দর্শনমডার্নিটি

গ্রন্থালোচনা: Formations of The Secular — তালাল আসাদ

Share
Share
দর্শনApril 10, 2026

গ্রন্থালোচনা: Formations of The Secular — তালাল আসাদ

আমাদের আলোচ্য বইটির নাম ‘ফরমেশনস অফ দা সেক্যুলার’। এর মূল লেখক তালাল আসাদ।

লেখক সম্পর্কে কিছু কথা:

আঠারো বছর বয়সে তালাল আসাদ ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান। তার বাবার ইচ্ছা ছিল তিনি স্থাপত্যবিদ্যায় (আর্কিটেকচার) পড়বেন, কিন্তু নিজের প্রবল আগ্রহের কারণে তিনি শেষ পর্যন্ত এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান (অ্যানথ্রোপলজি) বিভাগে ভর্তি হন। পরবর্তীতে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন এবং বিভিন্ন প্রথিতযশা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। বর্তমানে ৯২ বছর বয়সেও তিনি ‘সিটি ইউনিভার্সিটি অফ নিউইয়র্ক’ (CUNY)-তে কর্মরত রয়েছেন।

তার অত্যন্ত সুপরিচিত গ্রন্থ ‘ফরমেশনস অফ দ্য সেক্যুলার’ ২০০৩ সালে প্রকাশিত হয়। তবে এরও আগে, ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত ‘জিনিওলজিস অফ রিলিজিয়ন’ গ্রন্থটির মাধ্যমেই তিনি বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেন। ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয় তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘সেক্যুলার ট্রান্সলেশন’। এছাড়া ২০২৩ সালে ফরাসি ভাষায় তার ‘ক্রিটিক্যাল ট্র্যাডিশন’ নামে একটি বই প্রকাশিত হয়েছে, যা মূলত তার পুরনো প্রবন্ধগুলোর একটি সংকলন। তবে ইংরেজি ভাষায় তার সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ কাজ হিসেবে আমরা ‘সেক্যুলার ট্রান্সলেশন’ বইটিকে বিবেচনা করতে পারি।

​‘ফরমেশনস অফ দ্য সেক্যুলার’ এবং তার সর্বশেষ গ্রন্থের মধ্যবর্তী সময়ে প্রকাশিত হয় তার সাড়াজাগানো বই ‘অন সুইসাইড বোম্বিং’। নাইন-ইলেভেন এবং তার পরবর্তী বিভিন্ন ঘটনার রাজনৈতিক ও দার্শনিক তাৎপর্য এই বইটিতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বইটির একটি চমৎকার অনুবাদ করেছেন, যার শিরোনাম দিয়েছেন ‘আদমবোমা’। অনুবাদের পাশাপাশি তিনি এই গ্রন্থের বিষয়বস্তুর ওপর বেশ কিছু তাত্ত্বিক প্রবন্ধও রচনা করেছেন।

​বাংলাদেশে তালাল আসাদের কাজের চর্চা খুব বেশি পুরনো নয় এবং এই পরিমণ্ডলটি বেশ সীমিত। নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মানস চৌধুরী এবং রেহনুমা আহমেদ প্রমুখ তার চিন্তাধারা নিয়ে কাজ করেছেন। এছাড়া মোহাম্মদ আজমের সম্পাদনায় তালাল আসাদের সাক্ষাৎকারের একটি সংকলন প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে তার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকারের অনুবাদ সংগৃহীত হয়েছে। এর বাইরেও বিভিন্ন সময় ছোট ছোট কিছু প্রবন্ধ বাংলায় অনূদিত হয়েছে। মূলত এগুলোই বাংলাদেশে তালাল আসাদ চর্চার প্রাথমিক পরিচিতি।

তালাল আসাদের প্রধান আলোচনার ক্ষেত্র এবং যেখানে তিনি মৌলিক অবদান রেখেছেন, তা হলো— ‘সেক্যুলারিজম’ (ধর্মনিরপেক্ষতা), ‘ধর্ম’, ‘সভ্যতা’ এবং ‘ঐতিহ্য’ (ট্র্যাডিশন)-এর মতো ধারণাগুলোর ব্যবচ্ছেদ। সেক্যুলার বা ইহজাগতিকতার সাথে ধর্মের প্রকৃত সম্পর্ক কী, তা নিয়ে তার গভীর বিশ্লেষণ বিশ্বজুড়ে একাডেমিক মহলে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে।

​আজকে আমাদের আলোচ্য বইটি মূলত একটি উচ্চমার্গীয় তাত্ত্বিক বা ‘একাডেমিক’ গ্রন্থ। এর আলোচনার পদ্ধতি অত্যন্ত নিবিড়, কঠোরভাবে যুক্তিনির্ভর এবং রেফারেন্স বা তথ্যসূত্রে সমৃদ্ধ। ফলে এর পাঠপ্রক্রিয়া এবং বিশ্লেষণও বেশ বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম দাবি করে।

বইটিতে তালাল আসাদ প্রচলিত অসংখ্য যুক্তি খণ্ডন করেছেন এবং অত্যন্ত নির্মোহভাবে বিষয়গুলোকে বিশ্লেষণ করেছেন। প্রথমেই বইটির শিরোনাম অর্থাৎ ‘Formations of the Secular’ নিয়ে আলোচনা করা যাক। আহসানউল্লাহ খান এই নামটির একটি চমৎকার ও কাব্যিক অনুবাদ করেছেন— ‘দুনিয়াদারির রূপজগৎ’। এখানে তিনি ‘Secular’ অর্থে ‘দুনিয়াদারি’ এবং ‘Formations’ অর্থে ‘রূপজগৎ’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। অনুবাদটি যেমন গভীর, তেমনি পাঠককে প্রথম দর্শনেই ভাবিয়ে তোলে।

​তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে ‘Formations’ বলতে আসলে কী বোঝানো হচ্ছে? একে আমরা ‘গঠনপ্রক্রিয়া’ বলতে পারি। আরও স্পষ্টভাবে বললে, এমন কিছু ধারণা (Concepts) বা বর্গ (Categories), যার মাধ্যমে আমরা কোনো নির্দিষ্ট বিষয়কে অনুধাবন করি, তাকেই বলা হয় ‘Formations’। সেই হিসেবে ‘Formations of the Secular’ বলতে বোঝায়— ‘সেক্যুলার’ বা ইহজাগতিকতা নামক বিষয়টি যেসব বর্গ, ধারণা বা কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ। অর্থাৎ, আমরা ঠিক কোন কোন সংজ্ঞায়ন বা মানদণ্ড দিয়ে ‘সেক্যুলার’ বিষয়টিকে চিনি ও বুঝি, সেই মৌলিক বর্গগুলো নিয়ে আলোচনা করাই এই গ্রন্থের প্রধান লক্ষ্য।

বইটির সাবটাইটেল বা উপশিরোনাম হলো— ‘Christianity, Islam, and Modernity’। এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এখানে ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা এবং সমকালীন আধুনিকতার (Modernity) প্রেক্ষাপটে সেক্যুলারিজমের স্বরূপ অন্বেষণ করা হয়েছে। পুরো গবেষণাটি একটি আধুনিক ও উচ্চমার্গীয় তাত্ত্বিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে; তাই এর পদ্ধতিগত আলোচনাতেও মডার্নিটির এই ছাপ সুস্পষ্ট।

​গ্রন্থের শিরোনাম এবং নামকরণের সার্থকতা আমরা আগেই আলোচনা করেছি। আহসানউ ল্লাহ খানের অনুবাদে একে ‘দুনিয়াদারির রূপজগৎ’ বলা হয়েছে। আমরা বুঝতে পারলাম যে, ‘Formations’ বলতে সেইসব তাত্ত্বিক বর্গ (Categories) এবং ধারণাগুলোকে (Concepts) বোঝানো হচ্ছে, যার মাধ্যমে আমরা কোনো একটি বিষয়কে অনুসংজ্ঞায়িত করি। সেই অর্থে, ‘Formations of the Secular’ হলো সেক্যুলার নামক ধারণাটি যেসব চিন্তা-কাঠামো ও ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, সেগুলোরই একটি পদ্ধতিগত বিশ্লেষণ।

​তিনি এই বইটিকে তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করেছেন: একটি হলো ‘দ্য সেক্যুলার’ (The Secular), দ্বিতীয়টি ‘সেক্যুলারিজম’ (Secularism) এবং তৃতীয়টি হলো ‘সেক্যুলারাইজেশন’ (Secularization)। আমরা সংক্ষেপে এই তাত্ত্বিক বিভাজনের তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করব।

সাধারণত বর্তমান যুগে আমরা কোনো বিশেষণের আগে ‘The’ বসিয়ে একটি বিমূর্ত ধারণা বা নাউন গঠন করি— যেমন: The Political, The Religious কিংবা The Unconscious। একইভাবে, এখানে ‘The Secular’ শব্দটিকে একটি নাউন বা বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

​তালাল আসাদের মতে, ‘The Secular’ হলো একটি এপিস্টেমিক ক্যাটাগরি (Epistemic category) বা জ্ঞানতাত্ত্বিক বর্গ। এর অর্থ হলো, এটি এমন একটি কাঠামো বা চিন্তা-পদ্ধতি যা দিয়ে আমরা বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতাগুলোকে অনুধাবন করি। ‘The Secular’ মূলত একটি বিশেষ কন্ডিশন, যাকে ইংরেজিতে ‘Secularity’ বলা যেতে পারে। যেভাবে জঁ-ফ্রঁসোয়া লিয়োতার তার বিখ্যাত গ্রন্থে ‘The Postmodern Condition’-এর কথা বলেছেন, তেমনি এখানে ‘The Secular’ বলতে মূলত এক ধরনের ‘Secular Condition’ বা ইহজাগতিক জীবন-বাস্তবতাকে বোঝানো হচ্ছে।

আমরা ‘The Secular’-কে একটি এপিস্টেমিক ক্যাটাগরি (Epistemic category) বা জ্ঞানতাত্ত্বিক বর্গ হিসেবে বিবেচনা করব; অর্থাৎ এটি এমন এক চশমা বা মাধ্যম যার মধ্য দিয়ে আমরা জগৎকে দেখি ও বুঝি। বইটির প্রথম অংশে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ রয়েছে, যেমন— ‘What Might an Anthropology of the Secular Look Like?’, ‘Thinking about Agency and Pain’ এবং ‘Reflections on Cruelty and Torture’।

​এই প্রবন্ধগুলোর মূল নির্যাস হলো— নিষ্ঠুরতা (Cruelty) কিংবা নির্যাতনের (Torture) মতো বিষয়গুলোকে আমরা বর্তমানে ‘সেক্যুলার’ লেন্স বা দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করি। তালাল আসাদ এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলেছেন: আমরা যখন সেক্যুলার দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে এই বিষয়গুলোকে দেখি, তখন সেগুলোর অর্থ আমাদের কাছে কেমন দাঁড়ায়? আবার, এই আধুনিক ‘সেক্যুলার কন্ডিশন’ বা জীবন-বাস্তবতা যখন ছিল না, তখন নিষ্ঠুরতা বা নির্যাতনের ধারণাগুলো মানুষের কাছে কেমন ছিল? অর্থাৎ, দৃষ্টিভঙ্গির এই পরিবর্তনের ফলে আমাদের নৈতিক ও মানবিক উপলব্ধিতে ঠিক কী ধরনের রূপান্তর ঘটেছে, সেটিই এখানে বিশ্লেষণের মূল বিষয়।

বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়টি মূলত ‘Agency’ (কর্তৃত্ব বা কর্মতৎপরতা) এবং ‘Pain’ (বেদনা) নিয়ে রচিত। চার্লস টেইলরের ধারণার রেশ ধরে তালাল আসাদ এখানে দেখিয়েছেন যে, প্রাক-আধুনিক বা মধ্যযুগীয় ইউরোপে ‘এজেন্সি’ এবং ‘পেইন’-এর ধারণা কেমন ছিল। তিনি মূলত এই ধারণাগুলোর বিবর্তন বা রূপান্তর প্রক্রিয়াটি বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি বোঝার চেষ্টা করেছেন যে, মধ্যযুগীয় প্রেক্ষাপট থেকে আধুনিক সেক্যুলার যুগে আসার পথে মানুষের বেদনা অনুভব করার ধরন এবং নিজের ওপর নিজের কর্তৃত্বের ধারণায় কী ধরনের মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছে।

​এছাড়া, ভূমিকা বা ইন্ট্রোডাকশন পরবর্তী একদম প্রথম অধ্যায়ে তিনি ‘দ্য সেক্যুলার’-এর একটি বিস্তারিত জিনিওলজি (Genealogy) বা জ্ঞানতাত্ত্বিক উৎস সন্ধান করেছেন। এই অধ্যায়েই তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে আমাদের আধুনিক সেক্যুলার ধারণাগুলো ঐতিহাসিকভাবে ধাপে ধাপে গড়ে উঠেছে। মূলত ‘দ্য সেক্যুলার’ নামক খণ্ডের ভেতরেই এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক অন্বেষণগুলো স্থান পেয়েছে।

