পশ্চিমের আয়নায় ইসলামী সংস্কার ও তার লিগ্যাসি
যেসব পন্ডিত পশ্চিমপ্রীতি থেকে ইসলামের সংষ্কার চেয়েছে, তাদের লিগ্যাসি হয়তো বামপন্থায় মিলে গেছে। অথবা কট্টর সেক্যুলারিজমে থিতু হয়েছে। ইতিহাস থেকে কিছু নজির দিই:
১.
তুরস্কের তানযিমাত আন্দোলন থেকে উঠে এসেছেন জিয়াগোক আলপ। নদভি লিখেছেন, তৎকালে, এই লোক কান্নাভেজা কন্ঠে পশ্চিমের ইতিবাচক ভূমিকার কথা বলে বেড়াতো। তারই ভাবশিষ্য কামাল পাশা। কামালকে সচেতনভাবেই আতাতুর্ক বলি না। আতাতুর্ক মানে জাতির পিতা। কামাল তুরস্কে সেক্যুলারিজমের যে রুপসুরত ও সংষ্করণ এনেছিল, তা ছিল চরম ধর্মবিদ্ধেষি; লেইসিজম।
২.
তিউনিশিয়ায় খায়রুদ্দিন পাশার সংষ্কার প্রচেষ্টা প্রথম দিকে ধর্মাশ্রিত থাকলেও পশ্চিমপ্রীতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ফরাসি উপনিবেশ (১৮৮১) পরবর্তী সময়ে খায়রুদ্দিনের চিন্তা নতুন রূপ পায়। হাবিব বুরগিবা তাঁর সংস্কার ঐতিহ্যকে আরো সেক্যুলার ও জাতীয়তাবাদী পথে এগিয়ে নেন। হাবিব খায়রুদ্দিন পাশার প্রতিষ্ঠিত সাদিকি কলেজেই অধ্যায়ন করে। এবং পরবর্তীতে সমাজতন্ত্রেও ঝুঁকে যায়।
৩.
এবার আসুন বাংলাদেশে। ২০শ শতকের প্রথমার্ধে বাংলাদেশে মুসলিম সাহিত্য সমাজ এবং শিখাগোষ্ঠীর সক্রিয়তা শুরু হয়। এটি প্রগতিশীল সাহিত্য-সংস্কৃতি চক্র, যা শিখা পত্রিকাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। এর সঙ্গে প্রথম দিকে যুক্ত ছিলেন— কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল হুসেন, কাজী মোতাহার হোসেন, মোতাহার হোসেন চৌধুরী এবং আবুল ফজল প্রমূখ।
তারা সংষ্কারের আকুতি থেকেই মুসলিমদের জন্য নতুন পথ তালাশ শুরু করেন। কামাল পাশা তাদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। বুদ্ধির মক্তির কথা বলতেন তারা। চটকদার একটি শ্লোগান ছিল “জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।”
খেলাফতের পতনকে মুসলিমদের মুক্তির সোপান হিসেবে ব্যাখ্যা করতো। আব্দুল ওদুদ খেলাফতের পতনে খুশি হয়ে নাতি দীর্ঘ রচনা প্রকাশ করেছিল।
ওদুদ সাহেব চেয়েছিলেন, বাঙালি মুসলিম সমাজের জীর্ণ কঙ্কালে রেনেসাঁর প্রাণভোমরাটি পুরে দিতে। তাই আলেমদের হৃদয়ের দ্বার বন্ধ বলে তিনি সমালোচনা করতেন।
পরবর্তীতে বেগম পত্রিকা, সওগাত, শিখা এবং নবযুগের মতো পত্রিকাগুলো তাদের লিগ্যাসি বহন করে। এসব পত্রিকায় বেগম রোকেয়া ও চাঁদবী মলতী লিখতেন।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, ১৯৪০-৫০ এর দিকে শুরু হয় বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের নতুন চেহারা। সেখানে দেখবেন কবি শামসুর রহমান, সরদার ফজলুল করিম, আনিসুজ্জামান, সৈয়দ শামসুল হক, আবুল কাসেম ফজলুল হক এবং সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতো ব্যক্তিদের। যাদের কারোই ধর্মের সাথে সেভাবে সংযোগ তো ছিলই না, কেউ কেউ ছিল চরম ধর্মবিদ্ধেষি।
কেউ মুক্তি খুঁজছে সমাজতন্ত্রে। কেউবা পশ্চিমা জীবনদর্শনে। ধর্ম তাদের জীবনে ছিল কেবলই অন্ধকার গুহার মতো।
৪.
