শরিফ ওসমান হাদির সমাজভাবনা

আমার আজকের আলাপে আপনারা কিছুটা কষ্ট পেতে পারেন। অডিয়েন্স গ্রুপের চেহারার সাথে আমার এক ধরণের সাযুজ্য থাকায় অনেকে আমাকে ‘জাত ভাই’ মনে করেন, কিন্তু আপনাদের সাথে আমার দূরত্বের জায়গাটি শুরুতেই পরিষ্কার করা প্রয়োজন। হয়তো আজকের পর ‘মুসলিম মাইন্ডস’ থেকে আমি আর কোনো দাওয়াত পাব না, তবুও বলতে দ্বিধা নেই যে, এখানে নারী অংশগ্রহণ থাকা অত্যন্ত জরুরি ছিল। মোট জনসংখ্যার অর্ধেককে বাদ দিয়ে কোনো বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব। এটি হয়তো আপনাদের পলিসি, কিন্তু আমার পছন্দ-অপছন্দের স্বাধীনতা থেকে আমি মনে করি, এ জাতীয় আলোচনা শুধু পুরুষদের জন্য হওয়া উচিত নয়।
চব্বিশের অভ্যুত্থান এবং বাংলাদেশের ‘কালচারাল হেজিমনি’ নিয়ে দীর্ঘ তাত্ত্বিক আলোচনার অবকাশ আছে। কিন্তু আমি বরং আমার ব্যক্তিগত জীবনের কিছু বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতার আলোকে একটি কো-রিলেশন তৈরির চেষ্টা করব। আমার অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট; আমি খিলাফতের প্রশ্ন তুলি না কিংবা বাংলাদেশে ইসলামি শাসনের আবশ্যকতা নিয়ে আমার বিশেষ আগ্রহ নেই। আমার মূল মনোযোগের জায়গা হলো—বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মতত্ত্বের বাইরেও একটি অত্যন্ত শক্তিশালী সাংস্কৃতিক উপাদান। এমনকি এখানকার অমুসলিমরাও প্রাত্যহিক কথোপকথনে ‘ইনশাআল্লাহ’ বলে, ক্রিকেটাররা সেঞ্চুরি করে সিজদা দেয়। অথচ বিড়ম্বনা হলো, জনৈক আলিমকে প্রশ্ন করা হয় ক্রিকেট খেলে সিজদা দেওয়া জায়েজ কি না। মানুষ ক্রিকেট খেলা উপভোগ করছে ঠিকই, কিন্তু সিজদার বৈধতা নিয়ে দ্বিধান্বিত হচ্ছে—এই সংকটের জায়গাটি বোঝা জরুরি।
আমার সালাফি বন্ধুরা আমাকে পছন্দ করেন না এবং আমি তা উপভোগ করি। আমি প্রায়ই ‘খোদা’ শব্দটা ব্যবহার করি, যা শুনে আমার শুভাকাঙ্ক্ষীরা সওয়াবের আশায় আমাকে ‘আল্লাহ’ বলতে নসিহত করেন। এই মানুষগুলোর নিয়তে কোনো খুঁত নেই, তাদের মন ইসলামের জন্য কাঁদে; কিন্তু তাদের সঠিক বিচারবুদ্ধি ও দক্ষতার অভাব রয়েছে। এই দক্ষতার অভাবেই নব্বই শতাংশ মুসলিমের এই জনপদে তাদের রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রিক ক্ষমতা মাত্র নয় শতাংশের ঘরে সীমাবদ্ধ। বাংলাদেশে ইসলামকে সাংস্কৃতিক বা রাষ্ট্রীয়ভাবে এগিয়ে নেওয়ার পথে তথাকথিত ‘বামপন্থা’ বা ‘এজেন্সি’ যতটা ক্ষতি করেছে, তার চেয়ে আশি শতাংশ বেশি ক্ষতি করেছে এই ‘না বোঝা’ ইসলাম প্রেমী মর্দে মুজাহিদরা।
গত পাঁচ মাসে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর যে উত্থান, তার ফ্রেমিংটি লক্ষণীয়। আমরা যখন শাহবাগে স্বৈরাচার পতনের শোকরানা স্বরূপ ‘গণসিজদা ও দ্রোহের গান’ আয়োজন করলাম, তখন এই নামকরণের মধ্য দিয়ে একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক বয়ান তৈরি করতে চেয়েছি। অথচ এই নতুন ফ্রেমিংটি গ্রহণ করা অনেকের জন্যই সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে যারা প্রথাগত শাহবাগী ঘরানার চিন্তায় অভ্যস্ত।
