নতুন ডিপ্লোমা প্রোগ্রাম ২০২৬ শুরু হয়েছে! ক্রিটিক্যাল সোশ্যাল থট অ্যান্ড ইসলামিক ট্র্যাডিশন ডিপ্লোমা সম্পর্কে জানুন → নতুন ডিপ্লোমা প্রোগ্রাম ২০২৬ — ডিপ্লোমা সম্পর্কে জানুন →

দর্শন

পশ্চিমা তাত্ত্বিক গোলকধাঁধা এবং ইসলামের দার্শনিক পাঠ

Share
Share
দর্শনMay 6, 2026

পশ্চিমা তাত্ত্বিক গোলকধাঁধা এবং ইসলামের দার্শনিক পাঠ

বাংলাদেশে গত কয়েক দশকের বুদ্ধিবৃত্তিক বয়ান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর কেন্দ্র দখল কইরা আছেন ফরহাদ মজহার ও সলিমুল্লাহ খান। তাদের দুইজনেরই পাণ্ডিত্য ও প্রভাব অনস্বীকার্য, কিন্তু তাদের ‘এপিস্টেমিক রুট’ বা জ্ঞানতাত্ত্বিক নাড়ি পোতা আছে সেই পশ্চিমা আলোকায়ন এবং তার উত্তর-উপনিবেশবাদী ক্রিটিকের মধ্যে।

ফরহাদ মজহারের তরুণ মার্কস থেইকা হাইডেগার হইয়া লালনে ফেরা, কিংবা সলিমুল্লাহ খানের মার্কস-ফ্রয়েড-লাকাঁ-র হেটরোডক্সির ভিতর দিয়া লালন, সুলতান ও ছফাকে চেনা—এই পুরা প্রক্রিয়াটা মূলত ‘ওয়েস্টার্ন ক্রিটিক্যাল ট্র্যাডিশন’-এরই একটা সম্প্রসারণ। অর্থাৎ, তারা পুবের মাটিতে যে মুক্তি তালাশ করতেছেন, তার কম্পাসটা তৈরি হইছে পশ্চিমে।

মজহারের লালন পাঠ এক তাত্ত্বিক গোলকধাঁধা। লালনের আরশিনগররে তিনি এক প্রকার অস্তিত্ববাদী হাকিকত হিশাবে সাব্যস্ত করার চেষ্টা করেন।

যেইখানে ওহীর যুগ শেষ হইয়া গেছে সেইখানে বরাত দিয়া কথা বলা এখন আর যথেষ্ট না; মজহারের দাবি হইলো ওহীর সত্যরে এখন আকল দিয়া বুঝতে ও বুঝাইতে হইবে।

মজহার সাহেব তার ‘ভাবান্দোলন’ (২০০৮) কিতাবের বয়ানে যখন লালনরে পাঠ করেন, তখন তিনি আরবের ওহী আর বাংলার ভাবরে একই হাকিকতের ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ হিশাবে সাব্যস্ত করতে চান।

মজহারের আসল ফিকির হইলো ওহীর এক প্রকার সাংস্কৃতিক তর্জমা খাড়া করা। তিনি দাবি করেন, হাকিকত তো একটাই, কিন্তু যেইখানে যেই কাল বা পাত্র, সেইখানে তার প্রকাশও সেইরকম।

নবী-রাসূলদের কাছে যেইটা ওহী হইয়া নাজিল হইছে, বাংলার রুহানি সাধকদের কাছে সেইটাই নাকি ‘ভাব’ হইয়া ধরা দিছে। অথচ শাস্ত্রীয় ইসলামের চোখে ওহী হইলো এক খাস আর খতম হওয়া সিলসিলা।

এইটা লোকজ অনুভূতির সাথে গুলানো আকিদাগত বড় বিচ্যুতি। মজহার ওহীর শান ক্ষুণ্ণ কইরা সেইটারে স্রেফ এক সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতায় নামাইয়া আনছেন।

