সমসাময়িক বিশ্লেষণ

ইরান যুদ্ধ ও বিশ্ব-রাজনীতিতে আমেরিকার পতন

Share
Share

ইরান যুদ্ধ ও বিশ্ব-রাজনীতিতে আমেরিকার পতন

ভূমিকা

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষণে জন মেয়ারশাইমারের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব খুব কমই আছেন। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক এবং ‘অফেনসিভ রিয়ালিজম’-এর জনক ২০২৬ সালের এপ্রিলে এক আলাপচারিতায় মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ময়নাতদন্ত করেছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের শোচনীয় পরাজয়ের কারণ ব্যাখ্যা করেছেন তিনি। একইসঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের স্ববিরোধী বক্তব্যের পেছনের হাহাকার এবং বৈশ্বিক রাজনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিশ্লেষণ করেছেন। মেয়ারশাইমারের মতে, এটি কেবল একটি প্রশাসনের ভুল নয়, বরং আমেরিকার কৌশলগত চিন্তাধারার চরম ব্যর্থতা। তার এই পর্যবেক্ষণ মূলত এক সময়ের সুপারপাওয়ারের দ্রুত পতনের প্রতিচ্ছবি। এই রচনাটি জন মেয়ারশাইমারের বক্তৃতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি বিশ্লেষণাত্মক ভাষান্তর; উপস্থাপনায় শাহেদ হাসান।

——————-

ডোনাল্ড ট্রাম্প তখন দিশেহারা। বাইরে তর্জন-গর্জন আর হুমকি-ধমকি দিলেও ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধবিরতির আলোচনায় বসেছিল মূলত দুর্বল অবস্থানে থেকে। এর প্রমাণও ছিল একদম চোখের সামনে। ২০২৬ সালের এপ্রিলের শুরুর দিকে এক সোমবার ট্রাম্পের নিজের প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ করা দুটি পোস্টেই সেই মরিয়া ভাব ফুটে ওঠে।

সেদিন সকালে করা পোস্টে ইরানকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে চিরতরে মুছে ফেলার হুমকি দেন ট্রাম্প। একে সরাসরি ‘গণহত্যার হুমকি’ বলা যেতে পারে, যা একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের চেয়ে অ্যাডলফ হিটলারের ভাষার সঙ্গেই বেশি মানানসই। তবে একে কেবল পাগলামি বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বরং এটি ছিল এক কোণঠাসা মানুষের মরিয়া চেষ্টা। সেদিন সন্ধ্যায় সামরিক অভিযানের ঠিক আগমুহূর্তে ইরানকে ভীতিপ্রদর্শনের মাধ্যমে নতি স্বীকারে বাধ্য করাই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। কোনো যুদ্ধ ছাড়াই তেহরানকে বশ মানানোর এটি ছিল শেষ চেষ্টা। আদতে তার হাতে আর কোনো বিকল্পই অবশিষ্ট ছিল না।

সেদিন সন্ধ্যা হতেই ট্রাম্প ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যান। সন্ধ্যার পোস্টে তিনি ঘোষণা করেন, আলোচনা চলবে ইরানের দেওয়া ১০ দফা প্রস্তাবের ভিত্তিতে। এখানে আমেরিকার সেই কঠোর ১৫ দফার কোনো জায়গা ছিল না; বরং নথিতে তেহরানের সব দাবিই মেনে নেওয়া হয়। ট্রাম্প এই পরিকল্পনাকে চুক্তির ‘কার্যকর ভিত্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেন। দাবি করেন, সব বিরোধ প্রায় মিটে গেছে।

এখানকার সমীকরণ একদম পরিষ্কার। যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানে ক্ষমতার রদবদল, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস এবং হুথি-হিজবুল্লাহ-হামাসকে সমর্থন বন্ধ করার লক্ষ্য নিয়ে। কিন্তু তার একটি লক্ষ্যও অর্জিত হয়নি। ইরানের ১০ দফা মেনে নেওয়া মানে কোনো সমঝোতা নয়, বরং পরাজয় স্বীকার করে নেওয়া। প্রকৃতপক্ষে এই যুদ্ধ থেকে সম্মানজনক প্রস্থানের কোনো পথ ছিল না। যা করা হয়েছে, তা স্রেফ আত্মসমর্পণ। এছাড়া আর করার কিছুই ছিল না।

