানে বঙ্গবন্ধুকে ‘হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি’, ‘স্বাধীন বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির মহান স্থপতি’ এবং ‘সোনার বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি’—এই বাক্যটি এখন বহুল ব্যবহৃত, যার সূত্রপাত হয়েছিল ২০০৪ সালে বিবিসি বাংলা সার্ভিসের একটি জনমত জরিপে। সেই সময় তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় ছিলেন না, যা এই জনমতের সত্যতা ও গ্রহণযোগ্যতাকে আরও জোরালো করে। এমনকি দেশের প্রধান বিচারপতিও এক প্রসঙ্গে তাঁকে ‘এই মাটির শ্রেষ্ঠ সন্তান’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং তাঁর হত্যাকাণ্ডকে বাংলাদেশের ইতিহাসের ‘সবচেয়ে বেদনাদায়ক ও কলঙ্কজনক অধ্যায়’ বলে অভিহিত করেছেন।
এ ধরনের আবেগী প্রকাশভঙ্গি বাংলাদেশে মোটেও বিরল নয়। নয়নিকা মুখার্জির ভাষায়, বঙ্গবন্ধু সমকালীন বাংলাদেশের জন্য এক অনন্য ‘স্মৃতিভূমি’ বা ‘স্মৃতির আধার’ হয়ে উঠেছেন। ১৯৭১ সালের যাবতীয় স্মৃতি ও ঘটনাবলী মূলত তাঁকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত ও বিন্যস্ত হয়। তাঁকে দেখা হয় ইতিহাসের সেই কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে, যাঁর চারপাশেই সব ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ বিকশিত হয়েছে। তাঁর জীবনের নানা দিক নিয়মিতভাবে বিভিন্ন দিবসের ভাষণ, সংবাদপত্রের কলাম, টেলিভিশনের আলোচনা কিংবা রাস্তার ধারের ব্যানারগুলোতে কোনো না কোনোভাবে ফিরে আসে।
এ ধরনের বক্তৃতা বা চাক্ষুষ যোগাযোগের বাইরেও বাংলাদেশে তাঁর এই বিশেষ অবস্থানের অসংখ্য বাস্তব নিদর্শন রয়েছে। উইকিপিডিয়ায় ‘শেখ মুজিবুর রহমানের নামে নামাঙ্কিত বিষয়ের তালিকা’ শীর্ষক একটি পাতায় প্রায় ৭০টি সরকারি সংস্থা, ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাস্তা, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং পার্কের নাম পাওয়া যায়। তবে এই তালিকাটি কোনোভাবেই পূর্ণাঙ্গ নয়। সাধারণত যেকোনো খাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, অনুষ্ঠান, ভবন বা বড় কোনো উদ্যোগ বঙ্গবন্ধুর নামেই নামকরণ করা হয়। এছাড়াও তাঁর নামে ফেলোশিপ প্রোগ্রাম, উদ্ভাবনী অনুদান, হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি অতিথি অধ্যাপক পদ এবং একটি আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্টও চালু রয়েছে।
সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের গভীরে তাঁর উপস্থিতির সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো তাঁর প্রতিকৃতির সর্বব্যাপী অবস্থান। নারায়ণগঞ্জের রাস্তার ধারের বড় ব্যানার কিংবা দেশের দক্ষিণাঞ্চলের কোনো এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দেওয়ালে তাঁর যে ছবি দেখা যায়, সেটিই তাঁর সবচেয়ে আইকনিক রূপায়ন। এই বিশেষ ছবিতে তাঁকে খুব সাধারণ বা সহজলভ্য কোনো মানুষ হিসেবে নয়, বরং অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং এক নজরেই চেনা যায় এমন এক ব্যক্তিত্ব হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে বঙ্গবন্ধু তাঁর তর্জনী উঁচিয়ে কথা বলতেন; এখন কেবল সেই তর্জনীর ছবি ব্যবহার করেই অনেক জায়গায় তাঁর উপস্থিতি ও কর্তৃত্বের সংকেত দেওয়া হয়। একইভাবে তাঁর চশমাটিও একটি কালজয়ী প্রতীকে পরিণত হয়েছে, যা তাঁর জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্রের (‘মুজিব: একটি জাতির রূপকার’) পোস্টারেও প্রধান্য পেয়েছে। এমনকি তাঁর পরনের কালো কোটটি যেমন জাদুঘরে সগৌরবে প্রদর্শিত হয়, তেমনি একটি উপন্যাসে এই কোটটির অলৌকিক ক্ষমতার বর্ণনাও পাওয়া যায়।
রাজার প্রতিকৃতি নিয়ে একজন ফরাসি সভাসদের চিন্তা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ইতিহাসবিদ লুই মারিন বলেছিলেন, “একটি প্রতিকৃতির আসল রহস্য হলো তার মাধ্যমে একচ্ছত্র ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ব করা।” রাজার প্রতিকৃতি কেবল রক্তমাংসের একজন মানুষের ছবি ছিল না, বরং তা ছিল তাঁর তেজ, ক্ষমতা এবং অসীমত্বের প্রকাশ। রাজার পার্থিব বা ঐতিহাসিক শরীরের চেয়ে তাঁর যে ‘রাজনৈতিক সত্তা’ প্রতিকৃতির মাধ্যমে ফুটে উঠত, সেটিই ছিল অধিক গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিকৃতিটিই হয়ে উঠত স্বয়ং রাজা, যার মাধ্যমে তাঁর শাসনের মহিমা চিরস্থায়ী রূপ পেত।
বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি কার্যত কাগজের মুদ্রা থেকে শুরু করে প্রতিটি সরকারি দপ্তর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং রাজপথে সর্বত্রই বিরাজমান। ইতিহাসবিদ মারিনের তত্ত্ব অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধুর এই প্রতিকৃতি এবং তাঁর নাম আজ তাঁর অসীম তেজ ও ক্ষমতার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। তবে যেহেতু তিনি শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে নেই, তাই তাঁর এই ছবি ও নাম প্রকারান্তরে সেই শক্তিরই প্রতিনিধিত্ব করে যারা এই ‘ভক্তিবাদ’ বা কাল্ট গড়ে তুলেছে—অর্থাৎ বর্তমান শাসকগোষ্ঠী, তাঁর হাতে গড়া রাজনৈতিক দল এবং সর্বোপরি তাঁর কন্যা। এর মাধ্যমেই তাঁরা মূলত সর্বত্র নিজেদের উপস্থিতির জানান দেওয়ার একটি সুযোগ পান।
বিপ্লব-পূর্ব ফ্রান্সে একজন সভাসদের কাছে রাজার মর্যাদা ছিল অনেকটা ঈশ্বরপ্রদত্ত বা উচ্চবর্গের প্রতি সহজাত শ্রদ্ধার মতো। কিন্তু বর্তমানের এই ধর্মনিরপেক্ষ যুগে সাধারণ নাগরিকদের কাছে সেই ভক্তি কেবল অলৌকিক ভয় বা ভক্তি দিয়ে ধরে রাখা সম্ভব নয়। তাই জনগণের সাথে সংযোগ স্থাপনের জন্য এমন কিছু আবেগীয় আখ্যান বা গল্পের প্রয়োজন, যা ছাড়া বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি ও নাম কেবল প্রাণহীন আধারে পরিণত হতো। এই আখ্যানগুলোই মূলত মানুষকে তাঁর সাথে মানসিকভাবে একাত্ম করে এবং তাঁদেরকে প্রভাবিত করে।
ব্যতিক্রমী সক্ষমতা
