মডার্নিটি

ইসলামী সভ্যতার পতন ও মডার্নিটির উদ্ভব

Share
Share

ইসলামী সভ্যতার পতন ও মডার্নিটির উদ্ভব

আমাদের আলোচনার মূল বিষয় হলো “সভ্যতার সংঘাত”। ‘সংঘাত’ শব্দটা শুনে অনেকেই ভয় পেয়ে থাকেন, কিন্তু আসলে সংঘাত অনিবার্য। সংঘাত আপনাকে জড়াতেই হবে; আপনি এড়াতে চাইলেও আপনাকে সংঘাতে টেনে নেওয়া হবে।

আমাদের আলোচনা মূলত দুটি বিষয়কে ঘিরে— ইসলামী সভ্যতার পতন এবং মডার্নিটির উদ্ভব। দুটি বিষয় একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, অনেকটা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। একটির পর্ব শেষ হলে অন্যটির শুরু হয়। তাই, এই আলোচনায় দুটি বিষয় পাশাপাশি রেখে বিশ্লেষণ করা হবে।

সভ্যতার পরিচয়

সভ্যতার পরিচয় নানাজন নানাভাবে দিয়েছেন। তবে আমাদের আলোচনা শুরু হবে আরবি পরিভাষাকে সামনে রেখে। অনেকেই জানেন যে, ‘সভ্যতা’ শব্দটির আরবি হলো “হাদারা” (حضارة)। ‘হাদারা’ এসেছে ‘হুজুর’ বা ‘হাজির’ থেকে। আমাদের কওমি মাদরাসাগুলোতে উপস্থিতিকে বলা হয় “হাজিরা”। অর্থাৎ, কেউ উপস্থিত আছে— তা বোঝানোর জন্য শব্দটি ব্যবহৃত হয়। তারমানে দাঁড়ায়, সভ্যতার সাথে উপস্থিতির একটি সম্পর্ক আছে; স্থানিকতার সম্পর্ক আছে। এর সাথে জড়িয়ে আছে নির্মাণ, নগরায়ন ও উন্নয়ন প্রক্রিয়া। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলছেন, “আর তাদেরকে সে জনপদের কথা জিজ্ঞাসা করুন, যা ছিল সমুদ্রতীরে অবস্থিত …” (সূরা আল-আ‘রাফ, ৭:১৬৩)। সুতরাং, সভ্যতা কখনো স্থানিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।

সভ্যতার সাথে স্থিতিশীলতার সম্পর্ক রয়েছে। এজন্যই দেখবেন, জাহেলি যুগে যাযাবরদের মধ্যে অনেক কবি ছিলেন। তারা “সাকাফা” তথা কালচার, সংস্কৃতি, কবিতা ইত্যাদি চর্চা করতেন। তাদের রচিত সাব’উল মু‘আল্লাকাত (সাতটি ঝুলন্ত গীতিকবিতা) কাবা শরিফে ঝুলিয়ে রাখা হত। যাযাবর কবিদের মধ্যে ইমরাউল কায়েস ছিলেন, আনতারা ইবনে শাদ্দাদ ছিলেন। তাদেরদের মধ্যে এত বড় বড় কবি থাকা সত্ত্বেও তারা সভ্যতা গড়ে তুলতে পারেনি। কারণ, তাদের মধ্যে স্থিতিশীলতা ছিল না। তাদের কোনো নির্দিষ্ট স্থানের সাথে সংশ্লিষ্টতা ছিল না। তারা নানা দিকে ঘুরে বেড়াত। ফলে, তারা সভ্যতা গড়ে তুলতে পারেননি।

অর্থাৎ, সভ্যতার সাথে স্থানিকতা ও নগরায়নের একটি গভীর সম্পর্ক আছে। তাই, ইবনে খালদুন ‘উমরান’-এর কথা বলেছেন, উপমহাদেশের শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.) ‘ইরতিফাকাত’ তত্ত্বের কথা বলেছেন। এগুলো সংগঠন, সাংগঠনিকতা এবং সভ্যতার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এজন্য, কোনো সভ্যতাই স্থানের প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। পৃথিবীতে যতগুলো সভ্যতা ছিল— যেমন গ্রিক সভ্যতা, রোমান সভ্যতা, চৈনিক সভ্যতা, মিশরীয় সভ্যতা— কোনো সভ্যতাই তার স্থানের চিহ্ন থেকে মুক্ত নয়। সবগুলোকে তার স্থানের ভিত্তিতেই পরিচয় করানো হয়।

ইউরোপীয় সভ্যতার প্রতারণা

পৃথিবীতে একটি মাত্র ভন্ড সভ্যতা আছে, যে নিজের নামের সাথে স্থানকে জড়িয়ে নেয়নি, তা হলো ‘আধুনিক সভ্যতা’। ‘ইউরোপীয় সভ্যতা’ নিজের নামকরণ করেছে ‘আধুনিক সভ্যতা’ বা ‘Modern Civilization’। ইউরোপীয় সভ্যতাকে কেন Modern Civilization বলা হয়? ইউরোপীয় সভ্যতা বা Western Civilization বলতে সমস্যা কী? কেন একে Modern Civilization বলে পুরো বিশ্বের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়? বাকিসব সভ্যতা কি তাহলে পশ্চাৎপদ?— এটি  এক ধরণের ভণ্ডামি। এমন ভণ্ডামি তাদের নানা কাজকর্মে আপনারা দেখতে পাবেন। মারিয়াম জামিলা এজন্য খুব শক্তভাবে প্রশ্ন তুলেছেন: “Is Western Civilization Universal? — পশ্চিমা সভ্যতা কি সার্বজনীন?”

হামিদ দাবাশি বলেছেন— ইউরোপ তার কবিদের শুধু “কবি” বলে ডাকে। কিন্তু এর বাইরে অন্যদের ক্ষেত্রে বলে আফ্রিকান কবি, ভারতীয় কবি, আরবীয় কবি, চৈনিক কবি ইত্যাদি। একইভাবে, তাদের সভ্যতার ভেতরে জন্ম নেওয়া দার্শনিকরা হলেন “দার্শনিক”, আর বাকি বিশ্বের দার্শনিকরা ভারতীয় দার্শনিক, আরবীয় দার্শনিক, চৈনিক দার্শনিক প্রমুখ। যেন তাদের সভ্যতার সবকিছুই সহজাত, আর বাকি বিশ্বের কোন কিছুই সহজাত নয়! এটাও এক ধরণের ভণ্ডামি।

এসব ভণ্ডামির বিষয়গুলো আরও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন ইমারাহ। মুহাম্মদ ইমারাহ বলেছেন, পৃথিবীতে দুটি মহাযুদ্ধ হয়েছিল। এ যুদ্ধদুটিকে যথাক্রমে ১ম ও ২য় বিশ্বযুদ্ধ বলা হয়। এসব যুদ্ধে সকল দেশ অংশ নেয়নি, কিন্তু তা সত্ত্বেও এদেরকে বিশ্বযুদ্ধ বলা হয় কেন? এগুলো তো স্পষ্টতই সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ; একটি সাম্রাজ্যের সাথে আরেকটা সাম্রাজ্যের যুদ্ধ। ইউরোপের জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পারিক যুদ্ধ চলছিল। সেই যুদ্ধে ভাগাভাগি করতে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্য কার ভাগে পড়বে— এই নিয়ে সমস্যার সূত্রপাত। তারা দেখতে পেল, মধ্যপ্রাচ্যে উসমানী খেলাফতের একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে; একে ক্ষয়িষ্ণু করে দিতে হবে। অতএব, উসমানী খেলাফতের উপরে একটা ঐক্যবদ্ধ আক্রমণ প্র‍য়োজন। তারই ধারাবাহিকতায় ১ম মহাযুদ্ধ হয়েছে। তাই, আমরা যেটিকে বিশ্বযুদ্ধ বলছি, সেটি আসলে একটি ঔপনিবেশিক যুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ। তারা এই সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের মাধ্যমে সবাইকে দেখাচ্ছে যে, “আমরা (ইউরোপীয়রা) যা করব তা-ই সার্বজনীন, তা-ই বৈশ্বিক। আমরা যুদ্ধ করেছি, তাই আমাদের যুদ্ধকে তোমরা বিশ্বযুদ্ধ বলবে”— তাদের এই ভণ্ডামিগুলোকে আমাদের প্রশ্নবিদ্ধ করতে হবে। এরপর আমরা সভ্যতার যে Clash বা সংঘাত— তা নিয়ে কথা বলতে পারব। কিন্তু, কেউ যদি শুরুতেই তাকে মহান, ইউনিভার্সাল বা সার্বজনীন ধরে নেয়, তাহলে সে আর সামনে অগ্রসর হতে পারবে না।