সামরিক পরাজয় এবং আকাশশক্তির বিভ্রম

এই পরাজয়ের সামরিক দিকটি আরও ভয়াবহ। এখানে পরিষ্কার বলা হচ্ছে, শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিজয় ছিনিয়ে আনার মতো বাস্তবসম্মত কোনো পরিকল্পনাই ছিল না। কোনো সুসংগত কৌশলগত কাঠামো ছাড়াই ইরানের ওপর হামলার এই সিদ্ধান্ত কেবল ভুল নয়, বরং পুরোপুরি অযৌক্তিক।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলার পেছনে মূল ধারণা ছিল—শুধু আকাশ শক্তি দিয়েই ইরানে সরকার পরিবর্তন করা সম্ভব। ভাবা হয়েছিল, বোমাবর্ষণ করে সরকারকে হটিয়ে দেওয়া যাবে, রাষ্ট্রব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দেওয়া যাবে এবং সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অনুগত এক উত্তরসূরি বসানো যাবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কোনো তত্ত্বে বা গবেষণায় এমন ধারণার অস্তিত্ব নেই। আকাশ শক্তি একা কোনো রাষ্ট্রে শাসনব্যবস্থা বদলে দিতে পারে—এমন দাবির পক্ষে কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ বা নজির আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এটি কখনোই কাজ করেনি। এই তত্ত্ব কেবল ত্রুটিপূর্ণই ছিল না; এর কোনো ভিত্তিও ছিল না।

এর সামরিক ফলাফল ছিল ভয়াবহ। নৌপথে বিকল্প কোনো পথ খোলা ছিল না; অন্যদিকে স্থল অভিযানের ঝুঁকি ও ব্যাপকতা বিবেচনায় নিয়ে বিষয়টি শুরু থেকেই উপেক্ষা করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র এমন এক পরিস্থিতির গোলকধাঁধায় আটকে পড়েছিল, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো পথ ছিল না। কারণ প্রতিটি পদক্ষেপেই রাজনৈতিক ও কৌশলগত ক্ষতির পরিমাণ ছিল অসহনীয়। এই অভিযানের শোচনীয় অবস্থার একটি বড় প্রমাণ মেলে এক উদ্ধার অভিযানে; যেখানে ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর একদিনে সবচেয়ে বেশি মার্কিন যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল, যা জেতার কোনো পরিকল্পনাই তাদের কাছে ছিল না।

সামরিক চিত্রের পাশাপাশি এই যুদ্ধে ইরানের সবচেয়ে বড় কৌশলগত অর্জন হলো হরমুজ প্রণালীর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। ২৮ ফেব্রুয়ারির আগে ইরানের হাতে এই ধরনের কোনো সুযোগ ছিল না। এখন এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে কোন জাহাজ যাবে আর কোনটি যাবে না, তা নিয়ন্ত্রণ করছে ইরান। এর সাথে লোহিত সাগরের বাব আল-মানদাব প্রণালীতে হুথিদের চলাচল নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা যোগ করলে দেখা যায়, ইরান ও তার মিত্ররা এখন বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি সামুদ্রিক পথ একযোগে বন্ধ করে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। এটি কোনো সামান্য ঘটনা নয়। এর ফলে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে এক স্থায়ী পরিবর্তন ঘটেছে, যা যেকোনো যুদ্ধবিরতির চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হবে।

এদিকে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ১৩টি সামরিক ঘাঁটির সবগুলোই হয় ধ্বংস হয়েছে, নয়তো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলো আদৌ চাইবে কি না যে যুক্তরাষ্ট্র এসব ঘাঁটি আবার তৈরি করুক—কিংবা ওয়াশিংটন আদৌ তা করবে কি না—সেই প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, পারস্য উপসাগরে আমেরিকার আধিপত্য বিস্তারের সক্ষমতা এখন সমূলে বিনষ্ট হয়েছে।

