মডার্নিজমঃ পর্ব ১ | মুসা আল হাফিজ

যদি আধুনিকতার উদ্ভবের সময়কালকে এক কথায় চিহ্নিত করতে হয়, তাহলে সেটি ১৪৫৩ সাল। সময়টা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই সনেই মুহাম্মাদ আল ফাতিহ কনস্টান্টিনোপল বিজয় করেছিলেন; যার মধ্য দিয়ে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতন নিশ্চিত হয়েছিল এবং তাদের কেন্দ্র কনস্টান্টিনোপল থেকে রোমে স্থানান্তরিত হয়েছিল। রোমান সাম্রাজ্যের দুটি অংশ ছিল: একটি হলো রোমকেন্দ্রিক, অন্যটি তুরস্কের কনস্টান্টিনোপলকেন্দ্রিক। কনস্টান্টিনোপলকেন্দ্রিক সাম্রাজ্যটি মূলত ইউরোপের বৃহত্তর অংশ, বলকানসহ ইউরেশিয়ার বৃহত্তর অংশ এবং এশিয়ার একটি অংশকে শাসন করত এবং খ্রিষ্টধর্মের প্রতিনিধিত্ব করত।
কনস্টান্টিনোপলে অব্যাহতভাবে দুটি সভ্যতার মিলন হয়েছিল। একটি হলো পশ্চিমা-খ্রিষ্টীয় সভ্যতা, অন্যটি মুসলিম সভ্যতা। যদিও ১৪৫৩ সালে সেখানে মুসলিমদের বিজয় নিশ্চিত হয়েছে, কিন্তু আন্তঃসম্পর্ক এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া—এক সভ্যতার সাথে আরেক সভ্যতার যোগাযোগ, পরিচয় এবং ঘনিষ্ঠতার একটি ব্যাপার কয়েক শতাব্দী ধরেই চলে আসছিল। মুসলিমদের সাথে তাদের সংলাপ, পারস্পরিকতা, মুসলিম জ্ঞানের সাথে তাদের পরিচয়, মুসলিম সংস্কৃতির সাথে তাদের যোগাযোগ, মুসলিমদের সেখানে আনাগোনা—এমনকি কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের জন্য মুসলিমদের যে অভিযান, সেটি সাহাবাদের আমলেই শুরু হয়ে গিয়েছিল।
নবিজি ﷺ মদিনায় যার মেহমান হয়েছিলেন, হজরত আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)—তাঁর কবরস্থান কনস্টান্টিনোপলের উপকণ্ঠেই অবস্থিত। মুসলমানরা এই (বিজয়ের) চেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন। তাঁরা অভিযান করেছেন, বারবার ঘেরাও করেছেন, অবরোধ করেছেন। ফলে মুসলমানদেরকে তারা (ইউরোপীয়রা) দুইভাবে দেখেছে: আক্রমণকারী প্রতিপক্ষ হিসেবে এবং এমন একটি ধর্ম হিসেবে, যেটি তাদের অগ্রসর অংশকে অব্যাহতভাবে অনুপ্রাণিত করেছে, নিজের দিকে টেনেছে এবং উদ্বুদ্ধ করেছে।
ইসলাম ও খ্রিষ্টবাদ
ইউরোপীয়রা মুসলিমদের কীভাবে দেখেছে—বিষয়টি বুঝতে হলে ইসলামের সাথে খ্রিষ্টবাদের সংঘাতের কারণগুলো আমাদের জানতে হবে। ‘ইসলাম’ খ্রিষ্টবাদের কাছে অপরিচিত কোনো জিনিস নয়; বরং অনেকটা কাছাকাছিই বলা যায়। ইসলাম তাওহিদের কথা বলে, খ্রিষ্টবাদও তাওহিদের কথা বলে। ইসলাম রিসালাতের কথা বলে, খ্রিষ্টবাদও রিসালাতের কথা বলে। ইসলাম আখিরাতের কথা বলে, খ্রিষ্টবাদও আখিরাতের কথা বলে। কিন্তু, খ্রিষ্টবাদের তাওহিদের মধ্যে ট্রিনিটি (ত্রিত্ববাদ) ঢুকে পড়েছে, রিসালাতের মধ্যে আল্লাহর পুত্রত্ব ঢুকে পড়েছে, রিসালাতের ধারণা থেকে তারা বিচ্যুত হয়ে গেছে, তাদের আখিরাতের ধারণার মধ্যে আদি পাপের বিষয়টি যুক্ত হয়ে গেছে; ফলে সকল মানুষকে তারা পাপী মনে করছে। তারা মনে করছে—যারা যিশু খ্রিষ্টের অনুসারী—কেবল তারাই মুক্তি লাভ করবে; যেহেতু তাদের মুক্তির জন্য যিশু খ্রিষ্ট আত্মদান করেছেন এবং নিজে শূলবিদ্ধ হয়েছেন।
এসব বিশ্বাসের মধ্যে ইসলাম যেগুলোকে বিকৃতি হিসেবে দেখে, সেগুলোকে বাদ দিলে খুব কাছাকাছিই বলা যায়। ইসলাম ও খ্রিষ্টবাদে ওহির ধারণা, মুনাজ্জাল (অবতীর্ণ) কিতাবের ধারণা একই। তাদের যে সমস্ত নবি—মুসা (আ.), দাউদ (আ.), সুলাইমান (আ.), ইউসুফ (আ.), ইয়াকুব (আ.), ইব্রাহিম (আ.), ইসহাক (আ.)—তাঁরা ইসলামেরও নবি। খ্রিষ্টানদের কাছে তাঁরা মহাপুরুষ এবং এত বিকৃতির পরেও বাইবেলের মধ্যে (তাদের পরিভাষায়) তাঁদের বিবরণগুলো রয়েছে। যদিও সেখানে তাঁদের ব্যাপারে ভালো-মন্দ নানা কিছু আরোপ করা হয়েছে, তবুও তাঁদের কথা উল্লেখ রয়েছে এবং খ্রিষ্টানরা তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করে।
নৈকট্য অনেক সময় দ্বন্দ্ব তৈরি করে। যেমন: একটি খ্রিষ্টান দৃষ্টি ইসলামকে সব সময় খ্রিষ্টধর্মের একটি নকল হিসেবে দেখেছে। ইসলামকে ভেবেছে নিজের বিরুদ্ধে একটি বিদ্রোহ—খ্রিষ্টধর্মকে আরব দৃষ্টিকোণ থেকে সংস্কারের একটি প্রয়াস। ইসলামের মৌলিকত্ব, ঐশ্বরিক সত্য, স্বাতন্ত্র্য, নিজস্বতা এবং সারসত্তাকে একটি খ্রিষ্টান মন সার্বভৌম-সত্য হিসেবে স্বীকার করতে সবসময় কুণ্ঠিত থেকেছে। ফলে ইসলামের বিরুদ্ধে এক ধরনের ক্রোধ, ঘৃণা-বিদ্বেষ তাদের অব্যাহত উত্তরাধিকারের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আধুনিককালে আব্রাহামিক ধর্ম হিসেবে যে ধর্মগুলোকে ধরা হয়ে থাকে, তন্মধ্যে ইহুদি ধর্ম, খ্রিষ্টধর্ম এবং ইসলামকেই প্রধান হিসেবে দেখা হয়। অর্থাৎ, এরা সমগোত্রীয়। এই নৈকট্য এক ধরনের দ্বন্দ্ব তৈরি করেছে। এই দ্বন্দ্বের মধ্যে ঈর্ষা রয়েছে, প্রতিহিংসা রয়েছে, রয়েছে ক্ষোভ ও ক্রোধ।