শাহবাগী মহলের জন্য এটাই এখন বড় ক্রাইসিস। তারা বুঝতে পারছে যে, আমরা সেই দেওয়ালটি টপকাতে পারি আর না পারি, অন্তত বিষয়টিকে সঠিকভাবে অ্যাড্রেস করতে সফল হয়েছি। এতদিন যে বিষয়গুলো দিয়ে তারা তাদের সাংস্কৃতিক হেজিমনি তৈরি করে রেখেছিল এবং ক্ষমতার রাজনীতি ছাপিয়ে রাষ্ট্রের ভেতর এক সমান্তরাল রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিল, আমরা ঠিক তাদের সেই পলিটিক্যাল জায়গাটিতেই আঘাত করতে পেরেছি। এ কারণেই বর্তমান সময়ে শাহবাগের বড় শত্রু হিসেবে শিবির বা বিএনপি নয়, বরং ইনকিলাব মঞ্চ আবির্ভূত হয়েছে।
যখন আমরা ‘গণসিজদা ও দ্রোহের গান’-এর ডাক দিলাম, তখন একটি টেলিভিশন চ্যানেল থেকে আমাকে প্রশ্ন করা হলো—এই দুটি বিপরীতমুখী জিনিস একসাথে কেন? মজার ব্যাপার হলো, শোকরানা হিসেবে যখন আমরা সবাই মিলে সিজদা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম, সেখানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই শামিল হয়েছিলেন। আমি স্পষ্ট করে বলেছিলাম যে, এটি প্রথাগত ধর্মীয় সিজদা নয়, বরং একটি ‘পলিটিক্যাল সিজদা’; তাই অজু না থাকলেও এতে অংশ নিতে কোনো বাধা নেই। সেখানে আমাদের প্রায় ১৫-২০ জন বোন ছিলেন, যাদের অনেকের মাথায় হয়তো তখন কাপড় ছিল না, কিন্তু সিজদার মুহূর্তে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাপড় টেনে নিয়ে অংশগ্রহণ করলেন।
এই ঘটনার পর আমাকে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে—এতে কি আমার জান্নাত লাভ হলো কিংবা আমি ইসলামের কী উপকার করলাম? আমার উত্তর খুব সোজাসাপ্টা; আমি জান্নাত কামাই বা ইসলামের উপকারের জন্য এটি করিনি। আমি চেয়েছি এই জনপদে ‘মুসলিম আইডেন্টিটি’র ওপর যে অস্পৃশ্যতার তকমা সেঁটে দেওয়া হয়েছে, তা ভেঙে ফেলতে। কোনো ফরমাল সেশনে কিছু শব্দ উচ্চারণ করলে যে তথাকথিত ‘জাত’ থাকে না বলে মনে করা হয়, আমরা সেই ন্যারেটিভকেই চ্যালেঞ্জ করেছি।
টেলিভিশন ইন্টারভিউতে যখন প্রশ্ন করা হলো ‘গণসিজদা কেন?’, আমি তার উত্তরে বলেছিলাম—ফ্যাসিবাদের চর্চা যে কেবল ক্ষমতায় নয়, বরং মানুষের মনন ও সাংস্কৃতিক অভ্যাসেও মিশে থাকে, আপনার এই প্রশ্নটিই তার প্রমাণ। মানুষ তার আনন্দ বা বিজয় একেকভাবে উদযাপন করে—কেউ সিজদা দেয়, কেউ গান গায়, কেউ দৌড় দেয় কিংবা কেউ মোমবাতি জ্বালায়। যাঁর যা ইচ্ছা তিনি সেভাবেই তা প্রকাশ করবেন; কিন্তু সিজদাকে কেন আলাদা করে প্রশ্নের মুখে ফেলা হবে—মূল লড়াইটা সেখানেই।
কারো ইচ্ছা হলে এখানে কনসার্ট করবে, কেউ মাহফিল করবে, কারো ইচ্ছা হলে যাত্রা করবে কিংবা কেউ সিজদা দিবে—এটাই স্বাভাবিক। যাত্রা বা কনসার্ট যদি সাংস্কৃতিক ব্যাপার হতে পারে, তবে মিলাদ মাহফিল বা সিজদা কেন কেবল ‘ধর্মীয়’ ফ্রেমে বন্দি থাকবে? আমি যখন এই প্রশ্নটি করলাম, তখন উত্তরদাতা নিরুত্তর ছিলেন। আমার অবস্থান পরিষ্কার—মুসলমানরা যদি বলে কনসার্ট করা যাবে না, তবে আমি সেই নিষেধাজ্ঞার বিপক্ষে। কনসার্ট বন্ধ না করে বরং আপনারা এমন উন্নতমানের মাহফিলের আয়োজন করুন, যেখানে মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখে কনসার্ট এমনিতেই জনশূন্য হয়ে যায়।