ইসরায়েলের চরম কৌশলগত ভুল

আমেরিকার এই বিপর্যয় নিয়ে যখন বিশ্বজুড়ে আলোচনা হচ্ছে, তখন ইসরায়েলের জন্য এটি স্রেফ পরাজয় নয়, বরং অস্তিত্বের সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। তেল আবিবের মূল ছক ছিল গাজা ও লেবাননে তাদের সামরিক ব্যর্থতা ঢাকার জন্য সরাসরি ইরানকে বা ‘সাপের মাথা’কে আঘাত করা। কিন্তু সেই লক্ষ্য পুরোপুরি ভেস্তে গেছে। ইরান যেমন ধ্বংস হয়নি, তেমনি বশ্যতা স্বীকার করার মতো দুর্বলও হয়নি। উল্টো এই যুদ্ধ তাদের চিরশত্রুকেই আরও শক্তিশালী করে তুলেছে। এখন ইসরায়েলকে একযোগে লড়তে হচ্ছে অনেকগুলো ফ্রন্টে, আর পাশে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনও আগের মতো জোরালো নয়।

ওয়াশিংটনকে এই যুদ্ধের পথে ঠেলে দেওয়ার পেছনে ইসরায়েলের ভূমিকাই ছিল প্রধান। নিউইয়র্ক টাইমসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বলছে, সিআইএ প্রধান বা ভাইস প্রেসিডেন্টসহ মার্কিন প্রশাসনের নীতি-নির্ধারকদের বড় অংশই ইরানের ওপর হামলার বিরোধী ছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও মোসাদ প্রধান ডেভিড বার্নিয়া প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, এক ঝটকায় ইরানকে কুপোকাত করা সম্ভব। তাদের সেই হিসাব যে কতটা ভুল ছিল, তা এখন আর কারো বুঝতে বাকি নেই।

ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সম্পর্কের রসায়ন এই সংঘাতের পর চিরতরে বদলে যাওয়ার পথে। সাধারণ নিয়মেই কোনো দেশ যুদ্ধে হারলে তার কারণ ও দায়ীদের খুঁজতে শুরু করে। এখানেও উত্তরটি গোপন নেই—ইসরায়েলের উসকানিতেই আমেরিকা এই চোরাবালিতে পা দিয়েছিল। এখন তো ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা না থামা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হবে না। অর্থাৎ, ইসরায়েলের একগুঁয়েমির কারণেই যুদ্ধবিরতি আটকে আছে। আমেরিকার নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সবাই এখন এই তিক্ত সত্যটা বুঝতে শুরু করেছে। ইসরায়েলের প্রতি তাদের এই মোহভঙ্গ রূঢ় বাস্তবতারই প্রতিফলন।

ভবিষ্যতের কথা বলতে গিয়ে এক আশঙ্কার কথা বলতে হয়। ইসরায়েল এখন চরম এক দোলাচলের মুখোমুখি। মার্কিন সমর্থন নিয়ে প্রচলিত যুদ্ধবিগ্রহেও তারা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে তারা এখন পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে শুরু করতে পারে। নিকট ভবিষ্যতে এমনটা ঘটার সম্ভাবনা নিয়ে নিশ্চিত কিছু না বললেও, বিষয়টি একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।

ইসরায়েলি রাজনীতিতে ইরানকে দীর্ঘকাল ধরে এক অস্তিত্বের সংকট হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা হলো, প্রথাগত সামরিক শক্তি দিয়ে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকানো সম্ভব নয়—ইসরায়েলি নেতারা এখন এই রূঢ় সত্যের মুখোমুখি। যদি তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে পারমাণবিক শক্তিধর ইরানকে কোনোভাবেই দমন করা যাবে না এবং এতে তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে, তবে যুদ্ধের এই সমীকরণ বিপজ্জনকভাবে অস্থির হয়ে উঠবে।

সামরিক বা রাজনৈতিক সংঘাতের চেয়েও এই পরিস্থিতির আসল প্রভাব পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার মানে কেবল তেলের বাজারে ধস নামা নয়, বরং পুরো বিশ্ববাণিজ্যের ভিত নাড়িয়ে দেওয়া। তেল, গ্যাস ও সারের মতো জরুরি পণ্যের এক বিশাল অংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই পথ দীর্ঘকাল বন্ধ থাকলে ১৯২০-এর দশকের চেয়েও ভয়াবহ বৈশ্বিক মন্দা দেখা দিতে পারে। এখানে বাড়িয়ে বলা হচ্ছে না। এটি বরং বিশ্ববাণিজ্যের ভৌগোলিক বাস্তবতার এক অনিবার্য পরিণতি।

