দর্শনপাশ্চাত্যবাদপ্রাচ্যবাদসমসাময়িক বিশ্লেষণ

সেক্যুলার রাষ্ট্রকাঠামোয় শিক্ষা ও চেতনার নিয়ন্ত্রণকৌশল

Share
Share
দর্শনApril 11, 2026

সেক্যুলার রাষ্ট্রকাঠামোয় শিক্ষা ও চেতনার নিয়ন্ত্রণকৌশল

শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করতে গেলেই একটি বিখ্যাত উক্তি অবধারিতভাবে চলে আসে— ‘নলেজ ইজ পাওয়ার’।

এই উক্তিটি কার, তা কি আমাদের জানা?

‘জ্ঞানই শক্তি’—বিখ্যাত এই কথাটি সপ্তদশ শতাব্দীর ব্রিটিশ দার্শনিক ও রাষ্ট্রনায়ক ফ্রান্সিস বেকনের। তিনি ইউরোপীয় বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন। উক্তিটি মূলত তার হলেও বর্তমানে তা একটি ‘গণকথায়’ পরিণত হয়েছে। কোনো মহৎ কথা যখন সব মানুষ গ্রহণ করে নেয়, তখন তা আর লেখকের একার থাকে না; বরং সর্বজনীন হয়ে যায়। ফ্রান্সিস বেকনের এই দর্শনটি আজ সারা বিশ্বে একইভাবে সমাদৃত।

আমরা সচরাচর ‘নলেজ ইজ পাওয়ার’-এর একটি নির্দিষ্ট অর্থ ধরে নিই। নিজেদের ভাবনার জগৎ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমাদের মাথায় এর একটি ফ্রেম তৈরি হয়ে আছে। যেমন: জ্ঞানের আলো মানুষকে আলোকিত ও শক্তিশালী করে; শিক্ষা উন্নয়নের হাতিয়ার; যার যত বেশি জ্ঞান, সে তত বেশি এগিয়ে যাবে; কিংবা বাঁচতে হলে জানতে হবে। মূলত জ্ঞানের এই ইতিবাচক দিকগুলোকেই আমরা এর প্রচলিত অর্থ হিসেবে বুঝে থাকি।

তবে এই উক্তিটির প্রচলিত অর্থই একমাত্র নয়; এর গভীরে আরও নিগূঢ় কিছু ব্যঞ্জনা রয়েছে। জনমানসে উক্তিটি সমাদৃত হওয়ার ফলে সময়ের সাথে সাথে এর নানাবিধ ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছে। এই ব্যাখ্যাগুলোর কয়েকটি দিক আমাদের গভীরভাবে তলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

যেমন—যদি বলা হয় ‘জ্ঞানই শক্তি’, তবে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে: এই শক্তি অর্জনের উপায় কী? আর এই শক্তি আসলে অর্জন করবে কে? ধরা যাক, আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রচুর বই পড়লাম, পরীক্ষায় সফল হলাম কিংবা উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করলাম—এতে কি আমি প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী হতে পারলাম? উত্তর হলো, না। ব্যক্তিগত পাণ্ডিত্যই যথেষ্ট নয়। শক্তির প্রকৃত রূপান্তরের জন্য সমাজে সেই জ্ঞানের বিস্তার ঘটাতে হয়। জ্ঞানের সামাজিকীকরণ বা প্রসার ছাড়া যূথবদ্ধ শক্তি অর্জন করা সম্ভব নয়।

এ পর্যায়ে আরও কিছু মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—সমাজে আপনি ঠিক কোন ধরণের জ্ঞান প্রতিষ্ঠা করবেন? কোন বিষয়টিকে ‘জ্ঞান’ হিসেবে চিহ্নিত করা হবে আর কোনটি ব্রাত্য থাকবে? অর্থাৎ, জ্ঞানের সংজ্ঞা বা সীমানা কে নির্ধারণ করবে? জ্ঞানের এই আধিপত্যবাদী চরিত্র এবং এর পরিসীমা নির্ধারণের বিষয়টি বর্তমানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

এত প্রশ্ন উত্থাপনের কারণ হলো—শক্তি বা ক্ষমতা নিয়ে সমাজে সর্বদা সংঘাত লেগেই থাকে। কিন্তু জ্ঞান নিয়ে কি কোনো সংঘাত হয়? উত্তর হলো—হ্যাঁ, হয়। জ্ঞানের এই লড়াই সচরাচর দৃশ্যমান না হলেও এটি অত্যন্ত প্রভাবশালী। এই লড়াইয়ে যিনি জয়ী হন, তার হাতে একচ্ছত্র ক্ষমতা চলে আসে। কারণ, সমাজে মানুষ কী শিখবে এবং কতটুকু জানবে—তা তখন তিনিই নিয়ন্ত্রণ করেন। আর চিন্তা বা জ্ঞানের এই পরিসীমা নির্ধারিত হয়ে গেলে সাধারণ মানুষ সেই গণ্ডির ভেতরেই ভাবতে শুরু করে। এটি একটি বিশাল মনস্তাত্ত্বিক ক্ষমতা, যা নিয়ে সামনে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

মূলত শিক্ষাব্যবস্থায় সাম্রাজ্যবাদের প্রভাবই এই লেখার মূল উপজীব্য। তবে বিষয়টি আমরা একটু ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করব; তা হলো—জ্ঞান, শিক্ষা ও ক্ষমতার পারস্পরিক সম্পর্ক এবং আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রে এর কার্যকারিতা। যেহেতু পুরো আলোচনায় ‘নলেজ ইজ পাওয়ার’ ধারণাটি বারবার ফিরে আসবে, তাই এই দীর্ঘ ভূমিকার অবতারণা।

শুরুতেই কিছু সহজ প্রশ্ন দিয়ে শুরু করা যাক। যেমন:

  • পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গের নাম কী?
  • মাউন্ট এভারেস্ট।
  • মাউন্ট এভারেস্ট কত সালে আবিষ্কৃত হয়েছে?
  • উত্তর জানা নেই? কোনো সমস্যা নেই।
  • আমেরিকা মহাদেশ কে আবিষ্কার করেছেন?
  • কলম্বাস।
  • কত সালে?
  • এটি হয়তো পেরেছেন।
  • ভারতে আসার সমুদ্রপথ কে আবিষ্কার করেছিলেন?
  • ভাস্কো দা গামা।
  • কখন?
  • এবার কি আটকে গেলেন?
  • অস্ট্রেলিয়া কে আবিষ্কার করেছেন?
  • জেমস কুক।
  • কত সালে?

এই প্রশ্নগুলো নিয়ে একটু গভীরভাবে ভাবুন। এখানে একটি মৌলিক সমস্যা আছে যা আমরা সচরাচর এড়িয়ে যাই। সমস্যাটি আসলে প্রশ্নগুলোর ‘ফ্রেমিং’ বা কাঠামোতে। প্রশ্নগুলো এমনভাবে সাজানো যেখানে আপনি শুরুতেই ধরে নিচ্ছেন যে, একটি নির্দিষ্ট পক্ষই কেবল এই স্থান বা বিষয়গুলো আবিষ্কার করেছে। উদাহরণস্বরূপ, যখন প্রশ্ন করা হয়—‘মাউন্ট এভারেস্ট কে আবিষ্কার করেছেন বা এটি কবে আবিষ্কৃত হয়েছে?’, তখন এর পেছনের দৃষ্টিভঙ্গিটি খেয়াল করা জরুরি।

উত্তর হলো ১৮৫৬ সাল। ব্রিটিশ সার্ভেয়ার অ্যান্ড্রু ওয়াহ যখন ভারত উপমহাদেশ জরিপ করছিলেন, তখন তিনি এই পর্বতশৃঙ্গটি শনাক্ত করেন এবং এটিকে সর্বোচ্চ চূড়া হিসেবে অভিহিত করে একটি নাম দেন।

এখন প্রশ্ন হলো—নেপাল বা তিব্বতের স্থানীয় মানুষ কি মাউন্ট এভারেস্টকে চিনতেন না? তবে তিনি কীভাবে এটি ‘আবিষ্কার’ করলেন? আসলে ব্রিটিশদের আগে আর কোনো ইউরোপীয় এটি দেখেনি; কিন্তু স্থানীয় মানুষ তো যুগ যুগ ধরে এটি দেখে আসছে। তাদের কাছে এটি নতুন কোনো আবিষ্কার ছিল না। অথচ প্রচলিত বয়ান অনুযায়ী, ব্রিটিশরা যখন এটি দেখল, তখনই তা ‘আবিষ্কার’ হিসেবে গণ্য হলো।