ভৌগলিক বিজয়-অভিযান
ইউরোপীয়দের সাথে মুসলিমদের আরেকটি দ্বন্দ্বের বিষয় হলো: ইউরোপীয় বাইজেন্টাইনদের যে বৃহত্তর শাসনাধীন এলাকা এশিয়া ও আফ্রিকার মধ্যে ছিল, ইসলাম নিজের আরব সীমানা থেকে বের হয়ে বহির্বিশ্বে বিকাশের প্রথম ধাক্কায় সেসব অঞ্চলসমূহকে নিজের করে নিয়েছিল; নিজের করেছিল সেখানকার মানুষজনকেও। ইসলাম তাতারিদের মত এমন কোন ঝড় ছিল না, যে আসলো, আবার হঠাৎ করে উধাও হয়ে গেল। ইসলাম যেখানেই গিয়েছে, সেখানে ভূমি জয় করার আগে মানুষকে জয় করেছে। মানুষের মনের উপর নিজের জয় এবং কর্তৃত্বকে ইতিবাচক উপায়ে প্রতিষ্ঠা করেছে। এর মাধ্যমে ভূমির জয়কে সংহত করেছে। ইসলাম সেসব স্থানের জ্ঞানকেও জয় করেছে। কনস্টান্টিনোপলের পথ ধরে ইউরোপের সাথে ইসলামের যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। সেই যোগাযোগের মধ্যে ভীতি, দ্বন্দ্ব, সংঘর্ষ, বিদ্বেষ এবং প্রতিহিংসার একটি ধারাবাহিকতা ছিল।
আরেকটি যোগাযোগের পথ ছিল— যে পথে মুসলমানরা মরক্কো হয়ে জিব্রাল্টার প্রণালী পাড়ি দিয়ে স্পেন জয় করেছিল। সেখানে দীর্ঘকালীন শাসনের মধ্য দিয়ে মুসলমানরা ইউরোপকে তার “Age of Darkness” বা “অন্ধকার যুগে”র গহ্বর থেকে বের করে নতুন একটি জীবনীশক্তি প্রদান করেছিল। তারা সেটি করেছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের মধ্য দিয়ে, দর্শনের মধ্য দিয়ে, নগর জীবনের উত্থানের মধ্য দিয়ে, চেতনা বিস্তারণের মধ্য দিয়ে, জীবনকে নতুনভাবে দেখার একটি প্রেরণা সঞ্চারিত করার মধ্য দিয়ে, বিশ্বকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার একটি প্রবণতার মধ্য দিয়ে, প্রকৃতিকে বিশ্লেষণ করার, পাঠ করার এবং অধিকার করার আকাঙ্ক্ষা তৈরি করার মধ্য দিয়ে এবং অতীতের সমস্ত জ্ঞানের সাথে সংযোগের চ্যানেল স্থাপনের মধ্য দিয়ে। মুসলমানরা ইউরোপের একটি অগ্রসর শ্রেণিকে প্রতিষ্ঠা করল, যারা মূলত অগ্রসর হয়ে উঠেছিল মুসলমানদের সান্নিধ্যের ফলে, মুসলমানদের কাছ থেকে জ্ঞান লাভের ফলে; (মুসলমানদের) টলেডোতে, কর্ডোভায়, সেভিলে, গ্রানাডায় আগমনের মধ্য দিয়ে, সেখানকার বিদ্যাপীঠে জ্ঞানালোক লাভ করার মধ্য দিয়ে।
অপর একটি চ্যানেল তৈরি হয়েছিল সিসিলিতে— আফ্রিকার বার্বার১ এবং মুর২ মুসলিমদের মাধ্যমে। সিসিলির পথ হয়ে মুসলমানরা ইতালিকে, রোমকে আলোকমন্ডিত করছিলেন; নতুন জীবনীশক্তি এবং নতুন দৃষ্টি উপহার দিয়েছিলেন। ফলে, ইউরোপের দীর্ঘকালীন নীরব, ঘুমন্ত এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন গুহার মধ্যে সমর্পিত জনজীবন, সামাজিক জীবন, অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট নতুনত্ব লাভ করে। ইউরোপের তখনকার জ্ঞানবিদ্যার যে বাস্তবতা ছিল, সেখানে শিক্ষাকে এক ধরণের পাপ হিসেবে চিহ্নিত করা হত। এমনকি সেখানে সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করার আন্দোলন হয়েছিল! পোপ গ্রেগরি এই আন্দোলন শুরু করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “অজ্ঞতা হচ্ছে ধ্যানের জননী। যদি ধ্যান অর্জন না কর, তাহলে মুক্তি মিলবে না। আর যদি ধ্যান অর্জন করতে হয়, তাহলে জ্ঞান তোমাকে ধ্যান পর্যন্ত নিয়ে যাবে না। কারণ যেখানে জ্ঞান আসে, সেখানে জিজ্ঞাসা আসে। আর জিজ্ঞাসা ধ্যানের পরিপন্থী। যদি ধ্যান চাও, তাহলে জ্ঞান থেকে দূরে থাকতে হবে।” অতএব, জ্ঞানের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করতে হবে। তাই, সেগুলোকে ধ্বংস করার আন্দোলন হয়েছিল। এটিই ছিল মধ্যযুগীয় বর্বরতা।
অন্যদিকে, মুসলিমরা মধ্যযুগে কী করেছে? যেখানেই গিয়েছে, জ্ঞানের আলোকমালা নিয়ে গিয়েছে; বিদ্যাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে গিয়েছে; বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছে; পৃথিবীকে নতুন নতুন জ্ঞান সৃষ্টির মধ্য দিয়ে আলোকিত করেছে। এমনই ছিল মুসলিমদের মধ্যযুগ; মুসলিমদের সময়কাল। মধ্যযুগীয় বর্বরতা যদি কোথাও থেকে থাকে, সেটি ইউরোপে ছিল। সেখান থেকে ইউরোপকে টেনে তোলার কাজটা মুসলমানরা করেছে। মুসলমানরা সেটি করেছে স্পেনের পথ ধরে, কনস্টান্টিনোপলের সেতু দিয়ে, সিসিলি এবং ইতালি হয়ে।