তিনি মূলত সাংস্কৃতিক বিনির্মাণবাদের জায়গা থেইকা এই বয়ান সাজাইছেন। এইটা তার এক প্রকার এপিস্টেমিক অ্যাক্টিভিজম, যা ইসলামের অকাট্য যুক্তিরে পাশ কাটাইয়া যাইতে চায়।

কিন্তু এই অনুবাদ ইসলামের নিজস্ব বুরহান বা অকাট্য যুক্তির সিলসিলা থেইকা আসে নাই। এইটা বরং পশ্চিমা মেটাফিজিক্সের এক লোকাল তর্জমা হইয়া উঠছে।

মজহার লালনের ভাবের দোহাই দিয়া মূলত পশ্চিমা Being-এর এক দেশি মকশো তৈরি করতেছেন। লালনের অচিন পাখি মজহারের হাতে পইড়া হাইডেগারের Thrownness-এর এক কাব্যিক রূপ হইয়া উঠছে।

মজহারের কাছে লালন মূলত এক রণকৌশল। তিনি যখন লালনের মানুষ ভজনার কথা কন, তখন তিনি আধুনিক সেকুলারিজমের সাথে এক ধরনের তাত্ত্বিক সন্ধি করেন।

এইখানে মানুষের সার্বভৌমত্ব ওহীর অথরিটির সাথে এক পিচ্ছিল সমান্তরাল তৈরি করে। যা আদতে ইসলামের অকাট্য যুক্তিরে দুর্বল কইরা দিতে চায়।

মজহার সাহেব যখন ‘এবাদতনামা’ (১৯৮৮) লেখেন, তখন তিনি মূলত সেকুলার আধুনিকতার ভিতরকার ফাটল দিয়া আধ্যাত্মিকতার অক্সিজেন তালাশ করেন। এই আধ্যাত্মিকতা ইসলামের নিজস্ব বুরহান থেইকা আসে না।

এইখানে জ্ঞানের উৎসেই বড় গরমিল বিদ্যমান। ইসলামের নিজস্ব সিলসিলায় আধ্যাত্মিকতা বা ‘এহসান’ সবসময় ওহী এবং আকলের এক অবিভাজ্য বুরহানি ঐক্যের উপর দাঁড়াইয়া থাকে।

এইখানে সওয়াল উঠতে পারে—আরব মুসলিমরাই কি ওহীর একমাত্র দাবিদার? নিশ্চয়ই না, কারণ আল্লাহ দুনিয়ার সব জায়গায় পয়গম্বর পাঠাইয়াছেন। কিন্তু সমস্যা হইলো—বাংলার ‘ভাব’ যদি ওহীর দেশি রূপ হয়ও, তাহার মাপকাঠি বা ‘লিটমাস টেস্ট’ কী হইবে?

মজহার যখন ওহীর সার্বভৌমত্ব অস্বীকার কইরা তারে হাইডেগারীয় ‘বিয়িং’ দিয়া জাস্টিফাই করেন, তখন ওহী আর ‘বুরহান’ থাকে না। তা হইয়া যায় পশ্চিমা তত্ত্বের একটা লোকাল ‘অনুবাদ’।

এইখানে মূল লড়াইটা হইলো ‘অথরিটি’ বা কর্তৃত্বের। ফরহাদ মজহার যখন ওহী লইয়া আলাপ করেন, তখন তিনি সেইটারে আরবের কোনো বিশেষ আসমানি ঘোষণা হিশাবে না দেইখা সেইটারে মানুষের অস্তিত্বের এক গভীর ‘পাওয়ার’ বা ‘বিয়িং’ হিশাবে সাব্যস্ত করতে চান। এইখানেই হাইডেগারের দর্শন সুড়সুড় কইরা ঢুইকা পড়ে।