সভ্যতার সম্পর্ক তার স্থানের সাথে এবং প্রতিটি সভ্যতাই তার স্থানিক চরিত্রকে ধারণ করে— সেই স্থানের কালচার, সেখানকার মানুষের ধর্ম, চিন্তা-ভাবনা, মানসিকতা, সেখানকার সমাজ ব্যবস্থা ইত্যাদিকে ধারণ করে। এসবের উপর ভিত্তি করেই সভ্যতা নিজেকে দাঁড় করায়। তাই, একটি আঞ্চলিক সভ্যতা কোনভাবেই আরেকটি অঞ্চলের জন্য প্রযোজ্য হতে পারে না; ইউনিভার্সাল বা সার্বজনীন হতে পারে না। এসব প্রশ্ন আমাদের তুলতে হবে।

সভ্যতার দ্বন্দ্ব

যেহেতু, সভ্যতা তার স্থানের সাথে সম্পর্কিত, কাজেই একটি সভ্যতার সাথে আরেকটি সভ্যতার দ্বন্দ্ব লাগবেই। জমির সীমানার নিয়ে একজনের সাথে আরেকজনের যেমন ফ্যাসাদ লাগে, পাশাপাশি দুটি দেশের সীমান্ত নিয়ে যেমন সংঘাত হয়, তেমনি একটি সভ্যতার সাথে আরেকটি সভ্যতার সংঘাত অবশ্যম্ভাবী, অনিবার্য।

রাসূল ﷺ- এর একটি হাদিস রয়েছে — “যেভাবে দস্তরখানার চারপাশে মানুষ এসে জড়ো হয়, সেভাবে বিশ্বের অন্য সকল উম্মত তোমাদের উপর এসে আক্রমণ করবে।” ( আবু দাউদ: ৪২৯৭) সেই সময়টিই আমরা পার করছি, যখন পৃথিবীর অন্যান্য সকল জাতিগোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধভাবে মুসলিমদের উপর আক্রমণ শুরু করেছে। এই পর্যায়ে এসে ইসলামী সভ্যতার পতন নিয়ে আলোচনা কেন জরুরি? এটা তো অতীত— অতীত নিয়ে আমরা কেন পড়ে থাকব? এজন্যই পড়ে থাকব যে, ইসলামী সভ্যতার যে পথচলা, সেই পথচলায় পতনের পেছনে যে সকল অনুঘটক বা কারণ ছিল তা আমাদের বুঝতে হবে। কেননা এর কারণগুলোকে যদি আমরা খুঁজে বের করে বিশ্লেষণ করতে না পারি, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারব না।

আরেকটা ব্যাপার খেয়াল করুন— পৃথিবীর কোনো সভ্যতাই ১৪০০ বছর টিকে থাকেনি। ইবনে খালদুন বলেছেন, তিন প্রজন্ম পর্যন্ত একটা শাসনব্যবস্থা বা সভ্যতা টিকে থাকে। তিন প্রজন্ম মানে মোটামুটি ১২০ বছর। সেখানে, মুসলিম উম্মাহ বা মুসলিম সভ্যতা প্রায় ১৪০০ বছর টিকে ছিল! কাজেই, ১৪০০ বছর পরে যে মুসলিম সভ্যতার পতন হয়েছে— এটা কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। এজন্যই আমাদের সভ্যতার পতনের অনুঘটকসমূহ আমরা বিশ্লেষণ করব ভবিষ্যতের জন্য। আমাদের অতীত নিয়ে পড়ে থাকার সময় নেই— আমরা ভবিষ্যতের দিকে যেতে চাই, ভবিষ্যৎকে নির্মাণ করতে চাই, একটা ইসলামী সভ্যতা গড়ে তুলতে চাই। এ কারণেই আমাদের পেছনের ইতিহাস ফিরে দেখা দরকার।

বর্তমান সময়ে ইসলামী সভ্যতার পতনের কার্যকারণ এবং অনুঘটকসমূহ অনুসন্ধান করতে গিয়ে অনেক বড় বড় দার্শনিক এবং ইসলামী চিন্তাবিদ তৈরি হয়েছেন। যেমন: ইবনে খালদুন, মালেক বিন নবী, শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী, ত্বহা আব্দুর রহমান প্রমুখ। তাঁরা ইসলামী সভ্যতার পতন নিয়ে আলোচনা করেছেন।

ইসলামী সভ্যতার পতনের কারণসমূহ

আবুল হাসান আলি নদভী (রহ.) তাঁর “মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কি হারালো?” (ماذا خسر العالم بانحطاط المسلمين) গ্রন্থে লিখেছেন, দুটি জিনিসের সূচনা জানা যায় না। একটি হলো মানুষের ঘুম ও অন্যটি সভ্যতা। একজন ঠিক কোন মুহুর্তে ঘুমানো শুরু করেন সেটা যেমন কোনোভাবেই বলা সম্ভব নয়; ঠিক তেমনি একটি জাতির অধঃপতন ঠিক কখন শুরু হয়েছে তা নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। অর্থাৎ, সভ্যতার পতনের অনুঘটকসমূহ বিভিন্ন সময়ে আস্তে আস্তে তৈরি হয়। এটিকে মালেক বিন নবী বলেছেন— উপনিবেশযোগ্য (Colonizable) হয়ে ওঠা। অর্থাৎ, একটি সভ্যতা একসময় উপনিবেশবাদ (সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আক্রমণ) দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

যেমন: একটি বিল্ডিংকে যদি ধাক্কা দেওয়া হয়, সেটা কি সাথে সাথে পড়ে যায়? সব বিল্ডিং তো আর রানা প্লাজা না যে জামাত-শিবির ধাক্কা দিল, আর বিল্ডিং সাথে সাথে পড়ে গেল! কিন্তু বিল্ডিংটিকে যদি ভাঙার উপযোগী করার পর ধাক্কা দেওয়া হয়, তখন কিন্তু বিল্ডিংটি পড়ে যাবে। একইভাবে একটি সভ্যতার এমনি এমনি পতন হয় না— তাকে ধাক্কা দেওয়ার উপযুক্ত হতে হয়। ইসলামী সভ্যতার ভেতরে এমন অনেক অনুঘটক তৈরি হয়েছিল। এভাবে, এমন একটি সময় এসেছে যখন ইসলামী সভ্যতাকে ধাক্কা দিলেই এটি পড়ে যাবে; কিংবা, পা দিলেই দেবে যাবে। তখন পশ্চিমা সভ্যতা এসে এটিকে ধাক্কা দিয়েছে, আর তা পড়ে গিয়েছে। এভাবেই মুসলিম সভ্যতা অধঃপতিত হয়েছে, উপনিবেশে পরিণত হয়েছে।

এই অবস্থা নানাভাবে তৈরি হয়েছিল। অনেকের মতে, ইসলামিক সভ্যতায় শিক্ষার অভাব ছিল; কারো কারো মতে, প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাব ছিল, সামরিকীকরণ যথাযথ প্রক্রিয়ায় হয়নি। আবার অনেক অর্থনীতিবিদ (যেমন: উমর চাপরা বলেছেন— খিলাফতের পতনের ক্ষেত্রে কিছু অর্থনৈতিক বিষয় ছিল। যেমন: ওয়াকফ ব্যবস্থা। ওয়াকফ ব্যবস্থা এক সময় দুর্বৃত্তপনা ও অব্যবস্থাপনার মধ্যে পড়ে যায়। ফলে, এটির যে শক্ত ভিত্তি ছিল, তা নষ্ট হয়ে যায়। আপনারা হয়ত জেনে থাকবেন, একটি সময় পর্যন্ত ওয়াকফ ব্যবস্থাই মুসলমানদের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছিল। শিক্ষাব্যবস্থাই হোক কিংবা বিভিন্ন দাতব্য কাজ— সবই পরিচালিত হতো ওয়াকফের মাধ্যমে। অনেকেই জেনে অবাক হবেন— বিভিন্ন মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বা ওস্তাদদের ঘোড়ার ঘাস পর্যন্ত ওয়াকফকৃত সম্পত্তি থেকেই ব্যবস্থা করা হতো। এমন একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি ধ্বংস হয়ে যাওয়াকেও অনেকে পতনের জন্য দায়ী করেন। অনেকে পতনের জন্য নৈতিক অবক্ষয়কে দায়ী করেন। আবার অনেকে বলেন, নৈতিক অবক্ষয় পতনের কারণ নয়; বরং ফলাফল। সেসময় মুসলিম সমাজে সেসব নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হয়েছিল, সেগুলো এখনো বিদ্যমান আছে।