এবার সেক্যুলারিজম নিয়ে সংক্ষেপে বলা যাক। সেক্যুলারিজম মূলত একটি রাজনৈতিক প্রকল্প এবং একটি শাসনতান্ত্রিক মতবাদ। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, ‘সেক্যুলার’ এবং ‘সেক্যুলারিজম’ সম্পূর্ণ আলাদা বিষয় হওয়া সত্ত্বেও তারা পরস্পর নির্ভরশীল। আসাদের মতে, সেক্যুলারিজমের পূর্ববর্তী পরিস্থিতি ধর্মীয় কোনো অবস্থা নয়, বরং সেটি হলো ‘সেক্যুলার কন্ডিশন’। অর্থাৎ প্রথমে সেক্যুলার প্রেক্ষিত তৈরি হয় এবং সেক্যুলারিজম সেই সেক্যুলারেরই একটি অংশ হিসেবে আবির্ভূত হয়। এভাবেই তিনি বিষয়টিকে আমাদের সামনে উপস্থাপন করেন। সহজভাবে বললে, ‘সেক্যুলার’ হলো একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক বর্গ বা এপিস্টেমিক ক্যাটাগরি, আর ‘সেক্যুলারিজম’ হলো একটি রাজনৈতিক মতবাদ ও শাসনতান্ত্রিক পদ্ধতি, যা মূলত একটি আধিপত্যকামী বা হেজিমোনিক প্রকল্প।

প্রকৃতপক্ষে, কোনো বিষয় যখন ‘হেজিমোনিক’ বা আধিপত্যকামী হয়ে ওঠে, তখন আমরা এর বাইরে আর কিছুই চিন্তা করতে পারি না। এটি আমাদের মন ও চিন্তার জগতে এমনভাবে মিশে থাকে যে, একে প্রায় অদৃশ্য মনে হয়; আমরা এর অস্তিত্ব আলাদাভাবে টের পাই না, অথচ একে অবলম্বন করেই আমরা চলি এবং ভাবি। সুতরাং, তালাল আসাদ এখানে সেক্যুলারিজমকে একটি হেজিমোনিক এবং রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবেই ব্যবচ্ছেদ করেছেন।

​গ্রন্থের শেষ অংশে রয়েছে ‘সেক্যুলারাইজেশন’ প্রসঙ্গ। এখানে তিনি একটি কেস স্টাডির মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, সেক্যুলার লেন্স বা এই রূপান্তর প্রক্রিয়াটি মিশরে কীভাবে কার্যকর হয়েছে। বিশেষ করে, সেক্যুলারাইজেশনের ফলে মিশরের মতো রাষ্ট্রে আইন (Law) এবং নীতিবিদ্যার (Ethics) ধারণাগুলো কীভাবে পুনর্গঠিত বা ‘রিকনফিগার’ হয়েছে, সেই আলোচনা তিনি এখানে তুলে ধরেছেন।

​এই তিনটি অংশের প্রতিটি অধ্যায়ে যে শব্দটি বারবার ফিরে আসে, তা হলো— ‘নেশন স্টেট’ বা জাতি-রাষ্ট্র। সেক্যুলারিজমের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো একটি জাতি-রাষ্ট্র গঠন করা। অন্যভাবে বলা যায়, মডার্নিটির লক্ষ্যই হলো সেক্যুলারিজমের মাধ্যমে রাষ্ট্র বিনির্মাণ করা। অর্থাৎ, সেক্যুলারিজম মূলত একটি ‘স্টেট বিল্ডিং প্রজেক্ট’ বা রাষ্ট্র গঠনেরই একটি বিশেষ প্রক্রিয়া।

​বইটি সম্পর্কে এগুলোই প্রাথমিক কিছু কথা। তবে এর পাশাপাশি তালাল আসাদের পদ্ধতি সম্পর্কেও আমাদের সম্যক ধারণা থাকা প্রয়োজন। পুরো গ্রন্থে তিনি যে তাত্ত্বিক কাঠামো ব্যবহার করেছেন, তাকে আমরা ‘পোস্ট-স্ট্রাকচারালিস্ট’ বা উত্তর-কাঠামোবাদী পদ্ধতি হিসেবে অভিহিত করতে পারি।

এবার তালাল আসাদের পদ্ধতিগত কৌশল নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা যাক। তার আলোচনার পদ্ধতিকে বুঝতে হলে আমাদের আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষার সঙ্গে পরিচিত হতে হবে। তিনি যখন কোনো বিষয়ের ব্যাখ্যা দেন, তখন তিনি প্রধানত জিনিওলজিক্যাল বা জ্ঞানতাত্ত্বিক উৎস-সন্ধানী পদ্ধতি অনুসরণ করেন। আবার যখন কোনো ধারণা বা ‘কনসেপ্ট’ বিশ্লেষণ করেন, তখন তার দৃষ্টিভঙ্গি হয় নন-এসেনশিয়ালিস্ট (Non-essentialist)। মূলত এই জিনিওলজিক্যাল এবং নন-এসেনশিয়ালিস্ট—উভয় পদ্ধতিই তার উত্তর-কাঠামোবাদী (Post-structuralist) চিন্তাকাঠামোর অন্তর্ভুক্ত।

​এই গ্রন্থে তালাল আসাদ সেক্যুলারের কোনো প্রচলিত ইতিহাস কিংবা সমাজতাত্ত্বিক ইতিহাস বর্ণনা করেননি। এমনকি তিনি কেবল ‘আইডিয়া’ বা ধারণার ইতিহাস নিয়েও আলোচনা করেননি। বরং তার মূল লক্ষ্য হলো সেক্যুলার বা সেক্যুলারিজমের নেপথ্যে থাকা প্রচ্ছন্ন ধারণাগুলোকে উন্মোচন করা।

​এছাড়া উত্তর-কাঠামোবাদী পদ্ধতির একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি প্রথাগত দ্বৈতনীতি বা বাইনারি ডিভিশনকে অস্বীকার করে। আসাদও তার আলোচনায় এই বাইনারি বা দ্বিমুখী বিভাজনগুলোকে ভেঙে দিয়ে বিষয়গুলোকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন।

বইটির প্রায় প্রতিটি অধ্যায় জুড়েই আমরা এই পদ্ধতির প্রয়োগ দেখতে পাই। তালাল আসাদ কখনোই ধর্ম এবং সেক্যুলারিজমকে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে দাঁড় করান না। একইভাবে তিনি ইতিহাসের বিপরীতে মিথ, যুক্তির বিপরীতে কল্পনা, কিংবা পবিত্রতার (Sacred) বিপরীতে লৌকিকতাকে (Profane) উপস্থাপন করেন না। তিনি প্রথাগত এই দ্বিমুখী বা ‘বাইনারি’ বিভাজনগুলো ভেঙে দিয়ে দেখান যে, কীভাবে একটির ভেতর অন্যটি বিদ্যমান থাকে এবং এদের মধ্যে কোথায় অভিন্নতা রয়েছে। তার আলোচনায় কোনো ধরনের ‘ভ্যালু জাজমেন্ট’ বা মূল্যবোধগত বিচার থাকে না; তিনি কখনোই বলেন না যে যুক্তি ভালো নাকি কল্পনা, কিংবা ইতিহাস শ্রেয় নাকি ফিকশন। বরং তিনি কোনো একটি ধারণার গভীরে প্রবেশ করেন এবং তার সূক্ষ্ম অন্বেষণ করেন। তার চিন্তার মৌলিক পদ্ধতিই হলো কোনো বিষয়কে যথাযথভাবে শ্রেণিবদ্ধ ও সংজ্ঞায়িত করা।

​ক্যাটাগরি বা বর্গের প্রসঙ্গে বলতে গেলে—তার কাছে ধর্ম, অভিজ্ঞতা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, মিথ, কিংবা কাব্যিক সংবেদনশীলতা প্রতিটিই একেকটি স্বতন্ত্র বর্গ। একইভাবে মানুষ, অধিকার, পরিবার, জাতি-রাষ্ট্র, জাতীয়তাবাদ কিংবা ইসলামিজমকেও তিনি একেকটি ক্যাটাগরি হিসেবে গণ্য করেন। তিনি যখন কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন, তখন এই বর্গগুলোর ভেতরকার পারস্পরিক সম্পর্কগুলোকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। তার দৃষ্টিতে এই সম্পর্কগুলো সবসময় কেবল বৈপরীত্যমূলক বা রৈখিক নয়; বরং এগুলোর মধ্যে রয়েছে বহুস্তরীয় যুক্তি ও বাস্তবতা, যা তিনি তার লেখনীতে নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলেন।

এটি একটি নন এসেনশিয়ালিস্ট তথা উত্তর-কাঠামোবাদী পদ্ধতি, যেখানে প্রথাগত ‘বাইনারি’ ভেঙে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা হয়। আসাদ প্রধানত এই পদ্ধতিই অনুসরণ করেন। এর পাশাপাশি তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হলো জিনিওলজিক্যাল মেথড বা উৎস-সন্ধানী পদ্ধতি। গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়েই তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, তার মূল আগ্রহ হলো জিনিওলজিক্যাল পদ্ধতিতে চিন্তা করা।

​এখানে ‘জিনিওলজি’ বলতে কেবল প্রচলিত ইতিহাস বোঝায় না; বরং কোনো একটি ধারণা বা ‘কনসেপ্ট’ ঐতিহাসিকভাবে কীভাবে বিকশিত হয়েছে এবং বর্তমানের সাথে তার সম্পর্ক কী, সেটিই এর মূল আলোচ্য। এছাড়া কোনো ধারণার গভীরে যে প্রচ্ছন্ন অনুমান থাকে, জিনিওলজি তা-ও উন্মোচন করে। এই পদ্ধতিতে কোনো ধারণার বর্তমান অর্থ বিশ্লেষণের পাশাপাশি অতীতে বিভিন্ন সময়ে তার স্বরূপ কেমন ছিল, তা-ও খতিয়ে দেখা হয়।

​সুতরাং, জিনিওলজি হলো একটি নন-লিনিয়ার পদ্ধতিতে কোনো ধারণাকে ব্যবচ্ছেদ করা। এই পদ্ধতির গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বর্তমান ও অতীতের পারস্পরিক সম্পর্ক। এখানে বর্তমানকে ব্যবচ্ছেদের মাধ্যমে অতীতের শিকড় সন্ধান করা হয়। একইসাথে, কোনো নির্দিষ্ট বর্গের অর্থ উৎপাদনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এবং তৎকালীন সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিস্থিতি সেই বর্গটি গঠনে কীভাবে প্রভাব ফেলেছে—তালাল আসাদ সেই বিষয়গুলোকেও সামনে নিয়ে আসেন।

​এই পদ্ধতির মাধ্যমেই আমরা বুঝতে পারি একটি ধারণার বিকাশের নেপথ্যে সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট ঠিক কী ছিল এবং বর্তমানে তা কী অর্থ বহন করছে। উল্লেখ্য যে, এই পদ্ধতির গোড়াপত্তন করেছিলেন ফ্রেডরিক নিতশে, যা পরবর্তীতে মিশেল ফুকোর কাজের মাধ্যমে আরও বিস্তৃত ও জনপ্রিয় হয়।

তার আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো নন-এসেনশিয়ালিস্ট পদ্ধতি। ‘এসেনশিয়ালিজম’ বলতে মূলত এমন একটি প্রবণতাকে বোঝায়, যেখানে কোনো একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে কোনো জনগোষ্ঠী বা বিষয়ের অপরিহার্য ‘নির্যাস’ বা ‘সার’ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। এর ফলে ধরে নেওয়া হয় যে, ওই নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যটিই সংশ্লিষ্ট পুরো জনগোষ্ঠীর একমাত্র পরিচয় বা প্রতিনিধিত্বকারী সত্য।

​উদাহরণস্বরূপ, যখন ঢালাওভাবে বলা হয়, “নোয়াখালীর মানুষ মানেই এমন,” কিংবা “মুসলমানরা সবাই একই ধাঁচের”—তখন মূলত এক ধরনের নেতিবাচক স্টেরিওটাইপিং করা হয়।

​তালাল আসাদ এই প্রচলিত ও সংকীর্ণ পদ্ধতিকে কঠোরভাবে পরিহার করেন। তিনি কাজ করেন নন-এসেনশিয়ালিস্ট পদ্ধতিতে। এর অর্থ হলো, তিনি কোনো বিষয় বা জনগোষ্ঠীকে একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে বা একক বৈশিষ্ট্যে আটকে রেখে ব্যাখ্যা করেন না। অর্থাৎ, তার বিশ্লেষণে জেনারালাইজেশন বা স্টেরিওটাইপিংয়ের কোনো স্থান নেই।

