দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যেভাবে ইসলামিকরণ হলো || রিচার্ড এম. ইটনের সাক্ষাৎকার
ইউনিভার্সিটি অব অ্যারিজোনার ইতিহাসের অধ্যাপক রিচার্ড এম. ইটন দক্ষিণ এশিয়া আর বিশেষ করে বাংলার ইতিহাস নিয়ে গবেষণার জন্য সারা বিশ্বে সমাদৃত। তিন দশক পার হয়ে গেলেও বাংলার ওপর লেখা তাঁর 'দ্য রাইজ অব ইসলাম অ্যান্ড দ্য বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার, ১২০৪–১৭৬০' বইটি এখনো ইতিহাস পাঠকদের কাছে এক আকর গ্রন্থ। সেই বইয়ের নানা দিক নিয়ে তিনি কথা বলেছেন দ্য ডেইলি স্টারের সাথে। দ্য মুসলিম মাইন্ডস এর জন্য ইন্টারভিউটি অনুবাদ করেছেন শাহেদ হাসান।
দ্য ডেইলি স্টার: আপনি কাজ শুরু করার আগে বাংলায় ধর্মান্তর নিয়ে একটা ধারণা বেশ প্রচলিত ছিল যে—মানুষ প্রথমে হিন্দুধর্ম থেকে বৌদ্ধধর্মে গিয়েছিল, আর সবশেষে ইসলাম গ্রহণ করে। অনেক গবেষকই মনে করতেন, মূলত হিন্দুধর্মের জাতপাত বা বর্ণপ্রথা থেকে বাঁচতেই সাধারণ মানুষ দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। এই পুরনো ধারণাটাকে চ্যালেঞ্জ করে পুরো বিষয়টিকে একদম নতুনভাবে দেখার চিন্তা আপনার মাথায় কেন এল?
রিচার্ড এম. ইটন: আমি এই প্রচলিত ধারণাটাকে চ্যালেঞ্জ করার কথা ভেবেছি। কারণ আমি দেখলাম, শুনতে খুব যুক্তিযুক্ত মনে হলেও এর স্বপক্ষে আসলে কোনো শক্ত প্রমাণ নেই। আমার বইয়ের পঞ্চম অধ্যায়ে (১১৩-১৩৪ পৃষ্ঠা) আমি বিস্তারিত আলোচনা করেছি যে কেন এই পুরনো ধারণাগুলো ভুল এবং কেন বর্তমান প্রেক্ষাপটে এগুলো ধোপে টেকে না।
পূর্ববঙ্গের গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষের কাছে ইসলামই ছিল প্রথম কোনো ধর্ম, যা নির্দিষ্ট ধর্মগ্রন্থ এবং বিধিবদ্ধ রীতিনীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল।
অবশ্য এর আগে পূর্ববঙ্গে বৌদ্ধ বা ব্রাহ্মণ সংস্কৃতি কিছুটা পৌঁছেছিল, কিন্তু গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের পশ্চিম বদ্বীপ অঞ্চলের তুলনায় সেখানে এর প্রভাব ছিল বেশ কম। আর যা-ও ছিল, তা মূলত শহরকেন্দ্রিক এবং উচ্চবিত্ত শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ওই অঞ্চলে দেবীপূজা বা লোকজ ধর্মের বিভিন্ন ধারা প্রচলিত থাকলেও সেগুলোর কোনো লিখিত ধর্মগ্রন্থ বা সুনির্দিষ্ট উপাসনা পদ্ধতি ছিল না। কুরআন এবং হাদিসের মতো লিখিত পাঠ্যগুলোই মূলত মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস এবং আচার-অনুষ্ঠানকে একটি শক্ত কাঠামোর ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। সেই সাথে মুসলিম শাসন শুরুর পরপরই বাংলায় কাগজ তৈরির প্রযুক্তি চলে আসায় এই কাজটা আরও সহজ হয়ে গিয়েছিল।
দ্য ডেইলি স্টার: ১৮৭২ সালের প্রথম আদমশুমারির আগে কিন্তু কেউ ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি যে বাংলায় মুসলমানরা সংখ্যায় এতো বেশি। পরে এটাই তো রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিল। আপনার কি মনে হয়, পাকিস্তান বা বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে বলেই কি এখন পেছনের ইতিহাসটাকে ওভাবে মেলানোর চেষ্টা করা হচ্ছে? মানে, এমন একটা ভাব দেখানো হচ্ছে যে মুসলিম সংখ্যাগুরু হওয়ার কারণেই এই দেশগুলো হওয়াটা একদম অবধারিত ছিল?