নামকরণের বিষয়টি আরও কৌতূহল উদ্দীপক। এই পর্বতচূড়ার নাম রাখা হলো ‘মাউন্ট এভারেস্ট’—ব্রিটিশ সার্ভেয়ার জর্জ এভারেস্টের নামানুসারে, যিনি নিজে জীবনে কখনো এই পাহাড়টি দেখেননি! আজও আমরা সেই নামেই একে চিনি। অথচ তিব্বত ও নেপালের মানুষের দেওয়া নিজস্ব নাম আগে থেকেই ছিল। নেপালিরা একে বলত ‘সাগরমাথা’ আর তিব্বতিদের দেওয়া একটি প্রাচীন নামও ছিল (চুমোলুংমা)। যারা হাজার বছর ধরে সেখানে বসবাস করছে, তাদের দেওয়া নামগুলো গুরুত্ব পেল না; বরং প্রতিষ্ঠিত হলো একজন ব্রিটিশের নাম।

অন্যান্য উদাহরণগুলোও একই ধাঁচের। বলা হয়, ১৪৯২ সালে কলম্বাস ‘আমেরিকা আবিষ্কার’ করেছেন। এর আগে কি সেখানে কিছুই ছিল না? অবশ্যই ছিল। ইনকা ও অ্যাজটেক সভ্যতায় কোটি কোটি মানুষ সেখানে বসবাস করত। কিন্তু ইউরোপীয়রা যখন সেখানে পৌঁছাল, ঠিক তখনই তা ‘আবিষ্কার’ হিসেবে নথিবদ্ধ হলো। এর আগে যেন সেটির কোনো অস্তিত্বই ছিল না।

একইভাবে বলা হয়, ভাস্কো দা গামা ভারতে আসার সমুদ্রপথ আবিষ্কার করেছেন। অথচ শত শত বছর ধরে আরব, পারস্য এবং ভারতীয় ব্যবসায়ীরা এই পথ ব্যবহার করে আসছিলেন। তিনি ছিলেন প্রথম ইউরোপীয় যিনি এই পথে ভারতে আসেন, কিন্তু কৃতিত্ব দেওয়া হলো ‘আবিষ্কারের’। জেমস কুকের অস্ট্রেলিয়া ‘আবিষ্কারের’ (১৭৭০ সাল) গল্পটিও অভিন্ন। সেখানে তখন লক্ষ লক্ষ মানুষের বসবাস থাকলেও ইউরোপীয়দের পা রাখার পরই তা মানচিত্রে ‘আবিষ্কৃত’ স্থান হিসেবে জায়গা করে নিল।

বিষয়টি কি আপনি ধরতে পারছেন? এই পুরো প্রক্রিয়াটিই আসলে ক্ষমতার সমীকরণ।

অর্থাৎ, তারা ইউরোপীয়দের মধ্যে প্রথম যারা এই কাজটি করেছেন; কিন্তু বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন মানবজাতির ইতিহাসে তাদের আগে আর কেউ তা জানত না। এখানে মূল সমস্যাটি হলো ‘ফ্রেমিং’-এ—যেখানে ইউরোপীয়দের অবস্থানকেই সমগ্র মানবজাতির অবস্থান হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হয়।

এর অন্তর্নিহিত অর্থ দাঁড়ায়: ইউরোপ যদি না জানে, তবে তা বাস্তব নয়; ইউরোপ যদি না দেখে, তবে তা আবিষ্কৃত হয়নি; আর ইউরোপ যদি নাম না দেয়, তবে বস্তুটির আগের কোনো অস্তিত্বই নেই। ইউরোপ যখন কোনো বিষয়কে চিনে নেয়, তখনই তা ‘জ্ঞান’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়; তার আগ পর্যন্ত তা যেন কেবলই এক অজানা অন্ধকার। ইউরোপের জানার আগে কোটি কোটি মানুষ তা জানলেও তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক মূল্য নেই। এখানে ইউরোপই হলো সত্যের মানদণ্ড এবং পশ্চিম বিশ্বই হলো মাপকাঠি। বাস্তবতা ও জ্ঞান বিচারের এই একপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গিকেই বলা হয় ‘ইউরোসেন্ট্রিক বায়াস’ (Eurocentric Bias) বা ‘ইউরোসেন্ট্রিজম’; সহজ বাংলায় যা ‘ফিরিঙ্গি-কেন্দ্রিকতা’।

আরেকটি চমৎকার উদাহরণ হলো বিশ্বমানচিত্র। বর্তমানে আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে যে মানচিত্র দেখি, তা মূলত ১৫৬৯ সালে ইতালীয় মানচিত্রকর জেরার্ডাস মার্কেটারের তৈরি করা একটি ফরম্যাট—যাকে বলা হয় ‘মার্কেটার প্রজেকশন’ (Mercator Projection)। এই মানচিত্রগুলো লক্ষ্য করলে দেখবেন, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকাকে তুলনামূলক অনেক বড় করে দেখানো হয়, আর আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা ও এশিয়াকে দেখানো হয় ছোট করে।

উদাহরণস্বরূপ, এই ম্যাপে গ্রিনল্যান্ডের আয়তন আফ্রিকার প্রায় সমান দেখায়। অথচ বাস্তবে গ্রিনল্যান্ডের আয়তন মাত্র ২ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার, আর আফ্রিকার আয়তন প্রায় ৩০ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার—অর্থাৎ আফ্রিকা গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে ১৫ গুণ বড়! এটি সেই দৃষ্টিভঙ্গিরই এক চাক্ষুষ প্রতিফলন।

সমস্যাটি কেবল মানচিত্রের ত্রুটিপূর্ণ অঙ্কনে নয়, বরং এর পেছনের মানসিকতায়। এর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে এই বার্তা দেওয়া হয় যে—ইউরোপই পৃথিবীর কেন্দ্র। ইউরোপ গুরুত্বপূর্ণ, তাই মানচিত্রে তার আকৃতি বড়; আর এশিয়া বা আফ্রিকার গুরুত্ব কম, তাই তা ছোট দেখালেও ক্ষতি নেই। এর পক্ষে অনেকে জ্যামিতিক যুক্তি দেখালেও মূল পক্ষপাতটি কিন্তু স্পষ্ট। মজার ব্যাপার হলো, এর বিপরীতে ‘গ্যাল-পিটারস প্রজেকশন’-এর মতো আরও নিখুঁত মানচিত্র থাকলেও আমরা সেগুলো ব্যবহার করি না।

 এই উদাহরণগুলো থেকে বর্তমান বিশ্বের এক রূঢ় বাস্তবতা ফুটে ওঠে। আমরা যখনই ‘জ্ঞান’কে সংজ্ঞায়িত করতে যাই, অজান্তেই ইউরোপীয় ফ্রেমওয়ার্কের ভেতর বন্দি হয়ে পড়ি। আমাদের অবচেতন মন মেনে নিয়েছে—‘ইউরোপ যা ঠিক করে দেয় তা-ই জ্ঞান; যা তাদের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ, তা-ই সত্য এবং বিশ্বজনীন। ইউরোপই যেন সবকিছুর আদি উৎস বা সূচনাবিন্দু।’

এই সংকীর্ণ চিন্তা আপনার শিক্ষা, রাজনীতি, উন্নয়ন ভাবনা এবং সমাজ সম্পর্কে ধারণাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। পশ্চিমা লেন্স দিয়ে পৃথিবীকে দেখার ফলে দুটি বড় সমস্যা তৈরি হয়: ১. আপনি পশ্চিমা চিন্তাধারাকে ‘সর্বজনীন’ এবং ‘ধ্রুব সত্য’ হিসেবে বিনা প্রশ্নে মেনে নিচ্ছেন। ২. পশ্চিমের বাইরের বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারকে আপনি অপ্রাসঙ্গিক বা তুচ্ছ জ্ঞান করে নাকচ করে দিচ্ছেন।

আসলে জ্ঞান উৎপাদন কিংবা নামকরণ কখনোই নিরপেক্ষ নয়; এর পেছনে সবসময় কোনো না কোনো শক্তিশালি পক্ষের এজেন্ডা বা দৃষ্টিভঙ্গি গেঁথে থাকে। যে পক্ষ জ্ঞানের সংজ্ঞা ও সীমানা নির্ধারণ করে দেয়, সে আপনার ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে। ‘নলেজ ইজ পাওয়ার’ বা ‘জ্ঞানই শক্তি’র এটি এক গভীর ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যা।

এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে। তবে উপরে আলোচিত উদাহরণ বা প্রশ্নগুলোর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ একাডেমিক গবেষণা ও তাত্ত্বিক বিতর্ক। এখানে আলোচনার খাতিরে বিষয়টিকে কিছুটা সহজবোধ্য আকারে উপস্থাপন করা হয়েছে মাত্র।

এ প্রসঙ্গে গত শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী চিন্তাবিদ ও সাংস্কৃতিক সমালোচক এডওয়ার্ড সাইদের নাম উল্লেখ করা জরুরি। ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘ওরিয়েন্টালিজম’ (Orientalism) উত্তর-উপনিবেশবাদী (Post-colonial) তত্ত্বের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে।

বইটিতে সাইদ দেখিয়েছেন, পশ্চিমা বিশ্ব কীভাবে প্রাচ্যকে—বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বকে—উপস্থাপন করে। এই উপস্থাপনার সাথে ক্ষমতা, শাসন এবং নিয়ন্ত্রণের এক গভীর যোগসূত্র রয়েছে। সাইদের মতে, জ্ঞানকে আমরা নিরপেক্ষ মনে করলেও তা সবসময় নিরপেক্ষ হয় না। পশ্চিমা রাজনৈতিক এজেন্ডা, বিশেষ করে উপনিবেশবাদ ও আধুনিক সাম্রাজ্যবাদের সাথে তাদের জ্ঞান উৎপাদনের একটি সুনিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বের বিশ্বদখল ও নিয়ন্ত্রণের যে প্রকল্প, তাকে বৈধতা দিতেই পশ্চিমা জ্ঞানচর্চা কাজ করেছে। অর্থাৎ, তাদের তৈরি করা জ্ঞান মূলত শাসন, আগ্রাসন ও দখলদারিত্বকে যৌক্তিক প্রমাণ করার হাতিয়ার। এই ধারা আজও ফুরিয়ে যায়নি; আগে যা ‘ওরিয়েন্টালিজম’ নামে চলত, আজ তা ‘কাউন্টার-টেরোরিজম স্টাডিজ’, ‘ইসলামিক স্টাডিজ’ কিংবা এমনকি ‘ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ’-এর মোড়কেও হাজির হতে পারে।

এডওয়ার্ড সাইদ জ্ঞানের একটি মৌলিক বিভাজন করেছেন—পিউর নলেজ (বিশুদ্ধ জ্ঞান) এবং পলিটিক্যাল নলেজ (রাজনৈতিক জ্ঞান)।

‘পিউর নলেজ’ বা বিশুদ্ধ জ্ঞান হলো অনেকটা গাণিতিক ধ্রুবকের মতো; যেমন— ‘২+২=৪’। এই সত্যটি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার নয়। কিন্তু ‘পলিটিক্যাল নলেজ’ বা রাজনৈতিক জ্ঞান সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই জ্ঞানের মূল উদ্দেশ্যই হলো বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রকল্প বা আধিপত্যকে নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে বৈধতা দেওয়া।

এর সবচেয়ে প্রকট উদাহরণ হলো ওরিয়েন্টালিজম বা প্রাচ্যবাদ। এখানে প্রাচ্যকে একটি সুনির্দিষ্ট ছাঁচে উপস্থাপন করা হয়। পশ্চিমা বিশ্ব নিজেকে চিত্রিত করে উন্নত, প্রগতিশীল, সভ্য এবং গণতান্ত্রিক হিসেবে; অন্যদিকে প্রাচ্যকে দেখানো হয় অনুন্নত, পশ্চাৎপদ এবং অসভ্য হিসেবে। এই কৃত্রিম বৈষম্য তৈরির লক্ষ্যই হলো প্রাচ্যের ওপর পশ্চিমা দখলদারি, হস্তক্ষেপ এবং লুটপাটকে বৈধ করা। তারা বিষয়টিকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যেন তারা কোনো অন্যায় করছে না, বরং ‘অসভ্য’ জাতিকে সভ্য করার মহান দায়িত্ব পালন করছে। ইতিহাসে এই প্রক্রিয়াটিই ‘সিভিলাইজিং মিশন’ বা ‘হোয়াইট ম্যানস বারডেন’ (White Man’s Burden) নামে পরিচিত। অর্থাৎ, আপনার ওপর আগ্রাসন চালানো হচ্ছে আপনারই মঙ্গলের দোহাই দিয়ে।

এই প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার সাথে জ্ঞানের সম্পর্কটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যখন কেউ কাউকে শাসন বা শোষণ করতে চায়, তখন সে একগুচ্ছ বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যাখ্যা ও শাস্ত্র তৈরি করে, যা তার নিপীড়নকে যৌক্তিক প্রমাণ করে। ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোসহ আরও অনেক চিন্তাবিদ এ বিষয়ে একমত যে—জ্ঞান এবং ক্ষমতা অবিচ্ছেদ্য। যার হাতে ক্ষমতা থাকে, সেই আসলে নির্ধারণ করে দেয় কোন বিষয়টি ‘জ্ঞান’ হিসেবে গৃহীত হবে আর কোনটি হবে না।

বর্তমান সময়ের অন্যতম বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ড. ওয়ায়েল হাল্লাক এই আলোচনাকে আরও বিস্তৃত করেছেন। তিনি মনে করেন, এডওয়ার্ড সাইদ কেবল প্রাচ্যতত্ত্বের কথা বললেও এই প্যাটার্নটি আসলে পুরো সামাজিক বিজ্ঞান (Social Science) এবং মানবিকবিদ্যার (Humanities) রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিদ্যমান। তার মতে, পশ্চিমা বিশ্ব কিছু ধারণাকে—যেমন মানবাধিকার, গণতন্ত্র কিংবা নারী অধিকার—একটি নির্দিষ্ট ‘ফ্রেম’ হিসেবে ব্যবহার করে। এই ফ্রেমগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় যা পরোক্ষভাবে পশ্চিমা রাজনৈতিক প্রকল্পের সাথে যুক্ত। ফলে এই আদর্শগুলোর দোহাই দিয়ে অন্য দেশে আক্রমণ বা হস্তক্ষেপ করা সহজ হয়ে যায়।

আগে জ্ঞানের উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপীয় উপনিবেশবাদকে বৈধতা দেওয়া, আর এখনকার লক্ষ্য হলো আমেরিকান লিবারেল-সেক্যুলার ব্যবস্থাকে বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠিত করা। ডিকলোনিয়াল চিন্তাবিদদের মূল কথা এটাই—যখন আপনি পশ্চিমের দৃষ্টিভঙ্গি, তাদের দেওয়া জ্ঞানের সংজ্ঞা ও সীমানাকেই চূড়ান্ত ও ধ্রুব সত্য বলে মেনে নেন, তখন আপনি অজান্তেই তাদের নিয়ন্ত্রণের জালে বন্দি হয়ে পড়েন এবং আপনার নিজস্ব জ্ঞানভাণ্ডারকে অস্বীকার করেন।

যেকোনো নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ার শুরু হয় ‘চিন্তা’র জগত থেকে; ঠিক তেমনি প্রতিরোধের সূচনাও ঘটে চিন্তা থেকেই—এটিই ধ্রুব সত্য।

আমাদের বর্তমান প্রেক্ষাপটের সাথে এই আলোচনার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা, শাসনপদ্ধতি, শিক্ষাব্যবস্থা এবং সমাজ ও সংস্কৃতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুটি শক্তিশালী পক্ষপাত বা ‘বায়াস’ মিশে আছে—একটি পশ্চিমা পক্ষপাত (Eurocentric Bias) এবং অন্যটি কলকাতা-কেন্দ্রিক পক্ষপাত।

নিচে কিছু উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট করা যাক:

আমাদের ইতিহাসের পাঠ্যবইগুলোতে সুলতানি আমলের শাসক কিংবা আওরঙ্গজেবকে প্রায়ই ‘দখলদার’ বা ‘উগ্র’ হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়। অথচ হিন্দু বা বৌদ্ধ শাসকদের সময়কালকে উপস্থাপন করা হয় অখণ্ড গৌরবের যুগ হিসেবে। এটি মূলত কলকাতা-কেন্দ্রিক ইতিহাসের একটি ধ্রুপদী প্রভাব।