​সারসংক্ষেপে তার আলোচনার পদ্ধতি হলো— কোনো একটি বর্গ বা ক্যাটাগরিকে একক বৈশিষ্ট্যে সীমাবদ্ধ না করা; বরং বিভিন্ন স্তরে ও ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে সেটিকে পর্যবেক্ষণ করা। একইসঙ্গে সেই ক্যাটাগরির উদ্ভব ও বিবর্তনের নেপথ্যে থাকা সামাজিক ও ঐতিহাসিক কারণগুলো বিশ্লেষণ করা। মূলত এটিই তার ‘নন-এসেনশিয়ালিস্ট’ পদ্ধতির মূল বৈশিষ্ট্য।

​তার পদ্ধতিগত কৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘পাওয়ারফুল কোশ্চেন’ বা শক্তিশালী প্রশ্ন উত্থাপন করা। এই গ্রন্থের প্রতিটি প্রবন্ধেই আমরা তার এই প্রবণতা লক্ষ্য করি। যেমন— মানবাধিকার (Human Rights) নিয়ে আলোচনার শুরুতেই তিনি প্রশ্ন করেন, এই অধিকারে ‘মানুষ’ বলতে আসলে কাকে বোঝানো হচ্ছে? অর্থাৎ, ‘The Human in Human Rights’—এই সংজ্ঞায়িত মানুষটি আসলে কে? এভাবে তিনি প্রচলিত ধারণার মূলে প্রশ্ন ছুড়ে দেন।

​আসাদের বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের একটি বড় অংশ হলো প্রশ্ন করা। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, তার কাছে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেয়ে প্রশ্ন করাটাই বেশি জরুরি। কোনো একটি ভাবাদর্শ বা ‘আইডিয়া’র ভেতরে যদি কোনো ফাটল বা অসংগতি থাকে, তবে সেটি ধরিয়ে দেওয়াকেই তিনি তার প্রধান কাজ বলে মনে করেন। তার ভূমিকা কোনো রোগ নিরাময়কারী চিকিৎসকের নয়, বরং একজন রোগ নির্ণয়কারীর। তিনি কোনো সমাধান দেন না; বরং কোনো ধারণার গভীরে যদি কোনো খুঁত, ঘাটতি কিংবা লুকানো কোনো উদ্দেশ্য থাকে, তবে তিনি তা আমাদের সামনে উন্মোচিত করেন। কোনো সংজ্ঞার সীমাবদ্ধতা কিংবা অন্য কোনো লেন্স দিয়ে বিষয়টিকে দেখার যে সম্ভাবনা—তিনি সবসময় সেই দ্বারগুলো খুলে দেন।

​এবার আমরা বোঝার চেষ্টা করব তালাল আসাদ ‘সেক্যুলার’ ও ‘সেক্যুলারিজম’ বলতে আসলে কী বোঝাতে চেয়েছেন। যদিও গ্রন্থের বিভিন্ন স্থানে তিনি শব্দ দুটিকে ক্ষেত্রবিশেষে প্রায় সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করেছেন, তবে শুরুতেই তিনি একটি সূক্ষ্ম বিভাজনরেখা টেনে দিয়েছেন। তার মতে, ‘দ্য সেক্যুলার’ (The Secular) হলো কয়েকটি বিষয়ের সমষ্টি— বিশেষ ধরনের আচরণ (Behavior), বিশেষ ধরনের জ্ঞান (Knowledge) এবং এক বিশেষ ধরনের সংবেদনশীলতা (Sensibility)। যখন এই আচরণ, জ্ঞান ও সংবেদনশীলতা আধুনিক জাতি-রাষ্ট্র বা আধুনিক সমাজকাঠামোতে একীভূত হয়, তখন তাকেই তিনি ‘দ্য সেক্যুলার’ হিসেবে অভিহিত করেন। অধিকাংশ সময় তিনি ‘দ্য সেক্যুলার’ নিয়ে আলোচনার ধারাবাহিকতায় ‘সেক্যুলারিজম’ প্রসঙ্গটি নিয়ে আসেন, কারণ তার মতে এই দুটি ধারণা অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।

তিনি কেবল নির্দিষ্ট কিছু বর্গের (category) সীমাবদ্ধতায় আটকে না থেকে বরং সংশ্লিষ্ট ও উদ্ভূত পরিভাষাগুলো—যেমন ‘সেক্যুলার’ থেকে ‘সেক্যুলারিজম’ এবং ‘সেক্যুলারিজম’ থেকে ‘সেক্যুলারাইজেশন’—পরস্পর মিশ্রিত বা সমন্বিত অবস্থায় বিভিন্ন সময়ে ব্যবহার করবেন। তিনি বলবেন যে, সেক্যুলারিজমের এই ধারণা আমাদের চিন্তা জগতকে এমনভাবে আমূল পরিবর্তন করে দিয়েছে যা আগে নজিরবিহীন ছিল। বিশেষ করে তিনটি ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন অত্যন্ত লক্ষণীয়: ধর্মের ধারণা, নীতিবিদ্যা এবং রাজনীতি। এই ক্ষেত্রগুলোতে সেক্যুলারিজম এমন কিছু নতুন ধারণার জন্ম দিয়েছে যা আগে বিদ্যমান ছিল না। এমনকি তিনি এটিও বলবেন যে, ‘রিলিজিয়ন’ বা ধর্ম নামক যে বর্গটি আমরা এখন চিনি, সেটি মূলত সেক্যুলারিজমেরই একটি উদ্ভাবন।

একটি ধর্ম বা ‘রিলিজিয়ন’ আসলে কেমন হবে, এর সংজ্ঞাই বা কী—কিংবা কোনটি ধর্ম আর কোনটি কেবল সংস্কৃতি—এই যে সংজ্ঞায়নের কাজ, এটি মূলত সেক্যুলারিজমই করে থাকে। আমরা সাধারণত শুনি যে, সেক্যুলারিজম রাষ্ট্র ও রাজনীতি থেকে ধর্মের একটি বিচ্ছেদ ঘটায়। কিন্তু তিনি বলবেন যে, সেক্যুলারিজমের কাজ কেবল এই বিচ্ছেদ ঘটানো নয়, বরং এর চেয়ে বড় কাজ হলো ‘উৎপাদন’ করা। অর্থাৎ, সেক্যুলারিজম ধর্মের এমন একটি নতুন ধারণা তৈরি বা উৎপাদন করে, যা আগে বিদ্যমান ছিল না।

​তিনি বলবেন যে, সেক্যুলারিজম অনেকগুলো বাইনারি বা দ্বিমুখী বিভাজনের মাধ্যমে কাজ করে এবং এটি নিজেই এমন অনেক বাইনারি উৎপাদন করে যা আগে এই রূপে ছিল না। যেমন একটি প্রধান বাইনারি হলো আইন (Law) এবং নৈতিকতা (Morality)। এটি মূলত একটি আধুনিক প্রপঞ্চ; কারণ প্রাক-আধুনিক যুগে, যেমন মধ্যযুগীয় ইসলাম বা খ্রিস্টীয় শাসন ব্যবস্থায় আইন ও নৈতিকতা এভাবে আলাদা ছিল না। সেখানে যা-ই আইন ছিল, তা-ই ছিল নৈতিকতা। আমাদের ফিকহ শাস্ত্রের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, নামাজের আলোচনা একইসাথে যেমন আইনের বিষয়, তেমনি নৈতিকতারও অংশ। এমনকি সম্পত্তির বন্টন কিংবা পবিত্রতা সংক্রান্ত আলোচনাগুলোও কেবল আইনি বিষয় নয়, বরং নৈতিকতা ও ফিকহ শাস্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রাক-আধুনিক সময়ে আইন ও নৈতিকতাকে আলাদা কোনো সত্তা হিসেবে দেখা যেত না, কিন্তু সেক্যুলারিজম এই দুইয়ের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে। সে দাবি করে যে, আইন হলো রাষ্ট্রের বিষয় আর নৈতিকতা হলো একান্তই ব্যক্তিগত বা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর বিষয়।

​এভাবে সেক্যুলারিজম আরও অনেকগুলো ভাগ তৈরি করে—যেমন মিথ ও ইতিহাস, কল্পনা ও যুক্তি, অতিপ্রাকৃতিক ও প্রাকৃতিক, সমাজ ও প্রকৃতি, কিংবা প্রকৃতি ও সংস্কৃতি। এই যে সবকিছুকে ভেঙে ভেঙে বাইনারি তৈরি করা, এটাই সেক্যুলারিজমের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তবে তিনি আরও বলবেন যে, আমরা আজ ধর্ম ও সেক্যুলারিজমকে যেভাবে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে আলোচনা করি, এই আলোচনার প্রেক্ষাপট বা আলাপটি নিজেই আসলে একটি সেক্যুলার ঘটনা।

এমনকি আমরা যখন ‘রিলিজিয়ন’ এবং ‘সেক্যুলার’ শব্দ দুটি আলাদাভাবে ব্যবহার করি, এই যে পার্থক্যকরণের প্রক্রিয়া—এটিও আসলে একটি সেক্যুলার ঘটনা। যেমন, ইসলামে যখন আমরা ‘দীন’ এবং ‘দুনিয়া’কে দুটি বিচ্ছিন্ন সত্তা হিসেবে আলাদা করে ফেলি, তখন এই আলাদা করার প্রবণতাটিই মূলত একটি সেক্যুলার প্রবণতা। সেক্যুলারিজম এভাবেই বিষয়গুলোকে ভাগ ভাগ করে আলোচনা করে।

​সেক্যুলারিজমের অন্যতম একটি লক্ষ্য হলো ‘নেশন স্টেট’ বা জাতিরাষ্ট্র। একটি নেশন স্টেট রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে যে মূলনীতি ব্যবহার করে, তা-ই হলো সেক্যুলারিজম। নেশন স্টেটের একটি প্রধান কাজ হলো সবকিছুকে বিভিন্ন ক্যাটাগরি বা বর্গে বিভক্ত করা। যেমন—কোনটি ফ্যামিলি, কোনটি রিলিজিয়ন আর কোনটি সেক্যুলারিজম—রাষ্ট্র এভাবে সীমানা নির্ধারণ করে দেয়। এছাড়া সে শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা যুদ্ধ বিগ্রহের মতো বিষয়গুলোকে আলাদা আলাদা সেক্টর বা জোনে ভাগ করে ফেলে, যাতে তার শাসন ও নিয়ন্ত্রণ করতে সুবিধা হয়। মূলত, এই যে বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত এবং সার্বভৌম ক্যাটাগরি তৈরি করা এবং একের পর এক বাইনারি উৎপাদন করা—এটাই সেক্যুলারিজমের শাসনকাঠামোর মূল কৌশল।

এই বর্গ বা বিভাগগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার যে প্রচেষ্টা, তা আমরা সেক্যুলারিজম এবং জাতিরাষ্ট্র—উভয় কাঠামোর মধ্যেই দেখতে পাই। অর্থাৎ, সেক্যুলারিজম কেবল ধর্মের সাথে রাষ্ট্রের বিচ্ছেদ ঘটায় না, বরং তার চেয়ে বড় কাজ হিসেবে এটি অনেকগুলো দ্বিমুখী বিভাজন বা বৈপরীত্য তৈরি করে।

​সহজে মনে রাখার সুবিধার্থে সেক্যুলারিজমের তৈরি করা এই বিভাজনগুলোর একটি তালিকা করা যেতে পারে। যেমন—এটি বিশ্বাস এবং যুক্তির মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে। এরই ধারাবাহিকতায় আসে ধর্ম এবং বিজ্ঞানের বিভাজন। এছাড়া এটি পুরান বা রূপকথা এবং যুক্তিগ্রাহ্য তত্ত্বর মধ্যে ফারাক করে দেয়। একইভাবে প্রাকৃতিক এবং অপ্রাকৃতিক বা অতিপ্রাকৃতিক বিষয়গুলোকেও এটি আলাদা করে ফেলে।

​তবে সেক্যুলারিজমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো জনপরিসর এবং ব্যক্তিগত পরিসরের মধ্যে পার্থক্য করা। এই কাঠামোতে রাজনীতিকে দেখা হয় একটি প্রকাশ্য বা জনপরিসরের বিষয় হিসেবে, আর ধর্মকে ঠেলে দেওয়া হয় একান্তই ব্যক্তিগত পরিমণ্ডলে। ধর্মকে এভাবে জনপরিসর থেকে সরিয়ে ব্যক্তিগত গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ করে ফেলা সেক্যুলারিজমের একটি অত্যন্ত মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ দিক।

সেক্যুলারিজমের একটি প্রধান কাজ হলো ধর্মকে ব্যক্তিগত গণ্ডিতে ঠেলে দেওয়া এবং রাজনীতিকে জনপরিসরে নিয়ে আসা। কিন্তু আমরা বাস্তবে দেখি, রাজনীতি ঠিকই মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে ঢুকে পড়ে। লেখক এখানে সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে কিছু মৌলিক প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি জিজ্ঞেস করছেন—আপনারা তো বললেন ধর্ম থাকবে ব্যক্তিগত পরিসরে আর রাজনীতি থাকবে জনপরিসরে; কিন্তু রাজনীতি যখন মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করে, আমাদের একান্ত পারিবারিক সম্পর্কের ওপর যখন রাষ্ট্র হাত দেয়—তখন কি সেটা প্রশ্নবিদ্ধ হবে না?