তিউনিসিয়ার রাশিদ আল-ঘানুশিকে যখন প্রশ্ন করা হলো যে, ইসলামি বিপ্লবের পরও সেখানে কেন মদ বিক্রি হয়? তিনি অত্যন্ত চমৎকার একটি উত্তর দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, মদ নিষিদ্ধ করা তাঁর কাজ নয়; বরং মানুষের মধ্যে এমন সচেতনতা তৈরি করা তাঁর কাজ যাতে তারা নিজ থেকেই মদ খাওয়া ছেড়ে দেয়। মানুষ যদি মদ কেনা বন্ধ করে দেয়, তবে দোকানদার এমনিতেই ব্যবসা পরিবর্তন করতে বাধ্য হবে। কিন্তু জোর করে বন্ধ করলে তা কেবল ব্ল্যাক মার্কেটে বিক্রি হওয়া শুরু করবে।
সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের ময়দানটি বুঝতে হবে। মেট্রো রেলের পিলারে আমরা যতীন সেনের বড় ছবি দেখি। তাঁকে ‘হিরো’ হিসেবে কারা প্রতিষ্ঠিত করেছে, তা আমরা জানি। কিন্তু মুশকিল হলো, পাশের চারটি পিলার যখন ফাঁকা পড়ে থাকে, তখন আমাদের তথাকথিত ‘ডানপন্থী’রা কেবল গালিগালাজেই লিপ্ত থাকেন। কেউ ছবি আঁকা জায়েজ কি না, কার্টুন আঁকা ঠিক কি না—এমন সব ফাতওয়ার বেড়াজালে আটকে থাকেন। ফলে ওই ফাঁকা পিলারগুলো আর আমাদের সৃজনশীলতা দিয়ে পূর্ণ হয় না। আমার কাছে ইসলামের প্রকৃত খিদমত হলো এমন কাজ করা, যা অন্তত বৃহত্তর মুসলিম মেজরিটির স্বার্থের বিপক্ষে যায় না।
গত পাঁচ মাসে কাজ করতে গিয়ে আমরা যে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছি, তা অনুধাবন করা জরুরি। সম্প্রতি জাতিসংঘের একটি ডেলিগেশনের সাথে জুলাই বিপ্লবে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী দশজন তরুণের বসার সুযোগ হয়েছিল, যেখানে আমিও আমন্ত্রিত ছিলাম। সেখানে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—বাংলাদেশ পৃথিবীর কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। আপনি বিশাল কিছু করে ফেললেন বললেই হয় না; আপনার কারেন্সির রেট কে ঠিক করে দিচ্ছে, আপনার সার্বভৌমত্বের স্টেকহোল্ডার কারা—এগুলো বাস্তব বিবেচনার বিষয়।
যতদিন পর্যন্ত আপনি অন্যের কারেন্সি রেট নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা অর্জন না করছেন, ততদিন আপনাকে আলোচনার টেবিলে থাকতে হবে। আলাপ-আলোচনা এবং রিকনসিলিয়েশনের মধ্য দিয়েই আপনাকে পথ চলতে হবে। এটাই হলো প্রকৃত ‘হিকমাহ’ বা প্রজ্ঞা। বিচ্ছিন্ন হয়ে না থেকে আলোচনার দুয়ার খোলা রেখে কতটুকু অর্জন করা সম্ভব, সেটাই এখনকার মূল পলিসি হওয়া উচিত।
সেই বৈঠকের গল্পটা বলি। আমরা মোট ১০ জন ছিলাম, যার মধ্যে দুইজন ছিলেন অন্য ঘরানার—যাদের আপনারা সাধারণত বৈরী মনে করেন। একজন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের, অন্যজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। বাকি আটজনের প্রত্যেকেরই নিজস্ব অবদান আছে; কেউ কেউ তৃণমূলের আন্দোলন নিয়ে কাজ করছে, কেউ জুলাই আর্কাইভ নিয়ে। জাতিসংঘ থেকে আসা প্রতিনিধি দল মূলত আন্দোলনের একেবারে ভেতরকার কথা শুনতে চেয়েছিলেন।