এই অর্থনৈতিক সংকটের কারণেই চীন ও রাশিয়া যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতায় এগিয়ে এসেছে। বেইজিং বা মস্কো এখানে কোনো দাতা হাতেম তাই হিসেবে কাজ করছে না; বরং তারা জানে যে বিশ্ব অর্থনীতির পতন ঘটলে তাদেরও চরম মূল্য দিতে হবে। বিশেষ করে চীন বিশ্ববাজারের সাথে এত গভীরভাবে যুক্ত যে জ্বালানি সরবরাহে সামান্য বিঘ্নও তাদের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ। ধারণা করা হচ্ছে, চীন পাকিস্তান ও রাশিয়ার সাথে মিলে ইরানের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি করেছে যাতে তেহরান আলোচনার টেবিলে বসে। যদিও সুবিধাজনক অবস্থানে থাকায় ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে চেয়েছিল, তবুও শেষ পর্যন্ত তারা আলোচনায় বসতে রাজি হয়। তবে নিজেদের অর্জনগুলো বিসর্জন দিতে তাদের কোনো তাড়া ছিল না।

তবে দৃশ্যপটের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য এখানেই। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় যে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়ার কথা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের, তা দেখাল চীন ও রাশিয়া। ওয়াশিংটন যখন একের পর এক ভূ-রাজনৈতিক চোরাবালিতে আত্মাহুতি দিচ্ছিল, তখন বেইজিং আর মস্কো বিশ্ব অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখার কারিগর হিসেবে আবির্ভূত হলো।

ভূ-রাজনীতির ওপর প্রভাব: ন্যাটো, ইউক্রেন ও আমেরিকার পতন

এই পরাজয়ের ধাক্কা মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে আরও বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এই ইরান যুদ্ধ আগে থেকেই শুরু হওয়া কিছু প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। বিশেষ করে বিশ্বজুড়ে প্রভাব বিস্তারে আমেরিকার ক্রমহ্রাসমান সক্ষমতা, মিত্রদের সাথে জোটের ফাটল এবং এক মেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা থেকে বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বের দিকে মোড় নেওয়ার বিষয়টি এখন আরও স্পষ্ট।

ন্যাটো জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক অন্ধকারাচ্ছন্ন চিত্র ফুটে উঠছে। ইরান যুদ্ধের এই ব্যর্থতার দায় ইউরোপীয়দের ওপর চাপিয়ে দিতে পারেন ট্রাম্প। তিনি হয়তো যুক্তি দেবেন যে, ন্যাটোর মিত্ররা অবরোধ ভাঙতে নৌবাহিনী না পাঠানোয় আমেরিকা এই যুদ্ধে হেরেছে। এমন একটি বয়ান তৈরির প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। এর ফলে আটলান্টিক পাড়ের দেশগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক আরও বিষিয়ে উঠবে। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য, ইউরোপীয় নেতাদের সাথে তাঁর আচরণ এবং ন্যাটোর বাজেট নিয়ে কড়াকড়ি এমনিতেই সম্পর্ককে তলানিতে ঠেকিয়েছিল। ২০২৯ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প যখন ক্ষমতা ছাড়বেন, তখন ন্যাটো আদৌ কোনো কার্যকর জোট হিসেবে টিকে থাকবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

