ইতিহাসপ্রাচ্যবাদ

বাংলাদেশে খ্রিষ্টীয় মিশনারি: গোড়া ও ডালপালা

Share
Share
ইতিহাসApril 30, 2026

বাংলাদেশে খ্রিষ্টীয় মিশনারি: গোড়া ও ডালপালা

পৃথিবীতে যত ধর্ম আছে, সেগুলো প্রচারের দিক থেকে দুই রকম। যথা:

১) যে ধর্ম সুনির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর বাইরে প্রচার করা যায়;

২) যে ধর্ম সুনির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর বাইরে প্রচার করা যায় না। 

খ্রিস্টধর্ম আসলে কোন প্রকারের মধ্যে পড়ে, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। কেউ বলেন খ্রিস্টধর্ম প্রথম প্রকারের—অর্থাৎ এটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর বাইরে প্রচারযোগ্য। আবার অনেকের মতে, এই ধর্ম দ্বিতীয় প্রকারের—যা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর বাইরে প্রচারযোগ্য নয়। এই বিতর্কের উৎস কী? 

এই বিতর্কের জন্ম মূলত খ্রিস্টধর্মের উৎস থেকেই। বাইবেলে প্রচারের পক্ষে ও বিপক্ষে—উভয় ধরনের বর্ণনাই পাওয়া যায়। প্রচারের বিপক্ষের কিছু বর্ণনা হলো:  

১) মথির সুসমাচারে বর্ণিত আছে: যিশু খ্রিস্ট তাঁর বারোজন সঙ্গীকে ধর্মপ্রচারের দায়িত্ব দিলেন এবং তাঁদের আদেশ করলেন, “তোমরা ধর্ম প্রচার করো; তবে জেন্টাইল (অইহুদি)-দের পথে যেয়ো না এবং শমরীয় (ইয়াকুব আলাইহিস সালামের বংশধর, তবে অইহুদি)-দের নগরে প্রবেশ কোরো না।” জেন্টাইল মূলত তারা, যারা অইহুদি। ইহুদিরা অইহুদিদের নিকৃষ্ট ও দ্বিতীয়-তৃতীয় শ্রেণির মানুষ মনে করত; তারা অন্যদের অধম এবং নিজেদের উত্তম ভাবত।

ইহুদিদের মধ্যে সব কালেই এই বিষয়টি বিদ্যমান ছিল। তারা নিজেদের ‘নির্বাচিত জাতি’ (Chosen People) মনে করত। কুরআনে বর্ণিত আছে: “আর ইহুদিরা বলে, ‘উযাইর আল্লাহর পুত্র’ এবং নাসারারা বলে, ‘মসীহ আল্লাহর পুত্র’।” [আল-কুরআন, ৯:৩০] ইহুদিরা এ কথাও দাবি করত: “…আমরা আল্লাহর সন্তান এবং তাঁর অধিক প্রিয়।” [আল-কুরআন, ৫:১৮]

২) মথির সুসমাচারে দেখা যায়, যিশু খ্রিস্ট বলছেন: “তোমরা তোমাদের পবিত্র বস্তু কুকুরদের দিয়ো না এবং তোমাদের মণি-মুক্তা শূকরের সামনে ফেলো না; কারণ শূকর তা মাড়িয়ে নষ্ট করে ফেলবে এবং পরে তোমাদের আক্রমণ করবে।” এখানে ‘পবিত্র বস্তু’ ও ‘মণি-মুক্তা’ দ্বারা বাইবেলের শিক্ষা এবং ‘কুকুর’ ও ‘শূকর’ দ্বারা অইহুদি জনগোষ্ঠীকে বোঝানো হয়েছে। 

৩) মথির সুসমাচারে আরও বর্ণিত আছে: কেনানের অধিবাসী একজন নারী যিশুর সমীপে এসে কান্নাকাটি করে বলছিলেন, “আমার মেয়ের ওপর অশুভ আত্মার প্রভাব পড়েছে, তার জীবন বিপন্ন।” সাধারণত যেকোনো অসুস্থ ব্যক্তি যিশুর কাছে এলে তিনি স্পর্শের মাধ্যমে তাকে সুস্থ করে দিতেন; এটি ছিল তাঁর স্রষ্টাপ্রদত্ত বিশেষ ক্ষমতা। কিন্তু যিশু খ্রিস্ট সেই নারীর দিকে তাকাচ্ছিলেন না, তাঁর কথাও শুনছিলেন না। যিশুর অনুসারীগণ অনুরোধ করলেন, “এই নারী অনবরত কান্নাকাটি ও চিৎকার করছে; আপনি দয়া করে তার দিকে দৃষ্টি দিন।” তখন যিশু খ্রিস্ট বললেন, “বনু ইসরাইলের হারানো মেষপাল ছাড়া আমি আর কারও প্রতি প্রেরিত হইনি। তাদের রেখে অন্য কারও প্রতি মনোযোগী হওয়ার অর্থ হলো নিজের সন্তানের খাবার কুকুরের পাত্রে রেখে দেওয়া।”

বাইবেলের এসব বর্ণনা থেকে প্রমাণিত হয় যে, খ্রিস্টধর্ম বনু ইসরাইল ছাড়া অন্য কোনো মানবগোষ্ঠীর কাছে প্রচারের জন্য নয়; বরং এটি একটি গোত্রভিত্তিক ধর্ম, যা কেবল ইসরাইল গোত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

আবার, প্রচারের পক্ষের বর্ণনা হলো: মার্কের সুসমাচারে বর্ণিত আছে যে, কবর থেকে পুনরুত্থানের পর যিশু বললেন, “তোমরা গোটা জগতে ছড়িয়ে পড়ো এবং সমস্ত সৃষ্টিজগতের সামনে সুসমাচার ও আমার সত্যবাণী প্রচার করো।” বাইবেলের বর্ণনানুযায়ী, তিনি এই কথা পুনরুত্থানের পরে বলেছিলেন।