তবে, একটি বিষয় সবসময় মুসলিম সভ্যতায় প্রাণ যুগিয়েছে— সেটি হলো শরিয়াহর প্রভাব। এখনো ইসলামী সমাজগুলোতে শরিয়ার প্রভাব আছে। যেমন: কোনো শাসক যখন কুকীর্তি করতে করতে সীমা অতিক্রম করে ফেলে, তখন জনগণ কিন্তু তাকে শরিয়াহর চোখেই দেখে। তারা বলে— এই শাসক ইসলামবিরোধী হয়ে গেছে কিংবা ইসলামের অমুক বিষয়কে সে লঙ্ঘন করেছে। শরিয়াহর এই প্রভাব সমাজে সবসময়ই ছিল। ইবনে খালদুন সমাজে শরিয়াহর উপস্থিতি থাকাটাকে বলেন ‘রাজতন্ত্র এবং খিলাফতের এক ধরনের সমন্বয়’। এটা এখনও আছে। (আধুনিকতার আগ্রাসনের পরেও এখনও শরিয়াহর প্রভাব রয়ে গেছে)

তারবিয়াহ

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো তারবিয়াহ। রাসূল ﷺ মদিনায় আসার আগে যে ১৩ বছর মক্কায় কাটিয়েছেন, সে সময় তিনি সাহাবীদেরকে তারবিয়াহ করেছেন। অর্থাৎ তিনি তাঁদেরকে গড়ে তুলেছেন, ঢেলে সাজিয়েছেন, তাঁদের মূল্যবোধকে শক্তিশালী করেছেন। ফলে, মদিনায় এসে সভ্যতা গড়তে সহজ হয়েছে। তারবিয়াহ ছাড়া সভ্যতা টেকানো সম্ভব নয়। রাগিব সারজানি প্রশ্ন তুলেছেন— যেসময় তারিক বিন জিয়াদ আফ্রিকা জয় করে স্পেনের দিকে যাত্রা করছিলেন, সেসময় কেন ওয়ালিদ ইবনে আব্দুল মালিক খেলাফতকে আর সম্প্রসারিত হতে দেননি? তখন তো চাইলে স্পেনের পরে পর্তুগাল এবং ইউরোপের অন্যান্য অংশও জয় করা যেত! কিন্তু, সেই সুযোগ আর হয়ে ওঠেনি। কারণ, ওয়ালিদ ইবনে আব্দুল মালিক বলেছিলেন, “তোমাদের সৈন্য-সামন্ত ফিরিয়ে আনো, আমরা আর সীমানা বিস্তার করতে চাই না।”

তিনি কেন চাননি— এর অনেক রকম ব্যাখ্যা আছে। রাগিব সারজানি দুটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। একটি ব্যাখ্যা হলো— তিনি (ওয়ালিদ ইবনে আব্দুল মালিক) ভয় পেয়েছিলেন যে, তারিক বিন জিয়াদরা সীমানা বিস্তার করে আলাদা একটি খিলাফত প্রতিষ্ঠা করে ফেলে কিনা! তবে, তিনি আরেকটি কারণের কথা বলেছেন, যেটা যৌক্তিক মনে হয়— ওয়ালিদ ইবনে আব্দুল মালিক মনে করেছিলেন, তাঁরা আফ্রিকার যেসব বর্বর জাতিগুলোকে জয় করেছিলেন, তাদেরকে কিন্তু তখনো ইসলামিকরণ করা হয়নি; তাদের তারবিয়াহ সম্পন্ন হয়নি। এভাবে (তারবিয়াহ ছাড়া) সাম্রাজ্য বিস্তৃত হতে থাকলে নানারকম ফিতনা দানা বাঁধতে পারে। আবার, ইসলামের বিরুদ্ধে তারা প্রতিবিপ্লবও শুরু করতে পারে। এই ভয় থেকেই ওয়ালিদ ইবনে আব্দুল মালিক বলেছেন, “সাম্রাজ্য বিস্তার করার দরকার নেই।” অর্থাৎ, তারবিয়াহ অবশ্যই করতে হবে। উপমহাদেশের বিশিষ্ট তাত্ত্বিক মাওলানা মওদুদী (রহ.) বলেছেন— “আমি যে বিচার ব্যবস্থাকে ইসলামিকরণ করব, আমার বিচারক কোথায়? আগে তো আমাকে বিচারক তৈরি করতে হবে।” এটাই হলো তারবিয়াহর জায়গা।

তারবিয়াহর প্রয়োজনীয়তা

দাওয়াতের তিনটি স্তর রয়েছে— তাবলিগ, তাকভিন এবং তানফিস। অর্থাৎ, আপনি আগে প্রচার করবেন, তারপর যাদের মাঝে ইসলাম প্রচার করেছেন তাদেরকে গঠন করবেন। গঠন করার পরে বলবেন— এবার ইসলাম বাস্তবায়ন কর। কেননা, শরিয়াহ শুধুমাত্র চাপিয়ে দিলেই হবে না। এটা তো কোন স্কুল কিংবা ক্যাডেট কলেজ নয় যে, নোটিশবোর্ডে আপনি আইন লিখে দিবেন আর সবাই পালন করা শুরু করে দেবে!

বিশেষত, উপমহাদেশে এটি আরও বেশি সত্য। উপমহাদেশের কোনো বিষয়ই এক কথায় হয়ে ওঠেনি। এখনকার জুলাই সনদের কথাই ধরুন— আপনার কি মনে হয় যে, শুধু জুলাইয়ের ঘোষণাপত্র গলায় ঝুলিয়ে রাখলেই দেশের সবাই ভালো হয়ে যাবে? ফ্যাসিজম দূর হয়ে যাবে? সম্প্রতি সোহাগ নামের যে মানুষটিকে (পাথর দিয়ে) হত্যা করা হলো— এটা কি কোনো সভ্যতার মধ্যে পড়ে? এটা কি বর্বরতা নয়? তাহলে ফ্যাসিজম কোথায় দূর হলো?

ফ্যাসিজম এখনো সমাজে টিকে আছে। এই ফ্যাসিজম শুধুমাত্র জুলাই সনদ দ্বারা যাবে না। বরং, সমাজের ভিতরে একটি গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আর সেই আন্দোলনের মাধ্যমে সবাইকে তারবিয়াহ শিক্ষা দিতে হবে। এটি করা ছাড়া কোনভাবেই ফ্যাসিজম দূর হবে না এবং শরিয়াহ কায়েম করা যাবে না। তা না হলে দেখা যাবে— পরবর্তীতে শরিয়ার বিরুদ্ধেই মানুষ প্রতিবাদ শুরু করে দিয়েছে। তাই, অবশ্যই তারবিয়াহর ব্যাপারটি সম্পন্ন করতে হবে।

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, যখন মঙ্গোলীয়রা মুসলিম বিশ্বে আক্রমণ করল, তখন তারা ক্রুসেডারদের সাথে মিলে একসাথে আক্রমণ শুরু করেছিল। সেসময় মুসলিম বিশ্বে একটি ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। তখনকার শাসনক্ষমতায় যারা ছিলেন, অর্থাৎ, আব্বাসীয়রা মনে করলেন, যেহেতু তাতার ও ক্রুসেডাররা অনেক শক্তিধর, কাজেই আমাদেরকে সামরিকীকরণের দিকে যেতে হবে। তাই, তারা মামলুকদের থেকে প্রচুর শক্তিশালী সামরিক যোদ্ধা নিয়ে আসলেন। কিন্তু, তাদের মধ্যে কোনো শিক্ষা-দীক্ষা ছিল না। তারা কুরআন পড়তে পারত না, আরবি জানত না; তাদের মধ্যে ইসলামী জ্ঞানের অনেক অভাব ছিল। এমতাবস্থায়, তাদেরকে অন্তর্ভুক্ত করার পরে নানা ধরণের ফিতনা দেখা দিল। অর্থাৎ, তারবিয়াহ সম্পন্ন না করে আপনি পরবর্তী ধাপে যেতে পারবেন না— সেটা উচিৎ হবে না।