ইউক্রেন যুদ্ধের চিত্রটিও সমানভাবে হতাশাজনক। ইরান যুদ্ধের সমাপ্তি মানেই যে ইউক্রেনে মার্কিন সাহায্যের জোয়ার বইবে, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। আমেরিকার অস্ত্রের মজুদ এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়। তা দ্রুত পূরণ করে আবারও ইউক্রেনে পাঠানোর মতো কোনো রাজনৈতিক সদিচ্ছা ওয়াশিংটনের নেই। অন্যদিকে, কূটনৈতিক চালবাজির মাধ্যমে রাশিয়ার জ্বালানি তেলের আয় আবার বেড়েছে, যা তাদের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তুলেছে। তারা এখন কোণঠাসা ইউক্রেনীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ট্রাম্পের সম্ভাব্য পদক্ষেপ হতে পারে ইউক্রেন যুদ্ধের দায় পুরোপুরি ইউরোপের ওপর চাপিয়ে দেওয়া। যদিও ইউরোপের সেই ভার বইবার ক্ষমতা নেই। শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনের অনিবার্য পরাজয়ের জন্য তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোকেই দুষবেন। এই কৌশলটি ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য লাভজনক হলেও ইউক্রেনের পতন ঠেকাতে কোনো কাজে আসবে না।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই ইরান যুদ্ধ বিশ্ব নেতৃত্ব থেকে আমেরিকার পিছু হটাকে ত্বরান্বিত করেছে। পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো থেকে মার্কিন বাহিনীকে সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নিয়ে আসায় চীনকে ঠেকানোর সক্ষমতা এখন প্রশ্নের মুখে। এর ফলে জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো মিত্ররা এখন আর আমেরিকার নিরাপত্তা বলয়ের ওপর পুরোপুরি ভরসা করতে পারছে না। উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন প্রভাব বিস্তারের মূল স্তম্ভ বা সামরিক ঘাঁটিগুলো এখন স্রেফ ধ্বংসস্তূপ। অন্যদিকে ইউরোপে আটলান্টিক পাড়ের সেই পুরনো অংশীদারিত্ব এখন এক ফাঁপা তত্ত্বে পরিণত হয়েছে।

তবে এই পরিস্থিতি আমেরিকার বৈষয়িক শক্তিকে একবারে ধূলিসাৎ করে দেয়নি। এখানে ভিয়েতনামের যুদ্ধের সাথে এক গভীর সাদৃশ্য দেখা যাচ্ছে। সেই যুদ্ধ যেমন আমেরিকার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করলেও তাদের মূল শক্তিকে শেষ করতে পারেনি, এবারও অনেকটা তেমনই ঘটেছে। কিন্তু নিজের সেই শক্তিকে প্রভাব হিসেবে কাজে লাগানো, বিশ্ব রাজনীতিকে নিজের মতো করে সাজানো, শত্রুকে ভয় দেখানো কিংবা মিত্রদের আশ্বস্ত করার সক্ষমতা—সবই এখন চরম সংকটের মুখে। মূলত একটি প্রভাবশালী বিশ্বশক্তি হিসেবে আমেরিকার কার্যকারিতা এখন গভীর ক্ষতের শিকার।

যৌক্তিকতা, অযৌক্তিকতা এবং ইতিহাসের শিক্ষা

পররাষ্ট্রনীতির অন্দরমহলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটি কতটা ‘যৌক্তিক’, তা নিয়ে তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। সেবাস্তিয়ান রোসাটোর সঙ্গে লেখা জন মেয়ারশাইমারের আলোচিত গ্রন্থ ‘হাউ স্টেটস থিংক’-এ বিষয়টি বিশদভাবে উঠে এসেছে। সেখানে তিনি ‘ভুল সিদ্ধান্ত’ আর ‘অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত’—এই দুইয়ের মাঝে এক সূক্ষ্ম অথচ গভীর রেখা টেনেছেন। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কোনো দেশের নেওয়া পদক্ষেপ কেবল তখনই যৌক্তিক বলে গণ্য হবে, যখন সেটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির কোনো স্বীকৃত তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হবে এবং যথাযথ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত রূপ পাবে। এমনও হতে পারে যে, একটি সিদ্ধান্ত কোনো বলিষ্ঠ অথচ ভুল তত্ত্বের ওপর দাঁড়িয়ে আছে; সে ক্ষেত্রে সেই সিদ্ধান্ত ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনলেও তাকে কিন্তু ‘অযৌক্তিক’ তকমা দেওয়া যাবে না।