বিভিন্ন আখ্যান ও গল্পের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর জীবন এবং তাঁর ইতিহাসকে বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের কেবল কেন্দ্রবিন্দু নয়, বরং অপরিহার্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত নানা ভক্তিভরে লেখা কাহিনীতে এই আখ্যানগুলো ফুটে ওঠে। যেমন—জাতীয় শিশু দিবস (যা বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনও বটে) হলো এমন এক উপলক্ষ যেখানে তাঁর ওপর নানা অসাধারণ গুণাবলি আরোপ করা হয়। সেখানে তাঁকে এমন একজন মানুষ হিসেবে তুলে ধরা হয় যিনি বন্ধুমহলে অত্যন্ত প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় ছিলেন, পড়াশোনায় ছিলেন তুখোড় এবং বড়দের কাছেও ছিলেন দারুণ সমাদৃত। তাঁর জীবন নিয়ে তৈরি চার খণ্ডের একটি কার্টুন উপন্যাসে তাঁকে দীর্ঘদেহী, সুদর্শন এবং সকল উদ্যোগের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, যিনি একই সাথে ছিলেন গভীর চিন্তাশীল ও অত্যন্ত কর্মোদ্যমী। ২০১৩ সালে তাঁর জন্মবার্ষিকীতে দৈনিক ‘নিউ এজ’-এর একটি বিশেষ সংখ্যায় তাঁর কন্যা উল্লেখ করেছিলেন যে, ‘শৈশব থেকেই বঙ্গবন্ধু ছিলেন নির্ভীক ও সাহসী এবং তাঁর বুদ্ধিমত্তা ছিল অসাধারণ।’
রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত ইতিহাস প্রচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো স্কুলের পাঠ্যবই। শিশুরা এই বইগুলোর মাধ্যমেই প্রথম দেশের ইতিহাসের সাথে পরিচিত হয়। একটি জাতি নিজের সম্পর্কে বিশ্বকে কী জানাতে চায়, কিংবা পাঠ্যপুস্তক রচয়িতারা জাতিকে কীভাবে উপস্থাপন করতে চান—তার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হলো এই বইগুলো। উদাহরণ হিসেবে, প্রথম শ্রেণির ‘আমার বাংলা বই’-এ দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সাথে শিশুদের যেভাবে প্রথম পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে তা লক্ষ্য করা যেতে পারে। ‘মুক্তিযোদ্ধাদের কথা’ শিরোনামের এই পাঠটিতে বঙ্গবন্ধুর একটি ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে লেখা আছে:
আমাদের দেশ বাংলাদেশ। এ দেশ যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হয়েছে। এটি ছিল এক বিশাল ঘটনা। পাকিস্তানিরা বাঙালিদের ওপর আক্রমণ করেছিল। তখন বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিলেন। তিনি আমাদের মহান নেতা। তাঁর নাম শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি আমাদের জাতির পিতা। পাকিস্তানি সৈন্যরা ছিল দানবের মতো। তারা লাখ লাখ বাঙালিকে হত্যা করেছে। হাজার হাজার বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে। বাঙালিরা বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়েছিল। পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হলো। যাঁরা যুদ্ধ করেছিলেন তাঁরাই মুক্তিযোদ্ধা। তাঁদের বুকে ছিল সাহস আর দেশের প্রতি ভালোবাসা। অনেকে জীবন দিয়েছেন। যুদ্ধ চলেছিল নয় মাস। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি সৈন্যরা পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হলো। আমরা জয়ী হলাম। স্বাধীন দেশের বুকে লাল-সবুজের পতাকা উড়ল। আমরা আমাদের দেশকে ভালোবাসি। আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের ভালোবাসি।
রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও বিপুল আত্মত্যাগের মাধ্যমে যে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে, তার পেছনে বঙ্গবন্ধুকে একমাত্র এবং মূল চালিকাশক্তি হিসেবে এই পাঠে উপস্থাপন করা হয়েছে। দুটি বিশেষ বাক্যে বিষয়টি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে: বঙ্গবন্ধু ‘স্বাধীনতার ডাক দিলেন’ এবং ‘বাঙালিরা বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়েছিল’। অর্থাৎ, বঙ্গবন্ধু ডাক দিয়েছিলেন বলেই বাঙালিরা পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল এবং দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণপণ লড়াই করেছিল। এই বর্ণনা অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধু একাই সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন এবং তাঁদের মনে সাহসের সঞ্চার করেছিলেন। যদিও পাঠের শিরোনাম এবং শেষ দিকের অনুচ্ছেদটি মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে লেখা, কিন্তু আলোচনার শুরু এবং সাথে দেওয়া ছবিটি বঙ্গবন্ধুরই। মূলত পুরো বর্ণনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে বঙ্গবন্ধুকে রাখা হয়েছে।
১৯৭১ সালের ইতিহাসের বর্ণনায় শত্রুদের কীভাবে তুলে ধরা হয়েছে, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখানে যুদ্ধকে এক ধরনের ‘বিপ্লব’ হিসেবে দেখানো হয়। যেমন—আগের পাঠ্যটিতে আমরা দেখেছি, এর প্রধান চরিত্র হলেন বঙ্গবন্ধু এবং শান্তিকামী বাংলাদেশিরা। অন্যদিকে তাঁদের প্রতিপক্ষকে বর্ণনা করা হয়েছে ‘দানব’ হিসেবে।
উচ্চতর শ্রেণির পাঠ্যবইগুলোতেও যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তাদের সবাইকে ‘রাজাকার’ বা বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পুরো পাঠ্যবই জুড়ে হত্যা, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া আর ত্যাগের নানা গল্প রয়েছে। এই গল্পগুলোর শেষ হয় দানবদের পরাজয় আর দেশের স্বাধীনতার মাধ্যমে। এই ধরনের বর্ণনার মূল উদ্দেশ্য হলো এটি বোঝানো যে, ১৯৭১ সালের আগে কেবল দুঃখ আর সংগ্রাম ছিল। তখন পাকিস্তানি ‘দানবরা’ এ দেশে অত্যাচার, হত্যা আর অগ্নিসংযোগ চালাত। কিন্তু যুদ্ধের মাধ্যমে এক নতুন ব্যবস্থা তৈরি হলো। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাধারণ মানুষ তাঁদের সাহস দিয়ে এই যুদ্ধ জয় করলেন। এর ফলে একটি খারাপ ও বিশৃঙ্খল অতীতের অবসান ঘটল এবং এক নতুন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ তৈরি হলো। এক কথায়, আগের সময়টা ছিল দানবীয়, আর পরের সময়টা হলো পবিত্র ও কল্যাণকর। অনেক জায়গায় এই যুদ্ধকে ‘হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল’ ভাঙার গল্প হিসেবেও দেখা হয়।
