বাঙালি মুসলিমসমসাময়িক বিশ্লেষণ

আওয়ামী লীগ ও শাহবাগের বয়ানের মিথস্ক্রিয়া এবং এর প্রতিবয়ান

Share
Share

আওয়ামী লীগ ও শাহবাগের বয়ানের মিথস্ক্রিয়া এবং এর প্রতিবয়ান

‘শাহবাগ আন্দোলন’-কে বুঝতে হলে প্রথমে এটি কী কারণে হয়েছিল তা বোঝা আবশ্যক। ২০১৩ সালে শাহবাগে বিশাল এক জমায়েত তৈরি হয়েছিল এবং সেই জমায়েতের নেতৃত্ব দিচ্ছিল বাংলাদেশের তথাকথিত সেক্যুলার গোষ্ঠী– তাদের লেখক, বুদ্ধিজীবী এবং মিডিয়াসমূহ। এই আন্দোলনকে জনপ্রিয় করবার জন্য বেশকিছু পদক্ষেপ তারা নিয়েছিল; তার মধ্যে একটি ছিল: শাহবাগের কর্মসূচি টেলিভিশনে ২৪ ঘন্টা লাইভ সম্প্রচার করা। এভাবে সারাদেশে এক ধরনের উন্মাদনা সৃষ্টি করা হয়। এর ফলে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রী, এমনকি তাদের বাবা-মায়েরা পর্যন্ত সেখানে হাজির হয়েছিলেন!

এই আন্দোলনের দাবি ছিল: যুদ্ধপরাধীদের ফাঁসি দিতে হবে। ‘বিচার’ কিন্তু না, ‘ফাঁসি’ দিতে হবে! লক্ষণীয় হচ্ছে: বিচারের দাবি তো যে কেউ-ই করতেই পারে, যেকোনো বিষয়ে বিচারের দাবি করা যেতে পারে। কিন্তু দাবি ছিল: ‘ফাঁসি’ দিতে হবে, যার মানে হচ্ছে, ‘বিচার’ তাদের উদ্দেশ্য ছিল না। সেখানে কেবল নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির ফাঁসির কথা বলা হলেও মূলত বাংলাদেশে একটি ন্যারেটিভ হেজেমনি (একটি নির্দিষ্ট বয়ানের আধিপত্য) তৈরি করবার জন্য পুরো শাহবাগের আয়োজন করা হয়েছিল।

এই বিষয়টি তৎকালীন বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ হয়তো বুঝতে পারছিলেন না। তারা বিষয়টিকে দেখছিলেন এক ধরনের পপুলার ডিমান্ড (গণদাবি) হিসেবে। অপরদিকে, যেহেতু দাবিগুলো ১৯৭১ সাল নিয়ে এবং ১৯৭১ সালের সাথে জামাতে ইসলাম এবং আরো কিছু ইসলামিক দলগুলো (বিতর্কিতভাবে) জড়িত ছিল, তাই সেই রাজনৈতিক দলগুলোর এই বিষয়ে কোনোরকম বক্তব্য দেয়ার মত পরিস্থিতি ছিল না; অর্থাৎ, আত্মরক্ষা করবে-এরকম সুযোগ তাদের কাছে ছিল না। শাহবাগের এই উন্মাদনা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে, তা আর কোনো আলাপ-আলোচনার পর্যায়ে ছিল না, বরং ইতোমধ্যেই ভিকটিম তৈরি করা হয়ে গিয়েছিল।

