ইতিহাসের পুনর্পাঠঃ ঔপনিবেশিক প্রভাব থেকে উত্তরণের পথ

বর্তমান বিশ্বে ঔপনিবেশিক জ্ঞানকাঠামো থেকে মুক্তির প্রশ্নটি ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষত ইংল্যান্ড ও আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইতিহাস, দর্শন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান থেকে শুরু করে পাঠ্যক্রম ও গবেষণাপদ্ধতি পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই একটি মৌলিক বিতর্ক চলছে: আধুনিক জ্ঞানের যে কাঠামোকে আমরা দীর্ঘদিন ধরে ‘সার্বজনীন’ বলে মেনে এসেছি, তা আদৌ কতটা সার্বজনীন? নাকি সেটি মূলত ইউরোপের নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ও ক্ষমতাকাঠামোর প্রতিফলন?
এই প্রশ্নগুলোর সঙ্গে আমার পরিচয় মূলত তুলনামূলক রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে কাজ করার সূত্রে। কারণ, প্রথাগত রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং তুলনামূলক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। প্রথাগত রাষ্ট্রবিজ্ঞান সাধারণত ইউরোপীয় রাজনৈতিক চিন্তাকে মানবজাতির রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করে। ইউরোপের নিজস্ব ইতিহাস, সংকট ও সামাজিক অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেওয়া ধারণাগুলোকে প্রায়শই এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন সেগুলো সকল সমাজ ও সভ্যতার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য এবং অনুসরণীয়।
অন্যদিকে, তুলনামূলক রাষ্ট্রবিজ্ঞান এই সার্বজনীনতার দাবিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। এটি জানতে চায় রাজনীতি, ন্যায়, স্বাধীনতা, রাষ্ট্র কিংবা নাগরিকত্বের মতো ধারণাগুলো কি কেবল ইউরোপীয় ঐতিহ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, নাকি বিশ্বের অন্যান্য সভ্যতা ও বৌদ্ধিক ঐতিহ্যও এসব বিষয়ে স্বতন্ত্র ও মূল্যবান চিন্তার ভাণ্ডার গড়ে তুলেছে? ডিকলোনাইজিং বিতর্কের সঙ্গে এই অনুসন্ধানের সম্পর্কও এখানেই।
আমাদের মূল আগ্রহের জায়গা হলো, এই যে ইউরোকেন্দ্রিক দর্শন সারা বিশ্বে আধিপত্য বিস্তার করে আছে এবং একে যেভাবে সার্বজনীন হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে তার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা। এই প্রশ্ন তোলাটাকেই অনেক সময় আমাদের ‘পশ্চাৎপদতা’ বা পিছিয়ে পড়া হিসেবে দেখা হয়।
আমি তুলনামূলক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের যে কর্মশালাগুলো পরিচালনা করি, সেখানে আমার সাথে সহ-আয়োজক হিসেবে আছেন চীনা ও ভারতীয় রাজনৈতিক চিন্তাধারার অধ্যাপকেরা। এছাড়াও আছেন স্বদেশীয় আমেরিকান চিন্তাবিদ এবং আমার মতো ইসলামি চিন্তা ও অনুশীলন নিয়ে কাজ করা গবেষকেরা। আফ্রিকান দর্শন নিয়ে কাজ করেন এমন অনেকেই আমাদের সাথে যুক্ত আছেন। এই প্রেক্ষাপটেই আমি মূলত ইসলামি চিন্তা ও অনুশীলনের ওপর আলোকপাত করি।