তবে জাতীয়তাবাদী এই ইতিহাসের বর্ণনায় অনেক বিষয় এড়িয়ে যাওয়া হয় বা খুব সহজ করে দেখানো হয়। স্বাধীন বাংলাদেশ কেমন হবে, তা নিয়ে তখন অনেকেরই ভিন্ন ভিন্ন স্বপ্ন ছিল। যেমন—একদল উগ্রপন্থী ছাত্র ২০ শতকের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের আদলে দেশ গড়তে চেয়েছিল। তারা এমনকি আলাদা গেরিলা বাহিনীও গঠন করেছিল, যারা সরকারি বাহিনীর সাথে যোগ দেয়নি। তাদের একটি অংশ ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে কড়া বিরোধিতাও গড়ে তুলেছিল। আবার ‘মওলানা ভাসানী’ ইসলামী নীতির ওপর ভিত্তি করে এক ধরনের সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ চেয়েছিলেন। সেখানে অনেক নরমপন্থী, মাওবাদী এবং ভারতপন্থী ও ভারত-বিরোধী নানা গোষ্ঠী ছিল। এই ‘নতুন শুরুর’ স্বপ্নটি সবার কাছে একই রকম ছিল না, বরং তা ভিন্ন ভিন্ন দিকে নির্দেশ করছিল।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধুর যে চার বছরের শাসনকাল (১৯৭২-১৯৭৫), তা জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের আলোচনায় প্রায়ই এড়িয়ে যাওয়া হয়। এই বছরগুলো ছিল সংঘাতে ভরা এবং অত্যন্ত কঠিন। এই সময়ের ইতিহাস স্বাধীনতা সংগ্রামের চেয়ে অনেক বেশি বিতর্কিত। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি কেবল অভাব-অনটনেই ভোগেনি, বরং অপশাসন, ক্ষমতাসীন দলের দুর্নীতি, অর্থপাচার এবং চোরাচালানের মতো সমস্যায় জর্জরিত ছিল। সে সময় রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড এবং এমনকি বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধেও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছিল। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে বঙ্গবন্ধু বহুদলীয় গণতন্ত্র বাতিল করে ‘বাকশাল’ নামক একদলীয় শাসন ব্যবস্থা চালু করেন। বর্তমান সময়ে তাঁর নিজের দলও এই সময়কাল নিয়ে কথা বলতে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করে। এই বছরগুলো ছিল বেশ সংকটময়। তাই বঙ্গবন্ধুকে যখন মহিমান্বিত করা হয়, তখন তাঁর এই একদলীয় শাসনের কথা না তুলে কেবল স্বাধীনতা সংগ্রামের ওপরই জোর দেওয়া হয়।
জাতির নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর এই ভাবমূর্তি তৈরির প্রক্রিয়ার মধ্যে আসলে বিশেষ কোনো নতুনত্ব নেই। গবেষক রেইচার ও হপকিন্সের মতে, ‘প্রতিটি জাতিরই নিজস্ব নায়ক থাকে’। জাতীয় আখ্যানগুলোতে সবসময়ই কিছু ‘আদর্শ চরিত্র’ থাকে, যাঁদের বীরত্বের কাহিনী বারবার বলা হয়। তবে বঙ্গবন্ধুর এই বর্তমান ভাবমূর্তিটি বুঝতে হলে আমাদের এটিও দেখতে হবে যে, তাঁর রাজনৈতিক সত্তার কিছু দিককে কীভাবে ছেঁটে ফেলা হয়েছে। ভারতীয় পাঠ্যপুস্তকের ওপর করা এক গবেষণায় লার্স তোর ফ্ল্যাটেন একে ‘ফোরগ্রাউন্ডিং’ বা ‘সামনের বিষয়কে বড় করে দেখানো’ বলে অভিহিত করেছেন। এর মানে হলো, নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের ওপর অনেক বেশি জোর দেওয়া হয় এবং অন্য অনেক প্রাসঙ্গিক বিষয়কে হয় বাদ দেওয়া হয়, না হয় খুব সংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়। বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রেও তাঁর এই অনন্য প্রভাব বা ক্ষমতাকে বিশেষভাবে সামনে আনা হয়; বিশেষ করে তিনি কীভাবে পথ দেখিয়েছেন এবং সাধারণ মানুষ তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছে—সেটিই মুখ্য হয়ে ওঠে। মানুষের কাছে তাঁর যে দৃষ্টিভঙ্গি আবেদন তৈরি করেছিল, তাকেই এখন ‘বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন’ বা তাঁর ‘চেতনা’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। এই শব্দগুলোই এখন সরকারি বক্তৃতা ও লেখায় নিয়মিত ব্যবহার করা হয়। যেমন—২০২০ সালের শোক দিবসে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বঙ্গবন্ধুকে ‘বাঙালি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা ও মহান স্বাধীনতার রূপকার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সরকারি এই ভাষ্য অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্ন ছিল একটি ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তোলা। তাঁর স্বপ্ন কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল একটি সুখী ও অভাবমুক্ত জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা। রাষ্ট্রপতির ভাষায়, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত একটি সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করা। এই কথাগুলোই এখন তাঁর স্বপ্ন বোঝাতে বারবার ঘুরেফিরে আসে। এর বাইরে এই স্বপ্নের ধারণাটি বেশ অস্পষ্ট এবং এর কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নেই। ঐতিহাসিকভাবে বঙ্গবন্ধু নিজে কোনো সুনির্দিষ্ট ‘মতবাদ’ বা ‘আইডিওলজি’র জন্ম দিয়ে যাননি, যদিও তাঁর কর্মীরা ‘মুজিববাদ’ নিয়ে অনেক কথা বলতেন। আসলে এই মুজিববাদ তাঁর ব্যক্তিত্বকে ঘিরে তৈরি হওয়া এক ধরনের ভক্তিবাদ ছাড়া আর কিছুই ছিল না।
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন হিসেবে উপস্থাপন করা এই উচ্চাভিলাষী অথচ অস্পষ্ট লক্ষ্যগুলোই এখন জাতির প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। এগুলো সরকারের প্রতিটি কাজকে যেমন বৈধতা দেয়, তেমনি জনগণকে সেই কাজের প্রতি অনুগত হতে উৎসাহিত করে। রাষ্ট্রপতির মতে, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণ করা এখন সবার ‘দায়িত্ব’। বঙ্গবন্ধুর সেই অসমাপ্ত কাজ হলো একটি সুখী ও সমৃদ্ধ দেশ গঠন করা। সেই লক্ষ্য অর্জিত হলেই কেবল ‘এই চিরঞ্জীব মহান নেতার প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন’ করা সম্ভব হবে।
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন যে এখন একটি জাতীয় বাধ্যবাধকতা, তা প্রায়ই সরকারি বিভিন্ন বিবৃতিতে দেখা যায়। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এই স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে অনেকটা আক্ষেপের সাথে স্বীকার করেছেন যে, শোষণ, বঞ্চনা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়ার যে স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু দেখেছিলেন, তা তাঁরা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত করতে পারেননি। একইভাবে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে যে, এই অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো মূলত ‘জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর একটি উদ্যোগ’। তাঁদের মতে, এটি আসলে ‘সোনার বাংলা’ স্বপ্নেরই পুনর্জাগরণ। এমনকি ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকেও ‘জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্নের পুনর্জাগরণ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। মূলত একজন মহান স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবেই এখন তাঁকে উপস্থাপন করা হয়।