বাবার চেয়ে ছেলেই বেশি রক্ষণশীল: স্ত্রীকে 'অনুগত' দেখতে চান জেন-জি পুরুষরা

২৩,০০০ মানুষের ওপর পরিচালিত একটি বিশ্বব্যাপী জরিপ অনুযায়ী, জেনারেশন জেড (Gen Z) বা বর্তমান প্রজন্মের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তরুণ ও কিশোর মনে করে যে, একজন স্ত্রীর উচিত তার স্বামীর বাধ্য থাকা। জরিপটিতে দেখা গেছে, লিঙ্গীয় ভূমিকার ক্ষেত্রে বয়স্ক প্রজন্মের তুলনায় তরুণদের চিন্তাধারা বেশি রক্ষণশীল। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতসহ মোট ২৯টি দেশে পরিচালিত এই জরিপ থেকে আরও জানা যায়, জেনারেশন জেড-এর প্রায় ৩৩ শতাংশ পুরুষ সদস্য মনে করেন, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেবল স্বামীরই থাকা উচিত।
জরিপটিতে দেখা গেছে, বৈবাহিক জীবনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ‘জেন-জি’ (১৯৯৭-২০১২ সালের মধ্যে জন্ম) পুরুষদের মধ্যে রক্ষণশীল মনোভাবের হার ‘বেবি বুমার’ (১৯৪৬-১৯৬৪ সালের মধ্যে জন্ম) পুরুষদের তুলনায় দ্বিগুণ। বয়স্ক প্রজন্মের পুরুষদের মধ্যে মাত্র ১৩ শতাংশ একমত হয়েছেন যে, স্ত্রীর সর্বদা স্বামীর বাধ্য থাকা উচিত। অন্যদিকে নারীদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, জেন-জি নারীদের ১৮ শতাংশ এবং বেবি বুমার নারীদের মাত্র ৬ শতাংশ এই মতবাদকে সমর্থন করেন। দেশভেদে এই মতামতের ব্যাপক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া (৬৬%) এবং মালয়েশিয়ায় (৬০%) নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অধিকাংশ মানুষ এই বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করেছেন। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রে এই হার ২৩ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্যে মাত্র ১৩ শতাংশ।
১৬ বছরের ঊর্ধ্ব ব্যক্তিদের ওপর ইপসস (Ipsos) এবং কিংস কলেজ লন্ডনের ‘গ্লোবাল ইনস্টিটিউট ফর উইমেন’স লিডারশিপ’-এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এই বার্ষিক গবেষণায় লিঙ্গীয় ভূমিকার বিষয়ে বিভিন্ন প্রজন্মের পুরুষদের চিন্তাধারার মধ্যে এক আকাশ-পাতাল ব্যবধান উন্মোচিত হয়েছে। ‘জেন-জি’ প্রজন্মের প্রায় এক-চতুর্থাংশ (২৪%) পুরুষ মনে করেন, নারীদের খুব বেশি স্বাধীনচেতা বা স্বাবলম্বী হওয়া উচিত নয়; যেখানে বেবি বুমার প্রজন্মের পুরুষদের মধ্যে এই হার মাত্র ১২ শতাংশ।
যৌন সম্পর্কের সামাজিক রীতিনীতির ক্ষেত্রেও দুই প্রজন্মের পুরুষদের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে। জেন-জি পুরুষদের ২১ শতাংশ মনে করেন একজন ‘প্রকৃত নারী’র কখনোই যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিজে থেকে উদ্যোগ নেওয়া উচিত নয়, যেখানে বয়স্ক প্রজন্মের মাত্র ৭ শতাংশ পুরুষ এমনটা মনে করেন। অর্ধেকের বেশি (৫৯%) জেন-জি তরুণ মনে করেন, নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে গিয়ে পুরুষদের ওপর অনেক বেশি চাপ দেওয়া হচ্ছে বা তাদের অনেক বেশি দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। যেখানে বয়স্ক প্রজন্মের (বেবি বুমার) মাত্র ৪৫ শতাংশ পুরুষ এমনটা মনে করেন।
একই বিষয়ে নারীদের মধ্যেও তফাত দেখা গেছে। জেন-জি নারীদের ৪১ শতাংশ মনে করেন যে লিঙ্গ সমতার জন্য পুরুষদের ওপর বেশি চাপ পড়ছে, যেখানে বয়স্ক প্রজন্মের নারীদের মধ্যে এই হার মাত্র ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ, বয়স্কদের তুলনায় বর্তমান প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের বড় একটি অংশ মনে করছে যে সমতা আনতে গিয়ে পুরুষদের ওপর বেশি প্রত্যাশা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মজার বিষয় হলো, নারীদের অতিরিক্ত স্বাধীনচেতা হওয়ার বিপক্ষে থাকলেও, জেন-জি পুরুষরাই আবার সফল ক্যারিয়ারসম্পন্ন নারীদের প্রতি বেশি আকর্ষণ অনুভব করেন। এই প্রজন্মের ৪১ শতাংশ পুরুষ মনে করেন যে, ক্যারিয়ারে সফল নারীরা পুরুষদের কাছে বেশি আকর্ষণীয়।