রিচার্ড এম. ইটন: ব্রিটিশরা একশ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারতে সেই পুরনো ‘ভাগ করো আর শাসন করো’ খেলাটা খেলেছে। মুখে খুব সুন্দর করে বলত যে তারা সবার মধ্যে একটা ‘রাজনৈতিক ভারসাম্য’ বজায় রাখছে, কিন্তু আসলে এটা ছিল তাদের এক ধরনের ধূর্ততা। যখন সাধারণ মানুষের ভোটের অধিকার বাড়তে লাগল, তখনই বিভিন্ন ধর্মের লোকজনের মধ্যে রেষারেষি বা পাল্লা দেওয়ার ব্যাপারটা ভীষণভাবে বেড়ে গেল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভারত ছেড়ে যাওয়ার জন্য ব্রিটিশদের মধ্যে এক ধরণের হুলুস্থুল পড়ে গিয়েছিল। তাই পরিস্থিতি সামাল দিতে তারা কোনোমতে দায়সারাভাবে মুসলিম লীগ আর কংগ্রেস—দুই পক্ষের দাবিই মেনে নিল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই ১৯৩১ সালের আদমশুমারির ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা ওই ধর্মীয় মানচিত্রটাই সব হিসেব উল্টে দিয়ে সবকিছু চূড়ান্ত করে দিল।
দ্য ডেইলি স্টার: এত বড় একটা অঞ্চল নিয়ে কাজ করা তো চাট্টিখানি কথা না! একদিকে জমির পুরনো সব রেকর্ড, অন্যদিকে সাহিত্যের বিশাল ভাণ্ডার; তার ওপর আবার মাটির ধরণ বদলানো বা পরিবেশ আর চাষবাসের পরিবর্তনের মতো হাজারটা বিষয়। এই জগাখিচুড়ি অবস্থা সামলাতে গিয়ে কী কী ঝক্কি পোহাতে হয়েছে আপনাকে? আর এই জট ছাড়াতে ম্যাক্স ওয়েবারের কায়দাটা আপনাকে ঠিক কীভাবে সাহায্য করেছিল?
রিচার্ড এম. ইটন: দেখুন, ম্যাক্স ওয়েবারের সমাজতত্ত্ব আমাকে বরাবরই টেনেছে। তবে আমার ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ছিল ফরাসি ‘অ্যানালস স্কুল’-এর, বিশেষ করে ফেরনান্দ ব্রোদেলের কাজের। তিনিই প্রথম বুঝিয়েছিলেন যে ইতিহাস মানে কেবল রাজনীতি, ভূগোল, সাহিত্য বা ধর্ম—এসব আলাদা আলাদা বিষয় না। বরং এই সবকিছুর একটা যোগসূত্র বা মিথস্ক্রিয়া থেকেই ইতিহাস তৈরি হয়। তাই ধর্মের বদল বুঝতে হলে শুধু ধর্ম নিয়ে পড়ে থাকলে চলে না; প্রকৃতি থেকে শুরু করে সংস্কৃতির বাকি সব দিকগুলোও বুঝতে হয়। কারণ এসব কিছুই ধর্মকে প্রভাবিত করে, ধর্মের গায়ে একটা বিশেষ রঙ চড়ায়।
দ্য ডেইলি স্টার: বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি বা চাষবাসের পেছনে ভৌগোলিক কারণগুলো ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল? বিশেষ করে একটা বড় ভূমিকম্পের পর গঙ্গা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পদ্মা যখন তার গতিপথ বদলে ফেলল, তখন তার প্রভাব কেমন ছিল? আর এই ভৌগোলিক কারণেই কি দুই বাংলার ধর্মান্তরের ইতিহাস বা ধর্মের ধরনটা আলাদা হয়ে গেল?