অতএব, তারবিয়াহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি না থাকার ফলে অনেক জটিলতা সৃষ্টি হয়। মুসলিমদের খিলাফত প্রতিষ্ঠার পরবর্তী আশি বছরের মধ্যে সেটির সীমানা যে এত দ্রুত বিস্তার লাভ করেছিল, এর পেছনে অবশ্যই কারণ আছে। ঐ সময়ে যদি সাম্রাজ্য এত দ্রুত বিস্তার লাভ না করত, তাহলে হয়ত রোমান ও পারস্য সভ্যতা মুসলিমদের গিলে খেতে পারত। তাই, অল্প সময়ে সাম্রাজ্য বৃদ্ধি করাটা তখন  ছিল সময়ের দাবি। তবে, এত দ্রুততার সাথে সাম্রাজ্য বিস্তারের কারণে প্রয়োজনীয় তারবিয়াহ সম্পন্ন করা যায়নি। মুহাম্মদ ইমারা এই তারবিয়াহর অভাবকে ইসলামী সভ্যতার পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ কারণেই পরবর্তীতে মুলুকিয়াহ বা রাজতান্ত্রিক শাসকদের মধ্যে ব্যাপকভাবে তারবিয়াহর অভাব দেখা দিয়েছিল। তারা ক্ষমতার লোভে পাঁচ-ছয় বছরের ছোট শিশুকে হত্যা করত, নিজ বাবা-ভাইকে পর্যন্ত খুন করত। বিভিন্ন সময়ে আমরা সামরিকীকরণের দিকে এত বেশি জোর দিয়েছি যে, বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধর্মীয় জ্ঞান সেভাবে বিকাশ লাভ করতে পারেনি। ১৯৪৮ সালের পরে সম্মিলিত আরবশক্তি যখন ইসরাইলের নিকট পরাজিত হলো, তখন মুসলমানরা অনুভব করল যে, তাদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতে হবে। সেই থেকে শুরু করে এখনও পর্যন্ত  আরবরা প্রতিনিয়ত অস্ত্র কিনে যাচ্ছে— কিন্তু এটা ভাবছে না যে, তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়ন দরকার, তারবিয়াহ দরকার। এটি একটি বড় সমস্যা এবং এ সমস্যাটিই প্রথমে দূর করতে হবে।

সভ্যতা পুনঃনির্মাণ

এবার আসা যাক সভ্যতা পুনঃনির্মাণের বিষয়ে। যদি ইসলামী সভ্যতাকে আমরা পুনরায় নির্মাণ করতে চাই, তাহলে আমাদের কী কী করণীয় রয়েছে? এজন্য আমাদের সামনে কিছু মডেল বা প্যারাডাইম দরকার। এমন কিছু নমুনা দরকার, যা অনুসরণ করে আমরা সামনে এগিয়ে যেতে পারি। এক্ষেত্রে, আমাদের সামনে অনেকেই রয়েছেন— যেমন ইবনে খালদুন রয়েছেন, শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী রয়েছেন, মালেক বিন নবী আছেন— যদিও মালেক বিন নবী পশ্চিমা মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত বলে অনেকে অভিযোগ করেছেন। এছাড়াও আছেন ত্বহা আব্দুর রহমান।//

আমাদের বুঝতে হবে— কেন ইবনে খালদুন এতকাল পরে এসেও জরুরি? তিনি যেসময়ে বড় হয়েছেন, ততদিনে আব্বাসীয়দের পতন হয়ে গিয়েছিল। এরপর তাতারিদের আক্রমণ এবং প্লেগ মহামারীর কারণে মুসলিম সভ্যতা ছিল পর্যুদস্ত। তাঁদের শাসনব্যবস্থা একপ্রকার ভঙ্গুর অবস্থায় চলে গিয়েছিল। এমন একটি সময়ে ইবনে খালদুন জন্মেছিছেন এবং তাঁকে বিভিন্ন সময়ে দেশান্তরিত হতে হয়েছে। যেমন: স্পেন পতনের আগে— অর্থাৎ খ্রিস্টানরা যখন মুসলিমদের থেকে স্পেন দখল করে নিল তার আগ মুহুর্তে তিনি পরিবার নিয়ে তিউনিসিয়ায় চলে এসেছিলেন। সেখান থেকে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে, পরবর্তীতে মিশরে নানা স্থানে ভ্রমণ করতে করতে তার মনে হয়েছে যে,  ইসলামী শাসন ও শাসকদের এমন অবস্থা চলতে থাকলে এই সভ্যতাকে টেকানো যাবে না। ফলশ্রুতিতে তিনি মুকাদ্দিমা লিখতে বসলেন, উমরানের প্রস্তাবনা দিলেন— নতুন করে একটি সভ্যতা কিভাবে নির্মাণ করা যায়, কেনই বা সভ্যতার পতন হয় এর কারণসমূহ কি কি— তা লিখতে শুরু করলেন। এজন্যই ইবনে খালদুন আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

মুসলিম হিসেবে আমাদের  পশ্চিমা দার্শনিকদের দ্বারস্থ হওয়া উচিৎ হবে না। আমরা ইসলামী সভ্যতায় তৈরি হওয়া বিভিন্ন দার্শনিকদের অনুসরণ করতে পারি। ইবনে খালদুনকে আমরা অনুসরণ করব কেন? কারণ, তাঁর মধ্যে তিনটি বৈশিষ্ট্য ছিল। প্রথমত, তিনি ইসলামী ওয়ার্ল্ডভিউকে সামনে রেখে ইসলামী সভ্যতার পতনের কারণগুলো দাঁড় করিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, তিনি শাসকদের পতনের কারণ বিশ্লেষণের মাধ্যমে সভ্যতার পতনের কারণগুলো তুলে ধরেছেন। তৃতীয়ত, ইবনে খালদুনের প্রস্তাবনাটি তুলনামূলকভাবে বিজ্ঞানভিত্তিক ছিল। এসব কারণে আমরা ইবনে খালদুনের আলোচনা গ্রহণ করতে পারি।

এরপর আসা যাক শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী (রহিমাহুল্লাহ) এর ব্যাপারে।তিনি আমাদের উপমহাদেশের মনীষী। তাঁকেকে মুসনিদুল হিন্দ বলা হয়। কেননা, হিন্দুস্তানে যতগুলো মাসলাক ও মানহাজ প্রচলিত, তাদের মোটামুটি সবাই  সূতিকাগার বা মূলসূত্র হিসেবেশাহ ওয়ালিউল্লাহকে মান্য করেন। সুতরাং, তিনি উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাঁর এ বিষয়ে তিন-চারটি তত্ত্ব আছে, যেগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমটি হলো, আর-রা’উল কুল্লি (الرع الكلي)। তিনি (শাহ ওয়ালীউল্লাহ) মনে করেন, মানব সভ্যতা এতদূর আসার কারণ মানুষের মধ্যকার কিছু স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। যেমন: অন্যান্য প্রাণী মনে করে, নিজের স্বার্থ পূর্ণ হলেই তার দায়িত্ব শেষ। এক্ষেত্রে অন্যের কী ক্ষতি হলো– এটা প্রাণীজগতের দেখার বিষয় নয়।যেমন: গরু যখন ঘাস খায়, তখন সে খেয়াল করে না যে, তার মালিকের পাশের জমিতে সে কোনো ক্ষতি করছে কি–না। অনেকটা ডোন্ট কেয়ার (Don’t Care) ব্যাপার-স্যাপার। কিন্তু মানুষ যখন কোনো কাজ করে, তখন সে লক্ষ্য রাখে– তার কারণে অন্যের স্বার্থে আঘাত লাগছে কি–না বা সে অন্যের কোনো ক্ষতি করছে কি–না। মানুষের এই গুণটিকে শাহ ওয়ালিউল্লাহ বলেছেন, “আর-রা’উল কুল্লি, অর্থাৎ সামগ্রিক স্বার্থ। মানুষের ভিতরে এটি থাকার কারণেই মানুষ এ পর্যন্ত এসেছে, পশুদেরর মতো বিলীন হয়ে যায়নি। নতুবা, মানুষ মানুষকেই খেয়ে ফেলত, মানুষখেকো হয়ে যেত; কিন্তু তা হয়নি।

একটা ব্যাপার খেয়াল করুন— পশ্চিমা সভ্যতা কী করেছে? তারা মানুষের এই স্বভাবজাত ফিতরাতগত বৈশিষ্ট্যকে নষ্ট করে দিয়েছে। পশ্চিম দেখিয়েছে যে, তোমাকে উপযোগবাদী হতে হবে। অর্থাৎ, যেখানে তোমার স্বার্থ আছে, লাভ আছে, সেখানেই তুমি কাজ করবে। ফলে, পশ্চিমের পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে এই স্বার্থকেন্দ্রিক বা মুনাফাকেন্দ্রিক বৈশিষ্ট্যের ওপর। একারণেই, সুদ-ঘুষ তাদের কাছে কোনো দোষের ব্যাপার নয়। পশ্চিমা অর্থনীতিতে ইলন মাস্ক যদি কাউকে এক টাকাও দান না করেন, তবুও তিনি অনুতপ্ত হবেন না এবং তাকে আপনি দায়ী করতে পারবেন না। কিন্তু ইসলামী সভ্যতায় যদি আপনি যাকাত না দেন, তবে আপনার খবর আছে! কারণ, আপনি একটি ফরজ বিধান লঙ্ঘন করলেন। এই যে উপযোগবাদী মনোভাব, যা পশ্চিমা সভ্যতায় গড়ে উঠেছে— এটাই তাদেরকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে।কারণ, তাদের সভ্যতাটি ব্যক্তি-মালিকানাকেন্দ্রিক বা ব্যক্তি-স্বার্থকেন্দ্রিক। আপনারা সম্ভবত ড. ইউনুসের একটি সাক্ষাৎকার শুনেছেন, খালেদ মহিউদ্দিনের সাথে, পশ্চিমে থাকার সময়। সেখানে ড. ইউনুস বলেছেন, এই সভ্যতার পতন হবে। কেন পতন হবে? কারণ, এই সভ্যতা মুনাফাকেন্দ্রিক। তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের কথা বলেছেন, মুনাফাকেন্দ্রিক হওয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন– এসব কারণেই এই সভ্যতার পতন হতে পারে।