​তিনি আবারও পাল্টা প্রশ্ন করছেন—রাজনীতি যদি জনপরিসরের বিষয় হয়েও ব্যক্তিগত পরিসরে হস্তক্ষেপ করতে পারে, তবে ধর্ম ব্যক্তিগত পরিসরের বিষয় হওয়া সত্ত্বেও কেন জনপরিসরে আসতে পারবে না?

​এভাবেই তিনি তাঁর আলোচনার পদ্ধতিতে দেখিয়েছেন যে, সেক্যুলারিজম মূলত জীবনকে কতগুলো ভাগে ভাগ করে দেয়। একদিকে থাকে ব্যক্তিগত জীবন, অন্যদিকে জনপরিসর; একদিকে কল্পনা, অন্যদিকে বাস্তবতা; একদিকে নৈতিকতা, অন্যদিকে আইন। একইভাবে একদিকে থাকে রূপকথা বা মিথ, অন্যদিকে ইতিহাস; এবং একদিকে পবিত্রতা, অন্যদিকে লৌকিকতা। সেক্যুলারিজম এই বৈপরীত্যগুলো তৈরি করেই নিজের কাঠামো দাঁড় করায়।

তিনি এভাবে অনেকগুলো ক্যাটাগরি বা বর্গ নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, সেক্যুলারিজম যেসব দ্বিমুখী বিভাজন বা ‘বাইনারি’ তৈরি করে, তিনি এই বইয়ে তার কয়েকটিকে ব্যবচ্ছেদ করবেন। প্রকৃতপক্ষে, চাইলে পুরো বইটিকে এই বাইনারি আলোচনার মাধ্যমেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব এবং এটি আলোচনার জন্য বেশ চমৎকার একটি পদ্ধতিও হতে পারে।

যেমন ধরা যাক মিথ এবং ইতিহাসের কথা। আমরা কোন বিষয়কে ‘মিথ’ হিসেবে সাব্যস্ত করব? তিনি বলেন, মিথ মূলত সেক্যুলার চিন্তা জগতেরই একটি উৎপাদন। একটা সময় ইতিহাস ও মিথের মধ্যে এমন কোনো দেয়াল ছিল না; ইতিহাস যা ছিল, মিথও ছিল তারই অংশ। উদাহরণস্বরূপ, প্রাক-আধুনিক যুগে পবিত্র কুরআনকে কেবল আলাদাভাবে ইতিহাসের বই বা বিজ্ঞানের বই হিসেবে দেখা হতো না। এটি একইসাথে আইনের বই, আবার একইসাথে নৈতিকতারও উৎস। এই বিষয়গুলোকে আলাদা করার প্রবণতা মূলত আধুনিক যুগের দান।

বিশেষ করে যখন থেকে ‘বৈজ্ঞানিক ইতিহাস’ বা সাইন্টিফিক হিস্ট্রি লেখার প্রচলন হলো, তখন থেকেই ইতিহাসের সাথে মিথের বিচ্ছেদ ঘটল। এই নতুন ধারার ইতিহাসে ‘তথ্যগত নির্ভুলতা’ বা ফ্যাকচুয়াল একিউরেসি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ালো। অন্যদিকে, মিথের লক্ষ্য কখনোই কেবল বস্তুনিষ্ঠ তথ্য দেওয়া ছিল না; বরং মিথের কাজ ছিল এমন এক শক্তিশালী আদর্শ বা ভাব তুলে ধরা যা মানুষের আধ্যাত্মিকতা ও মনোজগতকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

কিন্তু সেক্যুলার ইতিহাসের কাজ হয়ে দাঁড়ালো স্রেফ তথ্যের সঠিকতা যাচাই করা। এই যে তথ্যনির্ভর সেক্যুলার ইতিহাস—এটিই কালক্রমে আমাদের আধুনিক জীবন এবং জাতিরাষ্ট্রের এক অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠল। এইভাবে সেক্যুলারিজম ইতিহাসকে তার নিজস্ব ছাঁচে ফেলে মিথ থেকে পুরোপুরি আলাদা করে দিয়েছে।

অথচ একসময় গল্পকথা, কাহিনী বা কাব্য—সবকিছুরই ইতিহাসের মতো মর্যাদা ছিল। কারণ এগুলো আমাদের মনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলত এবং জীবন ও জগত সম্পর্কে একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরত। কিন্তু আধুনিক যুগের বা সেক্যুলারিজমের আগমনে এই অখণ্ডতা ভেঙে যায় এবং শুরু হয় নানা রকম বিভাজন বা ‘বাইনারি উৎপাদন’। চার্লস টেলর যেটিকে ‘সেক্যুলার এজ’ বা সেক্যুলার যুগ বলছেন, এই যুগে এসেই বিজ্ঞান, যুক্তি কিংবা ইতিহাসকে একে অপরের থেকে আলাদা করে ফেলা হয়।

​তালাল আসাদ একটি চমৎকার উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন যে, ধ্রুপদী ইসলামী যুগে কুরআনের ভাষাকে আলাদা করে ‘পবিত্র ভাষা’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়োজন হতো না। এই যে আলাদা করে ‘পবিত্র’ (sacred) এবং ‘অপবিত্র’ বা ‘লৌকিক’ (profane) হিসেবে ভাগ করা—এটি মূলত একটি সেক্যুলার ঘটনা। সেক্যুলারিজমই এই বিভাজনটি তৈরি করে এবং তার প্রয়োজনে যে কোনো কিছুর সংজ্ঞাও বদলে দেয়। যা একসময় পবিত্র ছিল, তা অপবিত্র হয়ে যেতে পারে; আবার যা অপবিত্র ছিল, তা পবিত্র হিসেবে গণ্য হতে পারে।

​যেমন, একসময় চার্চ ছিল পবিত্রতার কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু চার্চ যখন তার প্রভাব হারাল, তখন পবিত্রতার সেই ধারণাটি বিলুপ্ত না হয়ে বরং রাষ্ট্রের ওপর স্থানান্তরিত হলো—যাকে বলা হয় ‘পবিত্রতার হিজরত’ বা মাইগ্রেশন অফ দ্য হোলি। চার্চের সেই অলঙ্ঘনীয় পবিত্রতা তখন গিয়ে ভর করল ‘সম্পত্তির অধিকার’-এর ওপর। জন লক যখন বলছেন যে সম্পত্তির অধিকার একটি পবিত্র অধিকার, তখন মূলত সেই পুরনো পবিত্রতার ধারণাই নতুন কাঠামোতে ফিরে এল।

​একইভাবে মানবসত্তার পবিত্রতার যে আধুনিক ধারণা, সেটিও সেক্যুলারিজমেরই একটি অংশ। ঈশ্বরের জায়গায় যখন মানুষকে বসানো হলো কিংবা চার্চের জায়গায় রাষ্ট্রকে আনা হলো—তার মানে এই নয় যে ঈশ্বর বা চার্চের ধারণা পুরোপুরি উধাও হয়ে গেল। বরং এখানে যা ঘটল তা হলো এক ধরনের স্থানান্তর বা রদবদল। কোনো কিছুই একেবারে চলে যায়নি; বরং এক ধরনের ‘রিক্রাফটিং’ বা পুনর্গঠনের মাধ্যমে পবিত্রতার পুরনো ধারণাগুলো নতুন নতুন জাগতিক বিষয়ে এসে আশ্রয় নিল।



তিনি বিখ্যাত আরব কবি আদোনিসের উদাহরণ টেনে বিষয়টি আরও চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। আদোনিস একজন ঘোষিত নাস্তিক এবং আধুনিক কবি। তিনি সরাসরি বলেন যে, তিনি কোনো ঈশ্বর বা অলৌকিক সত্তায় বিশ্বাস করেন না। বইটিতে তাঁর একটি দীর্ঘ ও সুন্দর উদ্ধৃতি রয়েছে, যেখানে তিনি বলছেন—তাঁর কাছে মানুষই সব, মানুষের চেয়ে বড় বা মহত্তর আর কিছু নেই।

​লেখক এখানে একটি সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ তুলে ধরছেন। তিনি বলছেন, আদোনিস যখন মানুষের ঊর্ধ্বে আর কিছু নেই বলে ঘোষণা করেন, তখন আসলে তিনি অজান্তেই মানুষের ‘দেবতায়ন’ ঘটিয়ে ফেলেন। অর্থাৎ, ঈশ্বরকে অস্বীকার করলেও তিনি মানুষের ওপর এক ধরনের দৈবত্ব বা অলৌকিক মহিমা আরোপ করছেন। তার মানে, এই যে নাস্তিক্যবাদ বা ধর্মহীনতার দাবি—এটিও ঘুরেফিরে কোনো না কোনোভাবে ধর্মেরই একটি বর্গের মধ্যে ঢুকে পড়ছে। মানুষকে যখন চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দাঁড় করানো হয়, তখন মানুষই আসলে সেই পুরনো ঈশ্বরের জায়গাটি দখল করে নেয়।

​এভাবেই লেখক দেখাচ্ছেন যে, পবিত্রতার ধারণাটি একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায় না, বরং তা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত বা ‘শিফট’ হয়।

​এর পাশাপাশি তিনি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন। তাঁর মতে, সেক্যুলারিজম নিজেকে এমন একটি ‘ভিত্তি’ বা ‘জমিন’ হিসেবে কল্পনা করে, যার ওপর দাঁড়িয়ে সমস্ত ধর্মীয় ধারণা তৈরি হয়। আমরা প্রায়ই বলে থাকি, “সবখানে ধর্মের কথা টেনে আনো কেন?” এই কথাটির মধ্যেই একটি গভীর সেক্যুলার দৃষ্টিভঙ্গি লুকিয়ে আছে। এটি বুঝিয়ে দেয় যে, আমরা ধরে নিচ্ছি আমাদের এই সাধারণ আলাপ-আলোচনা বা পরিসরটি হলো স্বাভাবিক ও মূল পরিসর (insider), আর ধর্ম হলো বাইরের কোনো আপদ (outsider)। অর্থাৎ, সেক্যুলারিজম নিজেকে একটি নিরপেক্ষ ও প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে গণ্য করে, যেখানে ধর্মের প্রবেশকে সে একটি ‘অনুপ্রবেশ’ বা ‘দখলদারি’ হিসেবে দেখে।

আসলে সেক্যুলারিজমের দৃষ্টিভঙ্গিটা এমন যে, এটি ধর্মকে জনপরিসরের বাইরের বিষয় হিসেবে গণ্য করে। এখান থেকেই প্রশ্ন ওঠে—”তুমি কেন সবখানে ধর্ম টেনে আনছ? ধর্মকে নিজের ব্যক্তিগত পরিসরে বা বাড়িতে রেখে এসো এবং আমার সাথে কেবল একজন ‘নাগরিক’ হিসেবে কথা বলো।”

​অর্থাৎ, সেক্যুলারিজম নিজেকে একটি নিরপেক্ষ ভিত্তি, মূল ভিত্তি বা ফাউন্ডেশন হিসেবে উপস্থাপন করে। এই কাঠামোর ভেতরে ধর্ম হলো একটি বহিরাগত উপাদান। সেক্যুলারিজম নিজেকে একমাত্র সত্য ও বাস্তব জ্ঞান হিসেবে দাবি করে এবং এর বাইরের অন্য সব চিন্তাকে, বিশেষ করে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে, এক ধরনের ‘বিভ্রান্তিকর চেতনা’ (False Consciousness) হিসেবে চিহ্নিত করে।

​মার্কসবাদী ঐতিহ্যে এই ‘ফলস কনশাসনেস’ শব্দবন্ধটি বহুল প্রচলিত। এর সহজ মানে হলো বাস্তবতার একটি বিকৃত উপস্থাপন। সেক্যুলার দৃষ্টিভঙ্গিতে মনে করা হয়, কেউ যদি কোনো বিশেষ আদর্শ বা ধর্ম দিয়ে জগতকে বিচার করে, তবে সে জগতের প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ রূপটি দেখতে পায় না। বরং সে একটি আচ্ছন্ন বা বিভ্রান্তিকর চশমা দিয়ে জগতকে দেখে। তাই তাদের মতে, ধর্ম দিয়ে জগতকে চেনা বা ব্যাখ্যা করা হলো এক প্রকার ‘বিভ্রান্তিকর চেতনা’, যা মানুষকে প্রকৃত বাস্তবতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। সেক্যুলারিজম নিজেকে সেই বিভ্রান্তিমুক্ত একমাত্র ‘শুদ্ধ’ ভিত্তি হিসেবে ঘোষণা করে।

