মহাবিশ্বের উৎপত্তি নিয়ে কুরআনের বর্ণনা কি আজও প্রাসঙ্গিক?

অনেকে দাবি করেন, কুরআন আধুনিক মহাকাশবিজ্ঞানের বিরোধী। কুরআন অনুযায়ী পৃথিবী আকাশ ও নক্ষত্রের আগে সৃষ্টি হয়েছে।
এই নিবন্ধটিতে কুরআনের সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলোর ভাষাগত গঠন, আলঙ্কারিক উদ্দেশ্য এবং ব্যাখ্যার প্রাচীন ধারাগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে যে, এমন অভিযোগ মূলত আয়াতের ভুল ব্যাখ্যার ফল। যারা এমন দাবি করেন, তারা কুরআনের বর্ণনার গভীরতা ও বহুমুখী বৈশিষ্ট্যকে উপেক্ষা করেছেন।
একটি আপত্তি
আল্লাহ বলেন,
قُلْ أَئِنَّكُمْ لَتَكْفُرُونَ بِالَّذِي خَلَقَ الْأَرْضَ فِي يَوْمَيْنِ وَتَجْعَلُونَ لَهُ أَنْدَادًا ۚ ذَٰلِكَ رَبُّ الْعَالَمِينَ ۞ وَجَعَلَ فِيهَا رَوَاسِيَ مِنْ فَوْقِهَا وَبَارَكَ فِيهَا وَقَدَّرَفِيهَا أَقْوَاتَهَا فِي أَرْبَعَةِ أَيَّامٍ سَوَاءً لِلسَّائِلِينَ ۞ ثُمَّ اسْتَوَىٰ إِلَى السَّمَاءِ وَهِيَ دُخَانٌ فَقَالَ لَهَا وَلِلْأَرْضِ ائْتِيَا طَوْعًا أَوْ كَرْهًا قَالَتَا أَتَيْنَا طَائِعِينَ ۞ فَقَضَاهُنَّ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ فِي يَوْمَيْنِ وَأَوْحَىٰ فِي كُلِّ سَمَاءٍ أَمْرَهَا ۚ وَزَيَّنَّا السَّمَاءَ الدُّنْيَا بِمَصَابِيحَ وَحِفْظًا ۚ ذَٰلِكَ تَقْدِيرُ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ
‘বলুন, তোমরা কি সেই সত্তাকেই অস্বীকার করছ যিনি পৃথিবীকে দুই দিনে সৃষ্টি করেছেন? এবং তোমরা কি তাঁর সমকক্ষ দাঁড় করাচ্ছ? তিনিই তো বিশ্বজগতের প্রতিপালক। তিনি পৃথিবীতে ওপর থেকে পাহাড় স্থাপন করেছেন, তাতে বরকত দিয়েছেন এবং চার দিনে সেখানে খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন—প্রয়োজনপ্রার্থীদের জন্য যা সমান।
তারপর তিনি আসমানের দিকে মনোযোগ দিলেন, তখন তা ছিল ধোঁয়া। অতঃপর তিনি আসমান ও জমিনকে বললেন, ‘তোমরা উভয়ে আসো—ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়।’ তারা বলল, ‘আমরা স্বেচ্ছায় আসলাম।’ তারপর তিনি দুই দিনে আকাশমন্ডলীকে সাত আসমানে বিন্যস্ত করলেন এবং প্রতিটি আসমানে তার বিধান পৌঁছে দিলেন। আর আমি নিকটবর্তী আসমানকে প্রদীপ (নক্ষত্র) দ্বারা সুশোভিত ও সংরক্ষিত করেছি। এটা মহাপরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ সত্তার নির্ধারিত ব্যবস্থা।’ [কুরআন ৪১ : ৯-১২]
আক্ষরিকভাবে পড়লে যে কেউ ওপরের আয়াতগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। তারা বলতে পারেন যে, এই বর্ণনা মহাবিশ্বের উৎপত্তি সম্পর্কে আমাদের বর্তমান ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক। এখানে সৃষ্টির ক্রম উল্টে দেওয়া হয়েছে এবং মহাকাশ বা আসমান সৃষ্টির আগেই পৃথিবী সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে।
এমন প্রশ্নের ভিত্তি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ প্রাক-আধুনিক যুগে মানুষের মধ্যে এই ধারণা প্রচলিত ছিল যে, পৃথিবী আগে সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি অনেক প্রাচীন মুফাসসির বা কুরআন ব্যাখ্যাকারকও এই মতটিকে পছন্দ করতেন। উদাহরণস্বরূপ, ইবনু কাসির রাহ. এই মতের পক্ষেই যুক্তি দিয়েছেন। তিনি একটি দালানের উদাহরণ টেনেছেন—যেখানে পৃথিবীকে দালানের ভিত্তি এবং আকাশকে ছাদ হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। ইবনু কাসির আরও দাবি করেছেন যে, আদি যুগের প্রধান তাফসিরকারকদের মধ্যে কেবল কাতাদাহ রাহ. বিশ্বাস করতেন যে আকাশ পৃথিবীর আগে সৃষ্টি হয়েছে; বাকিরা এর উল্টোটি মনে করতেন।1
তাই স্বাভাবিকভাবেই দুটি প্রশ্ন জাগে:
- এই আয়াতগুলোর মহাজাগতিক বা সৃষ্টিতত্ত্বীয় ব্যাখ্যা কী?
- এই আয়াতগুলো কি আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক?