রিচার্ড এম. ইটন: দেখুন, বাংলার ইতিহাসের মূলে কিন্তু এই ভৌগোলিক আর জলবায়ুর প্রভাবটাই সবচেয়ে বড়। বাঙালি মাত্রই জানে, এই বদ্বীপ অঞ্চলটা একদিকে যেমন পানির প্রাচুর্য আর উর্বর পলিমাটির জন্য আশীর্বাদ, অন্যদিকে এই খামখেয়ালি বর্ষাকাল যে কতটা ভয়ঙ্কর আর শক্তিশালী হতে পারে—সেটাও কারোর অজানা নয়। তার ওপর এখানকার নদনদীগুলো সারাক্ষণই তাদের গতিপথ বদলায়। কখনো কোনো একসময়ের জমকালো শহরকে পরিত্যক্ত করে সেখানে ম্যালেরিয়ার আঁতুড়ঘর বানিয়ে ফেলে, আবার কখনো নতুন কোনো এলাকায় পলি জমিয়ে চাষবাস আর বসতির নতুন পথ খুলে দেয়। সত্যি বলতে, ভৌগোলিক পরিবর্তনের দিক থেকে বাংলার এই বদ্বীপ এলাকাটি পৃথিবীর অন্যতম অস্থির আর প্রাণবন্ত একটা জায়গা।
দুই বাংলার ধর্মের ইতিহাস যে আলাদা হয়েছে, তার মূল কারণ হলো উত্তর ভারত থেকে আসা ওই ‘ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি’ কোন এলাকায় কখন পৌঁছেছিল সেই সময়টা। সোজা কথায় বললে, মুসলিম শাসন শুরু হওয়ার অনেক আগেই পশ্চিম বাংলায় ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি বেশ শক্তভাবে গেঁড়ে বসেছিল। কিন্তু পূর্ব বাংলার চিত্রটা ছিল উল্টো; সেখানে এই প্রভাব তখনো অতটা পৌঁছায়নি। আর ঠিক এই কারণেই পূর্ব বাংলার মানুষ ইসলামের মতো একটা সুনির্দিষ্ট ধর্মগ্রন্থ আর নিয়ম-কানুন নির্ভর ধর্মের দিকে বেশি ঝুঁকেছিল।
একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে। আমাদের উত্তর-পূর্ব ভারতের নাগাল্যান্ডের কথা ভাবুন। ১৯ শতকের দিকে সেখানে যখন খ্রিস্টান মিশনারিরা গেল, তখন স্থানীয়রা খুব সহজেই খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিল। কারণ তার আগে সেখানে হিন্দু, বৌদ্ধ বা ইসলাম ধর্মের কোনো প্রভাবই ছিল না। অথচ ভারতের সমতল ভূমিতে কিন্তু খ্রিস্টান মিশনারিরা একদমই পাত্তা পায়নি, কারণ সেখানে আগে থেকেই হিন্দু আর মুসলিমরা শক্ত অবস্থানে ছিল।
দ্য ডেইলি স্টার: ভারতের অন্যান্য অঞ্চল, বিশেষ করে পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্ত এলাকাগুলোর সাথে তুলনা করলে বাংলায় ধর্মান্তরের ধরণটা ঠিক কেমন ছিল? এগুলোর মধ্যে মিল বা অমিলই বা কী? আর একটা বিষয়—ইসলামের মূল কেন্দ্রগুলো তো শুরুতে ছিল দিল্লি, আগ্রা, বিজাপুর, লক্ষ্ণৌ বা বিহার শরিফের মতো বড় বড় শহরগুলোতে। অথচ নদনদী ঘেরা বাংলার একদম প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও ইসলাম কীভাবে এত ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ল? এটাকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