মার্টিন হাইডেগারের দর্শনে ‘Being’ হইলো এমন এক হাকিকত যা মানুষের অস্তিত্বের একদম গভীরে থাকে। মজহার যখন ওহীরে ‘বিয়িং’-এর এই তাত্ত্বিক ছাঁচে ফেলেন, তখন ওহী আর আল্লাহর পক্ষ থিকা আসা কোনো অকাট্য বিধান বা ‘বুরহান’ থাকে না। ওহী তখন হইয়া যায় মানুষের এক প্রকার ‘অস্তিত্ববাদী অভিজ্ঞতা’। অর্থাৎ, ওহীর হাকিকত জাস্টিফাই করার জন্য আপনার তখন আর ওহীর দরকার পড়তেছে না, দরকার পড়তেছে হাইডেগারের মেটাফিজিক্স।

‘লোকাল অনুবাদ’ মানে হইলো—আপনি একটা বিজাতীয় ফ্রেমওয়ার্ক নিয়া আইসা নিজের ঘরের জিনিসের উপর সেইটারে চাপাইয়া দিতেছেন। মজহারের বয়ানে ইসলাম এইখানে নিজের পায়ে দাঁড়াইতে পারে না; সেইটারে দাঁড়াইতে হয় পশ্চিমা অস্তিত্ববাদের লাঠিতে ভর কইরা। ফলে ইসলাম আর আসলি ইসলাম থাকে না, তা হইয়া যায় পশ্চিমা দর্শনের এক ‘দেশি এডিশন’।

ইসলামের ‘বুরহান’ মানে হইলো এমন অকাট্য যুক্তি যা ওহীর সার্বভৌমত্বের উপর কায়েম থাকে। যখন আপনি ওহীরে হাইডেগারের তত্ত্ব দিয়া ‘ভ্যালিডেট’ করেন, তখন আপনি স্বীকার কইরা লন যে—ওহীর নিজের কোনো শক্তি নাই, পশ্চিমের থিউরি ছাড়া তারে বোঝা সম্ভব না। এইটাই হইলো জ্ঞানতাত্ত্বিক গোলামি বা ‘এপিস্টেমিক সাবঅর্ডিনেশন’।

এতে ইসলাম তার স্বতন্ত্র জ্ঞানতাত্ত্বিক অটোনমি হারায়। ওহী তখন আর স্রষ্টার পরম ঘোষণা থাকে না, বরং তা হাইডেগারীয় অস্তিত্ববাদের একটা সাবক্যাটাগরি হইয়া যায়।

মজহার যখন লালনের ভাব দিয়া ওহীর ব্যাখ্যা দেন, তখন তিনি ওহীর পরম অথরিটির চাইতে মানুষের ব্যক্তিক অনুভব বা ‘সাবজেক্টিভ এক্সপেরিয়েন্স’-কে বড় কইরা দেখেন। যা মূলত পশ্চিমা মেটাফিজিক্সেরই এক লোকাল ভ্যারিয়েন্ট।

ইসলামের দার্শনিক সিলসিলায় সত্য প্রমাণের যে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি বা মেথডলজি আছে, মজহার তারে পাশ কাটাইয়া পশ্চিমা ‘পোস্টমডার্ন’ টুলস ব্যবহার করেন। ফলে তার আধ্যাত্মিকতা শেষমেশ পশ্চিমা দর্শনের সংকট মোচনের হাতিয়ার হইয়া ওঠে।

মজহার নিজেই স্বীকার করেন যে তার ‘ভাব’ বা ‘এবাদত’ প্রথাগত কালামশাস্ত্রের গণ্ডির বাইরের জিনিস। আর সেইটা পশ্চিমা মেটাফিজিক্সের সংকট মেটানোর টুল হিশাবে ইউজ করা হইতেছে।

লালনরে তিনি যখন দেখেন, তখন সেইখানে আর ইসলামের নহর থাকে না। তা হইয়া যায় অন্টোলজিক্যাল ডিফারেন্স বা অস্তিত্বগত পার্থক্যের এক জলজ উদাহরণ।