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। সরকারি মন্ত্রণালয় কিংবা নেতারা বঙ্গবন্ধুর ‘স্বপ্ন’ শব্দটিকে নিজেদের প্রয়োজনে যতই ব্যবহার করুন না কেন, সমকালীন বাংলাদেশে এর একটি শক্তিশালী আবেগীয় আবেদন রয়েছে। ক্ষুধা ও অভাব দূর করার এই স্বপ্নটি আসলে সমাজ থেকে সব ধরনের বৈষম্য ও অবহেলা দূর করারই একটি বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে সাধারণত যে সামাজিক স্তরবিন্যাস এবং প্রকট আয়বৈষম্য রয়েছে, তার বিপরীতে এই সাম্যের ধারণাটি একটি বড় আদর্শ হিসেবে কাজ করে। এই সাম্যের চেতনা কারো কাছে ইসলামের শিক্ষার প্রতিফলন, আবার কারো কাছে আধুনিক ও প্রগতিশীল চিন্তার ফসল।
সাধারণ মানুষের আখ্যানে বঙ্গবন্ধুকে এমন এক ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখানো হয়, যিনি উঁচু-নিচু নির্বিশেষে সবাইকে সম্মান করতেন। তিনি অতি সাধারণ খাবার খেতেন, শ্রেণিভেদে সবার সাথে মিশতেন এবং মানুষের অভাব-অভিযোগের কথা শুনতেন। তাঁর এই গুণগুলো বিশেষ করে তরুণ সমর্থকদের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং তা বৃহত্তর বাঙালি জনমানসে এক গভীর রেখাপাত করে। তাঁর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও যখন বলেন যে—মানুষের কষ্ট দূর করতেই তিনি রাজনীতিতে এসেছেন, তখন তিনি মূলত বঙ্গবন্ধুর এই চিরাচরিত আখ্যানকেই সবার সামনে তুলে ধরেন।
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন আর সামাজিক মূল্যবোধের এই যোগসূত্রের চেয়েও জোরালো একটি বিষয় হলো মানুষের ব্যক্তিগত ও আবেগীয় অনুভূতি। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে হত্যাকাণ্ড—এই দুটি ঘটনার মধ্যে চার বছরের ব্যবধান থাকলেও বর্তমানে তা একটি বিশাল একক আখ্যানে পরিণত হয়েছে। এটি অশুভ ও দানবীয় শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক মহাকাব্যিক গল্প। এই গল্পের প্রতিটি পরতে যেমন জড়িয়ে আছে শোক আর হারানোর হাহাকার, তেমনি মিশে আছে বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগ, গর্ব এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের চিরন্তন সংগ্রামের চেতনা।
আবেগীয় যোগসূত্র
বঙ্গবন্ধু এবং রাষ্ট্রকে এমনভাবে একে অপরের পরিপূরক করে তোলা হয়েছে যে, জাতীয় উৎসবগুলো পালন করা আর বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করা এখন একই বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এটি বঙ্গবন্ধুকে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে মানুষের এক গভীর আবেগ, প্রত্যাশা এবং হারানোর বেদনার সাথে যুক্ত করে। মানুষের এই অনুভূতিগুলো অনেক সময় অবচেতন এবং তাৎক্ষণিক হলেও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান ও আচারের মাধ্যমে এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ এবং একটি নির্দিষ্ট দিকে পরিচালিত করা হয়। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী নিয়ে লিখতে গিয়ে মারিয়া রশীদ যুক্তি দেখিয়েছেন যে, এই আবেগীয় সম্পর্ক মূলত আনুগত্যের এমন এক বন্ধন তৈরি করে, যা শাসনের পেছনের কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও বাধ্যবাধকতার বাস্তবতাকে আড়াল করে দেয়। অর্থাৎ, এই আবেগের আড়ালে অনেক সময় রাজনৈতিক বা কৌশলগত উদ্দেশ্য লুকিয়ে থাকে।
বাংলাদেশে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রাষ্ট্র আর বঙ্গবন্ধুকে একই সমান্তরালে নিয়ে আসা হয়েছে। আমাদের সরকারি ছুটির দিনগুলোর মধ্যে তিনটি সরাসরি তাঁর সাথে যুক্ত। প্রথমটি হলো ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা দিবস, যে দিনে ১৯৭১ সালে তিনি স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। দ্বিতীয়টি হলো ১৭ই মার্চ তাঁর জন্মদিন, যা জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে পালিত হলেও মূলত ‘মুজিব জয়ন্তী’ হিসেবেই বেশি পরিচিত। আর তৃতীয়টি হলো ১৫ই আগস্ট জাতীয় শোক দিবস, যেদিন তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল।
এসব ছাড়াও স্বাধীনতা যুদ্ধের সাথে যুক্ত অন্যান্য দিবসগুলোতেও সংগ্রাম, ত্যাগ আর শোকের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। যেমন—গণহত্যা দিবস এবং শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। এই দিনগুলোতে সাধারণ ছুটি না থাকলেও সরকারিভাবে বড় বড় কর্মসূচি পালিত হয়, যেখানে সেনাবাহিনী এবং সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সরাসরি অংশ নেন। একইভাবে ‘জেল হত্যা দিবস’ উপলক্ষে আওয়ামী লীগ এবং সংবাদমাধ্যমগুলো সেমিনার ও আলোচনার আয়োজন করে। আবার একটি আনন্দের দিন হিসেবে পালিত হয় ‘বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস’। এটি সরকারি ছুটির দিন না হলেও প্রতি বছর ক্যালেন্ডারে এটি বিশেষভাবে চিহ্নিত থাকে এবং র্যালি, পতাকা উত্তোলন, ভাষণ ও বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিনটি উদ্যাপন করা হয়। এভাবেই বছরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ দিন কোনো না কোনোভাবে বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে আবর্তিত হয়।
এই রাষ্ট্রীয় আচার-অনুষ্ঠানগুলো সরাসরি আবেগের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু, দেশ এবং ইতিহাসকে একসূত্রে গেঁথে ফেলে। গবেষক নয়নিকা মুখার্জি খুব সূক্ষ্মভাবে খেয়াল করেছেন যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এ দেশের জাতীয় পরিচয়কে মূলত ‘দুঃখ ও ত্যাগের’ ওপর ভিত্তি করে ফুটিয়ে তুলেছে। ১৫ই আগস্ট জাতীয় শোক দিবসের অনুষ্ঠানগুলোতে হারানোর এই বেদনা সবচেয়ে প্রবলভাবে ফুটে ওঠে। এই দিনের ব্যানার বা পোস্টারগুলো সাধারণত খুব গাম্ভীর্যপূর্ণ এবং শোকাবহ হয়। সেখানে একদিকে যেমন চিন্তামগ্ন বঙ্গবন্ধুর ছবি থাকে, তেমনি তাঁর সাথে নিহত পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ছবিও স্থান পায়।