এই ঘটনার ওপর ভিত্তি করে সেন্ট পল এবং সেন্ট পিটার জোরালো দাবি তুললেন যে, খ্রিস্টধর্মের স্থায়িত্বের জন্য বনু ইসরাইলের বাইরে অন্যান্য জনগোষ্ঠীর কাছে এই ধর্ম প্রচার করতে হবে। সে সময় খ্রিস্টধর্ম মূলত ইহুদি এবং রোমান শাসকদের পক্ষ থেকে আসা হুমকির মুখে ছিল। সেন্ট পল ও সেন্ট পিটার—এই দুজন সচেতনভাবে চেষ্টা করছিলেন খ্রিস্টধর্মকে বনু ইসরাইলের গণ্ডি থেকে বের করে আনতে। তখন সেন্ট পিটার দাবি করলেন যে, যিশু খ্রিস্ট তাঁকে স্বপ্নযোগে দৈববাণী দিয়েছেন: “আমার বাণী নিয়ে ছড়িয়ে পড়ো।”

এরপর বিষয়টি নিয়ে খ্রিস্টানদের মধ্যে বহু বিতর্ক হয়। ‘আদৌ খ্রিস্টধর্ম বনু ইসরাইলের বাইরে প্রচার করা যাবে কি না’—এই নিয়ে তাঁদের ধর্মসভা হলো। সেখানেও সেন্ট পিটার কখনও বলেননি যে, যিশু খ্রিস্ট জীবিত অবস্থায় তাঁকে এমন আদেশ দিয়েছেন। এর অর্থ দাঁড়ায়, খ্রিস্টধর্ম প্রচারের বিষয়টি যিশু খ্রিস্টের (জীবিত অবস্থার) পক্ষ থেকে আসেনি।

পরবর্তীকালে এই নতুন পদ্ধতি, অর্থাৎ প্রচারের মাধ্যমে ধর্ম বিস্তারের প্রক্রিয়াটি ছড়িয়ে পড়তে থাকে। তখনও খ্রিস্টানদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই বিস্তারের বিপক্ষে ছিল এবং কয়েক শতাব্দী ধরে এই বিতর্ক চলমান ছিল। শেষ পর্যন্ত যারা প্রচারণায় বিশ্বাসী ছিল তারাই জয়ী হলো এবং বনু ইসরাইলের বাইরের সম্রাট কনস্টানটাইন খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে এর প্রধান অভিভাবক হয়ে উঠলেন।

খ্রিস্টীয় সভ্যতা এবং পুরো মানবজাতির ইতিহাসে ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সালেই স্পেনে মুসলমানদের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটেছে; অপরদিকে ক্রিস্টোফার কলম্বাস আমেরিকায় উপনীত হয়েছেন, যার মাধ্যমে নতুন দুটি মহাদেশ খ্রিস্টীয় সভ্যতার অধীনে আসার পথ উন্মোচিত হয়েছে। একই সাথে ইউরোপে নৌ-বিপ্লবের নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। কলম্বাসের ব্যক্তিগত সহকারী ড. চ্যাঙ্কা সরাসরি লিখেছেন যে, রানি ইসাবেলা এবং রাজা ফার্দিনান্দের কাছে কলম্বাস একটি চিঠি লিখেছিলেন। সেখানে তিনি বলেন, “এই অভিযান ‘সারাসেন’-দের বিরুদ্ধে।” ‘সারাসেন’ মানে ‘শয়তানের বাহিনী’, যা দ্বারা তারা মুসলিমদের বোঝাত। এই অভিযানের মধ্য দিয়ে তিনি বাইতুল মুকাদ্দাস তথা জেরুজালেম দখল করতে চেয়েছিলেন। অর্থাৎ, আগের ক্রুসেডগুলো হয়েছিল স্থলপথে; তখন সর্বশক্তি ব্যয় করেও তারা জয়ী হতে পারেনি। তাই তারা ভেবেছিল, নৌপথে ভিন্ন রাস্তা ধরে যদি প্রাচ্যের অঞ্চলে বা ফিলিস্তিনে পৌঁছানো যায়, তবে সম্ভবত সাফল্য আসবে।

এই নৌ-অভিযানগুলোর মধ্য দিয়ে স্পেন এবং পর্তুগাল কেবল ক্রুসেডীয় আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করতে চাইছিল তা নয়, বরং তারা বাণিজ্যিক বিস্তারও চাচ্ছিল। তখন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে মানুষ স্বর্ণের সন্ধানে অভিযান করত। ফলে স্পেন এবং পর্তুগালের মধ্যেও আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্ব তৈরি হলো। এই দ্বন্দ্ব নিরসনে ভূমিকা রাখলেন পোপ আলেকজান্ডার (ষষ্ঠ)।

পোপ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে (১৪৯২-১৫০৩) তিনি যেসব গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হলো ‘টর্ডসিলাস চুক্তি’ (The Treaty of Tordesillas)। এই চুক্তি স্পেন এবং পর্তুগালের মধ্যে হয়, যার মাধ্যমে তিনি ইউরোপের বাইরে গোটা পৃথিবীকে এই দুই দেশের মধ্যে ভাগ করে দেন। পশ্চিম ভাগ দেওয়া হয় স্পেনকে আর পূর্ব ভাগ দেওয়া হয় পর্তুগালকে। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ দখল ও শাসন করবে স্পেন; আর আফ্রিকা, ভারতবর্ষ, ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপসমূহ ও মালাক্কা দ্বীপসমূহ শাসন করবে পর্তুগাল। সেই অঞ্চলসমূহের মানুষ, সভ্যতা, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও সম্পদ—সবকিছুর ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, অত্যাচার-নিপীড়ন এবং শোষণের কাঁচামাল হিসেবে এসব মানুষকে ব্যবহার করা তাদের জন্য বৈধ করা হলো। শর্ত ছিল একটাই: সেই এলাকার ‘অসভ্য’ মানুষদের খ্রিস্টধর্মের শিক্ষা দিতে হবে। এভাবেই ঔপনিবেশিকতার চাবি স্প্যানিশ এবং পর্তুগিজদের হাতে চলে এল।