সেখানে প্রথম সংকটটা লক্ষ্য করুন। ওই দুইজন প্রতিনিধি তাদের চিন্তাভাবনা এবং ইনপুটগুলো চমৎকার ইংরেজিতে ব্রিফ করলেন। আপনারা জানেন, যখন কোনো বক্তব্য ইন্টারপ্রেট করা হয় বা অনুবাদকের মাধ্যমে বলা হয়, তখন তার মূল স্পিরিটের অর্ধেকই হারিয়ে যায়। বাকি যে ছেলেমেয়েরা ছিল, তারা অত্যন্ত ‘গুড বয়’, পরিশ্রমী এবং জুলাই বিপ্লবকে টিকিয়ে রাখতে জানপ্রাণ দিয়ে লড়ছে। কিন্তু শুরুতে ইংরেজিতে ইন্ট্রোডাকশন দেওয়ার পর তারা আর স্বাচ্ছন্দ্যে বলতে পারছিল না। তখন তাদের বাংলায় বলতে বলা হলো এবং অন্য একজন তা অনুবাদ করে দিচ্ছিল। আমি শুনছিলাম, তারা বাংলায় যা বলছিল, অনুবাদের সময় তার ৫০ শতাংশ মেসেজও ঠিকমতো পৌঁছাচ্ছিল না। অথচ রাজপথে তারা কী অমানুষিক কষ্ট করেছে! একদম শেষ দিকে আমি যখন ইংরেজিতে কথা বললাম, তখন দেখা গেল প্রতিনিধি দল বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করল।
এবার শতাংশের হিসাবটা বুঝুন। আমাদের দেশের সবথেকে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এই ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশে তারা নিজেরাই জানে না যে তাদের বোকা বানানো হচ্ছে। আমি তো বলি, আমরা সংখ্যায় ৯০ শতাংশ না হয়ে যদি ৯ শতাংশ হতাম, তবে অন্তত ‘মাইনরিটি’ হিসেবে কিছু সুযোগ-সুবিধা পেতাম। মুখে ৯০ শতাংশের দাপট দেখালেও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কিংবা ক্ষমতার রাজনীতিতে আমরা আজ ৯ শতাংশের চেয়েও নগণ্য মাইনরিটি। অথচ আমরা চিৎকার করে নিজেদের সংখ্যাধিক্যের বড়াই করি।
আপনার এই ৯০ শতাংশের কোনো স্টেক কি কোথাও আছে? নেই। সেই অবস্থান তৈরি করতে হলে যে ‘স্কিল’ বা দক্ষতা প্রয়োজন, সেখানেই আমাদের আসল ঘাটতি। ওই বৈঠকে অন্য ঘরানার দুইজন তাদের দক্ষতা দিয়ে পুরো পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিল, আর আমাদের আটজনের মধ্যে মাত্র একজন কথা বলতে পারল, বাকিরা পারল না। এর অর্থ অত্যন্ত স্পষ্ট—আমাদের মূল সমস্যাটা আসলে দক্ষতার।
আমাদের অনেক ভাইবোন যখন আমাদের প্রোগ্রামে আসেন, তারা আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, “ভাই, প্রয়োজনে জীবন দিয়ে দেব।” তারা হিপোক্রেসি করে এটা বলেন না, তারা সত্যিই জীবন দিতে চান। কিন্তু আল্লাহ তো শুরুতেই জীবন দিতে বলেননি; বরং আগে নিজের সামর্থ্য বা ‘মাল’ দিয়ে সাহায্য করতে বলেছেন। এখানে ‘মাল’ মানে হলো আপনার দক্ষতা বা স্কিল।
আমাদের যেসব বন্ধু মাদরাসায় বা আরবি বিভাগে পড়েন, তাদের আমি বলি না যে আপনাদের ইংরেজি শিখতেই হবে। কিন্তু আপনারা কি কাতার বা সৌদি অ্যাম্বাসিতে গিয়ে দুর্দান্ত সাবলীল আরবিতে আমাদের কথাগুলো বুঝিয়ে বলতে পারেন?
দুর্ভাগ্যবশত, তারা তা পারেন না। এমনকি একটি প্রেস রিলিজ দিলে সেটির মানসম্মত আরবি অনুবাদ করতেও তাদের হিমশিম খেতে হয়, যা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো পত্রিকায় ছাপানোর যোগ্য হয় না। আবার যারা ইংরেজিতে পড়েন, তাদের বলি—আমাদের এই মুভমেন্টের খবরগুলো সিএনএন বা আল-জাজিরায় পৌঁছানোর মতো করে অন্তত ইংরেজিতে লিখে দিন। সেখানেও দেখা যায় চরম ব্যর্থতা; সাধারণ একটি ব্যানার লিখতে গেলেও দশটি বানান ভুল থাকে।
দেশের বহু মানুষ চান ‘প্রথম আলো’ বন্ধ হোক। কিন্তু এই ‘বন্ধ হোক’ চিৎকার করার কারণেই প্রতিষ্ঠানটি আরও ১০০ বছর টিকে থাকবে। গায়ের জোরে বা চিৎকার করে প্রথম আলো বন্ধ করা যাবে না; বরং প্রথম আলোর বিপরীতে এর চেয়ে উন্নত মানের দশটি সংবাদমাধ্যম তৈরি করতে পারলেই কেবল তাদের আধিপত্য কমানো সম্ভব। আমাদের কর্মীরা সঠিক ‘অ্যাক্টিভিজম’ বোঝেন না। তারা প্রথম আলোর অফিসের সামনে গিয়ে এমন কাণ্ড করলেন, যা উল্টো সরকারকেই বাধ্য করল প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের পক্ষে অবস্থান নিতে।