পুরো পৃথিবীজুড়েই মানুষকে ব্যক্তি-স্বার্থ, ব্যক্তিগত লাভ কিংবা মুনাফার দিকে ধাবিত করা হচ্ছে। মানুষ এই মনোভাব নিয়েই চলছে। ফলে, সে একটি সভ্যতার পতনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। তো, এই (পশ্চিমা) সভ্যতার যদি পতন হয়, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে কোন সভ্যতা দাঁড়াবে— সেটা নিয়েই আমাদের চিন্তা-ফিকির করতে হবে। এজন্যই এসব সেমিনার আয়োজিত হচ্ছে, যেখানে আপনাকে সভ্যতা গঠনের প্রস্তুতি নিতে আহ্বান জানানো হচ্ছে।

শাহ ওয়ালীউল্লাহর আরেকটি তত্ত্ব হলো জারাফা বা নন্দনবোধ। মানুষের মধ্যে নন্দনবোধ রয়েছে। যেমন: আপনি শুধু সিঙ্গারা বা এ-জাতীয় কিছু খেয়েই আপনার পেট ভরতে পারতেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও কেন আপনি ফালুদা খোঁজেন, কেন কাচ্চি খেতে চান? কারণ তা সুস্বাদু, মুখরোচক এবং দেখতে সুন্দর। এই সুস্বাদু বা সুন্দর কিছু বেছে নেওয়ার প্রবণতাকেই বলা হয় নন্দনবোধ—যা অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে নেই। তাদেরকে যা খাওয়ানো হয়, তাই তারা খেয়ে ফেলে।

মানুষ যে পোশাক পরে, সেখানে কোনো ন্যাকড়া বা ছোট কাপড় দিয়েই তো সতর (লজ্জাস্থান) ঢেকে রাখা যেত।তা সত্ত্বেও, কেন আপনি চান যে, পোশাকের বোতামটা একটু সুন্দর হোক? কেন চান যে, কলারটা একটু সুন্দর হোক, বা পোশাকটা একটু টাইট-ফিটিং হোক? কেন বলেন যে, জামা-কাপড়ের রঙ আপনার পছন্দমতোই হতে হবে? কারণ, মানুষের মধ্যে নন্দনবোধ রয়েছে। এ কারণেই সভ্যতা এ পর্যন্ত এসেছে। তা না হলে, সভ্যতা সাদা-কালো জগতেই থেকে যেত। এত নতুন নতুন রঙ-এর পোশাক তৈরি হতো না। আপনারা জানেন কিনা— ব্রিটিশরা এখানে উপনিবেশ স্থাপন করে আমাদের নীল চাষে বাধ্য করেছিল তার অন্যতম একটি কারণ ছিল নীল রঙের প্রতি তাদের প্রবল আকর্ষণ।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বের কথা শাহ ওয়ালিউল্লাহ বলেছেন, সেটি হলো তাকামুল। অর্থাৎ, মানুষ সব সময় পরিপূর্ণতা চায়— যেকোনো জিনিসকে পূর্ণাঙ্গভাবে চায়। আরেকটি তত্ত্ব হলো ইরতিফাকাত।  অনেকেই মনে করেন, ইরতিফাকাত বলতে সংগঠন বা সাংগঠনিকতাকে বোঝানো হয়। যেমন: উবায়দুল্লাহ সিন্ধি এমনটি মনে করেন। তবে, কামালিসহ অনেকেই মনে করেন, এটি দ্বারা সভ্যতার নির্মাণকে বোঝানো হয়। শাহ ওয়ালীউল্লাহ ইরতিফাকাতের তিনটি স্তর দেখিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পৃথিবী তিনটি ইরতিফাকাতের মধ্য দিয়ে এসেছে। প্রথমটি হলো আদিম যুগ, যখন মানুষের মধ্যে বর্বরতা ছিল এবং তারা অনুন্নত ছিল। দ্বিতীয় পর্যায়ে সভ্যতা বিকশিত হয়েছে– যখন শিল্প ও উৎপাদনের ধারণা এসেছে। এরপরে আসে খিলাফতের যুগ—যেটিকে তিনি সভ্যতা বিকাশের তৃতীয় স্তর হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

এরপরে, মালেক বিন নবী একটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব উল্লেখ করেছেন। তিনি মনে করেন, মুসলমানদের সভ্যতার পতনের অন্যতম একটি কারণ হলো সভ্যতার বঞ্চনা। বঞ্চনা বলতে তিনি বুঝিয়েছেন, প্রতিটি সভ্যতা যখন তার আদর্শ, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, মোটিভেশন কিংবা মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলে, তখনই তার পতন ঘটে।

প্রতিটি সভ্যতারই কিছু নিজস্ব মূল্যবোধ থাকে। যেমন: পশ্চিমা সভ্যতার কিছু মূল্যবোধ রয়েছে— মানবাধিকার, সাম্য, স্বাধীনতা ইত্যাদি। এগুলো তার মানদণ্ড। এগুলো না থাকলে তাদের সভ্যতা টিকবে না। যেমন: এলজিবিটিকিউ, ব্যক্তিস্বাধীনতা না থাকলে তাদের সভ্যতা টিকবে না। একইভাবে, মুসলিম সভ্যতারও নিজস্ব কিছু মূল্যবোধ বা ভ্যালুজ (Values) রয়েছে। এগুলো যদি সমাজে না থাকে, তাহলে মুসলিম সভ্যতাও টিকতে পারবে না। তাই মুসলিম সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে হলে বা র্নির্মাণ করতে হলে মুসলিম সভ্যতার মূল্যবোধগুলো নিয়ে আলোচনা করতে হবে।

বিষয়টির সাথে ইবনে খালদুনের একটি কথার মিল আছে। তিনি বলেছেন, কোনো সভ্যতা যখন পতিত হয়, তখন সে– যেই সভ্যতার কারণে তার পতন হয়েছে, সেই সভ্যতার দিকে আঙুল তুলতে ভয় পায়। বিজয়ী সভ্যতাকে সে শক্তিশালী ভাবা শুরু করে। এরই মধ্য দিয়ে বিজয়ী সভ্যতার সংস্কৃতি, চিন্তাভাবনা, জীবনধারা (Lifestyle) — সবকিছুকেই সেই পতিত সভ্যতা আত্মীকরণ করে। এভাবে সে (বিজয়ী সভ্যতায়) মজে যায়; সেই সভ্যতার অনুকরণপ্রিয় হয়ে ওঠে। এটাই ঘটেছে আমাদের সাথে পশ্চিমা সভ্যতার ক্ষেত্রে। আমরা এখন সবকিছুতেই পশ্চিমা সভ্যতার আগাগোড়া অনুকরণকারী– পা থেকে মাথা পর্যন্ত পুরোটাই।

মরিয়ম জামিলার একটি বই রয়েছে—“পশ্চিমা সভ্যতা কি সার্বজনীন?” সেই বইতে তিনি একটি সার্ভের কথা উল্লেখ করেছেন। সিরিয়ার বিধ্বস্ত এলাকায় করা সেই সমীক্ষায় দেখা গেছে, সেখানকার হাইস্কুল ও প্রাইমারি স্কুলের অধিকাংশ বাচ্চারা পশ্চিমা সিনেমা দেখে। তারা বিশ্বাস করে যে, পশ্চিমারা তাদের প্রভু, তাদের শিক্ষক; এবং প্রতিটি মুভিই তাদেরকে পশ্চিমাদের লাইফস্টাইল শেখায়। কি ভয়ঙ্কর একটি ব্যাপার! তাই মারিয়াম জামিলা বলেছেন, মুসলিম বিশ্বে রাজনৈতিক উপনিবেশের অবসান ঘটলেও সাংস্কৃতিক উপনিবেশ থেকে গেছে। এখন আর সাদা চামড়ার ব্রিটিশ সৈন্যরা আমাদের রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়ায় না। কিন্তু, তাদের সংস্কৃতি এখন প্রতিটি ঘরে ঘরে। কাজেই, এই (অপ)সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আমাদের কথা বলতে হবে।

এবার আলোচনার দ্বিতীয় পর্বে আসা যাক– মডার্নিটি তথা আধুনিকতার উদ্ভব– যেই সভ্যতাকে পশ্চিমারা ভণ্ডামি করে “আধুনিক সভ্যতা” নাম দিয়েছে।