শোকের এমন প্রকাশ বাংলাদেশে মোটেও বিরল নয়। দেশের প্রভাবশালী পত্রিকা ‘প্রথম আলো’ (২০১৪) এই দিনটি নিয়ে লিখেছিল যে, সেদিন পৃথিবীর ইতিহাসে ‘সবচেয়ে বর্বর হত্যাকাণ্ড’ ঘটেছিল। এমনকি পত্রিকাটির সম্পাদকীয়তে দিনটিকে ‘ব্যথা ও শোকের দিন’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। উল্লেখ্য যে, প্রথম আলোকে সাধারণত একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পত্রিকা হিসেবে গণ্য করা হয়। অন্যদিকে কিছুটা সরকারঘেঁষা পত্রিকা হিসেবে পরিচিত ‘ঢাকা ট্রিবিউন’ (২০১৬) এক প্রসঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের রাতটিকে ‘দেশের ইতিহাসের অন্ধকারতম রাত’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের ভাষায়, আগস্ট মাস হলো বাংলাদেশে শোকের মাস, কারণ এই মাসে জাতি তাঁর মহান নেতাকে হারিয়েছে। যদিও ‘শোকের মাস’ কোনো আনুষ্ঠানিক দাপ্তরিক নাম নয়, কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের প্রচারের ফলে এটি এখন জনসমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। শোকের এই আবহটির মধ্যে ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর চালানো গ্রেনেড হামলার ঘটনাটিও স্মরণ করা হয়। সেই নৃশংস হামলায় আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন প্রবীণ নেতাসহ ২০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন।
এই শোকের বার্তার মূল সুরটি হলো—হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও তাঁর মহৎ কাজগুলোকে মাঝপথেই থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাঁর দল এবং যারা তাঁর স্বপ্নকে লালন করেন, তারা ‘দীর্ঘ ৩০ বছর পর’ ক্ষমতায় ফিরে আসতে পেরেছেন। এই হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা এবং এর ফলে জাতি যে বিশাল সুযোগ হারিয়েছে, তা আজকের বাংলাদেশকে এক বিশেষ দায়বদ্ধতার মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। মুক্তিযুদ্ধের সেই সংগ্রাম আর ত্যাগের পেছনে যে স্বপ্ন ও প্রতিশ্রুতিগুলো ছিল, তা পূরণ করাকে এখন জাতির জন্য একটি অনিবার্য কর্তব্য হিসেবে দেখা হয়।
২০২০ সালের আগস্ট মাস ছিল ‘মুজিব বর্ষ’ বা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর বছর। সেই বছর শোকের মাসের কর্মসূচিতে ছিল স্বেচ্ছায় রক্তদান এবং প্লাজমা সংগ্রহ। এছাড়া জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা এবং কালো পতাকা উত্তোলনের মতো আনুষ্ঠানিকতাও পালন করা হয়। সেই সাথে সারা দেশের মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডা ও গির্জাসহ সকল উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছিল।
শুধু বঙ্গবন্ধু নন, তাঁর স্ত্রী ‘বঙ্গমাতা’ এবং তাঁর সন্তানদের জন্মবার্ষিকীও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করা হয়। বিশেষ করে ২০২০ সালে এই আয়োজন ছিল বেশ বড়। তাঁদেরকে জাতীয় বীর হিসেবে তুলে ধরা হয় এবং তাঁদের মৃত্যুকে অপূরণীয় জাতীয় ক্ষতি হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই তাঁর বক্তব্যে সেই হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা, স্বজন হারানোর বেদনা এবং সেই চরম অবিচারের কথা অত্যন্ত আবেগ দিয়ে তুলে ধরেন।
এই শোকের বার্তা এবং চার বছর আগের মুক্তিযুদ্ধের আত্মত্যাগের স্মৃতি একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। গবেষক মুখার্জির মতে, বাংলাদেশের স্মৃতিসৌধগুলোতে বীরত্বের পাশাপাশি হারানোর যে বেদনা ফুটিয়ে তোলা হয়, তাতে এক ধরনের গভীর বিষণ্ণতা মিশে থাকে। এই একই আবেগ আমাদের কবিতা এবং জনপ্রিয় গানগুলোতেও পাওয়া যায়। যেমন—‘একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’ গানটির কথা ধরা যাক। এই গানে দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিপরীতে যুদ্ধের ভয়াবহতাকে তুলে ধরা হয়েছে। এটি মূলত দক্ষিণ এশিয়ার ‘শহীদি’ ঐতিহ্যেরই একটি প্রতিফলন।
এই সাধারণ আখ্যানগুলোতে যুদ্ধের স্মৃতি মানেই হলো এক বিশাল আত্মত্যাগ এবং অপরিসীম কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা। একে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও ভক্তির সাথে দেখা হয়। বাঙালিদের এই বীরত্ব ছিল ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি শাসকদের সেই পুরনো অবজ্ঞার জবাব। তারা মনে করত বাঙালিরা কেবল ‘কোমল স্বভাবের’ জাতি এবং তারা যুদ্ধের উপযোগী নয়। বঙ্গবন্ধু নিজেও এই প্রসঙ্গটি প্রায়ই তুলতেন। তিনি বলতেন যে, এই যুদ্ধ প্রমাণ করে দিয়েছে বাঙালিরা ‘কাপুরুষ’ নয়।
নিষেধাজ্ঞা ও আইনি সুরক্ষা
সবশেষে, গবেষক অ্যান ট্যাভস দেখিয়েছেন যে, বিশেষ বা পবিত্র সত্তাকে ঘিরে প্রায়শই এক ধরনের ‘ট্যাবু’ বা অলিখিত সামাজিক নিষেধাজ্ঞা কাজ করে। এই নিষেধাজ্ঞাগুলো সেই বিশেষ ব্যক্তিকে সাধারণ স্তরে নামিয়ে আনা, তাঁকে নিয়ে বিদ্রূপ করা কিংবা কোনোভাবে তাঁর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হওয়া থেকে রক্ষা করে। বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রে এই বিষয়টি বর্তমানে অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠেছে। তাঁকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই ‘কাল্ট’ বা ভক্তিবাদের চারপাশে এখন এক ধরনের চরম গাম্ভীর্য তৈরি হয়েছে, যেখানে হাস্যরসের কোনো স্থান নেই। সেই সাথে যুক্ত হয়েছে কঠোর সামাজিক ও আইনি বিধিনিষেধ।
বর্তমানে জনসমক্ষে তাঁর নাম নেওয়ার সময় ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’—এই পূর্ণ উপাধিটি ব্যবহারের একটি ক্রমবর্ধমান প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এটি মূলত তাঁর ভাবমূর্তি নিয়ে জনমানসে তৈরি হওয়া প্রবল সংবেদনশীলতারই একটি অংশ। ইতিহাসবিদ লুই মারিনের তত্ত্ব অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি যেহেতু ক্ষমতারই একটি রূপ, তাই তাঁর নাম, ছবি কিংবা তাঁর সাথে যুক্ত ঐতিহাসিক ঘটনাবলির সামান্যতম বিচ্যুতি বা ‘বিকৃতি’ এখন সমাজ সহজে মেনে নেয় না।