এই মানদণ্ডে বিচার করলে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর হামলার সিদ্ধান্তটি ছিল একেবারেই ‘অযৌক্তিক’। কারণ, কেবল আকাশ শক্তি দিয়ে একটি দেশের শাসনব্যবস্থা বদলে দেওয়া সম্ভব—এমন কোনো তত্ত্ব আন্তর্জাতিক রাজনীতির গুরুত্ববহ কোনো সাহিত্যে খুঁজে পাওয়া যায় না। অর্থাৎ, এই সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো গ্রহণযোগ্য কৌশলগত যুক্তি ছিল না। এটি কেবল ভুল ছিল না, বরং সংজ্ঞাগত দিক থেকেই ছিল পুরোপুরি অযৌক্তিক।

অন্যদিকে, সচরাচর যেসব সিদ্ধান্তকে নিছক বোকামি বলে মনে করা হয়, সেগুলোর পেছনে কিছুটা যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন—ন্যাটোর বিস্তৃতি। এই সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল এবং এর পরিণাম সম্পর্কে আগেভাগেই সতর্ক করা হয়েছিল। তবে একে ‘অযৌক্তিক’ বলা চলে না। কারণ এর পেছনে ‘গণতান্ত্রিক শান্তি’ এবং ‘অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরশীলতা’র মতো লিবারেল বা উদারপন্থী তত্ত্বগুলোর সমর্থন ছিল, যা বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে যথেষ্ট সমাদৃত। যদিও বাস্তবে সেই তত্ত্বগুলোর প্রয়োগ হয়েছে মারাত্মক ভুলভাবে। একইভাবে, ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুর দিকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে রাশিয়ার কোমর ভেঙে দেওয়ার যে পরিকল্পনা ছিল, তাকেও একটি ‘ভুল কিন্তু বাস্তবসম্মত’ ছক বলা যায়। কারণ রাশিয়ার আর্থিক খাত যেভাবে পশ্চিমা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল ছিল, তাতে এমন ধারণা করাটা সে সময় অমূলক ছিল না।

এই বিশ্লেষণের ফলে বর্তমান সময়ের একটি বাস্তবতা আমরা দেখতে পাই। সমস্যাটি কেবল মার্কিন নেতাদের অযোগ্যতা বা দুর্নীতির নয়, বরং এর শিকড় আরও গভীরে। আমেরিকার কৌশলগত দূরদর্শিতা এখন এতটাই ভঙ্গুর যে, কোনো সামরিক অভিযানে নামার আগে বিজয়ের একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা তৈরি বা যাচাই করার সক্ষমতা তারা হারিয়ে ফেলেছে। আমলাতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক চাপগুলো কোনো শক্তিশালী কৌশলগত ভিত্তি ছাড়াই যুদ্ধের পথে ঠেলে দিচ্ছে। আর এর করুণ পরিণতি এখন সবার চোখের সামনে পরিষ্কার।

ইরান-পরবর্তী বিশ্ব

ইরান যুদ্ধের পর পৃথিবীটা কেমন হবে?

যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশাল বৈষয়িক শক্তির অধিকারী এবং তারা এখনো এক মহান শক্তি বা ‘গ্রেট পাওয়ার’। পতনবাদীরা যেভাবে আমেরিকার চূড়ান্ত পতন দেখছেন, তিনি ঠিক সেভাবে দেখছেন না। তবে বিশ্বে প্রভাব বিস্তার করা, জোটের নেতৃত্ব দেওয়া, শত্রুকে কোণঠাসা করা কিংবা আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার যে সক্ষমতা আমেরিকার ছিল—তা এখন উল্লেখযোগ্যভাবে এবং সম্ভবত চিরতরে হ্রাস পেয়েছে।

অন্যদিকে, ইরান এক জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এই সংঘাত থেকে বেরিয়ে এসেছে। যুদ্ধের ফলে দেশটি অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগতভাবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। কিন্তু গত ২৮ ফেব্রুয়ারির আগের তুলনায় কৌশলগতভাবে ইরান এখন অনেক বেশি শক্তিশালী। হরমুজ প্রণালী এখন তাদের কবজায়। তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার অটুট আছে। এমনকি তাদের মিত্র—হুথি, হিজবুল্লাহ ও হামাস এখনো লড়াইয়ের মাঠে সক্রিয়। ইরান বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে যে, খোদ যুক্তরাষ্ট্রও বোমা মেরে তাদের বশ্যতা স্বীকার করাতে পারে না।