এই নিবন্ধে আমরা এই দুটি প্রশ্ন নিয়েই সরাসরি আলোচনা করব। এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করার অসংখ্য পথ থাকলেও, আমরা অতি-আধুনিক কোনো বিমূর্ত যুক্তি এড়িয়ে চলব। বরং ইসলামের ট্রেডিশনাল জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোর আলোকেই এর সমাধান খোঁজার চেষ্টা করব। ইনশাআল্লাহ, কোনো পাঠক এমনটি বলার সুযোগ পাবেন না যে, এখানে মূল প্রশ্নটিকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে বা এর প্রধান দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়নি।
একাধিক অর্থ
যখন কেউ উপরে উল্লেখিত সমস্যার মতো কোনো দ্বিধায় পড়েন, তখন তা সমাধানের বেশ কিছু পথ থাকে। আমি এখানে একটি তিন স্তরের পদ্ধতি প্রস্তাব করছি। এই পদ্ধতিটি বক্তব্যের উদ্দেশ্য এবং এর গ্রহণযোগ্যতাকে গুরুত্ব দেয়। পদ্ধতিটি নিম্নরূপ২:
১. রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে আরবরাই ছিলেন ওহির প্রথম সম্বোধনকারী। ওহি সবার আগে তাদের কাছেই পৌঁছেছিল। তাদের কাছে এই আয়াতের মূল উদ্দেশ্য কী ছিল, তা খতিয়ে দেখা।
২. আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক নয়—এমন ব্যাখ্যাগুলো গ্রহণ করা। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন জোর করে কোনো অর্থ চাপিয়ে দেওয়া না হয়।
৩. যেসব ব্যাখ্যা আধুনিক প্রমাণিত জ্ঞানের সাথে সরাসরি মিলে না, সেগুলো বাদ দেওয়া।
এটি কোনো আধুনিক বা নতুন পদ্ধতি নয়। বরং অনেক আগে থেকেই কুরআনের বহু ব্যাখ্যাকারক এই নিয়ম মেনে চলেছেন। গত এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে কুরআন এভাবেই বোঝা হয়েছে। আমরা এখন উপরে উদ্ধৃত আয়াতগুলোকে একটি ‘কেস স্টাডি’ হিসেবে ব্যবহার করে এই পদ্ধতিটি বিস্তারিত আলোচনা করব।
একটি বিতর্কমূলক প্রেক্ষাপট
এই আয়াতগুলো বুঝতে হলে আমাদের জানতে হবে এগুলো কোন প্রেক্ষাপটে নাজিল হয়েছিল। সুরার শুরুতেই সেই প্রেক্ষাপট স্পষ্ট করা হয়েছে:
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
حم ۞ تَنْزِيلٌ مِنَ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ ۞ كِتَابٌ فُصِّلَتْ آيَاتُهُ قُرْآنًا عَرَبِيًّا لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ ۞ بَشِيرًا وَنَذِيرًا فَأَعْرَضَ أَكْثَرُهُمْ فَهُمْ لَا يَسْمَعُونَ ۞ وَقَالُوا قُلُوبُنَا فِي أَكِنَّةٍ مِمَّا تَدْعُونَا إِلَيْهِ وَفِي آذَانِنَا وَقْرٌ وَمِنْ بَيْنِنَا وَبَيْنِكَ حِجَابٌ فَاعْمَلْ إِنَّنَا عَامِلُونَ
বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম।
হা-মিম। এটি দয়াময়, পরম দয়ালু আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। এমন এক কিতাব, যার আয়াতগুলো বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে—আরবি ভাষায় এক পাঠ (কুরআন), সেই জাতির জন্য যারা জ্ঞান রাখে। এটি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী, কিন্তু তাদের অধিকাংশই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তাই তারা শোনে না।
তারা বলে, ‘আপনি আমাদের যে বিষয়ের দিকে ডাকছেন, সে ব্যাপারে আমাদের অন্তর আচ্ছাদিত, আমাদের কানে আছে বধিরতা এবং আমাদের ও আপনার মাঝে আছে এক পর্দা। সুতরাং আপনি আপনার কাজ করুন, আমরা আমাদের কাজ করছি।’ [কুরআন ৪১ : ১-৫]
এটি ছিল মক্কি জীবনের কুরআন। তখন এমন এক শ্রোতাগোষ্ঠীকে সম্বোধন করা হচ্ছিল যারা ছিল উদ্ধত এবং সত্য গ্রহণে অনিচ্ছুক। তারা রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে নিয়ে বিদ্রূপ ও ঠাট্টা করত। তিনি যখন ওহি নিয়ে তাদের কাছে যেতেন, তারা মুখ ফিরিয়ে নিত। তারা উপহাস করে বলত যে, তারা বধির এবং হিদায়াত পাওয়ার পথে তাদের সামনে বাধা আছে।
তাদের এই শত্রুতামূলক আচরণের বিপরীতে কুরআন তিনটি স্তরে উত্তর দিয়েছে। তার প্রথম অংশটি হলো:
قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَىٰ إِلَيَّ أَنَّمَا إِلَٰهُكُمْ إِلَٰهٌ وَاحِدٌ فَاسْتَقِيمُوا إِلَيْهِ وَاسْتَغْفِرُوهُ ۗ وَوَيْلٌ لِلْمُشْرِكِينَ ۞ الَّذِينَ لَا يُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَهُمْ بِالْآخِرَةِهُمْ كَافِرُونَ ۞ إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَهُمْ أَجْرٌ غَيْرُ مَمْنُونٍ
বলুন, ‘আমি তো তোমাদের মতোই একজন মানুষ। আমার কাছে ওহি পাঠানো হয় যে, তোমাদের ইলাহ কেবল একজনই। সুতরাং তোমরা তাঁর দিকেই সোজা পথে চলো এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। আর দুর্ভোগ মুশরিকদের জন্য—যারা জাকাত দেয় না এবং পরকালকেও অস্বীকার করে। নিশ্চয়ই যারা ইমান আনে ও নেক আমল করে, তাদের জন্য রয়েছে অফুরন্ত পুরস্কার।’ [কুরআন ১৮ : ১১০-১১২]