ভিকটিম তৈরি করার ন্যারেটিভটি খুবই চমকপ্রদ ছিল। পদ্ধতিটি ছিল: এক ধরনের পাবলিক এনিমি (গণশত্রু) তৈরি করা। যেকোনো ফ্যাসিস্ট যখন ক্ষমতায় আসে, তখন তাদের জন্য আবশ্যকীয় কাজ হচ্ছে কোনো পাবলিক এনিমি তৈরি করা। কারণ জনগণকে যদি উন্মাদনার পর্যায়ে নিয়ে যেতে হয়, তাহলে কোনো পাবলিক এনিমি তৈরি করা ছাড়া সেই উন্মত্ত অবস্থায় নিয়ে যাওয়া যাবে না। এর উদাহরণ দেখা যায় অ্যাডলফ হিটলারের জার্মানিতে। হিটলারের জার্মানিতে সর্বপ্রথম পাবলিক এনিমি তৈরি করা শুরু হয়েছিল জিপসিদের দিয়ে। তারপর বিভিন্ন অসুস্থ মানুষ, যেমন: অটিজম-বিশিষ্ট ব্যক্তিদের পাবলিক এনিমি বানানো হয়। পরবর্তীতে ইহুদিদের পাবলিক এনিমি বানানো হয়েছে। ধারণাটি এমন ছিল যে, জার্মানির সকল দুর্দশার জন্য ইহুদিরা দায়ী। এরূপ করার ফলে হিটলারের পক্ষে সম্পূর্ণভাবে এক বর্বর শাসন ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল।

শাহবাগেও ঠিক এই কাজটিই করা হয়েছিল। জামাতে ইসলামী এবং আরও কিছু ইসলামিক দলের নাম দিয়ে তারাও এক ধরনের পাবলিক এনিমি তৈরি করেছিল। মূলত তারা যেকোনো প্রো-ইসলামিক পলিটিক্যাল ফোর্স (ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তি)-কে পাবলিক এনিমি বানানোর চেষ্টা করেছিল। এই তালিকায় আরও যোগ করা হয় ন্যাশনালিস্ট ফোর্স (জাতীয়তাবাদী শক্তি)-কে। কিন্তু এমন এক উন্মত্ত অবস্থা তখন ছিল যে, বিএনপি, যারা ন্যাশনালিস্ট ফোর্স এর প্রধান দল, তারাও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায় যে, তারা কি শাহবাগে যাবে বা শাহবাগের প্রতি সমর্থন জানাবে নাকি এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে?

অর্থাৎ, তারা এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না। সেই সময় বিএনপির সভানেত্রী এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দেশের বাইরে ছিলেন। এ কারণে বিএনপি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলো। শাহবাগ থেকে এ দাবিও করা হয়েছিল যে, বাংলাদেশে প্রো-ইসলামিক/ প্রো-ন্যাশনালিস্ট এডিটরিয়াল পলিসি বিশিষ্ট যত মিডিয়া আছে এবং প্রো-ইসলামিক ব্যক্তি যে সমস্ত ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় আছেন, সেগুলো বন্ধ করে দিতে হবে।

এ আন্দোলনে ভারতীয় দূতাবাসের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছিল। এর একটি প্রমাণ হল: সেই সময় আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন তৎকালীন ভারতীয় প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। তিনি তখন এরকম বলেছিলেন যে,

আসলে আমার মন পড়ে আছে শাহবাগে, এই আন্দোলনের সাথে, এই (তথাকথিত) গণজাগরণ মঞ্চ-তে। আমি আমার সমর্থন জ্ঞাপন করবার জন্য সেখানে যেতে চাই; কিন্তু যেহেতু আমি রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ত, এজন্য আমি যেতে পারছি না।

এটি একটি অবিশ্বাস্য ব্যাপার যে, অন্য এক বিদেশি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান এসে একটি দেশের অভ্যন্তরীণ একটি ইস্যুতে কোনো পক্ষ অবলম্বন করছিলেন! তার মানে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল, অনেকটা হিটলারের জার্মানির মতো, যে, ভারতের আর এই ব্যাপারটি লুকানোর কোনো প্রয়োজন ছিল না। ভারত প্রকাশ্যে বলতে চাইলো যে, আমরা এই আন্দোলনের পিছনে আছি।