রাজনৈতিক ও অস্তিত্ববাদী রণকৌশলটাই মুখ্য হইয়া দাঁড়ায়। মজহারের লালন পাঠে ইসলাম কখনোই তার নিজস্ব সার্বভৌম জ্ঞানকাণ্ড নিয়া দাঁড়াইতে পারে না।

পশ্চিমা দালানের ফাটল দিয়া পুবরে দেখতে গিয়া তিনি বারবার এক জগাখিচুড়ি তাত্ত্বিক ফ্রেমওয়ার্কে ডুইবা যান। ইসলাম এইখানে তার কাছে অনেকটা হাইডেগারের পার্থিব সংকটের এক স্বর্গীয় প্রেসক্রিপশন।

সলিমুল্লাহ খান যখন ফ্রয়েড পাঠ কইরা লাকাঁর ‘থ্রি রেজিস্টার’ দিয়া লালন, সুলতান বা ছফাকে পাঠ করেন, তখন তিনি মূলত পশ্চিমা মনোসমীক্ষণ ও ভাষাতত্ত্বের একটা সার্বজনীন দাবিকেই পোক্ত করেন। মজহার ও সলিমুল্লাহ দুইজনের ক্ষেত্রেই তত্ত্বের গতিপথ হইলো ‘পশ্চিম পাঠ কইরা পূর্বে পশ্চিমের প্রতিসম খোঁজা’।

সলিমুল্লাহ সাহেব পশ্চিমের উত্তর-উপনিবেশবাদী ক্রিটিকের মুরিদ হইয়াও আদতে পশ্চিমা তাত্ত্বিক ল্যাবরেটরিতে পুবরে এক ‘টেস্ট কেস’ বা নমুনা হিসাবে হাজির করেন। তিনি যখন লালন, সুলতান ও ছফারে নিয়া আলাপ করেন, তখন এই প্যারাডক্সটা প্রকট হইয়া ওঠে।

সলিম সাহেবের আলাপে লালন, সুলতান ও ছফা হাত ধরাধরি কইরা হাঁটেন। এইখানে টাইমলাইনটা গুরুত্বপূর্ণ; তিনি লালনের আধ্যাত্মিক দেহতত্ত্বের জমিনে সুলতানের পেশিবহুল কিষাণকে স্থাপন করেন। সলিমুল্লাহ যখন লাকাঁর চশমায় সুলতানের আঁকা সেইসব দেহকে দেখেন, তখন তিনি মূলত বাঙালির হাড়-জিরজিরে শরীরের এক ‘ফ্যান্টাসি’ বা কল্পিত পুনরুদ্ধার তালাশ করেন।

তার কাছে লালনের ভাব বা সুলতানের ক্যানভাস হইলো উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে এক ধরনের ‘দেশি রোমান্টিসিজম’। কিন্তু মুশকিল হইলো, লালন বা সুলতানের এই বডি-পলিটিক্সকেও তিনি শেষমেশ সেই মার্কসীয় ক্রিটিক বা ফ্রয়েডীয় অবদমন এবং লাকাঁর ভাষাতাত্ত্বিক ছাঁচেই ফিট কইরা ফালান।

লালন, সুলতান ও ছফাকে দিয়া সলিমুল্লাহ পশ্চিমের সাথে এক ধরনের ‘সংলাপ’ করতে চান ঠিকই, কিন্তু সেই সংলাপের ব্যাকরণটা সেই জর্মান বা ফরাসি ডিকশনারি থেইকাই ধার করা। অর্থাৎ, আমাদের ঘরের মালের ভ্যালিডেশন এখনো সেই ফিরিঙ্গি সার্টিফিকেটেই হইতে হইবে।