আমার কাজ তুলনামূলক হলেও এটি মূলত এই বিউপনিবেশায়নের বিতর্কের সাথেই ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। গত কয়েক বছরে যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রে এই আন্দোলন বেশ জোরদার হয়েছে। তবে এর আসল সূত্রপাত হয়েছিল জিম্বাবুয়ে বা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলোতে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমেই সমাজে আদর্শ ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তাই দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম এই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে যে, আমাদের যে সিলেবাস পড়ানো হচ্ছে, তার উদ্দেশ্য কী? এগুলো কেবল ঔপনিবেশিক যুগের উচ্ছিষ্ট বা উপহার নয়। বরং এগুলো চলমান সাম্রাজ্যবাদ ও নব্য-উপনিবেশবাদেরই অংশ। ভৌগোলিক দখলদারিত্ব হয়তো শেষ হয়েছে, কিন্তু আদর্শিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্য এখনো প্রবলভাবেই রয়ে গেছে।
পাকিস্তানের কথা যদি বলি, খুব কম সংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয়েই এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আর যতটুকু হচ্ছে, তার পরিধিও বেশ সীমিত। হয়তো বলা হচ্ছে সিলেবাসে দু-একটা বই পাল্টে দেওয়ার কথা। কিন্তু শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী, আমরা কেন জ্ঞান উৎপাদন বা গ্রহণ করছি, কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আসল কাজ কী এসব মৌলিক জায়গা থেকে বিষয়টি খুব একটা ভাবা হচ্ছে না।
একজন শিক্ষক হিসেবে আমি চাই প্রতিটি শিক্ষার্থীর পেছনে পর্যাপ্ত সময় দিতে, তাদের সমস্যাগুলো বুঝতে। কিন্তু যখন তিন-চারশো শিক্ষার্থীর বিশাল কোনো ক্লাস নিতে হয়, তখন পুরো শিক্ষাব্যবস্থাই অনেকটা শিল্পকারখানার মতো যান্ত্রিক রূপ নেয়। তখন আমরা ‘কেন পড়ছি’ বা ‘কী উদ্দেশ্যে পড়ছি’ এই মৌলিক প্রশ্নগুলোই হারিয়ে যায়।
ইসলামি অধ্যয়নের বিউপনিবেশায়ন
আমি অন্তত তিনটি মূল বিষয়ে কথা বলতে চাই। প্রথম বিষয়টি হলো ইসলামি অধ্যয়নের (Islamic Studies) বিউপনিবেশায়ন। এর মানে আসলে কী? বিউপনিবেশায়ন বলতে আমরা বুঝি ঔপনিবেশিকতার প্রভাবগুলোকে চিহ্নিত করা এবং সেগুলো কমিয়ে আনার চেষ্টা করা। কিন্তু এই প্রভাব চিহ্নিত করার কাজটি মোটেও সহজ নয়। কারণ, ঔপনিবেশিকতার ক্ষতিগুলো বোঝানোর জন্য আমরা যেসব ধারণা, তাত্ত্বিক কাঠামো বা শব্দভাণ্ডার ব্যবহার করি, সেগুলোও অনেক সময় পরোক্ষভাবে সেই ঔপনিবেশিকতারই ফসল। এমনকি আমরা যেসব সমাধানের পথ প্রস্তাব করি, সেগুলোর মধ্যেও প্রায়ই ঔপনিবেশিক চিন্তার প্রতিফলন দেখা যায়। এর কয়েকটি উদাহরণ আমি পরবর্তীতে তুলে ধরার চেষ্টা করব।
একটি জ্ঞানশাখা হিসেবে ‘ইসলামি অধ্যয়ন’ কীভাবে উনিশ শতকে, বিশেষত ১৮৬০-এর দশক থেকে, গড়ে উঠল তা বিশ্লেষণ করলেই বিষয়টি আমাদের কাছে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
চলুন দেখি একটি স্বতন্ত্র অ্যাকাডেমিক ডিসিপ্লিন হিসেবে এটি কীভাবে গড়ে উঠল। আমরা বলতে পারি, ১৮৬০-এর দশক থেকে এর যাত্রা শুরু।
অবশ্য এর আগেও ইসলাম নিয়ে কাজ হচ্ছিল। কুরআন, হাদিস, ইতিহাস, মুসলিম ফিকহ, দৈনন্দিন জীবনে মুসলমানদের আচরণবিধি এসব নিয়ে মুসলিম বিশ্বে আগে থেকেই ব্যাপক চর্চা ও পড়াশোনা ছিল। কিন্তু আধুনিক ইউরোপীয় অ্যাকাডেমিক ডিসিপ্লিনে ইসলামকে দেখা হলো একটি ‘বিষয়’ বা ‘সমস্যা’ হিসেবে। ইসলাম আসলে কী? এর মূল নির্যাস কী? এর প্রভাব কেমন? মূলত এই প্রশ্নগুলোর সাথে জড়িয়ে ছিল তাদের নিজস্ব কিছু রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ভাবনা। যেমন এই বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠীকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়?