শুধু সামাজিক সংবেদনশীলতাই নয়, তাঁর নাম ও সম্মানের সুরক্ষায় এখন অত্যন্ত শক্তিশালী আইনি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। ২০১৩ সালের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (ICT) আইনের ৫৭ ধারা এবং পরবর্তীতে ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২১ ধারায় এই আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়। এই আইনে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে—মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণা চালালে অনধিক ১০ বছরের কারাদণ্ড বা ১ কোটি টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। এই আইনটি ‘অত্যন্ত কঠোর’ হিসেবে দেশে-বিদেশে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে।
এখানে আরও একটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, সাধারণ মানহানির মামলায় সাজা যেখানে সর্বোচ্চ দুই বছর, সেখানে বঙ্গবন্ধুর অবমাননা একটি ‘আমলযোগ্য’ (Cognizable) এবং ‘অজামিনযোগ্য’ (Non-bailable) অপরাধ। এর অর্থ হলো, পুলিশ চাইলে কোনো ওয়ারেন্ট ছাড়াই সরাসরি গ্রেপ্তার করতে পারে এবং আদালতের সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত অভিযুক্তকে কারাগারেই থাকতে হয়। বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কোনো পক্ষ থেকে অভিযোগ আসলে ব্যবস্থা নেওয়া হয় অতি দ্রুত।
বরিশালের একজন স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তার ঘটনাটি এক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে একটি আমন্ত্রণপত্রে তিনি বঙ্গবন্ধুর একটি ‘শিশুর আঁকা ছবি’ ছাপিয়েছিলেন। তিনি যখন সেই কার্ডের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করেন, তখন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে ডিজিটাল আইনে মামলা করা হয়। তাঁদের দাবি ছিল, শিশুর আঁকা সেই ছবিটি ব্যবহার করা ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের’ জন্য চরম অবমাননাকর। যদিও শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী নিজে হস্তক্ষেপ করে বলেন যে ছবিটি সুন্দর ছিল এবং আদালত মামলাটি খারিজ করে দেয়, কিন্তু ততক্ষণে ওই কর্মকর্তাকে এক রাত জেল খাটতে হয়েছিল। ব্যক্তিগত শত্রুতা বা স্থানীয় রাজনীতির প্রভাব এখানে থাকলেও, এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে আমাদের রাষ্ট্রীয় সংবেদনশীলতা কতটা প্রখর। এমনকি ভক্তিভরে করা কোনো কাজকেও যদি অবমাননা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, তবে আইন সেখানে অত্যন্ত কঠোর রূপ ধারণ করে।
অন্য একটি ঘটনায়, পরীক্ষার প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুকে স্থানীয় একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সাথে তুলনা করার অভিযোগে তেরোজন স্কুল শিক্ষকের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করা হয়। এর মধ্যে তিনজন শিক্ষককে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল (দ্য ডেইলি স্টার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭)। আবার ২০২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম এবং আরও দুজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। কারণ, তাঁরা একটি গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেছিলেন যে, ১৯৭১-পূর্ববর্তী বঙ্গবন্ধু এবং ১৯৭১-পরবর্তী বঙ্গবন্ধু এক ছিলেন না (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ১৯ অক্টোবর ২০২১)।
বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতির প্রতি যথেষ্ট সম্মান প্রদর্শন না করার কারণে সাধারণ মানুষের জেল খাটা বা জনসমক্ষে তিরস্কৃত হওয়ার এমন আরও অনেক নজির রয়েছে। ২০২১ সালে যখন কয়েকজন মুসলিম ধর্মীয় নেতা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতা করে একে ইসলাম-বিরোধী বলে দাবি করেন, তখন একটি বড় বিতর্কের সৃষ্টি হয় (নিউ এজ, ২৯ নভেম্বর ২০২০)। এর আগে সুপ্রিম কোর্টের সামনে অবস্থিত ‘লেডি জাস্টিস’-এর ভাস্কর্য সরানোর ক্ষেত্রে ধর্মীয় নেতারা সফল হলেও, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের ক্ষেত্রে তাঁদের এই বিরোধিতা কঠোরভাবে দমন করা হয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তখন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, ভাস্কর্যের বিরোধিতা করা মানে ‘জাতিকে অপমান করা’ (দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ৬ ডিসেম্বর ২০২০)।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ফলাফল বুঝতে মানবাধিকার কর্মী ও ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়ার একটি মন্তব্য বেশ প্রাসঙ্গিক। তিনি একে পুলিশের ‘বেছে বেছে ব্যবস্থা নেওয়া’র (pick and choose) একটি পদ্ধতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন (ঢাকা ট্রিবিউন, ১০ আগস্ট ২০১৮)। তাঁর মতে, সরকার, পুলিশ এবং সরকারি দলের নেতাকর্মীরা আইনটিকে মূলত তাঁদের অপছন্দের মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছেন। তবে এসব মামলা থেকে একটি বিষয় অন্তত পরিষ্কার যে, বঙ্গবন্ধুর নাম ও প্রতিকৃতি বর্তমানে কতটা সংবেদনশীল এবং একে ঘিরে কত গভীর আইনি ও সামাজিক নিষেধাজ্ঞা (taboo) তৈরি হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর মানহানির অভিযোগ আসা মাত্রই পুলিশ, আদালত এবং দলীয় কর্মীরা অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং দ্রুত গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে—এমনকি সেই অভিযোগ যখন কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের ক্ষমতার রাজনীতির অংশ হিসেবে করা হয়, তখনও এই তৎপরতার কোনো কমতি দেখা যায় না।
উপসংহার
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসে এবং মানুষের চেতনায় স্বাধীনতা আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা এবং জাতির পিতা হিসেবে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা, জাদুকরী বাগ্মিতা এবং দূরদর্শী নেতৃত্বই সেই আন্দোলনকে পূর্ণতা দিয়েছিল, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ। স্বাধীনতার পর তাঁর শাসনকাল নিয়ে নানা সমালোচনা থাকলেও, ব্যক্তিগতভাবে তাঁর প্রতি মানুষের অগাধ শ্রদ্ধা ও জনপ্রিয়তা সবসময়ই অটুট ছিল।