তাহলে এই যে ‘সত্য চেতনা’ (True Consciousness) এবং ‘বিভ্রান্তিকর চেতনা’ (False Consciousness)—এই দুই ভাগে ভাগ করাও সেক্যুলারিজমের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী কৌশল। সেক্যুলারিজম নিজেকে একমাত্র বাস্তবসম্মত ও বস্তুনিষ্ঠ চেতনার আধার হিসেবে উপস্থাপন করে, আর ধর্মীয় চেতনাকে দাগিয়ে দেয় একটি অলীক বা মিথ্যা কল্পনা হিসেবে।

​এই গভীর ও জটিল বিষয়টি বুঝতে আমাদের সাহায্য করেন সাবা মাহমুদ এবং ওয়ায়েল হাল্লাক-এর মতো চিন্তাবিদগণ। বিশেষ করে হাল্লাক তাঁর ‘ইম্পসিবল স্টেট’ গ্রন্থে রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্বের প্রেক্ষাপটে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি সেক্যুলারিজমকে ব্যাখ্যা করেছেন ‘রাষ্ট্রের হাতে ঈশ্বরের মৃত্যু’ হিসেবে।

​এর মানে এই নয় যে জগত থেকে ঈশ্বরের অস্তিত্ব মুছে গেছে; বরং ঈশ্বর আগে যে সার্বভৌম জায়গাটি দখল করে থাকতেন, আধুনিক রাষ্ট্র সেই জায়গাটি দখল করে নিয়েছে। এখন রাষ্ট্রই হয়ে উঠেছে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতা। রাষ্ট্রই এখন আইন করে নির্ধারণ করে দেয় যে কোনটি ‘সংস্কৃতি’ হিসেবে গণ্য হবে আর কোনটি হবে ‘ধর্ম’। অর্থাৎ, আধ্যাত্মিক সার্বভৌমত্বের জায়গা দখল করে নিয়েছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সার্বভৌমত্ব। সেক্যুলারিজম মূলত এই রূপান্তরেরই নাম, যেখানে রাষ্ট্রই ঈশ্বরতূল্য ক্ষমতা নিয়ে সবকিছুর সংজ্ঞা নির্ধারণ করে।

তিনি অন্য একটি লেখায় দুটি বিশেষ ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন, যা এই বিষয়টি আরও পরিষ্কার করে দেয়। একটি ঘটনা ছিল জনপরিসরে ‘ক্রুশ’ ব্যবহার করা নিয়ে। ইতালীয় বা ফরাসি সমাজে যখন জনপরিসরে ধর্মীয় প্রতীক বহনের বিরোধিতা করা হলো—এই যুক্তিতে যে একটি সেক্যুলার রাষ্ট্রে এটি চলতে পারে না—তখন আদালত থেকে একটি চমৎকার রায় এলো। আদালত জানাল যে, ক্রুশ কোনো ধর্মীয় প্রতীক নয়, বরং এটি তাদের সংস্কৃতির অংশ। অর্থাৎ, ধর্মের গণ্ডি থেকে বের করে সেটিকে ‘সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে বৈধতা দেওয়া হলো।

​অন্যদিকে, হিজাব ব্যবহারের ক্ষেত্রে যখন অধিকারের প্রশ্ন তোলা হলো, তখন আবার আদালত ভিন্ন রায় দিল। সেখানে বলা হলো, হিজাব একটি ধর্মীয় প্রতীক। লক্ষ্য করার বিষয় হলো—কোনটি ‘সংস্কৃতি’ আর কোনটি ‘ধর্ম’, এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি কে দিচ্ছে? এই সিদ্ধান্ত দিচ্ছে সেক্যুলার জাতিরাষ্ট্র।

​এভাবেই রাষ্ট্র নিজের ইচ্ছেমতো সংজ্ঞায়ন করে কোনো বিষয়কে আপন করে নেয় (সংস্কৃতি বলে), আবার কোনোটিকে পর করে দেয় (ধর্ম বলে)। এই পুরো প্রক্রিয়ার মূলে রয়েছে সেক্যুলারিজম, যা আসলে জগত দেখার একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি। সেক্যুলারিজম প্রথমে একটি বিশেষ বিশ্ববীক্ষা চাপিয়ে দেয়, যা কিছু সুনির্দিষ্ট সমস্যার জন্ম দেয়। আবার অদ্ভুতভাবে, সেই সমস্যাগুলোর সমাধানের পথ হিসেবেও সেক্যুলারিজম নিজেকেই উপস্থাপন করে। অর্থাৎ, সেক্যুলার রাষ্ট্রই এখন চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ, যে নির্ধারণ করে দেয় নাগরিকের জীবনের কোন অংশটি ধর্মের আর কোনটি সংস্কৃতির।

এভাবেই তিনি সেক্যুলারিজমকে এমন একটি বর্গ হিসেবে তুলে ধরেছেন যা ধর্মের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে এবং কোনটি ধর্ম আর কোনটি ধর্ম নয়, তার সীমারেখা টেনে দেয়। শুধু তাই নয়, ধর্মের কোন অংশটুকু জনপরিসরে গ্রহণযোগ্য হবে, সেটিও সেক্যুলার রাষ্ট্রই ঠিক করে দেয়।

​রাষ্ট্র ধর্মের সেই অংশটিকেই উৎসাহ দেয় এবং জোরালোভাবে প্রচার করে, যা তার নিজস্ব লিবারেল বা উদারনৈতিক সেক্যুলার ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অর্থাৎ, ধর্মের যে রূপটি সেক্যুলার রাষ্ট্রের কাঠামোর সঙ্গে সংঘাত তৈরি করে না, রাষ্ট্র কেবল সেটিকেই প্রমোট করে। ধর্মের একটি ‘সহনশীল’ বা টলারেন্ট ভাবমূর্তি আমাদের সামনে উপস্থাপন করা হয় এবং বলা হয়—এটাই হলো ধর্মের ‘আসল’ বা খাঁটি রূপ। এমনকি আধুনিক সময়ে আমরা যে ‘সহি’ বা সঠিক ইসলামের তকমা দেখি, সেটিও অনেক ক্ষেত্রে একটি সেক্যুলার ধারণা। কোন ইসলামটি ঠিক আর কোনটি ঠিক নয়—এই বাছাই প্রক্রিয়াটি সেক্যুলার রাষ্ট্র তার নিজের স্বার্থেই করে থাকে।

​বইটির প্রথম অধ্যায়ে ‘এজেন্সি এবং পেইন’ (কর্তৃত্ব ও যন্ত্রণা) নামক একটি চমৎকার অংশ রয়েছে। লেখক এখানে যন্ত্রণার বা ব্যথার একটি বিশেষ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সাধারণভাবে মনে করা হয়, ‘পেইন’ বা যন্ত্রণা মানুষের কাজ করার ক্ষমতা বা এজেন্সিকে সংকুচিত করে দেয়। সেক্যুলারিজমের একটি বড় বয়ান হলো—ধর্ম মানুষকে যন্ত্রণা দেয়, ধর্ম রক্তাক্ত এবং সহিংস। বিশেষ করে মধ্যযুগীয় খ্রিস্টধর্মের যন্ত্রণাদায়ক ও টর্চার-নির্ভর ইতিহাসের কথা মাথায় রেখে এই ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। ফলে সেক্যুলারিজম এই প্রতিশ্রুতি দিয়েই হাজির হয়েছে যে, তার আগমনে সমাজে আর ধর্মীয় সহিংসতা, টর্চার বা যন্ত্রণার কোনো স্থান থাকবে না। সেক্যুলারিজম নিজেকে এই ব্যথামুক্ত আধুনিক জগতের ত্রাণকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করে।

সেক্যুলারিজমের দাবি ছিল এটি যন্ত্রণামুক্ত এক জগত তৈরি করবে। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখি, সেক্যুলারিজম আসলে নতুন ধরনের এবং আরও পরিশীলিত সহিংসতার জন্ম দিয়েছে; টর্চারের পদ্ধতিগুলো হয়েছে আরও সূক্ষ্ম। তার মানে যন্ত্রণা বা টর্চার সমাজ থেকে বিদায় নেয়নি, বরং তার কাঠামো বদলে গেছে মাত্র।

​’এজেন্সি এবং পেইন’ অধ্যায়ে লেখক এই বিষয়টি আরও গভীরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। সাধারণত ‘এজেন্সি’ বলতে আমরা বুঝি মানুষের সেই সক্ষমতাকে, যার মাধ্যমে সে স্বেচ্ছায় এবং স্বাধীনভাবে নিজের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে। সেক্যুলার দৃষ্টিভঙ্গিতে মনে করা হয়, যন্ত্রণা বা ‘পেইন’ মানুষের এই কাজ করার ক্ষমতাকে বা এজেন্সিকে খর্ব করে দেয়। কারণ আধুনিক সেক্যুলার জীবনের মূল লক্ষ্যই হলো যেকোনো মূল্যে যন্ত্রণা দূর করা। আমরা অসুস্থ হলে ব্যথানাশক ওষুধ খাই কারণ আমাদের ধারণা—ব্যথা থাকলে আমরা স্বাভাবিক কাজ করতে পারব না। অর্থাৎ, সেক্যুলারিজমের কাছে যন্ত্রণা মানেই হলো নেতিবাচক এবং তা বর্জনীয়।

​কিন্তু তালাল আসাদ এখানে একটি ভিন্ন ও বৈপ্লবিক চিন্তা তুলে ধরেছেন। তিনি দেখাচ্ছেন যে, যন্ত্রণাকে সবসময় নেতিবাচক হিসেবে দেখা ঠিক নয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি সন্তান জন্মদানের যন্ত্রণার কথা বলছেন। এই যে প্রসব বেদনা, এটি কোনো অর্থহীন কষ্ট নয়; বরং এই যন্ত্রণা নিজেই একটি ‘এজেন্সি’। কারণ এই যন্ত্রণা থেকেই একটি নতুন প্রাণের জন্ম হয়—এটি একটি উৎপাদনশীল বা সৃজনশীল যন্ত্রণা।

​একইভাবে তিনি শহীদের আত্মত্যাগের যন্ত্রণার কথা বলেন। এখানেও সেই যন্ত্রণা বা কষ্টটি কেবল একটি নিষ্ক্রিয় অনুভূতি নয়, বরং এটি নিজেই একটি সক্রিয় শক্তিতে বা ‘এজেন্সি’তে রূপান্তরিত হয়। অর্থাৎ, ধর্মীয় বা বিশেষ কিছু প্রেক্ষাপটে যন্ত্রণা কেবল মানুষকে থামিয়ে দেয় না, বরং নতুন কোনো মহত্তর কিছু অর্জনের পথ প্রশস্ত করে দেয়। এভাবে তিনি সেক্যুলারিজমের সেই একরৈখিক ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন যেখানে যন্ত্রণাকে কেবলই অগ্রগতির বাধা হিসেবে দেখা হতো।

এভাবেই তিনি দেখিয়েছেন যে, যন্ত্রণা (পেইন) এবং সক্ষমতা (এজেন্সি) সংক্রান্ত সেক্যুলার ধারণা আর ধর্মীয় জগতের ধারণা কতটা আলাদা। সেক্যুলারিজমের চশমায় আমরা যন্ত্রণাকে কেবলই বর্জনীয় এক বাধা হিসেবে দেখি, কিন্তু ধর্মীয় বর্গে যন্ত্রণার একটি ভিন্ন উৎপাদনশীল অর্থ থাকতে পারে।

এরপর বইটির তৃতীয় অধ্যায়—’দ্য সেক্যুলার’—অংশে তিনি টর্চার এবং সহিংসতা (ভায়োলেন্স) নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য তুলে ধরেন: আমরা সমাজ হিসেবে কিছু সহিংসতাকে বৈধ বলে মেনে নেই, আবার কিছু সহিংসতার তীব্র বিরোধিতা করি। উদাহরণস্বরূপ, শিল্পায়নের যুগে পশুপাখির ওপর যে অবর্ণনীয় সহিংসতা চালানো হয়, তা আমরা প্রায় গ্রাহ্যই করি না। মাংস বা দুধ উৎপাদনের জন্য আধুনিক শিল্প-কারখানায় পশুপাখিদের ওপর যেসব যান্ত্রিক ও নিষ্ঠুর পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয় (যেমন কেএফসি বা বড় বড় ডেইরি ফার্মের ক্ষেত্রে দেখা যায়), সেগুলো মূলত একটি অদৃশ্য সহিংসতা। সেক্যুলার যুগের এই নিয়মিত সহিংসতা আমাদের কাছে অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে গেছে এবং আমরা এর সুফল বা পণ্যগুলো হাসিমুখে ভোগ করি।