এই জবাবের প্রথম স্তরে ইসলামের বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে তুলে ধরা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তিনি যেন তাঁর কওমকে বলেন—তিনি কেবল একজন মানুষ মাত্র, যার কাছে আসমানি হিদায়াত বা ওহি আসে। এখানে বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অবিশ্বাসকে দুনিয়াদারির (এ ক্ষেত্রে কৃপণতা) সাথে এবং বিশ্বাসকে পরকাল ও চিরস্থায়ী সাফল্যের সাথে যুক্ত করা হয়েছে।
এর পরেই আসে সেই আয়াতগুলো, যা নিয়ে আমরা এই নিবন্ধে আলোচনা করছি:
قُلْ أَئِنَّكُمْ لَتَكْفُرُونَ بِالَّذِي خَلَقَ الْأَرْضَ فِي يَوْمَيْنِ وَتَجْعَلُونَ لَهُ أَنْدَادًا ۚ ذَٰلِكَ رَبُّ الْعَالَمِينَ ۞ وَجَعَلَ فِيهَا رَوَاسِيَ مِنْ فَوْقِهَا وَبَارَكَ فِيهَا وَقَدَّرَفِيهَا أَقْوَاتَهَا فِي أَرْبَعَةِ أَيَّامٍ سَوَاءً لِلسَّائِلِينَ ۞ ثُمَّ اسْتَوَىٰ إِلَى السَّمَاءِ وَهِيَ دُخَانٌ فَقَالَ لَهَا وَلِلْأَرْضِ ائْتِيَا طَوْعًا أَوْ كَرْهًا قَالَتَا أَتَيْنَا طَائِعِينَ ۞ فَقَضَاهُنَّ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ فِي يَوْمَيْنِ وَأَوْحَىٰ فِي كُلِّ سَمَاءٍ أَمْرَهَا ۚ وَزَيَّنَّا السَّمَاءَ الدُّنْيَا بِمَصَابِيحَ وَحِفْظًا ۚ ذَٰلِكَ تَقْدِيرُ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ
বলুন, ‘তোমরা কি সেই সত্তাকেই অস্বীকার করছ যিনি পৃথিবীকে দুই দিনে সৃষ্টি করেছেন? এবং তোমরা কি তাঁর সমকক্ষ দাঁড় করাচ্ছ? তিনিই তো বিশ্বজগতের প্রতিপালক। তিনি পৃথিবীতে ওপর থেকে পাহাড় স্থাপন করেছেন, তাতে বরকত দিয়েছেন এবং চার দিনে সেখানে খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন—প্রয়োজনপ্রার্থীদের জন্য যা সমান।
তারপর তিনি আসমানের দিকে মনোযোগ দিলেন, তখন তা ছিল ধোঁয়া। অতঃপর তিনি আসমান ও জমিনকে বললেন, ‘তোমরা উভয়ে আসো—ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়।’
তারা বলল, ‘আমরা স্বেচ্ছায় আসলাম।’
তারপর তিনি দুই দিনে আকাশমন্ডলীকে সাত আসমানে বিন্যস্ত করলেন এবং প্রতিটি আসমানে তার বিধান পৌঁছে দিলেন। আর আমি নিকটবর্তী আসমানকে প্রদীপ (নক্ষত্র) দ্বারা সুশোভিত ও সংরক্ষিত করেছি। এটা মহাপ্রাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ সত্তার নির্ধারিত ব্যবস্থা।’ [কুরআন ৪১ : ৯-১২]
এই আয়াতগুলো রাসুল ﷺ-এর বার্তার সপক্ষে একটি যৌক্তিক ও বুদ্ধিদীপ্ত ভিত্তি প্রদান করে। এগুলো আগের বক্তব্যের যৌক্তিকতা প্রমাণ করে। আরবের মূর্তিপূজকদের প্রশ্ন করা হচ্ছে—যে সত্তা মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন, তাঁকে ছেড়ে তারা কীভাবে প্রাণহীন বস্তুর ইবাদত করে? তাদের বলা হচ্ছে নিচের জমিন আর উপরের আসমানের দিকে তাকাতে। এই সৃষ্টির সৌন্দর্য দেখে যেন তারা বুঝতে পারে—যিনি এত সুন্দর কিছু সৃষ্টি করেছেন, তিনি নিজে কত মহান!
সবশেষে একটি আবেগঘন আহ্বান জানানো হয়েছে। পূর্ববর্তী জাতিগুলো যারা তাদের নবিদের অস্বীকার করেছিল, তাদের পরিণতি সম্পর্কে এখানে সতর্ক করা হয়েছে:
فَإِنْ أَعْرَضُوا فَقُلْ أَنْذَرْتُكُمْ صَاعِقَةً مِثْلَ صَاعِقَةِ عَادٍ وَثَمُودَ ۞ إِذْ جَاءَتْهُمُ الرُّسُلُ مِنْ بَيْنِ أَيْدِيهِمْ وَمِنْ خَلْفِهِمْ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا اللَّهَ ۖ قَالُوا لَوْشَاءَ رَبُّنَا لَأَنْزَلَ مَلَائِكَةً فَإِنَّا بِمَا أُرْسِلْتُمْ بِهِ كَافِرُونَ ۞ فَأَمَّا عَادٌ فَاسْتَكْبَرُوا فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَقَالُوا مَنْ أَشَدُّ مِنَّا قُوَّةً ۖ أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّ اللَّهَالَّذِي خَلَقَهُمْ هُوَ أَشَدُّ مِنْهُمْ قُوَّةً ۖ وَكَانُوا بِآيَاتِنَا يَجْحَدُونَ ۞ فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ رِيحًا صَرْصَرًا فِي أَيَّامٍ نَحِسَاتٍ لِنُذِيقَهُمْ عَذَابَ الْخِزْيِ فِي الْحَيَاةِالدُّنْيَا ۖ وَلَعَذَابُ الْآخِرَةِ أَخْزَىٰ ۖ وَهُمْ لَا يُنْصَرُونَ ۞ وَأَمَّا ثَمُودُ فَهَدَيْنَاهُمْ فَاسْتَحَبُّوا الْعَمَىٰ عَلَى الْهُدَىٰ فَأَخَذَتْهُمْ صَاعِقَةُ الْعَذَابِ الْهُونِ بِمَاكَانُوا يَكْسِبُونَ ۞ وَنَجَّيْنَا الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ
যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে বলুন, ‘আমি তোমাদের আদ ও সামুদ জাতির ওপর আপতিত বজ্রের মতো এক বজ্রের ব্যাপারে সতর্ক করছি। যখন তাদের কাছে আগে ও পেছন থেকে রাসুলগণ এসে বললেন যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদত করো না। তারা বলল, ‘আমাদের প্রতিপালক চাইলে ফেরেশতা পাঠাতেন; তাই তোমরা যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছ তা আমরা অস্বীকার করি।’
আদ জাতি পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে অহংকার করেছিল এবং বলেছিল, ‘আমাদের চেয়ে শক্তিশালী আর কে আছে?’