এরপর ২০২৩-২৪ সালের পাঠ্যবইগুলো লক্ষ্য করলে দেখবেন—কলকাতার ‘নবজাগরণ’ (যা মূলত হিন্দু সমাজের অভ্যন্তরীণ সংস্কার আন্দোলন ছিল) নিয়ে চার-পাঁচ পৃষ্ঠার বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। কিন্তু এর বিপরীতে মুসলিম সমাজের বৃহৎ সংস্কার আন্দোলনগুলো নিয়ে বরাদ্দ থাকে মাত্র এক-দুইটি অনুচ্ছেদ। হাজি শরিয়তুল্লাহ রাহ. ও ফরায়েজি আন্দোলন নিয়ে নামমাত্র আলোচনা থাকলেও শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি রাহ., সাইয়েদ আহমাদ শহিদ কিংবা উলামায়ে দেওবন্দের মতো প্রভাবশালী ধারার আন্দোলনগুলো প্রায় অনুপস্থিত। রাজা রামমোহন রায় বা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যতটা গুরুত্ব পান, তিতুমির বা শরিয়তুল্লাহরা ততটা পান না। এটি সেই নির্দিষ্ট পক্ষপাতেরই প্রতিফলন।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে মুসলমানদের দীর্ঘ ও রক্তঝরা ইতিহাস আমাদের পাঠ্যসূচিতে সেভাবে স্থান পায় না। ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, ১৮৫৭ সালের মহা-অভ্যুত্থান, বালাকোট ও বারাসাতের লড়াই, খিলাফত আন্দোলন কিংবা মাওলানা বেলায়েত আলী ও ইনায়েত আলীদের ত্যাগী ভূমিকা আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। অথচ সূর্যসেন, প্রীতিলতা বা ক্ষুদিরামদের বীরত্বগাথা সবিস্তারে পড়ানো হচ্ছে। এর মাধ্যমে সুকৌশলে ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে ‘ইসলাম ও মুসলিম পরিচয়ের’ ঐতিহাসিক ভূমিকাটি মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়।

শিক্ষার ক্ষেত্রে পর্দার বিধানকে প্রায়ই নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়। ইসলাম শিক্ষা বইগুলোতে ইসলামের এমন এক ‘অনুমোদিত’ ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে যা মূলত সেক্যুলার ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অনুকূল। সমাজবিজ্ঞান বইগুলোতে তথাকথিত ‘জেন্ডার আইডিওলজি’ বা কট্টর নারীবাদী অবস্থানগুলোকে ধ্রুব সত্য হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। এটি মূলত পশ্চিমা বা ইউরোসেন্ট্রিক দৃষ্টিভঙ্গির ফল।

লালমনিরহাটে ৬৯ হিজরির প্রাচীন ‘সাহাবা মসজিদ’ আবিষ্কৃত হয়েছে। এটি এই অঞ্চলের মুসলিম ইতিহাসের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন যা আমাদের জাতিসত্তার প্রাচীনত্ব প্রমাণ করে। কিন্তু পাঠ্যবইগুলোতে এর কোনো উল্লেখ বা গুরুত্ব নেই।

ফলাফল কী দাঁড়াচ্ছে? একদিকে আপনি পশ্চিমের বা নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর অবস্থানকে ‘সর্বজনীন সত্য’ হিসেবে গ্রহণ করছেন; অন্যদিকে নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস, ইমান এবং শেকড়কে তাচ্ছিল্য করতে শিখছেন। এভাবেই জ্ঞানের সংজ্ঞায়ন ও ইতিহাসের বিনির্মাণের মাধ্যমে আপনাকে আপনার প্রকৃত পরিচয় থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নলেজ ইজ পাওয়ারের এই মডেলে আপনি যত বেশি এই তথাকথিত ‘জ্ঞান’ অর্জন করছেন, তত বেশি অন্যের নিয়ন্ত্রণের জালে আটকা পড়ছেন।

অনেকেই দাবি করেন—‘বাংলার ইসলাম আলাদা, আরবের ইসলাম আলাদা’। প্রশ্ন হলো, ৬৯ হিজরির সেই ইসলামটি কোন ইসলাম ছিল? কারবালার মাত্র আট বছর পরের সেই সময়ে সাহাবাদের (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম) প্রথম প্রজন্ম তখনো জীবিত। সেই যুগে ইসলাম যদি বাংলা অঞ্চলে এসে থাকে, তবে তা কোন ইসলাম? সাহাবা মসজিদের এই ঐতিহাসিক সত্যগুলো সামনে আনলে বাঙালি মুসলিমদের পরিচয় নিয়ে প্রচলিত অনেক বিভ্রান্তিকর বয়ানই ভেঙে পড়ে। ফলে তারা আর চাইলেই বলতে পারে না যে, ‘আমাদের আরবের ইসলাম লাগবে না, পারস্য ঘুরে আসা ইসলাম লাগবে’।

এদেশে যে অলি-আউলিয়ারা এসেছেন—বাব আদম শহিদ, শাহ মখদুম, শাহজালাল (রাহিমাহুল্লাহ) সহ আরও অনেকে—তাদের সঠিক ইতিহাস আপনার পাঠ্যবইয়ে নেই। এর ফলে আপনার আত্মপরিচয়ের বড় একটি অংশই ধামাচাপা পড়ে থাকছে। এই অভাব কি আপনার আত্মচিন্তাকে প্রভাবিত করছে না? আপনার পরিচয়, আপনার ইতিহাস কিংবা আপনার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনার জগৎকে কি এটি বদলে দিচ্ছে না? অবশ্যই দিচ্ছে; আর এটিই আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

এডওয়ার্ড সাইদ বলেছিলেন, পশ্চিমারা প্রাচ্যের মানুষের একটি ‘ক্যারিকেচার’ বা বিকৃত রূপ তৈরি করে। অর্থাৎ, একজন মানুষ বাস্তবে যেমন, তাকে সেভাবে না দেখিয়ে এমন এক কুৎসিত রূপে উপস্থাপন করা হয় যেন তাকে আক্রমণ করা সহজ হয়।

বাংলাদেশে সেক্যুলার প্রগতিশীলরা ঠিক এই কাজটিই করে আসছে আলিমসমাজ ও সাধারণ মুসলিমদের ক্ষেত্রে। দশকের পর দশক ধরে নাটক, সিনেমা ও মিডিয়ায় দাড়ি-টুপিওয়ালা মানুষদের নেতিবাচকভাবে দেখানো হয়েছে। সেখানে হুজুর মানেই নারীভোগী, প্রতারক কিংবা অত্যাচারী; আর তার স্ত্রীকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসে কোনো সেক্যুলার চরিত্র।

আমাদের সমাজে হিন্দু বা বৌদ্ধ ঐতিহ্য থেকে আসা ফানুস ওড়ানো কিংবা মঙ্গল শোভাযাত্রার মতো বিষয়গুলো অবলীলায় ‘বাঙালি সংস্কৃতি’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। টিপ পরা থেকে শুরু করে অনেক কিছুই বাঙালি সংস্কৃতির অংশ হয়ে যায়। অথচ ইসলামের যেসব অনুষঙ্গ ৬৯ হিজরি থেকে অর্থাৎ ১৪০০ বছর ধরে এ অঞ্চলে মিশে আছে, সেগুলোকে উপস্থাপন করা হয় ‘বহিরাগত’ বা ‘বাইরের জিনিস’ হিসেবে। এগুলো স্পষ্ট পক্ষপাত বা বায়াস।

এই সবকিছু ঘটার মূল কারণ হলো—আমাদের সমাজের শিক্ষা, জ্ঞান ও চিন্তা মূলত দুটি লেন্সের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়। একটি হলো ইউরোসেন্ট্রিক (ইউরোপ-কেন্দ্রিক) এবং অন্যটি কলকাতা-কেন্দ্রিক বায়াস।

এটা হলো ‘Knowledge is power’-এর আরেকটা বাস্তবতা যে, যারা জ্ঞানকে নিয়ন্ত্রণ করে, তারা এইভাবে সমাজকে, সংস্কৃতিকে, রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।  এই ক্ষমতা বাংলাদেশে কারা চর্চা করে? বাংলাদেশের যারা সেক্যুলার  প্রগতিশীল গোষ্ঠী, যারা সংখ্যায় অনেক কম-তারা এই ক্ষমতাটা হাতে রাখে।

এইযে অনেকগুলো সংস্কার কমিশন গঠিত হয়েছে। এই সংস্কার কমিশনগুলোর ভেতরে কারা? সেক্যুলার  প্রগতিশীল গোষ্ঠী-এরাই। এরা দেশের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে না, কিন্তু তারাই ঠিক করে সংস্কার কিরকম হবে।