দেশের ইতিহাসে তাঁর এই মৌলিক অবস্থানের পাশাপাশি এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, ২০০৯ সালে তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে সরকারিভাবে বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করে একটি ‘ভক্তিবাদ’ বা ‘কাল্ট’ অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে প্রচার ও প্রসার করা হয়েছে। তাঁর নাম ও প্রতিকৃতির সর্বব্যাপী উপস্থিতি এবং তাঁর জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করার মধ্য দিয়ে এটিই প্রতীয়মান হয় যে, সরকার সচেতনভাবেই তাঁকে সাধারণ একজন রাজনৈতিক নেতার চেয়েও উচ্চতর কোনো অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। এই প্রচেষ্টারই একটি অংশ হলো এমন সব আখ্যান বা গল্প তৈরি করা, যেখানে বলা হয় যে তাঁর তর্জনীর সংকেত আর দূরদর্শিতাই সাধারণ মানুষকে শোষকদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। এর পাশাপাশি, ৫০ বছর পরও তাঁর সেই স্বপ্নগুলো পূরণ করা প্রতিটি বাংলাদেশির জন্য একটি ‘অপরিহার্য দায়িত্ব’ বা বাধ্যবাধকতা হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।
এই প্রবন্ধের মূল যুক্তি হলো—বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই ভক্তিবাদকে একটি ‘নাগরিক ধর্ম’ হিসেবে দেখাটা অর্থবহ। কারণ এটি বঙ্গবন্ধুকে এমন এক কেন্দ্রীয় অবস্থানে স্থাপন করে যা মূলত বিভিন্ন উপকথা, আচার-অনুষ্ঠান, শ্রদ্ধার নির্দিষ্ট নিয়ম, আনুগত্যের দাবি, সামাজিক নিষেধাজ্ঞা এবং পবিত্র প্রতীকে পরিপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে ‘নাগরিক ধর্ম’ বলতে এমন এক জাতীয়তাবাদকে বোঝায়, যা একটি রাষ্ট্র ও তার ইতিহাসকে ‘পবিত্র’ করে তোলে। এটি বিভিন্ন আচার ও আখ্যানের মাধ্যমে মৃত, জীবিত এবং অনাগত প্রজন্মের মধ্যে একটি যোগসূত্র তৈরি করে, যেখান থেকে একটি জাতি তার জীবনের চূড়ান্ত অর্থ খুঁজে পায়। এই নাগরিক ধর্মে বঙ্গবন্ধু হলেন সেই জাতির ‘সৃষ্টিকর্তা’ বা আদি উৎস, এবং সেই সুবাদে তিনি হলেন জাতির চূড়ান্ত ও সার্বভৌম কর্তৃপক্ষ। রাজনৈতিক দার্শনিকরা মনে করেন, যেকোনো বিপ্লব-পরবর্তী শাসনব্যবস্থাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য প্রতিদিনকার রাজনীতির ঊর্ধ্বে এমন এক উচ্চতর কর্তৃপক্ষের প্রয়োজন হয়; বঙ্গবন্ধুর এই সার্বভৌম রূপটি সেই অভাবই পূরণ করে।
অ্যান ট্যাভসের ‘বিশেষ সত্তা’ (special being) ধারণার আলোকে বঙ্গবন্ধুর এই ভাবমূর্তি গঠন করা সম্ভব হয়েছে। ট্যাভসের তত্ত্ব অনুযায়ী, চারটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই কাল্টকে শক্তিশালী করেছে। সেগুলো হলো: তাঁর অনন্যতা, তাঁর ব্যতিক্রমী সক্ষমতা, তাঁর সাথে জনগণের গভীর আবেগীয় বন্ধন এবং তাঁর নাম ও স্মৃতি রক্ষায় আইনি ও সামাজিক বিধিনিষেধ। এই চারটির মধ্যে ‘আবেগীয় বন্ধন’ বিষয়টি এই ভক্তিবাদকে সফল করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি মূলত ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের বীরত্ব ও অগণিত মানুষের আত্মত্যাগের স্মৃতিকে চার বছর পরের অর্থাৎ ১৯৭৫ সালের বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের শোকের সাথে একীভূত করে ফেলে। এই দুটি ভিন্ন ঘটনাকে শোক, হারানো বেদনা এবং দেশের শত্রুদের নৃশংসতার বিরুদ্ধে এক মহাকাব্যিক লড়াইয়ের আখ্যান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যা মানুষের মনে গভীর রেখাপাত করে।
বঙ্গবন্ধুর এই ভক্তিবাদের কার্যকারিতা মূলত একটি নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় তাঁর অগ্রণী ভূমিকা থেকে আসে। এখানে তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা নন, বরং তিনি এ জাতির স্রষ্টা—জাতির পিতা। হান্না আরেন্টের সংজ্ঞায়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল একটি বৈপ্লবিক মুহূর্ত; যা অতীতের সব কাঠামো ভেঙে দিয়ে নতুন কিছু আদর্শের ভিত্তিতে এক নতুন শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। পাকিস্তানের সামরিক ও কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার বিপরীতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে নতুন বাংলাদেশ গঠিত হয়েছিল গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের ওপর ভিত্তি করে। এক অর্থে, বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছাশক্তিই পাকিস্তানি রাষ্ট্রের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছিল।
এই বিশাল রূপান্তরের পেছনে তাঁর যে কেন্দ্রীয় ভূমিকা ছিল, এই ভক্তিবাদ মূলত সেটিকেই জোরালোভাবে প্রচার করে। সরাসরি বলা না হলেও, বিভিন্ন বয়ানে বঙ্গবন্ধুকে এমন এক ‘সার্বভৌম’ শক্তি হিসেবে দেখানো হয়, যিনি পুরনো জরাজীর্ণ ব্যবস্থাকে ভেঙে নতুন এক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন। তিনি ছিলেন এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মূল কারিগর। যদিও ঘাতকদের হাতে তাঁর কর্মময় জীবন মাঝপথেই থেমে গিয়েছিল, কিন্তু তাঁর আদর্শই ছিল একটি নতুন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি। বর্তমান প্রজন্ম এবং এই রাষ্ট্রকাঠামোর অনুসারীরা তাই তাঁর স্বপ্নের কাছে দায়বদ্ধ। এমনকি তাঁর উত্তরসূরিদের রাজনৈতিক কর্তৃত্বের বৈধতাও আসে তাঁর এই বিশাল ব্যক্তিত্বের উত্তরাধিকার থেকে।
ইসলামি প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুকে আক্ষরিক অর্থে ঈশ্বরের মতো অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন কোনো সত্তা হিসেবে দেখা অসম্ভব এবং তা ধর্মদ্রোহিতার শামিল হবে। কিন্তু তাঁর নাম ও ব্যক্তিত্বকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই ভক্তিবাদ—যাতে তাঁর অনন্যতা, বিশেষ সক্ষমতা এবং এর সাথে যুক্ত চরম গাম্ভীর্য ও আইনি বিধিনিষেধের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়—তা এটাই প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের ঊর্ধ্বে তাঁকে এক সার্বভৌম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁকে এমন এক গভীর শ্রদ্ধার আসনে রাখা হয়েছে, যা অনেকটা ‘পবিত্র’ কোনো সত্তার সমতুল্য।
তথ্যসূত্রঃ
- Ahmed, Moudud. 1984. Bangladesh: The Era of Sheikh Mujibur Rahman. Wiesbaden: Franz Steiner Verlag GMBH.