এস এম নাজমুজ সাকিবের লেখা সলিমুল্লাহ সাহেবের বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনী পাঠ করলে তার ডিসকোর্সের ভিত্রের অনুপ্রবেশকারী গুপ্ত প্রাচ্যবাদ স্পষ্ট হইয়া ওঠে। তিনি পশ্চিমের উত্তর-উপনিবেশবাদী ক্রিটিকের মুরিদ হইয়াও আদতে পশ্চিমা তাত্ত্বিক ল্যাবরেটরিতে পুবের ব্যবচ্ছেদ করেন । তখন এই প্যারাডক্সটা খুলাসা হইয়া ওঠে।

খান সাব যখন লালনের আধ্যাত্মিক দেহতত্ত্বের জমিনে সুলতানের পেশিবহুল কিষাণকে স্থাপন করেন, তখন তিনি সুলতানের ক্যানভাসরে শেষমেশ সেই মার্কসীয় বা ফ্রয়েডীয় অবদমন এবং লাকাঁর ভাষাতাত্ত্বিক ছাঁচেই ফিট কইরা ফালান।

পশ্চিমা দালানের ফাটল দিয়া তিনি পুবরে চিনতে যান বইলাই তার পুবের আশ্রয়স্থলগুলা বারবার পশ্চিমা তাত্ত্বিক রিইন্টারপ্রিটেশনে পর্যবসিত হয়। সুতরাং পুবের মালের কোনো নিজস্ব অথরিটি তার কাছে নাই, যতক্ষণ না সেইটা জর্মান বা ফরাসি থিউরির ছাঁচে ঠিকঠাক ফিট করে।

এই তাত্ত্বিক ট্রিলজিতে ছফা আসেন সবশেষে, এক রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ‘এজেন্সি’র দাবি লইয়া। সলিমুল্লাহ যখন ছফারে পাঠ করেন, তখন ছফার সেই ‘গাছপাথর’ মার্কা অর্গানিক তেজরে তিনি লাকাঁর ‘রিয়েল’ বা গ্র্যামশির ‘সাবঅল্টার্ন’ ক্যাটাগরিতে বন্দী করেন। ছফার যে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই, সেইটাকে তিনি থিওডোর অ্যাডর্নোর ‘নেগেটিভ ডায়ালেক্টিকস’ হিশাবে ব্যাখা করেন। অর্থাৎ, ছফার মেথডলজি বা চাবিকাঠি বাংলার মাটিতে নাই, তা আছে ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের ড্রয়ারে।

ছফার বইগুলা যেমন তার ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বা ‘ওঙ্কার’—এইগুলাকে সলিমুল্লাহ শেষমেশ একটা পোস্টকলোনিয়াল সাইকোঅ্যানালাইসিসের বেশি আর মর্যাদা দেন না। ফলে ছফা এইখানে আর স্বাধীন চিন্তক থাকেন না, বরং পশ্চিমা থিউরি ভ্যালিডেট করার এক জুতসই ‘রেফারেন্স’ হইয়া যান। পশ্চিমা অনুবাদ ছাড়া সলিমুল্লাহ পুবরে চিনতে পারেন না বইলাই তার ডিসকোর্সে ছফাও ফিরা আসেন পশ্চিমের অনুবাদ হইয়া, আসলি হাকিকত না হইয়া।

কবি আবুল হাসানের কবিতায় যে নিভৃত বাংলার বেদনা আর হাহাকার ফুটে উঠত, সলিমুল্লাহর ‘কবিতা ও মনস্তত্ত্ব’ সেইটারে এক তাত্ত্বিক ময়নাতদন্তের কবলে ফেলে। হাসানের রক্তমাংসের অনুভূতিগুলা সলিমুল্লাহর তাত্ত্বিক বয়ানে লাকাঁর ‘মিরর স্টেজ’ বা ‘ফ্যান্টাসি’র ফ্রেমওয়ার্কে সংজ্ঞায়িত হইয়া যায়।