রিচার্ড এম. ইটন: আমার মনে হয়, বাংলায় যেভাবে ইসলাম ছড়িয়েছে তার সাথে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য কোনো অঞ্চলের তুলনা হবে না। এর মূলে ছিল একসাথে কয়েকটা বিষয়—জঙ্গল কেটে আবাদি জমি বাড়ানো আর সেই সাথে মুঘল সরকারের তাদের পূর্ব সীমান্ত এলাকাগুলোকে ‘বশে আনার’ বা স্থায়ীভাবে গুছিয়ে নেওয়ার নীতি। মুঘলরা এমন সব উদ্যোক্তাদের জমির মালিকানা দিত যারা জঙ্গল পরিষ্কার করে ধান চাষের জন্য লোকবল জোগাড় করবে, আর ওই জমিতে একটা মসজিদ বা মন্দির বানাবে—সেটা খড় বা বাঁশের সাধারণ কোনো ঘর হলেও চলত। এই সব প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্দেশ্য ছিল অশান্ত সীমান্ত এলাকাগুলোতে একটা স্থিতিশীলতা আনা। ওই লোকগুলো কোন ধর্মের, সেটা নিয়ে মুঘলদের কোনো মাথাব্যথা ছিল না; তাদের আসল লক্ষ্য ছিল শান্তি বজায় রাখা, খাজনা আদায় আর অনুগত প্রজা তৈরি করা। তবে যেহেতু সেই অগ্রজ উদ্যোক্তাদের বেশিরভাগই ছিলেন মুসলিম, তাই মন্দিরের চেয়ে মসজিদই বেশি তৈরি হয়েছিল।
মুঘল আমলের জমির দলিলের কোথাও আমি ‘আশরাফ’ বা ‘আতরাফ’—এই শব্দগুলো পাইনি। মনে হয় এই ভাগগুলো ব্রিটিশ আমলের আগে আসেনি। ব্রিটিশ অফিসাররা যখন বাঙালিদের বংশপরিচয় জিজ্ঞেস করত, তখন অনেকেই নিজেদের বড় বংশের বা ‘আশরাফ’ বলে দাবি করতে শুরু করেন।
এমনকি ব্রিটিশ শাসনের আগের সময়টাতে বাইরে থেকে আসা অভিজাত মুসলিম আর স্থানীয় মুসলিমদের মধ্যে কোনো রেষারেষির প্রমাণও আমি দেখিনি। সম্ভবত এর কারণ হলো, বাংলায় ইসলাম ধর্ম আসার প্রক্রিয়াটা ছিল খুব ধীর গতির এবং বেশ স্বতঃস্ফূর্ত। যেমনটা আপনি নিজেও বললেন, ১৮৭২ সালের আদমশুমারির আগে তো লোকে জানতই না যে পূর্ব বাংলায় এত বিপুল সংখ্যক মুসলিমের বাস!
দ্য ডেইলি স্টার: এই যে আমাদের এই বদ্বীপ অঞ্চলে চাষবাস বাড়ল, এতে সুফিদের ভূমিকা আসলে কতটুকু ছিল? আমরা তো জানি তারা ধর্মের টানে এসে এখানে জঙ্গল পরিষ্কার করে আবাদ শুরু করেছিলেন, আর সেটাকেই ইসলামের প্রসারের বড় কারণ ধরা হয়। কিন্তু ইদানীং তো সুন্দরবনের গভীরেও প্রাচীন আমলের চাষবাসের চিহ্ন পাওয়া যাচ্ছে। তাহলে আপনার মতে এই ধর্ম পরিবর্তনের আসল কারণটা কী?