ক্রুসেড
ইউরোপীয়দের সাথে মুসলমানদের যোগাযোগের অন্য পথটি ছিল “ক্রুসেড”। ক্রুসেডের মধ্য দিয়ে ইউরোপীয়রা সিরিয়ায় এসেছিল, ফিলিস্তিনে এসেছিল এবং মুসলিমদের সভ্যতার প্রাণকেন্দ্রের সাথে তাদের সংযোগ তৈরি হয়েছিল। সেই সংযোগ যেমন শত্রুতার মধ্য দিয়ে হয়েছিল, তেমনি হয়েছিল মিত্রতার মধ্য দিয়ে— দীর্ঘস্থায়ী সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে। এখানে তারা দুইশত বছর অবস্থান করেছিল। তাদের এক প্রজন্মের পর আরেক প্রজন্ম এসেছিল। তারা রাষ্ট্রও গঠন করেছিল— তাদের পরিচালিত রাষ্ট্র ছিল লেভান্তে, সিরিয়ায়। এমনকি দীর্ঘদিন তারা বাইতুল মুকাদ্দাস শাসন করেছে; জেরুসালেম শাসন করেছে। এসবের মধ্য দিয়ে তারা মুসলিমদের জীবনযাত্রাকে প্রত্যক্ষ করেছে। মুসলিমদের গৃহনির্মাণকলা, শিক্ষাব্যবস্থা, বাজার-ব্যবস্থা, নগর পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা— সমস্ত কিছুকে তারা একেবারে নিকট থেকে অবলোকন করেছে। এর মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের জীবনের, নিজেদের সমাজ-ব্যবস্থার, রাষ্ট্র-ব্যবস্থার এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার যে সমস্ত অন্ধকার, অচল দিক এবং গতানুগতিক যে অসারতা ও অসাড়তা— এগুলোকে অতিক্রম করার একটি উদ্দীপনা এবং অন্তর্দৃষ্টি লাভ করেছে।
জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার বিপ্লব
ইউরোপীয় জাগরণের পেছনে একটি বড় কারণ হলো গ্রিকদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে তাদের সংযোগ। আর এই সংযোগের পথ তথা চ্যানেলটিও তৈরি করে দিয়েছিলেন মুসলমানরা। আমরা জানি, আব্বাসীয় আমলে বাগদাদে খলিফা মামুনের ব্যবস্থাপনায় বাইতুল হিকমাহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পৃথিবীর সকল ভাষার, সকল জাতির, সকল সভ্যতার যত জ্ঞান-সম্পদ— যা ছিল গ্রিকদের, রোমানদের, মিশরীয়দের, চাইনিজদের এবং ভারতীয়দের কাছে— সমস্ত কিছুকে একত্রিত করে সুরক্ষা দেয়া, অনুবাদ করা, সম্পাদনা করা, বিচার-বিশ্লেষণ করা, এবং তা কাজে লাগিয়ে নবসৃষ্টির এমন আন্দোলন পৃথিবীর ইতিহাসে অন্য কোথাও হয়নি। আর এটিই হয়েছিল বাগদাদে, আব্বাসীয় আমলে, বাইতুল হিকমাহতে— প্রাতিষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার মধ্য দিয়ে।
এমনই অপর একটি আন্দোলন ইউরোপের মধ্যে জেগে উঠল। আমরা একাদশ ও দ্বাদশ শতকে সেখানে অনুবাদ আন্দোলন দেখতে পাই। অর্থাৎ, মুসলিমদের জ্ঞানকে ইউরোপে স্থানান্তর। দ্বাদশ শতকে, ত্রয়োদশ শতকে, চতুর্দশ শতকে মুসলিমদের জ্ঞান-সম্পদ বিপুল মাত্রায় ল্যাটিনে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছিল। এখন পর্যন্ত বাঙালি মুসলমানদের অগ্রজ শ্রেণী হয়ত ইবনে সিনার “আল কানুন ফিত তিবব” কিতাবটির নাম শুনেছেন; স্পর্শ করে দেখার সৌভাগ্য হয়ত খুব কম লোকেরই হয়েছে। কিন্তু সেটি ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়েছে দ্বাদশ শতকেই। আল-খাওয়ারিজমির গ্রন্থ অনূদিত হয়েছে; আল বাত্তানির গ্রন্থ অনূদিত হয়েছে; ইবনু রুশদ, হাইসামি, মাওয়ারদি, আল-বিরুনি— প্রমুখের গ্রন্থসমূহ অনূদিত হয়েছে। একাদশ শতক থেকে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া চলমান ছিল এবং এখন পর্যন্ত এটি চলমান রয়েছে। অনুবাদের যুগ পার করে সেগুলোকে বিচার বিশ্লেষণের যুগ এল; এরপর এল নবসৃষ্টির যুগ। এই স্তরগুলো মুসলিমরাও এক সময় অতিক্রম করেছিলেন। মুসলিমদের হাতে যে সমস্ত অতীত জ্ঞান-বিজ্ঞান অনুশীলিত, চর্চিত, বিকশিত এবং বিশ্লেষিত হয়েছিল, সেগুলোকে— মুসলিমদের হাজার বছরের অর্জনকে— তারা এক লহমায় হাত বাড়িয়ে নিয়ে গেল!
ইউরোপীয়রা এটি স্বীকার করেছে। একজন-দুইজন না, অনেকেই স্বীকার করেছে— শত কণ্ঠ স্বীকার করেছে। অনুবাদের মধ্য দিয়ে তাদের সাথে যেমন অ্যারিস্টটল, প্লেটো, সক্রেটিসের চিন্তার যোগাযোগ ঘটল, ঠিক তেমনি মুসলিমদের জ্ঞান-সম্পদ— মুসলিমরা যা কিছু আহরণ করেছিলেন, উদ্ভাবন করেছিলেন, নবায়ন করেছিলেন, সূত্রায়ন করেছিলেন— সমস্ত কিছু তাদের হাতে চলে গেল।
পরবর্তী ধাপে ইউরোপের মধ্যে জেগে উঠল আবিষ্কারের যুগ। এক্ষেত্রেও তারা নিজেদের পূর্বপুরুষের কৃতিত্ব স্বীকার করেছে, কিন্তু মুসলিমদের মধ্যস্থতাকে অস্বীকার করেছে। এগুলো কি সৃষ্টিশীল কাজ নয়?