এইখানে কবির আসলি আবেগ আর স্বকীয় থাকে না; সেইটা হইয়া যায় এক পশ্চিমা মনস্তাত্ত্বিক ল্যাবরেটরির স্যাম্পল। কবির কলিজার রক্ত যখন ফরাসি থিওরির বিকার হইয়া ধরা দেয়, তখনই বোঝা যায় সলিমুল্লাহর থিওরিটিক্যাল ফ্রেমিং কতটা সংক্রামক।

সলিমুল্লাহ খান (জন্ম ১৯৫৮) বাংলাদেশের এখনকার ইনটেলেকচুয়াল ম্যাপে এমন এক ক্যারেক্টার, যিনি কন্টিনেন্টাল থিউরির ভারী সব মালমসলা—মানে মার্কস, ফ্রয়েড আর লাকাঁ—আমগো লোকাল ইতিহাস, পলিটিক্স আর সাইকোলজির লগে মিশাইয়া একখান নতুন জবান ও ফিকিরের জন্ম দিছেন। উনার পুরা কারবারটাই ঘোরে পোস্টকলোনিয়াল জমানায় আমগো ন্যাশনাল আইডেন্টিটির একখান জুতসই বয়ান খাড়া করার নিশানায়।

কলকাতা-মার্কা ভদ্রলোকি বাঙালিত্ব বা পাকিস্তানি তরিকায় মুসলিম পরিচয়—দুইটারে ধাক্কা দিয়া উনি এক নতুন ‘বাংলাদেশি’ বা ‘বাঙালি মুসলমান’ সওয়ালের জওয়াব খুঁইজা বেড়ান। ওনার এই ফেমাস বয়ান—”স্বর্গে ঈশ্বর নাই, ঈশ্বর আছেন ভাষায়”—দিয়া উনি বুঝাইতে চান যে, এই দুনিয়া আর জিন্দেগিরে বুঝার একমাত্র সদর রাস্তা হইলো ভাষা।

সলিমুল্লাহ খান লাকাঁনীয় মনোসমীক্ষণ আর পয়লা (আর্লি) মার্কসের ফিলোসফিক্যাল বয়ানরে হাতিয়ার বানাইয়া বাংলার সমাজ-সংস্কৃতিরে ব্যবচ্ছেদ করেন। খালি কিতাবি ‘শ্রেণি সংগ্রামের’ ভালগার মার্কসবাদ সলিমের কাপ অফ টি না; উনি বরং মার্কসীয় দর্শনের সেই হিউম্যানিস্ট আর ফ্রয়েড-লাকাঁর সাইকোএনালিটিকাল প্যাঁচগুলাতেই বেশি কমফোর্টেবল। উনারে থ্যাংকস দিতে হয় এই কারণে যে, উনি আমগো মগজের জড়তা ভাইঙ্গা কন্টিনেন্টাল থিউরির কিস্তিগুলারে বাংলার কাদা-পানিতে ভাসাইতে শিখাইছেন।

কিন্তু ঝামেলাটা পাকায় তখন যখন উনি এই কন্টিনেন্টাল ইউরোপের তত্ত্বের ফ্রেমওয়ার্করে এতোটাই অকাট্য মনে করা শুরু করেন যে, সেই চশমা দিয়া খোদ ধর্ম আর স্রষ্টারেও ডিফাইন করতে থাকেন। সলিমুল্লাহ অবশ্য কোনো থিউরিকেই ‘পরম সত্য’ মানার মতো নাদান লোক না, কিন্তু উনার কাটাছেঁড়ার কায়দাকানুন আলটিমেটলি ফিরিঙ্গি সেকুলার জ্ঞানকাণ্ডের প্রতিই একটা পরোক্ষ ইশারা রাইখা যায়। উনার সেই কথা যে “স্বর্গে ঈশ্বর নাই, ঈশ্বর আছেন ভাষায়”—এই বয়ানটা আসলে ফরাসি পোস্টমডার্ন চিন্তা আর লাকাঁনীয় চক্করের একখান স্মার্ট অনুবাদই মূলত।