রিচার্ড এম. ইটন: দেখুন, বাংলা বা অন্য কোথাও মুসলিম সমাজ গড়ে ওঠার এই ব্যাপারটাকে ‘ধর্মান্তর’ বলাটা আমার কাছে ঠিক মনে হয় না। এই শব্দটা শুনলে মনে হয় ১৯ শতকের সেই মিশনারিদের কথা, যেখানে হুট করে একদিনে একজনের ধর্ম পুরো বদলে যায়। কিন্তু এখানে বিষয়টা তেমন ছিল না। এটা ছিল খুব ধীর গতির একটা প্রক্রিয়া, যা মানুষ অনেকটা নিজের অজান্তেই গ্রহণ করেছে। যেহেতু বদলটা হয়েছে আস্তে আস্তে, তাই আমার মতে একে ‘ইসলামিকরণ’ বলাটাই বেশি মানানসই।
সুফি বলতে আমরা সাধারণত বুঝি সেই সব মরমী সাধকদের, যারা নিজেরা সাধনা করতেন আর অন্যদেরও আল্লাহকে পাওয়ার পথ দেখাতেন। অন্যদিকে, ‘পীর’ শব্দটা ভক্তি-শ্রদ্ধার সাথে মিশে আছে। পূর্ব দিকে জঙ্গল কেটে ধান চাষের জন্য যারা লোক জোগাড় করতে পারতেন, তাদের মধ্যে অবশ্যই একটা বিশেষ ক্ষমতা বা মানুষের ওপর প্রভাব ছিল। আর এই কারণেই সেই সময়ের দলিলপত্র বা লোকগীতিগুলোতে তাদের অনেককেই ‘পীর’ হিসেবে দেখা যায়।
ধীরে ধীরে মানুষের মনে এই মানুষগুলোর স্মৃতি গেঁথে যায়। যারা নতুন নতুন গ্রাম বসিয়েছিলেন, তাদের বড় বড় শেখ বা সুফি হিসেবে মান্য করা শুরু হয়। অনেক সময় তাদের কবরগুলোই মাজার হয়ে যায়, যেখানে মানুষ মানত করে বা ভক্তি দিতে আসে। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার যেটাকে বলতেন—একজন মানুষের ব্যক্তিগত প্রভাব বা ক্যারিশমা যখন একটা নিয়মের মধ্যে বা প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়, এটা আসলে ঠিক তেমনই একটা ব্যাপার।
এটা ঠিক যে সুন্দরবনের গহীনে সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক খোঁড়াখুঁড়িতে দেখা গেছে যে, মুসলিম আমলের আগেও সেখানে ধান চাষ হতো, বৌদ্ধদের মঠ ছিল, এমনকি সমুদ্রবন্দরও ছিল। তবে ষোলো শতকের দিকে যেটা একদম নতুন ছিল, তা হলো—এই সব চাষবাসের কাজের সাথে মুসলিম পীর বা পীর হিসেবে পরিচিত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সরাসরি জড়িয়ে যাওয়া। তাদের নেতৃত্বেই জঙ্গল পরিষ্কার করে নতুন করে আবাদ শুরু হয়েছিল। আর যেখানে আগে থেকেই কিছুটা চাষবাস ছিল, তাদের হাত ধরে সেখানে কাজের গতি আর পরিধি অনেক বেড়ে গিয়েছিল।
দ্য ডেইলি স্টার: কেবল চাষবাস বাড়ানো বাদে জানতে চাইছি, বাংলায় মুসলিম শাসনের ধরণটা আসলে কেমন ছিল? বিশেষ করে ওপরমহলের পৃষ্ঠপোষকতা আর উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে মুসলিমদের চলে আসার বিষয়টি নিয়ে যদি কিছু বলতেন। এক্ষেত্রে জলপথ বা স্থলপথের বাণিজ্য আর তুর্কি ও আফগানদের আসাটা ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল?