অথচ যখন ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে কোনো কোরবানি বা এই জাতীয় বিষয় আসে, তখন হঠাৎ করেই সহিংসতার প্রশ্নটি বড় করে তোলা হয়। লেখক মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, ইউরোপে জাতিরাষ্ট্র গঠনের ইতিহাস কিন্তু রক্তপাতহীন ছিল না। জাতিরাষ্ট্র গড়তে গিয়ে বা বিশ্বযুদ্ধের সময় যে ভয়াবহ ধ্বংসলীলা চলেছে, সেগুলোকে তথাকথিত ‘নেতিবাচক সহিংসতা’ হিসেবে ওভাবে তুলে ধরা হয় না। এগুলো মূলত সেক্যুলার সহিংসতা। এই রক্তপাত কোনো ধর্মের নামে হয়নি, বরং হয়েছে রাষ্ট্রের সীমানা রক্ষা, আধিপত্য বিস্তার এবং একাধিপত্য প্রতিষ্ঠার সাধনা থেকে।

অর্থাৎ, সেক্যুলার রাষ্ট্র তার নিজের প্রয়োজনে যে চরম সহিংসতা চালায়, সেটিকে সে ‘প্রয়োজনীয়’ বা ‘যৌক্তিক’ বলে বৈধতা দেয়। অথচ ধর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট সামান্য কিছুকেও সে ‘বর্বর’ বা ‘সহিংস’ হিসেবে দাগিয়ে দেয়। এভাবেই সেক্যুলারিজম সহিংসতার সংজ্ঞা নিজের সুবিধামতো পুনর্গঠন করে।

সেক্যুলারিজমের এই পুরো কাঠামোর ভেতরেই অসংখ্য অসংগতি ও স্ববিরোধিতা লুকিয়ে আছে। তালাল আসাদের আলোচনার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্যই হলো এই বৈপরীত্যগুলোকে জনসমক্ষে উন্মোচন করা।

তিনি তাঁর এই বইয়ে সেক্যুলারিজমকে সরাসরি কোনো একটি সংজ্ঞায় বেঁধে ফেলেননি। বরং তিনি এর বিভিন্ন রূপ, ছায়া এবং প্রকাশভঙ্গি বা ম্যানিফেস্টেশনগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁর পদ্ধতিটি অনেকটা ইনডিরেক্ট বা পরোক্ষ; তিনি সরাসরি বলতে চান না যে সেক্যুলারিজম ‘এই’, বরং তিনি দেখান যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে—যেমন এজেন্সি বা পেইনের ধারণায়—সেক্যুলারিজম কীভাবে কাজ করে।

যেমন, যন্ত্রণার (পেইন) বিষয়টি যদি আমরা দেখি, তবে প্রাক-আধুনিক ও আধুনিক যুগের মধ্যে এক বিশাল ব্যবধান চোখে পড়ে। খ্রিস্টধর্মে ‘সেলফ এফ্লিকশন’ বা নিজেকে কষ্ট দিয়ে আধ্যাত্মিক সাধনা করা এবং কৃচ্ছ্রসাধন করাকে পুণ্যের কাজ হিসেবে দেখা হতো। একইভাবে ইসলামের ইতিহাসে শহীদানরা যে যন্ত্রণা সহ্য করে মৃত্যুবরণ করতেন, সেই যন্ত্রণার একটি বিশেষ মর্যাদা ছিল। অর্থাৎ, প্রাক-আধুনিক বা আধুনিকতার আগের পর্বে যন্ত্রণা ছিল আধ্যাত্মিক উত্তরণ বা বিশেষ কোনো লক্ষ্যের মাধ্যম।

কিন্তু আধুনিক সেক্যুলার যুগে এসে যন্ত্রণার সেই মর্যাদা বা অর্থ হারিয়ে গেছে। আধুনিক জীবন যন্ত্রণাকে কেবলই একটি নিরর্থক কষ্ট হিসেবে দেখে, যা যে কোনো উপায়ে দূর করা প্রয়োজন। এভাবেই তিনি দেখিয়েছেন যে, ‘মডার্নিটি’ বা আধুনিকতা কীভাবে আমাদের মৌলিক অনুভূতিগুলোর সংজ্ঞা বদলে দিয়েছে।

যন্ত্রণা বা ‘পেইন’ আমাদের সামনে এক ভিন্ন মাত্রা ও ভিন্ন রূপ নিয়ে হাজির হয়। তিনি মূলত যন্ত্রণা, কর্তৃত্ব (এজেন্সি), এবং নিষ্ঠুরতা ও টর্চারের মতো ধারণাগুলো বিশ্লেষণ করার মাধ্যমেই সেক্যুলারিজমকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। আমাদের এই আধুনিকতায় বা সেক্যুলার যুগে এই মৌলিক ধারণাগুলোর এক ধরনের পুনর্গঠন বা ‘রিস্ট্রাকচারিং’ ঘটেছে।

​বইটির পরবর্তী অংশে মূলত তিনটি প্রধান বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে:

১. মানবাধিকারের মাধ্যমে মানুষের মুক্তি

২. ইউরোপে ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিসেবে মুসলিমদের অবস্থান।

৩. সেক্যুলারিজম, জাতিরাষ্ট্র এবং ধর্ম।

​মানবাধিকারের মাধ্যমে মানুষের মুক্তির যে ধারণা, সেখানে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন—আসলে এখানে কোন ধরনের ‘মানুষের’ কথা বলা হচ্ছে? এই ‘হিউম্যান’ বা মানুষের সংজ্ঞায়ন নিয়ে তিনি থমাস হবস এবং জন লকের রাজনৈতিক দর্শনের ব্যবচ্ছেদ করেছেন। তিনি আলোচনা করেছেন কীভাবে মানবাধিকারের বিশ্বজনীন ঘোষণা আমাদের চিন্তার জগতকে নিয়ন্ত্রণ করে।

​এই প্রসঙ্গে তিনি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সনদ ও ঘটনার উল্লেখ করেন; যেমন—ফরাসি বিপ্লব-পরবর্তী ঘোষিত ‘মানুষ ও নাগরিকের অধিকারের সনদ’, আমেরিকার ‘বিল অফ রাইটস’ এবং ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলিল, যেগুলো আধুনিক মানবাধিকারের ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

এখানে মূলত ‘বিল অফ রাইটস’-এর ভেতরে ‘রাইট’ ও ‘হিউম্যান’—এই দুটি ধারণা কীভাবে গড়ে উঠেছে, তা তিনি বিশ্লেষণ করেন। আলোচনার এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘হিউম্যান’ বলতে সেই সত্তাকেই বোঝায়, যার ‘ইনএলিয়েনেবল রাইটস’ বা অবিচ্ছেদ্য অধিকার রয়েছে। অর্থাৎ, এমন কিছু অধিকার যা মানুষের সঙ্গে জন্মগতভাবে যুক্ত এবং যা কোনোভাবেই তার থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না।

তার ভাষায়, যার এই অবিচ্ছেদ্য অধিকার রয়েছে, সেই-ই প্রকৃত অর্থে ‘হিউম্যান’।

এছাড়া, তিনি আরও উল্লেখ করেন যে ‘হিউম্যান’ ধারণার সঙ্গে ‘ফ্রিডম’ বা স্বাধীনতার ধারণাটিও নিবিড়ভাবে যুক্ত। সে সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক ছিল—স্বাধীনতা কি ‘সম্পত্তি’ হিসেবে বিবেচিত হবে, নাকি নয়। এখানে ‘সম্পদ’ ও ‘সম্পত্তি’র মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে।

যারা স্বাধীনতাকে ‘সম্পত্তি’ হিসেবে দেখতেন, তারা এক ধরনের মতাদর্শের প্রতিনিধিত্ব করতেন এবং ঐতিহাসিকভাবে দাসপ্রথার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। বিপরীতে, যারা স্বাধীনতাকে সম্পত্তি হিসেবে মানতেন না, তারা ভিন্ন এক বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন।

কারণ, যদি ‘ফ্রিডম’ বা স্বাধীনতাকে সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে তা কেনাবেচার যোগ্য হয়ে ওঠে। সম্পত্তি হলে যেমন তা ক্রয়-বিক্রয় করা যায়, তেমনি স্বাধীনতাকেও লেনদেনযোগ্য ভাবা সম্ভব হয়। এই যুক্তির ভিত্তিতেই দাসপ্রথা গড়ে ওঠে—যেখানে মানবের স্বাধীনতাকেই এক ধরনের সম্পত্তি হিসেবে ধরে নেওয়া হয়, ফলে দাস রাখা ও বিক্রি করা বৈধ বলে প্রতীয়মান হয়। এ বিষয়ে দর্শনশাস্ত্রে বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে।

পাশ্চাত্য জগতে ন্যাশনাল স্টেটের ধারণার একটি দিক হলো—দাস রাখা বা দাসপ্রথা মূলত দাস-মালিকের স্বাধীনতার চর্চা হিসেবে বিবেচিত হতো। অর্থাৎ, দাস রাখার অধিকারকেই তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অংশ হিসেবে দেখা হতো।

এই প্রসঙ্গে Ugly Freedoms নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের উল্লেখ করা যায়, যার লেখক এলিজাবেথ অ্যাঙ্কার। তিনি ওয়েন্ডি ব্রাউন-এর অধীনে পিএইচডি গবেষণা করেছেন। বইটিতে ‘আগলি ফ্রিডম’ ধারণার মাধ্যমে এই বিতর্কটি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

এখানে ‘আগলি ফ্রিডম’ বলতে মূলত দাস-মালিকের স্বাধীনতাকেই বোঝানো হয়েছে। যখন একজন দাস-মালিক দাস রাখে, তখন সে তার স্বাধীনতাকে বাস্তবায়ন করছে—এই ধারণাই সেখানে প্রতিষ্ঠিত। এর ফলে এমন একটি বিভাজন তৈরি হয়, যেখানে কিছু মানুষকে ‘দাস হওয়ার উপযুক্ত’ হিসেবে দেখা হয়, আর অন্যদের ‘সভ্য’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ফলে, যারা নিজেদের ‘সভ্য’ মনে করত, তারা দাসদের ‘সভ্য করে তোলা’র দায়িত্ব নিজেদের ওপর আরোপ করত। এইভাবে ‘হিউম্যান’ বা মানবের যে বিশেষ ধারণাটি গড়ে ওঠে, তা আসলে উপনিবেশবাদ ও দাসপ্রথা-এর ওপর নির্ভরশীল।

এমনকি, কিছু ঐতিহাসিক আলোচনায় দেখা যায়—উপনিবেশবাদকে দাসপ্রথার তুলনায় কিছুটা ‘সহনীয়’ বা ‘উন্নততর’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কারণ, দাসপ্রথায় ব্যক্তিকে সম্পূর্ণভাবে মালিকানার অধীন করা হয়, যেখানে উপনিবেশবাদের ক্ষেত্রে একটি জাতি বা সমাজের ওপর সামষ্টিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা হয়। ইতিহাসে উপনিবেশবাদ ‘civilizing mission’ বা ‘সভ্যতা দানের মিশন’-এর ধারণার মাধ্যমে নিজেকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে, যা অনেক সময় দাসপ্রথার তুলনায় ‘ভাল’ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সেক্যুলার ধারণায় ‘হিউম্যাননেস’ বা মানবিকতার প্রশ্ন। এখানে ব্যক্তি বাস্তবে মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হলেও, তাত্ত্বিকভাবে এই মানবিকতাকেই ‘ডিগনিটি’ বা মর্যাদা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অর্থাৎ, এটি এক ধরনের ‘স্যাক্রেড’ বা পবিত্র ধারণা—যা রক্ষা করা আবশ্যক।

এছাড়া, ইউরোপের বিভিন্ন বিপ্লব—যেমন আমেরিকান বিপ্লব এবং ফরাসি বিপ্লব—মানবাধিকারের সুরক্ষা ও প্রতিষ্ঠার দাবিকে জোরদার করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, কলোনিয়ালিজম, এনস্লেভমেন্ট এবং সেক্যুলারিজম—এই তিনটি প্রবণতা একটি নির্দিষ্ট ‘হিউম্যান’ ধারণার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেক্যুলারিজম মানুষের পরিচয় নির্ধারণ করে ‘রেশনাল’ (যুক্তিসম্পন্ন) ও ‘অটোনোমাস’ (স্বাধীন) সত্তা হিসেবে। এই ধারণার ভিত্তিতেই রাষ্ট্র ও আইনের কাঠামো নির্মিত হয়—যেখানে ধরে নেওয়া হয়, মানুষ সম্ভাব্যভাবে অপরাধপ্রবণ, তাই আইন প্রয়োজন; কিন্তু একই সঙ্গে মানুষ যেহেতু যুক্তিসম্পন্ন, তাই সে সেই আইন মেনে চলতেও সক্ষম।