আমরা শিক্ষা নিয়ে আলাপ করছি। শিক্ষার সংস্কার ব্যাপারটা একটা নীতি-সংক্রান্ত আলোচনা। ওই টেবিলে আপনি তো যেতেই পারছেন না। আপনাকে ওই টেবিলে তারা ঢুকতেই দিবে না। ওই টেবিলে তারা এনে বসাচ্ছে কাদেরকে? সেক্যুলার –লিবারেল কিছু মানুষজনকে। তারাই সবকিছু ঠিক করছে। অর্থাৎ আপনি যে সংস্কার করবেন, ওই সুযোগটা আপনাকে দেয়া হচ্ছে না। 

এই বাস্তবতাগুলো বর্তমান। আপনি কোন জায়গায় প্রোগ্রাম করতে পারবেন না, কথা বলতে পারবেন না। এবং এইটা হচ্ছে এই ক্ষমতাটার কারণে।

এই ক্ষমতার সমীকরণটি এমন যে, এটি সেক্যুলাররা তৈরি করলেও আমরা তা মুখ বুজে গ্রহণ করে নিয়েছি। এর ফলে অনেক মুসলিম বা যারা ইসলামের পক্ষে কাজ করতে চান, তারাও এই নির্দিষ্ট ফ্রেমের বাইরে চিন্তা করতে পারছেন না। তারা নিজেরাই আগ বাড়িয়ে বলতে শুরু করেন—‘অমুককে আসতে দেওয়া যাবে না, ওই কথা বলা যাবে না, কারণ ভারত রাগ করবে কিংবা আমেরিকা এটি পছন্দ করবে না—তাই আমরা এটা হতে দেব না।’ অর্থাৎ, আধিপত্যবাদী এই চিন্তার প্রভাব তাদের অবচেতন মনে এমনভাবে গেঁথে গেছে যে, তারা নিজেদের অজান্তেই অন্যের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন। এটিই হলো ক্ষমতার প্রকৃত রূপ। ‘নলেজ ইজ পাওয়ার’-এর রূঢ় বাস্তবতা মূলত এখানেই।

এই শোচনীয় অবস্থা কীভাবে তৈরি হলো? সংক্ষেপে এর পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। প্রথমত, উপনিবেশবাদ বা কলোনিয়ালিজম। স্কটিশ মিশনারি উইলিয়াম অ্যাডামস, যিনি এ অঞ্চলের শিক্ষা নিয়ে কাজ করেছিলেন, তার তথ্যমতে ইংরেজদের আক্রমণের আগে কেবল বাংলায় ৮০,০০০ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল। গড়ে প্রতি ৪০০ মানুষের জন্য ছিল একটি করে মাদ্রাসা। ইংরেজরা এসে এই পুরো ব্যবস্থাটি ধ্বংস করে দেয়।

মুসলিম সমাজে ওয়াকফ, মদদি মা’আস ও জায়গিরদারি প্রথার মাধ্যমে মাদরাসা, মক্তব, খানকা ও মুসাফিরখানার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হতো। ইংরেজরা আইন করে এই সমস্ত উৎস দখল করে নেয়, যার ফলে দীর্ঘদিনের একটি সামাজিক ইকোসিস্টেম পুরোপুরি ধসে পড়ে। এরপর তারা হঠাৎ করে প্রশাসনিক ভাষা ফার্সি থেকে বদলে ইংরেজি করে দেয়। একদিকে সামাজিক কাঠামো ভেঙে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো অচল করা হলো, অন্যদিকে নতুন ভাষায় প্রশাসনিক কাজের শর্ত জুড়ে দেওয়া হলো। এর ফলে কয়েক দশকের মধ্যে মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এবং তারা সন্তানদের শিক্ষিত করার সামর্থ্য হারায়। এটি একটি বড় উদাহরণ।

আরেকটি কারণ হলো পশ্চিমাদের ‘এপিস্টেমিক রেসিজম’ বা জ্ঞানতাত্ত্বিক বর্ণবাদ। এর সহজ অর্থ হলো—তারা যা বুঝেছে সেটিই একমাত্র জ্ঞান, এর বাইরে আর কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। আপনারা লর্ড ম্যাকলের নাম শুনেছেন, যাকে ভারতের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার জনক বলা হয়। তার একটি বিখ্যাত উক্তি ছিল—ইউরোপের একটি ভালো লাইব্রেরির একটি তাকে যে পরিমাণ জ্ঞান মজুদ আছে, সমগ্র ভারত ও আরবের মোট জ্ঞান তার সমান নয়। 

সহজ ভাষায় একেই বলে ‘এপিস্টেমিক রেসিজম’ বা জ্ঞানতাত্ত্বিক বর্ণবাদ। অর্থাৎ, তারা যা বলছে তা-ই ধ্রুব সত্য; বাকিদের জ্ঞান বা মতামতের কোনো মূল্য নেই। অনুরূপ একটি আত্মঘাতী দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সমাজেও জেঁকে বসেছে।

এই দৃষ্টিভঙ্গি কীভাবে তৈরি হলো? এর মূলে রয়েছে পশ্চিমাদের তৈরি করে যাওয়া সেই শিক্ষাব্যবস্থা। উপনিবেশবাদীরা এ দেশে ২০০ বছর শোষণ ও লুটপাট চালিয়েছে। আর এই লুটপাট প্রক্রিয়াটি নিরবচ্ছিন্নভাবে চালানোর জন্যও একটি সুশৃঙ্খল সিস্টেমের প্রয়োজন ছিল। বিশৃঙ্খল লুটপাটের চেয়ে সুপরিকল্পিত বা ‘সিস্টেমেটিক’ লুটপাট শাসনকারীদের জন্য অনেক বেশি সুবিধাজনক। এই শোষণযন্ত্র বা সিস্টেমটি সচল রাখার জন্য তাদের প্রচুর অনুগত ‘কেরানি’ বা জনবল প্রয়োজন ছিল। আর সেই কেরানি তৈরির কারখানা হিসেবেই তারা এই শিক্ষাব্যবস্থা সাজিয়েছিল। এই ব্যবস্থার ফসল হলো এমন এক গোষ্ঠী, যারা হুবহু ব্রিটিশদের মতো করে চিন্তা করতে শেখে।

এখানে ‘কেরানি’ বলতে তৎকালীন আমলাতন্ত্রকে বোঝানো হচ্ছে। ইংরেজদের বানানো এই আমলাতন্ত্রের মূল লক্ষ্যই ছিল তাদের শোষণমূলক শাসনযন্ত্রকে ঠিকঠাকভাবে পরিচালনা করা। যে কারণে আমাদের আমলাতান্ত্রিক কাঠামোটি এখনো এতটা গণবিরোধী রয়ে গেছে।

এই শিক্ষাব্যবস্থা থেকে যারা বেরিয়ে এসেছে, তারা মূলত ইউরোপীয় মনস্তত্ত্ব নিয়ে বড় হয়েছে। ফলে ইসলাম, মুসলিম পরিচয় কিংবা ইসলামি জ্ঞানের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক নয়; বরং তারা ইসলামকে দেখে ইংরেজের চোখ দিয়ে। ইংরেজরা এ দেশ ছেড়ে যাওয়ার সময় ক্ষমতা কাদের হাতে দিয়ে গেছে? নিশ্চয়ই তাদের হাতে নয় যারা দীর্ঘ ৪০-৫০ বছর ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। বরং তারা ক্ষমতা দিয়ে গেছে তাদেরই অনুগত গোষ্ঠীর হাতে। ফলে ইসলামের প্রতি সেই ঔপনিবেশিক বিদ্বেষ আজও আমাদের সমাজে টিকে আছে।

এভাবেই সমাজে এমন এক গুমোট পরিবেশ তৈরি হয়েছে যেখানে ইসলামের সাথে সম্পর্কিত যেকোনো মূল্যবোধ, বিধান কিংবা চর্চাকে আমরা ‘অনগ্রসর’, ‘মধ্যযুগীয়’ বা ‘ব্যাকডেটেড’ মনে করি। অন্যদিকে পশ্চিমা চিন্তা, দর্শন ও ব্যবস্থাকে মনে করি প্রগতি ও উন্নতির একমাত্র পথ। তারা যেহেতু বলেছে এটি ভালো, তাই বিনা প্রশ্নে আমরাও তাকেই ধ্রুব সত্য বলে মেনে নিই।