মোটা দাগে পশ্চিমা সভ্যতার তিনটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে:
১) আত-ত’আবিউল মা’আদ্দি তথা বস্তুবাদী স্বভাব
২) আত-ত’আবিউল ঊ’নসুলি তথা বর্ণবাদী (Racist) স্বভাব
৩) দ্বান্দ্বিক স্বভাব।

বস্তুবাদী স্বভাবটা এসেছে তাদের ঐতিহ্য, তথা গ্রেকো-রোমান সভ্যতা থেকে। “মডার্নিটি” বলতে বোঝায় ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। অর্থাৎ, আপনার অতীত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া, প্রগতিশীল হওয়া— এটাই আধুনিকতার স্লোগান। কিন্তু আধুনিকতা বা পশ্চিমা সভ্যতা আদতে নিজেই পশ্চাদমুখী। সে এক পা-ও চলতে পারবে না গ্রিক এবং রোমান সভ্যতা ছাড়া। এরিস্টটল, প্লেটো এবং সক্রেটিস ছাড়া সে মোটেও চলতে পারবে না। তার মুখে অনবরত চর্চিত হয় প্রাচীন গ্রিক এবং রোমান দার্শনিকদের নাম। যেমন: যখন অমুক-তমুক শাস্ত্রের জনকের প্রয়োজন পড়ে, তখন তারা অ্যারিস্টটলের দ্বারস্থ হয়। তাহলে সে কি ঐতিহ্যমুখী নয়? সে কি অতীতমুখী নয়? আসলে, সে নিজে অতীতমুখী; তার একটি ঐতিহ্য আছে, অতীত আছে। কিন্তু সে মানুষকে বলছে, “তোমার অতীত ভুলে যাও, প্রগতিশীল হও।” এটা এক ধরনের ভণ্ডামি। সুতরাং, পশ্চিমা সভ্যতার যে বস্তুবাদী স্বভাব, সেটি সে গ্রিক সভ্যতা থেকেই আয়ত্ত করেছে।

রোমানদের মধ্যেও অনেক বস্তুবাদী স্বভাব ছিল। তারা ছিল স্বার্থকেন্দ্রিক বা মুনাফাকেন্দ্রিক। তাদের মধ্যে প্রচুর বস্তুবাদী চিন্তাভাবনা ছিল, প্যাগানিজম ছিল। পশ্চিমা সভ্যতা সেখান থেকেও বস্তুবাদী বৈশিষ্ট্যগুলোকে গ্রহণ করেছে।

অ্যারিস্টটল মনে করতেন, আল্লাহর সাথে পৃথিবীর সম্পর্ক হলো– আল্লাহ হলেন মুহাররিক আউয়াল (প্রথম প্রণোদনাকারী)। অর্থাৎ, আল্লাহ পৃথিবীকে প্রথমবার নাড়া দিয়েছেন বা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। তিনি কেবলই স্রষ্টা, এর বাইরে আর কিছুই নন! তিনি সৃষ্টি করেছেন, কিন্তু সৃষ্টির পরে এর (পৃথিবীর) ভেতরে কী ঘটবে না ঘটবে— সে ব্যাপারে আল্লাহর কোনো ভূমিকা নেই! (নাউযুবিল্লাহ) তিনি একে তুলনা করেছেন ঘড়ির সাথে। যেমন: ঘড়ি নির্মাতা যখন একটি ঘড়ি তৈরি করে দিলেন, এরপর ঘড়িটি কীভাবে চলবে, কখন সময় দেবে—তা আর নির্মাতার হাতে থাকে না। কিন্তু, ইসলাম মনে করে, আল্লাহ হলেন পৃথিবীর প্রতিপালক। যতক্ষণ আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি আছে, ততক্ষণ তাঁর রুবুবিয়্যাত বা প্রতিপালন আছে। একটি মুহূর্তের জন্যও আল্লাহর প্রতিপালন বন্ধ হয় না। অর্থাৎ, স্রষ্টা এবং প্রতিপালকের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

এখানেই পশ্চিমাদের চিন্তাধারার সাথে আমাদেরপার্থক্য। পশ্চিম মনে করে, আল্লাহ তায়ালা পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, কিন্তু এরপর থেকে যা হচ্ছে সবই “ন্যাচারাল” বা বস্তুবাদী। সেখানে পরজগত বলে কিছু নেই। ফলে, পশ্চিমা সভ্যতায় মানুষকেই “সায়্যিদ” বা মালিক মনে করা হয়। তার মালিকানা আছে, সে এই জগতের মালিক। সে চাইলেই পৃথিবীর সবকিছু পরিবর্তন করতে পারে, চাইলে পাহাড় কেটে ধস নামাতে পারে, নদীর প্রবাহ পরিবর্তন করতে পারে, নদীকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, এমনকি একদেশ আরেক দেশের পানি ঠেকিয়ে দিতে পারে। কারণ, সে নিজেকে পৃথিবীর মালিক বা অধিপতি মনে করে।

কিন্তু ইসলাম মনে করে, মানুষ পৃথিবীতে আল্লাহর খলিফা। আপনি-আমি আল্লাহর ইস্তিখলাফ তথা প্রতিনিধিত্ব নিয়ে এসেছি। আমাদেরকে আল্লাহর ইচ্ছা বা চাহিদাকেই বাস্তবায়ন করতে হবে।

মজার ব্যাপার হলো, এই যে ইউরোপ বস্তুবাদী হয়ে গেল– এই বস্তুবাদী ইউরোপকে পরিবর্তন করার জন্য কি কেউ আসেনি? এসেছিল; খ্রিস্টধর্ম এসেছিল। কিন্তু, তেমন কোনো বড় পরিবর্তন আনতে পারেনি। বরং, খ্রিস্টধর্ম ইউরোপে এসে নিজেই পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল। এ কারণেই ইমারা বলেন, গ্রিক ও রোমান সভ্যতা খ্রিস্টধর্মকে গ্রহণ করেনি; বরং খ্রিস্টধর্মই গ্রেকো-রোমান সভ্যতাকে গ্রহণ করেছে এবং নিজেই পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে ইসলামী সভ্যতা ও খ্রিস্টীয় সভ্যতার মধ্যে মৌলিক তফাৎ হলো: খ্রিস্টীয় সভ্যতা যেখানে গেছে, সেখানকার সংস্কৃতিকে আত্মীকরণ করে নিয়েছে। কিন্তু ইসলাম কখনও আত্মীকরণ করেনি; বরং সেই সভ্যতাকে পরিবর্তন করেছে।

পশ্চিমা সভ্যতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি ব্যাপকভাবে বর্ণবাদী বা Racist। এর রেসিজম আপনি খুঁজে পাবেন হিটলারের মধ্যে, নাৎসি বাহিনীর মধ্যে। নাৎসি বাহিনীর যে জার্মান রক্তকেন্দ্রিক অহংকার বা গরিমা — এটি কিন্তু পশ্চিমা সভ্যতাই তাদের ভেতরে তৈরি করে দিয়েছিল। পশ্চিমা সভ্যতা পৃথিবীর অন্যসব সভ্যতাকে Other বা অপর মনে করে। সে (সবসময়) তার সভ্যতার অন্তর্গত দেশগুলোকে মিলেই জোট তৈরি করে।

আরেকটি মজার ব্যাপার হলো, পৃথিবীতে যত ফ্যাসিস্ট, স্বৈরাচার বা জালেম ছিল বা আছে, তাদের বেশিরভাগই বামপন্থা থেকে এসেছে। কেননা, বামপন্থার মধ্যেই বর্ণবাদ বা রেসিজম নিহিত আছে। বামপন্থা ঐতিহাসিক বস্তুবাদ ও দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের কথা বলে সে বলে যে, পৃথিবী দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়েই চলছে; এক সময় ছিল দাস ও মালিকের দ্বন্দ্ব, এখন আছে শ্রমিক ও মালিকের দ্বন্দ্ব এবং তাদের মধ্যে সবসময় দ্বন্দ্বের সম্পর্কই থাকবে। ডারউইনও প্রকৃতির মধ্যে দ্বন্দ্ব খুঁজেছেন। তিনি Natural Selection বা প্রাকৃতিক নির্বাচনের কথা বলেছেন— প্রকৃতির মধ্যেও দ্বন্দ্ব চলছে এবং এই দ্বন্দ্বে যে শক্তিশালী সেই টিকে থাকবে। এগুলো তো আসলে বর্ণবাদী প্রবণতা। ইউরোপ এইসকল ধ্যান-ধারণা নিয়েই উপনিবেশ কায়েম করেছে। তারা আফ্রিকায় গিয়েছে, সেখানকার মানুষকে দাস বানিয়েছে; তাদেরকে আমেরিকায় নিয়ে গেছে। এমনকি তাদেরকে খাঁচার মধ্যে বন্দী করেছে! আমেরিকান ছেলে-মেয়েরা খাঁচার মধ্যে তাদেরকে খোঁচা দিত। যখন আফ্রিকানরা তাদের ভাষায় কথা বলত, তখন আমেরিকানরা ভাবত তারা বোধহয় পশুপাখির মতো চেঁচাচ্ছে। চিড়িয়াখানায় আমরা যেমন বানরের সাথে দুষ্টামি করি, ইউরোপিয়ান এবং আমেরিকানরা আফ্রিকান বন্দীদের সাথে সেভাবেই ব্যবহার করত। এভাবেই তারা একটি কিম্ভূতকিমাকার সভ্যতা গড়ে তুলেছে। এখন তারা তাদের অতীতকে ভুলতে চায়— যে অতীতে দাসব্যবস্থা ছিল, জুলুম-নির্যাতন ছিল, মানুষকে অমানুষ মনে করা হতো। তারা সেই অতীত আড়াল করে এখন আমাদের মানবাধিকার (Human RIghts) শেখাতে এসেছে। কিন্তু, তারা নিজেরা যে রক্তের সাগর ডিঙিয়ে এখানে এসেছে, সেটা তারা কাউকে বলতে দেবে না, বরং সে আপনাকে ভুলিয়ে দেবে। এভাবে পশ্চিমা সভ্যতার ভেতরে সবসময়ই সংঘাত হয়ে এসেছে।