ফলস্বরূপ আমরা দেখি, পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দা গামা ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দের ২০ মে কালিকট বন্দরে উপনীত হয়ে কী নির্মম গণহত্যা ও নিষ্ঠুরতা চালিয়েছেন! অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়র ‘ফিরিঙ্গি বণিক’ বইয়ে এর বর্ণনা আছে। তৎকালীন ল্যাটিন, পর্তুগিজ ও আরবি গ্রন্থাবলীতেও এর বিবরণী পাওয়া যায়। তাদের কাছে সব নিষ্ঠুরতাই বৈধ ছিল, কারণ তারা একটি ‘পবিত্র’ অভিযানে বেরিয়েছিল। সেই সময় সাধারণ ইউরোপীয়রা সমুদ্রে বের হতে ভয় পাচ্ছিল। তাই খুনের দায়ে কারাবন্দী বা চিহ্নিত দাগি আসামি—যারা জীবনের আশা হারিয়ে ফেলেছে, এমন মানুষদের জাহাজে করে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। এরপর থেকে ভারতের উদ্দেশ্যে ডেনিশ, ফরাসি, ব্রিটিশ ও ওলন্দাজরা অব্যাহতভাবে আসতে থাকে। শুধু ভারত নয়, বরং ইন্দোনেশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া—পৃথিবীর চতুর্দিকে তারা ছড়িয়ে পড়ে।

সকল ঐতিহাসিক স্বীকার করবেন যে, এই বিস্তারের অন্যতম লক্ষ্য ছিল খ্রিস্টধর্মের প্রচার। আমরা দেখি, ভারতে খ্রিস্টধর্মের প্রধান ধারাগুলো একের পর এক আসতে থাকে। একটি বর্ণনা প্রচলিত আছে যে, সেন্ট থমাস প্রথম খ্রিস্টধর্ম প্রচারক হিসেবে ৫০ খ্রিস্টাব্দে ভারতে এসেছিলেন এবং ৫৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মালাবার উপকূলে ধর্ম প্রচার করেছেন; যদিও এর কোনো সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই।

ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী খ্রিস্টধর্ম প্রচারের ধারাবাহিকতায় দেখা যায়, ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে আন্তোনিও ভাজ এবং পেড্রো ডায়াস ভারতে আগমন করেন ক্যাথলিক ধারা প্রচার করতে। ১৫৮০ খিষ্টাব্দে রোমান ক্যাথলিক ধর্মযাজকদের একটি দল ভারতে আসে। ওলন্দাজদের তৈরি ব্যান্ডেল শহরকে তারা নিজেদের কর্মস্থলে পরিণত করে। শুরুর দিকের এই ধর্মপ্রচারকরা ছিলেন জেসুইট ও রোমান ক্যাথলিক। ১৫৯৯ সালে তারা সেখানে নিজেদের গির্জা, মঠ এবং স্কুল স্থাপন করে।

এই ধারাবাহিকতায় দেখা যায় যে, ১৬৩৩ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট শাহজাহান এক ফরমানের মাধ্যমে গির্জার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অনেক সুযোগ-সুবিধা দিয়েছিলেন। এসব সুযোগ-সুবিধার মধ্যে অন্যতম হলো: ৭৭৭ একর নিষ্কর জমি প্রদান। অর্থাৎ, ততদিনে গির্জা একজন সম্রাটের মনোযোগ লাভের সক্ষমতা তৈরি করে ফেলেছে। এই সুবিধা পরবর্তীতে ১৭৯৭ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজরাই বাতিল করে দেয়, কারণ তারা মনে করেছিল যে, খ্রিস্টান মিশনারিরা এ অঞ্চলে বেশি সক্রিয় হলে স্থানীয় মুসলমানেরা তাদের ধর্ম বিপন্ন হচ্ছে- এই ভেবে বিদ্রোহ করে বসতে পারে। 

এরপর প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মযাজকদের দল এখানে আসে। ব্রিটেনে তখনও সংস্কার আন্দোলন চলমান। এই সময়ে অনেকগুলো মিশনারি সোসাইটি তৈরি হয়, যাদের প্রতিষ্ঠাকাল খুব কাছাকাছি। ১৭৯২ সালে ব্যাপটিস্ট মিশনারি সোসাইটি, ১৭৯৫ সালে চার্চ মিশনারি সোসাইটি এবং ১৭৯৯ সালে লন্ডন মিশনারি সোসাইটি প্রতিষ্ঠিত হয়। যেসব অঞ্চলে ব্রিটিশরা গিয়েছে, সেসব অঞ্চলে এসব সংগঠন তাদের প্রতিনিধি পাঠিয়ে প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদ প্রচারে আত্মনিয়োগ করেছে।

তারপর আগমন ঘটে ইভানজেলিকাল খ্রিস্টানদের। আলেকজান্ডার ডাফের (১৮০৬-১৮৭৮) নেতৃত্বে বাংলায় ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে ইভানজেলিকাল চার্চ প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি একাধারে পণ্ডিত, প্রাচ্যবিদ, রাজনীতিবিদ ও বহুভাষাবিদ ছিলেন। এই তিন মতবাদ তখন চরম সংঘাতে লিপ্ত ছিল। ইউরোপে ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট এবং ব্রিটেন-স্কটল্যান্ডে প্রোটেস্ট্যান্ট ও ইভানজেলিকালদের মধ্যে তীব্র সংঘাত চলছিল—যা অনেকটা আমাদের সুন্নি ও শিয়াদের মধ্যকার দ্বন্দ্বের মতো।

এই পরিস্থিতিতে ভারতেও তাদের সংঘাত হওয়া স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এখানে তারা ধর্মপ্রচারের স্বার্থে নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে নেয়। তারা ঠিক করে যে, একজনের এলাকায় অন্যজন নিজ মতবাদ প্রচার করতে যাবে না। একই সাথে তাদের ধর্মীয় বিতর্কগুলোকে জনসমক্ষে না আনার সিদ্ধান্ত নেয়। অর্থাৎ, বিতর্কগুলো পণ্ডিত মহলেই সীমাবদ্ধ থাকবে, তারা তা সাধারণ মানুষের সামনে আনবে না।

খ্রিস্টান মিশনারি কার্যক্রমে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে উইলিয়াম কেরির হাত ধরে। তিনি ব্যাপটিস্ট মিশনারি সোসাইটির পক্ষ থেকে প্রেরিত হয়েছিলেন। তাঁর জীবনে অনেক উত্থান-পতন রয়েছে। গির্জা তাঁকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করেছে এবং তাঁর মধ্যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা জাগ্রত করেছে। তখন এ ধরনের ঘটনা খুব স্বাভাবিক ছিল। ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপনকারীদের নতুন প্রজন্ম নিজেদের বিশ্বজয়ী ভাবত এবং সেই মানের প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য তারা সবসময় উদগ্রীব থাকত।