আমাদের এখনকার সাধারণ চিন্তাধারা এমন যে—ইসলাম কেবল আপনার ব্যক্তিগত জীবনের একটি সীমিত অংশে থাকবে। এর বাইরে সমাজ বা রাষ্ট্রে যদি কেউ ইসলামকে তুলে ধরতে চায়, তবে মনে করা হয় তার নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা আছে। তাকে ‘উগ্রবাদী’ তকমা দিয়ে দমন করার বা আটকে দেওয়ার প্রবণতা কাজ করে। এভাবে সুকৌশলে তারা আমাদের আত্মপরিচয় ও আত্মবিশ্বাসকে ধ্বংস করে দিয়েছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, আমরা এখন প্রায় পুরোপুরি তাদের মতো করেই চিন্তা করছি। নিজেদের দ্বীন ও পরিচয় নিয়ে আমরা হীনমন্যতায় ভুগছি এবং পশ্চিমা কাঠামোর বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে ভয় পাচ্ছি।

এর মূল কারণ হলো এই জ্ঞানতাত্ত্বিক আগ্রাসন। জ্ঞানের প্রতি আমাদের এই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই এখন আমাদের সমাজ, শাসন ও চিন্তা—সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, এই সমস্যার শেকড় কোথায়? এর উত্তর হলো—সেক্যুলার শাসনব্যবস্থা বা সেক্যুলার রাষ্ট্রকাঠামো।

সহজ কথায়, আপনি চাইলেই বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল কোনো সংস্কার আনতে পারবেন না। কারণ, শিক্ষা সংস্কারের বিষয়টি সরাসরি সেক্যুলার রাষ্ট্র ও শাসনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কেন? কারণ, এই সেক্যুলার শাসন আমাদের দেশে স্বাভাবিকভাবে গড়ে ওঠেনি; বরং ফিরিঙ্গিরা এটি আমাদের ওপর জোর করে চাপিয়ে দিয়েছে। আর বলপ্রয়োগের মাধ্যমেই একে টিকিয়ে রাখতে হয়।

ইসলাম কখনো সেক্যুলার ব্যবস্থাকে চূড়ান্ত হিসেবে মেনে নেবে না, আবার সেক্যুলার ব্যবস্থাও ইসলামকে তার পূর্ণ স্বকীয়তায় গ্রহণ করবে না। এই দুইয়ের মধ্যে সংঘাত অনিবার্য। তাই এই ব্যবস্থা সবসময় ইসলামকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালায়। সেক্যুলারিজমের একটি সহজাত বৈশিষ্ট্য হলো ধর্মকে নিয়ন্ত্রণ করা। ইসলামের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা আরও তীব্র। কারণ, খ্রিস্টধর্ম বা ইহুদি ধর্মের মতো অন্যান্য ধর্মগুলো সেক্যুলারিজমের সাথে খাপ খাইয়ে নিজেদের অনেকটা পরিবর্তিত করে নিয়েছে। কিন্তু ইসলাম এখনো ঘোষণা করে—চূড়ান্ত কর্তৃত্ব কেবল আল্লাহর (আল-মালিকুল মুলক)। ইসলাম যেহেতু এই ব্যবস্থার কাছে বশ মানছে না, তাই তাদের প্রধান লক্ষ্যই হলো ইসলামের ওপর বেশি চাপ সৃষ্টি করা।

এ কারণেই সেক্যুলার ব্যবস্থা প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে সমাজে ইসলামের প্রভাব কমিয়ে আনতে। যতদিন ইসলামের এই স্বতন্ত্র চেতনা টিকে থাকবে, ততদিন সেক্যুলারব্যবস্থা স্বস্তি পাবে না। তাদের ভেতর সবসময় একটি বিপদের আশঙ্কা কাজ করবে যে, এই আদর্শিক শক্তিটি তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। ফলে তারা চেষ্টা করে জনসাধারণের রাজনৈতিক বা সামগ্রিক ইসলামি চেতনাকে ভেঙে ফেলতে, যেন মুসলিমরা আদর্শিকভাবে সেক্যুলার কাঠামোকেই পরম সত্য হিসেবে গ্রহণ করে নেয়। এই কারণেই শিক্ষা ও জ্ঞানের বিষয়টি সরাসরি সেক্যুলার শাসনের সাথে যুক্ত।

আধুনিক শাসনের মূলত দুটি দিক রয়েছে। একটি হলো রাষ্ট্রের সরাসরি বলপ্রয়োগের ক্ষমতা, আর অন্যটি হলো মানুষের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা। অর্থাৎ একদিকে শক্তি প্রয়োগ, অন্যদিকে ‘সম্মতি উৎপাদন’।

শক্তি প্রয়োগের কাজটি করে সেনাবাহিনী, পুলিশ বা বিচার বিভাগ; যাদের কাজ হলো আইন অমান্য করলে বলপ্রয়োগ করা। কিন্তু এর বাইরেও কিছু সূক্ষ্ম কৌশল থাকে যার কাজ হলো আপনার চিন্তাকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির ভেতরে আটকে রাখা। তারা চায় আপনি যেন ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে কিছু না ভাবেন, বরং এই সিস্টেমকেই ‘ভালো’ বলে মেনে নেন। কারণ, কেবল অস্ত্রের জোরে বা মানুষকে পিটিয়ে দীর্ঘমেয়াদে শাসন টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। কিন্তু যদি মানুষের চিন্তাকেই নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং মানুষ যদি নিজেই মনে করতে শুরু করে যে—‘না, এই ব্যবস্থাই তো ঠিক আছে, এতে খারাপ কী?’—তখন শাসন করা অনেক সহজ হয়ে যায়।

এই নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র তার আদর্শিক হাতিয়ার হিসেবে মিডিয়া, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ‘শিক্ষাব্যবস্থা’কে ব্যবহার করে।

শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে শৈশব থেকেই আপনাকে কিছু ধারণা এমনভাবে গেঁথে দেওয়া হয়—সহজ ভাষায় যাকে বলা যায় মগজ ধোলাই—যাতে আপনি প্রচলিত ব্যবস্থার বিরোধিতা না করেন, একে প্রশ্ন না করেন এবং মনে করেন যে এটিই আপনার জন্য মঙ্গলজনক।

পরিশেষে, শিক্ষা-সাম্রাজ্যবাদ, পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণ কিংবা কলকাতা-কেন্দ্রিক পক্ষপাত থেকে যদি আপনি মুক্তি পেতে চান, তবে এই সমস্যার মূল উৎসটি আগে চিহ্নিত করতে হবে। এই সংকটের শেকড় প্রোথিত রয়েছে এই সেক্যুলার শাসন এবং সেক্যুলার রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে; এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।

সহজভাবে বলা যায়—আপনি চাচ্ছেন প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থায় ইসলামকে অন্তর্ভুক্ত করতে। চাওয়াটা অবশ্যই ইতিবাচক, কিন্তু এই সেক্যুলার রাষ্ট্রকাঠামো কি আপনাকে সেই সুযোগ দেবে? দেবে না। কারণ, এটি তার অস্তিত্বের সাথে জড়িত। সেক্যুলার রাষ্ট্রের মূল ভিত্তিই হলো ইসলামকে ক্রমাগত নিয়ন্ত্রণে রাখা। তাই আসল দ্বন্দ্বটা কেবল শিক্ষাব্যবস্থায় নয়, বরং মূল লড়াইটা হলো ইসলামের সাথে সেক্যুলার ব্যবস্থার। জ্ঞান বা শিক্ষা নিয়ে যে সংঘাত আমরা দেখছি, তা আসলে এই বৃহত্তর লড়াইয়েরই একটি বহিঃপ্রকাশ মাত্র। সুতরাং, এই মৌলিক দ্বন্দ্বের সমাধান না হলে দীর্ঘমেয়াদী কোনো পরিবর্তন বা সংস্কার সম্ভব নয়।

এখন প্রশ্ন আসে, সমাধানটা তাহলে কীভাবে হবে? আমাদের সমাজে বর্তমানে যতগুলো তাত্ত্বিক বিতর্ক আছে, তার বেশিরভাগই হয় পশ্চিমা লেন্স দিয়ে বাস্তবতাকে দেখার ফলে সৃষ্ট অথবা ইসলাম ও সেক্যুলারিজমের চিরন্তন দ্বন্দ্বের কারণে।

একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। সম্প্রতি নারী কমিশন নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। তাদের কিছু বক্তব্যের বিরুদ্ধে উলামায়ে কেরাম এবং সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। এখানে বিতর্কের মূল বিন্দুটি কোথায়? নারী কমিশন নারী অধিকারের ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট পশ্চিমা অবস্থানকে ধ্রুব সত্য বলে মনে করে। তারা চায় সমাজ ও শাসনব্যবস্থা সেই ছাঁচে চলুক এবং সেই অনুযায়ী তারা আইন ও রাষ্ট্রীয় পলিসি সংস্কারের প্রস্তাব দিচ্ছে।

আর আপনি এর বিরোধিতা করছেন কারণ এটি ইসলামের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এটি আমাদের ধর্ম, তাহজিব-তামাদ্দুন এবং আত্মপরিচয়ের পরিপন্থী। তর্কের এক পর্যায়ে তারা সরাসরি বলছে—‘আপনি যে বিরোধিতা করছেন তা আপনার বিশ্বাস ও কুরআন-সুন্নাহর কারণে; কিন্তু আমরা তো সেই বিশ্বাস মানি না।’ বিভিন্ন টকশোতে এমন আলোচনা আপনারা হয়তো দেখেছেন। তাদের যুক্তি হলো—যে ব্যক্তি ইসলাম পালন করতে চায় না, তার জন্য তো একটি সমাধান দিতে হবে; আপনি সবার ওপর ইসলামের সমাধান চাপিয়ে দিতে পারেন না। এভাবেই তারা তাদের অবস্থানকে রক্ষা করতে চায়।

তাদের চূড়ান্ত যুক্তি হলো—ইসলামি সমাধান দেওয়া যাবে না, বরং একটি ‘সর্বজনীন’ সমাধান দিতে হবে যা সবার জন্য প্রযোজ্য। আর তাদের মতে, সেই সর্বজনীন সমাধানটি হলো সেক্যুলার সমাধান।

এই প্রশ্নের মুখে পড়ে আমরা অনেকেই থমকে যাই। অথচ উত্তরটি অত্যন্ত সহজ। একটু ভেবে দেখুন—তারা যেসব বিষয়কে সঠিক বা কাম্য মনে করছে, সেগুলোর ভিত্তি আসলে কী? সেই ধারণাগুলো কোত্থেকে আসছে?

যেমন, আপনি যখন বলেন—‘আমি মনে করি পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা উচিত’, তখন এর ভিত্তি হলো পবিত্র কুরআন। আপনি যখন বলেন—‘পরিবারে পিতাই মূল দায়িত্বশীল’, তখন এর ভিত্তি হলো রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ। আপনার প্রতিটি বিশ্বাসের একটি অকাট্য উৎস আছে। কিন্তু তাদের ভিত্তিটা কী?

তারা যখন মানবাধিকারের কথা বলে, তখন এর ভিত্তি মূলত জাতিসংঘের তৈরি করা কিছু রূপরেখা, যার মূল উৎস হলো পশ্চিমা বিশ্ব। তারা যখন ‘প্রগতি’র দোহাই দেয়, সেই প্রগতির ধারণাও ধার করা হয়েছে পশ্চিম থেকে। তারা যখন বলে—‘এটি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী’, তখন প্রশ্ন জাগে—পুরো দুনিয়ার মানুষ কি একসাথে বসে এই মূল্যবোধগুলো ঠিক করেছে? অবশ্যই না। এগুলো পশ্চিমারা নিজেদের মতো করে তৈরি করেছে এবং এখন আপনার ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। এমনকি তারা এমন যুক্তিও দেয় যে—‘যেহেতু বিশ্বের অনেক দেশে এটি প্রচলিত, তাই বাংলাদেশেও এটি করতে হবে।’ এটি কেমন যুক্তি? কোনো কিছু বহু দেশে প্রচলিত মানেই কি তা সঠিক? তাদের উচিত ছিল বিষয়টির যৌক্তিকতা প্রমাণ করা, যা তারা করে না।

আমরা সবাই বিশ্বাস করি যে, প্রতিটি মানুষের ন্যূনতম কিছু অধিকার আছে। শুধু মানুষ নয়, প্রতিটি সৃষ্টিরই হক বা ‘হাক্কুল ইবাদ’ আছে। কিন্তু এই অধিকারগুলো আসলে কে নির্ধারণ করবে? আমাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, তা নির্ধারণ করবেন স্বয়ং আল্লাহ।

কিন্তু তাদের দর্শন অনুযায়ী অধিকার নির্ধারিত হয় মানুষের খেয়াল-খুশি আর মর্জির ওপর। ফলে তাদের অধিকারের তালিকায় সমকামিতা, লিঙ্গবদল, এমনকি আত্মহত্যা কিংবা ইউথনেশিয়া বা যন্ত্রণাহীন মৃত্যুর অধিকারও যুক্ত হয়। এমনকি তারা ইসরায়েলের চালানো গণহত্যাকেও ‘আত্মরক্ষার অধিকার’ বলে চালিয়ে দেয়। এগুলো তারা নিজেদের প্রয়োজনমতো ঠিক করে নেয়। তাহলে এটি ‘সর্বজনীন’ হয় কীভাবে? বরং সে নিজের তৈরি কিছু অবস্থানকেই আপনার ওপর সর্বজনীন বলে চাপিয়ে দিচ্ছে।

সে যখন বলে ‘মানবাধিকার’, আপনিও বলতে পারেন ‘হ্যাঁ, আমি মানবাধিকারে বিশ্বাসী’। পার্থক্য শুধু উৎসে—আপনি আপনার সংজ্ঞা নিচ্ছেন ইসলাম থেকে, আর সে নিচ্ছে পশ্চিম থেকে। আপনার অবস্থান যদি পক্ষপাতদুষ্ট হয়, তবে তার অবস্থান কেন নিরপেক্ষ হবে? এই প্রশ্নটিই তাকে করা শিখতে হবে।

প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের এভাবে প্রশ্ন করা যায়—‘প্রগতির নামে তোমরা এমন কিছু করছো যার ফলে তোমাদের সমাজ ও পরিবার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে; আমি এমন প্রগতি চাই না।’

কিংবা বলা যায়—‘আধুনিকতার নামে তোমরা ভালো কাজের পাশাপাশি অনেক মন্দ কাজও করেছো। তোমরা প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে জলবায়ু বিপর্যয় ডেকে এনেছো, প্রকৃতিকে ধ্বংস করেছো। আক্ষরিক অর্থেই আমাদের বসবাসের যোগ্য পৃথিবীটাকে তোমরা বিষিয়ে তুলেছো। তাহলে এটি পুরোপুরি ভালো হয় কীভাবে? আমি একে কল্যাণকর মনে করি না।’

বিষয়টি কি বুঝতে পারছেন? আপনার ধর্মের ব্যাপারে সে যেমন প্রশ্ন তুলতে পারে যে—‘এটি তোমার বিশ্বাস, আমার নয়’; ঠিক তেমনি তার অবস্থানের ব্যাপারেও আপনি বলতে পারেন—‘এটি তোমার মত, আমার নয়। তুমি কোন অধিকারে এটি আমার ওপর চাপিয়ে দিচ্ছ?’ এই পয়েন্টটি ধরা খুব জরুরি।

আপনার অবস্থান যেমন একপাক্ষিক হতে পারে, তার অবস্থানও দিনশেষে পক্ষপাতদুষ্ট। সে কেবল চতুরতার সাথে নিজের অবস্থানকে ‘নিরপেক্ষ’ বলে চালিয়ে দিচ্ছে। ধরুন একটি সালিশ হচ্ছে। সেখানে বিচারককে নিরপেক্ষ হতে হয়। কিন্তু বিচারক যদি নিজেই একটি পক্ষ হন এবং তার নিজস্ব স্বার্থ থাকে, অথচ তিনি সবাইকে বোঝাতে সক্ষম হন যে তিনি নিরপেক্ষ—তবে সেই সালিশে তিনি যা চাইবেন তা-ই হবে।

পশ্চিমারা এবং সেক্যুলাররা ঠিক এই কাজটিই করছে। তারা আপনার বিশ্বাসকে বলছে ‘বায়াসড’ বা পক্ষপাতদুষ্ট, আর তাদের নিজেদের খেয়ালখুশি-নির্ভর বিশ্বাসকে বলছে ‘সর্বজনীন’।