তারা কি দেখল না যে, আল্লাহ—যিনি তাদের সৃষ্টি করেছেন—শক্তিতে তাদের চেয়ে অনেক বেশি প্রবল? তারা আমার নিদর্শনসমূহ অস্বীকার করত। তাই আমি তাদের ওপর অশুভ দিনগুলোতে এক প্রচণ্ড ঝঞ্ঝাবায়ু পাঠিয়েছিলাম, যাতে তাদের দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনাকর আজাব আস্বাদন করাতে পারি। আর পরকালের আজাব তো আরও বেশি অপমানজনক এবং তারা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে না। আর সামুদ জাতির কথা—আমি তাদের পথ দেখিয়েছিলাম, কিন্তু তারা হিদায়াতের বদলে অন্ধত্বকেই বেছে নিয়েছিল। ফলে তাদের কৃতকর্মের জন্য অপদস্থকারী আজাব তাদের পাকড়াও করল। আর যারা ইমান এনেছিল ও তাকওয়া অবলম্বন করত, আমি তাদের রক্ষা করেছি।’ [কুরআন ৪১ : ১৩-১৮]
লক্ষণীয় যে, অবিশ্বাসীরা আগে দাবি করেছিল যে তাদের অন্তর মোহরবদ্ধ এবং কান বধির, তাই তারা ইমান আনতে পারছে না। এর জবাবে আল্লাহ এখানে এমন এক জাতির উদাহরণ দিয়েছেন যারা অহংকারের কারণে সত্য গ্রহণ করেনি, আর অন্য এক জাতির কথা বলেছেন যারা হিদায়াতের বদলে অন্ধত্বকে বেছে নিয়েছিল। আরবের মূর্তিপূজকদের জন্য এটি ছিল একটি চরম সতর্কবার্তা—তারা যদি একই পথ অনুসরণ করে, তবে তাদের জন্যও এমন ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে।
এই প্রেক্ষাপটেই আমাদের আলোচিত আয়াতগুলো নাজিল হয়েছে। এই আয়াতগুলোর মূল উদ্দেশ্য ভূতাত্ত্বিক বা জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক তথ্য দেওয়া নয়; বরং এর মূল লক্ষ্য হলো আধ্যাত্মিকতা। পৃথিবী ও আকাশের উল্লেখ এখানে আসলে প্রকৃতির নিগূঢ় রহস্য নিয়ে ভাবনার মাধ্যমে স্রষ্টার সান্নিধ্য পাওয়ার একটি আহ্বান।
তৎকালীন শ্রোতারা এখানে বর্ণিত সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে কোনো দ্বিমত পোষণ করেনি; তাদের মূল বিরোধিতা ছিল একত্ববাদ বা তাওহিদের প্রতি। আল্লাহ তাদের প্রশ্ন করছেন—যেহেতু তারা স্বীকার করে যে আল্লাহই এই সুন্দর পৃথিবী ও মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন, তবে কেন তারা তাঁর সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করছে? এই দৃষ্টিকোণ থেকেই আয়াতগুলোকে বুঝতে হবে। এগুলো কোনো বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব বা নিছক মহাজাগতিক বর্ণনা নয়; বরং দৃশ্যমান জগতের বিশালতা দেখে অদৃশ্য স্রষ্টার ওপর বিশ্বাস স্থাপনের একটি জোরালো ডাক।
বিজ্ঞানের সাথে বৈপরীত্যের অনুপস্থিতি
কুরআনের এই অংশটি কোনো বৈজ্ঞানিক আলোচনা নয়। তাই এখান থেকে আধুনিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের হুবহু সমর্থন আশা করা ঠিক নয়। তবে আমাদের যা দেখতে হবে তা হলো—এই আয়াতগুলো কি প্রমাণিত কোনো তথ্যের সাথে সাংঘর্ষিক? অন্য কথায়, মহাজাগতিক ঘটনাগুলোকে আধুনিক বিজ্ঞানের ভাষায় নিখুঁতভাবে বর্ণনা করা এখানে জরুরি নয়। প্রেক্ষাপট বিবেচনায় তেমনটি হওয়া বরং অস্বাভাবিক হতো। এখানে মূল শর্ত হলো—আয়াতগুলো যেন ভুল প্রমাণিত না হয়। একেই বলা হয় ‘অ-সংঘাতের নীতি’ (Principle of Non-contradiction)।
এই পদ্ধতিটি তথাকথিত ‘বৈজ্ঞানিক মুজিজা’ (scientific miracles) বা ‘আল-ইজাজ আল-ইলমি’র চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। সেই তত্ত্বে দাবি করা হয় যে, কুরআনে আধুনিক বিজ্ঞানের সব কথা আগে থেকেই বলা আছে। কিন্তু আমাদের এই পদ্ধতিতে শুধু এটি প্রমাণ করলেই চলে যে, কুরআন আধুনিক বিজ্ঞানের কোনো সত্যকে অস্বীকার করছে না। এই বিষয়ে মূলত দুটি প্রশ্ন তোলা হয়:
১. কুরআন কি দাবি করে যে পাহাড় সূর্য ও নক্ষত্রের চেয়েও পুরনো?