কেরির মতোই আরও একজন হলেন উইলিয়াম জোন্স। তিনি তরুণ বয়সেই ইউরোপে থাকাকালীন আরবি শিখেছিলেন। তিনি কলকাতায় এলেন বিচারক হিসেবে এবং ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে ‘দ্য এশিয়াটিক সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর মধ্যেও একটি বৈশ্বিক ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠার প্রস্তুতি কৈশোর থেকেই ছিল। জোন্সের জীবনে কেরির মতো এত উত্থান-পতন ছিল না। তিনি এই আকাঙ্ক্ষা নিয়েই ভারতে আসেন যে, ধর্ম প্রচার করতে হবে, ধর্মের বাণী ছড়িয়ে দিতে হবে এবং ‘বর্বর-নিকৃষ্ট’ এই মানুষগুলোকে সভ্য করে তুলতে হবে।

কেরি ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে শ্রীরামপুরে ব্যাপটিস্ট মতাদর্শের ওপর ভিত্তি করে ‘শ্রীরামপুর মিশন’ প্রতিষ্ঠা করেন। শ্রীরামপুর তখন ড্যানিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে ছিল। তাঁর প্রধান সহযোগীদের মধ্যে ছিলেন জশুয়া মার্শম্যান (১৭৬৮-১৮৩৭) এবং উইলিয়াম ওয়ার্ড (১৭৬৯-১৮২৩)। কেরি এবং তাঁর দুই বন্ধুর হাত ধরে ভারত উপমহাদেশে, বিশেষ করে বাংলা ও কলকাতা কেন্দ্রিক বড় ধরনের পরিবর্তন সূচিত হয়।

শ্রীরামপুর মিশন এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, সেই সময়ে তারা নিজস্ব প্রেস তৈরি করে বাংলা, অহমিয়া, ওড়িয়া, হিন্দি, মারাঠি ও সংস্কৃতসহ আরও নানা ভাষায় বাইবেল অনুবাদ করেছিল। বাইবেলের অনুবাদ ছাড়াও তারা ভারতীয় সহযোগীদের (যেমন: রামরাম বসু, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার) দিয়ে রামায়ণ, গীতা ও অন্যান্য পুরাণের ইংরেজি অনুবাদ করায়। এর মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের সংস্কৃতিকে প্রভাবশালী করে তোলে।

এই পরিবর্তনের দুটি ধারা ছিল: একটি এশিয়াটিক সোসাইটি ভিত্তিক, অপরটি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ভিত্তিক। এশিয়াটিক সোসাইটি প্রাচ্যবিদ্যা নিয়ে কাজ করেছে এবং ফোর্ট উইলিয়াম কলেজও তার সমান্তরালে কাজ করেছে। এক প্রতিষ্ঠান অন্য প্রতিষ্ঠানের অসম্পূর্ণতা ও ত্রুটিগুলো দূর করার চেষ্টা করেছে। এশিয়াটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল—ভারতের মানুষকে শাসন করতে হলে তাদের আগে জানতে হবে; অন্যথায় এই সাময়িক শাসনব্যবস্থা একসময় ইতিহাসের অতলে হারিয়ে যাবে।

১৭৮৪ থেকে ১৮২৮ সাল পর্যন্ত এশিয়াটিক সোসাইটিতে স্থানীয়দের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল, হোক সে মুসলিম বা হিন্দু। ইংরেজরা মনে করত এটি একটি অভিজাত প্রতিষ্ঠান। তারা কী চিন্তা করে বা কেমন জ্ঞানচর্চা করে—তা স্থানীয়রা জেনে গেলে হয় কিছু বুঝবে না, অথবা বুঝে ফেললে তা ইংরেজদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে; কারণ স্থানীয়দের আনুগত্য তখনও পরীক্ষিত ছিল না।

স্থানীয়দের মধ্যে সর্বপ্রথম এশিয়াটিক সোসাইটিতে প্রবেশাধিকার পেলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদা দ্বারকানাথ ঠাকুর। তিনি ইংরেজি ক্লাবের সদস্য হন এবং কলকাতায় প্রথম ইউনিয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। এভাবে তিনি ইংরেজদের বিশ্বাসভাজন হয়ে ওঠেন। তাঁর কাছাকাছি সময়ে স্থানীয় আরও অনেকে সেখানে প্রবেশের সুযোগ লাভ করেছিলেন। যেমন: রাজেন্দ্রলাল মিত্র; তিনি প্রথমে লাইব্রেরিয়ান ও গবেষণা সহকারী ছিলেন, পরে গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক হন এবং ১৮৮৫ সালে এশিয়াটিক সোসাইটির সভাপতি নির্বাচিত হন।

এই প্রতিষ্ঠান অনেক বড় বড় পণ্ডিত তৈরি করেছে, যেমন: চার্লস উইলকিন্স, হেনরি টি কোলব্রুক ও আলেকজান্ডার কানিংহাম। তাঁরা সবাই ছিলেন প্রাচ্যবিদ। এই প্রাচ্যবিদ্যা আমাদের সংস্কৃতি, ভাষা, ধর্ম, কৃষি, সমাজব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, পারস্পরিক বন্ধন ও মনস্তত্ত্ব—অর্থাৎ আমাদের জীবনের প্রতিটি দিক নিয়ে নিবিড় গবেষণা করেছে। এই গবেষণা একদিকে যেমন খ্রিস্টান মিশনারিদের সহায়তা করেছে, তেমনি মিশনারিদের ধর্মীয় তৎপরতাও এশিয়াটিক সোসাইটির ভাবাদর্শকে এগিয়ে নিয়েছে।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রধান যিনি থাকতেন, তিনিই হতেন এশিয়াটিক সোসাইটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক। যেমন: এর প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তৎকালীন কোম্পানি প্রধান ওয়ারেন হেস্টিংস। এখানে এশিয়াটিক সোসাইটির কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়। প্রথমত, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা; দ্বিতীয়ত, গবেষণা প্রতিষ্ঠান; তৃতীয়ত, ধর্মপ্রচারক শ্রেণির সমর্থন; এবং চতুর্থত, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিপুল অর্থায়ন। এভাবেই সবকিছুর এক অসাধারণ সমন্বয় তারা নিশ্চিত করেছিল।