- Ahsan, Syed Badrul. 2014. From Rebel to Founding Father: Sheikh Mujibur Rahman. New Delhi: Niyogi Books.
- Arendt, Hannah. 1961. Between Past and Future: Six Exercises in Political Thought. New York: The Viking Press.
- Arendt, Hannah. (1963) 1988. On Revolution. London: Faber & Faber.
- Chatterjee, Partha. 2020. I am the People: Reflections on Popular Sovereignty Today. New Delhi: Permanent Black.
- CRI. 2018. Mujib: A Graphic Novel. Dhaka: CRI Prakashana.
- Crook, Tom. 2010. “Civil Religion and the History of Democratic Modernity: Probing the Limits of the Sacred and the Secular.” Religion Compass 4 (6): 376–387.
- Dunn, John. 2014. Breaking Democracy’s Spell. New Haven: Yale University Press.
- Flåten, Lars Tore. 2017. Hindu Nationalism, History and Identity in India: Narrating a Hindu Past Under the BJP. London: Routledge.
- Gauchet, Marcel. 1997. The Disenchantment of the World: A Political History of Religion. Translated by O. Burge. Princeton, NJ: Princeton University Press.
- Gentile, Emilio. 2006. Politics as Religion. Princeton NJ: Princeton University Press.
- Gentile, Emilio. 2005. “Political Religion: A Concept and its Critics – a Critical Survey.” Totalitarian Movements and Political Religions 6 (1): 19–32.
- Gilmartin, David. 2019. “Introduction.” In South Asian Sovereignty: The Conundrum of Wordly Power, edited by David Gilmartin, Pamela Price, and Arild Engelsen Ruud, 1–34. London: Routledge.
- Hansen, Thomas Blom. 2004. “Politics as Permanent Performance: The Production of Political Authority in the Locality.” In The Politics of Cultural Mobilization in India, edited by John Zavos, Andrew Wyatt, and Vernon Hewitt, 19–36. New Delhi: Oxford University Press.
- Hoggett, Paul, and Simon Thompson, eds. 2012. Politics and the Emotions: The Affective Turn in Contemporary Political Studies. New York: Continuum International.
- Imam, Neamat. 2015. The Black Coat. London: Pericope.
- Jahan, Rounaq. 2005. Bangladesh Politics: Problems and Issues. Dhaka: University Presses Limited.
- Kuttig, Julian. 2020. “Posters, Politics and Power: Mediated Materialisation of Public Authority in Bangladesh Party Politics.” South Asia: Journal of South Asian Studies.
- Lefort, Claude. 1988. Democracy and Political Theory. Cambridge: Polity Press.
- Maclean, Kama. 2015. A Revolutionary History of Interwar India: Violence, Image, Voice and Text. London: Hurst & Company.
- Marin, Louis. 1988. Portrait of the King. Minneapolis: University of Minnesota Press.
- Mookherjee, Nayanika. 2007. “Mourning, Melancholia, and the Martyred Intellectual Memorials in Bangladesh.” Space and Culture 10 (2): 271–291.
- Mookherjee, Nayanika. 2011. “‘Never Again’: Aesthetics of ‘Genocidal’ Cosmopolitanism and the Bangladesh Liberation War Museum.” Journal of the Royal Anthropological Institute 17: S71–S91.
- Raghavan, Srinath. 2013. 1971: A Global History of the Creation of Bangladesh. Cambridge, MA: Harvard University Press.
- Rashid, Maria. 2020. Dying to Serve: Militarism, Affect, and the Politics of Sacrifice in the Pakistan Army. Stanford, CA: Stanford University Press.
- Reicher, Stephen D., and Nick Hopkins. 2001. Self and Nation. London: Sage.
- Riaz, Ali. 2019. Voting in a Hybrid Regime: Explaining the 2018 Bangladeshi Election. Singapore: Palgrave Pivot.
- Ruud, A. E., and Mubashar Hasan, eds. 2021. Masks of Authoritarianism: Hegemony, Power and Public Life in Bangladesh. Singapore: Palgrave Macmillan.
- Santiago, Jose. 2009. “From ‘Civil Religion’ to Nationalism as the Religion of Modern Times: Rethinking a Complex Relationship.” Journal for the Scientific Study of Religion 48 (2): 394–401.
- Smith, Anthony D. 2000. “The ‘Sacred’ Dimension of Nationalism.” Millennium: Journal of International Studies 29 (3): 791–814.
- Sutcliffe, Steven J., and Carole M. Cusack, eds. 2016. The Problem of Invented Religions. London: Routledge.
- Swatos, William H., Jr. 2004. “Book Review.” Implicit Religion 7 (2): 193–198.
- Taves, Ann. 2012. “Special Things as Building Blocks of Religions.” In The Cambridge Companion of Religious Studies, edited by R. A. Orsi, 58–83. Cambridge: Cambridge University Press.
- V-Dem. 2021. Autocratization surges – resistance grows. Democracy report 2020. V-Dem Institute, University of Gothenburg.
- Wallace, Ruth. 1977. “Emile Durkheim and the Civil Religion Concept.” Review of Religious Research 18 (3): 287–290.
- Yelle, Richard A. 2018. Sovereignty and the Sacred: Secularism and the Political Economy of Religion. Chicago: The University of Chicago Press.







Comments