সারকথা হলো—আপনার একটি বিশ্বাস কাঠামো আছে, তারও একটি আছে। আপনার বিশ্বাসের ভিত্তিতে আপনি এক ধরনের সমাজ ও শিক্ষা চান; সে-ও তার বিশ্বাসের ভিত্তিতে অন্য এক ধরনের সমাজ ও শিক্ষা চায়। এই দুইয়ের মধ্যে সংঘাত অনিবার্য। এখানে কোনো ‘নিরপেক্ষ’ অবস্থান নেই। ভুলেও মনে করবেন না যে সেক্যুলার অবস্থান নিরপেক্ষ। পৃথিবীতে আদতে নিরপেক্ষ বলে কিছু হয় না।

কেউ যদি এসে বলে—‘আমি বেদের শাসন চাই’, আপনি বুঝবেন এটি নিরপেক্ষ নয়। কেউ বাইবেল বা ত্রিপিটকের শাসন চাইলে আপনি বুঝবেন সেটিও নিরপেক্ষ নয়। কিন্তু কেউ যখন কোনো গালভরা মতবাদের দোহাই দিয়ে শাসন চায়, তখন আমরা ভুলবশত তাকে নিরপেক্ষ মনে করি। দর্শনের ‘এপিস্টেমিক রিগ্রেস’ তত্ত্ব অনুযায়ী, পৃথিবীতে কোনো অবস্থানই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ হওয়া সম্ভব নয়; প্রতিটি অবস্থানের পেছনেই কোনো না কোনো পূর্বনির্ধারিত বিশ্বাস থাকে।

এখন প্রশ্ন হলো, সমাজের এক পক্ষ এক জিনিস চায়, অন্য পক্ষ ভিন্ন কিছু—তবে সমাধান কী? এর দুটি উপায় হতে পারে। একটি হলো সংলাপ বা আলোচনা। সেক্যুলার পক্ষ এবং ইসলামপন্থীরা বসে সমাজের সামগ্রিক কল্যাণের স্বার্থে আলোচনা ও আপস করবে—কিছু ছাড় আপনি দেবেন, কিছু তারা দেবে। এটি একটি আদর্শ সমাধান হতে পারত।

কিন্তু বাস্তবে এটি কখনো ঘটবে না। কারণ সেক্যুলাররা এটি চায় না; তারা চায় একচ্ছত্র আধিপত্য বা জমিদারি। যেহেতু বর্তমানে তারা শক্তিশালী অবস্থানে আছে, তাই তারা আলোচনায় আগ্রহী নয়। তারা মনে করে, আপনাকে বলপ্রয়োগে পেছনে ঠেলে দেওয়া বা সরিয়ে দেওয়া সম্ভব। এটিই বর্তমান বাস্তবতার একটি বড় দিক।

দ্বিতীয় বিষয়টি হলো—তাদের সাথে আমাদের আদৌ কোনো ‘শেয়ারড ইন্টারেস্ট’ বা যৌথ স্বার্থ আছে কি না। এই ভূখণ্ডের কল্যাণ কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা আদৌ একমত হতে পারছি কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়। অর্থাৎ, তারা এ দেশের জন্য কেমন ভবিষ্যৎ চায় আর আপনি কী চান—আমার মতে এই দুটি সমান্তরাল মেরু, যা কখনো মেলে না। আর যদি লক্ষ্যই না মেলে, তবে আপস হওয়ার সুযোগ কোথায়?

যদি আপস না হয়, তবে বিকল্প সমাধান কী? উত্তর হলো—আধিপত্য বা নিয়ন্ত্রণ। আর ঠিক এই কাজটিই তারা এখন করছে। তারা আমাদের ওপর ‘পিওর অ্যান্ড সিম্পল’ আধিপত্য কায়েম করে রেখেছে। কীভাবে? রাষ্ট্রযন্ত্র, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক হেজেমনির মাধ্যমে। এমনকি পুলিশ বা সেনাবাহিনীর মতো বাহিনীকে ব্যবহার করে আক্ষরিক অর্থেই শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে তারা আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

এই সুযোগ ও ক্ষমতা তারা পেল কীভাবে? তারা মূলত ব্রিটিশদের তৈরি করা সেই শোষক রাষ্ট্রযন্ত্রটি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়ে গেছে। ব্রিটিশরা যেভাবে আমাদের ওপর বলপ্রয়োগ করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল, বর্তমান শাসকগোষ্ঠী সেই একই উত্তরাধিকার বহন করছে। পাশাপাশি তারা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বয়ান তৈরি করেছে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে এই আধিপত্যকে দীর্ঘস্থায়ী করছে।

মূল কথা হলো—আপনি যদি এর বিপক্ষে দাঁড়াতে চান, তবে সংস্কারের আলোচনা অবশ্যই করতে হবে; কারণ কোনো সমাধানই এক দিনে আসে না। কিন্তু আপনি যদি আমূল পরিবর্তন চান, তবে শুধু সংস্কারের চিন্তা করলেই চলবে না। আপনাকে বুঝতে হবে যে, দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের পথ হলো তাদের এই আধিপত্যের জাল ভেঙে ফেলা। সে আপনার ওপর যে নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে দিচ্ছে, তা ছিন্ন করে আপনার ন্যায্য অধিকার বা হক আদায় করে নিতে হবে—যেকোনো মূল্যেই হোক।

এই অধিকার আদায়ের প্রক্রিয়াটি কেমন হবে? কেউ যখন আপনার হক দিতে চাচ্ছে না বরং আপনার ওপর নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছে, আর আপনি সুন্দর করে বুঝিয়ে বলার পরও সে শুনছে না—তখন আপনি কী করবেন? ‘আমার হকের দরকার নেই’ বলে কি আপনি সরে যাবেন? না, এখানে আধিপত্যের প্রশ্ন আসে। অর্থাৎ, সে যদি না থামে বা কথা না শোনে, তবে তাকে থামতে বাধ্য করতে হবে। এটিই দুনিয়ার নিয়ম। আপনি যত সুন্দর কথাই বলেন না কেন, দিনশেষে এটিই বাস্তবতা এবং এটি আমাদের মাথায় রাখা প্রয়োজন।

আর এই আধিপত্য আপনি কীভাবে কায়েম করবেন? এখানে অবশ্যই কাঠামোগত সংস্কার, আদর্শিক লড়াই, সামাজিক শক্তি বৃদ্ধি এবং গণআন্দোলনের কথা আসবে। একইসাথে জ্ঞানচর্চার বিকল্প ধারা তৈরি এবং প্রয়োজনে শক্তির ব্যবহারের প্রশ্নটিও সামনে আসবে। এটিই সরল ও রূঢ় বাস্তবতা। কারণ, এই লড়াইটি কেবল শিক্ষা বা জ্ঞান নিয়ে নয়, এর সাথে ক্ষমতার প্রশ্ন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর ক্ষমতার দ্বন্দ্বের সমাধান কেবল তত্ত্ব দিয়ে বা শুধু সংস্কার দিয়ে হয় না। মনে রাখতে হবে—‘নলেজ ইজ পাওয়ার’।

ওয়া আখিরু দা’ওয়ানা ‘আনিলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles
দর্শনমডার্নিটি

গ্রন্থালোচনা: Formations of The Secular — তালাল আসাদ

দর্শন•April 10, 2026দর্শনমডার্নিটিগ্রন্থালোচনা: Formations of The Secular — তালাল আসাদজগলুল আসাদ•107 min...

সমসাময়িক বিশ্লেষণ

হিটলারবাদ থেকে মাক্রোঁবাদ: রাজনীতির নানা রূপ — ইমানুয়েল টড

সমসাময়িক বিশ্লেষণ•April 9, 2026সমসাময়িক বিশ্লেষণহিটলারবাদ থেকে মাক্রোঁবাদ: রাজনীতির নানা রূপ — ইমানুয়েল...

ইসলামের ইতিহাসপাশ্চাত্যবাদসমসাময়িক বিশ্লেষণ

পশ্চিমের আয়নায় ইসলামী সংস্কার ও তার লিগ্যাসি

ইসলামের ইতিহাস•April 7, 2026ইসলামের ইতিহাসপাশ্চাত্যবাদসমসাময়িক বিশ্লেষণপশ্চিমের আয়নায় ইসলামী সংস্কার ও তার লিগ্যাসিখালিদ...

বাঙালি মুসলিমসমসাময়িক বিশ্লেষণ

শরিফ ওসমান হাদির সমাজভাবনা

বাঙালি মুসলিম•April 4, 2026বাঙালি মুসলিমসমসাময়িক বিশ্লেষণশরিফ ওসমান হাদির সমাজভাবনাশাহেদ হাসান•40 min read351ViewsFacebookXWhatsApp351...