উইলিয়াম কেরি এবং তাঁর সহযোগীরা দেশীয় ভাষা ও সাহিত্যের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন। কারণ ভাষা ও সাহিত্য হলো আধিপত্য বিস্তারের এমন এক জায়গা, যার প্রভাব সহজে শেষ হয় না। কোনো এক সময় যদি প্রত্যক্ষ উপনিবেশ হারিয়েও যায়, তবুও মস্তিষ্কের উপনিবেশ, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক উপনিবেশ থেকে যায়।

এশিয়াটিক সোসাইটিতে ভাষাতাত্ত্বিক, সমাজতাত্ত্বিক, ইতিহাসবিদ ও ধর্মতাত্ত্বিকসহ সব ধারার পণ্ডিত ছিলেন। এমনকি সেখানে যারা মরমী সাধনা করতেন, তাঁরাও ছিলেন। তাঁদের কেউ ছিলেন হিন্দুধর্মের প্রতি অনুরক্ত, কেউ মুসলিম বিষয়ের প্রতি, আবার কেউ আরবি বা ফারসি ভাষার প্রতি। এই অনুরাগ ছিল মূলত গবেষণামূলক লিপ্ততা। তাঁরা আমাদের সেরা গ্রন্থসমূহ—যেমন: ‘তাবাকাত-ই-নাসিরি’, ‘তারিখ-ই-ফিরোজ শাহী’, ‘তারিখ-ই-ফিরিশতা’, ‘তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরী’ ও ‘ফতোয়া-ই-আলমগীরী’ অনুবাদ করেছেন।

একইভাবে বাংলা ভাষার প্রথম মুদ্রিত ব্যাকরণ গ্রন্থ লিখেছেন নাথানিয়েল হ্যালহেড। বাংলা ও লাতিন অভিধান তৈরি করেছেন ম্যানুয়েল দা আসুম্পসাঁউ। এমনকি ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে উপমহাদেশের প্রথম বাংলা পত্রিকা ‘সমাচার দর্পণ’ সম্পাদনা করেন উইলিয়াম কেরি। বাংলা ভাষায় কথ্যরীতির প্রথম নিদর্শন হিসেবে তাঁর কাজগুলোকেই বিবেচনা করা হয়। তবে তাঁদের কেউই বাংলা ভাষার সেবা করার জন্য আসেননি। খ্রিস্টধর্ম প্রচারের তাগিদেই তাঁরা ভাষার ওপর এত গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ এই অঞ্চলে ধর্মপ্রচারের জন্য স্থানীয় ভাষা জানা জরুরি ছিল; আর বিদেশিরা যখন এই ভাষা শিখবে, তখন তাদের জন্য একটি সুসংগঠিত ব্যাকরণ থাকা প্রয়োজন ছিল। মূলত এসব কারণেই তাঁরা বাংলা ভাষার ভিত্তি গড়েছেন এবং এর মাধ্যমে ভারতের পরবর্তী জ্ঞানব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজিয়েছেন।

ধর্মপ্রচারের ক্ষেত্রে আমরা এখনো উচ্চমার্গীয় যেসব স্তরের কথা ভাবছিও না, তাঁরা সেই কাজগুলো করার মাধ্যমেই আমাদের ওপর বুদ্ধিবৃত্তিক একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন। এগুলো অলৌকিক কিছু নয় যে এমনি এমনি হয়ে গেছে, আবার একে কেবল ষড়যন্ত্রতত্ত্ব হিসেবে দেখারও সুযোগ নেই। এটি ছিল একনিষ্ঠ সাধনা ও আত্মনিয়োগের একটি ধারাবাহিকতা। আমরা যদি জ্ঞান-সাধনার এমন নজির তৈরি করতে পারতাম, তবে ইউরোপীয়রাও আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নেওয়ার জন্য নিজেদের চিন্তা ও মানসিকতাকে প্রস্তুত করত।

প্রথমে ইংরেজরা এসেছিল বাণিজ্যের মাধ্যমে; তারপর আমাদের রাজনৈতিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে রাজনীতি, সামরিক শক্তি এবং কূটনীতি—সবকিছুর সমন্বয়ে তারা আমাদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করল। এই কর্তৃত্ব ভঙ্গুর হতে পারত, দীর্ঘস্থায়ী না-ও হতে পারত; কিন্তু এই শাসন যেন স্থায়ী হয় এবং আমরা যেন শাসিত হওয়ার ওপর সন্তুষ্ট থাকি—সেই পথরেখা তৈরি করে দিয়েছিলেন তাঁদের পরবর্তী গবেষক ও চিন্তাবিদগণ।

তৎকালীন আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা ও ভারতসহ যত জায়গায় উপনিবেশ ছিল, সেসবের মধ্যে তারা এক ধরনের আন্তঃসম্পর্ক তৈরি করেছিল। অর্থাৎ, যিনি আগে কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে কাজ করেছেন, তাঁর অভিজ্ঞতাকে অন্য অঞ্চলে কাজে লাগানো হতো। এভাবে তারা একটি শক্তিশালী আন্তঃঔপনিবেশিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল।

উনিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে সুইজারল্যান্ডে ‘বাসেল মিশনারি সেমিনারি’ প্রতিষ্ঠিত হয়। সেখানে তারা ধর্মীয় অধ্যয়নের জন্য ইবনু হাজম আন্দালুসী, ইবনু তাইমিয়ার ‘আল-জাওয়াবুস সহীহ লিমান বাদ্দালাদ দীনাল মাসিহ’, শাহরাস্তানীর ‘কিতাব আল-মিলাল ওয়াল নিহাল’, আল-মাসউদি রচিত ‘মুরুজ আয-যাহাব’ এবং আল-বিরুনির গ্রন্থসমূহ অধ্যয়ন করত। এমনকি ইবনে হাজমকে তারা তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের জনক হিসেবে উল্লেখ করত। এর পাশাপাশি কুরআন, হাদিস এবং মুসলিমদের সাথে সম্পর্কিত ভাষা—যেমন: আরবি, ফারসি, তুর্কি ও উর্দু তারা এই প্রতিষ্ঠানে শিখত।