ইসলামি জ্ঞানতাত্ত্বিক বিচারে এইটা একখান খতরনাক বিচ্যুতি কিন্তু। কারণ ইসলামে আল্লাহ বা খোদা মানুষের বানানো কোনো ল্যাঙ্গুয়েজ কনস্ট্রাক্ট না। উনি হইলেন ‘ওয়াজিবুল উজুদ’ বা নেসেসারি বিয়িং, যিনি ভাষা বা মানুষের বয়ান আসার অনাদিকাল আগে থেইকাই আছেন।

আল্লাহ নিজেরে জাহির করার লাইগা ভাষার উছিলা নিছেন ঠিকই (কালামুল্লাহ), কিন্তু উনি ভাষার এই লিমিটেড খাঁচায় বন্দি না। সলিমুল্লাহ যখন খোদারে ভাষার পিঞ্জিরায় জিম্মি কইরা ফালান, তখন উনি আসলে স্রষ্টারে মানুষের বানানো ‘সিগনিফায়ার’ বা প্রতীকের গোলাম বানাইয়া ছাড়েন।

এইটা স্রষ্টার অতীন্দ্রিয় আর অতিপ্রাকৃত সত্তারে অস্বীকার করার একটা কায়দা, যারে তাত্ত্বিক পরিভাষায় আমরা ‘ইন্টেলেকচুয়াল শিরক’ কইতে পারি। একই প্যাঁচ আমরা দেখি যখন উনি লাকাঁনীয় ‘অজ্ঞান’ বা আনকনশাসরে স্রেফ ‘ঈশ্বর’ বা খোদার সাবস্টিটিউট বানাইয়া ফেলেন।

এই তরিকায় উনি আধ্যাত্মিকতারে স্রেফ একটা সাইকোঅ্যানালিটিকাল গিট্টু এবং ড্রাইভের লেভেলে নামাইয়া আনছেন। অথচ মানুষের দিলের ভিতরে যে ‘রুহ’ আছে, সেইটা তো আল্লাহর তরফ থিকা আসা এক আসমানি রাজ বা সিক্রেট। এইটারে ফ্রয়েডীয় ‘লিবিডো বা লাকাঁনীয় ‘থ্রি রেজিস্টার’-এর ফিতা দিয়া মাপতে যাওয়া পণ্ডশ্রম ছাড়া আর কিছু না।

ফিরিঙ্গি তাত্ত্বিক মোহে সলিমুল্লাহ ভুইলা যান যে, এই ‘অজ্ঞান’ বা আনকনশাস তো নফসের একটা নিচু স্টেজ মাত্র, কিন্তু খোদা তো ‘আল-আলিম’—উনারে কোনো ‘অজ্ঞান’ দিয়া ধরা সম্ভব না। সলিমুল্লাহর ডিসকোর্সে ‘অজ্ঞান’রে ঈশ্বর ডাকা মানে হইলো মানুষের নিজের লিমিটেশনরেই খোদার গদিতে বসানো।

সওয়াল হইলো, আমগো ডাকসাইটে আঁতেলরা কেন এই শেষ জমানাতেও ফিরিঙ্গি তত্ত্বে এতোটা মইজ্যা আছেন? সলিমুল্লাহর কামকাইজ আমগো চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দেয় যে, আমরা আসলে ‘এপিস্টেমিক কলোনিয়ালিজম’ বা জ্ঞানতাত্ত্বিক গোলামি থিকা এখনো আজাদ হইতে পারি নাই।