ভারত এই ধরনের কথা বলার সাহস পাবার কারণ ছিল: এই শাহবাগের ন্যারেটিভের বিরুদ্ধে অন্য কোনো ন্যারেটিভ কোনো মিডিয়া নিয়ে আসতে চায়নি বা সাহস পায়নি – দুটোই হতে পারে। অধিকাংশ মিডিয়া তখন শাহবাগের ন্যারেটিভকে গ্রহণ করেছিল। যে দুই-একটি মিডিয়া এই ন্যারেটিভ গ্রহণ করেনি, তাদেরও সেই পরিস্থিতিতে এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস ছিল না। অর্থাৎ, কোনো ফ্যাসিস্ট এনভাইরনমেন্টে যা যা হওয়া দরকার, ঠিক তাই তাই হচ্ছিল।

সেই অবস্থায় ‘আমার দেশ’ পত্রিকার কাছে অপশন ছিল: হয় অন্যান্য মিডিয়ার মতো চুপ করে থাকা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং প্রো-ইসলামিক রাজনীতিকে শেষ হতে দেখা, অন্য কথায় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব হিন্দুত্ববাদী ভারতের কাছে অর্পণ করা অথবা অত্যন্ত ক্ষুদ্র শক্তি নিয়ে ঐ ন্যারেটিভের বিরুদ্ধে লড়াই করা। ‘আমার দেশ’ পত্রিকার সিদ্ধান্ত ছিল দ্বিতীয় পথাবলম্বন: অতি সামান্য শক্তি নিয়েই এই ন্যারেটিভের বিরুদ্ধে লড়াই করা।

শাহবাগের ন্যারেটিভের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য প্রথমত বাংলাদেশের মানুষকে বোঝানো দরকার ছিল যে, শাহবাগে যা হচ্ছে, তা কোনো পপুলার মুভমেন্ট (গণ আন্দোলন) বা কোনো স্পন্টেনিয়াস মুভমেন্ট (স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন) ছিল না, বরং It was a Mechanical Movement, not an Organic one এবং এই ন্যারেটিভ তৈরি করবার সাথে ভারত সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল। বাংলাদেশের মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়া এবং তথাকথিত লিবারেল / সেকুলার সিভিল সোসাইটির যারা ভারতের দালাল শেণির ছিল, তারাই যে মূলত এই ধরনের উন্মাদনা তৈরি করেছিল, তা মানুষকে বোঝানো দরকার ছিল।

It was a sort of cultural fight; অর্থাৎ, আমরা এক ধরনের সাংস্কৃতিক লড়াই করতে যাচ্ছিলাম। এই সাংস্কৃতিক লড়াইতে যদি আমরা বা বাঙালি মুসলমানেরা হেরে যেতাম, সেক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবেও আমরা পরাজিত হতে বাধ্য ছিলাম; কারণ যেকোনো দেশে যদি সাংস্কৃতিকভাবে এক ধরনের হীনম্মন্যতা চলে আসে, তারপরে আর রাজনৈতিকভাবে ঐ দেশের স্বাধীনতা ধরে রাখা সম্ভব হয় না।

“দিল্লি না ঢাকা? ঢাকা, ঢাকা”- জুলাই ‘বিপ্লব’-এর এই স্লোগান অবশ্যই রাজনৈতিক, কিন্তু এর পটভূমি হচ্ছে সাংস্কৃতিক লড়াই। এই সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের স্বরূপ কী? এর স্বরূপ হচ্ছে: বাঙালি মুসলমানের যে সংস্কৃতি, তা বাঙালি হিন্দুর সংস্কৃতি থেকে আলাদা – এ কথা অনুধাবন করা। একাত্তরে স্বাধীনতার পর থেকে কিংবা তারও আগে থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের নামে আমাদের ওপরে আসলে হিন্দু জাতীয়তাবাদ চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে বাঙালি মুসলমানের যে সংস্কৃতি-ঐতিহ্য,অত্যন্ত গৌরবময় ইতিহাস, তা যেন আমরা ভুলে যাই এবং আমরা যেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের নামে ভারতীয় হিন্দু জাতীয়তাবাদকে গ্রহণ করি। 

বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে স্লোগান, এটি শুরু হয়েছিল আঠারো শতকে পশ্চিমবঙ্গে যখন বেঙ্গল রেনেসাঁ হয়, তখন থেকে। এটি বিশেষত হিন্দু বাঙালির রেনেসাঁ, যার মধ্যে বাঙালি মুসলমানের কোনো জায়গা ছিল না। ‘The Autobiography of An Unknown Indian’ বইতে নীরদচন্দ্র চৌধুরী আঠারো শতকের সেই তথাকথিত বেঙ্গল রেনেসাঁ নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি পরিষ্কারভাবে বুঝিয়েছেন যে, সেই রেনেসাঁর মধ্যে মুসলমানের কোনো জায়গা ছিল না। বাঙালি মুসলমানকে তারা বাঙালি মনে করতেন না। এজন্যই আমরা যদি এই রেনেসাঁর একটি বৃত্ত কল্পনা করি, তবে ঐ বৃত্তের বাইরে ছিল মুসলমানদের অবস্থান। মুসলমানদের যদি ঐ বৃত্তে ঢুকতে হতো, তাহলে তাদের মুসলমানিত্ব পরিত্যাগ করে ঐ বৃত্তে ঢুকতে হতো। অর্থাৎ, কোনো মুসলমান বাঙালি রেনেসাঁর অংশ তখনই হতে পারবে, যখন সে তার ইসলামি ঐতিহ্য এবং ইসলামি সংস্কৃতি বিসর্জন দিতে পারবে। ঠিক এভাবেই কিন্তু বাংলাদেশের বাঙালি জাতীয়বাদের যে বয়ান, তা রচিত হয়েছে।

বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ এবং ভারতপন্থী রাজনীতিবিদরা যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বয়ান পেশ করেছিল, সেই বয়ানের মধ্যেও মুসলমানের কোনো জায়গা নেই। মুসলমান যে একটি ভিন্ন কালচারাল এন্টিটি (এমন সাংস্কৃতিক সত্তা, যার স্বতন্ত্র সংস্কৃতি আছে), তা ঐ বয়ানের মধ্যে গ্রহণ-ই করা হয়নি। অথচ আমরা যদি বাংলা সাহিত্য এবং বাংলা ভাষার ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাই, তাহলে দেখব যে, বাংলা ভাষার উৎকর্ষের মধ্যে স্বাধীন সুলতানি আমলের সুলতানদের অবিস্মরণীয় অবদান ছিল। কারণ মুসলিম শাসনের আগে যখন সেন বংশ এই বাংলা শাসন করতো, তখন এই অঞ্চলে তাদের রাজদরবারে বাংলা ভাষা চর্চা নিষিদ্ধ ছিল; সেখানে সংস্কৃত ভাষা চর্চা করা হতো। এমনকি এটিও বলা হতো যে, যদি কেউ বাংলা ভাষায় হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থও পাঠ করে, তাহলে যে পাঠ করবে এবং যে শুনবে, উভয়ের কানে গরম সিসা ঢেলে সাজা দেওয়া হবে। তার মানে সেখানে বাংলা ভাষার কোনো জায়গা ছিল না, একে বলা হতো ‘অচ্ছুৎ’ (অস্পৃশ্য)-দের ভাষা।

এই অবস্থা থেকে বাংলা ভাষাকে উদ্ধার করেছিলেন মুসলমান সুলতানেরা। তাদের আমলেই বাংলা ভাষা প্রসারের জন্য বৃত্তি দেওয়া শুরু হয়। বিশেষত যে কয়েকজন সুলতানের নাম উল্লেখযোগ্য, তাঁদের একজন আলাউদ্দিন হোসেন শাহ। তিনি বাংলা ভাষাকে অনেক পেট্রোনাইজ (পৃষ্ঠপোষকতা করা) করেছেন, এমনকি হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থকেও বাংলায় অনুবাদ করবার জন্য তিনি বিশেষ বৃত্তি দিতেন। আরো একজন ছিলেন সুলতান জালালউদ্দিন, তিনিও এ জন্য প্রচুর টাকা-পয়সা দিতেন। এ ছাড়াও ছিলেন সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ। এই সমস্ত মুসলিম সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতার ফলেই বাংলা ভাষার উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে এবং তখন বাংলা সাহিত্য চর্চা শুরু হয়েছে। অর্থাৎ, সুলতানি আমলের আগে এই বাংলা সাহিত্য চর্চা শুরুই হয়নি।

কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে বয়ান, সেখানে কোথাও স্বাধীন বাংলাদেশের সেই সময়কার সুলতানদের নাম খুঁজে পাওয়া যাবে না। দিপু মণি যখন শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন, তখন স্কুল-কলেজের জন্য রচিত কিছু বইয়ে এই স্বাধীন সুলতানদের বহিরাগত এবং অত্যাচারী হিসেবে দেখানো হয়। বাঙালি মুসলমানের যে ঐতিহ্য-ইতিহাস, বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত এটিকে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। জুলাই ‘বিপ্লব’-এর পরে এখন তাঁদের স্বীকৃতির সময় এসেছে।

সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ, তিনি সর্বপ্রথম পুরো বাংলাকে একত্রিত করেছিলেন। তাঁর আগে কিন্তু বাংলা একত্রিত ছিল না, বরং বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত ছিল। এসকল ভাগের বিভিন্ন নামও ছিল, যেমন: উত্তরবঙ্গের নাম ছিলো বরেন্দ্র অঞ্চল। বরিশালকে বলা হতো চন্দ্রদ্বীপ। পশ্চিমবঙ্গের নাম ছিল গৌড়। বঙ্গ বলা হতো শুধুমাত্র বিক্রমপুর এলাকাকে। সেন রাজাগণ (লক্ষণ সেন বা তারও আগে বল্লাল সেন) নিজেদের বলতো ‘গৌড়েশ্বর;’ অর্থাৎ, গৌড় এর ঈশ্বর। তারা নিজেদের ‘বাংলার রাজা’ বলতো না। সর্বপ্রথম সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ যখন একক রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে পুরো বাংলাকে একত্রিত করলেন, তখন তিনি প্রথমবারের মতো নিজের উপাধি দিলেন ‘সুলতানে বাঙ্গাল;’ অর্থাৎ, বাংলার সুলতান। এই ‘বাংলা’ শব্দটিও তো ব্যবহার করেছিলেন একজন মুসলমান সুলতান, অথচ এমনভাবে সবকিছু বিকৃত করা হয়েছে যে, এই বিকৃতির মধ্যে মুসলমান সুলতানদের এই সমস্ত অবদান তেমন কিছুই উল্লেখ করা হয় না!

বাঙালি মুসলমান এবং বাঙালি হিন্দুর সংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্য আছে। যেমন: বাঙালি মুসলমান H2O কে বলে ‘পানি’ আর বাঙালি হিন্দু একে বলে ‘জল।’ ভারতের উত্তর প্রদেশে কিন্তু ‘পানি’-ই বলে, ‘জল’ বলে না। এছাড়াও আমাদের ভাষায় অনেক আরবি-ফারসি শব্দ আমরা পাই। ভাষার বিবর্তনের মাধ্যমে এই শব্দগুলো আমাদের ভাষায় প্রবেশ করেছে। এখন যদি আমরা বেশি বাঙালিত্ব দেখাতে গিয়ে এই শব্দগুলো ব্যবহার না করি, তাহলে মূলত আমাদের ঐতিহ্যকে অস্বীকার করা হবে। অর্থাৎ, বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতি এবং বাঙালি হিন্দুর সংস্কৃতি আলাদা – এই বিষয়টি আমাদের মেনে নিতে হবে। কিন্তু শাহবাগে যে ফ্যাসিবাদের পদধ্বনির শুরু হয়েছিল, তার উদ্দেশ্যই ছিল এই বাংলাদেশের মুসলমানদের বা বাঙালি মুসলমানদের ঐতিহ্যকে শেষ করে দেয়া এবং তাদের ওপর হিন্দু সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়া।