সেক্যুলার সকল প্রতিষ্ঠান মূলত এই অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে যে মানুষ স্বাধীন ও যুক্তিনির্ভর। এই ধারণাই এনলাইটেনমেন্ট-এর মূল ভিত্তি, যা ব্যক্তির অধিকার ও মানবাধিকারের ধারণার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ‘হিউম্যান রাইটস’ বলতে এখানে সেই অধিকারগুলোকে বোঝানো হয়, যা একজনকে পূর্ণাঙ্গ ‘মানুষ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার শর্ত তৈরি করে।

তিনি আরও আলোচনা করতে গিয়ে ‘সিভিল রাইটস’ ও ‘হিউম্যান রাইটস’-এর মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরেন। উদাহরণ হিসেবে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র-এর কথা উল্লেখ করা যায়, যিনি যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গদের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে আন্দোলন করেছিলেন—অর্থাৎ, রাষ্ট্রের ভেতরেই সমান অধিকার নিশ্চিত করার দাবি তুলেছিলেন।

অন্যদিকে ম্যালকম এক্স যুক্তি দেন যে কেবল সিভিল রাইটস যথেষ্ট নয়; বরং প্রয়োজন ‘হিউম্যান রাইটস’। তার মতে, কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর যে নিপীড়ন চলছে, তা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; বরং এটি একটি বৈশ্বিক মানবাধিকার ইস্যু। তাই এই প্রশ্নকে জাতিংসংঘ-এর মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে উত্থাপন করা প্রয়োজন। যদি বিষয়টি জাতিসংঘে তোলা যায়, তাহলে এশিয়া, আফ্রিকা এবং বিশ্বের অন্যান্য অ-পশ্চিমা জনগোষ্ঠী এই দাবির পক্ষে অবস্থান নেবে। এর মাধ্যমে কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকারকে একটি সার্বজনীন মানবাধিকার প্রশ্ন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।

সেক্যুলার যুগে হিউম্যান রাইটসকে কেন্দ্র করে নানা রকম ইন্টারভেনশন, ডিহিউমাইজেশন, নানা তত্ত্ব এবং আন্তর্জাতিক আইন প্রবর্তিত হয়েছে। এটাকেই তিনি বলছেন সেক্যুলারিজম।

একদম শেষ চ্যাপ্টারে তিনি ইজিপ্টের প্রসঙ্গ আনবেন। সেখানে শরিয়া কোড ছিল, মিক্সড কোড ছিল, ধীরে ধীরে শরিয়া কোডগুলো সেক্যুলার ল দ্বারা, ইউরোপিয়ান ল দ্বারা রিপ্লেস হচ্ছিল। স্টেট ল এবং প্রাইভেট ল নিয়ে বিতর্ক হচ্ছিল। ১৯৫৫ সালে জামাল আব্দুল নাসের সময় ডুয়াল কোড ভেঙে যায়। শরিয়া কোর্টের কাজ সমাপ্ত হয়।

তিনি বলছেন, ল এবং এথিক্স রিকনফিগারেশন হলো প্রথম উপনিবেশিক শক্তির কাজ। মিশরে ভূমি আইন, সিভিল আইন, ক্রিমিনাল ল ধীরে ধীরে বদলানো হয়। জুডিশিয়াল সিস্টেমকে ন্যাশনাল স্টেটের কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা হয়, বুরোক্রেটাইজেশন হয়। রাষ্ট্র ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ঘটে।

শরিয়া আইনগুলোকে প্রান্তিক করে রাষ্ট্র তার ক্ষমতা সংহত করে। আরবান এলিট ইউরোপিয়ান আইনের প্রতি মুগ্ধ হয়। তারা আইনগুলোর পক্ষে কথা বলে। এভাবেই সেক্যুলারাইজেশন হয়। এর পেছনে কলোনাইজারদের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ।

তাদের দেশ যেভাবে কাজ করে সেই অভিজ্ঞতা মিশরর তারা প্রয়োগ করে। যেমন আমাদের এখানে ওয়াকফ ছিল একটা বড় সম্পদ—ধার্মিক ধনী মুসলিম ব্যক্তিগণ তাদের বেশিরভাগ সম্পদ ওয়াকফ করতেন। কিন্তু ইউরোপে দেখা যায় চার্চ ল্যান্ড দখল করত, একচ্ছত্র করত, ল্যান্ডকেন্দ্রিক দুর্নীতি করত। তো ওরা যখন ইজিপ্টে আসে তখন ভাবে ওয়াকফও একই রকম—একটা দুর্নীতির জায়গা। সুতরাং ওরা চার্চের ল্যান্ড যেভাবে ট্যাকেল করেছে, সেভাবেই মিশরে ওয়াকফ ল্যান্ডকে বদলাতে শুরু করল। এরপর জুডিশিয়াল সিস্টেমেও ব্যাপক পরিবর্তন আনল। এভাব মিশরে আইন পরিবর্তনের মাধ্যমে এক ধরনের সেক্যুলারাইজেশন শুরু হলো।

এখানে এথিক্সের প্রসঙ্গটি সামনে আসে। চ্যাপ্টারের শেষদিকে আলোচনা কেন্দ্রীভূত হয় ফ্যামিলি ও ন্যাশন-স্টেটকে ঘিরে। পুরো বইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ থিম হলো—ন্যাশনাল স্টেট ফ্যামিলিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়, তবে সেই ফ্যামিলির একটি নির্দিষ্ট রূপকে প্রাধান্য দেয়: মনোগ্যামাস নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি। অর্থাৎ একক বিবাহ, ছোট পরিসরের পরিবার—যেখানে যৌথ পরিবারের ধারণা নিরুৎসাহিত, এবং সন্তানের সংখ্যাও সীমিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। কখনো বলা হয় দুই সন্তান যথেষ্ট, আবার কখনো এমন মনোভাব তৈরি করা হয় যেন অন্যের তুলনায় পিছিয়ে পড়ার অনুভূতি না জন্মায়।

এইভাবে ফ্যামিলিকে নিয়ন্ত্রণ করা ন্যাশনাল স্টেটের একটি মৌলিক কাজ হিসেবে হাজির হয়। কারণ রাষ্ট্র মূলত আইন নিয়ে কাজ করে, আর ফ্যামিলি কাজ করে নৈতিকতা নিয়ে। নৈতিকতার চর্চা মূলত পরিবারকেন্দ্রিক। ফলে রাষ্ট্র একদিকে ফ্যামিলির গুরুত্ব স্বীকার করে, অন্যদিকে সেটিকে নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ করে। ফ্যামিলি থাকবে, নৈতিকতা চর্চা করবে—কিন্তু কেমন ফ্যামিলি হবে, তা নির্ধারণ করবে রাষ্ট্র।

এ কারণেই ডিভোর্সের নিয়ম, বিয়ের বিধান, ন্যূনতম বিবাহের বয়স—এসবই রাষ্ট্র দ্বারা নির্ধারিত হয়। অর্থাৎ আমাদের সবচেয়ে ব্যক্তিগত ও অন্তরঙ্গ ক্ষেত্রেও রাষ্ট্র প্রবেশ করে। এর ফলে আমাদের নৈতিকতাকেও একধরনের সমরূপতা-এর মধ্যে আনার চেষ্টা দেখা যায়।

প্রচলিত ধারণা হলো—ধর্ম মানুষের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে। কিন্তু তালাল আসাদসহ অনেক চিন্তাবিদ দেখিয়েছেন, সেক্যুলার রাষ্ট্র যে মাত্রায় মানুষের স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ ও বিন্যস্ত করে, ইতিহাসে তার তুলনা খুব কমই দেখা যায়।

​বিদেশে যেতে হলে দেখা যায়—নিজের আইডি কার্ড, পাসপোর্ট, বার্থ সার্টিফিকেট, ডেথ সার্টিফিকেট—সবই আজ নথিবদ্ধ। প্রতিটি অফিসে কাগজপত্র, দীর্ঘ প্রক্রিয়া, ফর্ম ফিলাপ, নানা ডিপার্টমেন্ট আর ফাংশন—পুরো ব্যবস্থাটাই আজ আমলাতান্ত্রিক। এই আধুনিক জাতিরাষ্ট্র আমাদের স্বাধীনতাকে নানা দিক থেকে সংকুচিত করে ফেলেছে, যা প্রাক-আধুনিক যুগে এমন ছিল না।

​তবে লেখক এখানে ‘আগে খারাপ ছিল আর এখন ভালো’ অথবা ‘আগে ভালো ছিল আর এখন খারাপ’—এমন কোনো সরল বাইনারি বা দ্বৈতনীতিতে বিশ্বাস করছেন না। তিনি মূলত দেখাচ্ছেন কীভাবে একটি অন্টোলজিক্যাল রূপে এই জিনিসগুলো গঠিত হয়েছে। তিনি এর ভেতরের বৈপরীত্য বা কন্ট্রাডিকশনগুলো সামনে আনছেন। যেমন, সেক্যুলার লাইফ আমাদের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সেই স্বাধীনতার ধারণার পেছনে কাজ করছে এনলাইটেনমেন্ট, রেনেসাঁর হিউম্যানিজম আর হেগেলের হিস্ট্রি থিওরির মতো কিছু ইউরোপীয় কনসেপ্ট।

​হেগেল বলেছিলেন, ইতিহাস এক যৌক্তিক প্রক্রিয়ায় এগিয়ে চলে; রাষ্ট্র হলো সেই রিজনিং প্রসেসের চূড়ান্ত রূপ এবং আমাদের রাজনৈতিকতার মূল লক্ষ্যই হলো স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতাই সমস্ত রাজনৈতিক তত্ত্বের কেন্দ্রীয় আলোচনার বিষয়।

​সাধারণত বলা হয় ধর্ম আমাদের স্বাধীনতাকে খর্ব করে, কিন্তু আধুনিক জাতীয়তাবাদ কী করছে? আধুনিক জাতীয়তাবাদ মানুষের স্বাধীনতাকে যতটা শৃঙ্খলিত বা কনস্ট্রেইন করছে, ইতিহাসে অন্য কিছু সম্ভবত তা করেনি। এই পাওয়ার এক্সারসাইজ বা ক্ষমতার চর্চা বোঝাতে লেখক মিশেল ফুকোকে টেনে এনেছেন। ফুকো ক্ষমতার তিনটি ধরনের কথা বলেছেন—সোভরিন পাওয়ার, ডিসিপ্লিনারি পাওয়ার আর বায়ো পাওয়ার।

​সোভরিন পাওয়ার মানে হলো রাজা বা সার্বভৌম শক্তি, যিনি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। জনসম্মুখে বেত্রাঘাত বা শাস্তির ব্যবস্থা করাই ছিল এই সোভরিন পাওয়ারের বহিঃপ্রকাশ।
ডিসিপ্লিনারি পাওয়ার হলো মূলত নজরদারি ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ—যেমন জেলখানা, যেখানে দেহটাকে আটকে রাখা হয়। এখানে ‘প্যানঅপটিক’ধারণার মতো উপর থেকে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করা হয়; অর্থাৎ এক অদৃশ্য দৃষ্টির নিয়ন্ত্রণ ও নজরবন্দীর মাধ্যমে মানুষকে নির্দিষ্ট নিয়মের জালে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে ফেলা হয়।

​অন্যদিকে বায়োপাওয়ার কাজ করে আরও গভীরে। এখানে রাষ্ট্র সরাসরি জনগণের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জন্মহার—সবকিছুর দেখাশোনা বা ‘কেয়ার’ করার আড়ালে মূলত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। বিভিন্ন নীতিমালার মাধ্যমে নাগরিকদের এমনভাবে গড়ে তোলা হয় যেন তারা ‘ডোসাইল’ বা অনুগত হয়ে ওঠে। স্কুল, ইউনিভার্সিটি বা নির্দিষ্ট সিলেবাসের মাধ্যমে ঠিক করে দেওয়া হয়—কী পড়া যাবে আর কী যাবে না। ইতিহাসের একটি বিশেষ পাঠ্য বা বয়ান তৈরি করা হয়, যা পাঠ করে এমন এক নাগরিক গোষ্ঠী তৈরি হয় যারা রাষ্ট্রের প্রতি অবিচল আনুগত্য রাখবে।

​এর ফলে তৈরি হচ্ছে একটি ‘ডোসাইল বডি’ বা অনুগত শরীর এবং ‘লয়াল সিটিজেনশিপ’। এই মেকানিজমের মাধ্যমেই আধুনিক রাষ্ট্র—বিশেষ করে সেক্যুলার ন্যাশনাল স্টেট তার কার্যক্রম পরিচালনা করে। অর্থাৎ, আগে যে কাজটি ধর্ম করত, এখন সেটিই করছে রাষ্ট্র—শুধু ধরন বা প্যাটার্ন বদলে গেছে। ভিন্ন এক প্যাকেজে একই ধরনের ক্ষমতার চর্চা চলছে।