এই বাসেল মিশনারি সেমিনারিতেই কার্ল গটলিব ফান্দার শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি একাধারে আরবি ও ফারসি ভাষা জানতেন। প্রথমে তাঁকে পাঠানো হয় রাশিয়ায়। ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি জার্মান ভাষায় ‘মিজানুল হক’ (জার্মান নাম: Waage der Wahrheit) নামক গ্রন্থ রচনা করেন। ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি এই গ্রন্থের ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশ করেন। ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে রুশ সরকার রাশিয়ায় জর্জিয়া মিশনারিদের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়; কারণ সেখানে মিশনারিরা সমাজের ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের বিরুদ্ধাচরণ করে জনজীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। এরপর তিনি বাসেলে ফিরে যান এবং সেখান থেকে তাঁকে বিশেষভাবে ভারতে পাঠানো হয়। তিনি উর্দু ও ফারসি ভাষায় ‘মিফতাহুল আসরার’ (রহস্যের চাবি), ‘তরিকুল হায়াত’ (জীবনের পথ) ইত্যাদি গ্রন্থ রচনা করেন এবং তাঁর ‘মিজানুল হক’ গ্রন্থের উর্দু অনুবাদ প্রকাশ করেন।

ভারতে ফান্দার তাঁর ইসলামবিরোধী কার্যক্রম জোরালোভাবে চালাতে থাকেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, দিল্লি জামে মসজিদের সামনে গিয়ে তিনি মুসলিম পণ্ডিতদের উদ্দেশে হুংকার ছুড়তেন—কে আছে তাঁর সাথে বিতর্ক করবে বা ইসলামের সত্যতা প্রমাণ করবে? উপমহাদেশের মানুষের ধর্মীয় জীবন যেসব প্রতিষ্ঠান দ্বারা পরিচালিত হতো, সেসব প্রতিষ্ঠানের দেয়ালে দেয়ালে মিশনারিদের এই চ্যালেঞ্জ প্রতিধ্বনিত হতে থাকল। তারা চাইছিল কেউ যেন বেরিয়ে এসে তাদের জবাব দেয়। এরপর মুসলিমদের পক্ষ থেকেও প্রতিক্রিয়া আসতে শুরু করল।

তৎকালীন ইসলামি জ্ঞানচর্চার অন্যতম একটি দিক ছিল তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব। এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা হলো: এক খ্রিস্টান পাদরি শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভীর পরিবারের কারও সাথে বিতর্ক করতে চাইলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল—এই পরিবারের কাউকে পরাজিত করতে পারলে সমগ্র দিল্লি তাঁর কাছে নতি স্বীকার করবে। তাই তিনি দেহলভী পরিবারের সবচেয়ে কম বাকপটু ব্যক্তি, আব্দুল কাদির মুহাদ্দিস দেহলভীর সাথে বিতর্ক করতে চাইলেন। বিতর্কের শুরুতে আব্দুল কাদির দেহলভী তাঁকে বললেন, “আপনি এই এই বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করবেন, তাই তো?” পাদরি হতভম্ব হয়ে গেলেন; কারণ তিনি যেসব প্রশ্ন মনে মনে সাজিয়ে এনেছিলেন, আব্দুল কাদির দেহলভী তার সবগুলোই আগেভাগে বলে দিয়েছেন। পাদরি বুঝলেন, যাঁর কাছে প্রশ্নগুলো আগে থেকেই জানা, তাঁর কাছে নিশ্চয়ই এর মোক্ষম জবাবও তৈরি আছে।

তখন আব্দুল কাদির মুহাদ্দিস দেহলভী বললেন, “শুনুন, আপনি পরীক্ষার জন্য এমন জায়গায় এসেছেন, যেখানে আপনার আসা উচিত হয়নি। আমরা কুরআনের তাফসির পড়ার আগেই তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের জ্ঞান অর্জন করি। যখন আমাদের কুরআনের তরজমা পাঠ শেষ হয়, তখনই আমরা তাওরাত, যাবুর, ইনজিল এবং এদের ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলো পড়ে ফেলি।” আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-এর গ্রন্থে এই ঘটনার উল্লেখ আছে।

অন্যান্য মনীষীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন জাওয়াদ সাবাত আল হুসাইনী। তাঁকে জাহাজডুবির নাটক সাজিয়ে খ্রিস্টান মিশনারিরা হত্যা করেছিল। তাঁর রচনাসমূহের ধারাবাহিকতা পরবর্তীকালে আরেক মহান মুসলিম মনীষী রহমতুল্লাহ কিরানভীকে প্রস্তুত করে।

মুজাফফরনগরের কিরানার এক অত্যন্ত অভিজাত ডাক্তার পরিবারে রহমতুল্লাহ কিরানভীর জন্ম। তাঁর পরিবার সম্রাট আকবরের আমল থেকেই মুঘল সালতানাতের সাথে যুক্ত ছিল। আবার জ্ঞানচর্চার ধারাও সেই পরিবারে বিদ্যমান ছিল। তিনি ৬ বছর বয়সেই ইসলামি শিক্ষার ঐতিহ্যবাহী ধারায় যুক্ত হন; ১২ বছর বয়সে কুরআন মুখস্থ করেন এবং আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষা শেখেন। এরপর দিল্লিতে গিয়ে দর্শন, গণিত ও চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন।

রহমতুল্লাহ কিরানভীর বংশের আরেকজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি হলেন ডাক্তার উজির খান। তিনি বিহারে জন্মগ্রহণ করেন এবং বাংলার মুর্শিদাবাদে মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক শেষ করে কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে চিকিৎসা বিদ্যায় ডিগ্রি অর্জন করেন। কলকাতায় থাকাকালীন তিনি দেখতে পান যে, মিশনারি কার্যক্রম ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এরপর তিনি উচ্চতর শিক্ষার জন্য ইংল্যান্ড যান। সেখানে খ্রিস্টধর্মকে বিশ্লেষণ ও সমালোচনা করার জন্য গ্রিক, লাতিন ও ইংরেজি ভাষার ওপর দক্ষতা অর্জন করেন। তিনি খ্রিস্টধর্মের ওপর তৎকালীন গবেষকদের বিপুল পরিমাণ মূল্যবান গ্রন্থ সংগ্রহ করে ভারতে ফিরে আসেন। ইংরেজরা আমাদের সংস্কৃতিকে জানার জন্য ইউরোপীয় হয়েও আমাদের ভাষা শিখেছিল; আর আমাদের সবচেয়ে অগ্রসর ও সোনালি সন্তান তাঁদের মোকাবিলা করতে তাঁদেরই ভাষাগুলো শেখেন এবং তাঁদের গ্রন্থসমূহের ওপর গভীর সমালোচনামূলক ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা অর্জন করেন।