উপনিবেশবাদ তো শুধু ভৌগোলিক দখলদারিত্বের মাধ্যমে শেষ হয়ে যায়নি। সেসময় একটা বড় প্রশ্ন ছিল—ইসলাম কি আধুনিকতার (Modernity) সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ? আমাদের নিজেদের অনেক পণ্ডিতও তখন আধুনিকতা ও ইসলামের সম্পর্ক নিয়ে বিস্তর ভেবেছেন। সত্তরের দশকে, বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এই প্রশ্নটা একটু ভিন্ন রূপ নিল। তখন উদারতাবাদ (Liberalism) সারা বিশ্বের একমাত্র আধিপত্যশীল আদর্শ হয়ে দাঁড়াল। ফলে ইসলামি অধ্যয়নে নতুন প্রশ্ন উঠল—ইসলাম কি উদারতাবাদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ? অনেক মুসলিম ও অমুসলিম গবেষক তখন প্রমাণ করতে চাইলেন যে, হ্যাঁ, ইসলাম ও উদারতাবাদের মধ্যে মিল বা সামঞ্জস্য রয়েছে।
সমসাময়িক বিশ্বপরিস্থিতিতে এই প্রবণতা আরও প্রকট হয়েছে। এখন প্রশ্ন দাঁড় করানো হয়েছে যে, ইসলাম কি স্বভাবগতভাবে সহিংস, নাকি তা শান্তিপূর্ণ ও বহুত্ববাদী সমাজের ভিত্তি হতে পারে? ইসলাম কি আধুনিকতার সাথে মানানসই? এখানে লক্ষণীয় যে, সহিংসতার পুরো দায়ভার একতরফাভাবে মুসলিম ও ইসলামের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। বলা হয়, এরা তো সহিংস, এদের কি আদৌ সহনশীল হওয়ার মতো কোনো উৎস আছে?
কিন্তু এই কাঠামোতে আমরা কখনোই প্রশ্ন করি না যে, খোদ উদারতাবাদের নিজস্ব কোনো সমস্যা আছে কি না, বা ‘উদারবাদী সহনশীলতার’ (Liberal tolerance) কোনো সীমাবদ্ধতা বা স্ববিরোধিতা আছে কি না। প্রমাণের পুরো দায়ভার একতরফাভাবে মুসলমানদের ঘাড়ে চাপে। আর পাল্টা প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগই থাকে না। এটাই হলো এই কাঠামোর প্রভাব। কোন প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, আর কোনটির উত্তর আমাদের খুঁজতে হবে, সেই প্রশ্ন করার স্বাধীনতাই আমাদের (অর্থাৎ উপনিবেশিত মানুষের) আর থাকে না।
শরিয়ার বিষয়টি যদি দেখি, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন শাসন শুরু করল, তাদের বুঝতে হবে এই মানুষদের কীভাবে সামলাবে। তারা দেখল, মুসলমানরা শরিয়া অনুযায়ী আর হিন্দুরা তাদের নিজস্ব রীতি অনুযায়ী সমস্যা মেটায়। তারা এগুলোকে আদালতে আইনি বিধানে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করল। উইলিয়াম জোন্স এবং আরও অনেকে মিলে শরিয়ার একটি নির্দিষ্ট কাঠামো দাঁড় করানোর চেষ্টা করলেন। প্রথাগত শরিয়া ব্যবস্থায় অনেক ধরনের ব্যাখ্যা বা মতভিন্নতার সুযোগ ছিল। উদাহরণস্বরূপ, চুরির শাস্তি হাত কাটা হতে পারে, কিন্তু চোর যদি ক্ষুধার্ত হয়ে চুরি করে থাকে, তবে হয়তো তাকে কিছু টাকা দিয়ে বিদায় করার বিধানও থাকতে পারে। অর্থাৎ, সমস্যা সমাধানের অনেক নমনীয় উপায় ছিল। কিন্তু ব্রিটিশ বিচারকদের বোঝার সুবিধার্থে বিষয়গুলোকে অত্যন্ত সংকীর্ণ করে ফেলা হলো। একটি কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রের প্রয়োজনে শরিয়াকে অভিন্ন বিধানে রূপ দেওয়া হলো।