অ্যাক্টিভিজমের তো একটা ন্যূনতম ধারণা থাকতে হয়। গত ১৫ বছরে ডেইলি স্টার বা প্রথম আলো যাদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক ন্যারেটিভ তৈরি করে জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে, তাদের উচিত ছিল আগে একত্রিত হওয়া। তারা প্রেস ক্লাবে গিয়ে তাদের বিরুদ্ধে করা রিপোর্টগুলো নিয়ে তথ্যভিত্তিক প্রেস ব্রিফিং করতে পারতেন। এরপর সব নথিপত্র নিয়ে প্রেস ইনস্টিটিউটে যেতেন, প্রতিবাদ জানাতেন। এরপর প্রতিকার চেয়ে আদালতে যেতেন। যখন সব জায়গা থেকে ব্যর্থ হতেন, তখন বলতেন যে আমরা সব আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক পথ চেষ্টা করেও বিচার পাইনি।
অথচ আপনারা কী করলেন? কারওয়ান বাজারে গিয়ে দাঁড়ালেন। আপনাকে আন্তর্জাতিকভাবে ‘জঙ্গি’ হিসেবে ট্যাগ করার চেষ্টা চলছে, অথচ আপনার হাতে একটা ইংরেজি প্ল্যাকার্ড পর্যন্ত নেই। আপনারা ডেইলি স্টারের সাইনবোর্ড সরালেন, কিন্তু তাতে কিচ্ছু হয়নি। উল্টো রাজশাহীতে প্রথম আলোর সাইনবোর্ড ছিনিয়ে নেওয়ার এমন সব ছবি ও ভিডিও পাঠানো হলো যা দেখে সহজেই কাউকে ‘আইএস’ এর সাথে তুলনা করা যায়। ফলাফল হিসেবে আমেরিকান অ্যাম্বাসি উদ্বেগ জানাল এবং সরকার তাদের নিরাপত্তা দিতে বাধ্য হলো।
আপনাদের বোঝা উচিত ছিল যে, এই সরকারটি অন্তত আমাদের গণ-অভ্যুত্থানের ফলে আসা সরকার। আগে তো প্রথম আলোর সামনে যাওয়ার সাহসই কেউ পেত না, এখন যেতে পারছেন—এটাই সরকারের নমনীয়তার প্রমাণ।
আপনারা নূন্যতম কৌশল না বুঝে সব সুযোগ প্রথম আলোর হাতে তুলে দিয়ে আসলেন। যদি না পারতেন, তবে চুপ করে বসে থাকতেন; আপনাদের এই হঠকারী কাজ করতে কে বলেছে? এই কথাগুলো বললে আমাদের ভাই-ব্রাদাররা আহত হন, মনে কষ্ট পান। আমি বাইরের লোকজনকে কম বলি, নিজের ঘরের লোকজনকে আরও বেশি বলি। দেখুন, মুষ্টিমেয় কিছু ইয়াহুদি আজ সারা দুনিয়া দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, আর আমরা কোটি কোটি মুসলমান কেবল মার খেয়ে চিৎকার করছি। এর মূলে রয়েছে ‘স্কিল’ বা দক্ষতা, যা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এক লক্ষ সাধারণ মানুষের চেয়ে একশো জন দক্ষ মানুষ অনেক বেশি শক্তিশালী। আমাদের কি এমন দশজন লোক আছে, যারা সিএনএন বা আল-জাজিরায় গিয়ে দুর্দান্ত ইংরেজি বা আরবিতে আমাদের অবস্থান তুলে ধরবে এবং প্রতিপক্ষের ফ্রেমিং ভেঙে দেবে?
আমাদের দেশের দেশপ্রেমিক মানুষেরা তাদের শত্রুকে চিনতে পর্যন্ত ভুল করে। যুদ্ধের প্রথম শর্ত হলো শত্রু সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান রাখা। আপনার শত্রু কে, তার পলিসি কী, সে কীভাবে এই অবস্থানে এল—এসব স্টাডি করার ধৈর্য আপনাদের নেই। এখন সবাই মিলে দায়িত্ব দিয়েছে ‘আমার দেশ’ পত্রিকাকে; যেন তারাই প্রথম আলোকে উৎখাত করবে। অথচ আমরা কেন ১০টি বিকল্প ‘প্রথম আলো’ তৈরি করতে পারছি না? যারা ‘আমার দেশ’-এর প্রশংসা করেন, তারাই আবার পরের দিন সেখানে কোনো নারীর ছবি দেখলে ‘নাউজুবিল্লাহ’ বলে মুখ ফিরিয়ে নেন।