ভারত-পাকিস্তানে আলিগড় স্কুল অব থটেও যে মেরুকরণ ঘটেছে, সেটি আর ধর্মের রুটে ফেরেনি। লিবারেল, সেকুলার এবং সমাজতান্ত্রিক জীবন পদ্ধতির দিকে ঝুঁকে গেছে অধিকাংশ। আলিগড় ঘরানার উত্তরসূরিরা সবসময় চেয়েছে পাকিস্তানকে একটি আধুনিক উদারনৈতিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে।
৫.
উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বিশ্বব্যাপী একদল মুসলিম বুদ্ধিজীবী কোমর বেঁধে নেমেছিলেন হাজার বছরের প্রাচীন ইসলামী ফিকহের গোড়া ধরে টান দিতে। তাদের সেই শাস্ত্রীয় মনোভাবের মূল লক্ষ্যই ছিল কুরআনের বাইরের উৎস থেকে পাওয়া জ্ঞানের বৈধতা আর ফিকহের চার সূত্র—কুরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াসের পদ্ধতিগত ব্যবচ্ছেদ করা। তারা যে জ্ঞানতাত্ত্বিক (Epistemological) কৌশল অবলম্বন করেছিলেন, তা কুরআন ও হাদিসের ‘আধুনিক’ পাঠ তৈরি করেছিল। এবং ইজমা ও কিয়াসকে সায়েন্টিফিক র্যাশনালিজম বা ‘বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদ’-এর দাঁড়িপাল্লায় ফেলে আমূল বদলে ফেলতে চাইছিল।
এই আমলের প্রধান কারিগর ছিলেন জামালুদ্দিন আফগানি, স্যার আহমদ খান, মুহাম্মদ আবদুহ কিংবা আমির আলীর মতো ব্যক্তিরা। তারা ইসলামকে এমন এক মোড়কে উপস্থাপন করতে চাইলেন, যা তথাকথিত আধুনিক চিন্তা আর যুক্তিবিজ্ঞানের সাথে কোনোভাবেই ‘বেমানান’ ঠেকে না। পশ্চিমা সভ্যতার সেই প্রভূত উন্নতি তাদের চোখে এমনভাবে ধাক্কা দিয়েছিল যে, ইউনিভার্সের নিউটনীয় ধারণা, হার্বার্ট স্পেন্সারের সমাজতত্ত্ব কিংবা ডারউইনের বিবর্তনবাদ — এমনকি পশ্চিমা যাপনের চোখ ধাঁধানো আড়ম্বরও তাদের নিকট ছিল চরম আরাধ্য মরীচিকা।
মোদ্দা কথা:
সংস্কারের তাড়না কিংবা নতুন করে পথ খোঁজার আকুতিগুলো ছিল একান্ত ভেতর থেকে আসা এক অন্তর্জাত তাগিদ। কিন্তু আঠারো শতকের শেষ আর উনিশ শতকের শুরুতে ইউরোপীয় সম্প্রসারণবাদের প্রবল অভিঘাত সব হিসাব পাল্টে দিয়েছিল।
ইউরোপের সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাব কেবল এক ‘প্রতিপক্ষ’ হিসেবেই আসেনি, বরং তা ছিল বিধ্বংসী চ্যালেঞ্জ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেই জৌলুস ছিল বিভ্রমের মতো আকর্ষণীয়।
ইউরোপের সেই অর্থনৈতিক ক্ষমতা, আধুনিক বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির দাপট, তাদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গঠনতন্ত্র, এমনকি আধুনিক সমাজের তথাকথিত ‘নৈতিকতা’—সবকিছুই তখন মুসলিম চিন্তকদের কাছে এক জ্বলন্ত আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়াল। তারা এক মৌলিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতে বাধ্য হলেন, ইউরোপের এই মহাপ্রভাব মোকাবিলা করার শক্তি মুসলিমরা কোথা থেকে পাবে? কীভাবে তারা এই আধুনিক পৃথিবীর অংশ হয়ে উঠবে?
আলবার্ট হুরানির ভাষ্যমতে, এই কঠিন প্রশ্নের প্রথম স্পষ্ট জবাবগুলো মিলতে শুরু করেছিল উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। ইস্তাম্বুল, কায়রো আর তিউনিসের সরকারি সংস্কার আন্দোলনের সাথে যুক্ত আলেম আর লেখকদের কলমেই ফুটে উঠেছিল সেই জবাব। উপরের ঐতিহাসিক বিবরণই সেই জবাব; যেগুলো আদতে ইউরোপের ভাষা ও চিন্তার ভেতর দিয়েই পরিস্ফুটিত হয়েছিল।






Comments