এক-দেড়শো বছর পর এর ফল কী দাঁড়াল? বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এসে এই শরিয়া পরিণত হলো একটি অত্যন্ত সীমিত ও কঠোর আইনি ব্যবস্থায়। এর সেই আগের প্রাণবন্ততা বা নমনীয়তা আর রইল না। তখন মুসলমানরাই বলতে শুরু করল, শরিয়াকে নতুন করে সাজানো করা দরকার। অর্থাৎ, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রভাবে অনেক মুসলমান নিজেই এমন সব পরিবর্তনের দাবি জানাতে শুরু করল, যা মূলত পশ্চিমা আধুনিকতার সাথেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ইসলামি অধ্যয়নের ওপর ঔপনিবেশিক প্রভাবের আরেকটি দিক আমি তুলে ধরতে চাই। যাঁরা বিউপনিবেশায়ন নিয়ে কাজ করতে চেয়েছিলেন, তাঁদেরও কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। মাওলানা মওদুদীর ওপর আমার কাজের সূত্র ধরে বিষয়টি বলছি। মাওলানা মওদুদী জাতীয়তাবাদের কট্টর সমালোচক ছিলেন। তিনি স্পষ্ট বলেছিলেন, জাতীয়তাবাদ গণতন্ত্রের জন্যও হুমকিস্বরূপ। ইউরোপের নিজস্ব বিশেষ পরিস্থিতির কারণে সেখানে গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ একসঙ্গে বিকশিত হয়েছিল। কিন্তু বাকি বিশ্বের জন্য, বিশেষ করে ভারতের মুসলমানদের জন্য জাতীয়তাবাদ একটা বড় সমস্যা। অনেকেই তাঁর এই সমালোচনা ঠিকমতো বুঝতে পারেননি; ভেবেছেন তিনি হয়তো একে স্রেফ ‘অনৈসলামিক’ বলে খারিজ করে দিয়েছেন।
কিন্তু তিনি কেন একে অনৈসলামিক বলেছিলেন? কারণ তিনি মনে করতেন, জাতীয়তাবাদ ধীরে ধীরে মানুষকে এক ধরনের প্রতিযোগিতামূলক বর্ণবাদের দিকে ঠেলে দেয়। ইউরোপের ইতিহাস টানলে দেখা যায়, এটি কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করে। ইউরোপে নিজেদের একতাবদ্ধ করতে হয়তো এই ধারণা কাজে লেগেছিল, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তাদের নিজেদের মধ্যেও প্রতিযোগিতামূলক বর্ণবাদ বেড়েছে।
অর্থাৎ, একদিকে তিনি ইউরোপীয় ধারণার খুব চমৎকার ও তীক্ষ্ণ সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু অন্যদিকে তিনি যে সমাধানের পথ দেখালেন, তা তৎকালীন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের বাইরে যেতে পারেনি। ১৯২০ বা ৩০-এর দশকে ইউরোপে ফ্যাসিবাদী আন্দোলন এবং রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লবের পর মনে করা হতো, বড় কোনো পরিবর্তন আনতে চাইলে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা জরুরি। রাশিয়ান বিপ্লবের মডেলে মনে করা হতো, একটি ‘ভ্যানগার্ড পার্টি’ যদি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে, তবে তারা সমাজকে আমূল বদলে দিতে পারবে। মওদুদী সাহেবও ঠিক এই চিন্তাকাঠামোর ভেতরেই কাজ করছিলেন। তিনি ভাবলেন, মুসলমানদের জন্যও এমন একটি ভ্যানগার্ড পার্টি দরকার, যারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে সমাজকে পাল্টে দেবে।
এর অর্থ হলো, তিনি একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত চিন্তাকে উপনিবেশমুক্ত করতে পারলেও, শেষ পর্যন্ত ওই কাঠামোর বাইরে যেতে পারেননি। আমরা যখন বিউপনিবেশায়নের কথা বলি, তখন আমাদেরও এই সীমাবদ্ধতাগুলোর কথা মাথায় রাখতে হবে। এর মানে এই নয় যে আমরা বিউপনিবেশায়ন করব না, কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে কাজটা কত কঠিন।
চিন্তার উপনিবেশমুক্তি ও আগামী দিনের পথ
বিউপনিবেশায়নকে আমাদের কীভাবে বোঝা উচিত? অতীতকে পুরোপুরি বাতিল করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়; কারণ আমরা এখন এমন সব প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে বাস করি, শিক্ষাব্যবস্থার এমন এক জাঁতাকলে আটকে আছি যার শেকড় অনেক গভীরে। বিউপনিবেশায়নের মানে এই নয় যে আমরা কোনো এক কাল্পনিক, নিখুঁত অতীত যুগে ফিরে যাব।