​এই আলোচনার রেশ ধরেই তিনি শেষ অধ্যায়ে প্রবেশ করেছেন—ইউরোপে মুসলিম ধর্মীয় সংখ্যালঘু প্রসঙ্গ নিয়ে। অধ্যায়ের শুরুতেই তিনি বলেছেন: মুসলমানরা ইউরোপে একই সঙ্গে উপস্থিত আবার অনুপস্থিত।

​কারণ, ইউরোপ তার নিজের যে পরিচয় বা ধারণা নির্মাণ করেছে, সেখানে মুসলমানদের জন্য কোনো প্রকৃত জায়গা রাখা হয়নি। মুসলমানদের কি আদৌ ইউরোপীয় পরিচয়ের মধ্যে রিপ্রেজেন্ট করা সম্ভব?—তিনি মূলত এই প্রশ্নটি নিয়েই চুলচেরা বিশ্লেষণ করবেন। এই প্রশ্নের সূত্র ধরেই তিনি দেখাবেন—আসল ইউরোপ মানে কী, ইউরোপীয় আইডেন্টিটি বা সত্তা কীভাবে গঠিত হয়েছে এবং এই বিশেষ ‘নির্মাণ’ বা কনসেপ্টটি পৃথিবীর সামনে কীভাবে হাজির করা হয়েছে।

এখানে তিনি দেখাবেন যে, ইউরোপীয় সভ্যতার সাথে ইউরোপীয় পরিচয়ের যে গভীর সম্পর্ক, তাতে মুসলমানরা মূলত একটি বহির্ভূত বা ‘এক্সটার্নাল’ শক্তি। ইউরোপীয় পরিচয়ের মূল ভিত্তিই হলো ইউরোপীয় সভ্যতা। ফলে মুসলমানরা যতই ইউরোপে বসবাস করুক না কেন, তারা কখনোই পুরোপুরি ‘ইউরোপীয়’ হয়ে উঠতে পারবে না। কারণ, ইউরোপীয় হওয়াটা কেবল কোনো ভূখণ্ডে বা টেরিটোরিতে বসবাসের বিষয় নয়; বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট ‘আইডেন্টিটি’ বা পরিচয়। ইউরোপ কোনো ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা নয়, এটি একটি বিশেষ সভ্যতা।

​তিনি অন্য একজনের বরাতে বলবেন যে, এই ইউরোপীয় সভ্যতা মূলত কয়েকটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ-এর মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। যেমন: রোমান এম্পায়ার, খ্রিস্টানিটি এবং এনলাইটেনমেন্ট। এগুলোই হলো ইউরোপীয় সভ্যতার প্রধান উপাদান ও মূল নির্যাস।

​মজার ব্যাপার হলো, মুসলিম অভিবাসীরা এই রোমান এম্পায়ার, খ্রিস্টানিটি কিংবা এনলাইটেনমেন্ট—এই ঐতিহাসিক পর্যায়গুলোর মধ্য দিয়ে আসেনি। যেহেতু মুসলমানরা এই সভ্যতার মৌলিক উপাদানের অংশ ছিল না, তাই তারা এই সভ্যতার অন্তর্ভুক্তও হতে পারে না। আর যেহেতু ইউরোপীয় পরিচয় সরাসরি এই সভ্যতার সাথে যুক্ত, তাই মুসলমানরা শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয় হিসেবে গণ্য হয় না। কারণ, ইউরোপীয় সভ্যতার কাঠামোটিই তৈরি হয়েছে মুসলমানদের বাদ দিয়ে।

​এই কাঠামোটি বড়জোর মুসলমানদের ‘সহ্য’ করার কথা বলে। এখানে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট আনবেন—ইউরোপীয়দের কাছে বিষয়টি হলো ‘সহাবস্থান’। অর্থাৎ, তাদের চিন্তাটা অনেকটা এমন যে—‘আমরা’ এবং ‘ওরা’ (us and them) এর মধ্যে বড়জোর একটি সহাবস্থান সম্ভব হতে পারে, কিন্তু একীভূত হওয়া নয়।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, মুসলিম এবং ইউরোপীয়দের মধ্যে বড়জোর একটি সহাবস্থান হতে পারে, যেখানে ‘আমরা’ এবং ‘তারা’—এই বিভাজন বজায় রেখেই একে অপরকে সহ্য করে থাকা হবে। মজার বিষয় হলো, ইউরোপের লিবারেল (উদারপন্থী) এবং এক্সট্রিম রাইট (চরম ডানপন্থী)—উভয় পক্ষই এই একটি জায়গায় একমত যে: মুসলমানরা ইউরোপীয় পরিচয়ের জন্য পুরোপুরি একটি বহিরাগত বা ‘এক্সটার্নাল’ সত্তা। তাদের মধ্যে মূল বিতর্কটা কেবল এইটুকুই যে—এই মুসলমানদের আসলে ঠিক কতটুকু সহ্য করা হবে, অর্থাৎ ‘আদার’ বা অন্যদের প্রতি টলারেন্সের মাত্রাটা কতটুকু হবে।

​এভাবেই গড়ে উঠেছে ইউরোপীয় আইডেন্টিটি। এখানে লেখক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পার্থক্য দেখিয়েছেন—একটি হলো Idea of Europe (ইউরোপের ধারণা), আর অন্যটি হলো Narrative of Europe (ইউরোপের বয়ান)। এই ইউরোপীয় আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করার জন্যই একটি নির্দিষ্ট বয়ান বা ন্যারেটিভ তৈরি করতে হয়েছে।

​ইউরোপের এই ‘আইডিয়া’র মধ্যে ভূগোলের একটি বিশেষ রাজনীতি আছে। যেমন রাশিয়ার কথা ধরা যাক; ভৌগোলিক অবস্থান সত্ত্বেও রাশিয়াকে ইউরোপের কাছে সবসময় মার্জিনাল বা প্রান্তিক মনে করা হয়। আবার তালাল আসাদ স্পেনের একটি চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন। বর্তমান ভৌগোলিক মানচিত্রে স্পেন ইউরোপের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু যখন সেখানে মুসলিম শাসন ছিল, অর্থাৎ সেই ‘আরব স্পেন’ বা মুসলিম ইউরোপকে কখনোই ইউরোপের অংশ হিসেবে মেনে নেওয়া হতো না।

​বর্তমানে স্পেনকে ইউরোপের অংশ ভাবা হলেও আরও এমন অনেক অঞ্চল আছে, যেগুলোকে ইউরোপ তার নিজের অংশ বলে মনে করে না। অর্থাৎ, ইউরোপের এই ‘আইডিয়া’ বা ধারণাটি এমনভাবেই নির্মাণ করা হয়েছে, যার পরতে পরতে রয়েছে অন্যকে বাদ দেওয়া বা খারিজ করে দেওয়ার মতো বর্জনমূলক উপাদান। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই মূলত ঠিক করা হয় কারা ‘ইউরোপীয়’ আর কারা ‘বহিরাগত’।

সুতরাং তিনি এই মৌলিক প্রশ্নটিই তুলছেন—ইউরোপে বসবাসরত মুসলিমরা কি তাদের মুসলিম সত্তা বজায় রেখে যথাযথভাবে প্রতিনিধিত্ব পেতে পারবে? এখানে ‘নাগরিক অধিকার’ আর ‘পরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকা’ এক বিষয় নয়। নাগরিক অধিকার মানে কেবল রাষ্ট্রের একজন বৈধ সদস্য হওয়া। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন মানুষ কি কেবল একজন ‘সিটিজেন’ হয়েই থাকবে, নাকি তার মুসলিম পরিচয় নিয়েও সেখানে পূর্ণভাবে বিকশিত হতে পারবে?

​তালাল আসাদ মূলত এই জটিল প্রশ্নগুলোকেই আমাদের সামনে নিয়ে আসেন। আগেই বলা হয়েছে, তিনি সরাসরি উত্তর দেওয়ার চেয়ে প্রশ্ন নির্মাণ করাকেই নিজের প্রধান কাজ মনে করেন। আমরা সংক্ষেপে তাঁর এই বইটি নিয়ে আলাপ করলাম, যদিও এর প্রতিটি অধ্যায় এতই গভীর যে দীর্ঘ আলোচনার দাবি রাখে। বিশেষ করে বইটির প্রতিটি প্যাসেজে এমন সব সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ আছে যা আমাদের প্রথাগত চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ করে।

​আমাদের সামগ্রিক আলোচনায় আমরা দেখেছি—সেক্যুলারিজম কীভাবে ধর্মকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে একটি নির্দিষ্ট পণ্য হিসেবে ‘বাজারজাত’ করে এবং বাস্তবতাকে নানা দ্বৈততায় বিভক্ত করে ফেলে। পাশাপাশি, আমরা আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের (National State) সেই সর্বগ্রাসী চরিত্রকেও দেখেছি, যেখানে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রই রাষ্ট্রের তীক্ষ্ণ নজরদারির ভেতরে থাকে।

​সবশেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকট সামনে এসে দাঁড়ায়: ইসলামের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক ঠিক কী হওয়া উচিত?

​এই বিষয়ে মুহাম্মাদ আসাদ তাঁর ‘Between Religion and Politics’ গ্রন্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাঁর মতে, বর্তমান ইসলামপন্থীদের একটি বড় অংশ আধুনিক ন্যাশনাল স্টেটের বিদ্যমান কাঠামোর ভেতরেই ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চায়। অর্থাৎ, রাষ্ট্রের কাঠামোটি আগের মতোই থাকে, কেবল তার ভেতরে ইসলামের কিছু বিষয় সংযোজন করা হয়। কিন্তু মুহাম্মাদ আসাদ দেখাচ্ছেন, এভাবে প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা প্রকৃত অর্থে ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ হয়ে ওঠে না; বরং তা আধুনিক ন্যাশন-স্টেট হিসেবেই থেকে যায়।

​যদি ইসলামকে কেবল একটি ‘ধর্মীয় অনুষঙ্গ’ হিসেবে রাষ্ট্রের ভেতরে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তবে সার্বভৌমত্ব শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের হাতেই থেকে যায়—আল্লাহর সার্বভৌমত্ব সেখানে মুখ্য থাকে না। কারণ, যখন বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাস বা মতাদর্শের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়, তখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করে রাষ্ট্র নিজেই। এর ফলে ধর্ম কার্যত রাষ্ট্রের একটি অধীনস্থ বিষয়ে পরিণত হয়।

​ন্যাশনাল স্টেটের এই কাঠামোর মধ্যে ইসলামকে খাপ খাওয়ানোর যে সংকট, এটিই হলো বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জ—যা আসাদ গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।

এখানেই আজকের আলোচনা সমাপ্ত করছি। ধৈর্যসহকারে পড়ার জন্য আপনাদের আন্তরিক ধন্যবাদ।

আসসালামু আলাইকুম।


Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles
দর্শনপাশ্চাত্যবাদপ্রাচ্যবাদসমসাময়িক বিশ্লেষণ

সেক্যুলার রাষ্ট্রকাঠামোয় শিক্ষা ও চেতনার নিয়ন্ত্রণকৌশল

দর্শন•April 11, 2026দর্শনপাশ্চাত্যবাদপ্রাচ্যবাদসমসাময়িক বিশ্লেষণসেক্যুলার রাষ্ট্রকাঠামোয় শিক্ষা ও চেতনার নিয়ন্ত্রণকৌশলআসিফ আদনান•70 min read18ViewsFacebookXWhatsApp18...

মডার্নিটি

সভ্যতার ধ্বংস ও বিকাশের নেপথ্য অনুঘটক

মডার্নিটি•April 5, 2026মডার্নিটিসভ্যতার ধ্বংস ও বিকাশের নেপথ্য অনুঘটকখালিদ মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ•71 min read264ViewsFacebookXWhatsApp264...

পাশ্চাত্যবাদমডার্নিটিসমসাময়িক বিশ্লেষণ

আধুনিকতা কি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে আরোও ধার্মিক করে তুলছে?

পাশ্চাত্যবাদ•April 4, 2026পাশ্চাত্যবাদমডার্নিটিসমসাময়িক বিশ্লেষণআধুনিকতা কি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে আরোও ধার্মিক করে তুলছে?রিফাহ তাসফিয়াহ...

দর্শনমডার্নিটিসমসাময়িক বিশ্লেষণ

মহাবিশ্বের উৎপত্তি নিয়ে কুরআনের বর্ণনা কি আজও প্রাসঙ্গিক?

দর্শন•March 30, 2026দর্শনমডার্নিটিসমসাময়িক বিশ্লেষণমহাবিশ্বের উৎপত্তি নিয়ে কুরআনের বর্ণনা কি আজও প্রাসঙ্গিক?শাহেদ হাসান•50...