আধুনিকতা কি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে আরোও ধার্মিক করে তুলছে?

এক সময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো ইসলামি উগ্রবাদের উত্থান নিয়ে বেশ আতঙ্কে ছিল। তা দমনে কঠোর ও সফল ব্যবস্থাও নিয়েছিল। তবে বর্তমানে এই অঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দুটি প্রধান দেশ—ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় এক অন্যরকম পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এখানে ইসলাম নিজেকে কোনো সহিংস পথে নয়, বরং রাজনীতি, আইন, বাজার সংস্কৃতি এবং সামাজিক চাপের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
উদাহরণ হিসেবে, গত মাসে ইন্দোনেশিয়ায় একটি নতুন দণ্ডবিধি কার্যকর করা হয়েছে। এই আইনে বিয়ের আগে শারীরিক সম্পর্ক নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং ধর্ম অবমাননা ও ধর্মত্যাগের অপরাধের পরিধি আরও বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া নতুন বিধিতে ‘প্রচলিত রীতিনীতির আইন’ (living law)-কেও স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে স্থানীয় প্রশাসন এমন সব শরয়ি নিয়ম চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ পাবে, যা নারী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য বৈষম্যমূলক হতে পারে ।
অন্যদিকে, মালয়েশিয়ার তেরেঙ্গানু রাজ্যে গত আগস্টে একটি নতুন শরিয়া বিধান চালু করা হয়েছে। সেখানে কোনো মুসলিম পুরুষের যদি শুক্রবারের জুমুআর নামাজ একবারও ছুটে যায়, তবে তাকে ৩,০০০ রিঙ্গিত (প্রায় ৭৭০ ডলার) জরিমানা অথবা দুই বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে হতে পারে। অথচ নামাজ পড়ার বাধ্যবাধকতা নিয়ে এমন কঠোর জেল-জরিমানার নিয়ম ইরান বা সৌদি আরবের মতো দেশেও দেখা যায় না।
উভয় দেশই এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে যে, আধুনিকায়নের কারণে স্বাভাবিকভাবেই মানুষ সেকুলারিজমের দিকে ঝোঁকে।
অর্থনৈতিক অগ্রগতি সত্ত্বেও সেখানকার মানুষের ধর্মপ্রাণতা দুর্বল হচ্ছে না, বরং আরও তীব্র হচ্ছে। এটি পূর্ব এশিয়া এবং ইউরোপে দেখা প্যাটার্নের সম্পূর্ণ বিপরীত, যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে ধর্মাচরণ কমে যাওয়ার একটি স্পষ্ট সম্পর্ক দেখা গেছে।
শিক্ষা, উদারীকরণ এবং ইন্টারনেটের সুযোগ সমাজকে অনিবার্যভাবে সেকুলার মূল্যবোধের দিকে টেনে নিয়ে যায়—এই যুক্তি কিছু উদারপন্থী মানুষ দিয়েই থাকেন। কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো ভিন্ন কথাই বলছে। লন্ডনের কিংস কলেজের অ্যালিস ইভান্স লিখেছেন, ‘একজন ব্যক্তির কত বছরের শিক্ষা আছে তা বড় কথা নয়, বরং একটি সম্প্রদায় কোন বিষয়কে মর্যাদাপূর্ণ মনে করে সেটাই আসল।’ বর্তমানে ‘ধার্মিকতা’ মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
এই দুটি দেশ খুবই ভিন্নভাবে ইসলাম চর্চা করে। মালয়েশিয়া ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তারা ধর্মীয় বিষয়ে রাজ্যগুলোকে আইনি এখতিয়ার দেয়। একেক রাজ্যে একেক ধরনের শরিয়া আইন প্রচলিত আছে, যা জাতীয়ভাবে ফেডারেল ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ডিপার্টমেন্ট (JAKIM) সমন্বয় করে। ২০২৬ সালের বাজেটে ‘ইসলামি উন্নয়নের’ জন্য রেকর্ড ২.৬ বিলিয়ন রিঙ্গিত (৬৪২ মিলিয়ন ডলার) বরাদ্দ করা হয়েছে যা অমুসলিম উপাসনালয় রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বরাদ্দ ৫০ মিলিয়ন রিঙ্গিতের তুলনায় পঞ্চাশ গুণ বেশি।