সংকটটা ঠিক এখানেই। আমাদের একজন নারী উপস্থাপক যখন ইউটিউবে জঙ্গি নাটক নিয়ে নিউজ করেন, তখন নিচে কমেন্টে মানুষ বলে—‘নারীকে রাখা ঠিক হয়নি’। আরে ভাই, প্রতিষ্ঠানের পলিসি কী হবে সেটা কি আপনি ঠিক করে দেবেন? আমি যদি পারতাম, তবে এমন একটা ফ্রেমিং তৈরি করতাম যেখানে একজন টি-শার্ট পরা মেয়ে আমাদের টকশো হোস্ট করবে আরবিতে, আর একজন সম্পূর্ণ পর্দা করা বোন, যার শুধু চোখ দুটি দেখা যায়, তিনি দুর্দান্ত ইংরেজিতে আন্তর্জাতিক মহলের প্রশ্নের উত্তর দেবেন। আমাদের এই প্রচলিত ধারণাটা ভাঙা দরকার যে, বোরকা পরা মেয়েরা ইংরেজি জানে না কিংবা টি-শার্ট পরা মেয়েরা আরবি বলতে পারে না।
এই ফ্রেমিং ভাঙার জন্য যে সাহস ও ধীশক্তি দরকার, তা অর্জন করার ধৈর্য আমাদের অনেকেরই নেই। আমি নিজে মাদ্রাসার ছাত্র, আলিয়া মাদ্রাসা থেকে আলিম পাস করেছি। আমার নানা পক্ষ দেওবন্দি ঘরানার বড় আলিম, আর দাদা পক্ষ চরমোনাই ঘরানার। আমার নিজের জেনারেশনের মধ্যে আমি হয়তো সবথেকে ‘আল্ট্রা মডার্ন’, যাকে আপনারা গালিগালাজ করেন। কিন্তু আমার অ্যাক্টিভিজমে আমি আপনাদের মতো আবেগী ভাইদের কখনোই ‘টার্গেট অডিয়েন্স’ মনে করি না। কারণ, কেবল আবেগী মানুষদের নিয়ে লক্ষ্য বা মাকসাদে পৌঁছানো সম্ভব নয়। আমার এই কথায় আপনারা হয়তো অফেন্ডেড হচ্ছেন, তবে সত্যটা মেনে নেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশের আলিম সমাজ ও আমাদের রাজনৈতিক চিন্তার সীমাবদ্ধতা নিয়ে এবার কিছু জরুরি কথা বলা প্রয়োজন। মাসখানেক আগে সাংবাদিক ইলিয়াস ভাইয়ের একটি সেশনে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, যেখানে জসিমুদ্দিন রহমানি ও মুফতি হারুন ইজহার হুজুরও উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের সামনেই আমি সাহসের সাথে একটি কথা বলেছিলাম—আমি আপনাদের রাজনীতি পছন্দ করি না, কিন্তু আপনাদের চেহারার কারণে আপনাদের ওপর ‘জঙ্গি’ ট্যাগ দিয়ে যে নির্যাতন করা হয়, তার ঘোর বিরোধী আমি। আমার রাজনীতি মূলত সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে।
একটি মৌলিক প্রশ্ন আপনাদের করতে চাই—বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মভিত্তিক এতগুলো রাজনৈতিক দল আছে, কিন্তু হিন্দু ধর্মভিত্তিক কোনো রাজনৈতিক দল নেই কেন? আপনাদের উচিত অন্তত দুই-তিনটি হিন্দু রাজনৈতিক দল গঠনে সহায়তা করা। আমরা গর্ব করে বলি যে ‘আমরা মন্দির পাহারা দেই’। কিন্তু মন্দির কেন অরক্ষিত থাকবে যে আপনাকে পাহারা দিতে হবে? এই পাহারার কথা বলার মানেই হলো সেখানে নিরাপত্তাহীনতা আছে। যদি হিন্দু ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল থাকত, তবে তারা নিজেরাই তাদের দাবিগুলো সঠিক জায়গায় পৌঁছাতে পারত। এতে আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের ‘হিন্দু কার্ড’ খেলার রাজনীতি চিরতরে বন্ধ হয়ে যেত। এমনকি এমনও হতে পারত যে কোনো হিন্দু দল জামায়াত বা খেলাফত মজলিসের সাথে জোট বেঁধে নতুন এক রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি করত। কিন্তু আমরা তো হিন্দু দল গঠনের কথা শুনলেই গালিগালাজ শুরু করব।