শাহবাগের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার মাধ্যমেই ‘হেফাজতে ইসলাম’ এর উত্থান ঘটে। হেফাজতের উত্থানের মাধ্যমে তখন আলিমরা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, আমরা একটি ভিন্ন ধর্ম এবং ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ। আমাদের এই ভিন্নতা মেনে নিতে হবে। এই উত্থান বা লড়াই এর পিছনে কারণ কী? তার জন্য প্রথমে বুঝতে হবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পিছনের কারণ।

আজকে যে বাংলাদেশ স্বাধীন তার পিছনের কারণ হচ্ছে: এই দেশের ৯০% মানুষ মুসলমান। আমরা যদি মুসলমান না হতাম, তাহলে ভারতের সাথে মিশে যেতে তো কোনো সমস্যাই ছিলো না! আমরা তো একই ভাষাভাষী, আমাদের তিন দিকেই ভারত। কিন্তু আমাদের আলাদা রাজনৈতিক অস্তিত্ব থাকার কারণ:  আমরা মুসলমান। ১৯৪৬ সালে ভারত বিভক্ত হবার আগে ভোট নেয়া হয়েছিলো যে, এ অঞ্চলের মানুষ কি ভারত নাকি পাকিস্তানের অংশ হতে চায়? আমাদের পূর্বপুরুষেরা ভোট দিয়েছিলেন পাকিস্তানের পক্ষে। কেন? কারণ তারা মনে করেছিলেন যে, এ অঞ্চলের মুসলিমদের জন্য একটি স্বাধীন আবাস ভূমি লাগবে। স্বাধীন আবাস ভূমি যদি না থাকে, তাহলে তারা অত্যাচারিত হবে (ভারতে তা অনবরত হচ্ছে)। কাজেই আজকে যদি বাংলাদেশ তার স্বাধীন সত্তা বজায় রাখতে চায়, তাহলে অবশ্যই তাকে ইসলামী মূল্যবোধ এবং বাঙালি মুসলমানের কালচার বজায় রাখতে হবে।

হেফাজতে ইসলাম এর আন্দোলনের মাধ্যমে এই বিষয়টি জনগনকে তখন বোঝানো সম্ভব হয়েছিল, কারণ তার আগে মনে হচ্ছিলো যে, দেশের সবাই বোধ হয় ‘শাহবাগী’ হয়ে গেছে! কিন্তু হেফাজতের যখন উত্থান ঘটল, তখন সর্বপ্রথম ৬ই এপ্রিল যে মিটিং হলো, সেই মিটিংয়ে দেখা গেল যে, ঢাকা শহরে কমপক্ষে পঁচিশ লক্ষ মানুষ এসেছেন! আওয়ামী লীগ সরকার সমস্ত বাস-ট্রেন, এমনকি লরি এবং লঞ্চ পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছিল যাতে করে ঢাকা শহরে বাইরে থেকে কেউ আসতে না পারে। কিন্তু আলিম এবং মাদ্রাসার ছেলেরা পায়ে হেঁটে ঢাকায় এসেছিল! তখন প্রমাণ হলো যে, না! বাংলাদেশে এভাবে হিন্দুত্ববাদী ন্যারেটিভ দিয়ে জনগণের ওপর প্রভুত্ব কায়েম করে যাবে না।