২. কুরআন কি দাবি করে যে মহাকাশ সৃষ্টির আগেই পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে?
আসুন প্রথমে প্রথম প্রশ্নটি নিয়ে আলোচনা করি। বিভ্রান্তিটি মূলত সুরা ফুসসিলাতের ৯ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা থেকে তৈরি হয়। প্রাসঙ্গিক দুটি আয়াত ও অনুবাদ এখানে পুনরায় দেওয়া হলো:
قُلْ أَئِنَّكُمْ لَتَكْفُرُونَ بِالَّذِي خَلَقَ الْأَرْضَ فِي يَوْمَيْنِ وَتَجْعَلُونَ لَهُ أَنْدَادًا ۚ ذَٰلِكَ رَبُّ الْعَالَمِينَ ۞ وَجَعَلَ فِيهَا رَوَاسِيَ مِنْ فَوْقِهَا وَبَارَكَ فِيهَا وَقَدَّرَفِيهَا أَقْوَاتَهَا فِي أَرْبَعَةِ أَيَّامٍ سَوَاءً لِلسَّائِلِينَ
বলুন, ‘তোমরা কি সেই সত্তাকেই অস্বীকার করছ যিনি পৃথিবীকে দুই দিনে সৃষ্টি করেছেন? এবং তোমরা কি তাঁর সমকক্ষ দাঁড় করাচ্ছ? তিনিই তো বিশ্বজগতের প্রতিপালক। তিনি পৃথিবীতে ওপর থেকে পাহাড় স্থাপন করেছেন, তাতে বরকত দিয়েছেন এবং চার দিনে সেখানে খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন—প্রয়োজনপ্রার্থীদের জন্য যা সমান।’ [কুরআন : ৯-১০]
এই বিভ্রান্তির মূল কারণ হলো এক আয়াত থেকে অন্য আয়াতে যাওয়ার মাঝখানের সংক্ষিপ্ততা। এই ধরনের সংক্ষিপ্ততা কুরআনের ভাষাগত সৌন্দর্য বাড়ায় এবং পাঠককে মূল আধ্যাত্মিক বার্তার দিকে মনোযোগ দিতে সাহায্য করে। এখানে সময়াক্রমের চেয়ে বার্তার গুরুত্বই বেশি। প্রথম আয়াতে পৃথিবী সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে এবং দ্বিতীয় আয়াতে পাহাড় সৃষ্টির কথা এসেছে। এই দুটি বাক্যের মাঝে ‘و’ (ওয়া) অব্যয়টি ব্যবহার করা হয়েছে, যার সাধারণ অর্থ হলো ‘এবং’। আরবি ভাষায় এই অব্যয়টি কেবল একাধিক বিষয়কে একত্রে উল্লেখ করার জন্য ব্যবহৃত হয়; এটি দিয়ে সবসময় একটির পর একটি ঘটার ধারাবাহিকতা বোঝানো হয় না।
প্রথম আপত্তির বিরুদ্ধে এই খণ্ডনটি এতটাই স্বত:সিদ্ধ যে এর জন্য বাইরের কোনো রেফারেন্সের খুব একটা প্রয়োজন হয় না। তবুও আমাদের দাবির সপক্ষে আমরা কয়েকজন বিখ্যাত মুফাসসিরের ব্যাখ্যার উদাহরণ দেব।
ধ্রুপদী যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুফাসসির আল-বায়জাবি এ বিষয়ে বলেন:
‘{আর তিনি তাতে পাহাড় স্থাপন করেছেন}—এই বাক্যটি একটি নতুন প্রসঙ্গের সূচনা (resumptive statement), যা ‘সৃষ্টি করেছেন’ ক্রিয়াপদের সাথে সরাসরি যুক্ত নয়। বরং এটি আগের প্রসঙ্গের চেয়ে আলাদা একটি বিবরণ।’৩তাঁর সমসাময়িক আন্দালুসিয়ার শ্রেষ্ঠ ভাষাবিদ আবু হাইয়ান লিখেছেন:
‘{আর তিনি তাতে পাহাড় স্থাপন করেছেন}: এটি একটি স্বাধীন বাক্য। এটি আগের বাক্যের অংশ নয়, বরং এটি সরাসরি ‘তোমরা অস্বীকার করছ’ কথাটির সাথে যুক্ত (অস্বীকৃতির কারণ হিসেবে)।’৪আধুনিক ও প্রাচীন—সব সময়ের অন্যতম সম্মানিত মুফাসসির ইবনু আশুর লিখেছেন:
এটি সরাসরি সম্বন্ধসূচক খণ্ডের (Relative clause) ক্রিয়ার সাথে যুক্ত, কর্মের (Object) সাথে নয়। সুতরাং, {এবং তিনি তাতে এর উপরিভাগে অটল পর্বতমালা স্থাপন করেছেন} ইত্যাদি বাক্যটি অর্থগত দিক থেকে একটি দ্বিতীয় সম্বন্ধসূচক খণ্ড। আর একারণেই {সৃষ্টি করেছেন} ক্রিয়াটি থেকে ভিন্ন আরেকটি ক্রিয়া হিসেবে {স্থাপন করেছেন} শব্দটির ব্যবহার করা হয়েছে; কারণ এই ‘স্থাপন করা’ বিষয়টি হলো অন্য একটি গঠন-প্রক্রিয়া যা পৃথিবী সৃষ্টির পরে সংঘটিত হয়েছে—অর্থাৎ এটি পৃথিবীর সাথে সংশ্লিষ্ট এমন কিছু অংশের সৃষ্টি, যা হয় পৃথিবীর সমজাতীয় (যেমন: পর্বতমালা) অথবা ভিন্নজাতীয় (যেমন: রিজিক বা জীবনোপকরণ)। ঠিক একারণেই তাঁর বাণী {দুই দিনে} (সৃষ্টির) বর্ণনার পর {চার দিনে} কথাটি এসেছে (সুরা ফুসসিলাত : ৯)।৫সুতরাং, পাহাড় স্থাপন করা যে পৃথিবী সৃষ্টির সাথে সাথেই বা একই সময়ে হতে হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এই বিষয়টি মাথায় রাখলে, বর্তমান বিজ্ঞানের সাথে এই আয়াতের কোনো বিরোধ থাকে না। বিজ্ঞান বলে পাহাড়ের অনেক আগে আকাশ সৃষ্টি হয়েছে—আর কুরআনের এই বর্ণনা সেই তথ্যের সাথে সাংঘর্ষিক নয়।