মুসলমানরা অতীতের সমস্ত কিছু পর্যালোচনা করে জ্ঞানের নতুন নতুন অধ্যায় সৃষ্টি করেছেন। সারা পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার পেছনে রয়েছে “পৃথিবী গোলাকার তত্ত্ব”— মুসলিমদের হাতে বিকশিত। “বীজগণিত” তথা “অ্যালজেবরা” মুসলমানদের হাতে সৃজিত। অ্যালজেবরাকে যদি বাদ দেয়া হয়, কম্পিউটার কি অস্তিত্বে আসবে? এই যে বৈদ্যুতিক যোগাযোগব্যবস্থা, টেলিভিশনসহ প্রায় প্রতিটি আবিস্কারের পেছনে গণিত বিদ্যমান রয়েছে, অ্যালজেবরা রয়েছে। এটিকে বাদ দিলে পৃথিবীকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা যায় না। কম্পাসকে বাদ দিলে ইউরোপের ভৌগোলিক আবিষ্কার সম্পন্ন হতো না। এ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের নির্ধারক, নির্ণায়ক, পথপ্রদর্শক যে সমস্ত মৌলিক উদ্ভাবন— এগুলো কাদের হাতে হয়েছে? মুসলিমদের হাতে।
আধুনিকতাবাদ
ইউরোপে যে আধুনিকতার বিকাশ ঘটেছে, তারা সেটির কৃতিত্ব এবং ঋণ স্বীকার করেছে গ্রিকদের ও রোমানদের নিকট। তারা মনে করেছে, দাবি করেছে এবং নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে যে, আত্মশক্তির অনুশীলনের মধ্য দিয়ে তারা অন্ধকার যুগ থেকে আলোকিত যুগে প্রবেশ করেছে। আধুনিকতার জন্ম মূলত চতুর্দশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে পঞ্চদশ শতকের মাঝে। ষোড়শ শতকে এটি এমন একটি প্রেক্ষাপট লাভ করল, যার ভেতর থেকে ইউরোপীয় রেনেসাঁ জেগে উঠল। স্বায়ত্তশাসিত নগর রাষ্ট্রগুলোর জন্ম, মধ্যযুগের বাণিজ্যিক অগ্রগতি, প্রোটেস্ট্যান্টদের সংস্কার আন্দোলন, তারপর প্রতিসংস্কার আন্দোলন পাশ্চাত্য জগতে আধুনিকায়নের নতুন আবহ সৃষ্টি করলো। সেখানে বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সাধন হলো। মূলত, রেনেসাঁর মধ্য দিয়েই আধুনিকতা নিজস্ব একটি পটভূমি লাভ করল, নিজস্ব জমি লাভ করল, বিকাশ লাভ করল। তাই বলা যায়, ইউরোপে আধুনিকতার জন্মস্থান, জন্মসূত্র এবং জন্মঘটনা হলো রেনেসাঁ
উদ্ভব, বিকাশ এবং নতুন মাত্রা লাভ করার পরে আধুনিকতা এক যুগ থেকে আরেক যুগে বিবর্তিত হয়েছে। বিশেষত, উনিশ ও বিশ শতকে এটি পশ্চিমা সমাজে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন এনেছে; ব্যাপক রূপান্তরের ঘটনাগুলো ঘটেছে; সাংস্কৃতিক প্রবণতা নবায়ন হয়েছে; নতুন নতুন মাত্রার সংযোজন ঘটেছে। বিশেষ করে বিগত শতকের পঞ্চাশের দশকে, অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে আধুনিকীকরণ একটি নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। বিশ্বব্যাপী নিজের বিস্তার এবং আধিপত্যকে স্থায়ী রূপদানের জন্য বিভিন্ন কলাকৌশল, প্রতিষ্ঠান, যেমন: অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান— সমস্ত কিছু নতুন একটি শৃঙ্খলা দ্বারা প্রতিস্থাপিত করেছে। এর আগে যা ছিল ঔপনিবেশিক শৃঙ্খলার অধীনে, তা থেকে এমন একটি নতুন শৃঙ্খলায় (New World Order) আসলো, যার অধীনে আমরা এখন পর্যন্ত রয়েছি।
আধুনিকতার বাহনসমূহ
কোন প্রক্রিয়াই কখনো আপনাআপনি বিকশিত হয় না; তার কতগুলো বাহন থাকতে হয়। আধুনিকতার বাহনগুলো কী কী? ঔপনিবেশিক আমলে এগুলো একরকম ছিল, এখন ভিন্নরকম। যেমন: একটি বাহন হলো রাজনৈতিক দলসমূহ। অন্য একটি হলো ক্যারিশম্যাটিক লিডারশিপ। এছাড়া রয়েছে আমলাতন্ত্র, বুদ্ধিজীবী শ্রেণী, থিংক ট্যাঙ্কসমূহ, গণমাধ্যমসমূহ— যার মধ্যে রয়েছে মুদ্রণযন্ত্র, বেতার, চলচ্চিত্র, আলোকচিত্র, ইন্টারনেট, টিভি, কেবল টিভি, মোবাইল, স্যাটেলাইট ইত্যাদি। গণমাধ্যমগুলোকে আবার তিনটি পর্যায়ে বিভাজিত করা যায়: সনাতন গণমাধ্যম, আধুনিক গণমাধ্যম এবং অত্যাধুনিক তথা সাম্প্রতিক গণমাধ্যম।
আধুনিকতা নিজস্ব যাত্রাপথে যে সমস্ত মাত্রা সংযোজন করেছে তথা যে সমস্ত পরিবর্তন এনেছে তাদের মধ্যে নেশন স্টেট বা জাতিরাষ্ট্রের উত্থান একটি বড় ঘটনা। এছাড়াও বাণিজ্যবাদ এবং পুঁজিবাদের উত্থান ঘটেছে; তারা উপনিবেশ স্থাপন করেছে। রেনেসাঁ এসেছে; ধর্ম সংস্কার হয়েছে, প্রতিসংস্কার হয়েছে। রিফর্মেশন হয়েছে, ফরাসি বিপ্লব ঘটেছে, প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রের উত্থান হয়েছে। আমেরিকার স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়েছে; রুশ বিপ্লব হয়েছে; ব্রিটেনে গৃহযুদ্ধ হয়েছে, ফলশ্রুতিতে সেখানে নতুন আইনি ব্যবস্থার প্রবর্তন ঘটেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান ভূমিকা সম্প্রসারিত হয়েছে; নগরায়ন হয়েছে। শিক্ষাকে ব্যাপক করা হয়েছে, গণসাক্ষরতা সৃষ্টি করা হয়েছে, জ্ঞানের মধ্যে নতুন নতুন সৃষ্টি— নব সৃষ্টি যাকে বলে— এটির প্রক্রিয়া অব্যাহত গতিতে চলেছে। উনিশ শতকে আধুনিকতার সাথে আরও কতিপয় প্রবণতা যুক্ত