রিচার্ড এম. ইটন: আমার বইয়ে আমি লিখেছি কীভাবে মুঘল সাম্রাজ্যের ছোট-বড় কর্মকর্তারা জঙ্গল পরিষ্কার করে ধান চাষ করার শর্তে জমি বিলি করতেন। শর্ত একটাই—সেখানে মসজিদ বা মন্দির বানাতে হবে আর সাম্রাজ্যের কল্যাণের জন্য দুআ করতে হবে। পূর্ব বাংলায় ধান চাষ বাড়ার ফলে যখন অঢেল টাকা-পয়সা আসতে শুরু করল, তখন চট্টগ্রাম বন্দরটা খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল। এখান থেকে চাল বোঝাই হয়ে বঙ্গোপসাগর দিয়ে একদিকে সুদূর ইন্দোনেশিয়া, আবার অন্যদিকে গোয়া পর্যন্ত চলে যেত। আর মুঘল আমলের আগে প্রথমে তুর্কি আর পরে আফগানরা যে সুলতানি আমল গড়ে তুলেছিল, তার ফলে উত্তর ভারতের সাথে বাংলার একটা সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হয়—যেটা এম. আর. তরফদার খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
পাল আর সেন আমলের কথা ধরলে দেখা যায়, ৬ষ্ঠ থেকে ১১শ শতাব্দীর মধ্যে উত্তর আর পশ্চিম বাংলায় চাষবাস বাড়ানো আর সমাজকে একটা কাঠামোর মধ্যে আনার কাজটা আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। স্থানীয় প্রভাবশালীরা নিজেদের ক্ষমতায় বা পরে পাল রাজাদের নির্দেশে বনের আদিবাসীদের একজোট করে বড় বড় কাজ করাতেন—যেমন পুকুর কাটা, দিঘি খনন বা জঙ্গল পরিষ্কার করা। এই প্রভাবশালীরাই আবার বৌদ্ধ মঠ বা মন্দির বানিয়ে নিজেদের মান-সম্মান বাড়াতেন। ঠিক একই চিত্র কয়েকশ বছর পর আবারও দেখা যায়, যখন অন্য একদল প্রভাবশালী মানুষ একইভাবে লোকবল জোগাড় করে আবাদি জমি বাড়িয়েছিলেন। তারাও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান তৈরিতে টাকা ঢালতেন, তবে তাদের ক্ষেত্রে সেগুলো ছিল মূলত মসজিদ। আমরা এ-ও জানি যে, তুর্কিরা আসার অনেক পরেও অমুসলিম উপাসনালয়গুলো দিব্যি চালু ছিল। তাই তুর্কি বিজয়ের ফলে যে রাতারাতি এই অঞ্চলের ধর্ম বা সংস্কৃতি বদলে গিয়েছিল—এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই।
দ্য ডেইলি স্টার: আপনার কি মনে হয়, সুলতানি আমলের চেয়ে মুঘল আমলেই বেশি মানুষ ইসলামের সংস্পর্শে এসেছিল? এই দুই আমলের সরকারি নীতি তো আলাদা ছিল; তাহলে সেই হিসেবে বাংলায় ইসলাম প্রচারের ধরণটাই বা কেমন ছিল?
রিচার্ড এম. ইটন: হ্যাঁ, অনেকটা তাই। সুলতানি আমলের তুলনায় মুঘল আমলের অনেক বেশি নথিপত্র আমাদের হাতে আছে। তাই মনে হতে পারে যে ১৭ বা ১৮ শতকেই ইসলাম বেশি ছড়িয়েছে। তবে অন্যদিকে, সুলতানি আমলের অনেক পুঁথি বা সাহিত্যেও এমন সব পীরদের কথা পাওয়া যায়, যারা ধান চাষ আর ইসলাম প্রচার—দুটোর সাথেই যুক্ত ছিলেন। তাই এটা বলাই যায় যে, মুঘলরা আসার অনেক আগে থেকেই পূর্ব বঙ্গে ইসলাম আসার প্রক্রিয়াটা শুরু হয়ে গিয়েছিল।
দ্য ডেইলি স্টার: আজকের দিনে আমরা ধর্মমনিরপেক্ষতা বা সহনশীলতা বলতে যা বুঝি, মধ্যযুগে তো আর বিষয়টা তেমন ছিল না। সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে অমুসলিমদের প্রতি বাংলার সুলতানদের মনোভাব কেমন ছিল? রাষ্ট্র আর সমাজের সাধারণ স্তরে এই সম্পর্কগুলো কীভাবে সামলানো হতো? বিশেষ করে অনেক জায়গায় তো মন্দির ভাঙা বা অপবিত্র করার কথা শোনা যায়, যেটাকে অনেকে রাজনৈতিক বিজয়ের প্রতীক হিসেবেও ব্যাখ্যা করেন। এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী?