গ্লোবাল ইনস্টিটিউট ফর উইমেন’স লিডারশিপ-এর পরিচালক এবং এই গবেষণার প্রধান অধ্যাপক হি জুং চাং বলেন, লিঙ্গ সমতার প্রতি মানুষের সমর্থন যে এখনো বেশ শক্তিশালী, তার কিছু আশাব্যঞ্জক লক্ষণও দেখা গেছে। যেমন—সরকার বা রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে আরও বেশি নারীর অংশগ্রহণ থাকা উচিত, এই বিষয়ে অধিকাংশ মানুষই একমত হয়েছেন। তবে প্রাপ্ত তথ্যের তুলনা করলে দেখা যায়, মানুষের চিন্তাধারা দিন দিন আরও রক্ষণশীল হয়ে পড়ছে। ২০১৯ সালে বিশ্বজুড়ে ৪২ শতাংশ মানুষ মনে করতেন যে তাদের দেশে নারী অধিকারের কাজ যথেষ্ট হয়েছে, যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫২ শতাংশে। ব্রিটেনে এই হার এক লাফে ১২ শতাংশ বেড়েছে।
অধ্যাপক চাং বলেন, “আমার মনে হয় পুরুষদের মধ্যে সামাজিক অবস্থান হারানোর একটা ভয় কাজ করছে। আর সেই সুযোগটাই নিচ্ছে কিছু নেতিবাচক প্রচারণা, যা তরুণ প্রজন্মকে নারী-পুরুষের সমান অধিকার, নারী এবং অভিবাসীদের বিরুদ্ধে উসকে দিচ্ছে।” জরিপ অনুযায়ী, জেন-জি তরুণরা নিজেদের আচরণের ক্ষেত্রেও বেশ সেকেলে চিন্তাধারা পোষণ করেন। যেমন: ২১ শতাংশ জেন-জি তরুণ মনে করেন, যেসব পুরুষ সন্তানদের দেখাশোনা করেন তারা অন্যদের তুলনায় কম পুরুষালি। অথচ বয়স্ক প্রজন্মের পুরুষদের মধ্যে মাত্র ৮ শতাংশ এমন কথা বিশ্বাস করেন।
জরিপে নারী-পুরুষ উভয় পক্ষই মনে করেন যে, ডেটিং বা সম্পর্ক (২২%), ঘরের কাজ (২৪%) এবং পোশাক নির্বাচনের (৩৪%) ক্ষেত্রে নারীদের স্বাধীনতা বেশি। অন্যদিকে, শখ মেটানো (১৮%) এবং চাকরির (৩৯%) ক্ষেত্রে পুরুষরা বেশি স্বাধীনতা পান বলে তারা মনে করেন।
গ্লোবাল ইনস্টিটিউট ফর উইমেন’স লিডারশিপ-এর প্রধান এবং অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ড এই ফলাফলকে উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “জেন-জি প্রজন্মের অনেক তরুণ যে শুধু নারীদের ওপর সীমাবদ্ধতা চাপিয়ে দিচ্ছে তা-ই নয়, বরং তারা নিজেরাও নিজেদেরকে লিঙ্গীয় প্রথার কঠোর বেড়াজালে বন্দি করে ফেলছে। আমাদের আরও কাজ করতে হবে যাতে মানুষ বুঝতে পারে যে, নারী-পুরুষের সমান অধিকার মানে এই নয় যে এতে শুধু নারীদেরই লাভ হবে আর পুরুষদের ক্ষতি হবে।”
অধ্যাপক চাং-এর মতে, এর পেছনে অর্থনৈতিক কারণও থাকতে পারে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, “আগের প্রজন্মের পুরুষরা পরিবারের ভরণপোষণ, আর্থিক জোগান দেওয়া বা বাড়ি কেনার মতো কাজের মাধ্যমে নিজেদের ‘পুরুষত্ব’ প্রমাণ করতে পারতেন। তারা ছিলেন পরিবারের রক্ষক ও অন্নদাতা। বর্তমান বিশ্বের তরুণদের জন্য সেই সুযোগ এখন অনেক কমে গেছে। ফলে তারা এক ধরণের পরিচয় সংকটে ভুগছেন। অন্যদিকে, পুরুষত্ব যে কেবল ঘর চালানো বা টাকা উপার্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—এর যে আরও ইতিবাচক ও মানবিক দিক থাকতে পারে, সে সম্পর্কেও তাদের কোনো সঠিক ধারণা দেওয়া হয়নি।”
গবেষণায় ব্যক্তিগত মতামত এবং সামাজিক প্রত্যাশার মধ্যে একটি বড় পার্থক্যও ফুটে উঠেছে। যেমন ব্রিটেনে ব্যক্তিগতভাবে মাত্র ১৪ শতাংশ মানুষ মনে করেন যে সন্তানদের দেখাশোনা করার মূল দায়িত্ব নারীদের হওয়া উচিত। কিন্তু ৪৩ শতাংশ মানুষের ধারণা, সমাজ আসলে চায় যে সন্তানদের সব দায়িত্ব নারীই পালন করুক।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান (The Guardian)
অনুবাদ: শাহেদ হাসান, রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, দ্য মুসলিম মাইন্ডস






![পাশ্চাত্যবাদ [OCCIDENTALISM]](https://themuslimminds.org/storage/2025/09/পাশ্চাত্যবাদ-OCCIDENTALISM-1024x446.jpeg)



Comments