হয়েছে। যেমন: গণমাধ্যম ও তথ্য প্রযুক্তির বিস্তার ঘটেছে। অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পেশায়নের ঘটনা ঘটেছে। সামাজিক বিজ্ঞান এবং নৃতত্ত্বের উত্থান ঘটেছে। রোমান্টিসিজম এবং অস্তিত্ববাদের উত্থান ঘটেছে। শিল্পচর্চায় প্রকৃতিবাদী পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে। ভূতত্ত্ব, জীববিজ্ঞান, রাজনীতি এবং সামাজিক বিজ্ঞানে বিবর্তনীয় চিন্তা-ভাবনার রাজত্ব ও প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আধুনিক মনোবিজ্ঞানের সূচনা হয়েছে। ক্রমবর্ধমান হারে ধর্মের নিয়ন্ত্রণ এবং ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্নতার ঘটনা ঘটেছে। নারী মুক্তির নামে নারীবাদের উত্থান হয়েছে।
এই প্রতিটি ব্যাপার, প্রতিটি দিক— আলোচনার জন্য ব্যাপক পরিসর এবং বিশ্লেষণের দাবি রাখে। প্রতিটি দিকের ইতি-নেতি যদি আলোচনার মধ্যে না আসে, তাহলে সকল বিষয়ে ইউরোপীয় ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে এই ন্যারেটিভকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে, পাঠ্যপুস্তকে, নাটকে, উপন্যাসে, কাব্যে, শিল্প-সাহিত্যে, মিডিয়ায়— সর্বত্র একচ্ছত্রতা দেওয়া হয়েছে এবং সেটি আমাদের মন-মস্তিষ্কে— সব জায়গায় আধিপত্য দাবি করছে। এর ভিত্তিতে আমাদের মস্তককে সব সময় ইউরোপের প্রতি নত হতে বলছে। পশ্চিমের প্রতি তাসলিম করতে বাধ্য করছে, অনুপ্রাণিত করছে এবং আমাদের সর্বসত্তাকে তার অনুকূলে নিয়ে যাচ্ছে। আধুনিক সকল তত্ত্বের পেছনে যে ন্যারেটিভ তৈরি করা হয়েছে, সেটি সবকিছুকে শুধুমাত্র ইউরোপীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করে। এসবের বিপরীতে যে নেতিবাচক-সর্বনাশা দিকগুলো রয়েছে, যে বিপজ্জনক স্তরগুলো রয়েছে, যে গর্তসমূহ রয়েছে, যে জখম এবং রক্তক্ষরণগুলো রয়েছে— এগুলোকে যদি চিহ্নিত না করা হয়, কিংবা সামনে না আনা হয়— তাহলে পশ্চিমা সভ্যতার একচ্ছত্রতা বা ‘হেজেমনি’ কায়েম হয়। এই হেজেমনির মাধ্যমে কখনোই আমাদের মুক্তির পথ প্রশস্ত হবে না। ফলে, আমরা নিজেদের উদ্দেশ্য ও গন্তব্যের পথে যথাযথ এবং সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপগুলো নিতে পারব না।
পশ্চিমা আধিপত্য
এটি সত্য এবং যেকোন ইনসাফপূর্ণ বিশ্লেষক বা গবেষকই এই সত্য স্বীকার করবেন যে, আধুনিকতার দ্বারা পুরো পৃথিবী ও পৃথিবীর মানুষ নানা মাত্রায় উপকৃত হয়েছে। এটি জীবনযাপনকে সহজ করে দিয়েছে। চিকিৎসাশাস্ত্রে অভূতপূর্ব উন্নতি নিয়ে এসেছে। আধুনিক সভ্যতার কণ্ঠে সাম্য, স্বাধীনতা, মানবতা, মর্যাদার কথা অনেক বেশি উচ্চারিত হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে— অনর্গল, অনবরত, সর্বত্র। এর মাধ্যমে দাসপ্রথার বিলুপ্তি ঘটেছে। কৃষিক্ষেত্রে উন্নতি হয়েছে— সেচব্যবস্থা, পাওয়ার টিলার প্রভৃতি যন্ত্র আবিষ্কার হয়েছে, যার ফলশ্রুতিতে ফলনের মাত্রা বেড়েছে বহুগুণে (অতীতের তুলনায় প্রায় দশ গুণ)। বিদ্যুত আবিষ্কারের ফলে জীবনযাত্রা ভিন্ন একটি রূপ, আয়তন ও অবয়ব লাভ করেছে। রেডিও, টেলিভিশন, টেলিফোন, ফ্যাক্স এসেছে; প্লেন-উড়োজাহাজ ইত্যাদি আবিষ্কার হয়েছে। ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থায় এসেছে বিস্ময়কর পরিবর্তন। মানুষে-মানুষে পারস্পরিক অবগতি ও জানাশোনায় উন্নতি এসেছে। পৃথিবীর এক প্রান্তের সাথে আরেক প্রান্তের সংযোগ, যোগাযোগ— সমস্ত কিছু এত দ্রুততর, এত ঘনিষ্ঠ, এত কাছাকাছি হয়েছে যে, পৃথিবীকে বলা হচ্ছে গ্লোবাল ভিলেজ তথা বিশ্বগ্রাম। নতুন নতুন আবিষ্কার, তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে পৃথিবীকে, নিসর্গকে, মহাবিশ্বকে জানার এমন একটি স্তরে মানুষ উপনীত হয়েছে, যেটি আগে চিন্তাও করা যেত না।
কিন্তু সামগ্রিকভাবে আধুনিকতাকে বিশ্লেষণ করার ক্ষেত্রে কোনোভাবেই যুক্তিবাদ এবং সেকুলারিজমকে বাদ দেয়া যায় না। আধুনিকতা এক ধরনের রাজনৈতিক অবস্থা। যাকে আধুনিকতা বলা হচ্ছে— এই অবস্থাটা আমাদেরকে কী দেয়? আমাদের থেকে কী নেয়? কী বিয়োজন করে আর কীই বা সংযোজন করে?– এই ব্যাপারগুলো, এই মাত্রাগুলো, এই ধরণ এবং ধারণগুলো যদি আমরা না বোঝার চেষ্টা করি, তাহলে এই অবস্থাটি আমাদের জন্য কতটুকু আশীর্বাদ আর কতটুকু অভিশাপ— তা আমরা উপলব্ধি করতে পারব না— উপলব্ধি করা সম্ভব হবে না। আধুনিকতার প্রসঙ্গ উঠতেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কথা বলা হয়, জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তির ব্যবহারের কথা বলা হয়— আধুনিকতার মানদণ্ড ও মাপকাঠি হিসেবে এগুলোকে প্রস্তাবনা করা হয়। অথচ, আধুনিকতা বলতে কিন্তু সামাজিক পরিবর্তনের একটি নির্দিষ্ট ধারা এবং ধরণকেও বোঝায়। বলা হয়, আধুনিক হতে হলে কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য, যাকে বলে “উন্নত সমাজের বৈশিষ্ট্য” থাকতে হবে। যেমন: মুক্ত সমাজ (Free Society), বহুত্ববাদ (Pluralism), ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য (Individualism) ইত্যাদি। তবে, এসবের বাইরেও আধুনিকতাকে ভিন্নভাবে দেখার সুযোগ রয়েছে।
আধুনিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা হল সমাজতত্ত্ব। এটি আধুনিকতাকে বোঝার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিকতা বিভিন্ন বিষয়কে সংঘবদ্ধ, একত্রিত কিংবা সংযুক্ত করে। প্রথমত, এটি কিছু নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গিকে সকল মানুষের কাছে পৌঁছে দেয় এবং সেগুলো সকলের জন্য প্রযোজ্য হিসেবে দাবি করে। এরপর সেগুলোর প্রয়োগ বা কার্যকারিতাকেই আধুনিক হয়ে ওঠার উপায়, সিঁড়ি, মানদণ্ড কিংবা মাত্রা হিসেবে প্রস্তাবনা করে, দাবি করে এবং চাপিয়ে দেয়। দ্বিতীয়ত, একটি জটিল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এর পেছনে কাজ করে। বিশেষ করে শিল্পজাত দ্রব্য, বাজার অর্থনীতি— এগুলো মাধ্যমে সেই অর্থনীতির বিশ্বায়ন ঘটায় এবং সবসময় অর্থনীতির উপর নিজের একচ্ছত্রতা বা মনোপলি প্রতিষ্ঠিত রাখে। এসবের পেছনের তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক উপাদানসমূহকে আধুনিকতা নিজের হাতে রাখে এবং নিজেকে বিশ্বের একচ্ছত্র ও একমাত্র বাস্তবতা হিসেবে দাবি করে।
আরেকটি ব্যাপার হলো— রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। আধুনিকতা যখন কোথাও প্রতিষ্ঠিত হবার চেষ্টা করে তখন সে একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের আকারে হাজির হয়। এটির উপর ভর করে সে পরিবর্তনের বিভিন্ন ধারাকে সংযোজন করে। যেমন: আধুনিকতা অনুযায়ী অবশ্যই জাতিরাষ্ট্রের ধারণা থাকতে হবে। মজার বিষয় হল, জাতিরাষ্ট্রের ধারণা যখন আসে, তখন এর সাথে ইউরোপীয় একগুচ্ছ প্রবণতা এসে সংযুক্ত হয়। উদাহরণস্বরূপ, সেখানে গণতন্ত্র থাকতে হয়। সেখানকার রাজনীতি সকল বৈশিষ্ট্য, সকল প্রকৃতি, সকল প্রবণতা, সকল শ্রেণী-চেতনা, সকল মেজাজ, সকল লক্ষ্যমাত্রা— সবকিছু দিয়ে ইউরোপ তথা পশ্চিমের অনুগামী হওয়ার চেষ্টা করতে হয়। তার কেন্দ্র সবসময় থাকে ইউরোপ। অর্থাৎ, সে ইউরোসেন্ট্রিক পলিটিক্সের অংশ। শিল্প-সাহিত্য, কাব্য, নন্দনচর্চা কিংবা দর্শনচর্চা— সর্বত্র একই ঘটনা ঘটে; তবে তা ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায়, ভিন্ন ভিন্ন আকারে। প্রত্যেকটির পেছনেই রয়েছে আলাদা আলাদা ন্যারেটিভ, আলাদা আলাদা প্রতিষ্ঠান, আলাদা আলাদা সূত্র, আলাদা আলাদা বিনিয়োগ, আলাদা আলাদা উদ্দীপনা এবং আলাদা আলাদা যুক্তি-পদ্ধতি।
আধুনিকতার পুনর্পাঠ
আধুনিকতা এক ধরনের অভিজ্ঞতা। আধুনিক হওয়া মানে এমন এক বিশেষ পরিবেশে, বিশেষ প্রেক্ষাপটে, বিশেষ বাস্তবতায় নিজেকে আবিষ্কার করা—যেখানে অনেকগুলো বিষয় রয়েছে, রয়েছে অনেকগুলো অঙ্গীকার। যেমন: অভিযাত্রার বিষয়, ক্ষমতার বিষয়, আনন্দের বিষয়, উত্থানের বিষয়, অন্তর্জগতের বিষয়, বহির্জগতের বিষয়, পরিবর্তনের বিষয়। এর সাথে রয়েছে নানা প্রকার অর্জন, সাফল্য ও প্রগতি। আরও রয়েছে নানা ধরনের বিনাশ—বিনাশের বার্তা, বিনাশের প্রণোদনা, বিনাশের উত্তেজনা। আধুনিকতা কাকে বিকশিত করে এবং কার বিনাশ নিশ্চিত করে? সে কাকে সৃষ্টি করে এবং কাকে ধ্বংস করে? সে কোন কোন জিনিসকে আমন্ত্রণ করে এবং কার কার জন্য দরজা বন্ধ করে দেয়? এই বিষয়গুলোকে যদি ইনসাফের জায়গা থেকে বিশ্লেষণ না করা হয়, তাহলে আসলেই আধুনিকতা কী এবং আমাদের জন্য এটি কেমন—এই বিষয়ে সুনিশ্চিত ও সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে আমরা উপনীত হতে পারব না। এটি সবসময় আমাদের জন্য ক্ষতি নিয়ে আসে—বিষয়টা তা নয়। আবার সর্বক্ষেত্রে এটি আমাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে হাজির হয়—তাও নয়।
আমাদের নিজস্বতা দিয়ে, প্রয়োগশীলতা দিয়ে এবং আমাদের প্রতি কল্যাণকারিতার দিক থেকে আধুনিকতাকে বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে। এটিকে আমাদের যাচাই করতে হবে, মাপতে হবে এবং ওজন করতে হবে। এই ওজনের তুলাদণ্ডটা আমাদের হাতেই রয়েছে। আর সেটি হলো ইসলামের জীবনবাদিতা। আধুনিকতার যতগুলো উপকরণ রয়েছে—তার সমস্তই আমরা ইসলামের মধ্যে দেখব, তবে ভিন্নভাবে। সেটি এসেছে ইসলামের মূলীভূত জীবনদর্শন থেকে। আর বর্তমান আধুনিকতার সমস্ত উপকরণ বের হয়েছে পশ্চিমা তথা ইউরোপীয় মূলীভূত জীবনদর্শন থেকে।
প্রগতি