ইন্দোনেশিয়ার সমাজ চলে তাদের রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ‘পঞ্চশীলা’ মেনে, যেখানে নাস্তিক হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে দেশটি ইসলামসহ মোট ছয়টি ধর্মকে (ইসলাম, প্রোটেস্ট্যান্ট, ক্যাথলিক, বৌদ্ধ, হিন্দু ও কনফুসীয়) সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেয় এবং সবাইকে যার যার ধর্ম পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়। দেশটির সমাজব্যবস্থায় ‘নাহদলাতুল উলামা’-র মতো বড় বড় মুসলিম সংগঠনের বিশাল প্রভাব রয়েছে। প্রায় ১০ কোটিরও বেশি মানুষের এই সংগঠনগুলো এমন এক ইসলাম প্রচার করে, যা সবার সাথে মিলেমিশে থাকা এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সম্মান করার কথা প্রচার করে।
বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম এই গণতান্ত্রিক দেশে ধর্মীয় দলগুলো শুধু উপাসনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তারা প্রচুর স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় আর হাসপাতালও চালায়। তাদের বিশ্বাস হলো—ইসলামি আদর্শ আর গণতন্ত্র একে অপরের পরিপূরক। আসলে ইন্দোনেশিয়ার ইসলাম কয়েকশ বছরের পুরনো হিন্দু-বৌদ্ধ রীতিনীতি আর স্থানীয় আদিবাসী সংস্কৃতির সাথে মিলেমিশে এক অনন্য রূপ পেয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ায় ধর্মীয় সহনশীলতা এখনো টিকে আছে। গত ফেব্রুয়ারিতেই দেখা গেছে, দেশটির লাখ লাখ মানুষ রমজান, লেন্ট আর চীনা নববর্ষের উৎসব একসাথে পালন করছে। তবে দুই দেশেই মানুষের মধ্যে ধর্ম পালনের আগ্রহ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। পার্থক্য শুধু ধরন নিয়ে।
মালয়েশিয়ায় ইসলাম এখন রাজনীতির প্রধান অস্ত্র। ওখানকার ৬০ শতাংশ ভোটারই মালয় মুসলিম। আর আইন অনুযায়ী তাদের মুসলিম থাকতেই হয়। তাই সরকারি আর বিরোধী—সব দলই মালয় ভোটারদের মন জয় করতে কে কার চেয়ে বড় মুসলমান, সেই প্রতিযোগিতায় নামে। এর ফলে পুরো দেশটা দিন দিন আরও রক্ষণশীল হয়ে পড়ছে। ২০১৩ সালে তো দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘোষণা দিয়েছিল যে, ‘আল্লাহ’ শব্দটা শুধু মুসলিমরাই ব্যবহার করতে পারবে। এমনকি কয়েকটা দোকানে ‘আল্লাহ’ লেখা মোজা পাওয়া যাওয়ায় তুলকালাম কাণ্ড ঘটে গিয়েছিল। সেখানে সমকামিতার জন্য ২০ বছর পর্যন্ত জেল আর বেতের বাড়ির বিধান আছে। ইন্টারনেটে কোনো কিছু ভাইরাল হলে ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ সাথে সাথে তদন্তে নেমে পড়ে। যেমন জানুয়ারিতে এক জুম্বা ট্রেইনার হিজাব পরে হাঁটু বের করা পোশাকে নাচার কারণে তাকে ক্ষমা চাইতে হয়েছে এবং তদন্তের মুখে পড়তে হয়েছে।
আদালতের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। মালয়েশিয়ায় সাধারণ আদালত আর শরিয়া আদালত আলাদা থাকলেও, এখন ধর্মীয় বিষয়গুলো সাধারণ আদালতের ওপর প্রভাব খাচ্ছে। যেমন—এক ব্যক্তি খ্রিস্টান ধর্ম থেকে ইসলাম গ্রহণ করে বিয়ে করেছিলেন। বিচ্ছেদের পর তিনি আবার নিজের ধর্মে ফিরতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আদালত রায় দিয়েছে যে এই সিদ্ধান্ত শরিয়া আদালতই নেবে।
সোশ্যাল মিডিয়া বা টিকটক এখন ধর্ম চর্চার বড় মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেলিব্রিটি বক্তারা ছোট ছোট ভিডিওর মাধ্যমে ধর্ম প্রচার করছেন, যাকে বলা হচ্ছে ‘মাইক্রো-দাওয়াহ’। গত নির্বাচনে একটি কট্টরপন্থী দলকে জেতাতেও টিকটক বড় ভূমিকা রেখেছে।
ইন্দোনেশিয়ার চিত্রটা একটু আলাদা। সেখানে হিজাব পরার হার ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে এখন ৭৫ শতাংশ হয়েছে, তবে এটা কোনো আইনের চাপে নয়—বরং সামাজিক প্রভাব আর নিজেদের ইচ্ছায়। সেখানে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি কিছুটা কম হলেও ২০১৭ সালে জাকার্তার গভর্নরকে ধর্ম অবমাননার দায়ে জেল খাটতে হয়েছিল। ইন্দোনেশিয়ার রাজনীতিবিদরা এখন পর্যন্ত ধর্মকে পুরোপুরি ঢাল হিসেবে ব্যবহার না করলেও, দেশটির বহুত্ববাদ বা বৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে হলে সারাক্ষণ সতর্ক থাকতে হবে।
সূত্রঃ দ্য ইকোনোমিস্ট
অনুবাদঃ রিফাহ তাসফিয়াহ শশী, শিক্ষার্থী, কুয়েট












Comments