ইসকন প্রসঙ্গে আসি। গত দশ বছর ধরে ইসকন কী করছে, তা আমরা সবাই জানি। তাদের কর্মকাণ্ডের বড় ভিক্টিম ছিল কওমি বা সালাফি আলিমরা। কিন্তু ইনকিলাব মঞ্চ যেভাবে ইসকনকে মোকাবিলা করেছে, তা কোনো আলিম বা হুজুর হিসেবে নয়। আমরা কেবল মুসলমানের কী ক্ষতি হচ্ছে সেই আবেগী বয়ান দিইনি। বরং আমরা তথ্য-প্রমাণসহ তাদের অনুমতির উৎস খুঁড়ে বের করেছি, সংসদের আইন প্রিন্ট করে এনে দেখিয়েছি যে তাদের অ্যাক্টিভিজম প্রচলিত আইনের পরিপন্থী কি না। আমাদের এই প্রপার হোমওয়ার্ক এবং সঠিক অ্যাক্টিভিজমের কারণেই রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত কথা বলতে বাধ্য হয়েছে।
বাস্তবতা হলো, প্রতি জুমুআর পর বায়তুল মুকাররমে হাজার হাজার মানুষের মিছিল হলেও তা কোনো জাতীয় দৈনিকে গুরুত্ব পায় না। অথচ বাম ঘরানার ১০ জন মানুষের মিছিলও বড় বড় শিরোনাম হয়। এর কারণ হলো তাদের নিজস্ব মিডিয়া এবং সঠিক নেটওয়ার্কিং আছে। আপনি যদি প্রপার হোমওয়ার্ক করে মাঠে নামেন, তবে আজ হোক বা কাল, আপনার কাজের ইমপ্যাক্ট অবশ্যই তৈরি হবে। ইনশাআল্লাহ।
দ্বিতীয়ত যে বিষয়টি কেউ অ্যাড্রেস করে না তা হলো—একটি ছোট মিছিল বা সমাবেশকে ‘নিউজ আইটেম’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে কী কী প্রয়োজন, তা বাংলাদেশের ডানপন্থীরা জানে কি না? আপনাদের কাউকে জিজ্ঞেস করলে কেউ এর উত্তর দিতে পারবেন না।
আগামীকালের কোনো প্রোগ্রামের তথ্য মিডিয়া হাউজগুলোতে কত ঘণ্টা আগে পাঠাতে হয়, তা কি আপনারা জানেন? প্রতিটি মিডিয়া হাউজ তাদের পরের দিনের অ্যাসাইনমেন্ট আগের দিন বিকেল ৫টার মধ্যে চূড়ান্ত করে ফেলে। শুধু ফোনে বলে দিলে নিউজ হয় না; ৫টার আগেই পুরো প্রোগ্রামের বিস্তারিত বিবরণ সুন্দর ভাষায় মেইল করতে হয়। আপনার ফ্রেমিং যদি আকর্ষণীয় হয়, তবে সাংবাদিকরা একদিন, দুদিন বা তিনদিন পর অবশ্যই আসবে। আপনারা ১১টার প্রোগ্রাম লিখে যদি পৌনে একটায় শুরু করেন, তবে সাংবাদিকরা কি আর আসবে? ১১টার প্রোগ্রাম ১১টাতেই শুরু করতে হবে—এটি অত্যন্ত সাধারণ একটি শিষ্টাচার।
আরেকটি বাস্তবতার কথা বলি। আপনারা বিরাট মিছিল করছেন, কিন্তু মিছিলের সামনে একটিও ইংরেজি ব্যানার নেই। আপনাদের মিছিলে এমন চেহারার মানুষ আছেন, যাদের খুব সহজেই ‘জঙ্গি’ হিসেবে পোট্রে করা যায়; অথচ আন্তর্জাতিক মহলের কাছে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করার জন্য আপনাদের হাতে কোনো ইংরেজি প্ল্যাকার্ড বা ব্যানার নেই। এই প্রস্তুতির অভাবেই ৯০ শতাংশ মানুষের এই দেশে আপনারা মাত্র ৯ শতাংশ পাওয়ার বা ক্ষমতা নিয়ে হাহুতাশ করেন। আর যাদের সংখ্যা ৯ শতাংশের কম, তাদের স্টেক বা দখল আজ ৯০ শতাংশ। আপনারা ব্র্যাক বা প্রথম আলোর বিরুদ্ধে কথা বলেন, কিন্তু তাদের সাথে নেগোশিয়েট করার মতো যোগ্যতাসম্পন্ন ১০ জন মানুষও খুঁজে পাওয়া যায় না।
ফ্যাসিবাদ যখন পালালো, তখন বাংলাদেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রো-ভিসি, রেজিস্ট্রার ও ট্রেজারার নিয়োগের জন্য কমপক্ষে ২৫০ জন দক্ষ লোকের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, স্ক্যানার দিয়ে খুঁজেও তেমন দক্ষ লোক পাওয়া যাচ্ছিল না। আপনারা বিকল্প তৈরি করবেন কী দিয়ে?