আমার মতে, বিউপনিবেশায়ন হলো সৃজনশীলতার সাথে আজকের সমস্যাগুলোকে বোঝা। আর সমাধানের জন্য কেবল ইউরোপ, কিংবা কেবল মদিনার রাষ্ট্র বা কেবল অতীতের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। সব জায়গা থেকে ইতিবাচক উপাদানগুলো নিয়ে সেগুলোর সমন্বয় ঘটাতে হবে।
মাওলানা মওদুদীকেও যদি আপনি গভীরভাবে পড়েন, দেখবেন তিনিও ইউরোপীয় এবং ইসলামি উভয় ধারণা থেকেই উপাদান গ্রহণ করেছেন, যদিও তিনি সেগুলোকে একান্তই ‘ইসলামি’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। আজকের দিনে কোনো একটি নির্দিষ্ট চিন্তাধারাকে পুরোপুরি বাতিল করে দেওয়া সম্ভব নয়; আমাদের উভয় দিক থেকেই গ্রহণ করতে হবে।
বর্তমানে আমি ‘ইসলামি সমাজতন্ত্র’ নিয়ে কাজ করছি। অনেকেই বলেন, সমাজতন্ত্রের কথা বললে আপনি পশ্চিমা হয়ে গেলেন। আর ইসলামি থাকতে চাইলে কেবল ইবনু তাইমিয়া বা অতীতের ওপর নির্ভর করতে হবে। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ইসলামি সমাজতন্ত্র নিয়ে সেসময়ের বিতর্কগুলো বেশ চমকপ্রদ ছিল। তারা এই দুই ধারার সমন্বয় করার চেষ্টা করেছিলেন। এই প্রয়াস কতটা সফল বা ব্যর্থ ছিল, সেটা ভিন্ন তর্ক। কিন্তু আজ যখন সারা বিশ্বে বৈষম্য) চরম আকার ধারণ করেছে, গত বিশ বছরে এই বৈষম্য যে মাত্রায় বেড়েছে তা মোকাবিলার জন্য যদি সেই পুরনো বিতর্কগুলো থেকে আমরা নতুন কোনো ধারণা বা পদ্ধতি পাই, তবে সেখান থেকে আমাদের শেখা উচিত।
সবশেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে চাই। এখনো ইসলামিক স্টাডিজের অনেক সম্মেলনে বা পাকিস্তানের গণমাধ্যমগুলোর রাজনৈতিক বিতর্কে একটি বিষয় খুব দেখা যায় সবাই যেন ইসলামের একটি ‘মূল নির্যাস’ বা অবিমিশ্র সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে ব্যস্ত। কিন্তু যদি খেয়াল করেন, ইসলামের এই ‘নির্যাস’ খোঁজার প্রবণতাটি একেবারেই আধুনিক একটি বিষয়।
আগেকার যুগের ফকিহ বা চিন্তাবিদেরা নির্দিষ্ট ঘটনা বা বাস্তবতার আলোকে কাজ করতেন। কিন্তু পুরো ইসলামকে একটি সুনির্দিষ্ট বাক্সে বন্দি করে ফেলা—’এখান থেকে শুরু, এখানে শেষ, এই হচ্ছে এর সীমানা’—এভাবে যৌক্তিকভাবে সাজানোর তাড়নাটি পুরোপুরি আধুনিক ও ঔপনিবেশিক চিন্তার ফসল। ব্রিটিশরা যেমন হিন্দুধর্মের একটি একক নির্যাস খুঁজে বের করতে চেয়েছিল, এটিও ঠিক তেমনই।
সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, আমাদের প্রশ্নটি কী হবে? উত্তর খুঁজতে হয়তো অনেক সময় লাগবে, কিন্তু নিজেদের সমস্যা অনুযায়ী নিজেদের প্রশ্নগুলো ঠিক করতে পারাটাই সবচেয়ে বড় কাজ। এটি কঠিন হলেও, এভাবেই আমরা ঔপনিবেশিক চিন্তার ছায়া থেকে বেরিয়ে আসার পথে পা বাড়াতে পারব। অন্যথায় আমরা উপনিবেশবাদের ফাঁদেই আটকে থাকব। নিজেদের প্রশ্নগুলো নিজেরাই তৈরি করতে পারলেই আমরা প্রকৃত অর্থে মুক্তি পাব।
শ্রুতিলিখনঃ
শাহেদ হাসান
রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, দ্য মুসলিম মাইন্ডস
মূল আলোচনা: To shift the mindset of people from the colonial influence, we need to study our history







Comments