সেই সাথে ইতিহাসের প্রতি সৎ থাকার স্বার্থে এ কথাও বলতে হবে যে, বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সিঙ্গাপুর থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসার পর শাহবাগের বিরুদ্ধে বিএনপির একটি পরিষ্কার অবস্থান মিলে। যতক্ষণ না বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশে ফিরেছেন, ততক্ষণ বিএনপি দল হিসাবে কোনো স্বাধীন অবস্থান নিতে পারেনি। সেই সময় ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সাথে বিএনপির একটি মিটিং করার কথা ছিলো, কিন্তু মিটিং এর দিন হরতাল থাকায় বেগম খালেদা জিয়া বললেন যে, হরতালের মধ্যে আমি কোনো মুখার্জির সাথে দেখা করতে পারবো না। হয় তাকে সন্ধ্যার পরে দেখা করতে হবে (কারণ হরতাল ছিল সন্ধ্যা পর্যন্ত), আর না হয় আমি দেখা করতে পারব না। তো ভারতীয়পক্ষ সন্ধ্যার পরে মিটিং দিতে রাজি হয়নি, যে কারণে বেগম খালেদা জিয়া প্রণব মুখার্জির সাথে দেখা করতে পারেননি। এই কারণে বেগম খালেদা জিয়াকে বিএনপির অনেক লোক গোপনে হলেও এখন পর্যন্ত দোষারোপ করে থাকে! তারা বলে থাকে যে, এটি না করে তিনি একটি পলিটিক্যাল মিসটেক করেছিলেন এবং এই কারণে শেখ হাসিনাকে ভারত সাপোর্ট করেছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বেগম খালেদা জিয়া সঠিক রাজনৈতিক অবস্থান-ই নিয়েছিলেন। এই রাজনৈতিক লড়াই এবং সাংস্কৃতিক লড়াইতে অনেক কুরবানী দিতে হয়েছে, অনেক রক্তপাত হয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের বাঙালি মুসলমানেরাই জয়লাভ করেছে।

এ লড়াইয়ে বাঙালি মুসলমান যে পরাজিত হয়নি, তা প্রমাণিত হয়েছে ২০২৪ এ এসে। আমাদের তরুণ প্রজন্ম বুকের রক্ত দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, আমাদের সাংস্কৃতিক লড়াইটি সঠিক ছিল। তাদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে এই সাংস্কৃতিক লড়াই রাজনৈতিক লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে এবং এই রাজনৈতিক লড়াইয়ে আমরা জয় লাভ করেছি। আজকের তরুণ প্রজন্ম কালচারাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং এ আগের তুলনায় অনেক পরিপক্ব এবং এর কারণেই তারা জুলাই ‘বিপ্লব’ সম্পাদন করতে পেরেছে।

তবে এ লড়াই শেষ হয়ে যায়নি। একাত্তরে স্বাধীনতার পর থেকে বাঙালি মুসলমান কর্তাসত্তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং সাংস্কৃতিকভাবে তাদের দাবিয়ে রাখা হয়েছে। যদি প্রশ্ন করা হয় যে, “চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাঙালি মুসলমান, যাদের পলিটিক্যাল এস্পাইরেশন আছে বা যারা এই সাংস্কৃতিক লড়াইয়ে বিজয় লাভ করতে চায়, তারা কীভাবে সামনের দিনগুলোতে কাজ করতে পারে?”- তবে এর উত্তর কী হবে?

এর উত্তর পেতে হলে আমাদের ২০১৩ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত এগারো বছরের লড়াইয়ের দিকে একটু নজর দিতে হবে। এই সময়ে শত বাধা সত্ত্বেও সোশ্যাল মিডিয়াতে কাজকর্ম অব্যাহত ছিল এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে বেশ কয়েকজন অত্যন্ত জনপ্রিয় মুখ উঠে এসেছেন, যেমন: পিনাকী ভট্টাচার্য, ইলিয়াস হোসেন, কনক সরওয়ার প্রমুখ। তারা সোশ্যাল মিডিয়াতে এত জনপ্রিয় কী করে? এর কারণ তারা আমাদের সাংস্কৃতিক লড়াইকে অব্যাহত রেখেছেন। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে এবং তারা পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। তরুণদের মধ্যে যারা এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে তারা পড়াশোনা করত, সেগুলো নিয়ে পাঠচক্র করতো। অর্থাৎ, তারা তাদের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা চালিয়ে গেছে।