এখন আমরা দ্বিতীয় আপত্তিটি নিয়ে আলোচনা করব। অর্থাৎ, পৃথিবী এবং আকাশ সৃষ্টির সময়ানুক্রম নিয়ে যে প্রশ্ন তোলা হয়, সেখানে পাঠ্য বা টেক্সট নিজে থেকে কোনো নির্দিষ্ট সময়ক্রম চাপিয়ে দিচ্ছে কি না, তা আমাদের যাচাই করা প্রয়োজন।
উপরে আমরা যাঁর উদ্ধৃতি দিয়েছি, সেই আবু হাইয়ান লিখেছেন:
‘আল-ওয়াহিদি তাঁর ‘আল-বাসিত’ গ্রন্থে মুকাতিল থেকে বর্ণনা করেছেন যে, মুকাতিল বলেছেন, ‘আল্লাহ পৃথিবীকে সৃষ্টির আগেই আকাশ সৃষ্টি করেছেন।’ তিনি আয়াতের অংশ—{অতঃপর তিনি আসমানের দিকে মনোযোগ দিলেন যখন তা ছিল ধোঁয়া}—এর ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে যে, এটি পৃথিবী সৃষ্টির আগেই ঘটেছিল। এখানে একটি উহ্য ‘ছিল’ (was) ধরে নিতে হবে। যেমনটি আল্লাহ ইউসুফ আ. -এর ভাইদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, {সে যদি চুরি করে থাকে, তবে তার ভাইও তো আগে চুরি করেছিল}।’৬আল-ওয়াহিদি ছিলেন ধ্রুপদী যুগের একজন শীর্ষস্থানীয় ভাষাবিদ ও শব্দতত্ত্ববিদ। অন্যদিকে, মুকাতিল ছিলেন ইতিহাসের অন্যতম আদি মুফাসসির। প্রকৃতপক্ষে, মুকাতিলের তাফসিরটিই এখন পর্যন্ত টিকে থাকা কুরআনের প্রাচীনতম পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যাগ্রন্থ। মুকাতিলের কাছে এমন কোনো নতুন বিজ্ঞান পৌঁছায়নি যা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সময়ের মানুষের কাছে ছিল না।
তাই মুকাতিল, আল-ওয়াহিদি এবং আবু হাইয়ানের মতো আলিমদের এই ব্যাখ্যা প্রমাণ করে যে—আকাশ পৃথিবীর আগে সৃষ্টি হয়েছে—এই পাঠটি ভাষাগতভাবে সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য। যদিও এই মতের অনুসারী সংখ্যায় কম ছিলেন, তবুও এটি একটি প্রতিষ্ঠিত অবস্থান। মনে রাখা প্রয়োজন, ইসলামের ইতিহাসে এমন অনেক ঘটনা আছে যেখানে কোনো এক সময়ের সংখ্যালঘু মতটিই পরবর্তীকালে সঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছে। এটি কুরআন গবেষণার একটি স্বাভাবিক ফলাফল। কারণ যেকোনো ব্যাখ্যাই সমসাময়িক ধ্যান-ধারণা বা বিজ্ঞানের দ্বারা কমবেশি প্রভাবিত হতে পারে।
সামগ্রিকভাবে এই অবস্থানগুলো এটাই স্পষ্ট করে যে, ‘অ-সংঘাতের নীতি’ (non-contradiction) এখানে খুব সহজেই রক্ষা করা সম্ভব। এমনকি সমালোচকরা যদি পৃথিবী বা আসমান শব্দগুলোকে তাদের নিজেদের মতো করেও সংজ্ঞায়িত করেন, তবুও এই আয়াতগুলোর এমন গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা রয়েছে যা আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। যেহেতু এই আয়াতগুলোর মূল উদ্দেশ্য সুনিপুণভাবে মহাজাগতিক তত্ত্ব ব্যাখ্যা করা নয়, বরং মানুষকে আল্লাহর সৃষ্টির বিস্ময় নিয়ে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা, তাই এখানে সময়ের নিখুঁত ধারাবাহিকতা বর্ণনা না করাটাই যুক্তিযুক্ত। বরং এখানে অলঙ্কারশাস্ত্রীয়ভাবে যা সবচেয়ে বেশি কার্যকর, তার ওপরই জোর দেওয়া হয়েছে।
পরিভাষার নমনীয়তা
এই নিবন্ধে উত্থাপিত আপত্তিগুলোর একটি সহজ সমাধান আমাদের হাতে আছে। আমরা খুব সহজেই বলতে পারি যে, প্রাচীন মুফাসসিরগণ সৃষ্টিতত্ত্ব বা ভূতত্ত্ব সম্পর্কে আজকের মতো অবগত ছিলেন না, তাই তারা এই আয়াতগুলোর ব্যাখ্যায় কিছুটা ভুল করেছিলেন। আমরা এ-ও বলতে পারি যে, এই আয়াতগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী; কারণ এগুলো কোনো নির্দিষ্ট সময়ের বৈজ্ঞানিক ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেনি। ফলে হাজার বছর আগের মানুষের কাছে এগুলো যেমন গ্রহণযোগ্য ছিল, আজও তেমনই আছে। এই অস্পষ্টতা বা ব্যাপকতার কারণেই কোনো যুগের মুসলিমদের এই আয়াতগুলো বুঝতে সমস্যা হয়নি।