তিনি দেশে ফিরে দেখেন যে, রহমতুল্লাহ কিরানভীর সাথে পাদরি ফান্দারের চিঠি আদান-প্রদান হচ্ছে। কিরানভীর যে জ্ঞান ছিল তা মূলত ঐতিহ্যগত; তখন ডাক্তার উজির খান ইউরোপ থেকে অর্জিত আধুনিক ও সাম্প্রতিক বিষয়সমূহের জ্ঞান তাঁকে সরবরাহ করেন। ফলে রহমতুল্লাহ কিরানভীর জ্ঞান আরও সমৃদ্ধ হয় এবং তাঁরা একই লক্ষ্যের দিকে ধাবিত হন।

১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ এপ্রিল, সোমবার রহমতুল্লাহ কিরানভী এবং ফান্দারের মধ্যে সেই ঐতিহাসিক বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। বিতর্কের প্রথম বিষয় ছিল ‘নাসখ’ (রহিতকরণ); অর্থাৎ ইসলামের আবির্ভাবের মাধ্যমে পূর্ববর্তী ধর্মগুলোর বিধান রহিত হয়ে গেছে কি না, তা প্রমাণ করা। দ্বিতীয় বিষয় ছিল বাইবেলের বিকৃতি। তৃতীয় বিষয় ছিল ‘ত্রিত্ববাদ’; বাইবেল এবং ইসলামের আলোকে প্রমাণ করতে হবে যে ত্রিত্ববাদ গ্রহণযোগ্য নয়। চতুর্থ বিষয় ছিল ‘ইজাযুল কুরআন’; অর্থাৎ কুরআন যে আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত এবং কোনো মানুষ এর সমকক্ষ কিছু রচনা করতে পারে না, তা প্রমাণ করা। সর্বশেষ বিষয় ছিল নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুয়তের প্রমাণ। এই পাঁচ বিষয়ে বিতর্ক হয় এবং এতে রহমতুল্লাহ কিরানভী জয়ী হন। এরপর ফান্দার ভারত ছেড়ে ইস্তাম্বুলে পালিয়ে যান; পরবর্তীকালে তাঁকে সেখান থেকেও পালাতে হয়েছিল। এই বিতর্কের বিষয়বস্তুর ওপর ভিত্তি করেই রহমতুল্লাহ কিরানভী তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘ইযহারুল হক’ রচনা করেন।

ফান্দারের পরাজয় সাধারণ কোনো ঘটনা ছিল না। ভারতের প্রান্তে প্রান্তে, গ্রামে-গঞ্জে এই খবর ছড়িয়ে পড়েছিল। মুসলমানেরা তখন শাসনক্ষমতা, অর্থনীতি, জমিদারি—সবকিছু হারিয়েছেন। রাষ্ট্রক্ষমতা খ্রিস্টানদের হাতে থাকা সত্ত্বেও জ্ঞান এবং প্রমাণের শক্তি দিয়ে তাঁদের পরাজিত করার এই ঘটনা সমগ্র ভারতে, এমনকি উপমহাদেশের বাইরেও ঈমানের প্রতি এক চূড়ান্ত অঙ্গীকার এবং আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছিল।

আরও একজন মুসলিম মনীষী ছিলেন মুনশী মেহেরুল্লাহ (১৮৬১-১৯০৭)। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলায় জন্মগ্রহণকারী একজন দর্জি কীভাবে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানসমূহ থেকে শিক্ষা লাভ করে ধর্ম প্রচার করতে আসা বড় বড় খ্রিস্টান প্রচারকদের মেরুদণ্ড কাঁপিয়ে দেবেন, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। তিনি হাতে হারিকেন নিয়ে গ্রামে-গঞ্জে ও শহরে-নগরে সর্বত্র একা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাঁর ক্ষমতা ও সামর্থ্য কী ছিল? তাঁর ক্ষমতা ছিল সেই জ্ঞান, যা রহমতুল্লাহ কিরানভীকে শাসকদের বিপরীতে বিজয় দান করেছিল। যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য অস্ত যেত না এবং যে সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল ধর্মপ্রচার, সেই ধর্মপ্রচারের সমগ্র প্রচেষ্টাকে তিনি প্রকাশ্যে পরাজিত করেন।

তিনি ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে ধর্মীয় প্রেরণা জাগিয়ে তোলার জন্য ‘ইসলাম ধর্মোত্তেজিকা সভা’ নামে একটি সংস্থা তৈরি করেন। কলকাতায় তিনি ‘সুধাকর’ ও ‘ইসলাম প্রচারক’ পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করতেন। ধর্ম, সমাজকল্যাণ এবং তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে তাঁর গ্রন্থসমূহ অত্যন্ত মূল্যবান। যেমন: ‘খ্রিস্টীয় ধর্মের অসারতা’ (১৮৮৭), ‘বিধবা গঞ্জনা ও বিষাদভাণ্ডার’ (১৮৯৪), ‘মেহেরুল ইসলাম’ (১৮৯৭), ‘হিন্দু ধর্ম রহস্য ও দেবলীলা’ (১৮৯৮) এবং ‘মুসলমান ও খ্রিস্টান তর্কযুদ্ধ’ (১৯০৮)। এ ছাড়া তিনি অসংখ্য বিতর্কে খ্রিস্টানদের পরাজিত করেছেন।

আল্লাহ তায়ালা তাঁকে অসামান্য দক্ষতা, বাগ্মিতা, উপস্থিত বুদ্ধিমত্তা এবং প্রজ্ঞা দিয়েছিলেন। তাঁর কলম যেমন সক্রিয় ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল, ঠিক তেমনি তাঁর জবানও ছিল শক্তিশালী। তিনি বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে দ্বীনের বার্তা নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন। সাহিত্য, সমাজ ও সংস্কৃতি—সবকিছুর ওপর তাঁর তীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টি ছিল। তিনি কেবল নিজে ধর্ম প্রচার করেননি, বরং বহু প্রচারক ও লেখক তৈরি করেছেন।