সুতরাং, এখনো আমাদের এই লড়াই অব্যাহত রাখতে হলে এই চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। তাদের এই পাঠচক্র যেগুলো আছে, সেগুলো জারি রাখতে হবে। বাঙালি মুসলমান মনীষীরা যেসব বইপত্র লিখেছেন, প্রবন্ধ-গল্প-উপন্যাস-কবিতা, সেগুলো পড়তে হবে; অর্থাৎ, সব ধরনের সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। কারণ, কেউ যদি ফিলোসফিক্যালি ক্লিয়ার না হয়, তাহলে সে লড়াই করতে পারবে না। সাংস্কৃতিক লড়াই অস্ত্র দিয়ে করা যায় না; বয়ানকে বয়ান দিয়েই মোকাবেলা করতে হয়। বয়ানের লড়াই যদি করতে হয়, তাহলে আমাকে ইন্টেলেকচুয়ালি সুপেরিয়র হতে হবে এবং এরূপ হতে পারার একটিই পন্থা: বেশি বেশি পড়াশোনা করা, বেশি বেশি নিজেদের মধ্যে আলোচনা করা, একে অপরের কাছ থেকে জ্ঞান আহরণ করা। এভাবেই, ইনশাআল্লাহ, বিজয় অর্জিত হবে।

সারাংশ:

১. শাহবাগ আন্দোলন কোনো গণমানুষের আন্দোলন ছিল না, বরং তা ছিল ভারতের পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলামবিদ্বেষী ন্যারেটিভ তৈরির সাংস্কৃতিক লড়াই;

২. বাঙালি মুসলমানের নিজস্ব,স্বতন্ত্র সংস্কৃতি-ঐতিহ্য আছে। কিন্তু শাহবাগ মূলত চেয়েছিল বাংলার মুসলমানদের ওপর হিন্দুত্ববাদী বয়ান চাপিয়ে দিতে;

৩. বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের সৃষ্টি ও বিদ্যমানতা তার মুসলমান জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস,সংস্কৃতি,মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে;

৪. জুলাই অভ্যুত্থান মূলত শাহবাগের বিরুদ্ধে চলে আসা মুসলমানদের সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের ধারাবাহিকতা, পূর্ণ বিজয় এখনো অর্জিত হয়নি;

৫. বর্তমান তরুণ প্রজন্ম এই লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিতে চাইলে তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হবে, ইন্টেলেকচুয়াল সুপেরিওরিটি অর্জন করতে হবে।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles
বাঙালি মুসলিমসমসাময়িক বিশ্লেষণ

শরিফ ওসমান হাদির সমাজভাবনা

বাঙালি মুসলিম•April 4, 2026বাঙালি মুসলিমসমসাময়িক বিশ্লেষণশরিফ ওসমান হাদির সমাজভাবনাThe Muslim Minds BD•40...

আধুনিকতাপাশ্চাত্যবাদসমসাময়িক বিশ্লেষণ

আধুনিকতা কি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে আরোও ধার্মিক করে তুলছে?

আধুনিকতা•April 4, 2026আধুনিকতাপাশ্চাত্যবাদসমসাময়িক বিশ্লেষণআধুনিকতা কি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে আরোও ধার্মিক করে তুলছে?রিফাহ তাসফিয়াহ...

সমসাময়িক বিশ্লেষণ

বাবার চেয়ে ছেলেই বেশি রক্ষণশীল: স্ত্রীকে ‘অনুগত’ দেখতে চান জেন-জি পুরুষরা

সমসাময়িক বিশ্লেষণ•March 31, 2026সমসাময়িক বিশ্লেষণবাবার চেয়ে ছেলেই বেশি রক্ষণশীল: স্ত্রীকে 'অনুগত' দেখতে...

Uncategorizedবাঙালি মুসলিম

শাহবাগের এন্টি-ইসলামী সেক্যুলার জিনিওলজি

Uncategorized•September 7, 2025Uncategorizedবাঙালি মুসলিমশাহবাগের এন্টি-ইসলামী সেক্যুলার জিনিওলজিড. তানজিন দোহা•24 min read279ViewsFacebookXWhatsApp279 views•0...