তবে কুরআনের ভাষাগত বৈশিষ্ট্য বুঝতে পারলে এমন তর্কেরও প্রয়োজন পড়ে না। যেকোনো প্রাচীন লেখা পড়ার সময় আমাদের একটি সহজাত প্রবণতা থাকে—সেটিকে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে বিচার করা। নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ হওয়ার জন্য আমাদের এই প্রবণতা থেকে দূরে থাকা উচিত। যদিও কুরআন সর্বজনীন এবং সব সময়ের মানুষের জন্য, তবুও এর একটি প্রাথমিক শ্রোতাগোষ্ঠী ছিল। সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বাদ দিলে কুরআনের অনেক গভীর অর্থ আমাদের কাছে অস্পষ্ট থেকে যাবে।
ইসলামের সমালোচকরা প্রায়ই একটি ভুল করেন—তারা কুরআনের ‘বহুার্থকতা’ বা একটি শব্দের একাধিক অর্থের গুরুত্ব বুঝতে পারেন না। আধুনিক যুগে আমরা ভাষার নিখুঁত সংজ্ঞা এবং গাণিতিক নির্ভুলতাকে বেশি মূল্য দিই। কিন্তু প্রাচীন সাহিত্য সংস্কৃতিতে একটি শব্দের একাধিক ব্যঞ্জনা বা অর্থ থাকাকেই পাণ্ডিত্য ও অলঙ্কারশাস্ত্রের শ্রেষ্ঠত্ব মনে করা হতো। ভাষার এই অস্পষ্টতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এর সৌন্দর্য ও প্রভাব। কুরআন এই গুণে পৃথিবীর যেকোনো গ্রন্থের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।
এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ হলো আমাদের আলোচিত আয়াতে ব্যবহৃত ‘ইয়াওম’ (দিন) শব্দটি। আধুনিক পাঠকের কাছে ‘দিন’ মানেই একটি সুনির্দিষ্ট ও পরিমাপযোগ্য সময়। কিন্তু কুরআনে এই শব্দটির সংজ্ঞা অনেক বেশি নমনীয় বা প্রশস্ত। যেমন, কুরআনে বলা হয়েছে:
يَعْرُجُ إِلَيْهِ فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ أَلْفَ سَنَةٍ مِمَّا تَعُدُّونَ
‘তাঁহার (আল্লাহর) কাছে পৌঁছাতে এমন এক দিন লাগে, যার পরিমাণ তোমাদের গণনায় এক হাজার বছর।’ [কুরআন ৩২ : ৫]
অন্যত্র বলা হয়েছে:
تَعْرُجُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ إِلَيْهِ فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ
‘ফিরিশতা এবং রুহ (জিবরাইল আ.) তাঁর দিকে আরোহণ করে এমন এক দিনে, যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর।’ [কুরআন ৭০ : ৪]
সুতরাং, ‘দিন’ বলতে এখানে একটি অনির্দিষ্ট দীর্ঘ সময়কালকেও বোঝানো হতে পারে। তৎকালীন আরবরা ভাষার এই অলঙ্কার খুব ভালোভাবেই বুঝতেন এবং এর কাব্যিক সৌন্দর্য উপভোগ করতেন। আমাদের আধুনিক যুগের ‘যান্ত্রিক পরিভাষা’ ব্যবহারের আকাঙ্ক্ষা এখানে অপ্রাসঙ্গিক; কুরআন সেই যান্ত্রিক সংজ্ঞার কাছে দায়বদ্ধ নয়।
একইভাবে, যখন কুরআনে ‘আস-সামা’ (আকাশ/মহাকাশ) এবং ‘আল-আরদ’ (পৃথিবী) শব্দগুলো আসে, তখন আমরা সেগুলোকে আধুনিক বিজ্ঞানের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞায় বেঁধে ফেলার একটি তাড়না অনুভব করি।
কেউ যদি মনে করেন ‘সামা’ মানে কেবল আমাদের মাথার উপরের বায়ুমণ্ডল, তবে বিজ্ঞানের সাথে কোনো বিরোধই থাকে না। কারণ পৃথিবী গঠিত হওয়ার পরেই বায়ুমণ্ডল তৈরি হয়েছে। আবার মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে এই আকাশই নক্ষত্র দিয়ে সুশোভিত এবং এটি পৃথিবীকে সুরক্ষা দেয়।
অন্যদিকে, কেউ যদি ‘সামা’ বলতে মহাকাশ বোঝান, তবে আয়াতের অর্থ দাঁড়াবে—মহাকাশ এক সময় ধোঁয়াশা বা গ্যাসীয় অবস্থায় ছিল, যা পরে বর্তমান অবস্থায় রূপ নিয়েছে। একইভাবে ‘আল-আরদ’ বা পৃথিবী বলতে কেবল এই গ্রহটি নয়, বরং মহাজাগতিক কঠিন পদার্থকেও বোঝানো হতে পারে।
আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি মুহাম্মদ আল তানতাভি ব্যাখ্যা করেছেন যে, কুরআনের বর্ণনাভঙ্গিতে এটি মোটেও অস্বাভাবিক নয়। তিনি একটি আয়াতের উদাহরণ দিয়েছেন:
وَلَقَدْ خَلَقْنَاكُمْ ثُمَّ صَوَّرْنَاكُمْ ثُمَّ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ لَمْ يَكُنْ مِنَ السَّاجِدِينَ
‘আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি, তারপর তোমাদের আকৃতি দান করেছি, তারপর ফিরিশতাদের বলেছি—আদমকে সিজদা করো।’ [কুরআন ৭ : ১১]