রিচার্ড এম. ইটন: এম. আর. তরফদার খুব সুন্দরভাবে দেখিয়েছেন যে, বাংলার মুসলিম সুলতানরা কীভাবে অমুসলিমদের শাসনের মূল ধারায় যুক্ত করে নিয়েছিলেন।
আর ইসলামের নিয়মকানুন বা রীতিনীতিগুলো সাধারণ মানুষের মধ্যে কীভাবে ছড়িয়েছিল, তা নিয়ে আয়িশা ইরানি, টনি স্টুয়ার্ট আর থিবো ডিউবার্টের মতো গবেষকরা মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য নিয়ে অনেক কাজ করেছেন। যেমন, আয়িশা ইরানি দেখিয়েছেন ১৭ শতকে ‘নবি-বংশ’ কাব্যের লেখক সৈয়দ সুলতান কীভাবে ইসলামকে বাংলার পুরনো ঐতিহ্যের সাথে মিলিয়ে উপস্থাপন করেছিলেন। তিনি হিন্দু দেবতাদেরও ইসলামের নবি-রাসুলদের বংশধারার সাথে জুড়ে দিয়েছিলেন। এটা ছিল এক ধরণের ‘সৃজনশীল খাপ খাইয়ে নেওয়া’, যার ফলে প্রাক-ঔপনিবেশিক আমলেই ইসলাম এখানকার মাটির নিজস্ব ধর্মে পরিণত হয়। সৈয়দ সুলতানের কাছে এই ইসলামিকরণ ছিল বাঙালিদের হারিয়ে যাওয়া নিজস্ব ধর্মীয় ঐতিহ্যকে ফিরে পাওয়ার মতো একটা ব্যাপার।
অন্যদিকে, টনি স্টুয়ার্ট দেখিয়েছেন সেই সময়ের কবিরা কত চমৎকার কৌশলে আরবি ভাষার ইসলামি চিন্তাগুলোকে সংস্কৃত-ঘেঁষা বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। আর ডিউবার্ট ১৭ ও ১৮ শতকের চট্টগ্রামের গ্রামাঞ্চলের নিম্নবিত্ত মানুষের মধ্যে ‘নুরনামা’র মতো বইগুলোর প্রচার নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, এই সাহিত্যগুলো কেবল মানুষের মনের কথা বলেনি, বরং তাদের মধ্যে ইসলামের ধারণাগুলোকে আরও সুদৃঢ় করে দিয়েছিল।
দ্য ডেইলি স্টার: আপনি আপনার বইতে পূর্ববঙ্গে ইসলামের শিকড় নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনটে ধারণার কথা বলেছেন—অন্তর্ভুক্তি (Inclusion), পরিচয় ঘটানো (Identification) আর পূর্বের জায়গা দখল করা (Displacement)। এই প্রক্রিয়াগুলো কীভাবে আগের পুরনো সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় পরিচয়ের সাথে মানিয়ে নিয়েছিল বা সেগুলোকে বদলে দিয়েছিল? সে সম্পর্কে যদি বিস্তারিত কিছু বলতেন।
রিচার্ড এম. ইটন: দেখুন, এই তিনটে ধাপ আসলে বোঝায় একটা সমাজ ঠিক কোন অতিপ্রাকৃত শক্তি বা দেব-দেবির ওপর ভরসা রাখছে। একটা গোষ্ঠী কাকে পূজা করছে বা কার কাছে প্রার্থনা করছে, তা থেকেই বোঝা যায় তাদের নিজেদের ধর্মীয় পরিচয়টা আসলে কী। তাই যখন আমরা পুরনো কোনো পুঁথি বা বই পড়ি, তখন সেখানে কোন শক্তির গুণগান করা হয়েছে সেটা দেখলেই বোঝা যায় সেই সময়ে সমাজের ধর্মীয় রূপটা কেমন ছিল।