আরেকটি ব্যাপার খেয়াল করুন— আমাদের পাঠ্যপুস্তকে কিভাবে ভুল ইতিহাস শেখানো হয়।আমাদের বলা হয়েছে– “কলম্বাস একজন বিরাট আবিষ্কারক, সে নাকি আমেরিকা আবিষ্কার করেছে!”কিন্তু, কলম্বাসের উদ্দেশ্য কি ছিল? সে কেন আমেরিকা এসেছিল? আসলে সে উপনিবেশ স্থাপন করতে এসেছিল। তার দুটি উদ্দেশ্য ছিল— একটি ছিল এশিয়ার সাথে ইউরোপের বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য নতুন বাণিজ্যপথ খোঁজা, অন্যটি ছিল সমগ্র মুসলিম অঞ্চলকে ঘিরে ফেলা। অথচ, আমাদের কাছে তাকে মহান হিরো হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে!

আমি একজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম— শ্রেষ্ঠ চিত্রকর্ম হিসেবে আমাদের কাছে যে “মোনালিসা”-কে উপস্থাপন করা হয়– এর মধ্যে কী এমন আছে? পরে শুনলাম, এটির মধ্যে নাকি মানবতাবোধ রয়েছে! এটির মধ্যে সবাই কি এমন মানবতাবোধ খুঁজে পায়– আমি তো তা বুঝি না। কেন ওই ছবিটাই মানবিক আর আমার ছবিটা মানবিক নয়? এরকম অদ্ভুত কিছু দৃষ্টিভঙ্গি (Narrative) আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, আর আমরা সেগুলো গিলছি।

আলোচনার শুরুতে আমরা বলেছিলাম, সভ্যতা নির্মাণের ক্ষেত্রে আমাদের করণীয় সম্পর্কে কিছু কথা বলা জরুরি। কেননা, পশ্চিমা সভ্যতা ইতোমধ্যেই তার শেষের দিকে চলে এসেছে। ফুকুয়ামার কথা ভুলে যান। সে ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে বলেছিল, পশ্চিমা উদারনৈতিক বা লিবারেল সভ্যতা তার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে— এটাই নাকি সভ্যতার শেষ– এর পরে নাকি আর কোনো সভ্যতা আসবে না! কিন্তু তার সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। পশ্চিমা সভ্যতা তার পতনের দ্বারপ্রান্তে; এখন নতুন আরেকটি সভ্যতা আসবে। অনেকেই হয়ত হান্টিংটনের Clash of Civilizations তত্ত্বের কথা শুনে থাকবেন। সেখানে তিনি বলেছেন— “এর পরে দুটি সভ্যতা আসতে পারে: একটি চৈনিক এবং আরেকটি ইসলামী।  এই দুটি সভ্যতাকেই আমাদের (পশ্চিমাদের) মোকাবিলা করতে হবে।” এ জন্যই পশ্চিমারা “ওয়ার অন টেরর”-এর মতো প্রকল্প নিয়ে এসেছিল।

ইসলামী সভ্যতা নির্মাণের ক্ষেত্রে আমাদের কিছু মৌলিক চিন্তা-ভাবনা মাথায় রাখতে হবে। ইসলাম আমাদেরকে নতুন নতুন বিষয় আবিস্কার (Innovation) এবং নির্মাণের সুযোগ দিয়েছে। যেমন: ইসলামে দুটি ধারণা রয়েছে: একটি হলো ইস্তিখলাফ—পৃথিবীতে আল্লাহর খলিফা হিসেবে আমরা তাঁর ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করব; অন্যটি হলো তাশদীদ তথা নবায়নের ধারণা। এটিকে আমরা Innovation বা সৃষ্টিশীলতাও বলতে পারি। তবে, কেউ কেউ এটি (তাশদীদ)-কে প্রগতিশীলতা বলতে চান, কিন্তু এটি প্রকৃত অর্থকে ধারণ করে না। কারণ, প্রথমত এতদিনে বামপন্থীরা “প্রগতিশীলতা” শব্দটিকে যথেচ্ছ ব্যবহার করে এর অর্থকে দূষিত ও নষ্ট করে ফেলেছে। তাই, আমরা এই শব্দ ব্যবহার করব না। দ্বিতীয়ত, ওয়ায়েল হাল্লাক বলেছেন, পশ্চিমা সভ্যতা “Theory of Progress” বা “প্রগতিশীলতার তত্ত্ব”-এর মধ্য দিয়ে চলে। কিন্তু, ইসলামের মূলতত্ত্ব প্রগতিশীলতা নয়। ইসলাম নিজেকে একটি ‘Moral Epistemic Paradigm’’ মনে করে। ইসলামী সভ্যতা একটি নৈতিক সভ্যতা। ইসলামী সভ্যতারকাছে নৈতিকতার চূড়ান্ত মানদণ্ড হলো খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগ। খাইরুল কুরুন তথা প্রথম তিন যুগে যেসকল সভ্য মানুষেরা গড়ে উঠেছিলেন এবং নৈতিকতার যে চূড়া তৈরি হয়েছিল– সেটিই আমাদের মানদণ্ড এবং সেখানেই আমরা ফিরে যেতে চাই। আমরা সামনে (ভবিষ্যতে) নতুন কোনো নৈতিকতা বা মোরালিটি খুঁজতে চাই না, আমরা আমাদের সর্বোচ্চ নৈতিকতা পেছনে ফেলে এসেছি।

দ্বিতীয়ত, তাশদীদ আর ইসলাহ (Reformation)এক নয়। Reformation মানে হলো সংস্কার, আর তাশদীদ মানে হলো নবায়ন। এদের মধ্যে পার্থক্য হলো: সংস্কার মনে করে, অতীতে অনেক ভুল ঘটনা ঘটে গেছে– সেই ভুলগুলোকে সংশোধন করা দরকার। যেমন: পশ্চিমে রিফর্মেশন হয়েছে; কারণ প্রোটেস্ট্যান্টরা মনে করত, ক্যাথলিকরা অনেক ভুল কাজ করেছে– ধর্মের ভেতরে অধর্ম ঢুকিয়েছে, ইন্ডালজেন্স বা মুক্তিপত্র বিক্রি করেছে; ফলে ধর্ম নষ্ট হয়েছে। তাই তারা ভেবেছিল, নষ্ট জিনিসকে মেরামত করতে হবে। কিন্তু, ইসলাম পেছনের ঘটনাগুলোকে নষ্ট মনে করে না। ইসলাম মনে করে, প্রতি ১০০ বছরে একজন করে মানুষ পাঠানো হবে, যে ধর্মকে নবায়ন করবে। অতীতের ঘটনাগুলো নিজস্ব সময়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল। এখন যেহেতু নতুন সময় এসেছে, তাই আমাদের চিন্তা-ভাবনাকে নতুনভাবে গড়তে হবে। তাশদীদে দ্বীন তথা ধর্মের নবায়ন মানে কিন্তু কুরআন বা হাদিসের টেক্সট পরিবর্তন নয়, বরং ধর্মকে কেন্দ্র করে যে নতুন চিন্তা-ভাবনা গড়ে উঠেছে সেগুলোকে (কুরআন-হাদিসের আলোকে) পরিবর্তন করাই হলো তাশদীদ। এজন্যই যুগে যুগে বিভিন্ন মুজাদ্দিদ এসেছেন। একেকজন মুজাদ্দিদের একেক রকম কর্মপদ্ধতি, একেক ধরণের মানহাজ। প্রত্যেক মুজাদ্দিদের প্রতিই আমরা শ্রদ্ধাশীল। ইতিহাসের তথা তুরাস (Tradition)-এর প্রত্যেকটি ঘটনাকে আমরা শ্রদ্ধা করি। এখানে আমাদের কোনো বাইনারি নেই। আমরা বলব না যে– শাহ ওয়ালিউল্লাহকে মানবো না কিংবা ইমাম গাজ্জালীকে মানবো না। বরং, সবাই আমাদের অংশ এবং সবার থেকে শিক্ষা নিয়েই আমরা সামনে এগিয়ে যাব।