তাই আমার এই বকাঝকা বা চিল্লাপাল্লার মধ্য দিয়ে যদি কেউ রাগ করেও আজ এই ওয়াদা নিতে পারেন যে—মাদরাসায় পড়ি ঠিক আছে, কিন্তু এমন আরবি শিখব যা দিয়ে দুনিয়া কাঁপিয়ে দেব। শুধু কিতাবি আরবি নয়, বরং সমকালীন ভাষায় দক্ষ হতে হবে। যেন আপনাদের মিছিলের মাঝে যখন আমরা মাইক্রোফোন ধরব, তখন আপনি তিন মিনিটে এমন এক ব্রিফ দেবেন যা আল-জাজিরা, সিএনএন কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের অ্যাম্বাসিগুলোতে পাঠানো সম্ভব হয়। অন্তত বাংলাটাই যদি করেন, তবে তা যেন হয় অত্যন্ত মানসম্পন্ন এবং প্রভাবশালী।
আমাদের অনেক ভাই আছেন যারা আবেগভরে বলেন, ‘ভাই, প্রয়োজনে জীবন দিয়ে দেব।’ অথচ তাদের যখন বলি, ‘ভাই, জীবন দিতে হবে না। তোমার তো ছবি তোলার শখ, চলো তোমাকে একটা ভালো ফটোগ্রাফি কোর্সে ভর্তি করিয়ে দিই,’ তখন তারা দশটা অজুহাত দেখান। তারা জীবন দিতে রাজি, কিন্তু দক্ষতা অর্জন করতে রাজি নন। আমাদের এখন দক্ষ ভিডিওগ্রাফার দরকার, স্পেশালাইজড মানুষ দরকার। কিন্তু অবস্থা এমন যে, সবাই সবকিছু একটু আধটু করতে চায়, অথচ কোনো বিষয়েই উসতাদ হতে পারে না। মনে রাখবেন, এখন আর মাল্টি-ট্যালেন্টেড হওয়ার দিন নেই, এখন স্পেশালাইজেশনের যুগ। আপনি যদি আরবিতে দক্ষ হন, তবে সেটি দিয়েই বিশ্ব কাঁপাতে হবে। যদি ভিডিওগ্রাফি করেন, তবে আপনাকে হতে হবে দেশের সেরা দশজনের একজন। এরকম মাত্র ২০ জন দক্ষ মানুষ আমাকে দিন, এক বছরের মধ্যে আমরা দৃশ্যপট বদলে দেব ইনশাআল্লাহ।
সংগঠন বা অ্যাক্টিভিজম চালাতে গেলে প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয়ে নজর দিতে হয়। এই যে বিশাল ব্যানারের মাপ কত হবে, ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল থেকে ছবিটা কেমন আসবে—এসব সূক্ষ্ম বিষয়গুলো আমাদের মাথায় রাখতে হয়। ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব জাবেরের ব্যাগে সবসময় রশি, কস্টেপ, ব্লেড থাকে যাতে মিছিলের ব্যানার ছিঁড়ে গেলে তৎক্ষণাৎ মেরামত করা যায়। এখনো আমাকে ব্যানারের বানান থেকে শুরু করে মিছিলের বক্তৃতা পর্যন্ত একা সামলাতে হয়। ওয়ান ম্যান আর্মি দিয়ে তো বড় পরিবর্তন সম্ভব নয়। স্লোগান দেওয়ার জন্যও দক্ষ লোক পাওয়া দুষ্কর; একটু ক্লান্ত হলেই তারা ভুলভাল স্লোগান দিতে শুরু করে।
সাংস্কৃতিক লড়াইয়ে আমাদের অবস্থান পরিষ্কার। প্রগতিশীল বা শাহবাগীরা আমাদের ‘হুজুর’, ‘শিবির’ বা ‘জঙ্গি’ ট্যাগ দিয়ে কোণঠাসা করতে পারে না, কারণ আমরা তাদের চেয়েও শক্তিশালী বয়ান তৈরি করেছি। জুলাই বিপ্লব নিয়ে ইনকিলাব মঞ্চের ‘লাল জুলাই’ গানটি তার প্রমাণ। শাহবাগীরা আমাদের ওপর যত অসভ্য গালিগালাজ বর্ষণ করে, আমরা তার চেয়েও কঠোর ভাষায় তাদের জবাব দিই। আমি চাই এই লড়াইয়ের সব দায়ভার ও গালিগালাজ আল্লাহ আমাকে দিন, আমার ভাইদের দিন; তার বিনিময়ে কেবল আমার সেই মুসলিম ভাইবোনরা স্বাধীন নাগরিক হিসেবে মাথা উঁচু করে বাঁচুক যারা দিনের পর দিন বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজপথে নির্যাতিত হয়েছে।
আমি আপনাদের সাথে অনেক খোলাখুলি এবং হয়তো কিছুটা রূঢ় কথা বললাম। কোনো সিরিয়াস তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং একজন ভাই হিসেবে মনের কথাগুলো শেয়ার করলাম। ভুলত্রুটি হলে মার্জনা করবেন। সবাইকে ধন্যবাদ।
আসসালামু আলাইকুম। ইনকিলাব জিন্দাবাদ।
শ্রুতিলিখনঃ
শাহেদ হাসান,
রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, দ্য মুসলিম মাইন্ডস






![পাশ্চাত্যবাদ [OCCIDENTALISM]](https://themuslimminds.org/storage/2025/09/পাশ্চাত্যবাদ-OCCIDENTALISM-1024x446.jpeg)




Comments