এই বদলগুলোর পেছনে বেশ কিছু কারণ ছিল। যেমন—চাষবাসের পরিধি বেড়ে যাওয়া, পীর-দরবেশদের নেতৃত্বে নতুন নতুন এলাকায় ধান চাষ শুরু হওয়া, কাগজের ব্যবহার আর লেখাপড়া জানার প্রসার (যেটা ধর্মগ্রন্থ পড়ার জন্য খুব দরকার ছিল), আর সবশেষে ১৯ শতকের দিকে স্টিমার আর রেলগাড়ির প্রচলন। এই যাতায়াতব্যবস্থা সহজ হওয়ার কারণেই মানুষ বেশি করে হজে যেতে পারল এবং সেখান থেকে ফেরার পর অনেক ‘সংস্কার’ আন্দোলন শুরু হলো। এই সবকিছুই প্রমাণ করে যে, ইসলামিকরণ কোনো এক নিমেষের ঘটনা নয়, বরং এটি ছিল দীর্ঘদিনের একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
দ্য ডেইলি স্টার: একদম শেষ প্রশ্ন—আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যদি পেছনে ফিরে তাকান, তবে আপনার ‘দ্য রাইজ অফ ইসলাম অ্যান্ড দ্য বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার, ১২০৪–১৭৬০’ (১৯৯৩) বইটির গবেষণা বা লেখার ক্ষেত্রে কোন জিনিসটা ভিন্নভাবে করতেন? তিন দশক পার হওয়ার পরও কিন্তু বাংলার ওপর আপনার এই বইটিকে অন্যতম সেরা কাজ হিসেবে ধরা হয়।
রিচার্ড এম. ইটন: আমার বইটা যখন প্রথম বের হয়, তারপর থেকে প্রত্নতত্ত্ব বা আর্কিওলজিতে দারুণ সব আবিষ্কার হয়েছে। সত্যি বলতে, আমি যখন লিখেছিলাম তখনকার চেয়ে এই শাখাটা এখন অনেক বেশি উন্নত। তবে মুশকিল হলো, আমার মতো অনেক ইতিহাসবিদই এখনো মাটির নিচের এই সব প্রমাণ বা প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যগুলোকে ইতিহাসের সাথে ঠিকঠাক মেলাতে পারছি না। আমরা ইতিহাসবিদরা সাধারণত রাজনীতি আর ক্ষমতার রদবদল নিয়ে এত বেশি মগ্ন থাকি যে, আমরা মনে করি একটা রাজবংশ গেলেই বুঝি সমাজ আর সংস্কৃতিও রাতারাতি বদলে যায়। আমার বইয়ের নামেই তো দুটো রাজনৈতিক সাল আছে—১২০৪ আর ১৭৬০। এটা দেখলে মনে হতে পারে যে ইসলামিকরণ বুঝি ১২০৪ সালে হঠাৎ শুরু হয়ে ১৭৬০-এ শেষ হয়ে গিয়েছিল! আসলে ব্যাপারটা কিন্তু মোটেও তেমন না, বরং এভাবে সাল দিয়ে বেঁধে দেওয়াটা বেশ বিভ্রান্তিকর।
প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণগুলো কিন্তু হুট করে কোনো বদলের কথা বলে না। বরং সেগুলো দেখলে বোঝা যায়, সবকিছু আসলে অনেক কাল ধরে টিকে ছিল আর এক সংস্কৃতির সাথে অন্যটা মিলেমিশে ছিল। যেমন, প্রত্নতত্ত্ববিদ স্বাধীন সেন রংপুরে এমন কিছু পুরনো উপাসনালয় খুঁজে পেয়েছেন যা একেক সময় একেক ধর্মের দখলে ছিল। কখনো দেখা গেছে ব্রাহ্মণরা বৌদ্ধদের জায়গা নিয়েছে, আবার কখনো বৈষ্ণবরা শৈবদের জায়গায় বসেছে—এই অদলবদল চলতেই থাকত। তাই আজ যদি আমি নতুন করে বইটা লিখতাম, তবে মাটির নিচের এই সব তথ্য আরও বেশি করে কাজে লাগাতাম।
আরেকটা আক্ষেপের জায়গা হলো, আমি বাংলাদেশের ওপর যতটা সময় দিয়ে খুঁটিয়ে গবেষণা করেছি, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে হয়তো ততটা করা হয়নি। জানি না তাতে আমার মূল যুক্তিটা কতটা বদলাত, তবে দুই বাংলার একটা তুলনামূলক চিত্র থাকলে বইটা হয়তো আরও সমৃদ্ধ হতো।
দ্য ডেইলি স্টারের হয়ে ইন্টারভিউটি নিয়েছেন প্রিয়ম পাল।









Comments