তৃতীয়ৎ, তাকী উসমানী বলেছেন, পশ্চিমা সভ্যতা আমাদের উপর Orientalismবা প্রাচ্যবাদের মাধ্যমে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে চেপে বসেছে। তাই, পাশ্চাত্যের মোকাবেলায় আমাদের Occidentalism তথা পাশ্চাত্যবাদ তৈরি করতে হবে— অর্থাৎ, পাশ্চাত্যের বিরুদ্ধে সমালোচনামূলক চিন্তাধারা গড়তে হবে। তবে, অনেকসময় অনেকে পাশ্চাত্যবাদের কথা বলে প্রাচ্যবাদি প্রকল্পের পথেই হাঁটেন। যেমন: অনেকে ভুলভাল তত্ত্ব বা চাপিয়ে দেওয়া তত্ত্ব চর্চা করে থাকেন, যা করা যাবে না। সতর্ক থাকতে হবে, যেন পাশ্চাত্যবাদ আবার প্রাচ্যবাদের মতো না হয়ে যায়। কারণ, প্রাচ্যবাদ ইতোমধ্যে পশ্চিমে নিন্দিত। কেউ নিজেকে এখন আর প্রাচ্যবিদ বলে না। অনেকে এখন “প্রাচ্যবাদী” অথবা “প্রাচ্যবিদ” শব্দটিকে গালি হিসেবে ব্যবহার করেন। মোটকথা, ওরিয়েন্টালিজম এখন আর কেউ পছন্দ করে না। মূলত এডওয়ার্ড সাঈদ এবং ওয়ায়েল হাল্লাকদের পরবর্তী সময়ে পশ্চিমে এমন পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

তাকী উসমানী আমাদেরকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন। যেমন: একসময় ইমাম গাজ্জালী,ইমাম রাজি, ইমাম ইবনে তাইমিয়্যারা বিভিন্ন কিতাবাদি লেখার মাধ্যমে যেভাবে পশ্চিমা চিন্তাধারাকে মোকাবেলা করেছিলেন, সেটিই এখন নতুনভাবে আমাদেরকে আবার জাগিয়ে তুলতে হবে। এখন তো আমরা আর গ্রিক সভ্যতার ভেতরে নেই, গ্রিক দর্শন সরাসরি আলোচনাও হয়না। এখন আধুনিক দর্শন এসেছে, আধুনিক সভ্যতা এসেছে। সুতরাং, আমাদের আধুনিক সভ্যতা ও আধুনিক দর্শনকে মোকাবেলা করতে হবে, সেগুলোর মুখোমুখি হতে হবে। সেজন্য আমাদের কিছু গাজ্জালী লাগবে, কিছু ইবনে তাইমিয়্যা লাগবে— যারা সরাসরি পশ্চিমা দর্শন ও  সভ্যতাকে নৈতিকভাবে, জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে, বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে প্রতিরোধ করবেন।

সবশেষে আরেকটি নির্দেশনা, যা তাকী উসমানী, বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসি এবং আবুল হাসান আলী নদভী (রহিমাহুমুল্লাহ) বলেছেন– পশ্চিমের মধ্যে দররাহ (ক্ষতিকর) এবং নাফিয়া (উপকারী) দুটি বিষয়ই রয়েছে। পশ্চিম একই সাথে আমাদের জন্য ক্ষতিকর, আবার কিছু ক্ষেত্রে উপকারীও। যেমন: তাদের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বা জ্ঞানের নতুন নতুন শাখা— সেগুলো থেকে উপকৃত হওয়াতে সমস্যা নেই। কিছুদিন আগে আমেরিকা ইরানকে হামলা করেছিল। সেসময় তারা যে প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে, আমরা কেন সেগুলো তৈরি করব না? এটি আমরা অবশ্যই করতে পারি।

এসব প্রস্তাবনার মধ্য দিয়ে তাকী উসমানী আমাদেরকে জাগতে বলেছেন— পশ্চিমের যা উপকারী, তা গ্রহণ করতে, আর ক্ষতিকর দিকগুলো বর্জন করতে বলেছেন।

আশা করি, উপরোক্ত আলোচনার মধ্য দিয়ে আমি পাঠকদের নিকট ইসলামী সভ্যতার পতনের অনুঘটকগুলো তুলে ধরতে পেরেছি এবং আধুনিক সভ্যতা যেসব ভিত্তি বা পাটাতনের উপর দাঁড়িয়ে আছে, সেসব বিষয়ে খোলাসা করতে পেরেছি। আল্লাহ তায়ালা উক্ত আলোচনা থেকে সবাইকে উপকৃত হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমীন।

টীকা

১। উমরান হলো এমন জ্ঞান যা মানুষের সমাজ ও প্রকৃতির বিভিন্ন অবস্থা ও ইতিহাস সম্পর্কিত জ্ঞান।

৩। মরিয়ম জামিলা (১৯৩৪-২০১২) একজন আমেরিকান বংশোদ্ভূত নারী, যিনি ইহুদিধর্ম থেকে ইসলাম গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে (১৯৬১ সাল থেকে) তিনি পাকিস্তানে বসবাস শুরু করেন। তিনি ইসলাম নিয়ে বেশ কিছু বই লিখেছেন, যার বেশ কয়েকটি বাংলায় অনুবাদ হয়েছে।

৪। হামিদ দাবাশি (১৯৫১-) একজন ইরানি-আমেরিকান অধ্যাপক। তিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে ইরানিয়ান স্টাডি ও তুলনামূলক সাহিত্যে অধ্যাপনা করছেন।

৫। মুহাম্মদ ইমারাহ (১৯৩১–২০২০) ছিলেন একজন মিশরীয় ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক, সম্পাদক। তিনি কায়রোর আল-আজহার ইউনিভার্সিটির ইসলামী গবেষণা বিভাগের সদস্য ছিলেন।

৬। মালেক বিন নবী (১৯০৫-১৯৭৩) ছিলেন একজন আলজেরীয় লেখক, দার্শনিক, সমাজবিজ্ঞানী ও বিংশ শতাব্দীর অন্যতম চিন্তাবিদ। তিনি মুসলিম সভ্যতার পতন, পুনর্জাগরণ এবং ‘উপনিবেশযোগ্যতা’ (Colonizability) তত্ত্বের জন্য সুপরিচিত।

৭। ত্বহা আবদুর রহমান (১৯৪৪-) একজন মরোক্কান দার্শনিক ও চিন্তাবিদ। বাংলায় তার একটি বইয়ের অনুবাদ বের হয়েছে- “ফালসাফা, আধুনিকতা ও ট্রাডিশন” যা লেখক (খালিদ মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ) নিজেই অনুবাদ করেছেন।

৮। রানা প্লাজা ধস: ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারে রানা প্লাজা নামে একটি নয়তলা ভবন ধসে পড়ে। এ দূর্ঘটনায় সরকারি হিসাব অনুযায়ী ১১৭৫ জন শ্রমিক নিহত এবং দুই হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়। সেসময় বিএনপি-জামায়াত জোটের হরতাল চলছিল। সেসময় এক সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর বলেন, “হরতাল সমর্থকরা রানা প্লাজার ফাটল ধরা দেয়ালে ও গেট ধরে নাড়াচাড়া করাতেই পুরো ভবন ধসে পড়েছে।”

৯। উমর চাপরা (১৯৩৩-) একজন ব্রিটিশ ভারতীয় বংশোদ্ভূত ইসলামী অর্থনীতিবিদ। তিনি সৌদি আরবে অবস্থিত ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের (Islamic Development Bank, IDB) ইসলামী গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (Islamic Research & Training Institute, IRTI)- এর গবেষণা উপদেষ্টা ছিলেন।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles
পাশ্চাত্যবাদমডার্নিটিসমসাময়িক বিশ্লেষণ

আধুনিকতা কি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে আরোও ধার্মিক করে তুলছে?

পাশ্চাত্যবাদ•April 4, 2026পাশ্চাত্যবাদমডার্নিটিসমসাময়িক বিশ্লেষণআধুনিকতা কি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে আরোও ধার্মিক করে তুলছে?রিফাহ তাসফিয়াহ...