এখানে লক্ষ্য করুন, ‘খালাকনাকুম’ (তোমাদের সৃষ্টি করেছি) শব্দটি ‘সাওয়ারনাকুম’ (তোমাদের আকৃতি দিয়েছি) শব্দের আগে এসেছে। অর্থাৎ, আকৃতি দেওয়ার আগেই মানুষকে ‘সৃষ্টি’ করা হয়েছে বলা হচ্ছে। মানুষের সেই আদিম অস্তিত্ব আমাদের কাছে চেনা কোনো ফর্মে ছিল না, তবুও তাকে ‘সৃষ্টি’ বলা হয়েছে।
এই যুক্তিতেই অধিকাংশ আলিম বিশ্বাস করেন যে, পৃথিবী সৃষ্টির আগে পুরো মহাবিশ্ব একটি গ্যাসীয় অবস্থায় ছিল। পরে সেই উপাদান থেকে পৃথিবী তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং অবশিষ্ট গ্যাসীয় উপাদান থেকে সূর্য ও নক্ষত্রের মতো মহাজাগতিক বস্তুগুলো তৈরি হয়। এরপর পৃথিবী তার নির্দিষ্ট রূপ পায় এবং পাহাড়, নদী ও চারণভূমি দিয়ে বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। ইসলামের জ্ঞানতাত্ত্বিক ধারায় এই ব্যাখ্যাটি অত্যন্ত প্রচলিত, যা সমালোচকদের সংকীর্ণ যুক্তির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।
কুরআনের ওপর আমাদের নিজস্ব ভাষাগত ধারণা চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। কুরআন কারো ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করে না। বরং সততা ও বিনয়ের সাথে কুরআনের নিজস্ব ব্যাকরণ ও প্রেক্ষাপট দিয়েই একে বুঝতে হবে।
উপসংহার
সুরা ফুসসিলাতের শুরুর আয়াতগুলোর মূল উদ্দেশ্য প্রাকৃতিক ঘটনার কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেওয়া নয়। এই বিষয়টি মনে রাখা জরুরি; কারণ এটি ভুলে গেলে কেউ হয়তো এমন সরাসরি বৈজ্ঞানিক নিশ্চয়তা খুঁজতে পারেন যা সেখানে নেই। বরং এই আয়াতগুলো আল্লাহর মহিমা, ক্ষমতা এবং তাঁর সৃষ্টির সৌন্দর্যের সপক্ষে শক্তিশালী যুক্তি তুলে ধরেছে। এগুলো মূর্তিপূজারী একটি জাতির সামনে ইসলামের আকিদা পেশ করেছে এবং যৌক্তিক ও আবেগঘন বর্ণনার মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর ইবাদত করার প্রয়োজনীয়তা বুঝিয়েছে।
তাছাড়া, এটিও স্পষ্ট হয়েছে যে আয়াতগুলো আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। বিশেষ করে যখন আমরা সময়ের ক্রমবিন্যাসের বিভিন্ন ব্যাখ্যা এবং ভাষার নমনীয়তা (বহুার্থকতা) বুঝতে পারি, তখন কোনো বিরোধ থাকে না। এই ধরনের ভাষা কুরআনের অন্যান্য আয়াতের সাথে যেমন সংগতিপূর্ণ, তেমনি প্রাচীন যুগের স্বাভাবিক ভাষা ব্যবহারের রীতি অনুযায়ীও সঠিক। যখন এই আয়াতগুলোর যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা বিদ্যমান, তখন অসম্ভব ও ভুল ব্যাখ্যাগুলো সহজেই নাকচ করে দেওয়া যায়।
সুতরাং, এই নিবন্ধের শুরুতে যে আপত্তিগুলো তোলা হয়েছিল তার সমাধান হয়েছে। এই আলোচনাটি এটিও প্রমাণ করে যে, কুরআন এবং এর তাফসির বা ব্যাখ্যাতত্ত্ব নিয়ে গভীর গবেষণা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এমন গবেষণার জন্য বিনয়, ধৈর্য এবং একাডেমিক সততা প্রয়োজন। বিভ্রান্তি ছড়ানো বা আক্রমণাত্মক মনোভাব খুব কমই ফলপ্রসূ হয়।
আল্লাহ বলেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يَسْتَحْيِي أَنْ يَضْرِبَ مَثَلًا مَا بَعُوضَةً فَمَا فَوْقَهَا ۚ فَأَمَّا الَّذِينَ آمَنُوا فَيَعْلَمُونَ أَنَّهُ الْحَقُّ مِنْ رَبِّهِمْ ۖ وَأَمَّا الَّذِينَ كَفَرُوا فَيَقُولُونَ مَاذَاأَرَادَ اللَّهُ بِهَٰذَا مَثَلًا ۘ يُضِلُّ بِهِ كَثِيرًا وَيَهْدِي بِهِ كَثِيرًا ۚ وَمَا يُضِلُّ بِهِ إِلَّا الْفَاسِقِينَ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মশা কিংবা তার চেয়েও বড় কিছুর উদাহরণ দিতে লজ্জা বোধ করেন না। যারা ইমান এনেছে তারা জানে যে এটি তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে সত্য। কিন্তু যারা কুফরি করে তারা বলে, ‘এই উদাহরণ দিয়ে আল্লাহ কী বোঝাতে চেয়েছেন?’ তিনি এর মাধ্যমে অনেককে বিভ্রান্ত করেন আবার অনেককে হিদায়াত দেন। আর তিনি পাপাচারী ছাড়া কাউকে বিভ্রান্ত করেন না।’ [কুরআন ২ : ২৬]
- তাফসির ইবনু কাসির ↩︎









Comments