উনি যখন লাকাঁ বা ফ্রয়েড নিয়া মাতামাতি করতেছেন, তখন সেই তত্ত্বগুলারে ইসলামের অরিজিনাল সোর্স বা কুরআন-সুন্নাহর কষ্টিপাথরে পরখ কইরা দেখার কোনো গরজ উনি দেখান না। বরং উনার হাবভাবে মনে হয় এই ফিরিঙ্গি মালমসলাই হইলো আধুনিক মানুষ বুঝার ‘অহি’ স্বরূপ।

সলিমুল্লাহ আর উনার সাগরেদরা ফিরিঙ্গি তত্ত্বের এই ‘সেকুলার’ বা ‘অ্যাগনস্টিক’ ভিত্তির ব্যাপারে আজব রকম বেখবর। উনারা মগজে যা ঢুকাচ্ছেন, তার ইসলামি ভ্যালু বা আখেরাতের হিসাব নিয়া উনাদের কোনো জুতসই ফিকির বা তাকওয়া দেখা যায় না।

সলিমুল্লাহ খান যেইখানে আইসা ব্রেক দিছেন, সেইখান থিকা আগাইতে হইলে আমগো এমন এক রিগোরাস ক্রিটিক করা দরকার যা খালি পিরিতি দেখাইয়া থামবে না। উনার ওই ‘ভাষাই ঈশ্বর’ বা ‘অজ্ঞানই ঈশ্বর’ টাইপ গালভরা বয়ান শুনতে কুল মনে হইলেও ইসলামের আসল দাড়িপাল্লায় এইগুলা লুজ মাল।

এই মনোগ্রাফের পরের অধ্যায়গুলাতে আমরা দেখবো উনার একেকটা তাত্ত্বিক পজিশন কেমনে ইসলামের অরিজিনাল জ্ঞানকাণ্ডের লগে বারবার ধাক্কা খাইতেছে। আমরা সলিমুল্লাহর ডিসকোর্সরে ব্যবচ্ছেদ করমু ইসলামের নিজস্ব আর আপডেটেড জ্ঞানতাত্ত্বিক বয়ান দিয়া, আমগো টার্গেট হইলো তৌহিদী প্যারাডাইম।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles
দর্শনরাজনৈতিক দর্শন

রাষ্ট্র যখন উপাস্য: জাতিরাষ্ট্রের মেটাফিজিক্যাল দাবি || শায়খ মুসা আল হাফিজের সাক্ষাৎকার

দর্শন•May 18, 2026দর্শনরাজনৈতিক দর্শনরাষ্ট্র যখন উপাস্য: জাতিরাষ্ট্রের মেটাফিজিক্যাল দাবি || শায়খ মুসা...

দর্শনবাঙালি মুসলিমমডার্নিটিসমসাময়িক বিশ্লেষণ

ইটন-এর কৃষক ও বাংলার ইসলামের ভবিষ্যৎ

দর্শন•May 13, 2026দর্শনবাঙালি মুসলিমমডার্নিটিসমসাময়িক বিশ্লেষণইটন-এর কৃষক ও বাংলার ইসলামের ভবিষ্যৎমনোয়ার শামসী সাখাওয়াত•9...

দর্শনবাঙালি মুসলিমমডার্নিটিসমসাময়িক বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের ইসলামি পুনর্জাগরণ কেন শহুরে মধ্যবিত্তকেন্দ্রিক?

দর্শন•May 13, 2026দর্শনবাঙালি মুসলিমমডার্নিটিসমসাময়িক বিশ্লেষণবাংলাদেশের ইসলামি পুনর্জাগরণ কেন শহুরে মধ্যবিত্তকেন্দ্রিক?দ্য মুসলিম মাইন্ডস...

ইতিহাসদর্শনবাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ

সার্বভৌম সত্তা হিসেবে মুজিব : একটি নাগরিক ধর্মের নির্মাণ

ইতিহাস•May 7, 2026ইতিহাসদর্শনবাঙ্গালী জাতীয়তাবাদসার্বভৌম সত্তা হিসেবে মুজিব : একটি নাগরিক ধর্মের নির্মাণদ্য...