আধুনিকতা একটি অব্যাহত অস্থিরতা, অনাস্থা। এটি কোনো কিছুর প্রতি আস্থাশীল থাকতে পারে না। আমরা যখন রেনেসাঁর কথা বলি, যা আজ থেকে কয়েক শতাব্দী পূর্বের ঘটনা—আধুনিকতা সেই সময়কে অতিক্রম করতে চায়। এটি তার প্রবণতারই অংশ। সপ্তদশ শতকের মধ্যবর্তী সময়ে এটির সূচনা; এটি সেই সময়ের পূর্ববর্তী সময়কে অনাধুনিক এবং অতিক্রমযোগ্য সময় মনে করে, পেছনে ফেলে আসা ‘সেকেলে সময়’ মনে করে। যেমন: ২০২৩ সালে ২০১৯ সালের প্রবণতাকে সেকেলে মনে করা হয়। তাহলে প্রশ্ন আসে—মানবজাতি কীভাবে সমৃদ্ধ হয়? কীভাবে অভিজ্ঞ হয় বা অভিজ্ঞতা অর্জন করে? কীভাবে বিকশিত হয়? মূলত পূর্ববর্তী ঐতিহ্য, পূর্ববর্তী অর্জন এবং বিসর্জন—সমস্ত কিছুর সমন্বয়ে কোনো কিছুর ‘আজ’ তৈরি হয় এবং আগামীকালের পথ প্রশস্ত হয়। ‘আধুনিকতা’ পূর্ববর্তী সমস্ত কিছুর প্রতি এক ধরনের অব্যাহত অনাস্থা। ৫০ বছর আগে যা আধুনিক ছিল, আজ সেটি অনাধুনিক। আজ যা আধুনিক, ১০ কিংবা ২০ বছর পরে তা অনাধুনিক। এটি মানবচিন্তার জন্য, মানবজ্ঞানের জন্য কোনো আদর্শ পরিস্থিতি হতে পারে না।
রেনেসাঁর সময় বলা হয়েছিল—রেনেসাঁর চিন্তা, উপাত্ত, উপাদান, প্রেরণা এবং প্রবণতাগুলোই আধুনিকতার সর্বোচ্চ মানদণ্ড। ফরাসি বিপ্লব যখন এসেছিল, তখন বলা হয়েছিল—ফরাসি বিপ্লবের শিল্প, সাহিত্য, চিন্তা, দর্শন, উপাদান, দাবি এবং চরিত্রগুলোই আধুনিকতার সর্বোচ্চ মানদণ্ড! উনিশ শতকের শেষ দিকে (১৮৯০ থেকে নিয়ে ১৯৪০) ফ্রান্স ছিল আধুনিকতার কেন্দ্রে। তখন ফ্রান্সের মধ্যে যা হচ্ছিল, ফ্রান্সের মধ্য থেকে যা যা বিকশিত হচ্ছিল, বিস্তৃত হচ্ছিল এবং ছড়িয়ে পড়ছিল—সেগুলোই ছিল আধুনিকতার আদর্শ! ১৮৯০ থেকে ১৯২০ সালে জার্মানিতে যা যা হয়েছিল, সেখান থেকে যা যা এসেছিল, যা যা দাবি করা হয়েছিল, যেমন করে নিজেকে সাজাতে বলা হয়েছিল, যেমন করে ভাবতে বলা হয়েছিল, যেমন করে জীবনকে সজ্জিত করতে বলা হয়েছিল—সেটিই ছিল তখনকার সর্বোচ্চ আধুনিকতা! ১৯০১-০২ থেকে ১৯২০ পর্যন্ত রাশিয়া যে চিন্তা দিয়েছিল, যে বিপ্লব এবং বার্তা দিয়েছিল, ইতিহাসকে যেভাবে নির্ধারণ করেছিল, অর্থনীতি সম্পর্কে যা বলেছিল—তখন সেটিই ছিল আধুনিকতার সর্বোচ্চ! প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কিছু সময় আগ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তারপর থেকে এখন পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সমন্বিত অবস্থা—এক্ষেত্রেও আমরা এমনটাই দেখতে পাই।
এই বিকাশের ধারায় আজকের চিন্তা প্রত্যেক গতকালকে অস্বীকার করছে এবং অস্বীকার করাটাকেও অস্বীকার করছে। সরাসরি এটি বলছে না যে, অতীতকে আমি অস্বীকার করি; কিন্তু একটি অস্বীকৃতি তার ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে, সংশয় চাপিয়ে দিচ্ছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই আধুনিকতা এটি নানাভাবে করছে, করে চলেছে। এটি নিত্যনবায়িত হতে চায়; প্রত্যহ প্রগতির দিকে যাত্রা করতে চায়। কী সেই প্রগতি? কী সেই প্রগতির সর্বোচ্চ মানদণ্ড? কী সেই প্রগতির আদর্শরূপ? কী সেই প্রগতির আদর্শ গন্তব্য?—অস্পষ্ট, অনিশ্চিত, অনির্ধারিত। মানুষকে অব্যাহতভাবে সেটি পরিক্রমণ (চক্রমন-এর বদলে) করতে হবে। গতকাল সে যা ছিল, আজ সে নতুন কিছু হবে—কিন্তু, কী হবে? সেটির কোনো সুনির্দিষ্ট, সুনিশ্চিত এবং সুগঠিত রূপরেখা তার সামনে উপস্থিত নেই।
হেগেলের সাব্জেক্টিভিটি
আমাদের সামনে আধুনিকতার যেসব বিষয় তুলে ধরা হয়—যেমন শহর গড়ে তোলা, শিল্পের উন্নয়ন বা সবার জন্য শিক্ষা—বলা হয় যে, এগুলোই আধুনিকতা এনেছে। কিন্তু আসলে এগুলোই আধুনিকতা নয়। দার্শনিক হেগেল মানুষের কাজকে ‘সাবজেক্টিভিটি’ বলেছেন, যা পরে হেবারমাস বিশ্লেষণ করেছেন। হেবারমাসের মতে, হেগেলের এই চিন্তার চারটি রূপ আছে, যার একটি হলো ব্যক্তির নিজের ইচ্ছা। আধুনিকতা মানুষের মনে সব সময় সীমাহীন স্বাধীনতা আর সমাজে বড় হওয়ার ইচ্ছা জাগিয়ে রাখে। এটি সবকিছু নিয়ে প্রশ্ন তোলার বা সমালোচনা করার অধিকার চায়।
সমালোচনা করা ভালো, কিন্তু তার মতে, সমালোচনার বাইরে কিছু নেই। প্রশ্ন হলো, এই সমালোচনার সীমা কোথায়? আমার কথা যতক্ষণ অন্যের বিশ্বাসে আঘাত না করে, ততক্ষণ তা আমার অধিকার হতে পারে। কিন্তু সেই সমালোচনা কি অন্যের জীবন, বিশ্বাস ও মূল্যবোধকে কষ্ট দেবে, তাদের অস্তিত্বকে বিপদে ফেলবে? আধুনিকতার কাছে এর কোনো সঠিক উত্তর নেই।
এরপর আসে নিজের ইচ্ছামতো কাজ করার বিষয়টি। আধুনিকতা বলে, আমরা যা চাই তা করার স্বাধীনতা আমাদের আছে এবং আমাদের কাজের জন্য আমরাই দায়ী থাকব। এখন প্রশ্ন হলো—আমরা কী করব আর কী করব না? ধর্মগুলো—যেমন ইসলাম, খ্রিষ্টধর্ম, বৌদ্ধ বা হিন্দুধর্ম—এসবের সীমা ঠিক করে দিয়েছে। তারা আমাদের ভালো-মন্দ ও পাপ-পুণ্যের ধারণা দেয়।