এক রাউন্ড গুলি না ছুড়েই চীন ও রাশিয়া এখন আমেরিকার তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছে গেছে। এটি তাদের নিজেদের সক্ষমতা বাড়ার কারণে নয়, বরং আমেরিকার সক্ষমতাকে কৌশলগত সাফল্যে রূপান্তরের ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে ঘটেছে।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—মার্কিন আলোচক দলের প্রধান হিসেবে জে ডি ভ্যান্স কি একটি টেকসই শান্তি চুক্তি নিশ্চিত করতে পারবেন? মেয়ারশাইমার ভ্যান্সের ওপর কিছুটা আস্থা রাখছেন। স্টিভ উইটকফ বা জ্যারেড কুশনারের মতো পূর্বসূরিদের চেয়ে ভ্যান্সকে তিনি অনেক বেশি যোগ্য এবং কৌশলগতভাবে সিরিয়াস মনে করেন। তবে ভ্যান্সের রাজনৈতিক ঝুঁকির দিকটিও তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন। যে শান্তিচুক্তিতে আমেরিকার পরাজয়ের ছাপ থাকবে, রিপাবলিকান পার্টির কট্টরপন্থীরা তা কিছুতেই মেনে নেবে না। ভ্যান্স নিজেও এই বিপদের কথা জানেন। এখন প্রশ্ন হলো, নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার বা গদি বাঁচানোর চেয়ে দেশের স্বার্থকে বড় করে দেখার মতো সাহস তিনি দেখাতে পারবেন কি না।

সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে কৌশলগত অদূরদর্শিতা কী ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারে, এই ঘটনা তারই এক বড় উদাহরণ। কোনো পরাশক্তি যখন নিজের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকে, পৃথিবী কিন্তু তখন বসে থাকে না। এই ইরান যুদ্ধের চড়া মূল্য কেবল আমেরিকা বা ইরানকে দিতে হচ্ছে না; বরং সারা বিশ্বের কয়েকশ কোটি মানুষকে তা ভোগ করতে হচ্ছে। কারণ বৈশ্বিক বাজার, আন্তর্জাতিক সংস্থা আর পরাশক্তিগুলোর দায়িত্বশীল আচরণের ওপরই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা নির্ভরশীল।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles
দর্শনপাশ্চাত্যবাদপ্রাচ্যবাদসমসাময়িক বিশ্লেষণ

সেক্যুলার রাষ্ট্রকাঠামোয় শিক্ষা ও চেতনার নিয়ন্ত্রণকৌশল

দর্শন•April 11, 2026দর্শনপাশ্চাত্যবাদপ্রাচ্যবাদসমসাময়িক বিশ্লেষণসেক্যুলার রাষ্ট্রকাঠামোয় শিক্ষা ও চেতনার নিয়ন্ত্রণকৌশলআসিফ আদনান•70 min read107ViewsFacebookXWhatsApp107...

সমসাময়িক বিশ্লেষণ

হিটলারবাদ থেকে মাক্রোঁবাদ: রাজনীতির নানা রূপ — ইমানুয়েল টড

সমসাময়িক বিশ্লেষণ•April 9, 2026সমসাময়িক বিশ্লেষণহিটলারবাদ থেকে মাক্রোঁবাদ: রাজনীতির নানা রূপ — ইমানুয়েল...

ইসলামের ইতিহাসপাশ্চাত্যবাদসমসাময়িক বিশ্লেষণ

পশ্চিমের আয়নায় ইসলামী সংস্কার ও তার লিগ্যাসি

ইসলামের ইতিহাস•April 7, 2026ইসলামের ইতিহাসপাশ্চাত্যবাদসমসাময়িক বিশ্লেষণপশ্চিমের আয়নায় ইসলামী সংস্কার ও তার লিগ্যাসিখালিদ...

বাঙালি মুসলিমসমসাময়িক বিশ্লেষণ

শরিফ ওসমান হাদির সমাজভাবনা

বাঙালি মুসলিম•April 4, 2026বাঙালি মুসলিমসমসাময়িক বিশ্লেষণশরিফ ওসমান হাদির সমাজভাবনাশাহেদ হাসান•40 min read409ViewsFacebookXWhatsApp409...