তাঁর শাগরিদদের অন্যতম হলেন শেখ জমিরুদ্দিন। ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে তিনি এলাহাবাদ সেন্ট পলস ডিভিনিটি কলেজ থেকে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের ওপর স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তারপর কলকাতার ডিভিনিটি কলেজ থেকে আরও উচ্চতর ডিগ্রি নেন। খ্রিস্টধর্মতত্ত্ব, ইংরেজি, লাতিন, সংস্কৃত, আরবি, গ্রিক ও হিব্রু ভাষাসহ এসব ভাষার সাহিত্য ও ব্যাকরণের ওপর তাঁর অগাধ দখল ছিল। তিনি খ্রিস্টান পণ্ডিতদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ইসলাম ত্যাগ করে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন এবং ‘জন জমিরুদ্দিন’ নাম ধারণ করেন। ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে ‘খ্রিস্টীয় বান্ধব পত্রিকা’-য় তিনি কলাম লেখেন—‘আসল কোরান কোথায়?’

এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় দাঁড়িয়ে যান মুনশী মেহেরুল্লাহ। তিনি ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দের ২০ জুন ‘সুধাকর’ পত্রিকায় কলাম লেখেন: “ইশায়ী বা খ্রিস্টানী ধোঁকা ভঞ্জন”; আবার ২৭ তারিখে লেখেন: “আসল কোরান সর্বত্র।” এই বিতর্কে জন জমিরুদ্দিন পরাস্ত হন এবং মুনশী মেহেরুল্লাহর হাতে পুনরায় ইসলাম গ্রহণ করে ইসলাম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন।

আমরা আরও দেখব যে, উইলিয়াম মুর ১৮৫০ সালে ‘দ্য লাইফ অফ মাহোমেট’ (The Life of Mahomet) নামক দুই খণ্ডের বইয়ে নবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম-এর জীবন নিয়ে অসংখ্য মিথ্যার ওপর ভিত্তি করে অনেক আপত্তি উত্থাপন করেন। এর জবাব দেন স্যার সৈয়দ আহমদ খান। এর জন্য পর্যাপ্ত কিতাবপত্র তাঁর কাছে ছিল না; তাই তিনি নিজের জমি বিক্রি করে বিলেত যান এবং প্রয়োজনীয় আকর গ্রন্থ সংগ্রহ করে তার জবাব দেন। ফলে উইলিয়াম মুর তাঁর গ্রন্থের পরবর্তী সংস্করণে ভুলগুলো সংশোধন করতে বাধ্য হন।

খ্রিস্টান মিশনারিদের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি, পৃষ্ঠপোষকতা এবং পদ্ধতিগত ধারাবাহিকতা ছিল। আর আমাদের প্রতিরোধ মূলত ব্যক্তিগত উদ্যোগ এবং আত্মনিয়োগের মাধ্যমেই গড়ে উঠেছিল। আমরা মিশনারিদের মতো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে পারিনি; তবুও ইমানের সুরক্ষা এবং দীনি পরিচয়ের হিফাজতের জন্য অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান তৎকালীন সময়ে আপসহীন ভূমিকা পালন করেছে, যার মধ্যে অন্যতম দারুল উলুম দেওবন্দ।

এভাবেই মুসলমানেরা অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। আমরা ঘুরে দাঁড়িয়েছি আমাদের ঐতিহ্যের ভেতর থেকে, আমাদের জ্ঞানব্যবস্থার ভেতর থেকে এবং আমাদের সামাজিক আত্মশক্তির ভেতর থেকে। আর এই ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হয়েছে আলিম এবং সাধারণ শিক্ষিত শ্রেণির সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে।


সারাংশ: 

১) বাইবেলে যিশু খ্রিস্ট তাঁর ধর্মকে কেবল ইসরাইলিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন। ইসরাইলিদের বাইরে খ্রিস্টধর্ম প্রচার মূলত পরবর্তীদের উদ্ভাবন; 

২) খ্রিস্টধর্মের প্রচারকাজই মূলত ইউরোপীয়দের হাতে ঔপনিবেশিকতার চাবি তুলে দিয়েছিল; 

৩) ইংরেজরা প্রাচ্যবিদ্যার মাধ্যমে ব্যাপকভাবে মুসলমানদের গ্রন্থাবলী ও সংস্কৃতি অধ্যয়ন করেছে এবং এভাবে আমাদের মনস্তত্ত্বে উপনিবেশ স্থাপন করেছে; 

৪) প্রত্যক্ষ উপনিবেশ না থাকলেও মস্তিষ্কের উপনিবেশ এখনো রয়ে গিয়েছে; 

৫) খ্রিস্টান মিশনারিদের অপপ্রচারের জবাব আমাদের পূর্বপুরুষগণ অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে দিয়েছেন। এমনকি এ উদ্দেশ্যে জ্ঞান আহরণে তাঁরা নিজেদের জায়গা-জমি বিক্রি করতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি। অতএব, আমাদেরও উচিত তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করা।

শ্রুতিলিখনঃ জারিফ রহমান

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles
দর্শনপাশ্চাত্যবাদপ্রাচ্যবাদসমসাময়িক বিশ্লেষণ

জ্ঞান ও ক্ষমতার আন্তঃসম্পর্ক: ফুকোর বরাতে

দর্শন•April 11, 2026দর্শনপাশ্চাত্যবাদপ্রাচ্যবাদসমসাময়িক বিশ্লেষণজ্ঞান ও ক্ষমতার আন্তঃসম্পর্ক: ফুকোর বরাতেআসিফ আদনান•70 min read639ViewsFacebookXWhatsApp639...

ইতিহাসইসলামের ইতিহাসবাঙালি মুসলিম

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যেভাবে ইসলামিকরণ হলো || রিচার্ড এম. ইটনের সাক্ষাৎকার

ইতিহাস•April 7, 2026ইতিহাসইসলামের ইতিহাসবাঙালি মুসলিমদক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যেভাবে ইসলামিকরণ হলো || রিচার্ড এম....