আধুনিকতা আমাদের সব ধর্মের পুরনো ঐতিহ্য থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। যদি আপনি রাষ্ট্রের নিয়ম ভাঙেন, তবেই আপনি অপরাধী; কিন্তু আপনি যদি কোনো পাপ করেন, সেটি আপনার ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখা হয়। আধুনিকতা এগুলোকে যার যার বিশ্বাস হিসেবে ছেড়ে দেয়। কিন্তু আসল সমস্যা হলো অপরাধের সংজ্ঞা নিয়ে। যে কাজগুলো মানুষ চিরকাল অপরাধ হিসেবে দেখেছে, আধুনিকতা আইনের মাধ্যমে সেগুলোকেই অধিকার বলে দাবি করছে।
যেমন, সমকামিতাকে কোনো যুগের কোনো সভ্যতাই ভালো চোখে দেখেনি। কিন্তু এখন একে অনেক বড় করে দেখা হচ্ছে এবং অনেক দেশে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে। যারা এটি মেনে নিচ্ছে, তাদের আধুনিক ও উন্নত বলা হচ্ছে। আধুনিকতা সমকামিতার মতো কাজকে অধিকারে পরিণত করেছে। আমরা কোনটিকে অপরাধ বলব আর কোনটিকে অধিকার বলব, তার কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। সবকিছুই এখন মানুষের বারবার বদলে যাওয়া ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। আধুনিকতা মানুষকে তার খেয়ালখুশির গোলাম বানিয়ে ফেলেছে। মানুষের এই কুপ্রবৃত্তির জয় হওয়াকেই আধুনিকতার চোখে ‘উন্নতি’ বলা হচ্ছে।
আধুনিকতা আমাদের ধর্মীয় অনুভূতি বা ভালো কাজের ইচ্ছাকে সম্মান করার দায়িত্ব নেয় না। বরং আধুনিক চিন্তাধারা ও জীবনযাপন আমাদের বিশ্বাস ও পুরনো ভালো মূল্যবোধগুলোকে সব সময় ছোট করে দেখছে এবং আঘাত করছে।
আধুনিকতার একটি বড় দিক হলো নিজের ভালো নিজে বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা। এটি বলে যে, প্রত্যেকেই নিজের মঙ্গল নিজে ঠিক করবে। কিন্তু মানুষ কীভাবে তা করবে? কারণ, পরিবারের শিক্ষা বা ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা তো আগেই নষ্ট করা হয়েছে। এখন মানুষ নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী ভালো-মন্দের বিচার করতে চায়। এর ওপর ভিত্তি করে সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতো চিন্তাবিদরা অনেক তত্ত্ব তৈরি করেছেন। তিনি মানুষের মনের গোপন ইচ্ছাকেই সবচেয়ে বড় সত্য হিসেবে দেখিয়েছেন। তিনি মনে করেন, মানুষ নিজের খেয়ালখুশির মাধ্যমেই নিজেকে অনুভব করে এবং নিজের জীবনের লক্ষ্য ঠিক করে।
গ্রীক ও রোমান ভিত্তি
আধুনিকতার জন্ম পশ্চিমে হলেও এটি এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্বজুড়ে এর ব্যাপক প্রভাব ও প্রসার দেখা যায়। তবে আধুনিকতার মূল নিয়ন্ত্রণ এখনো পশ্চিমের হাতেই রয়েছে। এটি পশ্চিমা দেশগুলোর আধিপত্যকে আরও শক্তিশালী ও স্থায়ী করে তুলছে।
আধুনিকতাবাদ কেবল অর্থনীতি বা রাজনীতির বিষয় নয়। এটি আসলে এক ধরণের মানসিকতা বা দৃষ্টিভঙ্গি। এই চিন্তাধারার কিছু বিশেষ দিক আছে। যেমন আগে বলা হয়েছে যে, আধুনিকতা সব সময় নতুন কিছু চায়। যা কিছু পুরনো বা সেকেলে তাকে এটি বর্জন করে। আধুনিকমনা মানুষরা পুরনো প্রথাকে তুচ্ছ করে এবং সব সময় প্রগতিশীল হতে চায়। মজার ব্যাপার হলো, ইউরোপীয়রা তাদের পুরনো গ্রিক ও রোমান ঐতিহ্যকে খুব সম্মান করে। তারা মনে করে গ্রিক ও রোমান সভ্যতাই পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ।
আমাদের দেশের একজন পরিচিত ব্যক্তিত্ব আব্দুল্লাহ আবু সাঈদ একবার বলেছিলেন যে, সব সভ্যতার মধ্যে গ্রিক সভ্যতাই সেরা। তিনি কেন এমন কথা বললেন? গ্রিকরা কি দাসদের সাথে ভালো ব্যবহার করত? তারা কি নারীদের মর্যাদা দিত? সেখানে নারীরা সমাজের অর্ধেক হওয়া সত্ত্বেও কি সঠিক অধিকার পেত? এসব দিক বিচার করলে তাদের শ্রেষ্ঠ বলা কঠিন। আসলে তার সামনে একটি তৈরিকৃত বয়ান ছিল। এই বয়ান এসেছে সেই শিক্ষা ও ইতিহাস থেকে যা ইউরোপীয়দের শ্রেষ্ঠ করে দেখানোর জন্য লেখা হয়েছে। এটি সারা বিশ্বে প্রচার করা হয়েছে এবং আমাদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে।
পশ্চিমারা সব সময় নিজেদের ইতিহাসকে সেরা প্রমাণ করতে চেয়েছে। তারা গ্রিক ও রোমানদের সব কাজকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরে। তাদের মতে তাদের পুরনো ঐতিহ্য শ্রেষ্ঠ কিন্তু আমাদের অতীত হলো সেকেলে বা অসভ্য। আমাদের ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করাকে তারা পশ্চাদপদতা মনে করে। পশ্চিমা জগতের নৈতিকতা মূলত গ্রিকদের থেকেই এসেছে। গ্রিকরা মনে করত ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতা কেবল তাদেরই প্রাপ্য। অর্থাৎ নিজেদের জন্য এক নিয়ম আর অন্যদের জন্য আলাদা নিয়ম। আধুনিক ইউরোপীয়রাও অনেকটা তেমনই ভাবে। তারা নিজেদের জন্য বাকি বিশ্বের জন্য এবং বিশেষ করে মুসলমানদের জন্য আলাদা আলাদা নীতি মেনে চলে।
সম্পাদনা: এহসান সিফাত, মো: জামিল-উল-আকসাদ শোভন




Comments